সাম্প্রতিক

নিছক শীতের গান গিমিক বিহীন । জাহেদ আহমদ

আবার শীতের গান গলা খুলে গাই —
গুচ্ছ গুচ্ছ গাছে দেখো শুদ্ধ জলপাই
ঝুলিতেছে ওলিভ গরিমা নিয়া তার;
স্বতঃস্ফূর্ত অন্ধকারে বসে থাকবার
এ-ই তো সময়, সখে, এসো বসে থাকি —
উষ্ণদেশে আসা যেন পরিযায়ী পাখি।

২.
তারপর তুমি-আমি মিলে দুইজন
তাঁবুর বাইরে এসে বসব যখন —
আগুন-উস্কে-দেয়া বাতাসের হাত
তোমাকে-আমাকে দেবে সান্ত্বনাপ্রপাত;
শত দুঃখশোকহর সন্ধিস্নিগ্ধ ক্ষণে
আমরা দু-জনে শুধু : শীতগন্ধা বনে —
৩.
শহরে শীতের দেরি, সইছে না তর
উত্তুরে হাওয়া বয়ে এনেছে খবর :
গারো পাহাড়েতে ঝুম শীত পড়িয়াছে;
ওইখানে যেয়ে দেখি, যদি পাই কাছে
খুয়ায়েছি যাহা-কিছু গ্রীষ্ম-অবকাশে —
খুঁজিয়া বেড়াব তারে, বনফুলে, ঘাসে;

৪.
শষ্পশীর্ষে দেখি রোজ তোমার নাসিকা
শীতপ্রভাতের রোদে ইন্দ্রজালিকা
আমারে নির্দেশ করে তোমার হদিশ;
বাতাস বহিয়া আনে শরীরের শিস —
তোমার গন্ধস্মৃতি, গোপন গানগুলো
অরণ্য শোনায় রোজ; অঘ্রানের ধুলো …

৫.
সহজ শীতের মতো আমাদের মন —
খড়ের গাদার পাশে বসেছি যখন;
মিঠে রোদ পিঠে তুমি দেখছিলে কাছে
গাভীর ওলানে রাঙা ওম মেখে আছে;
অদূরে চড়ুইগুলো আকাশিয়া-শাখে
উড়ে যেয়ে ফিরে এসে জোড়ে বসে থাকে।

৬.
সহজ শীতের মতো সহজ আদর
আমরা দু-জনে চাই; কুয়াশাকাতর
তবু থেকে যাই যেন সহস্র রজনী
রহিয়া রহিয়া জ্বলে হৃদয়ে অরণি;
এইভাবে শীত যায়, গ্রীষ্মদিন আসে
আমাদের প্রেম ভাসে বিলে, রাজহাঁসে।

৭.
অনেক বকের ন্যায় এখানে আকাশ
শুভ্রবোধে ভরে দেয় আমাদের শ্বাস;
আমরা দেখছি চেয়ে দিগন্তের ধূলি
উড়তেছে সাথে লয়ে ঝরাপাতাগুলি;
ঝরিছে বেদনারাশি টুপটাপ স্বরে
রচিয়া চলেছি দোঁহা — শীতের অক্ষরে।

৮.
অবলা কথার কুঁড়ি গত শীত থেকে
চলতেছি দু-জনেই বুকে চেপে রেখে
এবার কুসুম হয়ে ফুটুক না-হয় —
কেবলি কুসুম হবে? ফল কেন নয়?
এই শীতে এসো বলি সেই কথাগুলো
বলি বলি করে কত বর্ষা গত হলো! …

৯.
অতঃপর, শীতকাল, ঝরাপাতাঋতু —
যেন সে কিশোরী এক, রজঃরক্তভীতু!
মুখে তার মধুবিন্দু — যেন মনীষার
লেগে আছে ভোরবেলা দিগবালিকার;
সারাদিন দেহে তার সবুজাভা হাসি
রবিরশ্মি-রমণীয় শস্য রাশি-রাশি।

১০.
দুনিয়ায় রয়েছেন সিদ্ধাচার্য কত
এ-মুহূর্তে তারাও কি আমাদের মতো
শীতের আমেজ নিয়ে সুখে ও সহজে
বারান্দার ইজিরোদে রয়েছেন মজে?
নাকি তারা স্বভাবত কঠিন ও মেকি! —
সে-ভেবে কী লাভ, এসো প্রজাপতি দেখি;

১১.
নয়ন নিবদ্ধ রেখে পাখিটির পানে
শুনি অনসূয় গান বাজে কোনখানে —
নদীর ওপারে ওই নেয়েদের ঘর
ওইখান থেকে বুঝি আসে এই স্বর?
যেতে যদি হয় কোনো অন্য অধিবাসে
যেন এই শীত সেথা ফিরে ফিরে আসে।

১২.
চিলতে রোদের ফিতা আমার দু-পায়ে
জানালা গলিয়ে এসে বসে টায়ে-টায়ে;
ঘুলঘুলি দিয়ে ঢোকা ডিমাকার ফুল
সোনার হাঁসের নয়, রোদের মুকুল!
এমন মুহূর্তে দেখি আতাফলগাছে
এই শীতে বেশুমার রোদ ফলিয়াছে!

১৩.
খেজুরগাছের থেকে নামাতেছে রস
ধাপ বেয়ে উঠে গাছি — এহেন বিবশ
দৃশ্যে আমি দিবালোকে বুঁদ হয়ে থাকি
সারাটা শীতের ঋতু এখানে একাকী;
যদিচ এথায় নেই খেজুরের বীথি
রয়েছে নদীর তীরে নায়ের জ্যামিতি।

১৪.
বিছিয়ে রেখেছে কারা ক্ষেত-কাটা ধান
খোলতাই হয়েছে তাতে আজি অঘ্রান; —
সারানিশি শিশিরের দুধ পান করে
সকালে রোদের পুষ্টি শস্যে পড়ে ঝরে।
বিকেলের দিকে তারা নিয়া যাবে তুলে
এই ধান, নাড়াপাতা — নগরভূগোলে —

১৫.
শিমের মাচাঙ ভরে রয়েছে সকাল
পাখসাটে উড়ে যায় শাদা বকপাল
শহরতলির জোলো ক্ষেতজমি জুড়ে
শাদাডানা পাখিঝাঁক দৃশ্য রাখে মুড়ে
শিমপত্রে ভাসমান শিশিরের সর
ত্বকে মেখে স্বাস্থ্য পায় আমার শহর।

১৬.
ওই তো অশ্বত্থগাছ, বাঁ-দিকে বকুল
পায়ের পাতার কাছে চড়ু’য়ের চুল —
কোথা থেকে এল উড়ে! — উপরে তাকাই :
দয়াল চড়ুই তুমি কই গেলা ভাই!
এখানে আকাশ নীল — রৌদ্রপ্রসাধিত
এ-ধারা বিস্ময়ভ্রম শীতেই প্রার্থিত।

১৭.
কাঁটা দিয়ে ওঠে দেহ শীতের শিহরে
অরণ্যের পোস্টম্যান ঘোরাফেরা করে —
এখানে বাঁশের বনে, বাতাসবাগানে
গতানুশোচনাছাড়া বার্তা বয়ে আনে;
কেমন কোমল এই অপরাহ্নহ্রদ —
পাখিরা ঝরায়ে যায় কুয়াশাপারদ।

১৮.
বিকেলের বিলে কিছু কেঁচো ও শামুক;
অল্পজল অন্ধকারে অতীব উৎচোখ
নীরবে ঘাঁটছে কাদা ক-টি শীতহাঁস :
ঠোঁটের নাগালে এলে শামুকের শাঁস
অথবা কেঁচোর স্বাদু শরীরের ছাল
আপাত সুরাহা হয় আহার্য-আকাল।

১৯.
হলদি ঠোঁটের ওই হাঁসজোড়া দেখে
রাখতে বসেছি এথা কাদাকেলি এঁকে —
দেহ ঝাঁকি দিয়া তার ফেলে-দেয়া কাদা! —
সুন্দর সর্বত্র তা-ই, রক্ষা করে শাদা
নিজেকে বিপন্ন করে যে-কোনো মূল্যেই;
কর্দমে কদাপি যার নিমজ্জন নেই …

২০.
নগরের মোড়ে মোড়ে বাতিগাছগুলো
টিমটিমে কুপি যেন; শিমুলের তুলো
যেমন বরন হয় দীপ্র চোতমাসে
কুয়াশাবাহিতা আলো তদরূপ ভাসে;
এখানে যখন রাতে সকলে ঘুমায়
বাতিগাছ জেগে থেকে কুয়াশা ছড়ায়।

২১.
ঘন শীত জমে আছে চালতাপাতায়
সকালবেলার রোদ পুকুরঘাটায়
নেমেই দেখতে পায় পাতার কাঁপন :
চালতার গাছ ভারী শীতপরায়ণ!
অতঃপর আলগোছে জল থেকে উঠে
রোদ যেয়ে বসে গাছে — পাতার মুকুটে।

২২.
এবার শীতের দেশে খুব কোলাহল
সারাবেলা দইওলা ‘অমল … অমল …’
হেঁকে অপসৃত হয় হাঁটাপথ ধরে
মুখ ডোবে মুখ ভাসে অথির অম্বরে;
এবার শীতের বন স্মৃতিভারানত
ছেলেবেলা ডেকে পাখি ভীষণ আহত।

২৩.
কুকুরের ধ্বনি আসে শীতভারাতুর;
থেকে থেকে কেঁপে-ওঠা ঝাকড়া পাকুড় —
পুকুরের গায়ে ফেলে বিষটিশিশির
সেই পতনের গানে টুটিছে তিমির;
এইবার পায়ে পায়ে নামিতেছে ভোর
রজনী রাঙায়ে আসে সকালের সুর।

২৪.
একাকী শীতের ভোর একলা দুপুর
জানালার জামগাছ সঙ্গী বড়জোর;
পরিস্থিতির প্রকার এমন যখন
কাটা ঘুড়িটির শোকে বালকের মন
স্তব্ধবাক চেয়ে রয় আকাশের পানে —
কুয়াশাঝাপসা স্মৃতি রাখি এইখানে …

২৫.
রোদের মাদুরে বসে কমলালেবুটি
শীতের সুঘ্রাণে ভরে দেয় এই ছুটি —
সকালের অবকাশ, দ্বিপ্রহরকাল
দোরে-ঘরে দিনভর বিষাদ বহাল;
বেড়ালের লোম থেকে উঠে-আসা ওম
সারিয়ে তুলতে পারে হিমের জখম!

২৬.
কারো কাছে যেয়ে তবু বলিনি বিষাদ
জেগে থেকে কতরাত ঘুমাবার সাধ
বুকে পুষে চুপচাপ আছি চোখ বুঁজে —
বিগত বন্ধুর মুখ ফিরি খুঁজে খুঁজে;
শীতে ভালো জমে ওঠে স্মৃতি-রোমন্থন
অলস বাতাসে ভাসে পুরাণিক মন।

২৭.
পাহাড়ে উঠতে যেয়ে দেখি কত কাছে
আগায়ে এসেছে দূর, দু-ধারের গাছে
ধরেছে পাখির প্রিয় প্রসূন ও ফল
ঋষিধ্যানে থম ধরে রয়েছে জঙ্গল;
শীতের অরণ্যে সন্ধ্যা নেমে আসে ত্বরা —
বিঘৎ দূরত্বে বসে নক্ষত্রপসরা।

২৮.
সমস্ত দিবস জুড়ে শীতের প্রবাহ —
টের পাই দেহে তার অপরূপ দাহ!
বহিছে ভুবনে-বনে রতিঋতুসুর
লেপমুড়ি কেটে যায় নিরাই দুপুর।
তুমি কোথা তুমি কোথা তুমি কোথা, হায়!
এহেন অঘোর ঘন শীতে, কুয়াশায়!

২৯.
কুয়াশাকুহকে ঘেরা শীতরাত্রিগুলো
গাছেরা গা-ঝাড়া দিলে নক্ষত্রের ধুলো
ঝুরঝুর ঝরে পড়ে ঢেউটিনপিঠে
জোছনাশিশিরে ভেজে উঠোন ও ভিটে;
প্রভাতে উঠিয়া — এ কী! — মরি হায় হায়
পৃথিবী প্লাবিয়া যায় মধুকুয়াশায়!

৩০.
শীত যেন অন্তরালে লুকনো অসুখ
কবেকার মৃত সেই আত্মীয়ার মুখ! —
সারাদিন সঙ্গ দেয়, পাশাপাশি হাঁটে
রাত্তিরে বেড়ায় ভেসে নক্ষত্রতল্লাটে।
এহেন আবহে রচি এক দুই তিন …
নিছক শীতের গান — গিমিক বিহীন।

 

Comments

comments

জাহেদ আহমদ

জাহেদ আহমদ

অনিয়মিতভাবে লেখালেখিলিপ্ত, মূলত নোটক, মুখ্যত প্রকাশবাহন ফেসবুক

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: , , , , ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি