সাম্প্রতিক

অচলায়তন । আবু উবায়দাহ তামিম

এখানেও চায়ের লিকার কড়া করে দিল, আমার রাশির সাথে এই বিষয়টা চুম্বকের মতো জড়িয়ে আছে —নতুন কোন অপরিচিত দোকানে গিয়ে হালকা করে চা চাইলে চাঅলা নির্দ্বিধায় তিতা চা করে দিবে। মনে হবে যেন আজিবনই তার কাছ থেকে ওরাকম চা খেয়ে এসেছি। আর ঐ চা আমার পেটে যাওয়া মাত্রই নাড়িভুড়ি সব জ্বলতে জ্বলতে ছিড়ে যাওয়ার উপক্রম। সেই ভোর ছয়টা নাগাদ বাড়ি খেকে বেরিয়েছি। সকালে মাত্র দুই গ্লাস পানি খেয়েছিলাম। অন্যদিনে অবশ্য পানির সাথে পাউরুটি বা কলা খাওয়া হয়। কিন্তু আজকে রাগ আর ক্ষোভের তীব্র যন্ত্রণা ওসবের কথা ভুলিয়ে দিল। গত রাতে আমার একটা উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি ধরে কাজের মেয়েটা চুলোয় দিয়েছে। আমি মাকে বারবার বলেছিলাম বাইরের মানুষ বাড়িতে রাখা ঠিক হবে না। যতসব উল্টাপাল্টা কাজ করে বসে, আবার গায়ে হাত তোলা যায়না। কালও আমি নিজের হাতকে যথেষ্ঠ সংবরণ করেছিলাম, যেহেতু আমি গল্পকার হতে চলেছি —গল্পকারদের এসব কাজ নাকি মানায় না। আমি ইতিমধ্যে একটা কনফিউশনে পড়ে গিয়েছি —পাণ্ডুলিপিটা আসলেই কি কাজের মেয়েটি পুড়িয়েছিল নাকি মা! কাজের মেয়েটা পুড়ালে সে না বুঝেই পুড়িয়েছে, হয়ত আমার ঘর ঝাড়ু দিতে গিয়ে টেবিলের নিচে দেখে-বেদরকারি বুঝেই এটা করেছে। আর মা’র দ্বারা যদি হয়ে থাকে, তাহলে নিশ্চিত, মা না দেখে পোড়ায়নি। পাণ্ডুলিপির সদরে একটা প্যারা ছিল, যেটায় পেন্টি আর ব্রার বর্ণনা বিস্তরভাবে লেখা, মার চোখে হয়ত ওটাই পড়েছে। মা তো এমনিই লেখালেখি করতে নিষেধ করে। তারপরে ওটা দেখে ভেবেছে ছেলে নিশ্চয় মাত্রাতিরিক্ত খারাপ হয়ে যাচ্ছে, —এরপর ধরেই চুলোই ভরেছে সেটা। নাহ্, কারো উপরই শিওর ভাবে দোষটা দেয়া যাচ্ছে না এখন। যেহেত বিষয়টা পুরোপুরিই আমার অগোচরে হয়েছে। এসব আগোছালো চিন্তা করতে করতে চাঅলা চায়ের কাপ নিতে এলো আমার কাছে। আমি বললাম, —চা এতো কড়া দিলেন ক্যানো! আপনাকে না দুবার করে বললাম হালকা বানাতে! চাঅলা মুখ কাঁচুমাচু করে বলল, -আমি খ্যাল করি নাই আপনার কতা। আরাকটা পাঠাই দিমু?

—দিয়েন।

আমি আবার হালকা মেজাজে ফিরতে চেষ্টা করলাম। মিনিট দশেক পরে বার তের বছরের একটা মধ্যম গড়নের মেয়ে তড়াক শব্দ করে টেবিলের উপর চা দিয়ে গেল। বলল, দ্যাখেন তো ঠিক হইছে কিনা। চায়ে চুমুক দিতে দিতে আমার মনে হল, মেয়েটার কন্ঠস্বরের সাথে আমি পূর্ব পরিচিত। চেনবো বলে চোখ উঠালাম, ততক্ষণে সে পেছন ফিরে হাঁটা দিল। হয়ত মেয়েটা চাঅলার মেয়ে, আবার নাও হতে পারে। এই অচেনা কাউকে চেনা চেনা মনে হওয়া, এটা একটা সাইক্লোজিক্যাল প্রবলেম। সেটাও হতে পারে। যা হবে হোক তো!

তো সেই মেজাজ খারাপের কথায় ফিরে আসি, গতপরশু উপন্যাসের যে অংশটা আমি লিখেছি, ওটা সিরিয়াস কিছু ছিল বলে মনে হয়। কত সুন্দর করে করে রাত জেগে লিখেছিলাম। সেটা এখন চুলোর আগুনে ছাই হয়ে গেছে। হঠাৎ মনে হল, এভাবে থেকে থেকে আফসোস করে লাভ নেই। ওরচে’ বরং নতুন করে লেখা শুরু করে দিই, ভালো হবে। কিন্তু মা যদি ওটা পুড়িয়েই থাকে, তাহলে সব পড়ে ফেলেছে। তার মানে শেষ পর্যন্ত মাও জেনে গেল জীবনের গোপন কথাগুলো। অথচ এটা কখনোই পরিবারের কাউকে জানানোর ইচ্ছা ছিলনা আমার।


রাতে এসে ল্যাপটপ অন করে বসলাম। উপন্যাসের ঐ পার্টটা আবার লিখতে হবে। মনে মনে গুছিয়ে নিচ্ছি, কিছুক্ষণ লিখছি। মাঝে মাঝে গত হওয়া পাণ্ডুলিপিটার পরে আফসোসটা আছড়ে পড়ছে। কী যন্ত্রণা! আমি মন থেকে ঝেড়ে ফেলছি বারবার। আবারো মৌমাছির মতো উড়ে উড়ে মাথায় বসছে। বুঝতে পারলাম, ভেতরে অতিরিক্ত মায়া কাজ করছে। পৃথিবীর অনেক জ্ঞানীরা বলেছেন, যে কোন জিনিসের উপর অতিরিক্ত মায়া বাড়ানো অনুচিৎ।

অনেকদিন হলো, আমি কোন মেয়েকে মন সঁপে দেইনি বা নেইনি। তাই বলে আমার সমবয়েসী বন্ধুরা বসে নেই, ওরা রীতিমত প্রেম করে আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে। শুধু তাই না, প্রেম সংশ্লিষ্ট বিষয় গুলোতেও ওরা হেভি এক্সপার্ট হয়ে উঠেছে। আমাকে প্রায় সাক্ষাতে ওরা বলে, -দোস্ত, তুমি তো লেখালেখিটাই বৌ বানিয়ে ফেলেছো। প্রেমের মজা পাইলা না।

আমি কৃত্তিম উৎসুক হয়ে বলি,
—কেমন মজা পাচ্ছিস তোরা?
ওরা দাঁতগুলো কেলিয়ে হাসতে হাসতে বলে,
—এই যেমন মেয়েদের ঠোঁট চোষা, বুক খাওয়া, মোটা মোটা…!
—থাক, বুঝেছি।

এভাবে আমি ওদের কথা থামিয়ে দিই প্রায়শই। শুনতে ভালো না-লাগার কারণে থামাই না। থামানোর হেতু হল, এসবের সাথে আমার একটি বেদনা মিশ্রিত কাহিনী জড়িয়ে আছে। কাহিনী তেমন বলার মতো কিছু নয়, আবার বলার মতো বললেও ভুল হবে না।

আজ থেকে সম্ভবত ছয় অথবা সাত বছর আগে হবে, আমি খুলনা থেকে সাতক্ষীরায় গিয়েছিলাম পড়াশোনার জন্য। ইন্টারমিডিয়েট ফাইনাল ইয়ারে পরীক্ষা দেব। যাওয়ার সময় আব্বু বারবার সতর্ক করে বলেছিল, —যা পারিস করিস, অন্তত মেয়ে টেয়ের পিছে পড়িস না, তামিম। প্রেমের চিন্তা তখন অব্দি আমার মাথায় ছিলনা, কিন্তু আব্বুর নিষেধ করাটা যেন আমাকে আরো আগ্রহ বাড়িয়ে দিল। আমি সেখানে বড়চাচার বাড়িতে খাই দাই, পড়াশোনা করি। ভাগ্যক্রমে ওখানে ছোটখাটো একটা চাকরিও জোগাড় হয়ে গেল আমার। বেতন অল্প। তবু ওতেই আমার তৃপ্তি। গরিবের একটু টাকা পয়সা হলে যা হয়, আমারও তো তার ব্যতিক্রম কিছু হলনা। আব্বুর নিষেধ ডিঙিয়ে আমার প্রেমের কৌতুহল মিটালাম, কলেজের একটা মেয়ের প্রেমে পড়ে, রূপা। ও মনে হয় আমাকে দারুণ পছন্দ করত, মনে মনে বিয়ে, সংসারের স্বপ্নও দেখত। মধ্যবিত্ত মেয়েদের এই একটা গুণ বা দোষ হলো, —এরা খুব দ্রুতই প্রেমিকের সাথে ঘর বাধার স্বপ্ন দেখে। তবে বিয়ে-শাদির ব্যাপারটা তখনও কল্পনায় আসেনি আমার। এখন ঠিক পাই, সেসময় শুধু আবেগ দিয়েই প্রেম করেছি, পয়সা খরচ করেছি। উন্মত্ত হয়ে গায়ে জড়িয়ে ধরেছি। ওকে আনন্দ দিয়ে গেছি সবসময়।

একবার বাংলা নববর্ষের দিন রূপা আমাদের বাড়ি আসার জন্যে বায়না ধরল, আমি ওকে খুব করে বুঝালাম, —ওটা তো আমাদের নিজেদের বাড়ি নয়, চাচার বাড়ি, আর চাচা কড়া মেজাজের লোক। গার্লফ্রেন্ডকে বাড়িতে ওঠানো উনি সহ্য করতে পারবেন না, দুজনকেই অপমান করবেন। রূপা নাছোড় হয়ে লেগেই থাকলো। আমি সাময়িক একটা ওয়াদাও জুড়ে দিলাম, বললাম —এবার ছুটিতে খুলনা নিয়ে যাবো মনমতো ঘুরবো, অন্তত এখন আমাকে বাঁচাও। কোন বোঝানোতে কাজ হলো না। শেষমেষ ঐদিন সন্ধ্যের কিছু পরে লুকিয়ে লুকিয়ে ওকে নিয়ে ঢুকলাম বাড়িতে। সবাই তখন টিভির ঘরে উন্মাদ ছিল বলে আমাদের প্রবেশ ঠিক পেলনা। রূপাকে আমার ঘরে নিয়ে বসালাম, ও আমাকে জড়িয়ে ধরে গালে মুখে চুমু দিতে লাগলো। আমি ওকে উঁচু করে খাটের পরে নিয়ে পড়লাম। আমি কন্ঠে আহ্লাদ এনে বললাম, এতো পাগল কেন গো তুমি?

—পাগল নয়, পাগলি।
—তোমার বুক দেখবো, দেখাবে।
—নাহ্। ওসব দেখতে নেই।
—দেখাওনা পাখি।
—বিয়ের পরে দেখো।

আমি বুঝতে পারলাম ও নিজে থেকে বুক দেখাবে না। আবারো বললাম,
—দেখাবে না পাখি?
—না বললাম তো, তুমি তো ছোট বাচ্চা।’ বলে হা হা করে হেসে পড়লো। আর আমি হঠাৎ এক ঝটকায় ওর লাল ব্লাউজ ধরে টান দিলাম, মুহুর্তে আমার সামনে শাদা ধবধবে দুটো স্তন বের হয়ে আসলো। ও জোরে একটা চিৎকার দিয়ে ব্লাউজের দু’পাশ একসাথে চেপে ধরে বলল,
—খবরদার!!

আমি ঠিক কী করবো বুঝে উঠতে পারলাম না ভয়তে। এর ভেতরে ওর চেচানি শুনে চাচি আম্মা দরজা ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়লেন। রূপার দিকে তাকিয়ে মুখ বন্ধ হয়ে গেলো তার, —রূপার একহাতে ব্লাউজ ধরা, আরেকহাতে শাড়ির আঁচল। চাচি আম্মার কপাল গোটানো আর মোটা চোখ নিয়ে শক্ত মুখে তাকাল আমার দিকে। চাচির গরম চোখের তাপে আমি আলমারির পাশে দ্বিতীয় আলমারি হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলাম। চাচি আম্মা কোন কথা না বলে ধুড়ুম করে দরজা ঠেলে চলে গেলেন। এর পরের স্টেপ হলো পুরো বাড়ি জানা-জানি হওয়া। তাই আমি তড়িঘড়ি করে কোনমতে ওকে নিয়ে ঘর থেকে বের হলাম, উঠোনে চাচা অগ্নিমূর্তি হয়ে দাড়িয়ে আছে। আমি কোন কথা না বলেই উঠোন পার হতে লাগলাম। চাচা বললেন,

—চলে যাও আপাতত, আর কাল খুলনা চলে যেও। এ বাড়িতে মাগি পোষার জায়গা নেই।

আমি কোন কথা না বলে রূপাকে নিয়ে বের হয়ে গেলাম। রূপা বলল, —আমি একা যেতে পারবো! তুমি চলে যাও।

আমি তারপরেও কদমতলা বাজার পর্যন্ত ওকে এগিয়ে দিলাম, ওখান থেকে কিছুদূর হেঁটে ওদের বাড়ি, ও চলে যেতে পারবে। আর আমি শুধু আমার বোকামির জন্য মনে মনে ‘শিট’ বলতে বলতে গলা ভিজিয়ে ফেললাম। এই এতক্ষণ যে রাতের কথা বললাম, এটাই সেই বেদনা মিশ্রিত কাহিনী। আর এইগুলোই লেখা ছিল গত হওয়া পাণ্ডুলিপিতে।

এরপরের দিন আমার সাথে রূপা দেখা করেনি। বোধহয় ও রাগ করেছে আমার উপরে। এভাবে দ্বিতীয় দিন গেল, তৃতীয় দিন গেল। ওর সাথে আমার কোন সাক্ষাৎ হল না। আমারও ভেতরে ভেতরে ওর পরে রাগ হতে শুরু করলো, তারপর সেটা অভিমানে রূপান্তরিত হলো। হঠাৎ একদিন খুলনা থেকে খবর পেলাম আমার ছোটবোন জয়নব সিরিয়াস অসুস্থ, আমি হন্তদন্ত হয়ে ছুটলাম সে রাতে। পৌছে শুনলাম জয়নব মারা গেছে। ওর নিউমোনিয়া হয়েছিল। জয়নবের মৃত্যুতে মনে প্রচণ্ড ধাক্কা খেয়েছিলাম, সেই আঘাতে আর সাতক্ষীরায় যাওয়া হলো না আমার। ওদিকে রূপার কথাও ভুলতে বসলাম আমি। এরপরে তারেক মামার ঘ্যাচড়ানিতে আবারও লেখালেখি শুরু হল, উনি তো আমাকে গল্পকার বানিয়েই ছাড়বেন। আমার শুনে হাসি পেল।


ল্যাপটপ বন্ধ করে ঘুমানোর জন্য উঠলাম, হঠাৎ মনে হল, —যে বাচ্চা মেয়েটাকে আজ চায়ের দোকানে দেখেছি, ঐ মেয়েটাই তো একদিন রূপার সাথে ঘুরতে গিয়েছিল কলেজে। কিন্তু ও রূপার কেমন আত্মীয় হত, মনে নেই। কখনো শোনাও হয়নি। কিন্তু ঐ মেয়েটি এখানে এলো কীভাবে? আমার ভাবনা সব এলোমেলো হয়ে গেল। পরদিন বুধবারে খুব ভোরে গেলাম সেই চায়ের দোকানে, তখন চাঅলা দোকান খুলছে মাত্র। আমি দৌড়ে গিয়ে বললাম,

—আপনার মেয়েটা কৈ?
—আমার মেয়ে কোতায় পাইলেন?
আমার চোখ কপালে উঠার কাছাকাছি, ওনার মুখের কাছে গিয়ে বললাম,
—কালকে যে মেয়েটা আমার চা দিয়ে গেলো, সে কী হয় আপনার?

—আপনি আইছিলেন কিনা এইডাই তো মনে নাই, তা ক্যামনে কমু কে আপনেরে চা দিল! মাথার ভেতরে প্রচণ্ড চাপ এসে ভর করতে শুরু করেছে ততক্ষণে। নাহ, কোনভাবেই মেয়েটির আর খোঁজ পাওয়া গেলনা। আমি নিরুপায় হয়ে পা বাড়ালাম বাড়ির পথে! ফাঁকা রাস্তায় কোন মানুষ নেই। কয়েকটা মালবাহী ট্রাক রাস্তা কাপিয়ে চলে যাচ্ছে মাঝে মাঝে। আমি উদাস মনে তাকিয়ে দেখছি, বড় রাস্তা মাড়িয়ে রূপা আমার দিকে এগিয়ে আসছে। আমি দূর থেকে হাত ইশারা দিয়ে বললাম, —রূপা! এইযে আমি দাড়িয়ে আছি, এখানে।

Comments

comments

আবু উবায়দাহ তামিম

আবু উবায়দাহ তামিম

গল্প ও কবিতা লেখে সময় খরচ করছেন, ছাত্রত্ত কাটেনি এখনো। জন্ম ২৯শে আগস্ট খুলনার খানজাহানআলী থানাধীন মিরেরডাঙ্গা গ্রামে ১৯৯৫ সনে।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি