বংটুর হাতী । এহসান হায়দার

নানান ধরনের নাম শুনেছি- বল্টু, পল্টু, গুল্টু, সুল্টু, ঘনা, মগা, জগা। কিন্তু— ওর নাম বংটু। পাহাড়ী ছেলে। বয়স নয় কী দশ হবে। বংটু বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়। ওর মা-বাবা দু’জনেই জুম চাষে ব্যস্ত থাকে। ক্ষেত পাহারা দেয় আর জুম কাটার মৌসুম এলে সেকি ব্যস্ত। খাবার সময়টুকুও থাকে না তাদের। বংটুর খেলার সাথী বনের পশু-পাখী। এদের সাথেই গল্প করে সারাটা দিন কাটে তার। সন্ধ্যা গড়িয়ে এলে বংটু বাড়ি ফেরে। বংটুদের বাড়িটা পাহাড়ের চূড়োয়। একটা দো-চালা কাঠের ঘর। বাড়ির উঠোন থেকে পুবের সূর্যগলা আকাশ আর দূরের জল টলমলে দীঘিটা দেখা যায়। রাতে বংটু যখন মার বুকের মধ্যে ঘুমায়। মা তখন বংটুকে ওই দীঘির গল্প শুনায়। মা বলে— ওখানে নাকি কোনো দীঘি ছিল না। ওখানে ছিল এই অঞ্চলের রাজবাড়ি। রাজার বাড়ি- রাজার রাজ্য,   সৈন্য—সামন্ত আর লস্কর সব নিয়ে রাজা ছিল মহাসুখে। তারপর হঠাৎ একদিন রাজ্যে শুরু হল মানুষ হারিয়ে যাবার খেলা। একজন মানুষ হারালে নতুন আরও একজন মানুষ এসে সেখানে বাস করা শুরু করত। এভাবে রাজার রাজ্য তার সৎ ভাই দখল করে নিল। আর রাজার পুরো পরিবারকে মেরে ফেলল । তারপর ঘটে যায় এক আজব ঘটনা। যে রাতে ওই রাজার বাড়িতে তার সৎ ভাই বসবাস করতে আসে। সে রাতেই একটা বিকট শব্দে রাজবাড়িটা মাটির নিচে ঢুকে যায়। আর কল কল করে জলে ভরে যায় পুরো গর্তটা। লোকে বলে পাপের শাস্তি হয়েছে। ধীরে ধীরে সেই গর্তই আজ জলটলমল দীঘি।

এদিকে বংটু তো বটুর কথা ভুলেও যায়। ছিপ দিয়ে মাছ ধরতে বসলে বংটুর আবার কিছু মনেই থাকে না। তাজা মাছ মা যখন ভেজে দেয় উফ্ কি যে স্বাদ। আজ অনেকগুলো মাছ ধরেছে সে। হঠাৎ বংটুর খেয়াল হয় বিকাল প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। চেয়ে দেখে আশেপাশে বটু নেই। তবে কোথায় গেল সে। বংটু উঠে দাঁড়ায়। বটুকে খুঁজতে যায়। ততক্ষণে সন্ধ্যা নেমে এসেছে বনে

বংটুর সাথে ক’দিন থেকে একটা হাতীর বাচ্চার ভাব হয়েছে। বাচ্চাটার মার সাথে বংটু ঘুরে বেড়াত। পিঠে চড়ত। বাচ্চাটা হওয়ার পর থেকে বংটু ওকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে। বংটু হাতীর বাচ্চাটার নাম দিয়েছে বটু। বটু নামটা বংটুর খুব প্রিয়। নামটা ওর ভাই হলে রাখবে বলে ঠিক করেছিল; মাকেও বলেছিল। মা শুনে হেসে বলেছিল- বংটুর সাথে মিল করেছিস? বংটু- মাথা নেড়ে সায় দিয়েছিল। তারপর বংটুর ভাইও হয় না আর নামটাও পড়ে আছে। তাছাড়া বংটু এই হাতীর বাচ্চাটাকে খুব পছন্দ করে— ভালোবাসে। তাইতো বংটু নিজের ভাইয়ের নামটাই দিল ওকে। বটু বলে ডাকলে, যেখানে থাকুক বটু হাজির। বটুর সুঁড়টা ওর মার মতো অতটা লম্বা না। তবুও বটু ওটা দিয়েই বংটুকে মাঝে মাঝে আদর করে পিঠ বুলিয়ে দেয়। আর বংটু হেসে ওঠে। বংটুও কম না। রোজ সকালে বটুর জন্য একটা করে কচি কলা গাছের থোড় নিয়ে যায়। বটু থোড় দেখে খুশিতে নাচতে শুরু করে ঢিং ঢাং ঢিং ঢাং ঢিং। সকালে কলার থোড় এনে বংটু বলে— নে তাড়াতাড়ি খেয়ে নে। নদীর পাড়ে মাছ ধরতে যাব। তুইও যাবি আমার সাথে। বটু তাতে সায় দিয়ে ছোট্ট সুঁড় নাড়িয়ে হুহাঃ হুহাঃ করে ওঠে। বংটুর থোড় খাওয়া শেষে দু’জনে মাছ ধরতে যায় নদীর পাড়ে। বংটু ছিপ নিয়ে বসে যায় ছোট্ট একটা পাথরের ওপর। আর বটু তার চারপাশে ঘুরতে থাকে। সুঁড়ের নানান খেলা দেখায়। এক পায়ে দাঁড়িয়ে কোমর দোলায়। বংটু, বটুর এমন আহ্লাদ করে করে নাচতে দেখে সেও বেশ আনন্দ পায়। এভাবে বেশ কিছুক্ষণ আনন্দ করার পরে বটু হাঁটতে থাকে নদীর পাড় ধরে । বংটু তা দেখে বলে ওঠে, হাঁ-রে বটু? বংটুর ডাকে— বটু ফিরে তাকায়। বংটু বলে, দূরে যাসনে…

ওদিকে শিকারিদের দেখা যায়। বিনোদ কাকু গত বছর দেখেছিল ওদের। ওরা শহুরে। মাঝে মাঝে ওদের দেখা যায়। এই বনের পশু-পাখি ধরে নিয়ে যায় ওরা। ওদের না’কি চিড়িয়াখানা আছে বুঝলি; সেখানে এই বনের অনেক প্রাণীদের ধরে নিয়ে বন্দী করে রেখে মজা করে। বটু, বংটুর কথা শুনে চলে যায়। এদিকে বংটু তো বটুর কথা ভুলেও যায়। ছিপ দিয়ে মাছ ধরতে বসলে বংটুর আবার কিছু মনেই থাকে না। তাজা মাছ মা যখন ভেজে দেয় উফ্ কি যে স্বাদ। আজ অনেকগুলো মাছ ধরেছে সে। হঠাৎ বংটুর খেয়াল হয় বিকাল প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। চেয়ে দেখে আশেপাশে বটু নেই। তবে কোথায় গেল সে। বংটু উঠে দাঁড়ায়। বটুকে খুঁজতে যায়। ততক্ষণে সন্ধ্যা নেমে এসেছে বনে । বনের পথ ঘাট বংটুর চেনা। সে পথেই বংটু— বটুকে খুঁজতে লাগল । অনেক খোঁজাখঁজি করল। খুঁজে পেল না কোথাও। এমন কি যেখানে বংটু আর বটু রোজ পলান টুক টুক খেলতো সেখানেও। তবে কি হল বটুর? বংটু ভাবনায় পড়ে গেল। একা একা হাঁটতে লাগল বাড়ির পথে। সেখানেই দেখা পেল বটুর মার। বটুর মা বংটুকে দেখে সুঁড় নাড়িয়ে কেঁদে ফেলল। বংটুর তখন বুঝতে বাকি নেই। বংটুও কেঁদে ফেলল মনে হল- ইস্ কি ভুল আজ সে করেছে। নিশ্চয়ই তার জন্যেই বটুকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তবে কি বটুকে কোনো নিষ্ঠুর শিকারির দল ধরে নিয়ে গেছে। ভয় করে ছোট্ট বংটুর। আর কী দেখা পাবে না সে খেলার সাথী ছোট্ট হাতী-বটুর!

Comments

comments

এহসান হায়দার

এহসান হায়দার

এহসান প্রকৌশলী রূপে পড়াশোনা করলেও, পেশায় সাংবাদিক। জন্ম-৩০ মার্চ। জন্মস্থান খুলনা, বসবাস করছেন ঢাকায়। এহসান বর্তমানে ‘রূপকথা’ নামে একটি শিশু-কিশোর পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। নিজেকে পরিচয় দেন ছোটকাগজ কর্মী হিসেবে। কারণ, কবিতা প্রবন্ধ এই ছোটকাগজেই ছাপতে ভালো লাগে। একান্ত ইচ্ছে শিশুদের জন্যে একটি নতুন ধরনের জগত তৈরি ‌‍করা। ছেলেবেলায় শিশুসাহিত্যর প্রতি যে আগ্রহ জন্মেছিল তা থেকে দূরে যাওয়া যায়না- আর তাই শিশুদের নিয়ে লিখতে ভালো লাগে। ইমেল : shubornoarjo@gmail.com

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি