সাম্প্রতিক

একটি কবিতা পুনর্পাঠের পর ব্যক্তিগত ও নৈর্ব্যক্তিক অনুবাদ । ফজলুররহমান বাবুল

     স্বপ্ন আমার কবিতা,
.      অমাবস্যার দেয়ালি,
     ধূম্রলোচন নিদ্রাহীন
.       মাঘরজনীর সবিতা।
.                       – বিষ্ণু দে

ঘোর বৃষ্টিতেও কবিতার জন্ম হয়;-হয় ভালোবাসা সংগোপনে, ধনধান্যপুষ্পভরা আমাদের এই মর্ত্যলোকে। ভালোবাসা বিচিত্র আসক্তি আর আমিও ভালোবাসি কবিতা; ভালোবাসি নদীর স্রোত, বসন্তের দখিনা বাতাস… এবং ভালোবাসি ঘুমনগরীর রাজকুমারীর সঙ্গে দেখা করতে।

কবিতাকে কেউ ভাবতে পারেন উষ্ণ সময়ের অপচয়। আমি ভালোবাসি কবিতা আর কুয়াশায় ভেজা গুচ্ছ-গুচ্ছ ঘাস; ভালোবাসি ঝরা বকুল। হেমন্তের কুয়াশা-ঝরা রাতের সমস্ত ভালোলাগা হতে পারে আমার কবিতা। কখনও রাত ঘনিয়ে এলে কুয়াশার ভিতরে যখন দু’একটি বাদুড় ডানা ঝাপটায় তখন তেতো কিংবা মিষ্টি কবিতা সঙ্গোপনে হাসায়, রক্তে জ্বলে জোনাকি।

কবিতার ভিতরে চাঁদ কাঁপে, রুপালি জ্যোস্নার ঢেউ ওঠে উপমায় ছন্দে চিত্রকল্পে, রূপে, রসে…

অজস্র কবিতা চাই তখন আমি, যখন একা থাকি। যদি ঢুকে পড়ি কোনো কাননে তখনও দরকার থাকে, অলস মুহূর্তেও দরকার পড়ে তার। অন্য কারো কথা আমি জানি না, বিশ্বচরাচরে কবিতা না-থাকলে মাঝেমধ্যে নিজের ছায়ার সাথেই কথা বলতে হতো আমার। আমি প্রয়োজনে কিংবা অপ্রয়োজনে হারাতে পারি কবিতার কাননে। কবিতা এক মায়াবী অসুখ আমার।

কবিতা শুধু নয় চলন্ত বাসের জানালা দিয়ে দেখা শস্য-শ্যামল প্রান্তর কিংবা হৃদয়ের উচ্ছ্বাস মাত্র। কবিতা বলতে বুঝি আত্মার সুর, হৃদয়ের দোলা;-কবিতা পিপাসায় তপ্ত হয়ে ভালোবাসার ভিতর হৃদয় দিয়ে কিছু নক্ষত্রকে ধরা।

এই বোধ/উপলব্ধি কিংবা অনুভব এই বিশ্বচরাচরে একান্তই কি শুধু আমার? বাল্মীকি, ব্যাস, দান্তে, হোমার, শেলী, বায়রন, কীট্স, লোরকা, রিলক্, র্যাঁবো, কাহলিল জিবরান, ইয়েট্স কিংবা পাবলো নেরুদার আত্মাও ছুঁতে পারিনি আমি; কথাও বলিনি তাঁদের সাথে;-অথচ উন্মত্ত নদীর স্রোতসম তাঁদের মতো আরো কত কবি কবিতার ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকেন আমার চারপাশে; কেউ-কেউ কথা বলেন, কেউ হাসেন, কেউ বা কাঁদেন।

বহু শতাব্দী পূর্বে এথেন্স যাবার পথে দুজন কবির যেমন দেখা হয় তেমনি দেখা হবে অন্য কোথাও একজন কবি এবং তাঁর কবিতার পাঠকের? ঐ কবি টি এস এলিয়ট হলে পোড়ো জমির গন্ধ শুঁকে দেখতে পারবেন কি না পাঠকের শরীরে? একজন কবি চেশোয়াব মিউশ কিংবা নিকানোর পাররা হয়তো তাঁর পাঠককে জিজ্ঞেস করতেও পারেন, আজকাল কী পড়ছেন আপনি?

যদি এমন হয়, মন্দ কী!

জানি না আমিও কেন লিখতে চাই কথা, যা হয়ে উঠবে কবিতা; কিন্তু কথারা পালিয়ে যায় দূর অজানায়; যেন আমি বাঘ না ভলুক-যেন আমি খেয়ে ফেলবো কথার হাড়মাস। তেমন শব্দ/কথা কোথায় পাই যে শব্দ/কথা নদীর মতো দূরের সমুদ্রে নিজেরে হারাতে পারে? লিখতে চাই তড়িঘড়ি করে, লিখতে চাই ধীরে ধীরে, প্রায়শই হয়ে ওঠে না; আলো জ্বলে না।
… … …

বিশ শতকে কত কাব্য ও কবিতা, যুদ্ধ ও ভালোবাসার কবিতা, গ্রীষ্ম শরৎ হেমন্ত কিংবা বসন্তের কবিতা! সব কবিতা নেহাতই সাধারণ নয়; অন্যদিকে সবই নয় অসাধারণ। কোনো-কোনো কবিতা যখন পড়ি তখন নিজের ভিতরে হেসে ওঠে কেউ; এবং মনে-মনে বলি, ‘দূর! ছাইভষ্ম!’ ক্ষুধায় ক্ষিপ্ত হই-যখন হৃদয়ের গভীরে শব্দহীন গান না-বাজে। কবিতায় পাই আমার দেশ, আমার পৃথিবী; কবিতায় পাই আমার স্বপ্ন, ভালোলাগা চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা।

‘ঘুমের রানী’ কবিতায় ঘুমনগরীর রাজকুমারীর সঙ্গে যেমন একজন কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের দেখা হয় সন্ধ্যাবেলায় ঝাপসা ঝোপের ধারে, তেমনি আমারও দেখা হয়; তার পরনে থাকে হাওয়ার কাপড়, ওড়না ওড়ে অঙ্গে। কবি কখনও কখনও তাঁর লেখায় আমার নিজের কথাটাই বলেন। কখনও কবি বলেন আর আমি শুনি; মাঝে-মাঝে দেখিও। পরিচিত ও অপরিচিত দৃশ্যের ভিতরে কিছু-কিছু জানালা খুলে যায়; কেঁপে ওঠে হৃদয়ের রজনীগন্ধা,-যখন কবি বলেন :

দেখা হোলো ঘুমনগরীর রাজকুমারীর সঙ্গে
সন্ধ্যাবেলায় ঝাপসা ঝোপের ধারে,
পরনে তার হাওয়ার কাপড়, ওড়না ওড়ে অঙ্গে,
দেখলে সে রূপ ভুলতে কি কেউ পারে।

চোখ দুটি তার ঢুলু ঢুলু মুখখানি তার মিঠে
আফিম ফুলের রক্তিম হার চুলে;
নিঃশ্বাসে তার হাসনুহানা, হাস্যে মধুর ছিটে,
আলগোছে সে আলগা পায়েই বুলে।

এক যে আছে কুজ্ঝটিকার দেওয়াল-ঘেরা কেলা,-
মৌনমুখী সেথায় নাকি থাকে।
মন্ত্র পড়ে বাড়ায় কমায় জোনাক পোকার জেলা,
মন্ত্র পড়ে চাঁদকে সে রোজ ডাকে।

তুঁত পোকাতে তাঁত বুনে তার জানলাতে দেয় পর্দা
হুতোম পেঁচা প্রহর হাঁকে দ্বারে,
ঝর্নাগুলি পূর্ণচাঁদের আলোয় হয়ে জর্দা
জলতরঙ্গ বাজনা শোনায় তারে।

কালো কাঁচের আর্শিতে সে মুখ দেখে সুস্পষ্ট,
আলো দেখে কালো নদীর জলে।
রাজ্যেতে তার নেইকো মোটেই স্থায়ী রকম কষ্ট,
স্বপন সেথা বেড়ায় দলে দলে।

সন্ধ্যাবেলায় অন্ধকারে হঠাৎ হোলো দেখা
ঘুমনগরীর রাজকুমারীর সনে,
মধুর হেসে সুন্দরী সে বেড়ায় একা একা,
মূর্ছা হেনে বেড়ায় গো নির্জনে।

‘কাব্যে আমরা আপনাকে জানি।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা। রবীন্দ্রনাথ এও বলেছেন, ‘আমরা যতক্ষণ আপনাকে আপনার মধ্যে বদ্ধ করিয়া দেখি ততক্ষণ আপনাকে পুরা জানি না।’ আমাদের প্রয়োজন নিজেকেই নিজের ভিতর থেকে বের করে আনা। নিজেকে নিজের ভিতর থেকে বের করার উদ্দেশ্যেই আমি অন্যদের কাছে যেতে চাই। আমি যখন অন্যদের কবিতা পাঠ করি তখন এটুকুও মনে রাখি যে, উপলব্ধি/অনুভবই দিয়েই আত্মস্থ করতে হবে ঐ কবিতাকে। কোনো-কোনো কবিতা শুধু উপলব্ধি কিংবা অনুভবই করি না, চোখ দিয়েও দেখি। সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘ঘুমের রানী’ পাঠেও যেন চোখে অনেক কিছু দেখি। ভালোলাগায় হৃদয় ভরে যায়। এখানে শব্দ/বাক্যসামঞ্জস্য, বাক্রীতি, উপমা, ছন্দ কিংবা বিষয়কেন্দ্রকে ইঙ্গিত করছি না; এইসব অনুসন্ধান বিজ্ঞ কাব্যালোচক কিংবা নন্দনতাত্ত্বিকেরাই ভালো করবেন। আমি ইঙ্গিত করছি শুধুই পাঠ-উত্তর সরল ভালোলাগার। কবিতাটি পড়ি, মুগ্ধ হই। ভালোলাগা আরো অনেক কবিতার মতো ‘ঘুমের রানী’ কবিতাটির সরল পাঠ শুরু করলে শেষ না-করা পর্যন্ত আর কোনো অবসর নেই। সাহিত্যিক ও সামাজিক ইতিহাস থেকে এবং কবির জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে শুধুমাত্র একটি নির্মিতি হিসেবে যতবার পাঠ করি ততবারই যেন আচম্বিতে দেখি এক ঘুমনগরীর রাজকুমারীকে। এই দেখা প্রতিবারই নতুনরূপে দেখা, ঘুরে-ঘুরে ফিরে-ফিরে দেখা (রাজকুমারীর সাথে হয়তো কালেভদ্রে, কদাচিৎ দেখা হয়, কিন্তু বাস্তবের দেখা আর কবিতার দেখা কি এক?)

এমন কবিতাও তো পড়তে হয় প্রায়শ-যে কবিতার পাঠ শুরু করলে মনে হয় কোনোরকমে শেষ করতে পারলে বাঁচি। ভালো কবিতা পাঠক পড়লে নিজেও টের পান না-পড়া শেষ হয় কখন; অন্যদিকে জীর্ণ কবিতার পাঠ শুরু করলে শেষ হতে চায় না যেন।

সৌভাগ্য, বিশ এবং একুশ শতকে বার বার পাঠ করার মতো বাংলা ভাষায় অনেক উজ্জ্বল/উচ্ছল কবিতা পেয়েছি আমরা ।

শৈশবে ও কৈশোরে কত উজ্জ্বল কবিতার দোলনা পেয়েছি; হৃদয় দুলেনি;-যেহেতু উপলব্ধির আয়নায় ধরা পড়েনি কত-কিছু; এখন সবকিছু উপলব্ধি করি তা-ও নয়।

শুধু-শুধু শব্দের বুদ্বুদ নয়, প্রকৃতার্থে কবিতা লিখতে চাই আমিও;-হয়ে ওঠে না। ভাবি, ধ্যান করি, ভাষার শব্দ আর ছন্দের দৃঢ় সম্মীলন হয় না। নক্ষত্রালোকে ওড়ি; নিজেই নিজেকে নগ্ন করি; হয় না হৃদয়-কাঁপানো কিছু। হৃদয়-কাঁপানো কথা লিখতে পারি না; শব্দের গাঁথুনিতেই কবিতার অবয়ব তৈরি হয়, কবিতা শব্দেরই বিন্যাস; কিন্তু লেখা হয়ে ওঠে না শ্যামসুন্দর শব্দগ্রহ/শব্দতরঙ্গ। কবিতা লিখে আমি তৃপ্ত হতে পারি না। অতৃপ্তিটা থেকেই যায়। কবিতাকে আমি দৈব কিছু ভাবি না। হৃদয়ের অতলে বিরহব্যথা জাগে; হৃদয়ের অতলে খোঁড়াখুঁড়ি করি কিংবা ঝরাপাতা কুড়াই এই আশায়, যদি দেখা হয় আমার ঘুমনগরীর রাজকুমারীর সঙ্গে; কিন্তু আমি অনুকরণ করতে চাই না সত্যেন্দ্রনাথের ‘ঘুমের রানী’ কিংবা অন্য কোনো কবিতাকে।

 পুনশ্চ :

মোট চব্বিশ লাইনে লেখা বিবরণধর্মী এই কবিতাটির আলোচনা/পর্যালোচনার উদ্দেশ্যে এই রচনায় উদ্বুদ্ধ হইনি আমি। তবে কেন এলোমেলো কথার ঘোরপাকে জড়ালাম? এর উত্তর এই যে, শ্রেফ ভালোলাগায়; একটা ভালোলাগা কবিতার প্রতি ভালোবাসার প্রকাশে। আরেকটা প্রশ্ন এখন আমার নিজের ভিতরেই উঁকি দিচ্ছে। অন্য কোনা কবিতা নেই যা আমার ভালো লাগে? আছে। আপাতত ‘ঘুমের রানী’ পড়েই কিছু লিখতে মন চাইলো। ‘ঘুমের রানী’ কবিতাকে এই রচনার উৎসবিন্দু হিসেবে ধরে নেয়াটাই শ্রেয়সী মনে করি।

বাংলা কবিতার ইতিহাসের দিকে চোখ রাখলে আমরা দেখি যে, রবীন্দ্রযুগে (রবীন্দ্রপ্রতিভার ছায়াতলে) সত্যেন্দ্রনাথের মতো রবীন্দ্রপ্রভাবে প্রভাবিত হয়েছেন আরো কয়েকজন কবি, যেমন-সতীশচন্দ্র রায়, কুমুদরঞ্জন মলি¬ক, কিরণধন চট্টোপাধ্যায়, সাবিত্রীপ্রসন্ন চট্টোপাধ্যায়, কালিদাস রায় সহ আরো অনেকেই। এঁদের মধ্যে আবার সবচেয়ে জনপ্রিয় ও নেতৃস্থানীয় ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ (যদিও সতেন্দ্রনাথের কবিতা আগের মতো আজ আর পঠিত হয় না)। এই কবিগোষ্ঠী তাঁদের কবিতাকে রবীন্দ্রবৃত্ত থেকে বের করে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন নি কিংবা করলেও লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেননি। যৌবনেই এঁরা রবীন্দ্রনাথের কাব্যমাধুর্যে এতটাই অনুরক্ত হয়ে পড়েছিলেন যে, তার ফলাফল হলো অনিবার্য অনুকরণ। বাংলা কবিতার বাহিরে বিদেশি ভাষার কবিতার প্রতি প্রত্যক্ষ ইন্দ্রিয়ময় জগতের শিল্পী সত্যেন্দ্রনাথের কৌতূহল ছিল যথেষ্ট; পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন ভাষার অনুবাদও করেছেন অনেক; কিন্তু রবীন্দ্রবৃত্ত থেকে নিজের কবিতাকে মুক্ত করতে পারেন নি। তাঁর কবিতায় নিসর্গ ও স্বদেশপ্রেম, মানবতাবাদ ও ঐতিহ্যানুরাগের স্বাক্ষর রয়েছে যথেষ্ট। প্রত্যক্ষ জীবনের সাথে রোমান্টিক আমেজের সেতুবন্ধন, ক্লাসিক ভাবসৌন্দর্যের পাশে লিরিক আবহ তাঁর কবিতার দ্যুতিময়তাকে প্রসারিত করেছে। এছাড়া ছন্দনির্মিতি, চিত্রকল্প রচনায়ও তাঁর দক্ষতা কাব্যালোচকদের প্রসংশা পেয়েছে প্রচুর।

‘সন্ধিক্ষণ’, ‘বেণু ও বীণা’, ‘হোমশিখা’, ‘ফুলের ফসল’, ‘কুহু ও কেকা’, ‘অভ্র-আবির’ ইত্যাদি কাব্যগ্রন্থের রচয়িতা সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের আয়ুষ্কাল ছিল মাত্র চলি¬শ বৎসর (১৮৮২-১৯২২)। কিন্তু বাংলা কবিতায় বিশ শতকের গোড়ার দিকে (রবীন্দ্রযুগে) সত্যেন্দ্রনাথের আবির্ভাব এবং প্রতিষ্ঠা স্বকীয়, বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ছিলো। সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর সময়ে (রবীন্দ্র কবিপ্রতিভার ছায়াতলে স্বকীয় বিশিষ্টতায়) বাণীসৌন্দর্য, রোমান্টিক আবহ, ছন্দ ও চিত্রকল্পের বৈচিত্র্যতায় পাঠক-সমাজের একটা বড় অংশের হৃদয় হরণ করেতে পেরেছিলেন।

আজকের কবিতার কারিগরেরা, সত্যেন্দ্র্রনাথ দত্তের ‘ঘুমের রানী’, জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ কিংবা সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘উটপাখী’র মতো আরো কবিতা লিখবেন তা বলার অবকাশ নেই; স্বাতন্ত্র্যই তাঁদেরকে পাঠকের মঞ্চে প্রশংসনীয় করে তুলবে। এই। তাঁদের লেখায় থাকবে উজ্জ্বল চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা যৌক্তিকতায় তাঁদেরই মতো। বিষয়কেন্দ্র যা-ই হোক কবি তাঁর সমগ্র জীবনব্যাপী একটা নতুন ফর্ম/কণ্ঠস্বরের লক্ষ্যেই পথের খোঁজ করেন; কেউ পথ পেয়ে যান, কেউ পান না। রবীন্দ্রউত্তর কবিদের মধ্যে নতুন কণ্ঠস্বরের সাধনায় সবচেয়ে সফল কবি জীবনানন্দ দাশ। অবশ্য জীবনানন্দের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঝরা পালক’-এ সত্যেন্দ্রনাথ ও নজরুল এর প্রভাবের উল্লেখ রয়েছে কোনো-কোনো আলোচনায়। ‘ঝরা পালক’-এর পরবর্তী পর্যায় থেকেই শুরু হল জীবনানন্দের ভাষার নিজস্বতা, কণ্ঠস্বরে স্বকীয়তা; রবীন্দ্রউত্তরকালের বাংলা কবিতার পাঠক দেখা পেলো নতুন পথের; বিশিষ্টতায় উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর ও প্রসংশিত হলেন জীবনানন্দ।

কবিতার কারিগরদের নতুন প্রজন্মের কবি সহ শ্রদ্ধেয় কবিদের কবিতারাজি পুনর্পাঠ সবসময়ই জরুরি বলে মনে করি। সময়ে-সময়ে নিজের লেখার পুনর্পাঠ দরকার। অন্যদের ভালো কবিতার পুনর্পাঠ দরকার অনুকরণ নয় নিজের দুর্বলতাকে উপলব্ধির জন্যে। কবির হয় না কিছুই যদি কবিতা না-হয়। আজকের কবিরা মঙ্গলকাব্যও রচনা করেছেন না যে, স্বপ্নযোগে দেবীকে দর্শন করে মহৎ কাব্য রচনা করার অনুপ্রেরণা লাভ করবেন; মহৎ কিছু লেখার জন্যে অদম্য আগ্রহের সাথে পঠন ও অনুশীলন দরকার। অনুশীলন ছাড়া প্রতিভারও উৎকর্ষ হয় না। অদম্য আগ্রহ এবং অনুশীলন ছাড়া মাত্র একুশ বছর বয়সে ফরাসি কবি জাঁ আর্ত্যুর র্যাঁবোর ‘নরকে এক ঋতু’র মতো চমক সৃষ্টিকারী কাব্যগ্রস্থ প্রকাশিত হতে পারতো কিনা জানি না। ইয়েট্স-এর ঞযব ঈধঢ় ধহফ নবষষং কবিতাটির পুরোটাই নাকি স্বপ্নলব্ধ। বাংলাভাষার কবি বিষ্ণু দে ১৯৩৫ সালের এক ভোরে জ্বরাক্রান্ত অবস্থায় লিখতে পেরেছিলেন জনপ্রিয়/আলোচিত কবিতা ‘ঘোড়সওয়ার’-এর প্রথম অংশ। লেখার পর ঘুমিয়ে পড়লেন; ঘুম থেকে উঠে আবার লিখলেন দ্বিতীয় অংশ; এরকম ঘটনা তো হামেশাই ঘটে না কবির জীবনে।

Comments

comments

ফজলুররহমান বাবুল

ফজলুররহমান বাবুল

জন্মসাল ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দ। জন্মমাটি ও বাসস্থান সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলাধীন উত্তর-মিরেরচর, মালদারবাড়ি। মাঝেমধ্যে কবিতাবিষয়ক প্রবন্ধ-নিবন্ধ লেখেন। মূলত কবি। 'ঋতি' নামের একটি কবিতার কাগজ সম্পাদনা করেছেন কিছুদিন। বই, ভ্রমণ এবং নিসর্গপ্রেমী। প্রকাশানুক্রমে ফজলুররহমান বাবুল বিরচিত কবিতাবইগুলো : ঋণী হবো সোহাগী জলে (১৯৯৯), সখিকাব্য (২০০৪), সপ্তস্ফুট (২০১২), থেঁতো ফর্দ (২০১৪)।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: , , ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি