সাম্প্রতিক

ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ আর তাঁর কবিতা । হাসান শাহরিয়ার

‘A verse is based on a rhythm which is first established or occured to the poet on which a poet builds the Poem or the Ghazal’- কবির মনে কবিতা বা গজলের নির্মাণ এইভাবেই হয় বইলা মনে করতেন উর্দু ভাষার কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ, যার কবিতা প্রধানত লিরিক্যাল। একদিকে ফয়েজের কবিতা গভীরভাবে মানবিক, অন্যদিকে তাঁর ভাষা স্পষ্ট, মুখোমুখি। অখন্ড ভারতে পাঞ্জাবের শিয়ালকোটে ১৯১১ সালের ১৩ফেব্রুয়ারি জন্ম নেয়া এই কবি শিক্ষাজীবনে দীক্ষা নেন মার্ক্সবাদে। এম এন রায় আর মোজাফফরদের নেতৃত্বে প্রথমে নিখিল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি এবং পরে অখন্ড পাকিস্থানের কমিউনিস্ট পার্টিরও সদস্য ছিলেন কবি ফয়েজ। প্রথম জীবনে পশ্চিমের কবি কিটস্‌, শেলি, ব্রাউনিং-এ প্রভাবিত এই কবি পরবর্তীতে গভীরভাবে আসক্ত হন আল্লামা ইকবাল আর মির্জা গালিবে। পারস্যের মহান কবি সূফী জালালউদ্দিন রুমিতেও ফিদা ছিলেন ফয়েজ। দেখা যায়, শুধু কবিতা না, তাঁর জীবন আর দর্শনেও সূফীজমের বিস্তর প্রভাব। তাঁর অনেক কবিতাই সূফীজমের শান্ত অথচ ভাবের গভীর প্রত্যয়ে আচ্ছন্ন। সূফীজম অথবা অন্য যে কোন কারণেই হোক, শ্রমিক শ্রেনীর নেতৃত্বে বল প্রয়োগে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক দর্শনের জায়গা থেইকা একসময় সইরা আসেন কবি ফয়েজ আহমেদ এবং হইয়া উঠেন মানবতাবাদী (humanist)!

tumblr_mi5a2wob6t1r1ms15o1_1280আল্লামা ইকবালের সাথে কবি ফয়েজকেও বলা হয় ‘পোয়েট অব ইস্ট’। পাকিস্থানের নিজস্ব ধ্রুপদী আবহে তিনি যোগ করেন পশ্চিমা আধুনিকতা। মূলত পশ্চিমা কবিতার আকার-আঙ্গিক অনুসরন কইরা পূর্বের অবদমিত খোয়াবগুলারে ভাষা দেন কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ। তৈরি করেন উর্দু কবিতার নতুন আঙ্গিক, নতুন ভাষা, নতুন স্বর। উর্দু কবিতা, সামগ্রিকভাবে উর্দু সাহিত্য শিল্পকলা বিকাশে কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ একজন অন্যতম অগ্রদূত। তিনি যখন জন্ম নেন তখন গোটা বিশ্বে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠতেছিল। তারচেয়েও বড় বাস্তবতা, গোটা ভারত তখন ব্রিটিশদের সরাসরি উপনিবেশ। যখন কবিতা লিখতেছেন, তখন ভারত ভাগ হইল। তিনি দেখলেন, তার জন্মস্থান পাঞ্জাবের পূর্ব পশ্চিমে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় হিন্দু মুসলিম শিখরা একে অন্যরে নৃশংসভাবে পোড়াইতেছে, জবাই করতেছে। দেখলেন, পাকিস্থান হইবার পর সামরিক হায়েনাদের থাবায় নিষ্পেষিত জনগণ। এইসব দুঃসহ ঘটনা কবিকে আঘাত করে প্রচন্ডভাবে। তাঁর কবিতার ভাষা, শব্দ, দৃশ্য, পরিণতি হইয়া ওঠে নিপীড়িত জনগণের নির্ভীক স্বর। শিল্পের জন্য শিল্পের নন্দনফর্মূলা বাতিল করেন ফয়েজ। শুধু নিঃশব্দ, নিঃসঙ্গতা, প্রেম, লাস্যময়তা, ভাবে আটকাইয়া রাখেন নাই কবিতারে। নিপীড়িত মানুষের ক্রন্দন, লড়াই, ন্যায়বিচার, মুক্তির প্রতিক হইয়া ওঠে তাঁর কবিতা।

পাঠকের লাইগা এইখানে কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের কিছু কবিতা অনুবাদ করা হইল। অনুবাদগুলা ফয়েজের কবিতার ইংরেজি অনুবাদ থেইকা করা। ইংরেজি অনুবাদকের নাম কবিতাগুলার নিচে দেয়া হইছে। প্রায় সবগুলা কবিতাই ফয়েজের প্রথম জীবনে লেখা। ‘বাংলাদেশ-২’ কবিতাটা কবি লেখেন ৭১’এর মার্চ এপ্রিলের দিকে- যখন পাকিস্থানি সামরিক হায়েনারা বাংলাদেশের মানুষের উপর নৃশংস হত্যাযজ্ঞ শুরু করে।

Faiz Ahmed Faiz 2
নিঃসঙ্গতা

সুপ্ত পুরোনো এক মিত্রের মত নিঃসঙ্গতা
আমার ঘরে এসে মদ ঢালে সায়াহ্নবেলায়।
আমরা একসাথে বসে অপেক্ষা করি চাঁদ আর
তোমার জন্য; কখন জ্বলজ্বল করবে সবকটা ছায়া।
Loneliness
– English translation: Azfar Hussain

গতরাতে

গত রাতে অন্তরিত তুমি এসেছিলে আমার ভিতর
যেমন কোন জলহীন বিস্তারে নিভৃতে আসে বসন্ত
যেমন বয়ে যায় শান্ত সমীর আর কেঁপেকেঁপে ওঠে
জনশূন্য নিমগ্নতা;
যেমন প্রশান্তি আসে চুপে আর অল্পঅল্প গিলে ফেলে
কারো তুমুল যন্ত্রণা।
Last night
English Translation: Azfar Hussain

স্তবক

যদিবা তারা কেড়ে নেয় আমার কালি ও কলম
আমি অভিযোগরহিত থাকি,
আমি যে মরণ বুকের গহিন রক্ত-জলাসারে
ভিজিয়েছি অঙ্গুলি আমার।
আমি অভিযোগরহিত থাকি
এমন কি যখন তারা আমার কন্ঠরুদ্ধ করে;
কোন কন্ঠ কি ধ্বনিত আজ
ভেঙ্গে দিতে পারে শেকলের এই চক্রবূহ্য সব?
Stanza
English Translation: Azfar Hussain
 
 
নির্জনতা

কেউ কি আছে আশেপাশে, আমার ক্রন্দনরত হৃদয়? না, কেউ নাই।
তথাপি জনৈক পথিক; সে-ও চলে যাবে ঠিক তার নিজের পথে।
রাত্রি কাটছে, অন্ধকারে ছড়িয়ে পড়ছে নক্ষত্রের তরঙ্গ-ধুলি। আর
সংসদভবনে স্বপ্নপূর্ণ প্রদীপেরা টলতে টলতে ভেঙ্গে পড়ছে ক্রমশ।
অপেক্ষারত ক্ষুদ্র রাস্তাগুলি ঘুম দিচ্ছে সংসরণের পাশে আর
অদ্ভুত ধরিত্রী লুকায়ে ফেলছে ধীরে গতকল্যের সব পদচিহ্ন।
বাতি নেভাও প্রিয়, সরিয়ে রাখো মদের বোতল
নামিয়ে দাও চোখের পাতা এই ভোর গোধূলিতে
এখন এইখানে কেউ নাই, এইখানে কেউ আসবে না আর।
Solitude
English Translation: Philip Nikolayev

আমার সাক্ষাৎকার

বৃত্তাকার ছাদ ধরে কালো হয়ে উঠেছে পুরোনো দেয়াল।
আর সব মুসাফির চলে গেছে পথ শূন্য করে । আরো
একবার রাত্রি আমার লীন হলো তার একাকীত্বে; আরো
একবার মনে হয় অথিতি নাড়ছে কড়া আমার দরজায়।
এক করতল রঞ্জিত তার হেনায়, অন্য তলে লহু
তার এক চোখ ঢালছে বিষ, অভিশাপ অন্য চোখে।

আমার এই হৃদয়-গৃহে কারো আসা-যাওয়া নাই; বলি-
নিঃসঙ্গতা জলহীন শুষ্ক রাখে তার ব্যথার কুসুম।
কে আছে আড়ে রঞ্জিত করতে পারে তার দুঃখের পেয়ালা?

আবার মনে হয় অথিতি নাড়ছে কড়া আমার দরজায়
আত্মরতি যাতনায়। মিত্র আমার- যারে আমি মরণ
বলে ডাকিঃ সে বন্ধু আমার-ডাকি, সে শত্রু আমার-ডাকি;
সে প্রেমিকার মত খুনি, সে প্রেমিকার মত লাস্যময়ী!
My interview
English Translation: Philip Nikolayev

 

সংসরণ

পড়ে আছে এই নিরাশার সংসরণ
চোখ রেখে দূর অনুভূমিক রেখায়
জমে যাওয়া তার বুকের শীতল ধুলি
ছড়িয়ে দিয়েছে ধূসর লাবন্য-লিপি।

মনে হয় তারে কোন বিষন্ন প্রেমিকা
একলা ঘরে অন্তরিত নিজের ভেতর
যেন কারো অপেক্ষাতে এই নিমগ্ন নির্বেদ
নিস্তেজ সমস্ত শরীর, ব্যথিত প্রতিটি লোমকূপ।
Highway
English Translation: Philip Nikolayev

 

কথা বল

কথা বল, এই ঠোঁট তোমার।
কথা বল, এই স্বর তোমার।
কথা বল, এই শরীর তোমারি।
কথা বল, এখনো বেঁচে রয়েছো তুমি।

দেখো, কেমন করে ওই কামারশালায়
উন্মত্ত জ্বলে অগ্নিশিখা, ঠিকরে ওঠে লোহিত লোহা
আর খুলে পড়ে কুলুপের চোয়াল
ভেঙ্গে পড়ে শেকলের গিঁট।

শরীর আর স্বর ধ্বসে যাবার আগে
কথা বল, যথেষ্ট এই ক্ষণিক সময়।
কথা বল, সত্য এখনো অন্তরিত নয়
যাই ঘটুক, কথা তোমাকে বলতেই হবে।
Speak
English Translation: Azfar Hussain

 
বাংলাদেশ-২

আর এইভাবে আমার যন্ত্রণা দৃশ্যমান হয়ে উঠেছিলঃ তার অপার ধূলিচূর্ণ- কাল থেকে কালান্তরে ভরাট করেছে হৃদয় আমার; তারপর উঠে এসেছে চোখে। আর আমার মিত্ররা তখন বলেছিল- রক্তস্রোতে ধুয়ে ফেলতে চোখ। আমি তাই শুনে গেছি চুপে, নির্মোহ তিক্ততায়।

অকস্মাৎ সবকিছু রক্তজমাট- সব মুখ, সব প্রতিমা, লোহিত দিগ্বিদিক।
রক্তে ভেসে গেছে সূর্যবাতি, মুছে গেছে তার সোনালী বিভাস।

রক্তাগুনে মূর্ছিত চাঁদ, নিভে গেছে তার রুপালি নৃত্য
রক্তভোরের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সরে গেলে আকাশ, রক্ত ঝরাতে ঝরাতে নামল রাত্রি।

বৃক্ষগুলো হয়ে উঠল একএকটা রক্ত-লাল খুঁটি
সমস্ত কুসুম-আঁখি একএকটা রক্ত-নদী।
তখন- নির্বিণ্ণ দৃষ্টিসব একএকটা তীরের ফলা- বিঁধছিল এইসব রক্তছবি।
আর রক্তসাগর কাঁদছিল শহীদের তরে; কাঁদতে কাঁদতে বয়ে নিচ্ছিল তাদের ইচ্ছেগুলো-
যন্ত্রণায়, উন্মত্ত ক্রোধে আর দগ্ধ মমতায়।

এই রক্ত ভেসে যাক। কে বেঁধে রাখবে তার এই ভেসে যাওয়া? মৃত্যুর আলখাল্লায় ঘৃণাই পড়ে রবে শুধু; তাহলে! মিত্র আমার, এখনি এইসব বন্ধ কর। ফিরিয়ে দাও আমায় ঝরে যাওয়া সব অশ্রু। আর তুমুল বন্যাতে মুছে দাও এই লোহিত ধূলিচূর্ণ চোখ।
Bangladesh -2
English Translation: Aga Shahed Ali

তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট
কৃতজ্ঞতাঃ AZFAR HUSSAIN

Comments

comments

হাসান শাহরিয়ার

হাসান শাহরিয়ার

জন্ম ৮ নভেম্বর ১৯৮৫, একটি কবিতার বই রেরিয়েছে ‘বালির ঘর’ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ jhs.phy@gmail.com

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: , , , ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি