সাম্প্রতিক

গাদা বন্দুক ও গোল্ডফিশ । রাসেল রায়হান

Raa 1সওদাগর

কাকে চাও, সমুদ্র নাকি ব্যস্ত বন্দর—

মশলার গন্ধ মেখে হেঁটে যাচ্ছ, হেঁটে। একবার
জিজ্ঞেস করো নি, গতবারের জিনিসগুলো
কেমন ছিলো, রঙ পছন্দ হয়েছে কিনা

এবার সেই আর্তনাদসমূহের কাছে আসা যাক —প্রকৃতপক্ষে
যারা ছিল হারানো জাহাজের বিউগল। সমুদ্রে
যে ঝড় ছিলো কিংবা বন্দরে অপেক্ষারত একাকী বৃক্ষের শিকড়ে
গড়িয়ে আসা কীটনাশকের দানা, যাকে বলা যায়
শংসিত শৈশব—মার্বেল, মাটির চামড়ায় ছুঁড়ে দেয়া লাটিম…
যাকে চেনা যেতো সোনাকচ্ছপ এবং ঝিঁঝিঁর
কষ লাগা ডানার সৌরভে, সাইকেলের ঘন্টি আর বারান্দায়
দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিবেশিনীর বড় কন্যার উপহাসের ভঙ্গিতে।
সেসব আর্তনাদ ছিলো না-ডোবা-জাহাজে সংরক্ষিত পোড়ামাটির
ধর্মবই এবং ইমামের সংস্কারসুলভ গ্রন্থপাঠে—
এই অবেলায় এসে ফেরত নাও পরিশোধযোগ্য আর্তনাদ,
প্রতিবেশিনী এবং তার বড় কন্যার উপহাস—
বেঁচে থাকো, বর্তে থাকো, উদাসীন হতে শেখো ওসব ভঙ্গিতে

—বোকা মানুষ, ফিরে যাচ্ছ স্রেফ শুকতারার নিচে

সিজারের ঘড়ি

অন্ধগলি পেরিয়ে যাচ্ছে অশ্বাবলী, ঘাড় দোলাচ্ছে, কেশর নড়ছে, নালের মরচে গড়িয়ে পড়ছে, ভাঙা তরবারি লুটিয়ে পড়ছে নগ্ন ধুলাতে, জ্যোৎস্নালু রাতে মদ মদিরাতে…আমাদের সাথে হেঁটেই চলছো হেঁটেই চলছো

যাদের দিচ্ছো মদ ও মদিরা, তাদের ক্লান্ত শিরা-উপশিরা খনিতে নেমেছে দংশন নিয়ে;—
খাঁচার ভিতরে শতেক মুনিয়া। মাছির গন্ধে তারিয়ে তারিয়ে দেয়াল বাইছে সাদা টিকটিকি। দুপায়ে মাড়িয়ে জোড়া-নির্মোক, আতঙ্ক নিয়ে হেঁটেই চলছ। অন্ধকারেও ভূতের মতন রাজার বর্ম ছায়াতে নাচছে। যুদ্ধ চাচ্ছে যুদ্ধ চাচ্ছে…রাত ঘনাচ্ছে

আমলকিবনে মরকতগাঁথা শুনিয়ে যাচ্ছে অদৃশ্য কেউ; কাঠের জাহাজ নোঙর করছে; নামছে সেখানে কালো শ্রমিকেরা।

—সিজারের ঘড়ি বেজেই যাচ্ছে…রাত পোহাচ্ছে, রাত পোহাচ্ছে…

নাচ

‘এ তবে ময়ূর! আমি অন্ধভাবে ভেবেছি অপ্সরা!’

—এরা যদি উড়ে আসে অভ্রময় সুস্বাদু পালকে
অথবা ঝড়ের সাথে যদি আসে পঙ্খিরাজ ঘোড়া
সবাই দেখেছে যাকে—জন্মান্ধ শাদ্দাদের চোখে।

—অস্থিচেরা রাতে
পঙ্খিরাজ ঘোড়া, নাকি ময়ূরেরা স্নান করে
আমাদের ঘামের প্রপাতে?

স্টেশন

তুই
আমার
দূরাগত
ট্রেন—

এই
তথ্যটুকু পূর্বজ্ঞাত, তাই
দেবতার
কাছ থেকে
ছিনিয়ে আনি প্রবাদ

—স্টেশনে ট্রেনদের থামতেই হয়

অশ্বমেধ

একটি রজঃস্বলা তীব্র হাত আজও
কেড়ে নিতে থাকে শ্বাস আর আমার দৃশ্যে-ভারবাহী-চোখে
নেমে আসতে থাকে নির্জনতার বেখেয়ালি মাধুর্যমর্মর।
তখন একটি বাসগৃহের প্রয়োজন হয়ে পড়ে
এবং আমি পেয়েও যাই একটি বাসগৃহের অনুমতি—

নির্জলা উপহাসের ভঙ্গিতে দালির কণ্ঠস্বর ভেদ করে নেমে আসে ঝাঁক ঝাঁক সোমত্থ অশ্ব—দেয়ালে দেয়ালে সাজিয়ে রাখা সেই অশ্বের হ্রেষা আর হৃদস্পন্দন মর্মরিত হয় গোপনীয়তায় আর অজস্র কবুতরের দানা ছড়িয়ে দিই মেঝেতে কিছু অপ্রত্যাশিত ছায়ার প্রয়োজনে
খোলা ছাদ বেয়ে তখন চোরের মত নেমে আসে রীতিমত অশ্লীল চাঁদ, যেরকম খাপ ছেড়ে বিজয়ী যোদ্ধার হাতে উঠে আসে নগ্ন তরবারি

—এবং নারী ছাড়া সমস্ত নগ্নতা আমার কাছে অশ্লীল মনে হতে থাকে…

গাদা বন্দুক ও গোল্ডফিশ

এসো। আবার পাল্লা দাও মারমেইড। দেখি তোমার লেজে কতখানি শক্তি ও সকাতরতা। আমরা এ-ও দেখতে চাই, তোমার স্তনে কতখানি দুধ জমলে তুমি হারতে রাজি হবে! তোমার না আঁচড়ানো লবণাক্ত চুলে সদলবলে খুঁজে যাব আমার নিহত পূর্বপুরুষদের এবং জানি, তারা ফিরেও আসবেন লুপ্ত সাম্রাজ্যসমেত।

প্রকৃতপক্ষে বলতে চাই, আমিই সম্রাট। এই লঘু কবুতরের দিনে, তামা-মাখা গোধুলিতে শিয়রে যাদের আশা করি তারাও শিকার থেকে ফিরেছে। গাদা বন্দুক পড়ে আছে স্মৃতির সান্নিধ্য নিয়ে।

সেসব নগরী নিয়ে ফিরে এসো মলিন মারমেইড

গির্জা

ঝাপসা কাচে লেপ্টে আছে প্রাচীন মোম, তাই ওপাশের তোমায় স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি না, মাতা মেরি। মার্বেলের মেঝেতে নির্বিঘ্ন শুয়ে থাকা যেই শিশুটির অনন্ত কান্না শুনতে পাচ্ছি, যাকে আমি আমার নামে চিনতাম—তাকে পর্যন্ত চিনতে কষ্ট হচ্ছে। শুধু শুনতে পাচ্ছি চিরহরিৎ কোনো বৃক্ষের সান্ধ্যসঙ্গীত, তার স্বপ্নের মর্মার্থ ব্যাখ্যা করা এক বৃদ্ধের গোঙানি, আর্তস্বর, আর বাতাবিলেবুর বনে নিপাট ভদ্রলোক খরগোশটির নরম রোমের মতো সাদা তারার আহ্বান—ঘন্টাধ্বনির কর্কশ শব্দের সাথে সাথে যে গূঢ় ডাক তীব্র থেকে তীব্রতর হয়।

সেই মুহূর্তে পৃথিবী থেকে উড়ে যেতে থাকে প্রতিবিম্বময় অজস্র বুদবুদ ও বোরাকের ডানা। অনন্তের গির্জায় শুয়ে শুয়ে আমি দেখতে থাকি একজন নিঃসন্তান বেবিসিটারের করুণ মুখ

তানিয়া

অবনতির এই চাঁদ মনে করিয়ে দিচ্ছে সেই নিষিক্ত বীজের কথা যার কাণ্ড অধোমুখী—আর সেই নীরিহ মানুষদের যাদের খুলি অজ্ঞাতসারে ব্যবহৃত হচ্ছে এই যাদুবিদ্যায়। প্রগাঢ় রাতে নবনির্মিত প্রার্থনালয়ে যেসব প্রাচীন প্রার্থনাকারী জড়ো হয়, আজও তাদের মুখ মনে করে জ্বলে যায় অই চাঁদ
আর তার বাঁকা ভঙ্গি কারো কারো ভুরুর সঙ্কেতে নেচে ওঠে।

তানিয়া, চতুর্থীর এই চাঁদে জমিয়ে রেখেছি যে দুষ্প্রাপ্য মদ—ক’টুকরো বরফ দিলে তা তোমার পানযোগ্য হবে?

পামিং

এই যে পামিং—গোপনে তালুতে সিগারেট, ঝকঝকে কয়েন আর গোলাপ ধরে রাখার বিদ্যা। পনেরোশ টাকায় শিখে নেবার পরে রাতদিন চর্চা ও পরিচর্যা করে যাচ্ছি…
একদিন সাক্ষাৎ তোমায় লুকিয়ে ফেলবো।

হাতের তালুতে বসে কলহাস্যে মেরি-গো-রাউন্ড চড়বে, এই জামার দীর্ঘ আস্তিন নড়ে উঠবে পতাকার মতো, হাওয়ায়, এবং তুমি উপুড় হয়ে শুয়ে শুয়ে বই পড়বে, চিৎ হয়ে ঘুমুবে—

তখন এসব নোংরা মুখোশ ছুড়ে দিও অনুসন্ধিৎসুদের উদ্দেশে

সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে

আমাদের ইচ্ছে ছিল, কোনো জল্লাদের খড়্গের নিচে মুখোমুখি হয়ে একে অপরের হত্যাদৃশ্য দেখবো।…এখনো হয়ে ওঠে নি! এখনো আমরা সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের গেটের কাছে উজিরনাজির মারি, আর সিগারেটের ধোঁয়া ওড়াই। লাল চোখ মুছে নিতে নিতে চেঁচিয়ে কোরাস গাই, অন্ধ মানুষের পৃথিবী অন্ধকারের দিকেই আগায়…

জানি ঐ বিশেষ মুহূর্তটিতে কোথাও একটি দল নামাজের মতো কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নামছে রাস্তায়। কেউ একজন সামরিক বুট পরে নিস্পৃহ ভঙ্গিতে বন্দুক তাক করে আছে পছন্দসই বিষণ্ন ব্যক্তিটিকে বেছে নিয়ে। আর ঐ মুহূর্তটিতেই খুব দূর থেকে কেউ চেঁচিয়ে যাচ্ছে, স্টপ স্টপ…

আমরা তখনও সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে উজিরনাজির মারি…চেঁচিয়ে কোরাস গাই, অন্ধ মানুষের পৃথিবী অন্ধকারের দিকেই আগায়…

 .                                                                       # # #

Comments

comments

রাসেল রায়হান

রাসেল রায়হান

কবি, থাকেন ঢাকায়। একটা বেসরকারি কোম্পানিতে কর্মরত। জন্ম ৭ মার্চ, ১৯৮৮। ইমেইল rasahmed09@gmail.com

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

Tags: , , , , , , , , , ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি