সাম্প্রতিক

আম্মার খোয়াবনামা ও বাসার নীচের পাগলী । রওশন আরা মুক্তা

আম্মার খোয়াবনামা

সকালবেলা আম্মা আমাদের দু’বোনকে সাথে নিয়ে দাঁত মাজতেন। নিমের মাজন দিয়ে দাঁত মাজলে দাঁত নাকি মুক্তার মতো ঝকঝকে হয়। তাই আম্মা পেস্ট দিয়ে না মেজে প্রায়ই নিমের মাজন দিয়ে দাঁত মাজতেন।যেহেতু আম্মা পানও খেতেন তাই দাঁত সাদা করার এই চেষ্টা। দাঁত মাজার সময় আম্মা কেমন জানি একদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হাত চালানো বন্ধ করে দিয়ে স্থির হয়ে যেতেন। একদিকে কেমন করে যেন তাকিয়ে থাকত আম্মা। আমি সেই স্থির দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থাকতাম। আম্মার চোখের কালো চকচকে মণির ভিতরে গিয়ে ঢুকে পড়তাম আমি। মাঝে মাঝে আম্মাও আমার দিকে এভাবে তাকাতো। একবার খোসাসহ বাদাম খাওয়ার অপরাধে আম্মা আমাকে একটা চড় মেরেছিল। আমি নিজেও ভাবি আচ্ছা, খোসাসহ বাদাম আমি কেন খেতাম? খোসা ছাড়ানোর আলসেমিতে? নাকি খোসার খসখসে স্বাদ আমার ভালো লাগতো?

 

আমার আম্মার স্বপ্নগুলো হতো অদ্ভুত প্রকৃতির। যেসব গল্প শুনে শুনে আমরা দু’বোন বড় হয়েছি তার বেশীর ভাগই আম্মার স্বপ্ন দৃশ্যের বর্ননা। আম্মা স্বপ্নে দেখত আকাশ, আর সেই আকাশে সূর্য থাকত তিন চারটা। আম্মা একটা গল্প বলতো, মধ্য রাতে ঘরের বাইরে গিয়ে লেঞ্জা তারা দেখে ভয় পাওয়ার গল্প।

আম্মা তখন অনেক ছোট, ক্লাস ফোরে পড়ে মনে হয় তখন। রাতেরবেলা সেই লেজওয়ালা তারা দেখে আম্মার ভয় লেগেছিল ভীষণ। আম্মা আমাদের বলতো আসলে সেটা ছিল ধূমকেতু। কত অসংখ্যবার এ গল্প যে আমরা শুনেছি! আম্মার আরেকটা ভয়ের গল্প ছিল তার দাদাবাড়ির। বাইরে থেকে ঘরে তাকিয়ে বিছানায় কার পা দেখে যেন ভয়ে পেয়েছিল আম্মা। অথচ বিছানায় কেউ নাকি ছিল না।

আম্মার স্বপ্নে আম্মা ক্লাস ফোরে পড়া বালিকা হয়ে থাকত। উঠানে মাঠে ঘাটে খেলছে এমন একটা মেয়ে হয়ে স্বপ্ন দেখত আম্মা। আর সব মরে যাওয়া আত্মীয়-স্বজনদের স্বপ্নে দেখে আম্মা উদাস হয়ে যেত।

আমার আম্মার একটা খোয়াবনামা ছিল। সকালে উঠেই আম্মা সেই খোয়াবনামা খুলে বসত। এভাবে পুরো খোয়াবনামাটা মুখস্ত হয়ে গিয়েছিল তার। আমরা কোনো স্বপ্ন দেখলেও আম্মা ঝরঝর করে বলে দিত কোন স্বপ্নের কী মানে!

আমি গতরাতে স্বপ্ন দেখলাম আমার বিয়ে হয়েছে। এবং বিয়ের পর আমার জামাইটা একটা বাঘ হয়ে গেছে। এবং বাঘের সাথে সংসার করে আমি খুব গর্বিত বোধ করছি। আচ্ছা আম্মা, বাঘকে বিয়ে করা দেখলে কী হয়? আম্মার খোয়াবনামায় এইসব স্বপ্নের মানে কেন যে থাকে না!

Mukta ১বাসার নীচের পাগলী

প্রথম যেদিন শংকরের পিছনে বাসায় উঠলাম। সারা রাত একজনের গালাগালির কারণে ঘুমাতে পারিনি। মনে হলো পাগলী। কিন্তু সেই পাগলীই এক সময় হয়ে উঠলো আমার দার্শনিক। আমি যেদিন যে বিষয় নিয়ে ভাবতাম, সেদিন সে সে বিষয় নিয়ে কথা বলতো। এগুলো ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিতাম তখন। এমন হলো যে আমাকে যারা চেনে তারা এই পাগলীকেও চিনে ফেলল। আমি যাদের চিনি না তারাও আমার কাছে পাগলীর খবর নেয়া শুরু করল। আবার অনেকে ভাবতেন আমি এই চরিত্রটি সৃষ্টি করেছি, আসলে তেমন কেউ নাই!অথচ তিনি এখনো আছেন এবং রোজ দুই প্যাকেট গোল্ডলিফ সিগারেট সাবাড় করে চলেছেন।
Wednesday, July 31, 2013 at 1:13am
.
ভরা পূর্ণিমায়, প্রচণ্ড শীতে অথবা এমন বৃষ্টির দিনে আমার সামনের বাসার মহিলার অনবরত বকবক কানে আসতে থাকে। সারা রাত এক নাগাড়ে কথা বলে যান তিনি। হাঁটেন আর হাঁটেন মাঝে মাঝে সিগারেট খান। তার শব্দগুলো খুব ভারী। যেমনঃ মধ্যবিত্ত নারী, সন্তানের ভালবাসা, চরিত্র, প্রতারণা, সম্মান ইত্যাদি। মাঝে মাঝে অবশ্য মুখ ছেড়ে দেন, সেইগুলা আর না লিখলাম। সারা রাত এভাবেই মনে হয় যাবে। আহারে…
Monday, September 23, 2013 at 1:29am
.
নতুন বয়ান দিচ্ছেন আমার বাসার সামনের মহিলা। ”তুমি কি পাগল? তুমি কি বুড়ো হয়ে গেছ? বাংলা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে তুমি কি কিছুই বলবে না? ইসলামের তরিকা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে তবু তুমি চুপ? এই তুমি কি পাগল হয়ে গেছ? তুমি কি বুড়ো হয়ে গেছ? ইসলামের তরিকা কি শিখো কীভাবে জমিদারবাড়ি দখল করতে হয়… তুমি কি বুড়ো?… পুত্র থাকবে না, কন্যা থাকবে না, মা বাবা কিছুই রাখতে পারবে না, স্বামী স্ত্রী কিছুই পাবে না… বাংলা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ইসলামের তরিকা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে…” এর মাঝেই একটা সিগারেট ধরালেন মহিলা, ”থাক বলো না, চুপ করে থাকো। বাংলা নষ্ট হলে তোমার কি…? ইসলামের তরিকা নষ্ট হলে তোমার কি। তুমি তো পাগল তুমি তো বুড়ো…” উপরে তাকিয়ে আমাকে আর জারাকে দেখে ফেললেন, ”এই বাচ্চা যা ঘুমা…” আমি আর জারা কি আর ছাড়ার পাত্র! লাইট নিভিয়ে জানালায় গেলাম। মহিলা বলল ”এই বাচ্চা আমি অন্ধকারেও দেখি! যা! ঘুমা!” ভয়ে সটকে পড়লাম! ঢিল মারে যদি!
Friday, October 25, 2013 at 12:21am
.
আমার বাসার ঠিক উল্টা দিকে টিনশেড কিছু বাসা আছে। সেখানে একজন বিস্ময়কর মহিলার বাস। মাঝেমাঝে সারারাত তিনি ভাষণ দেন। আজকে তিনি কী বলছেন দ্যাখেনঃ ”কোথায় তোমার ডাক্তারি? কোথায় তোমার ইঞ্জিনিয়ারিং? কোথায় তোমার ডক্টরেট? তোমার রাজতন্ত্র, রাষ্ট্রবিদ্যা কোথায়? তুমি পারছো না? রাজতন্ত্র পারছো না? তোমার রাষ্ট্রবিদ্যা গঙ্গাজলে ডুবিয়ে দাও!” একই কথা বারবার বারবার রিপিটেশন চলছে, চলবে সারারাত! গতকালকে এই বিস্ময়মহিলা বলছিল, ”আমি পাগল না, সত্যি বলছি আমি পাগল না।” আমারো মনে হয় এই মহিলা পাগল না।
Friday, January 10, 2014 at 12:50am

আমার বাসার নিচে এক পাগল মহিলা থাকে। কেমন জানি হিংসা লাগে এই মহিলার প্রতি।
Wednesday, January 29, 2014 at 12:41am

“মনে রাখিস হিটলারও কিন্তু আর্টিশিয়ান ছিল। আমি আর্টিশিয়ান আমাকে বাধ্য করিস না হিটলার হতে।” -বাসার নিচের ‘পাগল’ মহিলা।
Sunday, May 4, 2014 at 2:33am

আজকে রাতের লেকচার- ”এই তোদের শেল্টার, এই তোদের বিজ্ঞান! বিজ্ঞান বলবো না। বিজ্ঞান বলবো না একটাই কারন। বিজ্ঞান শয়তান। বিজ্ঞান বলবো না। জাহান্নামে যাবে সব!” বাসার নীচের পাগল মহিলা।
Sunday, July 6, 2014 at 12:59am
.
অনেকদিন হলো, আমার বাসার নীচের পাগল মহিলা একদম চুপ হয়ে আছে। কিছুদিন আগে খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি, একটি ছয়তলা বাড়ির মালিক তিনি। অথচ থাকে আমার বাসার সামনে একটা টিনের চালা ঘরে।
Wednesday, July 23, 2014 at 12:45am
.
অবশেষে তিনি মুখ খুলেছেন…”আমি তগো কেউ না! আমি কেউর কারো না!” আই লাভ মাই নেইবার। ***তিনি আমার বাসার নীচের ‘পাগল মহিলা”

Comments

comments

রওশন আরা মুক্তা

রওশন আরা মুক্তা

মূলত কবি। চিন্তা করতে ভালোবাসেন, চিন্তার পথে কোথাও থেমে যেতে চান না। তার প্রথম কবিতার বই ‘অপ্রাপ্তবয়স্কা’ প্রকাশিত হয়েছিল ২০১৩ এর বইমেলায়। পরের বইয়ের প্রস্তুতি চলছে। জন্ম ১৯৮৮ এপ্রিলের ১২ তারিখ। তিনি মেষ রাশির জাতিকা। ইমেল : raramukta@gmail.com

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি