সাম্প্রতিক

কাশি । আরিফুর রহমান

Arif bai 1“খুক খুক খুক…” কাশির শব্দে বিরক্তিতে ভুরু কুচকালো ডাঃ রায়হান। কাশির উৎস তার নতুন এসিস্টান্ট লিপি। দাঁতের ডাক্তার রায়হানের বয়স ৪০ এর কোটায়, প্রায় ৬ ফুট উচ্চতা আর একহারা গড়ন এর কারনে যথেষ্ট আকর্ষণীয় লাগে তাকে এখনো। অবশ্য দুপাশের কিছু চুলে পাক ধরেছে ,ডাক্তারী পড়ার সময় থেকেই শুরু হয়েছিল চুলে পাক ধরা – বোধহয় পড়াশুনার অতিরিক্ত চাপ থেকেই। রায়হান অবশ্য চুলগুলো ডাই করেনা কারন তার মনে হয় এই কাঁচাপাকা চুল আর পুরু চশমা তার ব্যাক্তিতে একটা পরিপূর্ণতা এনে দিয়েছে। বয়স ৪০ হলেও একজন অভিজ্ঞ প্রফেসরের মতই লাগে তাকে দেখতে।
.
ডাঃ রায়হানের ক্লিনিকটি যথেষ্টই আধুনিক, অনেক প্রশস্থ আর সুন্দরভাবে সাজানো। তার আসলে সব কিছুতেই একটু খুত খুতে ভাব আছে। ক্লিনিক যেন সব সময় ঝকঝকে পরিপাটী থাকে সেটা নিশ্চিত করার পাশাপাশি যন্তপাতি জীবাণুমুক্ত করার ব্যাপারেও সে নিয়মিত নজরদারী করে। এছাড়াও তার আছে কিছু শো করার মনোভাব, যেমন রোগীদের সামনে ডিস্পোজেবল গ্লাস, সাকশান টিপস, গ্লভস বের করে ব্যাবহার করা যেন রোগীদের মনে সন্দেহের অবকাশও না থাকে হাইজিনের ব্যাপারে। নিজের পোশাকের ব্যাপারেও যথেষ্ট সচেতন রায়হান, একদম ফর্মাল শাট-প্যান্ট এর উপর ধবধবে সাদা এপ্রোনে তাকে সত্যিই একজন আদর্শ ডাক্তার বলেই মনে হয়। তার এসিস্টেন্টদের জন্যও রয়েছে আলাদা পোশাক, যদিও এরা ডিপ্লোমা করা এসিস্টেন্ট না , ভালো বেতন দিয়েও ডিপ্লোমাধারী এসিস্টেন্ট পাওয়া কঠিন, কারন তারা নিজেদের বড় ডাক্তার মনে করে আর নিজেরাই ক্লিনিক খুলে বসে শহরতলী- গ্রামে। তাই বিকল্প হিসেবে রায়হান নার্সিং বা ম্যাটসে পড়াশুনা করে এমন দরিদ্র ছেলে-মেয়েদের এসিস্টেন্ট হিসেবে চাকুরী দেন উনার ক্লিনিকে। সবকিছু মিলিয়ে রায়হান এর পসার বেশ ভালই, রোগীর তালিকায় আছে শহরের অনেক কর্পোরেট অফিসার, হোমরাচোমরা ব্যাবসায়ীসহ অনেকে। তবে রায়হান একটা ব্যাপার খেয়াল করে দেখেছে দাঁতের রোগীর বেশির ভাগই মহিলা। উচ্চ মহলের মহিলারা বেশিরভাগই খুব শুচীবাইগ্রস্থ হন, আর মেয়ে এসিস্টেন্ট থাকলে তারা সাচ্ছন্দবোধ করেন এটাও লক্ষ্য করেছে সে, তাইতো এসিস্টান্ট হিসেবে মেয়েদের রাখার পক্ষপাতি সে ।গতমাসে রায়হানের একজন সিনিয়র ভাই লিপিকে তার কাছে পাঠায় , সাথে নোট এ লিখে দিয়েছিলেন- “বাবা-মা মরা এই মেয়েটা খুব গরীব আর অসহায়, পারলে তার একটা চাকুরীর ব্যাবস্থা কর। এই বয়েসী মেয়েদের সব জায়গায় মান-সন্মান নিয়ে চাকুরী করা সম্ভব হয়না , তোমার ওখানে যেটা সম্ভব- তাই পাঠালাম।“
.
সেইদিন থেকেই মেয়েটা কাজ করছে রায়হানের ক্লিনিকে। কাজ কর্মে আগ্রহ থাকায় অল্পদিনেই মেয়েটা সব বুঝে নিয়েছে কিন্তু সমস্যা একটাই- কিছুক্ষণ পর পর খুক খুক করে কাশবে। রোগীরা এখন খুব সচেতন , এই রকম কাশি শুনে মুখে কিছু না বললেও তারা ইতস্থত করে, যেন যক্ষ্মার রোগী মুখের সামনে দাড়িয়ে কাশছে। এভাবে প্রায় ২০-২৫ দিন হতে চলল কিন্তু কাশি কমার কোন লক্ষন নেই।
.
তোমাকে যে ঔষধগুলো দিয়েছিলাম সেগুলো ঠিকমত খাচ্ছ কি? – লিপিকে জিজ্ঞেস করে রায়হান।
.
ওগুলোতো ৫ দিন আগেই শেষ হয়ে গেছে স্যার- লিপি সঙ্কুচিত ভাবে উত্তর দেয়।
.
তোমার কাশিতো তাও শেষ হল না, যাও টয়লেটে গিয়ে ঝেড়ে কাশে আস, যত্তসব ডিসগাস্টিং ! – বিরক্তির সাথে লিপিকে বলে রায়হান। রায়হান মনে মনে ভাবে সত্যই যক্ষ্মা নাকি? তাই বা কি করে হয়, বক্ষব্যাধির সবচেয়ে বড় প্রফেসরের কাছে লিপিকে দেখানোর ব্যাবস্থা করেছে রায়হান। উনার দেয়া একগাদা টেস্ট করাতে গিয়ে রায়হানের প্রায় ৩০০০টাকা বের হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। কিন্তু শেষমেশ ফলাফল জিরো, কোন রোগই ধরা পরেনি। বক্ষব্যাধির ডাক্তার উনাকে বলেছেন এটা সম্ভবত এল্যাজির জন্য হচ্ছে, “এয়ার কন্ডিশনারে এল্যাজি” কারন কাশির সমস্যাটা লিপির চেম্বারে থাকাকালীন সময়ই শুধু হচ্ছে, বাহিরে নয়। আছে এমন অনেকে যাদের এসি সহ্য হয়না।
.
যত্তসব ফকিরী লোকজন আসে জুটে আমার কপালে- রাগে গজ গজ করতে করতে বলে রায়হান। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে মাসের শেষে বেতন দিয়ে লিপিকে বলে দিবেন আর আসতে হবেনা । আরে বাবা আমার এখানে যেসব লেভেলের লোকজন আসে তারা সারাক্ষন এয়ার কন্ডিশনারে থেকে অভ্যস্ত, চিকিৎসা শেষে এতগুলো টাকা কি এমনি এমনি দেয়? এয়ার কন্ডিশনার ছাড়া এদের ধরে রাখা অসম্ভব। এদের সবকিছুই কন্ডিশন কন্ট্রোলড।
.
লিপির মাথায় যেন বাজ পরল, বেতনের টাকাটা হাতে নিয়ে তার মাথায় শুধু রায়হানের কথাগুলোই ঘুরছিল, – এখানে দুই মাসের বেতন দেয়া আছে , তুমি দয়া করে কাল থেকে আর এসোনা, অন্য কোথাও চাকুরী খুজে নিও।
.
লিপি ভেবে পাচ্ছিল না কি কারনে তার চাকুরীটা চলে গেল। করুনভাবে সে শেষ চেস্টা করলো রায়হানের মন গলাবার। -স্যার, একটু দয়া করুন, আমার দোষটা বলেন, শুধরায় নিব… একবার সুযোগ দেন স্যার।বাবা-মা নাই, ভাইদের সংসারে টাকা দিতে না পারলে থাকতে দিবে না।
.
এসব কিছুই রায়হানের মন গলাতে পারেনা। মনোযোগ দিয়ে সে খবরের কাগজ পড়ার ভান করে, একজন কর্মচারীকে তো আর এই কথা বলা যায়না যে কাশির কারনে তোমার চাকুরীতে থাকা সম্ভব হচ্ছেনা। সে শুধু বলল প্রয়োজনে এক মাসের বেতন আরো দিয়ে দিচ্ছি কিন্তু তোমাকে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
.
বছর দশেক পরের কথা। ডাঃ রায়হান এখন আরও বড় পরিসরে ক্লিনিক চালান। তার খুতখুতে স্বভাব এখন আরো যেন বেড়েছে, অনেক টিপটপ তার ক্লিনিক। এখন অনেক বিদেশী রোগীও তার কাছে চিকিৎসা করাতে আসে। অইতো সেদিন জার্মান দূতাবাসের হাইকমিশনার মিস্টার সিয়াটন রুট কেনেল আর ক্যাপ করাতে এলেন তার ক্লিনিকে। এইসব হাই প্রফাইলের মানুষদের কাজ করাও সৌভাগ্য , রিসিপশনে বসা অন্যান্য রোগীদের ডাক্তারের প্রতি সমীহ আরো বেড়ে যায় যখন এই লেভেলের রোগীদের চিকিৎসা নিতে দেখে। আজ মিস্টার সিয়াটনের এপয়ন্টমেন্ট আছে সন্ধ্যা ৬ টায়। রায়হান সব কিছু প্রস্তুত করে অপেক্ষায় আছে। আজ সে একজন প্রফেশনাল ফটোগ্রাফারকে এনে রেখেছে, এক সুযোগে হাই কমিশনারের সাথে একটা ছবি তুলতে হবে এই উদ্দেশ্যে। পরে সেটা ক্লিনিকের দেয়ালে বাধিয়ে রাখা যাবে। এই কাজটা আরো আগে থেকেই করা উচিৎ ছিল, গতমাসে জলিল না জালাল নামের একজন অভিনেতাকে স্কেলিং-পলিশিং করার জন্য নিয়ে এসেছিল তার বন্ধু জুনায়েত।অবশ্য পরিচয় না দিলে রায়হান বুঝতোই না উনি এত বড় নায়ক কারন টিভি-সিনেমা দেখার মত সময় রায়হানের খুব একটা হয়না। হয়তো সামনের দিন গুলোতে আরো ভিভিআইপিরা আসবেন তার ক্লিনিকে , রিসিপশনের দেয়ালে এইরকম ৮-১০টা ছবি লটকানো থাকলে আর কি লাগে?
.
সোয়া ছয়টা বাজে তাও মিস্টার সিয়াটন এসে পৌছালনা কেন? – একটু দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হল রায়হান, রিসিপশনে ৪-৫জন রোগী বসে আছে, হাইকমিশনারের আসার কথা তাই তাদের ঢুকাতেও পারছেন না। এই সময় সিকিউরিটি সহ ক্লিনিকে ঢুকলেন মিস্টার সিয়াটন । রায়হান হাই-হ্যালো করে ডেন্টাল চেয়ারে বসালেন মিস্টার সিয়াটনকে। আজ এসিস্টেন্ট হিসেবে ডাঃ সাজানাকে রেখেছে সে। এখন এই এক সুবিধা হয়েছে- প্রতি বছর গাদা গাদা ডাক্তার পাশ করায় অল্প বেতনে জুনিয়র ডাক্তারদের রাখা যায়। আর এই ডাঃ সাজানা আবার নেপালী এবং খুব আধুনিক। স্কিন টাইট জিন্স আর টি শার্ট এর উপর এপ্রন চাপায় সে যখন রোগীদের কাজ করে ক্লিনিকে একটা ইন্টারন্যাশনাল পরিবেশ চলে আসে। সাজানা ইনজেকশনটা আগায় দিতেই হটাৎ রায়হানের মনে হল গলার কাছটায় কে যেন সুরসুরী দিলো, প্রচন্ড ভাবে কাশতে ইচ্ছে হল রায়হানের কিন্তু তা তো এমন স্পর্শকাতর রোগীর সামনে কোনভাবেই সম্ভব না। শালার কাশি আসার আর সময় পেল না- মনে মনে ভাবল রায়হান।অবশ্য মুখে ‘এক্সকিউজ মি’ বলে টয়লেটে গিয়ে অনেক সময় নিয়ে কাশল, এক গ্লাস পানি খেয়ে আবার এসে বসা মাত্রই আবার একই সমস্যা… মনে হল কাশতে না পারলে বুঝি দমই বন্ধ হয়ে আসবে। কোন রকমে খুকখুক করে মিস্টার সিয়াটনের কাজ শেষ করলো রায়হান। ছবি তোলার কথা মনেই রইল না। পরের ৩-৪ টা রোগী গলার খুসখুস সমস্যা নিয়েই কোনমতে তাড়াহুড়া করে দেখে শেষ করল সে। ক্লিনিক থেকে বের হয়েই অনেকটা স্বস্তি অনুভব করল রায়হান। তারপরও বার কয়েক প্রান খুলে খক খক করে কেশে সোজা রওয়না দিল গলার ডাক্তার দেখাতে। ডাক্তার বেশ কিছু টেস্ট করালেন, পরীক্ষাও করে দেখলেন গলার ভিতর কিন্তু কোন সমস্যাই বের করতে পারলেন না। শেষে গম্ভীর গলায় বললেন- দেখুন ডাঃ রায়হান সবকিছু দেখে মনে হচ্ছে আপনার সমস্যাটা এল্যাজিক, আপনি কিছুদিন এয়ার কন্ডিশনার এড়িয়ে চলুন, আশা করি সমস্যাটা সেরে যাবে।
.
* বিঃদ্রঃ পুরো ঘটনাটাই কাল্পনিক, জীবিত বা মৃত কারো সাথে এটা মিলাতে যাবেন না।

Comments

comments

মোঃ আরিফুর রহমান

মোঃ আরিফুর রহমান

মোঃ আরিফুর রহমান পেশায় একজন দন্ত চিকিৎসক । ছবি তোলা উনার সবচাইতে পছন্দের হবি। জন্ম ১৯৮০ সালে রংপুরে। বাবার সরকারী চাকুরীর সুবাদে শিক্ষাজীবন কেটেছে বিভিন্ন জেলায় জেলায় ঘুরে। পাঠশালা [সাউথ এশিয়ান মিডিয়া ইন্সিটিউট] হতে ছবিতে ছবিতে গল্প বলায় কর্মশালা করেছেন। ডকুমেন্টরি ফোটোগ্রাফিতে প্রধানত আগ্রহী তিনি।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি