সাম্প্রতিক

‘জেমস বন্ড’ সিরিজ – পর্ব ০২ । মোঃ অনিকউজ্জামান

(প্রথম পর্বের পর থেকে… )
‘ডেনিয়েল ক্রেগ’ অভিনীত ‘জেমস বন্ড’ সিরিজের ৪টি মুভির একটি কমন মিল আছে আর তা হল মুভি গুলোর নাম নেয়া হয়েছে কোন স্থান বা সংগঠনের নাম থেকে যা এর আগের ২১টি বন্ড মুভিতে কখনো দেখা যায়নি। যেমন, প্রথম মুভি ‘ক্যাসিনো রয়্যাল’ হচ্ছে মুভিতে দেখানো একটি বিশেষ ক্যাসিনোর নাম যেখানে বসে বন্ড ও ‘ল্যাশিফ’ এর মাঝে জুয়া খেলা হয়। তারপর ‘কোয়ান্টাম অফ সোলেস’ মুভির নামটি নেয়া হয়েছে ‘ইয়ান ফ্লেমিং’ এর লেখা ‘ফর ইয়োর আইজ অনলি’ মুভির ‘কোয়ান্টাম অফ সোলেস’ নামক একটি ছোট অধ্যায় থেকে যদিও সেই ছোট অধ্যায়ের গল্পের সাথে এ মুভির কোন মিল নেই তাই ‘কোয়ান্টাম’ নামটি দেখানো হয়েছে মুভির প্রধান ভিলেন সংগঠনের যার হেড ছিল মুভির প্রধান ভিলেন ‘ডমিনিক গ্রিন’। তারপর ‘স্কাইফল’ মুভির নামটি দেখানো হয়েছে বন্ডের বাবার তৈরী বিশাল ম্যানশনের যেখানে বন্ডের শৈশব কেটেছে। আর শেষ মুভি ‘স্পেক্ট্রা’র নামটি দেখানো হয়েছে বন্ড সিরিজের সব থেকে ভয়ংকর ভিলেন সংগঠনের। নামের এই মিল গুলো ‘ক্রেগ’ মুভির বেশ ভালই একটি বিশেষত্ব। আবার ‘ক্রেগ’ এর প্রথম দুইটি মুভির নাম উচ্চারিত হয়েছে ‘ক’ দিয়ে (‘ক্যাসিনো রয়্যাল’ ও ‘কোয়ান্টাম অফ সোলেস’) এবং এই দুটি মুভির গল্প পরস্পর ধারাবাহিক, পাশাপাশি পরের দুই মুভির নাম উচ্চারিত হয়েছে ‘স’ দিয়ে (‘স্কাইফল’ ও ‘স্পেক্ট্রা’) এবং এই দুটি মুভির গল্পও এগিয়েছে পরস্পর ধারাবাহিক ভাবে। মিলটা কিন্তু বেশ নজরকাড়া। এভাবে বন্ড সিরিজের কোন মুভির গল্পই ধারাবাহিক নয়। পুর্বের ২১টি মুভির প্রত্যেকটিই একে অন্যটির থেকে সম্পুর্ণ আলাদা। কিন্তু ‘ক্রেগ’ সিরিজের ৪টি মুভি একটি অন্যটির সাথে গভীর ভাবে সম্পর্ক যুক্ত।

এখন আসা যাক ভিন্ন প্রসংগে। আমরা জানি যে প্রতিটি সিরিজেই কিছু ছোট খাটো খুচরো ভিলেনের পাশাপাশি একটি মাস্টার মাইন্ড ভিলেন থাকে এবং সেই ভিলেন ছাড়া যেন সিরিজের নায়ক অসম্পুর্ণ। যেমন ‘শার্লক হোমস’ সিরিজের কথা আসলেই সবাই এক বাক্যে বলবে ভিলেন ‘প্রফেসর জেমস মরিয়ার্টি’ এর নাম। ‘মরিয়ার্টি’ আর ‘হোমস’ পরস্পর একে অন্যকে ছাড়া অসম্পুর্ণ। তেমনি ভাবে লেখক ‘ইয়ান ফ্লেমিং’ও ‘জেমস বন্ড’ সিরিজকে দিয়েছেন বন্ডের এক যোগ্য নেমেসিস, যার নাম ‘আর্নেস্ট স্টাভ্রো ব্লোফেল্ড’ যার ইভিল সংগঠনের নাম ‘SPECTRE’ (Special Executive for Counter-intelligence, Terrorism, Revenge and Extortion) যার লোগো হচ্ছে অক্টোপাস। প্রতিটি মাস্টার মাইড ভিলেনের কিছু নিজস্ব স্বকয়ীতা ও স্টাইল থাকে যার জন্য সে বিখ্যাত ও যার দ্বারা তাকে চেনা যায়। ‘আর্নেস্ট স্টাভ্রো ব্লোফেল্ড’ মূলত বিখ্যাত তার কোলে নিয়ে বেড়ানো একটি সাদা রঙের বেড়াল এর জন্য। এ্টিই তার ট্রেড মার্ক। এছাড়াও ‘ব্লোফেল্ড’ দেখতে টাক মাথা ও তার ডান চোখ বরাবর একটি লম্বা কাটা দাগ আছে যা তার চেহারাকে অত্যন্ত ভয়ংকর করে তোলে।

‘ইয়ান ফ্লেমিং’ তার ‘জেমস বন্ড’ সিরিজের গল্পে সর্ব প্রথম ‘SPECTRE’ এবং তার হেড ‘ব্লোফেল্ড’ এর অবির্ভাব ঘটিয়ে তাকে পাঠকদের সাথে পরিচয় করিয়েছেন ‘থান্ডারবল’ গল্পে এবং মুভির ক্ষেত্রে এর আগে বন্ড সিরিজের ২১ টি মুভিতে মোট ৭ বার পর্দায় আবির্ভাব ঘটেছে ‘SPECTRE’ এবং ‘ব্লোফেল্ড’ এর। সর্ব প্রথম ‘ব্লোফেল্ড’কে দেখানো হয় ১৯৬৩ সালে ‘শন কনারি’ অভিনীত ‘ফ্রম রাশিয়া উইথ লাভ’ এবং ১৯৬৫ সালে ‘থান্ডারবল’ মুভিতে। এই দুই মুভির ভিলেন ছিল অন্য কেউ যাকে নিয়ন্ত্রন করতো ‘SPECTRE’ এবং ‘ব্লোফেল্ড’, তাই এই দুই মুভিতে ‘ব্লোফেল্ড’কে সরাসরি পর্দায় দেখানো হয়নি। সে ছিল পর্দার আড়ালের ব্যক্তি যার শুধু গলার ভয়েজ, হাত ও ব্যাক সাইড দেখানো হয়েছে এবং এই দুই মুভির গল্পের ‘ব্লোফেল্ড’ একই অর্থাৎ গল্পের ‘ব্লোফেল্ড’ চরিত্র ধারাবাহিক যার ভূমিকায় দুই মুভিতেই একই ব্যক্তি অভিনয় করেছে এবং ভয়েজ দিয়েছে। অতঃপর সর্ব প্রথম ১৯৬৭ সালে পর্দায় প্রথম বারের মত আগের দুই পর্বের পর্দার আড়ালে থাকা ‘ব্লোফেল্ড’ পুর্নাঙ্গ রূপে ভিলেন হিসেবে হাজির হয় ‘শন কনারি’ অভিনীত ‘ইউ অনলি লিভ টোয়াইজ’ মুভিতে যেখানে মুভির শেষে ‘ব্লোফেল্ড’ এর মৃত্যু ঘটে না, সে হাতে ইনজুরি নিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। পরবর্তীতে ১৯৬৯ সালে ‘জর্জ লেজেনবি’ অভিনীত ‘অন হার ম্যাজেস্টিজ সিক্রেট সার্ভিজ’ মুভিতে আবার প্রধান ভিলেন হিসেবে আবির্ভুত হয় ‘ব্লোফেল্ড’ যেখান মুভির শেষে ‘ব্লোফেল্ড’ পালিয়ে যায় ও তার হাতে বন্ডের স্ত্রী ‘ট্রেসি’র মৃত্যু ঘটে। এরপর ১৯৭১ সালে ‘ডায়মন্ডস আর ফরেভার’ মুভিতে ‘শন কনারি’ পুনরায় ‘জেমস বন্ড’ চরিত্রে ফিরে আসে এবং সাথে করে প্রধান ভিলেন হিসেবে নিয়ে আসে পুনরায় ‘ব্লোফেল্ড’কে। এই মুভির শেষে ‘ব্লোফেল্ড’ এক মিনি সাবমেরিনে করে পালাতে চেষ্টা করলে বন্ডের হাতে সাবমেরিন বিস্ফোরনে অবশেষে ‘ব্লোফেল্ড’ এর মৃত্যু ঘটে। এরপর ‘ব্লোফেল্ড’ আরো একবার পর্দায় হাজির হয় অতিথী চরিত্রে ‘রজার মুর’ অভিনীত ‘ফর ইয়োর আইজ অনলি’ তে, মুভির শুরুতে একটি ছোট অ্যাকশন দৃশ্যে যেখানে ‘ব্লোফেল্ড’ এর কোন চেহারা দেখানো হয় না, শুধু মাত্র তার কোলে সেই বেড়ালটি থাকায় দর্শক বুঝতে পারে যে এই হচ্ছে ‘ব্লোফেল্ড’ এবং ঐ অ্যাকশন দৃশ্যে বন্ডের হাতে ‘ব্লোফেল্ড’ এর মৃত্যু ঘটে। এরপর আবার ১৯৮৩ সালে ‘শন কনারি অভিনীত আনঅফিসিয়াল বন্ড মুভি ‘নেভের সে নেভার এগেইন’ যা ছিল মূলত ‘থান্ডারবল’ মুভির রিমেক, এই মুভিতেও পুনরায় ‘ব্লোফেল্ড’কে ‘থান্ডারবল’ মুভির মতই পর্দার আড়ালে রেখেই উপস্থাপন করা হয়। অবশেষে, সব মিলিয়ে ‘জেমস বন্ড’ পুর্নাঙ্গ রূপে ‘ব্লোফেল্ড’ এর মুখোমুখি হয় এবং ‘ব্লোফেল্ড’ চরিত্রে পুর্ণাঙ্গ রূপে অভিনয় করা হয় ‘ইউ অনলি লিভ টোয়াইজ’ (‘ডোনাল্ড প্লেসেন্স’), ‘অন হার ম্যাজেস্টিজ সিক্রেট সার্ভিস’ (‘টেলি সাভালাস’) এবং ‘ডায়মন্ডস আর ফরেভার’ (‘চার্লস গ্রে’) এই ৩ মুভিতে এবং ‘নেভার সে নেভার এগেইন’ মুভিতে সুইডিস অভিনেতা ‘ম্যাক্স ভন সিডো’ কে কয়েক মিনিটের জন্য অতিথী চরিত্রে ‘ব্লোফেল্ড’ হিসেবে পর্দায় দেখা যায়। (‘ফর ইয়োর আইজ অনলি’ মুভির ‘ব্লোফেল্ড’কে গণায় ধরা উচিত না)। দুর্ভাগ্যক্রমে ‘টিমথি ডাল্টন’ ও ‘পিয়ার্স ব্রসনান’ দেখা পাননি এই মহান ভিলেনের। এবং ‘ব্লোফেল্ড’ সাহেবের হাতে সব থেকে বেশী মার খেয়েছেন লেজেন্ডারী বন্ড ‘শন কনারি’। তবে এই ৭টি মুভির মধ্যে ৪টি মুভির (‘ফ্রম রাশিয়া উইথ লাভ’, ‘থান্ডারবল’, ‘ইউ অনলি লিভ টোয়াইজ’ এবং ‘ডায়মন্ডস আর ফরেভার’) গল্প অনুসারে ‘ব্লোফেল্ড’ একজন (নায়কও একজন ‘শন কনারি’) আর বাকি ৩টি মুভির গল্পে ‘ব্লোফেল্ড’ এসেছে ভিন্ন ভাবে।

এখন ‘ডেনিয়েল ক্রেগ’কে নিয়ে যখন গোটা বন্ড মুভি পুনরায় রিবুট করা হল, তখন নির্মাতারা আবার ফিরিয়ে আনতে চাইলেন এই লেজেন্ডারী ভিলেনকে এবং সম্পুর্ণ ভিন্ন ভাবে যা এর আগে দেখা যায়নি কখনো। ‘ব্লোফেল্ড’ অভিনীত ৭টি মুভিতে ‘ব্লোফেল্ড’ এর অরিজিন কখনো দেখানো হয়নি। সে কে, কোথা থেকে এসেছে, কিভাবে সে ‘SPECTRE’ গঠণ করেছে, বন্ডের সাথে তার কিসের শত্রুতা এগুলোর সব কিছুই ছিল ঐ মুভি গুলোতে অনুপস্থিত। ঐ মুভিগুলোতে সে শুধু এসেছে, বন্ডকে মেরেছে, পালটা মার খেয়েছে এবং বন্ডের হাতে মরেছে বা পালিয়েছে। কিন্তু ‘ক্রেগ’ মুভি বলছে ভিন্ন কথা। আপনারা হয়তো ভাবছেন ক্রেগের ৪র্থ মুভির নাম ‘স্পেক্ট্রা’ হওয়াতে এই মুভিতে আবির্ভাব ঘটবে ‘ব্লোফেল্ড’ এর, এবং আগের মুভি গুলোর মতই সে আসবে, মারবে, মার খাবে এবং মরবে। যদি এমনটা ভেবে থাকেন তবে অনেক ভুল ভাববেন। আগেই বলেছি ‘ক্রেগ’ সিরিজে ‘ব্লোফেল্ড’ কে ফিরিয়ে আনা হয়েছে সম্পুর্ণ ভিন্নভাবে যা আগে দেখেনি কেউ কখনো। এখানে বন্ডের সাথে সাথে ‘ব্লোফেল্ড’কেউ রিবুট করা হয়েছে এবং তাদের দুজনকে একই যোগসুত্রে একই সমান্তরালে হাঁটানো হয়েছে। অর্থাৎ ‘ব্লোফেল্ড’ শুরু থেকেই ছিল বন্ডের লাইফে। ‘ব্লোফেল্ড’ ছিল ‘ক্যাসিনো রয়্যাল’ এ, ‘ব্লোফেল্ড’ ছিল ‘কোয়ান্টাম অফ সোলেস’ এ, ‘ব্লোফেল্ড’ ছিল ‘স্কাইফল’ এ এবং অবশেষে ‘ব্লোফেল্ড’ এর পুর্ণাঙ্গ রূপে আবির্ভাব ঘটেছে ‘স্পেক্ট্রা’তে। এ যেন অনেকটা ‘হ্যারি পর্টার’ সিরিজের মত, যেখানে প্রথম ৩টি মুভিতে ‘লর্ড ভল্ডেমর্ট’ শুরু থেকেই ছিল কিন্তু পুর্ণাঙ্গ রূপে তার আবির্ভাব ঘটে ৪র্থ পর্বে হ্যারির প্রতি প্রতিশোধ নেবার জন্য। ‘ব্লোফেল্ড’ হচ্ছে ‘ড্যানিয়েল ক্রেগ’ এর বন্ড সিরিজের ‘লর্ড ভল্ডেমর্ট’ যার আবির্ভাব ঘটেছে ‘স্পেক্ট্রা’তে হ্যারির মতই বন্ডের উপর প্রতিশোধ নেবার জন্য। এবং ‘স্পেক্ট্রা’তে অনেক যত্ন নিয়ে ‘ব্লোফেল্ড’ চরিত্রটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এবং ‘ব্লোফেল্ড’ এর সাথে বন্ডের সম্পর্ক ও শত্রুতার ব্যাখ্যা দিয়ে তার অরিজিন গল্প বলা হয়েছে।

# লেখাটি আগামী পর্বে শেষ হবে

Comments

comments

মোঃ অনিকউজ্জামান

মোঃ অনিকউজ্জামান

শিক্ষার্থী ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি তে আইন নিয়ে পড়ছেন, জন্ম ১৪ মার্চ ১৯৯১ । aneecque@gmail.com

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি