মেয়েটির জাদুর তুলি । এহসান হায়দার

গ্রামটির নাম গড়খালী। এই গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে কলকল করে শিবসা নদী। নদীর বিশাল চর। যার কথা বলব বা বলা শুরু করেছি সে বাস করতো তার বাবা-মার সাথে। এই চরেই ওরা থাকতো । হঠাৎ একদিন বেচারীর মা-টা হারিয়ে গেল চাঁদের দেশে। যখন এ গাঁয়ে মানুষের আনাগোনা ছিল এক্কেবারেই কম, দু-একজন জেলে আসতো জাল ফেলে মাছ ধরতে আর বাড়ি ফেরার সময় নিয়ে যেত নানান ধরনের মাছে ভরা ঝুড়ি। মেয়েটা সেই মাছ ধরা মানুষদের কাছ থেকে মাছ নিত তার কৃষক বাবার জন্য। তারা ছিল খুব গরিব। এক বেলার ভাত জুটলে আর এক বেলা জুটতো না। এভাবেই বাবা মেয়ের সংসার চলে যাচ্ছিল । এই গাঁয়ে ছিল এক লোভী আর রাগী জমিদার । প্রচুর টাকা আর জমি থাকতেও তার শুধু চাই চাই আর চাই। সে তার জমি বর্গা দিত কৃষকদের আর ভাগের বেলায় তাদের ঠকাতো। সোনা সে খুব ভালো বাসতো। এই ছোট্ট মেয়ের বাবাও তার জমি চাষ করতো কিন্তু ভাগের বেলায় এতটাই কম দিত যে দু-জনের সংসারে সেই ধানে কুলোতো না। মেয়েটা স্কুলে যেতেও পারতো না। মেয়েটা ভালো ছবি আঁকতে জানতো কিন্তু মেয়েটার কোনো তুলি ছিল না। তুলি থাকবে কি করে তার বাবার তো অত টাকা নেই যে মেয়েকে পড়াবে তাই মেয়েটা রোজ চরে গিয়ে একা একা বালির মধ্যে পাখি আঁকতো ফুল আঁকতো, মাছ আঁকতো আর আঁকতো আকাশ। কিন্তু আকাশ-ফুল-পাখি আর মাছ আঁকলে কি হবে সুন্দর এই ছবিগুলোর তো রং করা চাই রং সে কোথায় পাবে; এই ভেবে সে আর আঁকতো না আবার বাড়িতে ফিরে আসতো। বাবাকে কিচ্ছুটি বলতো না। বাবাকে বলে কি হবে বাবা কেবলই কষ্ট পাবে দিতে না পেরে। এভাবে তার খুব কষ্ট হতো। তার কোনো খেলার জিনিসও ছিল না যে তা দিয়ে খেলবে। সে ভাবতো যদি তার তুলি থাকতো রঙ থাকতো-তবে সে কেবলই আঁকতো। ছবির মতো সুন্দর এক গ্রাম আঁকতো।রূপোলি রোদ আঁকতো, পরী আঁকতো, আঁকতে আঁকতে তার সব সময় বয়ে যেত।

দুই

এক রাতে ছোট্ট মেয়েটির একটি অবাক করা ঘটনা ঘটলো। মেয়েটি রাতে ঘুমিয়েছিল দেখলো একজন দরবেশ দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। সে মিটিমিটি করে হাসছে আর তার হাতে ধরে আছে একটি ছোট্ট তুলি।

মেয়েটি বললো— কে তুমি?

দরবেশ হেসে বললো— আমি দরবেশ ফকির মানুষ;

মেয়েটি বললো— তুমি এখানে কেন এসেছো?

দরবেশ হেসে উত্তর দিল, এই জাদুর তুলি তোমাকে দিতে এসেছি।

মেয়েটি বললো—আমি তো তোমার কাছে তুলি চাইনি। দরবেশ তখন হাসতে হাসতে বললো, এটা চাইতে হয় না যার দরকার তার কাছে আমি নিজেই দিয়ে যাই। তোমার দরকার ছিল তাই দিতে এলাম। এই তুলি এমন এক আজব জাদুর তুলি যে তুমি যা আঁকবে তা বাস্তব হয়ে যাবে; এই যেমন ধরো তুমি একটা হলদে পাখি আঁকলে ওমনি দেখবে যে পাখিটি উড়াল দিল—করে ফুড়ুৎ করে উড়াল দিয়ে পালালো। আবার ধরো তোমার খুব ক্ষুধা লাগলো কিন্তু হাতের কাছে খাবার কিচ্ছু নেই, তখন তুমি টুপ করে এঁকে নিলে বড় এক টুকরো ভাজা মাছ আর এঁকে নিলে ধোয়া ওঠা আতপ চালের ভাত তারপর মন ভরে খেয়ে নাও। তবে শোনো, এটা কখনও কোনো ভুল কাজে ব্যবহার করো না তাহলে আর কখনো কাজ হবে না আর এর জাদুও ফুরিয়ে যাবে। ছোট্ট মেয়ে অবাক হয়ে গেল দরবেশের এইসব কথা শুনে। দরবেশ এই কথা বলে জাদুর সেই আজব তুলি মেয়েটির হাতে দিল। তারপর মেয়েটি গেল জেগে আর খুঁজতে লাগলো সেই লম্বা দাড়িওয়ালা ফকিরকে কিন্তু তাকে কোথাও পেল না। হঠাৎ তার মনে পড়লো তার সেই তুলির কথা চেয়ে দেখলো তার সেই স্বপ্নে পাওয়া তুলিটি আছে। এরপর তুলি হাতে নিয়ে মেয়েটি আঁকতে লাগলো, দরবেশের কথা মতো প্রথমেই আঁকলো সে হলদে পাখি—তারপর কি হলো পাখিটা আঁকা শেষ অমনি ছোট্ট পাখিটা ডানা ঝাপটে ফুড়ুৎ করে উড়ে পালাল ছোট্ট সেই মেয়েটি কি যে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলো। একা একা এই পাখি আঁকে আর ডানা ঝাপটে হলদে পাখি লাল পাখি নীলকন্ঠ পাখি কত্তো তার পাখি আঁকা শেষ হতেই ডানা ঝাপটে ফুড়ুৎ করে উড়ে পালায়। মেয়ের আনন্দের সীমা রইলো না। সারারাত না খেয়ে ঘুমিয়েছিল মেয়েটি। তার বাবা জমিদারের বাড়িতে কাজ করছিল বলে রাতে বাড়িতে ফেরেনি। আর মেয়েটির এতক্ষন মনেও ছিল না যে তাকে খেতে হবে তবু খাবারের কথা যখন মনে হলো তখন তার মনে হলো সে কি খাবে বাবা তো কিছুই আনেনি। তখন সে দরবেশের দেওয়া তুলি হাতে নিয়ে আঁকলো গরম ভাজা ইলিশ শিবসা নদীর গভীর পানিতে যে ইলিশ ভেসে বেড়ায় আর থালা ভরা গরম ভাত। পরম আনন্দে সে ভাত—মাছ খেয়ে নিল মেয়েটি। পাড়ার এক বউ ওর এই ছবি আঁকার দৃশ্য দেখলো তারপর গাঁয়ে মেয়েটিকে নিয়ে পড়ে গেল উল্লাসের বন্যা। সবাই দল বেঁধে বেঁধে আসছে ছবি আঁকা দেখতে। মেয়েটি সবাইকে ফল এঁকে এঁকে দেখায় আর ফলগুলো ছবি থেকে বাস্তব হয়ে যায়। মজা করে সবাই তা আবার খায়। এই খবর পৌঁছে গেল জমিদারের কানে। জমিদার তার লাঠিয়াল বাহিনী আর লোক লস্কর দিয়ে ডেকে পাঠাল মেয়েটির বাবাকে আর মেয়েটিকে। অগত্যা কী আর করা তারা জমিদার বাড়ীতে গেল। জমিদার তাদের দেখে বললো— কৃষক তোমার মেয়ে যে ছবি আঁকে তা সব শুনলাম বাস্তব হয়ে যায়। আঁকো তো দেখি তুমি কেমন আঁকাও। এরপর কৃষকের ছোট্ট মেয়েটি একটা আপেল আঁকলো তারপর জমিদার কে সেই ছবিটা দিল আর জমিদার হাতে নিতেই তা ছবি হয়ে গেল। ছবি বাস্তব হতে দেখে জমিদারের চোখ রীতি মতো ছানাবড়া হয়ে গেল। জমিদার খুমি হয়ে কৃষককে বললো, ভর দুপুর হয়ে গেছে এখন থেকে যাও দুপুরে খেয়ে দেয়ে তবেই তোমরা যেও। জমিদারের এই কথা শুনে গরিব কৃষক রীতি মতো অবাক হলো। লোভী জমিদার বললো এমন কথা মেয়েটি ভাবনায় পড়ে গেল । এদিকে জমিদার ভেতরে দুষ্ট বুদ্ধি আঁটতে থাকলো। কিভাবে অনেক সোনার ছবি এঁকে নেওয়া যায়। মেয়েটা ছবি আঁকবে আর সোনা হয়ে যাবে। শত শত মণ সোনার মালিক হবে। লোভী জমিদারতো লোভ সামলাতে পারে না।

তিন

দুপুরে খাওয়া শেষে যখন কৃষক আর তার মেয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিল। জমিদার তখন তার নায়েব কে নিয়ে হাজির হলো সেখানে। বললো— কৃষক তোমার মেয়েকে সোনার ছবি আঁকতে বলো। আমার প্রচুর সোনা দরকার। সোনা আমি খুব পছন্দ করি। মেয়েটি তখন বুঝতে পারলো, লোভী জমিদার দুপুরে খাওয়ার কথা আসলে এ জন্যেই বলেছিল। জমিদারের কথা শুনে মেয়েটি বললো, অন্যায় কাজ আমি করবো না। আমি ছবি এঁকে কেবল মানুষের উপকার করতে চাই। আপনাকে যদি আমি সোনার ছবি এঁকে দিই তবে আমার পাপ হবে। আমি এই ছবি আঁকবো না। ছোট্ট মেয়েটির কথা শুনে জমিদার গেল রেগে। সে বললো, এত বড় কথা আমার হুকুম মানবে না। তবে থাকো আমার বন্দী হয়ে। লেঠেল বাহিনীকে ডেকে বললো, এদের বাপ-মেয়ে দু’জনকেই আটকে রাখ। যেদিন ওই মেয়ে ছবি আঁকতে রাজী হবে সেদিন ওরা ছাড়া পাবে। এরপর মেয়ে আর বাবাকে জমিদারের বিশাল পাঁচিল ঘেরা কয়েদখানায় আটকে রাখা হলো। দিনের আলো আস্তে আস্তে কমে আসতে থাকলো। রাত হয়ে গেল। কিন্তু জমিদারের কেউ এসে খাবার দিল না। ক্ষুধার জন্যে ছোট্ট মেয়েটি কাঁদতে লাগলো। রাতও বেশ গভীর তখন মেয়েটির হঠাৎ মনে হলো তাইতো আমি কাঁদবো কেন? আমার তো তুলি আছে। ব্যাগ থেকে তুলি নিয়ে মেয়েটি রুটি আর ভাজি আঁকলো তারপর খেয়ে নিল বাবা আর মেয়েতে। এবার মেয়েটি আঁকলো একটা চাবি তারপর সেই চাবি দিয়ে খুলে ফেললো তালা। এরপর সে আর তার বাবা বের হয়ে এলো। জমিদারের বাড়ীর বাইরে এসে মেয়েটি তারপর আঁকলো একটা বড় নৌকা। সেই নৌকায় করে মেয়েটি আর তার বাবা চলে গেল অনেক দূরে। সেখানে গিয়ে মেয়েটি আর তার বাবা সুখে বসবাস করতে লাগলো।

Comments

comments

এহসান হায়দার

এহসান হায়দার

এহসান প্রকৌশলী রূপে পড়াশোনা করলেও, পেশায় সাংবাদিক। জন্ম-৩০ মার্চ। জন্মস্থান খুলনা, বসবাস করছেন ঢাকায়। এহসান বর্তমানে ‘রূপকথা’ নামে একটি শিশু-কিশোর পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। নিজেকে পরিচয় দেন ছোটকাগজ কর্মী হিসেবে। কারণ, কবিতা প্রবন্ধ এই ছোটকাগজেই ছাপতে ভালো লাগে। একান্ত ইচ্ছে শিশুদের জন্যে একটি নতুন ধরনের জগত তৈরি ‌‍করা। ছেলেবেলায় শিশুসাহিত্যর প্রতি যে আগ্রহ জন্মেছিল তা থেকে দূরে যাওয়া যায়না- আর তাই শিশুদের নিয়ে লিখতে ভালো লাগে। ইমেল : shubornoarjo@gmail.com

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি