সাম্প্রতিক

মুজিব ইরম প্রণীত শ্রীহট্টকীর্তন

মিনতি রাখো গো তুমি, আমারেও নিও তোমার কীর্তনিয়ার দলে…তুমি ছাড়া কে আর বুঝবে বলো অধমের মন…ভাঙ্গাচুরা তাল, ভাঙ্গা গলা, ভাঙ্গা গীতি, সুরকানার কদর…তোমার বাজুতে শুধু দিনমান রেখো তুমি…বিবাগী মন্দিরা হয়ে তোমার দেহেতে আমি মিশে যেতে চাই গো অধম ভেকের ফকির…শুধু তোমার দলের গুণে যদি মায়া পাই…যদি লোকে বলে আমিও সুরের লোক, কীর্তনিয়া, তোমার ছায়ায়…এই ভাবে তোমার চরণ পাশে, দেহতলে, মাটিতে লুটাবো মন ঘরকানা এই ছদ্ম কবিয়াল…আমাকে রাখো গো তুমি সুরের দয়ায়।— ইরমের কবিতা পড়ে পাঠক কী নেয় জানি না, আমি না হয় আমারটাই বলি। ইরমের বন্দনায় কতো-কতো দিন দেখেছি নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আছে, তারও আগে বন্ধ হয়ে গেছে চোখের পাতা, কেনো যে এতো দীর্ঘশ্বাস নিতে হয়রে ইরম বুঝি না। ভেতরের চিৎকার গুলো এতো নিঃশব্দে কান্নায় জড়িয়ে যায়…এতো এতো কুলাহয় অথচ তার কোনো খবরই রাখে না। ‘মা’ এর আঁচলের গন্ধ নিতে ইরমকে পড়া যায়।—রাশপ্রিন্ট

FullSizeRender copyবন্দনা

প্রথমে বন্দনা করি গ্রাম নালিহুরী। ছাড়িয়াছি তার মায়া যেন কাটাঘুড়ি ॥ পরেতে বন্দনা করি আকাশ পাতাল। পিতামাতা দেশ ছাড়া হয়েছি মাতাল ॥ পুবেতে বন্দনা করি নাম তার মনু। এমনি নদীর রূপ উছলে ওঠা তনু ॥ উত্তরে বন্দনা করি শ্রীহট্ট নগর। সে তো থাকে মন মাঝে অনন্ত অনড় ॥ পশ্চিমে বন্দনা করি লেখাবিল নাম। এ-জীবন তার তরে তুলেছি নিলাম ॥ দক্ষিণে বন্দনা করি নাম শ্রীমঙ্গল। দেখিয়াছি টিলারূপ কুহকী জঙ্গল ॥ মৌলভীবাজার-কথা কী কহিবো আর। সে তো জানি প্রাণসখা বন্দনা অপার ॥ চারদিক বন্দি শেষে মন করি স্থির। ধরিয়াছে এই দেহ দেশের জিকির ॥ বন্দনা করিয়া সারা মধ্যে করি ভর। আসো গো কবির সখা বৈদেশ নগর ॥ ভিনবাসে ঘুরিফিরি তিষ্ঠ ক্ষণকাল। পয়ারে মজেছে মন বাসনা বেহাল ॥ পদ্য বাঁধি গদ্য বাঁধি সুরকানা আমি। ইরম হয়েছে ফানা জানে অন্তর্যামী ॥

জাতক

কতো না ঘুরেছি পথ ছদ্মবেশে, দেশে দেশে, নগরে নগরে…এই ভেক, এই মিছা আবরণ খুলে ফেলো…এই নামে ডাকো তুমি ডাকিবার ইচ্ছা যদি হয়…তুমি তো ডেকেছো কতো মায়াময় নামে…কতো রূপে হয়েছি হাজির…কতো নামে সাড়া দিতে হয়েছি অধীর…আমাকেও ডাকো তুমি নকলী অভিধায়…মনে লজ্জা পাই…আমাকেও দেখে কেউ বাস করি বৈদেশ নগর…আমাকেও দেয় খোঁটা—সোনা ছেড়ে খাদ বাছি, ছেড়ে আসি বাস্তুভিটা, ছেড়ে আসি ঘর…এত এত ডাকনাম, এত এত রূপে ডাকাডাকি…ইতা আমি লিখে রাখি তেমনি আবার—আর কোনো নাম নাই লেখা এই বুকে, আমিও সিলট্যা লোক জানে সর্বলোকে!

কীর্তনিয়া

মিনতি রাখো গো তুমি, আমারেও নিও তোমার কীর্তনিয়ার দলে…তুমি ছাড়া কে আর বুঝবে বলো অধমের মন…ভাঙ্গাচুরা তাল, ভাঙ্গা গলা, ভাঙ্গা গীতি, সুরকানার কদর…তোমার বাজুতে শুধু দিনমান রেখো তুমি…বিবাগী মন্দিরা হয়ে তোমার দেহেতে আমি মিশে যেতে চাই গো অধম ভেকের ফকির…শুধু তোমার দলের গুণে যদি মায়া পাই…যদি লোকে বলে আমিও সুরের লোক, কীর্তনিয়া, তোমার ছায়ায়…এই ভাবে তোমার চরণ পাশে, দেহতলে, মাটিতে লুটাবো মন ঘরকানা এই ছদ্ম কবিয়াল…আমাকে রাখো গো তুমি সুরের দয়ায়।

শ্রীহট্টগীতিকা

সুরমা ধলাই মনু কুশিয়ারা নদী, আমাকে ছাড়াই তারা বয় নিরবধী ॥ ফুটে ফুল হিজলের করচের ডালে, কলমি কদম ফুল বারিষার কালে ॥ দিন আসে দিন যায় হুহু করে বুক, কী যেন কী মায়ারূপ দেখেছিলো চোখ ॥ ঘুরিয়া অনেক পথ পন্থহীন হই, ধরিয়া অনেক ভান যেই-সেই রই ॥ বৈদেশ নগরে থাকি কাদাজলে লোক, আমাকে পেয়েছে দেখো শৈশব অসুখ ॥ প্রবাসে দৈবের বশে গীত নিয়া বাঁচি, আমি তো শীতের দেশে শীত হয়ে আছি ॥ আমাকে রাখিও তুমি রেখেছো যেমন, বৈদেশ বসিয়া গায় মুজিব ইরম ॥

Comments

comments

মুজিব ইরম

মুজিব ইরম

মুজিব ইরম-এর জন্ম বাংলাদেশের মৌলভীবাজার জেলার নালিহুরী গ্রামে, পারিবারিক সূত্র মতে ১৯৬৯, সনদ পত্রে ১৯৭১। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাসাহিত্যে স্নাতক সম্মান সহ এমএ। এ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে তার ১৩টি কাব্যগ্রন্থ: মুজিব ইরম ভনে শোনে কাব্যবান ১৯৯৬, ইরমকথা ১৯৯৯, ইরমকথার পরের কথা ২০০১, ইতা আমি লিখে রাখি ২০০৫, উত্তরবিরহচরিত ২০০৬, সাং নালিহুরী ২০০৭, শ্রী ২০০৮, আদিপুস্তক ২০১০, লালবই ২০১১, নির্ণয় ন জানি ২০১২, কবিবংশ ২০১৪, শ্রীহট্টকীর্তন ২০১৬, চম্পূকাব্য ২০১৭। উপন্যাস/আউটবই: বারকি ২০১১, মায়াপীর ২০০৯, বাগিচাবাজার ২০১৫। গল্পগ্রন্থ: বাওফোটা ২০১৫। শিশুসাহিত্য: এক যে ছিলো শীত ও অন্যান্য গপ ২০১৬। এছাড়া প্রকাশিত হয়েছে ধ্রুবপদ থেকে মুজিব ইরম প্রণীত কবিতাসংগ্রহ: ইরমসংহিতা ২০১৩, বাংলা একাডেমি থেকে নির্বাচিত কবিতার বই: ভাইবে মুজিব ইরম বলে ২০১৩, Antivirus Publications, Liverpool, England থেকে নির্বাচিত কবিতার অনুবাদ গ্রন্থ: Poems of Mujib Erom 2014, ধ্রুবপদ থেকে উপন্যাসসমগ্র: মুজিব ইরম প্রণীত আউটবই সংগ্রহ ২০১৬। ## পুরস্কার: মুজিব ইরম ভনে শোনে কাব্যবান-এর জন্য পেয়েছেন বাংলা একাডেমি তরুণ লেখক প্রকল্প পুরস্কার ১৯৯৬। বাংলা কবিতায় সার্বিক অবদানের জন্য পেয়েছেন সংহতি সাহিত্য পদক ২০০৯, কবি দিলওয়ার সাহিত্য পুরস্কার ২০১৪। কবিবংশ কাব্যগ্রন্থের জন্য পেয়েছেন ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার ২০১৪। শ্রীহট্টকীর্তন কাব্যগ্রন্থের জন্য পেয়েছেন সিটি-আনন্দ আলো সাহিত্য পুরস্কার ২০১৬।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: 

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি