সাম্প্রতিক

ময়মনারত্রোটক । শেখ লুৎফর

 

ময়মনারত্রোটক

বলতে গেলে গোটা বসন্ত কালটা ময়মনার একলা একলা কাটলো।

মাঘ মাসের পয়লা বিষুদবারের বিকালে প্রসব বেদনার খবর পেয়ে তার মা হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে। বুড়ি ধাত্রি আর তার মায়ের দিনমান কায়দা-কসরত আর টানাটানি শেষে এশার অক্তে সে এত্ত বড় একটা ছেলের মা হয়ে যায়। তারপর মাঘের শেষে মা চলে গেলেও তার স্বামী টিকন কিন্তু আর ঘরে আসেনি। সে আশ্রয় নিয়েছে বারবারান্দার মাচায়। পারতপক্ষে ঘরে ঢুকে না। খাবার সময় হলে পরশিবাড়ির বেগানা মরদের মতো উঠানে এসে হাঁক-ডাক পাড়ে আর রাত হলে বারান্দার মাচায় ওঠে ভূতে-ধরা মানুষের মতো কাব্দা মেরে পড়ে থাকে। ময়মনার শত ডাকাডাকিতেও টু শব্দটি করে না।

ছোট-খাট-উনপাঁজুরে গতরের টিকনের চোখে যে ভ্যাবলার মতো স্তিমিত দৃষ্টি ছিল তার বদলে সেখানে এখন ছিনালী সন্দেহ আর চাতুরি সারাক্ষণ লেগে থাকে। ঠেকায় না পড়লে তার কাছে-পিঠে ভিড়তে চায় না। সংসারের দায়-দরকারে ময়মনা তাকে নাগালে পেতে চাইলে আচমকা এমন অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গি করে, যা দেখে তার বুক ভেঙে রোদন আসে।

টিকন কিন্তু স্ত্রী ময়মনার খুব গোপন একটা বিষয়ে জটিল ফাঁফড়ে আটকে গেছে। সরল-সিধা মানুষটা নিজের মনের সেই পরমাদকে কিছুতেই না-পারছে ঠেকাতে, না-পারছে কারও কাছে খুলে কইতে।

Untitled-35 copy

যেদিন বিকালে ময়মনা প্রসব বেদনায় বিছানা লয় তখন সে ছিল ধান খেতে, ঘাস বাছায়। চাচাতু ভাই নজিরের আট-বছরি পোলাটা তাকে ডাকতে ডাকতে ছুটে আসে। তিন ক্ষেত দূরের বাতরে দাঁড়িয়ে, পেজকোনা পাখির মতো চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে জানায় :
চাচা, বাড়িত আইয়ো; চাচির বেদনা ওঠছে।
টিকন ভরা ধান ক্ষেত থেকে মাথা তুলে :
—কি কস?
ছেলেটা মুখস্থ বুলির মতো ফের শোনায় :
—চাচির বেদনা ওঠছে।
বেদনার কথায় টিকন বিরক্ত হয়। ক্ষেত ভর্তি মখমখা ধানের গোছাগুলো এরি মাঝে গাভ নিয়ে ফেলেছে। আর কয়দিন পরেই শীষ বেরুবে। মাঠের বাতাস ভরে যাবে রেনুর মিঠে গন্ধে। বিষয়টা ভাবতে তার ভালো লাগে; কেমন একটা অস্পষ্ট, স্বপ্ন স্বপ্ন। কিন্তু অক্ষণ আপদ হিসাবে ক্ষেতের জমিনে নডি মাগীর বালের মতো লাম্বা লাম্বা ঘাস ফনফন করে মাথা তুলছে। এখন যদি ধানের খাওন-পানিতে আগাছায় ভাগ বসায় তাইলে আখেরে ফলন কয়েক আনা কমে যাবে। সে-তো আর তালুকদার না, গাঁটের কড়ি ঢেলে কামলা নিবে। আর দ্যাখো এখন কিনা বেদনার কথা বলে তাকে বাড়িতে তলব করা হচ্ছে। মানুষের আক্কল!

তিন ক্ষেত দূরের বাতরে দাঁড়ানো ছেলেটা ফের কাওমাও করে ওঠে :
—চাচা,জলদি আইয়ো।
এখন আর টিকনকে দেখা যায় না। তার বদলে ক্ষেতের একটা জায়গায় কিছু ধানগাছ ঘনঘন নড়েচড়ে। সেই প্লাবিত সবুজের আড়াল থেকে অদৃশ্য টিকন নিজ স্বভাব মতো মিনমিনে ভাষায় তার অপারগতা জানিয়ে দেয় :
—অহন আমি পারতাম না, তর চাচিরে গিয়া ক কাম করোন লাগত না, বিছনাত হুঁইয়া থাহোক।
বাতরে দাঁড়ানো ছেলেটি চাচার কথা শুনে আগুনে পোড়া মানুষের মতো কাতরে ওঠে :
—অ চাচা, চাচি পেডের বেদনায় মইরা যাইতাছে, মায় কইছে তুমি শুক্কুরের মায়রে লইয়া বাড়িত যাইতা।

শুক্কুরের মার নাম শুনে তার মনের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। বোঝতে পারে অবস্থা চরম কাহিল। দুইদিন আগেও শুক্কুরের মা, ময়মনাকে দেখে গেছে। পাকঘরে তার বউয়ের কাছে বসে বুড়ি খুব বকর বকর করছিল। টিকনের এইসব না-পছন্দ। সে জানে, মেয়েলোক কামের চে’ আকামের কথাই বেশি কয়। কিঞ্চিত ত্যক্ত হয়ে সে কানে গোঁজা বিড়িটা ধরিয়ে চুলার পার থেকে হনহন করে বেরিয়ে আসার সময় বুড়ির একটা কথা তার শ্রবণে ধাক্কা দিয়েছিল :
—মনেকয় দুই দিনও যাইত না, হুঁশ কইরা চলিছ।

নজিরের পোলাটা ফের চেঁচিয়ে ওঠার আগেই সে ধান ক্ষেতের ঘন হরিৎ আচ্ছাদনের ভেতর কাদা-জলে হাত ধুতে ধুতে বলে :
—তুই যা, আমি অক্ষণ শুক্কুরের মায়রে লইয়া আইতাছি।

দৈবাৎ খবরে, ধান ক্ষেতে গতর ঢুবানো ভোঁতা-টিকনের সব যেন আউল-ঝাউল হয়ে যায়। ঝট করে তার চোখে ভেসে ওঠে বড়সড় আর ভার-ভারিক্কি শরীরের বউটার চালাক-চতুর দুটি চোখ এবং তার সারা মুখে অষ্টপ্রহর লেগে থাকা দয়ালু হাবভাব।

বউকে সে পছন্দ করে, মায় কিঞ্চিত ভালোওবাসে। তক্ষণি মনে পড়ে, গতরাতে যখন বউটা তার ঠেসে বেরিয়ে আসা পেট্টা নিয়ে হাঁসফঁস করছে, তখন বিশেষ কিছু সুবিধা করতে না-পেরে একটা বিড়ি টেনে সে আলগোছে ঘুমিয়ে পরেছিল। সকালে ঘুম থেকে ওঠতেই মনে পরেছিল ক্ষেতের ঘাসগুলোর কথা। তাই বউয়ের কোনো তত্ত্ব-তালাশ না নিয়ে সে সোজা ক্ষেতের কামে চলে আসে।

Gipcii (1)

ধাত্রি-বাড়ি কাছেই ছিল, মাঠের শেষে পাড়া তিনেক দক্ষিণে।

টিকন সেই দিকেই বেগে হাঁটে। পাশের পতিত ক্ষেতে বলদ দুটো বাঁধা। কাছ ঘেঁষে যাওয়ার সময় সাদা দামড়াটা মাথা তুলে তাকিয়ে থাকে। অবলা জীবের চোখে সজল মেঘের মতো আনুগত্য ঝিলিক দেয়, সে দেখেও দেখে না। তার সরল-সাদামাটা জীবনে ময়মনা ঘটিত আজকের সংবাদটি যথেষ্ট ঘোরালো। খবরের তীব্রতায় এরি মাঝে শরীর-মগজ লাজন্তি পাতার মতো নেতিয়ে গেছে। কেবল একটা ভীতিকর অনুভবে তার সবকিছু এখন যেন হোলাঘোলা।

উৎকণ্ঠায় অবসন্ন টিকন, গোয়াল ঘরের খুঁটিতে ঠেস দিয়ে বিকালটা কাটায়।

তার ডাইনে লাউমাচা। পাশেই তালপাতার একচালা রান্নাঘর। চুলার ওপর একটা ডেকচি বসানো। আগুনটা নিভে গেছে মেলা আগে। চুলা থেকে খড়পোড়া ছাইয়ের গন্ধ ক্ষণে ক্ষণে ভেসে এসে তার দূর্ভাবনা উসকে দেয়, ছন-বনে গড়া পক্ষীর বাসার মতো ছোট্ট এই ঘর-সংসারে ময়মনার অভাবটাকে আরও বেশি প্রকট করে।

এক চিলতে উঠানে মিষ্টি-কুমড়ার ফালি ফালি হলুদ গোধূলি নামে। পাশের দোচালা থেকে ভেসে আসে ময়মনার নাড়ি ছেঁড়া গোঙানি। বুড়ি ধাত্রি আর তার শ্বাশুরির কাতর অনুনয়, ভারবাহি পশুর মতো ভারী ভারী শ্বাস-প্রশ্বাস। ঘরের ভেতরে ময়মনার যন্ত্রনা প্রতি মুহূর্তে কতটা নৃশংস হয়ে ওঠছে টিকনের ভোঁতা ঘিলু তার আদত কায়াটা আন্দাজ করতে পারে না। কেবল মুখের ভেতর একটা তেতু স্বাদ নিয়ে সে বসে বসে ঝিমায়। গরুর তদারকি আর ক্ষেতের কামে আজ যথেষ্ট ঘাটতি হয়ে গেলো। হয়ত সেই বিগ্নটাই তাকে বেশি কাবু করে।

বাড়িটাতে অপ্রসন্ন সন্ধ্যা নামে, যা অশোভ নীরবতার ভারে ম্রিয়মান। চারপাশের ঘনায়মান অন্ধকার আর ঘরের ভেতরের জীবন-মৃত্যু লড়াই তার নিস্তেজ চেতনাকে ক্ষণে ক্ষণে গুঁতা মারে।  মনের মাঝে নেবু কাঁটার খোঁচার মতো কী যেন চিনচিন করে ঘুরে বেড়ায়; সে জ্বালায় টিকন অস্থির ভাবে উঠে দাঁড়ায়। খকখক করে কাশে। ঘন চটচটে কফ জিবের ডগায় নিয়ে বারকয় সামনা দাঁত দিয়ে কচকচ করে কাটে। কানে গোঁজা আধপোড়া বিড়িটা হাতে নিয়ে খামাখাই ঘ্রাণ শোঁকে। একটা ঝাঁঝাঁলো কটু গন্ধে মোহিত হয়ে গোপন কামনার মতো লুকিয়ে রাখা কফের দলাটা থুথু মেরে ফেলে দেয়।

বিড়ি ধরায় চুলার ছাই ঘেঁটে। দুটো টান দিতেই উৎকণ্ঠায় ভোঁতা মগজটা ডোবার বদ্ধ জলের মতো নাড়া খায়। বিড়ির স্বাদ ও গন্ধের সাথে ময়মনার বেপরোয়া চিৎকার তাকে আবাদ করা নতুন ফসলের মতো এট্টু আশান্বিত করে।

সে ধীরে ধীরে ঘরের পেছনে মেহেদি গাছের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। পাতাভর্তি গাছ আর সন্ধ্যার অন্ধকার মাখামাখি, যেমনটা ঘরের ভেতর তার শ্বাশুরির উৎসাহ আর ময়মনার হতাশা। শ্বাশুরি বলছে :
—মা, মারে আরেকটু জুরে।
সে বাইরে থেকেও টের পায়, ময়মনা প্রাণপণে কুঁথ দিয়ে ভারি কিছু উসটিয়ে ফেলতে চাইছে কিন্তু পারছে না। তাই হতাশায় সজনে গাছের নরম ডালের মতো মট করে ভেঙে পড়ে :
—আল্লারে, আর-ত পারি না।
টিকন ভূতগ্রস্তের মতো ঘরের বেড়ার পাশে দাঁড়িয়ে ভেতরের জান-প্রাণ লড়াইয়ের কিছু বুঝে, কিছু বুঝে না।

এখন নিজের অচেতনে সে-ও যেন ওই মরণ-পন সংগ্রামে খানিকটা জড়িয়ে গেছে।

তার বুক ধকধক কাঁপতে শুরু করে। ময়মনার মতো তারও যেন শ্বাস নিতে বেশুমার লাগে। কী একটা বিকট বোঝা যেন এরি মাঝে শরীরজুড়ে চেপে গেছে। সে হাতের বিড়িটা ফেলে বেপথু অসার দেহটা থেঁতলা ইদুরের মতো বেড়ার পাশে নিশব্দে গোঁজে দেয়। এখন বসে বসেই দেখতে পায় : পাটকাঠির বেড়ার ফাঁকে ফাঁকে চেরাগের মেন্দা আলো লোলা মানুষের মতো টালমাটাল কাঁপছে। ভেতর ঘরে তার শ্বাশুরির মমতা আর শাসনভরা গলা ফের শোনা যায় :
—আরেকটু…আরেকটু জুরে।

টিকন যন্ত্রচালিতের মতো বেড়ার ফাঁকে চোখ রাখে। নজরে আসে শায়িত ময়মনার উত্থিত দুই উরু। সেখানে মিশমিশা কালো একটা কী যেন অনড় হয়ে আটকে আছে! সে ভড়কে যায়। ভয় তাড়াবার জন্য বুকে থুতু দিয়ে ফের নজর দেয়।

ধাত্রি বুড়ি তেলের বাটিতে দুই হাত কব্জি তক ঢুবিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছে। আতঙ্কে টিকনের দূর্বল হৃৎপি- থেমে যেতে চাইলে সে চোখ বন্ধ করে ফেলে। একটু পরে একটা কচি-কোমল কণ্ঠের ওয়া…ওয়া…এলানে তার দেমাগ ফিরলে, সে চেয়ে দেখে ময়মনার রক্তাক্ত নিন্মাঙ্গ কাটা তরমুজের মতো লাল টকটকে। সে দৃশ্য কী ভীষণ, কী মর্মান্তিক বিবৎস!

টিকনের শরীরটা ভয়-তরাসে শিউরে ওঠে। সে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। চরম বিস্ময় ও ঘেন্নায় পেটের দানাপানি গলার কাছে ওখাড়ি আসতে চায়। ফের ভোঁতা কাচিতে কাটা আঙুলের মতো একটা বেদনার্ত সমূহ অনুভব তার গোটা শরীরটাকে স্তব্ধ করে দেয়।

সেই থেকে টিকন মন-মানসিকতায় কিঞ্চিত বেসামাল। ময়মনার কাছ থেকে বিলকুল ফারাকে থাকতে সর্বদা চেষ্টা চালায়। নানান অজুহাতে বাড়ি থেকে সময়-অসময়ে সটকে পড়ে।

গোটা বসন্ত মরশুমটা ময়মনা কচি ছেলেকে বুকে নিয়ে একলা কাটায়েছে। কী হেতু টিকন হেন আউল-ঝাউল হয়ে পালিয়ে বেড়ায়, শত ভেবেও তার কোনো দিশা ধরতে পারেনা। ছেলের মা হওয়ার পর থেকে ঘুমের ধরন পাল্টে গেছে। রসুনের খোসার মতো পাতলা নিদ পহরে পহরে আসে-যায়। চোখ খুলে প্রথমেই ছেলেকে দেখে। কোনোদিন মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে শুনতে পায় দেউড়ির পাশের আমগাছে টুপক্ষী ডাকছে। মানুষে কয়, এই পাখির ডাক একটা ভয়ঙ্কর দুর্লক্ষণ। গৃহস্তের দুর্বিপাকের সংকেত নিয়ে এরা নিশুতি রাতে বাড়ির পাশে এসে রোদন জোড়ে। বিশেষ করে মানুষের মরণের আগাম ইশারা এরাই নাকি দিয়ে যায়। কেউ বোঝুক আর না বোঝুক।

ময়মনা আতংকে চুপসে যায়। ছেলেকে বুকে জড়িয়ে খোদার কালাম পড়ে।

তার মা, ছেলের সিথানে দরকারি অনেক কিছুর সাথে একটা মর্চেপড়া লোহার পেরেকও দিয়ে গেছে। ওই অলুক্ষুণে পক্ষীটার ডাক শুনলেই মায়ের কথা মতো সে পেরেকটা জ্বলন্ত বাতির শীষে ধরে রাখে। কোনো কোনো দিন তাতেই পাখিটা বুক কাঁপানো ডাক বন্ধ করে দেয়। পেরেক পোড়ায় কাজ না হলে সে মরিয়া হয়ে টিকনকে ডাকতে শুরু করে। সেটা এক চরম দিগদারি। দীর্ঘক্ষণ পরে মানুষটা খেতার তলে থেকে ওই টুপক্ষীর মতো টু টু করে সাড়া দেয়। ময়মনা চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বিস্তর কথা খরচ করে টিকনকে বিষয়টা বুঝিয়ে বললে সে, ওঠে গিয়ে পাখিটার দিকে জোরে জোরে কয়টা ঢেলা মেরে তাড়িয়ে দেয়।

গেল হপ্তায় টিকন বজ্জাত পাখিটাকে তাড়াতে গেলে ময়মনা কপাট আগলে দাঁড়িয়ে থাকে। লোকে কয়, বেয়াক্কলের চে’ চোর ভালা। এই যে দুটো মাস সে কচিপুত্র বুকে নিয়ে একলা একলা কাটিয়ে দিলো, লোকটা কী একবার উঁকি দিয়ে তার বেদন বুঝতে চেয়েছে! আজ আসোক, এর একটা বিহিত সে করবেই।

মাঝ উঠানে দাঁড়িয়ে আমগাছটা তাক করে টিকন জোরে জোরে দুই-তিনটা ঢেলা মারে। থমথমে শীতল অন্ধকারে পলায়নপর খেচড়ের পাখা ঝাপটানোর কয়টা শব্দ ভরী ঢেউয়ের মতো আছড়ে আসে। ময়মনার পা থেকে চুলের গোড়া তক সেই শব্দটা শিরশির করে ছুটে বেড়ায়। তবু দরজা বদ্ধ করে না। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে। আন্দোলিত হৃৎপিণ্ডের মতো অন্ধকার আর নৈশব্দের অতলে বিচিত্র কর্মে আত্মমগ্ন মহাবিশ্ব। দৈব প্রাপ্তির মতো অতুল এ দিব্য-দর্শন! যা তার বুকের মাঝে একটা হুলস্থুল কান্নাকে পাক দিয়ে উঠায়। কিন্তু না, সে কাঁদবে না। যেন সে তার ষষ্ঠইন্দ্রিয় দিয়ে এই সংসারের আদত খেলাটা ধরে ফেলেছে। সমুখের ঐ উদাস প্রকৃতির সমুদয় স্তরে স্তরে কী এক নিস্পৃহ শক্তি যেন দিব্যি ছড়িয়ে রয়েছে। সে ভাবে; বোধ করি এমন একটা কিছুর জোরেই মানুষ বাঁচে।

টিকন টুণ্ডা-মুণ্ডা হয়ে লাউয়ের মাচার এক পাশে বসে পেশাব করে। হাতের ধূলো ঝাড়তে ঝাড়তে কাশে। গভীর অন্ধকারে ছোট আরেকটা অন্ধকার নড়েচড়ে। ময়মনা সাফসাফ টের পায়; ছোট-খাট গতরের আউল-ঝাউল স্বামীটির জন্য তার মনে যথেষ্ট দরদ ছটফট করছে। সাথে এও বোঝে, মানুষের দুখ-সুখ বিষয়ে তার স্বামীটির আক্কেলের পরিধি খুব যৎ-সামান্য। তাই মানুষটার প্রতি তার ক্ষোভ পুরোপুরি জমে ওঠে না।

টিকন বারান্দার কাছে আসতেই সে থপথপ করে দুই পা এগিয়ে যায়। খপ করে স্বামীর একটা হাত ধরে ফেলে। কৃষকের সে হাত শুকনো ডালের মতো শক্ত আর খসখসে। ময়মনা মনে মনে ডর পায়। ভোঁতা মানুষটা যদি আছকা ক্ষেপে গিয়ে চড়-থাপ্পর মারে, তাহলে আর রক্ষা নেই।

শান্ত-শিষ্ট-সবুরি স্ত্রীর কাছে টিকন এরকমটা মোটেই প্রত্যাশা করেনি। সে হকচকিয়ে চেয়ে দেখে তার চে’ দেড়া একটা মানুষ পথ আগলে দাঁড়িয়ে আছে। শরীরের ঘ্রাণ আর হাতের উষ্ণতায় নিজের বউকে চিনতে একটু দেরি হয়। কারণ দুধ দুধ একটা নতুন সুভাস দুজনের মাঝে স্থির হয়ে আছে। ময়মনার গতরে সেটা আগে ছিল না। তাই সবকিছু একুনে সমঝে নিতে সময় লাগে । যখন বোঝে, তখন একটা কপট রুক্ষতায় সে ধমকে ওঠে :
—কী কইবার চাস!
ময়মনা একটুও ভড়কায় না। তার দৃষ্টি স্বামীর দিকে নয়; যেখান থেকে একটু আগে সে বেঁচে থাকার গোপন রসদটি পেয়েছে সেই নিশীথ-নীরব প্রকৃতির দিকে। ওই মহামহিম বিশ্ব-প্রকৃতি যেন তার অন্তর-আত্মা সমঝে ফেলেছে। স্বজনের মতো সেও বুঝি সমব্যথি। সে ওই দিকেই চেয়ে চেয়ে ফিসফিস করে বলে :
—ঘরে আইয়োক, কতা আছে।
টিকন মিনমিনায় :
—কী কতা, এইহানে কওন যায় না?
—না, কওন যায় না।
ময়মনা একটা হ্যাচকা টানে তার স্বামীকে ঘরের ভেতর নিয়ে দরজাটা লাগিয়ে দেয়।

টিকন ভ্যাবলার মতো হা-করে দাঁড়িয়ে থাকে। সে একবার স্বামীর দিকে তাকায় একবার ঘুমন্ত ছেলের দিকে। তারপর মরিয়া হয়ে জিজ্ঞেস করে :
—হাচা কইরা কওক, কেন হে পলায়া পলায়া থাহে?
টিকন কোনো কথার উত্তর দেয় না। সে তার শিশু পুত্রের দিকে একমনে তাকিয়ে আছে। ছেলেটা তার মতো হাড়গিলে চিঙ্গট চেহারার নয়। মায়ের মতো ফর্সা আর গায়ে-গতরে লমলমা। শিশু পুত্রের নিদ্রীত কান্তি তার মন-দিল ভোরের বাতাসের মতো ছোঁয়ে যায়। সুখের নীরব আমোদে বিড়ির নিকোটিনে সেদ্ধ ভারী জিভটা মুখের ভেতর বারকয় দোলে ওঠে। তবু সে কোনো কথা না বলে গঁতা ব্যাঙের মতো নিজের আবেগকে শীতনিদ্রায় চেপে রাখে। তার মনোযোগ পুত্রের হাতের দিকে। ছেলে দুই হাত মুঠি করে ঘুমিয়ে আছে। সে যেন কার কাছে শুনেছিল, শিশুরা অনেক দিন পর্যন্ত হাতের মুঠি সহজে খুলে না। খুললেই তার ভাগ্য নাকি ফসকে যাবে। নসীবের ধনরতœ আর সুখ-সমৃদ্ধি হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে।

অনেক চাপাচাপির পর টিকন দুই হাত আর মুখে এমন একটা ভঙ্গি করে যে, ভয়-ঘেন্নায় তার বুক শুকিয়ে যায়। দিশেহারার মতো সে টলতে টলতে বিছানায় বসে পড়ে। ভয়ানক শরমে তার কলজে তক হিম হয়ে গেছে। এই মানুষ নিয়ে সে কী করে সংসার চালাবে!

টিকন চলে যাবার অনেকক্ষণ পর সে দরজা লাগায়। বিছানায় ওঠে ওরের কাছে ছেলেকে নিয়ে গুম হয়ে বসে থাকে। দুই কান ভোঁ ভোঁ করছে, জ্বলছে ব্রহ্মতালু। সে-তো এক মা। এই সংসারের আর সব মায়ের মতো। তবে কেন কেউ তার দরদি নয়। কেন ওই লোকটা জাহেল-বদের মতো তার বেদন বোঝতে চায় না!

এরি মাঝে হঠাৎ মনে পরে, তার খালাস হয়ে যাওয়ার পর পা দুটো সোজা করে চোখ খুলতেই বেড়ার ফাঁকে লেগে থাকা কার যেন দুটো চোখের সাথে তার চোখাচোখি হয়েছিল। সে যেই হোক, চুরি করে সব দেখে ফেলেছে। আর তার স্বামীর আলামত দেখে এখন মন বলছে সেই মানুষটাই তার ঘরের মানুষ।

একটু পরেই টুপক্ষীটা আবার আম গাছে ফিরে আসে। যমের দীর্ঘশ্বাসের মতো উৎকট রোদন লহমা লহমায় অতল অন্ধকারে ছুঁড়তে শুরু করে দিয়েছে। ময়মনা প্রথমে ভড়কে গেলেও তার মনের বলে চিড় ধরে না। ঘুমন্ত ছেলের দিকে চেয়ে চেয়ে সে নিবিড় মনে পাখির ডাক শুনে। সাথে যেন শুনতে পায় বিশ্বচরাচরের স্নেহ-নিশ্বাস। সে খুব সরেস বুদ্ধিতে ভাবে, পাখি তো শুধুই পাখি; তার মতো হাজার অনুভব নিয়ে বেঁচে থাকা একটা অবলা জীব মাত্র। তার কী মখদুর আছে মঙ্গল-অমঙ্গলের। সে বাইরের দিকে কান পাতে। নীরব নিশুতির পরতে পরতে কারা যেন নীচু স্বরে জীবনের গান গাইছে। সাহস আর শান্তনায় তার দুচোখ জলে ভরে ওঠে। নিজেই নিজেকে প্রবোধ দেয়,মানুষ ঠকালেও জীবন ঠকায়না। সংসারের সহজ ভাষায় তার মাতৃমন এক্ষণে বুঝে গেছে, জগজ্জননী পুরুষের মতো নয়; স্রষ্টার মতো নারীর মনের বেদনা বোঝে।

টিকন পরদিন সকালে নাস্তা খেতে এলে ময়মনা এমন ভাব করে যে, কিচ্ছুটি হয়নি।

শুঁটকি ভর্তা দিয়ে মানুষটা গভীর অভিনিবেশে জাউ খাচ্ছে । গরম গরম জাউ আর ভর্তার ঝালে তার ছোট্ট কপালখানায় ফুটি ফুটি ঘাম দেখা দিয়েছে। ময়মনা ভর্তার বাটি আর জাউয়ের বোল সামনের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে :
—লাগলে নেয় যে ।

টিনের গ্লাসে পানি দিয়েছে আগেই। এখন কলস থেকে জগে গপগপ করে আরও কিছু জল নিয়ে স্বামীর সামনে রাখে। টিকন খাওয়ার ফাঁকে আড়ে আড়ে তাকে দেখছে। এ দেখার যেন একটা আলাদা মাহিত্য আছে। এ কথা ভাবতেই গোপন অভিষ্পায় একটা তীক্ষ্ন গভীর চেতনা বিদ্যুতের ঝলকের মতো মুহূর্তের জন্য তার মানসে ছলকে ওঠে। দুরুদুরু বক্ষে সে চুলের খোপা থেকে রাবারের ব্যাল্টটা খুলে এনে টেনে টেনে বড় করে, ছেড়ে দিয়ে ছোট হতে দেয়। টানলে ব্যাল্টটা বৃহৎ বৃত্তের মতো একটা প্রকৃতি পায়। সেই বৃত্তের ভেতরে খুব সহজেই বুঝি একটা মানুষের মাথা ঢোকে যেতে পারবে। আবার ছেড়ে দিলে পূর্বেকার ক্ষুদ্র অবয়বে ফিরে আসে। শিশুদের মতো খেলাটা সে চালু রাখে। টিকন কপাল কুঁচকে চেয়ে থাকে। কিঞ্চিত বিরক্তি নিয়ে বলে :
—খামাখা এই রহম করছ ক্যা।
ময়মনা স্মিতহাস্যে হরহর করে জানায় :
—এম্নি এম্নি, ভাল্লাগে। দ্যাহোক না টানলে জিনিসটা কত্ত বড় অয়।
টিকন ফের আহারে মন দেয়। খেতে খেতেই কিঞ্চিত কৌতুক ও প্রচ্ছন্ন বিদ্রুপের সাথে নিজের মত প্রকাশ করে :
—এইডা আর এমন কী, রবার-ত এই রহমেই।
ময়মনার বুক তুমুল বেগে কাঁপতে শুরু করে। প্রকৃত কথাখানা প্রকাশের দূর্লভ মহূর্ত সমাগত, সে মুখের শরম, বুকের লাজ ভুলে ফসকরে বলে ফেলে :
—খালি রবার ক্যা, সবতাই-ত রবারের লাহান।
টিকনের রোদে পোড়া ঝামা মুখাবয়ব ধক করে পিঙ্গল বর্ণের হয়ে যায়, সে মুখের গ্রাসটা দ্রুত গিলে আবেগাল্পোত শিশুর মতো তড়বড়িয়ে জিজ্ঞেস করে :
—হাচা কৈছস?

aRUAMMc Y 11# #

Comments

comments

শেখ লুৎফর

শেখ লুৎফর

জন্ম ১৯৬৬, গফরগাঁও, ময়মনসিংহ। স্নাতক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা : শিক্ষকতা। বিজ্ঞাণ বিভাগ, আল জান্নাত এডুকেশন এনষ্টিটিউট, জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ । প্রকাশিত বই : গল্প— উল্টারথে [ঐতিহ্য, ২০০৮] ভাতবউ [ঐতিহ্য, ২০১৩] উপন্যাস— আত্মজীবনের দিবারাত্রি [ঐতিহ্য, ২০১০] কিশোর উপন্যাস— সুতিয়া নদীর বাঁকে [রূপসি বাংলা, ২০১৪] ই-মেইল : sheikh.lutfor32@gmail.com ০১৬৮১ ০২২৪৫২

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: , ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি