সাম্প্রতিক

একটি খুন, অতঃপর… । রিমঝিম আহমেদ

ঘুমন্ত পাড়া শব্দটা এখানকার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।দিনভর হুল্লোড় আর রাতের ফিসফিসানি এটাই এখানকার স্বাভাবিক রীতি। মাঝে মাঝে রাতের ফিসফিসানি ছাপিয়ে হাসি আর কান্নার রোল শব্দময় হয়ে উঠে, যারা এখানে থাকে, থাকতে থাকতে সবাই বিকারহীন সয়ে যাওয়া পরিস্থিতিকে মেনে নিয়ে প্রাত্যহিক নিয়মে বেঁধে ফেলেছে নিজেদের। নিজের বলে কোনকিছু খাটে না, সবটাই যৌথ, সমবেত। কতগুলো জীবন! কত বৈচিত্র্যময়তা! প্রতিটি গল্পই একক কিন্তু জীবন-যাপনে সমাবেশ।পাথরকুচির মতো সতেজতা নিয়ে আসে, শীতের পতনোন্মুখ পাতার মতো রুক্ষতা নিয়ে বেঁচে থাকে প্রতিটা দিন! বিশাল আকাশটার কখন রঙ পাল্টে যায়, তা জানার অধিকার নেই, দেখার অধিকার নেই। এটা এক ভিন্ন পৃথিবী, আকাশটাকে ভাগ করে রেখেছে ইট সুরকির সুউচ্চ লৌহকঠিন দেয়াল। দু’চোখের দৃষ্টি সীমায় এক চিলতে আকাশ দিনে একবেলা দেখার সুযোগ মেলে। বাকিটা কল্পনার আকাশে গুঁতো খেতে খেতে খেই হারিয়ে ফেলা ঘুড়ির মতো ঘুরপাক খায়। সে আকাশ দেখার স্বপ্ন গড়া আর ভাঙ্গার খেলা যেন বেলাভূমিতে শিশুর ঘরদোর খেলার মতই বিভ্রম।

ঘণ্টার শব্দে চমকে উঠে সুলতা। নিচে হাঁকডাক চলছে। রহিমার ক্যানক্যানে গলা শোনা যাচ্ছে- এখানে রহিমা আছে চারজন, তাই এই রহিমাকে সবাই ডাকে গালকাটা রহিমা। গালকাটা রহিমার গলা চারতলা ভবনের কোণাকাঁচি পর্যন্ত পৌঁছে গমগম করে। এই গলা শুনতে শুনতে সবাই অভ্যস্ত, ত্বরিত নেমে না আসলে ফলাফল কী হতে পারে এতদিনে সকলেরই তা জানা হয়ে গেছে। যে যার থালা-বাটি নিয়ে নেমে আসে নিচে। করিডোরে লম্বা লাইন। আজকে ভাতের সাথে সবজি আর ডাল। এসবের জন্যও নিত্য মারামারি। অকথ্য ভাষাগুলোকে আজকাল গালি মনে হয় না। এটাই এখানে স্বাভাবিক এবং মাতৃভাষার মতোই প্রচলিত । সুলতা তিনজনের পরেই খাবার পেয়ে গেল। পেছনের লাইন শেষ হতে অনেক সময় লেগে যাবে। খাবার নিয়ে তিনতলার সেলে উঠে আসে সে। খেতে মন চায় না। সকালের রুটি এখনো পড়ে আছে থালার ওপর, বিস্বাদ, শক্ত আর জীর্ণাবস্থায়। এখানে যারা থাকে সময় তাদের এই রুটির মতই করে দেয়, রুটি কি এসব মানুষের অবস্থার প্রতিনিধিত্ব করছে ! খুনিদের এখানে ক্ষমতা বেশি, চোর- ছ্যাঁচড়দের নগণ্যজ্ঞান করা হয়। তাদের হাতে কোন ক্ষমতা নেই। তবে ক্ষমতাবানদের ল্যাজরবৃত্তিতে কিছু ক্ষমতা হাতে আসে বটে, তার বিনিময়ে তাদের খুশি করতে করতেই হাঁপিয়ে উঠতে হয়। খুন যত নৃশংস, ক্ষমতার পাল্লাও তত ভারী। আপাতত সুলতা ক্ষমতাবানদের দলে। টিকে থাকতে হলে কী কী করতে হয় তা গত তিন মাসে রপ্ত করে ফেলেছে সুলতা। তার রপ্ত করার ক্ষমতা অনেকের চেয়ে বেশি।

ঘরের ছেলে ঘরেই থাকবে, মেয়েও ভালো থাকবে। সুলতার সবে মাত্র ঋতুস্রাব হয়েছে। তার মানে মেয়ে বিয়ের বয়সী হয়েছে। পড়ালেখার এত দরকার নেই মেয়েদের। শ্বশুরবাড়ি গিয়ে তো সে-ই ঘরকন্নাই করবে! এসব ভেবেই অসম বয়সী তারিকের সাথে সুলতার বিয়ে হয়ে যায়। সুলতা যখন প্রেগন্যান্ট তখন তারিক আবার কুয়েতে চলে যায়…

সুলতা একজন খুনি। আইনের চোখে, সমাজের চোখে, পরিবারে কিংবা রাষ্ট্রে সুলতার পরিচয় একটাই- সুলতা খুনি। তাই এই কঠিন চার দেয়ালের ভেতরে সারা শরীরে খুনির কাঠিন্য মেখে সুলতা ঘুরে বেড়ায়। লোকচক্ষুর আড়ালে, সামান্য নির্জনতায় কিংবা রাতের অন্ধকারে সুলতার কঠিন খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসে অন্য এক সুলতা। যাকে চেনে না এই চার দেয়ালের ভেতর বসবাসকারী কোন ব্যক্তি। শুধু চেনে তার স্বজনেরা। সে-ই সুলতার ভেতরে গ্লানির ক্ষরণ, মাতৃত্বের কোমলতা, স্নেহের জন্য হাহাকার আর ভালবাসার জন্যও ছটফটানি।

সুলতার হঠাৎ পাখির মায়ের কথা মনে পড়ে- পাখির মা তার প্রতিবেশী দেবরের বউ, যার সাথে সখ্য ছিল খুব। ঘরকন্নার পড় বিকেলে দুজনে একচিলতে সময় কাটাত। এ কথা সে কথা কত কথার ডালি সাজানো ছিল ওদের ! পরস্পরের পাওয়া-না পাওয়া, হাসি-কান্না সবকিছুর বৃত্তান্ত জানত। পাখি মা কি থাকবে আগের মত? নাকি ঘৃণায় ফিরিয়ে নেবে মুখ ? মন কেমন করে ওঠে ! ভুলতে গিয়ে চোখে ভেসে উঠে দুটি কচিমুখ। ছোট ছেলেটা মাকে ছাড়া এমুহূর্তও থাকতে পারতো না, মাকে সে চোখে হারায়। দোলনায় রেখে জোরে জোরে গান গাইতে গাইতে এ ঘর থেকে ও ঘরে যেতে হতো। মেয়েটার সমস্ত বায়না মায়ের কাছে। চুপচাপ স্বভাবের অভিমানী মেয়েটা নিজের প্রয়োজনের কথাটা মা ছাড়া কাউকে বলেও না। কেমন আছে ছেলেমেয়ে দুটো ! ঠিকমত খাওয়া দাওয়া করছে তো ! মেয়েটা পুকুর ভয় পায়। ঠিকমত গোসল করতে চায় না। সুলতা তেল মেখে, যত্ন করে টিউবওয়েলের পানিতে মেয়েকে গোসল করিয়ে দিত। মেয়েটার মাথায় ইদানীং উকুন হয়েছে, সুলতা দুই হাঁটুর মাঝখানে বসিয়ে পুণ্যির উকুন এনে দিত।আর ছেলেটার কানে পানি ঢুকলে কান পাকে। চোখে সাবান লেগে জ্বলুনির ভয়ে গোসলের সময় খুব ভয় পায়। সেবার চন্দ্রঘোনা ডাক্তারের কাছে গিয়ে ফেরার পথে নীল রঙের গামলাটা কিনেছিল প্রাণকে গোসল করানোর জন্য। সুলতার মেয়ের নাম পুণ্যি, ছেলের নাম প্রাণ। অতি আদরের পুণ্যিপ্রাণ। বুকটা হাহাকার করে উঠে সুলতার। মাঝরাতে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে প্রায়। কিন্তু নরমের এখানে স্থান নেই। শক্তের জয়জয়কার।

সুলতার মনে পড়ে একটি মুখ। এই ঘুটঘুটে অন্ধকারে সে মুখটাই একটুকরো আলো। সে আলোটার কথা মনের সহস্র দ্বিধা-দ্বন্দ্বের পর্দা সরিয়ে একমাত্র অবলম্বন মেনে ভাবে সুলতা। আচ্ছা, ও কি আমার কথা ভাবে ? না কি পরিবার ও সমাজের ভয়ে আমার সাথে সম্পর্ক রাখবে না আর? এসে কি জামিনের ব্যবস্থা করবে ? সুলতা জানে এটা আশা করা বোকামি, তারিক এসে তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে যাবে। একজন খুনি, চরিত্রহীন স্ত্রীকে কোন স্বামীই গ্রহণ করবে না। যদি করে তবে সে হবে অতিমানুষ। তারিককে মনে মনে অতি মানুষ ভেবেই শান্তি পায় সে। দশ বছরের সংসার তাদের। সুলতার এই দুঃসময়ে পাশে থাকলে কেবল তারিকই পারে, আর কেউ নয়। কিন্তু তার সম্পর্কে তারিকের ভাবনাটা জানা দরকার। তিন মাসে বাপেরবাড়ি কিংবা শ্বশুরবাড়ির কেউ একবার দেখতে এলো না। কেমন আছে সবাই খুব জানতে ইচ্ছে করে। প্রিয় সন্তান দুটো ছাড়া বুকটা কেমন খালি খালি লাগে। দশটার দিকে সেলাই-দিদি আসে। দুইদিন আগে তাঁকে ভাইয়ের মোবাইল নাম্বার দিয়েছিল, যদি একবার কোন খবর পায় !

যে রাতের কথা বারবার ভোলার চেষ্টা করছে সে অজান্তেই সে রাত, সে দুঃসহ ঘটনা চোখের সামনে ভাসছে। পুলিশের সামনে সেদিন গড়গড় করে সত্যি কথাগুলোই বলে ফেলেছিল। শাস্তির ভয়ে কি! না হয়তো, যে আগুন নেভার পর আকণ্ঠ অন্ধকার সুলতাকে ঢেকে দিয়ে গেছে সেটাকে সরানোর জন্যই সে সব সত্যি উগরে দিয়েছিল জবানবন্দীতে।

মনির, এলাকারই ছেলে। চার সন্তানের বাবা। একাধারে চান্দের গাড়ির মালিক ও চালক। সুলতার স্বামী দেশের বাইরে থাকে ছয় বছর। নানা প্রয়োজনে বাজার-ঘাটে যেতে হয় সুলতাকে। সবসময় নিজের সংসারের জন্য অন্যকে খাটানো যায় না। নিতান্তই বাধ্য হয়ে নিজের সংসারের হাল নিজেই ধরেছিল সে। সেরকমই একদিন বিকেলে মনিরের গাড়িতে উঠেছিল সুলতা। মনির নামিয়ে দেবার সময় সুলতার মোবাইল নাম্বার চেয়ে নেয়। কিছু না ভেবেই সেদিন মনিরকে মোবাইল নাম্বার দিলেও মনির যখন ফোন করে প্রথমদিন সংশয় হয়েছিল বটে, কিন্তু একা স্বামীহীন নিঃসঙ্গ সুলতাকে দুর্বল করতে মনিরের খুব একটা বেগ পেতে হয়নি। রাতবিরেতে, সময়ে অসময়ে সুলতা আর মনিরের ইথার সম্পর্ক মানসিক দূরত্ব ঘুচিয়ে দেয়। এভাবেই ভেসে যেতে থাকে ভুল সময়ে ভুল জোয়ারের স্রোতে। কিন্তু ভুলকে ভুল হিসেবে জানতে পারার আগে সুলতার কাছে মনে হয়েছিল হয়তো, খারাপ তো কিছুই নয় ! একটা মানুষের সঙ্গে কথা বলে নিজের একাকীত্বটুকু যদি দূর হয় তবে খুব বেশি কি ক্ষতি হবে ? এতকিছু চিন্তা করার সুযোগ আসেনি, মনির কথার জাদুতে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল সুলতাকে।

তারিক সম্পর্কে সুলতার ফুফাতো ভাই। থাকতো সুলতাদের বাড়িতে। বাজার সদাই করে দিত বিনিময়ে ঘরের ছেলের মতই বেড়ে উঠছিল সুলতার অন্যান্য ভাইবোনদের সাথে। তারপর কিছু টাকা পয়সা যোগাড় করে একদিন কুয়েতে পাড়ি দেয় জীবিকার সন্ধানে। তখন সুলতার বয়সই বা কত ! বড়জোর আট নয় বছর ! পাঁচ বছর পরে ফিরে এসে বিয়ের পাত্রী খুঁজতে গিয়ে আত্মীয় স্বজনরা পরামর্শ দিতে থাকে বাইরে পাত্রী দেখার দরকার কী, ঘরেই তো আছে, সুলতার মা-বাবাও রাজি। ঘরের ছেলে ঘরেই থাকবে, মেয়েও ভালো থাকবে। সুলতার সবে মাত্র ঋতুস্রাব হয়েছে। তার মানে মেয়ে বিয়ের বয়সী হয়েছে। পড়ালেখার এত দরকার নেই মেয়েদের। শ্বশুরবাড়ি গিয়ে তো সে-ই ঘরকন্নাই করবে! এসব ভেবেই অসম বয়সী তারিকের সাথে সুলতার বিয়ে হয়ে যায়। সুলতা যখন প্রেগন্যান্ট তখন তারিক আবার কুয়েতে চলে যায়। পরে চারবছর পর এসে আবার সুলতাকে প্রেগন্যান্ট করে দিয়ে চলে যায় কুয়েতে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য। সুলতা অল্পবয়সী বলে শ্বশুরবাড়িতে সাতখুন মাপ হয়ে যাবে তাও নয়, পান থেকে চুন খসলে কথা শোনাতে ছাড়েনি তার দেবর, ননদ, শাশুড়ি। অল্প কয়েক বছরেই আলাদা বাড়িতে আলাদাভাবেই সংসার শুরু করল সুলতা-তারিক। তারিক স্বামী হিসেবে গড়পড়তা সবার মতই। বিদেশ থেকে টাকা পাঠায়, সংসার চলে যায় , সপ্তায় এক দুইবার ফোন করে জেনে নেয় সবাই কেমন আছে, টাকার হিশেব ঠিকঠাক আছে কিনা, এইসব। সুলতা কম বয়সী, এসবের বাইরেও তার আরও কিছু চাই যা তারিক দিতে পারে না। স্বামী হিসেবে তারিককে খারাপ বলার কিছু নেই। সব দায়িত্ব যে অর্থে ঠিকঠাক বলা হয়ে থাকে সে অর্থে তারিক যথার্থই। কিন্তু সুলতার সবসময় মন কেমন করে! বুকের শূন্যতা খালি টিনের মতই হাহাকার করে বাজে।সে শূন্যতা থেকেই হয়তো সে ভেসে যেতে থাকে মাদকাসক্ত, চরিত্রহীন মনিরের মিথ্যে ভালবাসার স্রোতে। কিন্তু জানতেও পারেনি ঘুণাক্ষরে, মনির সে সব কথা মোবাইলে রেকর্ড করে রাখবে। যথাসময়ে মনিরের স্বরূপ ভেসে ওঠে। সে সুলতাকে ব্ল্যাক-মেইল করতে থাকে। নানারকম চাহিদার ঝাঁপি খুলে ভয় দেখাতে থাকে সুলতাকে।  পাড়ায়, দোকানে, হাটে, বাজারে ভেসে বেড়াতে থাকে মনির সুলতার কাছে অনেক টাকা পায়, তাদের মধ্যে অনৈতিক সম্পর্ক আছে । এসব কথা ঘটনা থেকে রটনা হয়ে সুলতার শ্বশুরবাড়িতে ভেসে বেড়ায়। সংসার ভাঙার আতঙ্কে সুলতা বারবার অনুরোধ করেও মনিরের কাছ থেকে পরিত্রাণ পায় না।

জীবন নিজের নিয়মেই চলে। সমস্যা আসে, আবার সে সমস্যার সমাধানও করে মানুষ। হয়তো সমাধানের স্টাইলটা ভিন্ন। যে যার মত করে সে সমাধানের পথ খুঁজে নেয়। সুলতাও সমাধান করতে চেয়েছিল নিজের মত করেই। নিজের মত করে করতে গিয়ে যা করেছে তা সমাধান ছিল না, নিজের কবর খুঁড়েছে বলা যায়।

সেদিন বিকেল ছিল, দুপুরের ভাত-ঘুমের জন্য শুয়েছে মাত্র, বাচ্চা দুটি ঘুম পাড়িয়াছে আরও আগেই। আজকাল মন খুব অশান্ত থাকে, ঘুম আসে না। মনিরের ভয়ে সারাক্ষণ আতঙ্কিত থাকছে। পুরো পাড়া করছে মনির। ইনিয়েবিনিয়ে সুলতার সাথে তার পরকীয়া সম্পর্কের রটনা রটিয়ে দিচ্ছে সে। সুলতা সেদিন ধানের বিষ খেয়ে মরতে গিয়েও পারেনি, বাচ্চা দুটোর কথা মনে আসলে মরাও অসম্ভব যেন। ভাবে-সে তো দোষ করেনি!  তবে কেন একটা মাতালের ভয়ে জীবনটাকে বিসর্জন দেবে! নিজের মনেই কঠোর হয় সে। তারপর খালা শ্বশুরঘরের দেবর মন্টুকে ডাকে। যেটুকু সম্পর্ক মনির আর তার মাঝে গড়ে উঠেছিল তা বিনাদ্বিধায় খুলে বলে। সব শুনে মন্টুর মেজাজ বিগড়ে যায়, আর ভাবে লম্পটটাকে কীভাবে শাস্তি দেয়া যায়!  তারপর দুজন মিলে ফন্দিফিকির করে একটা সিদ্ধান্তে পৌছয়।

প্রতিদিনের মতো রাতের রান্নাবাড়া বিকেলেই সেরে নেয়, মাগরিবের আজান মেয়ের পড়ার সময়। তাও হেরফের নেই। এশার আজান শুনে রাতের খাওয়াদাওয়া শেষ করে। তারপর ঘুমোতে যায়… সবাই ঘুমিয়ে পড়ে, ঘুমিয়ে পড়ে পুরো পাড়া শুধু জেগে থাকে কিছু রাতপাখি, ঝিঁঝিঁর গান, দূর থেকে ভেসে আসে শেয়ালের হাঁক।

মাঝরাত্তিরে টোকা পড়ে সুলতার দরজার কবাটে। দরজা খোলার আগে স্বভাবসুলভ জানতে চায় সুলতা– কে?

আমি, আমি মনির।

এতরাতে কেন? তোমাকে তো ফোন করেছি বিকেলে, মাঝরাতে তো আসতে বলিনি!

—তোমার কাছে আসব তার আবার দিন-রাত কী!  মনিরের কথা জড়িয়ে আসে। মদ খেয়ে বেঢপ মাতাল হয়ে মনির দরজায় ক্রমাগত আঘাত করতে থাকে। সামনের বারান্দার খাটে শুয়ে আছে মন্টু, সে চুপচাপ শুনছিল এতক্ষণ। এবার নিঃশব্দে এসে সুলতার পাশে দাঁড়িয়েছে। ইশারায় দরজা খুলতে বলে নিজে সরে দাঁড়াল।

দরজা খোলার পর সুলতাকে ঠেলেই ঢুকে পড়ে মনির। মুখ থেকে মদের ভোঁটকা গন্ধ, পা টলছে।

সুলতা জানতে চায়- তুমি মদ খেয়ে আমার ঘরে কেন আসলে? তাও এত রাতে?  কী চাও আসলে?  আমি বলেছি তোমার টাকা আমি দেব, নিতে আসতে বলেছি তুমি সারা বিকেল সময় পেলে না, এখন এলে?

—টাকা তো নেব, সাথে আরো কিছু নেব তাই এলাম। এতদিন ফোনে মধুর মধুর কথা বলে এখন সরে যাবে তা ক্যামনে হয়! জড়িয়ে আসে মনিরের কথা কিন্তু তার হাত সচল হয়। সুলতাকে জড়িয়ে ধরে খাটের দিকে এগুতে চায়। কিন্তু একজন মাতালের এত শক্তি নেই যে স্থির থাকে। সুলতা ধাক্কা দিতেই হুমড়ি খেয়ে পড়ে যায়, পরক্ষণে আবার সামলে নিয়ে সুলতাকে বিছানায় চেপে ধরে। কিন্তু ধস্তাধস্তিতে মনিরকে ঠেলে ফেলে দিয়ে রান্নাঘরের দিকে দৌড় মারে সে। ধারালো দা’টা হাতে নিয়ে রণচণ্ডী সুলতা মনিরের ঘাড়ে জোরসে বসিয়ে দেয় এক কোপ। কোপ খেয়ে মনির উঠে দাঁড়াবার আগেই মন্টু চেপে ধরে ফেলে দেয় মাটিতে। মন্টু মাথা চেপে ধরে মাটির সাথে আর সুলতা বুকের উপর বসে মনিরের গলায় পোঁচ দিতে থাকে। রক্ত গলগল করে পড়ে, একসময় মনিরের নিথর দেহ প্রাণহীন পড়ে থাকে সুলতার মাটির মেজের উপর। বিচক্ষণ সুলতা রাতেই বাবাকে ফোন করে নিয়ে আসে। মন্টু আর সুলতার বাবা লাশ বস্তাবন্দী করে অনতিদূরে পাহাড়ের ঢালে ফেলে দিতে যায়। ততক্ষণে সুলতা ঘরদোর লেপেপোছে পরিষ্কার করে নেয়, শাড়িতে লেগে থাকা রক্ত নিখুঁতভাবে ধুয়ে নেয়। ঘরের ভেতর ধস্তাধস্তির শব্দে জেগে গিয়েছিল সুলতার মেয়ে পুণ্যি। প্রত্যক্ষদর্শী মেয়েকে বুঝিয়ে বলে আজ যা যা দেখেছে এসব কথা কাকপক্ষীকেও যেন না বলে। তারপর মেয়েকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে নিজেও শুয়ে পড়ে। লাশ গুম করে ফিরে আসে দেবর মন্টু আর সুলতার বাবাও। কিন্তু সুলতা বুঝতে পারে না তার ঘুম সব ভেসে গেছে মনিরের রক্তের স্রোতে।

দুইদিন ধরে মনিরকে খুঁজছে তার পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী। অবশেষে পাহাড়ের ঢালে বস্তাবন্দী লাশ পাওয়া যায়। পুলিশ আসে, সন্দেহের তির গিয়ে পড়ে সুলতার দিকে। সুলতা পালিয়ে বাঁচতে চেয়েছিল কিন্তু অবস্থা বেগতিক দেখে নিজেই আত্মসমর্পণ করে থানায়। স্বীকার করে মনিরকে খুন করার কথা…কারাগারে নিয়ে আসা হয় তাদের সাথে দেবর মন্টু ও সহযোগী বাবা।

সুলতা জানে তাঁর ফাঁসি হতে পারে অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। তবু সে আশা করে কেউ আসবে, তার জামিনের ব্যবস্থা করবে। জামিন হলে আবার তারিকের সাথে সংসার করবে। বাচ্চা-দুটোকে নিজহাতে তেল মাখিয়ে গোসল করাবে, স্কুলে নিয়ে যাবে। বিকেল হলে পাখির মা’র সাথে গল্প করবে। চন্দ্রঘোনা বাজারে গিয়ে শাড়ি কিনবে….সুলতা জানে তার বাচ্চারা মায়ের অপেক্ষায় নীরব প্রহর গুনছে।

সুলতা জানে না, সুলতার স্বামীরা অন্য কারো স্বামী হয়ে যায়। তারা খুনি বউয়ের ফাঁসির জন্য মনেমনে উদগ্রীব হয়ে থাকে। তারপর সুলতার বিছানায় শুয়ে থাকে তারই শাড়ি পরে অন্য কোন সুলতা… দ্বিতীয় সুলতার আদরের দাগে চাপা পড়ে প্রথম সুলতার আদর। আদরে আদরে শহরের জন্ম হয়, পালটে যায় তারিকদের শরীরের মানচিত্র।

 

Comments

comments

রিমঝিম আহমেদ

রিমঝিম আহমেদ

পড়াশোনা করেছেন চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। পেশা : সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে কাজ করছেন কক্সবাজারে। জন্ম: ৮ জুলাই ১৯৮৫, রাঙ্গুনিয়া, চট্টগ্রাম। কবিতার বই: লিলিথের ডানা ইমেইল : rimjhimahmed85@gmail.com

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি