সাম্প্রতিক

হাসতে থাকা কৃষ্ণচূড়া । আফরোজা সোমা

ইলিউশন

পথে যেতে, স্বপ্নে পেলাম সোনার আংটি এক,
পেলাম কিছু সাদা এবং রং-বেরঙের ফুল, যেতে যেতে
হঠাৎ পথে দেখলাম একটা নদী। নদীর পাড়ে চেনা এবং অচিন
কিছু মুখ; নদীর পাড়ে রাস্তা একটা, শুয়ে ছিল কালো, দেখলাম হঠাৎ
কারা যেনো নদীটাকে কাটতে কাটতে কালো রাস্তার বুক ছাড়িয়ে

আরো খানিক দূরে নিয়ে এলো। নদীর পাড়ে আমি স্বপ্নের মধ্যে
দাঁড়িয়ে রইলাম, আমার যাবার বাহন নেই; স্বপ্নের মধ্যে ঘটে চলা
বাস্তবতায় দেখলাম আমার কুড়িয়ে পাওয়া সোনার আংটি নেই;
ফুলগুলোও সব কী করেছি, কাকে দিয়েছি, বা পেয়েছি কি
পাই নি আদৌ কিছুই মনে নেই।

সলিলকি

ধূলিধূসরিত দিন, আমাকে তোমার বুকের মধ্যে নাও,
দাও, একটুকু উষ্ণতা। দূর থেকে উড়ে আসা ঝড়ো হাওয়া
এই বুকের ভেতর এসো, এইখানে জমেছে যে ধূলোর পাহাড়
কণা কণা করে তাকে তুমি উড়িয়ে নিয়ে যাও। রংপেন্সিলে
এঁকে, দেখো কী সুন্দর বানিয়েছি এক ঘর, তার পাশে নদী
কী মনোরম, কুলুকুলু শব্দে বয়ে যায়; দুপুরের রোদ, মাঠময়
শুয়ে না থেকে তুমি এই ঘরে এসো, ঘরটিকে গৃহ করে দাও।
নদী পাড়ে রোদের মধ্যে অবিরল হাসতে থাকা কৃষ্ণচূড়া
ভালোবেসে তুমি আমার মুখের দিকে চাও, চেয়ে দেখো
চোখের তারায় আলগোছে ঝরে যায় গুচ্ছ গুচ্ছ দিন।

অগ্নি উপাসক

ছবিতে দেখেছি, লাল জামা গায়ে দেয়া একটি শিশু পোড়া বাবার গালে
দিচ্ছে আদর, রাত জাগা লাল চোখে রমনী এক বার্ন ইউনিটে বসে 
দগ্ধ স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছে অপলক।

আমি পোড়া বুক, আমি রাত জাগা নারী, আমি বাংলার বেহুলা বালা

সিঁথির সিঁদুর রাখবো বলে মৃত্যুকে মিছা বলে ভাসাই লাশের ভাসান,
ইন্দ্রের সভায় ক্লান্তিহীন নেচে নেচে আমি জয় করি দেবতারও মন;
তবু আজ হায় ভগবান! আমার সিঁদুর কেন মুছে যায়! এ কোন
কালসাপ এসেছে সংসারে! এমন আগুন পুরাণে তো দেখি নি আমি,
জানি না, এর দেবতা কোথায় থাকে!

ও মা মনসা তুমি আগুনের দেবতারে চেনাও, দয়িতেরে ফিরে পেতে আজ
হবো অগ্নি উপাসক, আবার ক্লান্তিহীন নেচে নেচে আমি জাগাবো শ্যামা অঙ্গ তার,
আবার তার ঠোঁটে রেখে ঠোঁট পৃথিবীতে জীবনের আনন্দ আমি করবো রচনা।

আগুন ও সেতার

বেদনাই আজ প্রসঙ্গ আমাদের। সামিয়ানার নিচে সারাটি রাত্রি ধরে
যে বেদনা ঝরছে অনিঃশেষ, বাদকের মর্মপীড়া সেতারের সুরলহরীতে
ভেসে ভেসে এসে বসেছে যে কাতর ঠোঁটের কোণায়, কপালের বিষন্ন
ভাঁজে যে বেদনা বাড়িয়েছে বিরহীর সন্তাপ, তার কোনো পরিসীমা নেই।

পরিসীমাহীন এই রাতে বাসের ভেতর পুড়ে কয়লা হলো যারা, দগ্ধ যারা
গেলো হাসাপাতালের বিছানায়, সামিয়ানার নিচে জড়ো হওয়া এই বিরহী
সমবেতদের কেউ নয় তারা, টেলিভিশনে দেখা নিহতের অঙ্গার হওয়া মুখ,
স্বজনের গগন বিদারী বিলাপ, ক্রমশই ফিকে হয়ে আসে এই সামিয়ানার
নিচে; ক্রমশই কী গাঢ় জমাট বাঁধা হতে থাকে রাত, কপালের ভাঁজে এসে
বসতে থাকে সেতার থেকে জন্ম নেয়া গাঢ় বিষণ্নতা, আর কী গভীর বেদনায়
নিজেকে নিজেতে ধরে না রাখতে পেরে দু’একটি তারা ঝরে যায় মৃতদের নামে;

কিন্তু আমরা দেখবো না মৃতদের মুখ; শুধু তারাদের ঝরে যাওয়া দেখে করবো
বেদনা যাপন; ভাববো: আহা! মরে গেলো একটি তারা! ঝরে গেলো চিরতরে!
আর বিরাট মাঠে সমবেত হয়ে সেতারের কান্না শুনে ঠোঁটের কোণে ফোটাবো
শোকের ভাঁজ; কিন্তু ভাববো না পোড়া মুখের ছবি, ভাববো না
কী বেদনা দগ্ধের অঙ্গে জমেছে জানে না সেতার।

গচ্ছিত

নিজেকে গচ্ছিত রেখো না তুমি অন্যের বুকের ভেতর
সে বুক যদি পাখি হয়ে উড়ে যায় দূরে, কী করে তুমি ফিরবে বাড়ি?
যদি সে বুক নীল তিমি হয়ে গভীর সমুদ্রে যায় চলে, কী করে বাঁচবে বলো?
তুমি তো জানো না সাঁতার। এরচেয়ে ঢের ভালো, চিরতা’র ডালের ভেতর
ঢুকে মিশে যাও তুমি; শেকড়ে সে বেঁধে রাখবে তোমায়।

যদি তুমি থাকতেই চাও গচ্ছিত খুব, তবে ক্ষুধার্তের থালায়
হয়ে যাও ভাতের নলা; মমতায় সে তোমাকে নিজেতে করবে ধারণ।
গচ্ছিত যদি থাকতেই চাও চিরতরে, তবে হয়ে যাও বরফের তৈরি মানুষ;
উত্তাপে গলে যেতে যেতে তুমি আর তুমি থাকবে না; পানি হয়ে গড়িয়ে যাবে
নালায় বা নদে, রৌদ্রতাপে বাষ্প হয়ে তুমি হয়ে যাবে মেঘ,উড়ে উড়ে
যাবে দেশান্তরে; বৃষ্টি হয়ে ঝরবে তুমি সাগরে ও ডাঙায়।

এভাবেই বাষ্প হয়ে, মেঘ হয়ে, বৃষ্টি হয়ে আবার ফিরবে তুমি নিজের কাছে তোমার;
এভাবেই ফিরে ফিরে এসে, অনাদিকাল ধরে নিজেকে নিজেতে গচ্ছিত রেখেছে সংসার।

 

Save

Save

Comments

comments

আফরোজা সোমা

আফরোজা সোমা

জন্ম ২রা অক্টোবর, ১৯৮৪, কিশোরগঞ্জ। পেশায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। পাশাপাশি ফ্রিল্যান্স ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট হিসেবে কাজ করেন বিবিসি বাংলা রেডিও-তে। প্রকাশিত কবিতার বই: অন্ধঘড়ি (২০১০,কথা প্রকাশ), হারমোনিকা (২০১৪, সংবেদ), ডাহুক (২০১৫, ভাষা প্রকাশ)।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: , , , , , ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি