সাম্প্রতিক

প্রকৃত বেদনায় দ্যুতিময় এক কবি । এহসান হায়দার

পৃথিবীতে ভালবাসা ছাড়া সুমহান কোনো উত্তেজনা নেই। অবিরাম উষ্ণতার গতিবেগ ছাড়া শরীরে তরঙ্গ নেই। প্রেমে সুগ্রাহী পাখিরা উড়ে যায়; বাতাসে বিধৌত দেহমন/ কার জন্য সুরক্ষিত? সে তো শিশুর মতোই সরল স্বীকারোক্তি দেয়; ভালবাসার অধিকার ছাড়া অনামিকা নদীর মতন দীর্ঘ কোনো দ্রবিভূত আলোড়ন নেই। স্বপ্নের ভেতরে মাংসের গোপন জ্যোৎস্নার সাক্ষাৎ ছাড়া মহীরুহ আকর্ষণ নেই। স্পর্শের পিপাসায় গর্ভস্থ আশ্চর্য অপেক্ষার ভ্রুণের মতন উত্তাপ নেই। মানুষের সাথে সাথে এই ভাবনা পৃথিবীতে সুদীর্ঘকাল ধরে বিচরণরত। অনেক গহীন থেকে উঠে আসে তর্কের স্বর। কোথায় সেই দিকচক্রবাল, বিচ্ছুরিত আলো, পরিচিত গভীর গ্রন্থ? কোন রূপের প্রতিভায় চিরন্তন কথারা টিকে থাকে জন্মের সাবলীল ঘুমের মতন? জানি কি? জানা যায় কি সত্যের এমত নির্বিকার স্বচ্ছতা। হৃদয়ের অবয়বহীন ঝঞ্জার মতন আকাশের পরিসরে আলো আর অন্ধকার নানাভাবে জড়িয়ে রয়েছে’ যে যার মতন তৃষ্ণা আর গান নিয়ে পরস্পর স্বস্থানে নিয়মানুসারে যেনো সাজানো সোনালী রূপালি কালো আকাশে আকাশে। ছন্দোবদ্ধ এই চিরসত্য মানুষ ভালবাসে আর ভালবাসে বলেই রহস্যের জিজ্ঞাসা নিয়ে মর্মের সমুদ্রপৃষ্ঠে একাগ্র ঘুরে বেড়ায় অনেক ছোবল নিয়ে প্রাণে। জানি অকারণে খুঁজে ফেরা ; আমি জানি, নীল হাসি নেই’ ব্যর্থ আকর্ষণের পরিণামে ব্যথারা উজ্জ্বল হয়ে উঠে। বৃষ্টির কীর্তি নিয়ে বহু দূরে সরে যায় ধনেশ পাখি, সভ্যতার এই একাগ্র সঞ্চালন সুদীর্ঘ অতীত থেকে পুনরায় পুনরায় মানুষের কুয়াশার সাথে এসে মিশে কিছুকাল প্রকৃতই অগ্নিময়ী থেকে অবক্ষয়ের দিকে দ্যুতিময়, আত্মসমাহিত হয়। ব্যাঘাতের এই যথেষ্ট নিষ্পেষণে মানুষ কেন ব্যথা পাও বলো, পৃথিবীর বিয়োগে বিয়োগে?’ প্রকৃতির রাজপথে অপ্রাপ্তির এই খেলা, অতৃপ্তির এই পিপাসা, অপূর্ণতার এই রক্তাক্ত সঙ্গম, অনিশ্চিত অনিশ্চয়তার সফল পদ্ধতি সর্বত্র ছড়ানো। চতুর্দিকে সূর্যপরিক্রমারত অন্ধকার, ফুটন্ত জলের মতো মোহ, কাঁটার আঘাতদায়ী দীর্ঘস্থায়ী কুসুমের স্মৃতি, স্তব্ধ যন্ত্রণার মতো আয়ু, স্নেহের দেয়াল, নিবেদিত চিলের ক্ষুধা, দুর্বোধ্য মৃত্যুর প্রান্তর, আর নেশাতুর লৌকিক ভেকের সহনশীলতা ছাড়া যখন কদাচিৎও কোনো ব্যর্থতাহীন প্রেমের আশ্চর্য সমুদ্রস্থান নেই, অমূল্য বিনাশের পূর্ণিমা ছাড়া দিকপরিবর্তনের আলোকিত রুদ্ধশ্বাস সচ্ছলতা নেই তখন কী এক ৎকন্ঠা যেন সর্বদা পীড়িত করে রাখে। এই পীড়ন এই ব্যাথা দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতের মতো প্রতি মুহূর্তে মানুষের  হৃদয়ে-পাহাড়ে-পুষ্পকুঞ্জে-গ্রীষ্মে-কুজনে-কৌতুহলের সকল স্বযতœ কীর্তির গায়ে চিত্রল বিশুষ্ক এক দংশন যেনো আঘাত করে অগ্নির তান্ডবে নৃত্যরত পৃথিবীর সমস্ত আলোর চূর্ণগুলিকে সুগভীর অগ্নিগীরির তপ্ত লোহিত অঙ্গারের মতো অভিজ্ঞ আগ্নির লেলিহান যন্ত্রণায় প্ররোচিত করে। ভালবাসার মতো সাবধানে সাপেরা আসে নীলাভ বিষের উত্তাপ নিয়ে। আর করুণ ফলের মতো ; কেউ চায় আত্মবলিদান। বিনয় মজুমদার প্রতি নিঃশ্বাসে এমনই সদ্যোজাত ব্যাথার যন্ত্রণাকে অভ্যর্থনা জানান। যেনো বেদনার আহার্য্যই তার একমাত্র  কামনা। অথবা এই বেদনার চিরকালীন পরিভ্রমণই যেনো পৃথিবীর সুনির্দিষ্ট আয়োজন। বৃষ্টির পরেও ফের বাতাস উত্তপ্ত হয়ে উঠে’ তাই অপক্ক হরিতকীর মতো হৃদয়ে জেগে ওঠা প্রেম প্রাণ ঝরে গেলেও পুনরায় তা অঙ্কুরিত হয়।সুদীর্ঘ পথ অবশিষ্ট ভালবাসার হাতছানি পায়। হারিয়ে যাওয়া সন্ধ্যা জ্যোৎস্নার ঘ্রান বালিকাকে বিদায় দেবার/ বহু পরে পুনরায় দর্শনের অপেক্ষার মতো ছড়িয়ে পড়ে আর ব্যাথার সর্বস্ব চমক ম্লান হয়ে যায় মুহূর্তেই। ভালবাসার প্রতি অভ্যন্তরে ক্ষুধার মতন এ সকল ফুটন্ত আকাক্ষা; ক্ষত আর স্তব্ধতার চিরস্থায়ী দাগগুলো মুছে দিতে উদ্ধত হয়।শাশ্বত, সহজতম এই দান নিয়ে বসে থাকে সার্থক পারাবত ; সক্ষম গ্রহীতার চিরস্থায়ী নিবেদনে। বিনয়ের কবিতা যেনো এই প্রেম-স্তব্ধতার বৃত্তবন্ধির বিচিত্র জগত। আঘাতে আঘাতে ব্যর্থ প্রেম ক্ষত আর বেদনায় নিষ্পেষিত হতে হতে কিসের ব্যাঘাতে মুঠো রে/ চন্দ্রালোক ধরে নিতে বারংবার ব্যর্থ হতে হয় পুনরায় জেগে উঠে। অভিভূত প্রত্যাশায় জেগে উঠে সহজ অঙ্কুরের সন্ধান। বিরহের নোলক ভালবাসার নাকে সদাই ঝুলছে প্রকৃত প্রেমিকার মতন উজ্জ্বল। বেদনার মুকুরে ফোঁটা ভালবাসার এ রহস্য সন্ধানী শান্ত দিনে যখনই কবি ভাবে তোমাকে বেসেছি ভালো ঠিক পর মুহূর্তে ফুটে উঠে সেই পরিণাম যা তার কাব্য দুয়েন্দের সব চাইতে সহজাত অঙ্কণ তুমি পুনরায় লে গেছ এই যেনো চিরায়াত পৃথিবী। ভালবাসার পথে ছড়ানো বিরহের ধুলি। সেই শুরু থেকে যেনো একই প্রেমিকা বারবার ফিরে আসে মুগ্ধ করে আবার পলকেই বিদীর্ণ ব্যাথার করুণ রজ্জুতে ঝুলিয়ে পলকে চলে যায় চলে যায় দূরে প্রতিক্ষার ক্ষুধার উদ্রেক জাগিয়ে। তবু হৃদয় স্বপ্নচারী, অতৃপ্তির পিপাসায় পুনরায় শিশুর মতন সরলতায় হাত বাড়ায়। বাড়ানো হাত ছুঁয়ে যায় অনেকেই তবু চিরস্থায়ী কোন ঠিকানার নিশ্চয়তা মিলে না আর মিলে না বলেই করুণ চিলের মতো ঘুরে ঘুরে তাকে পেতে চাওয়া ডানার সংগোপনী ঝাপ্টা থামে না কখনো। তাই নির্জনতা আর নিরুদ্দেশের প্রতি কবির একটা পক্ষপাত লক্ষ করা যায়। যদি খুব দৃশ্যমান নয় তবুও নিরুদ্দেশের প্রতি বৃক্ষ আর পুষ্পকুঞ্জের প্রতি বিশ্বাস তার অগাধ আর অগাধ বলে খুড়ে বের করে আনে সত্য সফল মালার জন্য ; হৃদয় পাহাড়ে ফেলে রাখোএই অপেক্ষা এই মর্মযন্ত্রণা এই মোহ এই সাবলীল প্রচেষ্টা শুধু প্রেম নয় শুধু কোন নারীর হৃদয়ে একটু স্থান করে নেবার জন্যই সচল নয় এ যেনো আরো অন্য কোন ধ্যান অন্য কোন নিমগ্নতা চেনা রিলের ভিতর অন্য উপস্থিতির উপলব্দি। যাকে শুধু শব্দের অন্তর্গত অনুভবের বিচিত্র গতি পথের বৈচিত্রতা দিয়েই আলিঙ্গন করা যায়। বাক্যোর বিচ্ছেদ দিয়ে অনুভূতির যতোটা সম্ভব ঘনিষ্ট সহচরীরূপে প্রতি মুহূর্তে মূর্তমান করে তোলা যায়। অন্তর্গত বিচ্ছেদের বিচিত্র এই ছক এই পদ্ধতির মধ্য দিয়ে একটু একটু করে এগিয়ে গেলেই নানা অনু-সিধান্ত, সিধান্তের সাথে দেখা হয় কখনো ধরে নেওয়া অনু-সিদ্ধান্তের বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে সিধান্তের দিকে যাওয়া যায় আবার সিধান্তের ভিতর থেকে কোন একটা নতুন অনু-সিধান্ত নতুন সমীকরণের জন্ম দেয়।

ভাবনার মাঝে সমুদ্রের ঘ্রাণ, কুসুমের মুখ, উর্ধ্বগামী আকাশের হাতছানি থাকে। যা ঠিক এড়িয়ে বা পাশ কাটিয়ে জীবন বলে কোন কিছুরই অস্তিত্ব খুজে পাওয়া যায় না। জানি সে হাতছানির গত্যন্তর নেই, কোন মাটির গভীরে ইতস্তত সভ্যতা র চিত্রায়িত ব্যথাতুর দৃশ্যাবলীর ক্ষতরাশি, আঘাতের চিহৃ, জীবনের অক্ষম ক্ষুধাকে পুষ্পরাশি দিয়ে আবৃত করেও কি ভালোবাসা ও বেদনা রহস্যের সমাধান পাওয়া যাবে…

এভাবেই চিরস্থায়ী একটা গণিতের সমাধান কল্পে এগিয়ে চলে যাপন ও অনুভবের স্ব-সক্রিয় উপলব্দির অনুসন্ধান। এ যেনো এক চিরস্থায়ী স্বপ্নের শুরু যা স্বপ্ন  ও বাস্তবের মাঝামাঝি যে অনির্ণয়ের পিপাসা এবং তার প্রজ্ঞার দিকে ঠেলে দেয়। যেখানে সকল অনুভব স্বচ্ছতার চেয়েও বেশি স্বচ্ছ। এমন একটা আয়না যেখানে দাঁড়িয়ে গেলে আয়না আর প্রতিবিম্বের মধ্যকার তফা বলে কোন কিছুর অস্তিত্ব আর দৃশ্যমান থাকে না। সেই সহজতম প্রকাশের তীব্রতা এতোটাই স্বাভাবিক যে তাকে আর চেনা ছকের কোন নির্দিষ্টতা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। এমন একটা অপার রহস্য যার ভিতর রহস্য বলে কিছু নেই, কোন ঢাকনা নেই, যাকে সরিয়ে দিলেই প্রকৃত কিছুর দেখা মিলে যাবে মিলে যাবে যাবতীয় শুলুকের সন্ধান। অথচ কোথায় যেনো এতো আলোর ভিতরেও আরো কোন অন্ধকার ঈশারা চুপ করে আছে আরো কোন প্রকাশ এতো সরলতার মধ্যেও বাকি রয়ে গেছে। গাছ যদি মরে তবে যা থাকে তাতাও গাছ, মৃত বলে অন্য কিছু নয়ব্যথা যদি উপশম হয় বা ব্যাথাবোধ যদি ক্ষয়ে ক্ষয়ে কমেও আসে যা থাকে তাও ঐ ব্যথাই। সেই করুণ আর্তিই নিভৃতে নিমগ্নে কাৎরায়। এই ঘোর এই ঘন স্বচ্ছতার অনুভব রীতি বিনয়ের একান্ত আবিষ্কার। যাকে খুব চেনা মনে হয় তার সমস্ত কিছু জেনে যাবার পরেও যেনো কোন এক প্রশ্নের তির উত্তরের উৎসুকতাকে রক্তাক্ত করে বিঁধে থাকে। বিনয়ের পাঠক মাত্রই এমনই অসহায়ত্বতা, এমনই ঈর্ষার মুখোমুখি। জানি বহু ৎসর, চিরকাল এইভাবে প্রবাহিত হবে সকল অস্পষ্টতাও খোলাখুলি একদিন এইভাবে প্রকাশ্যে এসে পরিস্ফুট হবে। সে প্রকাশেরও থেকে যাবে আরো আরো অনির্ণয়ের খোজ। এভাবেই জীবন এগুয়ো। এভাবেই সমস্ত অনুভবের সাথে জীবনের সচল কথপোকথন চলে। এখানে মিমাংসা বলে প্রকৃতই কিছু নেই। যা আছে তা শুধু সেই চিরায়াত যন্ত্রণার দীর্ঘ বাক্যালাপ আর পিপাসার্ত হৃদয়ের পুন পুন অভিযানের বহুরূপী গল্প।

বৃষ্টিপতনের কথা কোনদিন গোপন থাকে না

বিনয় নিজেই এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, আসল কথা হল ভাল কবিতা লেখা দরকার তখন বই ছেপে গোপন জায়গায় রেখে দিলেও পাঠকরা খুঁজে নিয়ে পড়বে, বিজ্ঞাপন দিতে হবে না আসলেই কি তাই, তাই ঘটে না’কি? অনেক আগে লেখা অনেক পরের লেখাগুলোর সাথে তবে কি এইভাবে যোগাযোগ ঘটে যায় পাঠকের সে গায়েত্রী’র কাছে লেখা হোক বা ঈশ্বরীর’র কাছে অথবা নিজের অনুভব আর নির্জনতা নিয়ে আঘ্রানের অনুভূতিমালা কিংবা ফিরে এসো চাকা  যেখানেই লেখা হোক না কেন সেই আত্ম খসড়ার অনুভূতিমালার সাথে যখন হৃদয়ের সফল যোগাযোগ থাকে তা পাঠকের অনুভবে অনুরণ তৈরি করবেই। মানুষে মানুষে যে চিরায়াত মেলবন্ধন তার সাথে সংযুক্তি করে নিয়ে সেই ভাষা সেই শব্দ সেই বাক্যরা একাত্ব হয়ে মিলে যাবে এই পংক্তির মতন করে, ওরা উড়ে যাবে দূরে, গানের সহিত যুক্ত হয়ে। কত দূরে যাবে? হৃদয়ের ক্ষতের মতো জ্বলে জীবনের অবিরাম প্রতীক্ষা তবুও কি নোঙর ফেলে। যতোই অনির্বাণ আঘাতে আহত  হয় যেনো ততোই উন্মত্ত সে নিজের নিয়মে হেঁটে চলে, আস্তগত সূর্যের দিকে তাকিয়ে নিরুৎসাহ, এই অনুশোচনায় ফুল আর বায়ুর সাথে গভীর আলোচনার আগ্রহে সুরক্ষিত দীর্ঘশ্বাস বুকে নিয়ে মানুষ এগিয়ে যায় পেছনের পোড়া ইট-কাঠ অগুনতি অভিজ্ঞতার মুখগুলি শুধু মহীরুহ বেদনার রোমাঞ্চকে খোদাই করে শিল্পের ভাষায় স্বাভাবিক শিকড়ের লীলাময়ী অসুখের সংক্রমণে। এই তো বিনয় ও তার বাচনের শীতল উচ্ছ্বাস। অনির্ণয়ের প্রতি এতো মোহ কিসের, শূণ্যের প্রতি এতো প্রেম কেন, কেননা নিষিদ্ধির শ্বাশত অধ্যাবসায় মিলে যায় সফল বেদনা ও ভালোবাসা। এমন ভাবনার মাঝে সমুদ্রের ঘ্রাণ, কুসুমের মুখ, উর্ধ্বগামী আকাশের হাতছানি থাকে। যা ঠিক এড়িয়ে বা পাশ কাটিয়ে জীবন বলে কোন কিছুরই অস্তিত্ব খুজে পাওয়া যায় না। জানি সে হাতছানির গত্যন্তর নেই, কোন মাটির গভীরে ইতস্তত সভ্যতা র চিত্রায়িত ব্যথাতুর দৃশ্যাবলীর ক্ষতরাশি, আঘাতের চিহৃ, জীবনের অক্ষম ক্ষুধাকে পুষ্পরাশি দিয়ে আবৃত করেও কি ভালোবাসা ও বেদনা রহস্যের সমাধান পাওয়া যাবে? পাওয়া যায়? যাবে হয়ত। হয়ত শিশুর মতন এই চাওয়া নিয়ে হারিয়ে যাবে কেউ, প্রেমার্ত দীর্ঘশ্বাসের মতন অবয়বহীন। এইসব অবাঞ্চিত পিপাসাই তো বিনয় জাগিয়ে তোলে পাঠের সরোবরে। সদ্যেজাত আকাশের করপুটে যে মুহূর্তগুলি হঠাৎই সমূহ সম্ভাবনার ঈর্ষা জাগিয়ে তোলার পর মুহূর্তেই চিয়স্থায়ী যন্ত্রণার দুর্বোধ্য অপেক্ষার দিকে হলুদবর্ণ ছুড়ে ফেলে দূরে চলে যাবে পুনরায় আততায়ী হয়ে ফিরে আসবার গভীর উৎকন্ঠায়। সেই সব অনুভূতির উত্তেজনা নিয়েই কবির যত কাঁটার আঘাতদায়ী কুসুমের স্মৃতির মতন দীর্ঘস্থায়ীচিন্তা। কেননা জীবনের মূল সত্য যে এই ব্যর্থ, স্তব্ধ, নিষ্পেষিত, নির্বাক প্রস্তরগুলির গায়ে সার্থকভাবে চিত্রিত। ত্বকের জ্বালার মতো গোপন, মধুর বেদনা এ অভিজ্ঞতা বিনয়ের স্বতঃস্ফূর্ত আবিস্কার। এ অনুভব চিরন্তন এক সিধান্ত। এইসব চিরস্থায়ী মানে শতসিদ্ধ কথার বলবার ঝোঁক বিনয়ের কবিতার মধ্যে প্রবল ভাবে আমরা খুঁজে পাই। এই পাওয়ার পেছনের গল্পটাও চমৎকার। একজন কবি ও একজন গণিতবিদের মধ্যে যে প্রকৃতই কোন পার্থক্য রেখা নেই। বাংলা ভাষায় তা উপলব্দি করার জন্য বিনয় মজুমদার সবচেয়ে যুতসই সম্ভবত একমাত্র উদাহরণ। একজন গণিতবিদ কি করেন, সুনিশ্চিয়তার খোজে থাকেন।  বিনয়েরর এমন একটা প্রবণতা শুরু থেকে শেষাবধি তার লেখার দিকে খেয়াল করলে আমরা দেখতে পাবো। একটু গাণিতিক হওয়া যাক। ভাষার মধ্যে দিয়ে জ্ঞানকে প্রকাশ করা হয়। এখন কথা হচ্ছে ঐ ভাষাটা কিভাবে তৈরি হচ্ছে? অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। কোন জ্ঞানই অভিজ্ঞতাহীন নয়। অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করেই জ্ঞানের বিস্তৃতি বাড়ে আর জ্ঞানের বিস্তৃতি মানেই নতুন নতুন জ্ঞানের উদ্ভব। যে অভিজ্ঞতা ভাষার মধ্যে দিয়ে নতুন ধরনের জ্ঞান বা অভিজ্ঞতার সম্প্রসারণ ঘটাচ্ছে তাকে বলা হয়ে থাকে সংশ্লেষী বচন ‘যখন কিছু না থাকে, কিছুই নিমেষলভ্য নয়,/ তখোন কেবলমাত্র বিরহ সহজে পেতে পারি!/ তাকেই সম্বল ক’রে বুঝি এই মহাশূণ্য শুধু/ স্বতঃস্ফূত জ্যাৎস্নায় পরিপূর্ণ মুগ্ধ হতে পারে।’ এই পুঙক্তিগুলির উদ্দেশ্যটা কি বলতে চাইছে? এটাই বলবার যে শূণ্যতার মাঝে লয়হীনতার মাঝে শুধু বিরহ আছে যার প্রাপ্তি অনেক সহজলভ্য কিন্তু ঐ যে বিধেয়তে বলা হল এই শূণ্যতার মাঝেও মুগ্ধ হওয়া সম্ভব। এটা কোন নির্দিষ্ট কোন শূণ্যতার কথা নয় এটা মহাশূণ্যতা হতে পারে অল্প শূণ্যতা হতে পারে স্থান এবং কালের মধ্যে দিয়েই এই অভিজ্ঞতা একেক জনের একেক রকমের হওয়ার সম্ভবনায় সম্প্রসারিত। বিনয়ের এই সংশ্লেষী বিশ্লেষী বচন তার কবিতার একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য। বিনয় তার কবিতা যাপনের মধ্য দিয়ে যেনো কোন সুনিশ্চিতির দিকেই পৌছাতে চাইছেন। ক্রমাগত অভিজ্ঞতার  সংশ্লেষণী বিশ্লেষী বচনের মধ্য দিয়েই নিজের অন্তর্বয়ানকে প্রকাশিত করতে চেয়েছে।

নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও অনুভবের ভেতর দিয়ে আমরা একে অপরের অনুভবের সংস্পর্শে আসি। সংস্পর্শ তখনই আলোড়ন তৈরি করে যখন পারস্পারিক অভিজ্ঞতা ও অনুভবের কণাগুলি সম্মিলিতভাবে বিক্রিয়াটা ঘটায়। পৃথিবীতে ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনার সাথে যে প্রতি মুহূর্তের সংশ্লেষ ও সম্পর্ক রয়েছে। অতি তুচ্ছ বলে যে সকল ঘটনা প্রবাহকে আমরা প্রায় সচেতন দৃষ্টির আলোচনার বাইরেই রাখি কিন্তু এই সকল অতি ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র মুহূর্তগুলির এক যৌথযোগ ফলের মধ্য দিয়েই মানুষের অজ্ঞিতা অনুভব ও জ্ঞানের বিস্তৃতি ঘটে তা বিনয় খুব নিবিড়ভাবেই জানতেন। তাই তিনি কোন প্রকার অতি কাল্পনিক কিছুকে তার কবিতার বয়ানের মধ্যে কখনো স্থান দেননি। জ্ঞানের যে অবারিত সম্প্রসারিত রূপ সে রূপের প্রতিকের মধ্য দিয়েই তার বাক্যবন্দন। তিনি যা ধারণা করেন এবং যা প্রকৃতই বস্তুরূপে বর্তমান তার মধ্যে সংযোগ স্থাপনের জন্য তিনি কখনোই অভিজ্ঞতা ও অভিজ্ঞতা নিরপেক্ষ বস্তুজগতের বাইরে পা ফেলেন না। কারণ তিনি জানেন মানুষের অভিজ্ঞতার বাইরে আসলেই কোন কিছুর কোন অস্তিত্ব নেই। ফলত বাড়তি অলঙ্কার ব্যবহার তার স্বভাজাত হয়নি কখনো। গণিতের মতন সবচেয়ে বিশুদ্ধ বিজ্ঞানের পাঠ থাকার কারণে তার মনস্তত্বে কখনোই কল্পনা বিলাসীতার আশ্রয় নেয়নি। তিনি যে কল্পনা ও ধারণার কথাগুলি বলেন তাও ঐ পূর্ব সূত্রতার সর্বশেষ  যুক্তি কাঠামোর উপর নির্ভর করেই বলেন। এভাবে কথা বলার ভঙ্গিটা বাংলা কবিতার রাস্তায় বিনয়ের পথচলার মধ্যে দিয়ে আমরা খেয়াল করি। এভাবেও যে জগৎ এবং সমস্ত কিছুর একটা ঝরঝরে অনুভূতিময়তার প্রকাশ হতে পারে বিনয়ের পাঠপূর্বে এই ধারণা বাংলা সাহিত্যে সম্পূর্ণ অনুউপস্থিত। অনেকই হয়ত বলবে এই স্মার্ট প্যার্টান বা এই বিজ্ঞাণমনষ্কতা আমাদের কবিতার উত্তরাধিকারের বিপরীত স্রোত কিংবা পশ্চিমা অতি বাস্তবাদিতার একটা লক্ষণ। কিন্তু একবার মনোযোগ সহকারে আলো ফেলে দেখেন তো যা শ্বাশত সত্য হিসেবে এখনো পর্যন্ত বর্তমান তা পৃথিবীর সকল স্থান-কালে একই রকম। তার কোন তারতম্য নেই ততোক্ষণ পর্যন্ত যতোক্ষণ না নতুন কোন শ্বাশত যুক্তি কাঠামো এসে পূবৃতনকে ভুল প্রমাণ করছে।। বিনয় ঠিক এই জাগায়টাতেই বাংলা কবিতার এক নতুন দিগন্তের দিকে আমাদের পথ দেখিয়ে দেন। যে শুধুমাত্র ভাবকে নমস্য করেই আমাদের জ্ঞানকান্ড বিস্তৃত হয়ে উঠেনি। আমাদের এই ভূমিতেও যৌক্তিক জ্ঞানের আদি বীজ তার সতন্ত্রতা নিয়েই উপস্থিত আছে। শুধুমাত্র পূর্বতন সৃষ্টির প্রকাশের ধারাবিহকতার মধ্যে দিয়ে চাঁদ নক্ষত্র মহাকাশ প্রেম বিষন্নতা উদাসিনতার প্রতিক হয়েই আসে না। নক্ষত্রমন্ডলের যে স্বাভাবিক গতি ও তার সাথে যে বৈজ্ঞাণিক যুক্তিকাঠামোর সম্পর্ক ও সে সকল সম্পর্কের যে সূত্রবদ্ধতা এবং সাবলিলতা অতি সাধারণ ঘটনাবলির সাথেও যে সেই সকল যুক্তির জগতে আনায়াসে খাপখায়ানো সম্ভব সেই সম্ভাবনার বহুরৈখিক উদারণ আমারা বিনয়ের লাইনে লাইনে খুঁজে পাবো। এভাবেই কেন কবিতার মতন শিল্পের সর্বোচ্চ মাধ্যম নিয়ে কাজ করার ভাবনা। শিল্প যে জীবনের বাইরের কিছু নয় এবং জীবন যে এই মহাবিশ্বের যে স্বাভাবিক অনুসিধান্তগুলি আছে তার বাইরের কিছু নয় এই সত্যের সাথে  নিবিড়ভাবে পরিচয় ঘটে গেলে এভাবে কথা বলা ছাড়া আর কোন গন্তব্য কি আছে বা আছে অতিশয় উক্তির প্রয়োজনীয়তা। খুব সমাজ সচেতন মানুষ হয়ত বিনয়ের এই আত্মনিবেদিত পরিভ্রমণের সত্যতাকে সমালোচনার মদ্যে ফেলবেন এই বলে যে, তার লেখায় চিরায়ত শতসিদ্ধতার প্রতি মোহ ছাড়া আর কি রয়েছে। কোথাও তিনি প্রাণকে উজ্জিবিত করে তুলছেন কোথায় জ্ঞানের অগ্রসর সম্পসারণ ঘটেছে ইত্যাদি আরো নানান প্রশ্ন। এই প্রশ্নগুলিই প্রমাণ করবার জন্য যথেষ্ট যে বিনয় এমন এক অনুসন্ধানের অভিজ্ঞতা আমাদেও সাথে ভাগ করে নিয়েছে যার সাথে আমাদের মুখ দেখা-দেখি থাকলেও ঘনিষ্ট কোন পরিচয় নেই। এই পরিচয় না থাকাটা অপরাধ নয়। এটাই সেই সামাজিক বৈষম্যেও ফসল যা আমরা বহুকাল ধরেই ভোগ করে এসেছি এবং সেই চিন্তা প্রবহারে অবক্ষয় যাকে স্থির ধরে নিয়ে আমরা আমাদের সকল ভাবনার প্রসরা সাজিয়েছি। কিন্তু কবিমাত্রই তো বিবর্তন আকাঙ্খি। হয়ত বৈপ্লবিক শব্দের মধ্যে দিয়ে উচ্চকিত ভাবনার তীব্রতা নিয়ে নিয়ে বিনয়ের ভাবনা জগৎ আমাদের সামনে প্রসারিত নেই। কিন্তু যে আলোক নিয়ে উদ্ভাসিত আছেন তাই হবার কথা মননের মধ্যে সেই আলোক রোপন করা যার রোশনাইয়ে সকল অনির্নয়ের দিকে যাত্রার পথ খুলে যায়।

Comments

comments

এহসান হায়দার

এহসান হায়দার

এহসান প্রকৌশলী রূপে পড়াশোনা করলেও, পেশায় সাংবাদিক। জন্ম-৩০ মার্চ। জন্মস্থান খুলনা, বসবাস করছেন ঢাকায়। এহসান বর্তমানে ‘রূপকথা’ নামে একটি শিশু-কিশোর পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। নিজেকে পরিচয় দেন ছোটকাগজ কর্মী হিসেবে। কারণ, কবিতা প্রবন্ধ এই ছোটকাগজেই ছাপতে ভালো লাগে। একান্ত ইচ্ছে শিশুদের জন্যে একটি নতুন ধরনের জগত তৈরি ‌‍করা। ছেলেবেলায় শিশুসাহিত্যর প্রতি যে আগ্রহ জন্মেছিল তা থেকে দূরে যাওয়া যায়না- আর তাই শিশুদের নিয়ে লিখতে ভালো লাগে। ইমেল : shubornoarjo@gmail.com

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি