সাম্প্রতিক

জলপাই গাছঘেরা বাড়ির বৃত্তান্ত । মুরাদুল ইসলাম

আমাদের জলপাই গাছ

আমাদের বাড়িতে একটা জলপাই গাছ লাগানো হয়েছিল
দাদা বললেন, ‘উত্তুরে হাওয়া এসে উড়িয়ে নেবে ঘরের চালা’
তাই গাছটা থাকুক, বড় হোক
আটকে দেবে বাতাসের জোর, ভাঙবে না দরজার তালা
দিনে দিনে সেই জলপাই গাছ বড় হলো
চারিদিকে মেললো ডালপালা

ঘন সবুজ পাতা তার, সবুজ সবুজ টক টক ফল
আমাদের রসনা বিলাস, জলপাই খেলে নাকি বাড়ে মনোবল
বড় হতে হতে গাছটি ঘরের চালার উপর উঠে গেল
ঘিরে ফেলল আমাদের পুরোটা বাড়ি
শক্ত ঝুলন্ত মূল বের হলো তার ডাল থেকে
পেঁচিয়ে ফেললো আমাদের বাড়ি

কেউ কেউ তখন বললেন, ‘এ কেমন গাছ? বটগাছ নাকি?’
দাদা ছিলেন না তখন
গাছটা মাঝে মাঝে দানবের মতো নড়ে উঠত সকাল-বিকাল
কারো সেদিকে তেমন দৃষ্টি ছিল না
ঘরের চালায় গাছের শক্ত বিস্তার দেখে
পিতা বললেন, ভালোই হলো, ‘বাড়িটা টিকে যাবে দীর্ঘকাল’
ভালোই চলছিলো সব

তারপর একদিন গাছটা তুলে নিলো রোদে শুকাতে দেয়া কাপড়চোপড়
রঙিন স্যান্ডেল, পিতার শাদা পাঞ্জাবি ও ঘরের দুয়ার
হতবাক হয়ে সেদিন আমরা নামলাম গাছ কাটতে
কিন্তু ততদিনে অনেক বিশাল সে
শক্ত অতি
তাকে কাটার মতো কুড়াল
কোথাও পাওয়া যায় না।

পাহাড়ের সাথে কথোপকথন

চলো পাহাড় আরেকটু দূরে চলে যাই
এখানে আমার আর ভাল্লাগে না
খারাপই লাগে
যখন শুনি আব্দুল মজিদের ছেলে
ও-পাড়ার সাইফুদ্দিনের ছেলেকে বিষ খাইয়ে খুন করার পর
পোস্টমর্টেম রিপোর্টে আসে “সাইফুদ্দিনের বড় ছেলে মহিউদ্দিন অবেলায় একগ্লাস মধু খাইয়া মারা গিয়াছে”
কোর্টে মামলা চলে
আব্দুল মজিদের অবৈধ টাকা কিছুটা কমে যায়
আর একদিন শোনা যায় তার ছেলে বেকসুর খালাস পেয়েছে
কিছুদিন পরে ছেলেটাকে ব্যাট হাতে দেখা যায় মাঠে
এবং আব্দুল মজিদের ছেলেরা এরপর থেকে বিষের বোতল পকেটে নিয়ে হাঁটে

বস্তিবাসী

তাদের ঘরবাড়ি নাই
উঠান নাই
শিক্ষাদীক্ষা নাই
ফকিন্নি সব
মানুষই না আসলে
ফকিন্নি-ফকিন্নি চেহারা
ফকিন্নি-ফকিন্নি কাপড়চোপড়
বই পড়ে না
শাস্ত্রীয় সংগীত শুনে না
ছি! ছি! কত আনকালচার্ড এরা
দুইটা ভালো ফিল্মও দেখে নাই
আমাদের সাথে থাকে অবশ্য
একই শহরে
উটকো ঝামেলাটাইপ ব্যাপার
পাশ দিয়ে গেলে গন্ধ লাগে নাকে
তাই আমাদের বেশি বেশি পারফিউম খরচ হয়
এরাই অসুখের মূল
একটা ভালো শহরে
সুন্দর শহরে
আমাদের মতো কালচার্ড
ফিল্ম দেখা, বই পড়া
স্প্যানিশ লিগ, ইংলিশ লিগ দেখাদের শহরে
এরা কেন থাকবে?
তুচ্ছ, নগণ্য, ফকিন্নিরা সব
এদের জ্বালিয়ে দাও।

মধ্যবিত্ত বিনোদন

বিজ্ঞাপনে সুন্দরী মহিলা চায়ের কাপ হাতে দাঁড়ায়।
ও মাবুদ! তাদের সেই গোছানো ঘরবাড়ি!
মহিলার হউরের মুখে খান জাহান আলী কালের গোঁফ
আর আছে মহিলার জামাই, পোলা
এবং হরি
সবাই কেমন যেন সুন্দর করে চা খায়।

পরিষ্কার শহর চাই

আমাদের শহরের সৌন্দর্য
হকারেরা খাইয়া যায়
তারা আম জাম ইত্যাদি ফল
চানাচুর বাদাম ইত্যাদি আজেবাজে জিনিস
এবং আরো কি কি যেন লইয়া বসে
অবৈধ চুদিরভাই সম্প্রদায়
এরা যানজটের মূলে
এরা রাস্তা খাইয়া যায়

যেসব গবেষকেরা বলেন প্রাইভেটকারই যানজটের কারণ
যেসব লোকেরা প্রশ্ন করেন গরিবের দেশে এত প্রাইভেট কার কেন
তাদের কথায় কান দেই না আমরা ভদ্রলোক
ওসব শুনতে আমাদের বারণ

আমরা চাই পরিষ্কার টাউন
নীল গাউন
শিক্ষিত-শিক্ষিত ভদ্রলোকের বেশ
হকারমুক্ত দেশ

Comments

comments

মুরাদুল ইসলাম

মুরাদুল ইসলাম

মুরাদুল ইসলামের জন্ম সিলেটের জগন্নাথপুরে। লেখালেখি করেন। গল্প, কবিতা, সাহিত্য নিয়ে নিবন্ধপ্রবন্ধও। প্রকাশিত গল্পবই ‘মার্চ করে চলে যাওয়া একদল কাঠবিড়ালী’। লেখকের ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট www.muradulislam.me Email : muradt20@gmail.com

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

Tags: , , ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি