সাম্প্রতিক

স্বপ্নবৃক্ষ, সময় এবং মুসাফির । মঈনুস সুলতান

সময়ের ফসিল

বদলে যায় পৃথিবী আমার
মৌসুমি হাওয়ায় হাওয়ায় বাবুই পাখির খড়কুটা অস্থির
স্নায়ুর জোসনাবাগে সৌরভের পতঙ্গ — আজ রাতে হয় অধীর।

বদলে যাচ্ছে হামেশা … অহরহ
দেখেছো কি ওলন্দাজ দিনেমার যুগের মানচিত্র
সাদোকালোর ব্যবধান ঘুচেছে — পূর্ণিমায় মিশেছে রোদ
জানি-দুশমন হয়েছে হালফিল আমার মিত্র।

ভোরের অরুণিম খুঁজতে গিয়ে আমি দেখি
গোলমোহরের বনে নেমেছে গোধূলি
মাটির তলায় খনিজ আকরে ঝলসায় লাপিসলাজুলি।

নিরিবিলি এসে দাঁড়াই শিউলিঝরা পাড়ে
রূপার তিরলে সারসভাসা জলের ঝলমলে সরোবর
বাষ্পের রূপছায়ায় আকাশে ওড়না উড়ায় মেঘের নৌবহর।

দেখি মোমের ম্রিয়মান শিখা — ভাটা পড়ে স্তনের সুগঠিত বিক্রম
শ্লথ হয় স্বপ্নের সরোজ, সিল্কের প্রিয় দৃশ্যভোজ। … সুস্মিত ব্রেসিয়ার
চাষীর মুঠোয় লোহার লাঙ্গল … ছড়ায় মরচের খয়েরি বাহার।

পানশালায় ফি-রাতে যারা হয় ভারমুথে বেসামাল
ফুরায় স্নায়ুতে সুরার তিয়াস
ঊরুতে উল্কি আঁকা নৃত্যে ঈষৎ বাঁকা নারীরা হয় কালের কঙ্কাল।

ভবসংসারে ধ্রুব বলে কিছু নেই
বালুচরে কাঁকড়ার পদচিহ্ন আকাশে উড়ন্ত গাঙচিল
ইমারত … নারী
মাছ ও কিশতির অদৃষ্টে লেখা দেখো সময়ের ফসিল।

স্বপ্নবৃক্ষ ও চলনবিলের রোহিত

কে নেভায় জোছনা আজ রাতে
চাঁদে গড়ে তোলে স্বপ্নবৃক্ষের ম্যাগমা মোহন জনপদ,
কার ইশারায় কসমিক কাননে চরে বেড়ায় সহিষ্ণু শ্বাপদ,
মাঝে মাঝে ভাবি কে সে — কোথায় সাকিন কি-বা তার পরিচয়,
মনে পড়ে রেসোটা স্টোনের লিপির কথা
বিবিধ ভাষায় আঁকা দূরূহ বিস্ময়;
খানিক বুঝতে পারি বাকিটুকু থেকে যায় আধেক অচেনা
বৈকালহ্রদ থেকে উড়ে আসে যে মরাল
চলনবিলের রোহিতের সাথে দিনান্তে চলে তার লেনাদেনা।

তরু-মুসাফির

আমার ভেতরে জল ছিল —
মৃত্তিকার সাথে মিশে এ সংবেদনশীল তরল হয়েছে একা —
বিচ্ছিন্ন হয়েছে সে সমুদ্র থেকে,
আমি বোট ভাসাবো বলে ছিলাম বিকেলে উৎসুক
জলের উৎস যে বৃষ্টি সে-ও ফিরিয়েছে মুখ,
বিজলি খারিজ হয়েছে আকাশে সোনালি সাপ এঁকে।

আমার ভেতরে তৃষ্ণা ছিল —
ভালোবেসেছি সারাটি জীবন বনানী ও বিরহ,
অনুর্বর সাভানায় দাঁড়িয়ে ভেবেছি
যে-তরমুজ ধরে রাখে হৃদয়ে সূর্যাস্ত,
উষর খেতে তা ফলানো হবে দুরূহ।

আমার প্রেষণায় জলতরঙ্গ ছিল —
কীত্তনের ধমনীতে তিরোহিত হয়েছে ভক্তির করুণ নির্যাস,
বিপাসা-রিক্ত কাননে দেখিনি প্রসূনের ফুল্ল প্রয়াস।

তাই নিভৃত যমুনার জল নীরবে সেঁচে গড়তে চেয়েছি
বর্ষানিবিড় জলপাইবন,
তোমার কথাও ভেবেছি — তরু-মুসাফির
মনে হয়েছে — ‘অল্ ইজ্ গন্’।

Comments

comments

মঈনুস সুলতান

মঈনুস সুলতান

ভ্রমণগল্প লিখে বাংলাদেশের পাঠকসমাজে ব্যাপক সমাদৃত মঈনুস সুলতান মূলত কবি । দীর্ঘদিন কবিতা পাকাশিত হয়নি যদিও, সম্প্রতি হয়েছেন ফের কবিতায় প্রত্যাবর্তিত । ভুবন ভ্রমিয়া ফেরেন তিনি কতকটা পেশাগত প্রয়োজনে, এবং অনেকটাই প্যাশন থেকে । লেখেন উপন্যাসোপন গদ্যপ্রকৌশলে সেইসব বৈচিত্র্যমুখর দেখাদেখির বৃত্তান্ত । সৈয়দ মুজতবা আলীর পরে সামাগ্রিক বিচারে বাংলা সাহিত্যে বৈঠকী স্বাদুতাবাহী গদ্যের পরম্পরা নবতর বৈদগ্ধ্যে-বৈভবে মঈনুস সুলতানের ন্যারেটিভে পাওয়া যায় । লেখকের জন্মজেলা সিলেট । স্ত্রী ও একমাত্র আত্মজা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও খণ্ডকালীন অন্যান্য নানা দেশে বাস করেন । প্রকাশিত বই প্রায় দশেরও অধিক, সব-কয়টিই পাঠকাদৃত, গদ্যগুণবিচারী পাঠকই তাঁর গ্রন্থগ্রাহী । কয়েকটি বই : ‘নিকারাগুয়া সামোটা ক্যানিয়নে গাবরিয়েলা’, ‘জিম্বাবুয়ে বোবা পাথর সালানিনি’, ‘মৃত সৈনিকের জুতার নকশা’, ‘কাবুলের ক্যারাভান সরাই’ প্রভৃতি । পেয়েছেন মননশীল বিইশাখায় ‘প্রথম আলো বর্ষসেরা পুরস্কার ১৪১৯’।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: , ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি