সাম্প্রতিক

চাকরি হারানোর সতেরতম সন্ধ্যায় একটি গ্রীষ্মকালীন স্বপ্ন । হাসান আওরঙ্গজেব

চাকরিটা হারিয়ে তখন আমি একেবারে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম; সত্যি বলতে কি, দিশেহারা হওয়া ছাড়া আমার আর কোনো উপায়ই ছিলনা! মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়া বলতে যা বোঝায় বিষয়টা ছিল তারচেয়েও বেশী রকমের কিছু। একজন সদ্য বিবাহিত যুবক, পারিবারিক প্রবল বিরোধিতা ও আপত্তির মুখে, যথাযথ জাগতিক প্রতিষ্ঠা ও প্রতিপত্তি লাভের পূর্বে যে কিনা বিয়েটাকেই জীবনের একমাত্র লক্ষ ঠাওরেছিল আর বিয়ের চারমাসের মাথায় সে চাকরিটা হারায়, তার মাথায় আকাশ কেন, মহাবিশ্বের পুরো কাঠামোটাইতো ভেঙ্গে পড়ার কথা!

তবে আমার এই চাকরিহীন অস্থির-চিত্ত দিশেহারা অবস্থার পুরোটাই ছিল ভেতরে-ভেতরে। বাহিরে সবসময় একটা বেশ ভারিক্কি ও দশাসই ভাব বজায় রেখে চলতাম। কাউকে বুঝতে দিতাম না যে আমার চাকরিটা নেই। আমি একটা অথর্ব, একটা যথার্থ অপগন্ড, একটা কপর্দকহীন ও দিবাস্বপ্নগ্রস্ত— এমনটা যেন কেউ ভাবতে না পারে এবং তাচ্ছিল্য করার সুযোগ না পায় সেজন্য সবসময় আমাকে বেশ কায়দা করে চলতে হতো। এমনকি মা এবং স্ত্রী, দুজনের কাউকে ব্যাপারটা বুঝতে দেইনি। প্রতিদিন সকালে ভোরে ঘুম থেকে ওঠে অফিসের জন্য প্রস্তুত হতাম। মা খাবার রেডি করতেন। দুপুরে খাওয়ার জন্য প্লাস্টিকের লাল একটা কন্টেইনার বক্সে খাবার ভরতে ভরতে মা বলতেন—“তাড়াতাড়ি খাইয়া নিছ। গরমে ভাত নষ্ট হইয়া যাইব”। ‘আচ্ছা, খাবনে’ বলে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়তাম। সন্ধ্যায় সত্যিকারের অফিস ফেরত লোকেরা যেরকম কর্ম-ক্লান্তি, অবসন্নতা ও জগতের প্রতি সীমাহীন বিতৃষ্ণা নিয়ে ঘরে ফেরে- আমিও তেমনি ফিরতাম।

আসলে আমার এই অফিস-অফিস ব্যাপারটার পুরোটাই ছিল ভুয়া। অফিস বলতে তখন আমার কোনো কিছুই ছিলনা। শুধু চারপাশের মানুষগুলোর ঘৃণা ও কটাক্ষ এড়িয়ে চলার জন্য অফিস নামক বায়বীয় ব্যাপারটাকে বাঁচিয়ে রেখেছিলাম। তাছাড়া আমার প্রবল বিশ্বাস ছিল যে আরেকটা চাকরি আমি শীঘ্রই পেয়ে যাব। তখন একমাত্র আমি ছাড়া জগতে আর কেইবা জানবে যে বিয়ে করার পর কিছুদিন আমি বেকার ছিলাম!

আমার চরম দুর্দশাগ্রস্ত ও উন্মাদপ্রায় দিনগুলোতে একমাত্র এই প্রত্যয়টি আমাকে বেশ উৎসাহ জুগিয়েছিল।

চাকরি হারানোর পর প্রতিদিনই সকালে ঘর থেকে বেরিয়ে লিংক রোডের মুখে এসে স্থির করতাম আজ আমি কোনদিকে যাব।  কোনোদিন যদি ইন্টারভিউ কিংবা চাকরির সন্ধানে বিশেষ কারো সাথে সাক্ষাতের শিডিউল বা আগ্রহ না থাকত তাহলে সেদিন সারাটা দিন উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়াতাম। প্রায়ই সদরঘাট চলে যেতাম। জাহাজঘাটায় নোঙ্গর করা কোন একটা জাহাজের ব্রিজে ওঠে নদীর ওপারে চেয়ে থেকে একটানা ঘন্টার পর ঘন্টা বসে কাটিয়ে দিতাম। বন্দরে নোঙ্গর করতে আসা জাহাজগুলোর কারনে সৃষ্ট ঢেউ আর বন্দর ছেড়ে যাওয়া জাহাজগুলোর কারনে সৃষ্ট প্রস্থানগামী ঢেউয়ের প্রতিক্রিয়া কিভাবে বুড়িগঙ্গার ওপর প্রভাব বিস্তার করে তা দেখতাম।  কোনোদিন বিমানবন্দরে চলে যেতাম। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিদেশফেরত এবং বিদেশগামি মানুষগুলোর মুখের বিচিত্র সব অভিব্যাক্তি পড়তে চেষ্টা করতাম। প্রিয়জনদের কাছে ফিরে আসার আনন্দ এবং প্রিয়জনদের ছেড়ে যাবার বেদনা তাদের চেহারায় কিভাবে প্রভাব ফেলে তা বুঝতে চাইতাম। কোনো কোনো দিন বিমানবন্দর রেলস্টেশনে কিংবা কমলাপুর রেলস্টেশনে গিয়ে বসে থাকতাম। ট্রেনে ওঠার জন্য যাত্রীদের হুল্লোড়, হুড়োহুড়ি, ব্যস্ততা আর ট্রেনের অপেক্ষায় বসে থাকা যাত্রীদের অলস প্রতীক্ষা দেখতাম। ব্যস্ততা আর অলস প্রতীক্ষা যাত্রীদের চেহারায় কিভাবে প্রভাব ফেলে তা গভীর অভিনিবেশের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করতাম। এসব কিছুই করতাম আমার ভেতরের হতাশা ও অস্থিরতাকে চেপে রাখবার জন্য; নিজেকে কোনো একটা ভাবনা বা কাজের মধ্যে ব্যস্ত রেখে ক্রমশ বেড়ে চলা উদ্বিগ্নতার নেতিবাচক প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া থেকে মুক্তি লাভের জন্য। তারপর সন্ধ্যা হলে দুশ্চিন্তা ও হতাশায় ক্লান্ত ও অবসন্ন হয়ে ঘরে ফিরতাম। হাতমুখ ধুয়ে পরিশ্রান্ত শরীরটাকে বিছনায় ছুঁড়ে দিতেই একরাশ ঘুম এসে আমাকে আলিঙ্গন করত। ঘুমের মধ্যে যত অদ্ভুত, ভীতিকর, হাস্যকর ও ঘটনাবহুল দীর্ঘ সব স্বপ্ন দেখতাম। ঘুম থেকে উঠে রাতের খাবার খেয়ে পুনরায় শয্যাগ্রহনের আগ পর্যন্ত সেইসব স্বপ্নের রেশ আমার শরীর ও মনের ওপর যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করত। স্বপ্নে দেখা চরিত্র ও স্থানগুলোর সঙ্গে মনে মনে কথা বলতাম। কখনো কখনো ব্যালকনিতে গিয়ে তাদেরকে দিক-নির্দেশনা দিতাম এবং তাদের কাছে বিভিন্ন বিষয়ের ব্যাখ্যা চাইতাম। তাদের ব্যাখ্যা আমার পছন্দ না হলে খুব উত্তেজিত হয়ে পড়তাম আর তাদেরকে প্রহার করতে শুরু করতাম। প্রথম দিককার প্রহারগুলো থাকত মৃদু ও ঈষৎ ব্যাথাময়। তাতে তাদের চিৎকারের চেয়ে গোঙানি ও অনুনয় প্রকাশ পেত বেশী। তারপর প্রহারের মাত্রা যখন বৃদ্ধি পেত, তাদের চিৎকারের মাত্রাও বৃদ্ধি পেত সমানতালে। আর বলাইবাহুল্য, পুরো সময়টাজুড়ে আমার ক্ষমতা, প্রভাব ও নিয়ন্ত্রন থাকত নিরঙ্কুশ। ঘুমের মধ্যে স্বপ্নগুলো আমাকে যতোটা নিয়ন্ত্রন করত এখানে পরিস্থিতির ঠিক ততোটাই নিয়ন্ত্রন থাকত আমার হাতে। আর এতসব কিছু ঘটত খুবই দ্রুত ও সন্তর্পণে। আমার পরিবারের কেউ তা ঘুনাক্ষরেও টের পেত না।

মায়ের প্রতি খুব রাগ হল। তিনি এমনটা না করলেই কি পারতেন না? শতহোক, সারা দুনিয়ার প্রেসিডেন্ট তিনি। তিনি চাইলে কি না করতে পারেন! আমার গা শিরশির করে উঠল। মায়ের এমন আচরন আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না।

গ্রীষ্মের মাঝামাঝি এমনি এক সন্ধ্যায়, চাকরি হারানোর সতেরতম দিনে, আমি শুয়েছিলাম বিছানায় আর চোখে নেমে এসেছিল রাজ্যের ঘুম। তখনি স্বপ্নটা দেখি।

স্বপ্নে দেখি আমি একটা অতি পুরোনো ও জরাজীর্ণ রেলসেতুর ওপর বসে আছি। সন্ধ্যাবেলা। যেভাবে বুড়িগঙ্গার জাহাজঘাটায় জাহাজের ব্রিজে উদাস ও বিষণ্ণ হয়ে বসে থাকতাম। ঘরে ফিরব ফিরব ভাবছি। এমন সময় সেতুটির মুখে একটা ট্রেন এসে থামল।  ট্রেনটিকে দেখে আমার খুব কৌতূহল জাগল। কেননা সত্যিকারের ট্রেন হিসেবে এই ট্রেনটির চরিত্র যেমন হওয়া উচিৎ ছিল সে তার অনেকগুলো দাবি পূরণে মোটামুটি ব্যর্থ। প্রথমত ট্রেনটির হুইসেল ছিল বাচ্চাদের খেলনা বাঁশির মত, যা আমার ভেতরে একটা সত্যিকারের ট্রেন হিসেবে নিরাপত্তাজনিত ভীতির সঞ্চার করতে পারেনি। বগিগুলোর কাঠামো ছিল পুরোনো আমলের ইস্টিমারের মত আর সেগুলো একটার সঙ্গে আরেকটা ছিল পাটের রশি দ্বারা সংযুক্ত। জানালাগুলো ছিল অনন্ত। পৃথিবীর সঙ্গে আকাশের দূরত্বের মত। আর কি অনায়াসে জানালাগুলোর ভেতর দিয়ে একটার পর একটা উড়োজাহাজ ও বোমারু বিমান আসা যাওয়া করছিল। চাকাগুলো ছিল যথাযথ। গতি এতটাই মন্থর ছিল যে আমি বিরক্তবোধ করছিলাম। কিছু লোক ট্রেনটাকে ঠেলে ঠেলে সেতুটির ওপর তুলতে সাহায্য করছিল আর ট্রেনটা বারবার পিছিয়ে যাচ্ছিল। একসময় ট্রেনটা সেতুটির ওপর উঠে এসে থামতেই ঔপনিবেশিক আমলের উর্দিধারি রেলের বাবুদের মত প্রাচীন একজন লোক নেমে এসে আমাকে কুর্নিশ করে মুখে একটা স্মিত হাসি বজায় রেখে বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে, “আপনার চাকরিটা এবার হয়ে যাচ্ছে, জনাব! নিশ্চয় প্রেসিডেন্ট আপনাকে ফিরিয়ে দেবেন না” বলতে বলতে তার খাকি রঙের উর্দির ভেতরে হাত ঢুকিয়ে একটা হলুদ রঙের দেশীয় চিঠির খাম আমার হাতে তুলে দিলেন। আমি বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে লোকটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। মুখে একটি শব্দও উচ্চারন করতে পারলাম না। ট্রেনটা ততক্ষনে আবার চলতে শুরু করেছে। লোকটা আর কোনো কথা না বাড়িয়ে খুব দ্রুত একটা দরজার হাতলে ধরে লাফিয়ে ট্রেনে উঠে পড়লেন। আমি তাকিয়ে দেখতে পেলাম, লোকটা দরজায় দাঁড়িয়ে বুকপকেট থেকে বাঁশিটা বের করে হুইসেল দিতে লাগল আর বাম হাতে একটা পতাকা ওড়াতে থাকল। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছিল, পতাকাটা ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের।

আমি খামটার দিকে তাকালাম। সেখানে লেখা ছিল—
প্রেরকঃ
হোয়াইট হাউস
ওয়াশিংটন ডিসি। ইউএসএ।

প্রাপকঃ
চাকরিহীন বিবাহিত লোকটি।

চিঠিটা খুলে দেখলাম, সেখানে খুব সংক্ষেপে লেখা আছে— “প্রেসিডেন্টের পক্ষে নিমন্ত্রন গ্রহন করুন”।

এমনি একটা উদ্ভট ও হাস্যকর ঘটনা সেদিন স্বপ্নের ভেতরে ঘটতে থাকল যা বাস্তব হিসেবে একেবারেই অসম্ভব। এখানে আপনাদের বলে রাখি, ঘুম ভেঙ্গে গেলে আমি এই মর্মে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হই যে স্বপ্নটা একসময় লিপিবদ্ধ করব। কিন্তু একটা সমস্যা আমাকে ভাবিয়ে তুলল, তা হল, স্বপ্নের চরিত্রগুলো খুবই বাস্তব এবং বৈশ্বিক। এ ধরনের চরিত্রদের নিয়ে কিছু লিখতে বসলে অনিবার্য ভাবে একটা স্থুল ও হালকা সমকালীন মেজাজ আমাকে তাড়া করবে। শেষ পর্যন্ত হয়তো স্বপ্নটাকে যথাযথ অবিকৃত রেখে একটা পরিশীলিত কাঠামো নির্মাণে আমি ব্যর্থ হব— এরকম একটা বদ্ধমূল ধারনা স্বপ্নটি লিপিবদ্ধ করতে আমাকে দীর্ঘকাল নিবৃত্ত করে রেখেছিল।

চিঠিটা পড়ে আনন্দের আতিশয্যে আমি এতটাই অভিভূত হয়ে পড়েছিলাম যে, রেলসেতুর ওপর লাফাতে শুরু করে দিলাম। আমার স্পষ্ট মনে আছে সেতুটা তখন কাঁপছিল। অবশ্য ট্রেনটা ততক্ষনে সেতু থেকে নেমে অদৃশ্য হয়ে গেছে। আমি ভাবতে লাগলাম, এতদিনে আমার একটা হিল্লে হতে চলেছে নিশ্চয়! প্রেসিডেন্টের কাছে সাক্ষাতে আমার চাকরিহীন দুর্দশার কথা সবিস্তারে খুলে বলব। অবশেষে এবার একটা ভাল চাকরির ব্যাবস্থা হবেই। শ্বশুর-শাশুড়ি ও সংসারের প্রত্যেককে একটা মোক্ষম জবাব দিতে পারব। বউটাকে তুলে আনতে আর কোনো বাঁধাই থাকবেনা। আমি আরো ভাবলাম, তিনি যথার্থই একজন মহান প্রেসিডেন্ট। দোর্দণ্ড প্রতাপে দুনিয়া শাসন করে বেড়ান। অথচ দরিদ্র এক দেশের হতদরিদ্র এক চাকরিহীন বিবাহিত দুর্দশাগ্রস্তকে নিমন্ত্রন করে তিনি তার মহত্ত্বকে আরো বাড়িয়ে তুললেন। তিনি কত মহান! তিনি কত মহান! আমার দু’চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল।

চিঠিটা পকেটস্থ করে রেলসেতু থেকে নেমে নদীর তীর ধরে হাঁটতে শুরু করলাম। হাঁটতে হাঁটতে বহুদূরের এক গ্রামে শাদা রঙের টিনের বেড়া দেওয়া একটা বাড়ির সামনে এসে মনে হল আমি হোয়াইট হাউসে পৌঁছে গেছি। বাড়িটার ওপরে আমেরিকার পতাকা উড়ছিল। টিনের বেড়ার মধ্যে ধুলোমলিন একটা নামফলকের মধ্যে কালো অক্ষরে লেখা ছিল—

“হোয়াইট হাউস।
আমেরিকার প্রেসিডেন্টের কার্যালয়”।

আমি খুবই আপ্লুত হলাম। এমন একটা ভাবনা আমাকে সুখী করে তুলল যে, অবশেষে আমার দুর্ভাগ্যের দিন শেষ হতে চলেছে। ভীষণ উত্তেজনার সাথে টিনের দরজায় কড়া নাড়লাম। আমার তর সইছিলনা। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আমার দেখা হতে যাচ্ছে!

ভেতর থেকে কমবয়সী একটা মেয়ে কোমল ও মৃদুস্বরে জানতে চাইল—“কে? কে দরজা ধাক্কায়?”

আমি মেয়েটির চেয়ে আরো কোমল ও বিনীত স্বরে জবাব দিলাম— “আমি। আমি প্রেসিডেন্টের সাথে দেখা করতে আসছি। আমার দাওয়াত ছিল”।

মেয়েটি এবার কিছুটা রূঢ় কন্ঠে জবাব দিল— “বাবা কারো লগে দেখা করতে পারবেনা। বাবা অখন ঘুমাইতেছেন”।

আমি করুণ স্বরে মিনতি করলাম- “দরজাটা খুলে দাওনা মামনি! বিষয়টা খুব ইম্পরট্যান্ট। প্রেসিডেন্ট নিজেই আমাকে দাওয়াত করেছেন। তাছাড়া তোমাকে কথা দিচ্ছি, প্রেসিডেন্টের ঘুম ভাঙলেই কেবল আমি ওনার সঙ্গে দেখা করব। তার আগে নয়। আমাকে শুধু একটু ভেতরে আসতে দাও”!

আমার করুণ মিনতিতে কাজ হল। মেয়েটি আমাকে অপেক্ষা করতে বলে দৌড়ে ভেতরে গেল। খানিক বিলম্বে ফিরে এসে দরজা খুলে দিল। আমি মেয়েটিকে চিনতে পারলাম। প্রেসিডেন্টের ছোট মেয়ে শাশা। একটা মলিন হাফপ্যান্ট আর সুতো ওঠে যাওয়া পুরোনো ফ্রগ পড়ে দাঁড়িয়ে আছে।

“ওমা একি!” দরজা খুলে আমাকে দেখেই শাশা ভীষণ চমকে গিয়ে উচ্ছসিত হয়ে উঠল। “চাচ্চু তুমি এসেছো বুঝি! আমি একদম বুঝতে পারি নাই। সারাদিন দুনিয়ার কত্ত মানুষ যে বাবার লগে দেখা করতে আহে! একটু ঘুমানোরও জো নাই। আচ্ছা চাচ্চু, তুমি কওতো, গোটা দুনিয়াডা চালানো কি চাট্টিখানি কথা! আজকে এই দেশের প্রেসিডেন্ট, কালকে ওই দেশের প্রধানমন্ত্রী, পরশু অমুক দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। খালি কাজ আর কাজ। কাজের কোনো শেষ নাই। আজকে সকাল থেইক্কাই তিন দেশের প্রধানমন্ত্রীর লগে বাবা দেখা করলেন। তারপর যখন খাওনের আগে গোসলে গেলেন, এমন সময় সুদানের প্রেসিডেন্ট আইসা দরজায় ধাক্কানো শুরু করল। বদ একটা।  আমি ঢুকতে দেই নাই। বাবা বাড়িত নাই কইয়া খেদায়া দিছি। তুমি কওতো চাচ্চু, কামডা কি আমি ঠিক করিনাই?”

“হ্যাঁ হ্যাঁ,” আমি বললাম, “তুমি যথার্থই ঠিক করেছো”। আমি এতক্ষনে বুঝতে পারলাম, শাশামনি আমাকে হোয়াইট হাউসের ভেতরে ঢুকতে না দিয়ে বেশ লজ্জা পেয়েছে। তাই লজ্জাটুকু কাটানোর সহায়ক হিসেবে তাকে বেশ একটা আত্মপক্ষ সমর্থন দিতে হল। এতে অবশ্য আমি কিছু মনে করিনি। আমার মনে হতে লাগল আমি বুঝি প্রেসিডেন্ট পরিবারের খুব ঘনিষ্টজন অথবা নিকটাত্মীয় কেউ।  তবে আত্মীয়তার সম্পর্কটি যে ঠিক কি তা আমি ভেবে কোনো কূলকিনারা করতে পারলাম না। এটা বলতেই হবে যে, প্রেসিডেন্ট পরিবারে যে আমি অপরিচিত নই কিংবা এই পরিবারের সঙ্গে আমার যে একটা অজানা আত্মীয়তার যোগসূত্র রয়েছে, এরকম ভাবনা আমাকে বেশ গর্বিত করে তুলল।

টিনের খিড়কি দরজাটা ঠেলে আমরা হোয়াইট হাউসের ভেতরে প্রবেশ করলাম। শাশামনি আমার হাত ধরে বেনি দুটো দুলিয়ে নেচে নেচে ভেতরে প্রবেশ করে চিৎকার করতে লাগল— “বাবা দেখো কে এসেছে! বাবা দেখো কে এসেছে!” বলতে বলতে আমাকে নিয়ে প্রেসিডেন্টের খাস কামরায় প্রবেশ করল।

প্রেসিডেন্ট একটা লুঙ্গি পরে খালি গায়ে ঘুমিয়ে ছিলেন। শাশামনির চেঁচামেচিতে তিনি হাই তুলতে তুলতে জেগে উঠে বিছানায় বসলেন। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন- “ভাত খাওয়ার পর একটু ঘুমাইতে হয়। এইটা অনেকদিনের অভ্যাস। ছাড়তে পারিনা”।

“না, না, ঠিকাছে। ঠিকাছে”। আমি বললাম।  “আপনি অনেক ব্যস্ত মানুষ। একটু বিশ্রাম প্রয়োজন। এটা শরিরের জন্য ভাল”।

প্রেসিডেন্ট লম্বা করে আরেকটা হাই তুলে শাশামনিকে বললেন— “শাশা, তোর মাকে বল আব্বাকে একটা জামা দিতে।  আব্বা পরব”।

শাশা আমার কোলে বসেছিল। বাবার নির্দেশ পেয়ে নিঃশব্দে ভেতরের ঘরে চলে গেল। ভেতরের ঘর থেকে একটানা সেলাই মেশিনের ঘরঘর শব্দ ভেসে আসছিল। ভেতরের ঘরে শাশার প্রবেশ করার কয়েক মুহূর্তের মধ্যে আমি শুনতে পেলাম, আমেরিকার ফার্স্ট লেডি চিৎকার করে বলতেছেন, “ঘুমাইয়া পরলেতো আর তোর বাপের দুইন্যাইর খবর থায়েনা। এইজন্যই চিন আর রাশিয়া মিল্যা ওনারে খুব কইর‍্যা গোয়া মারে। ঘরে যে তেল-নুন-লকড়ি কিচ্ছু নাই, ওনার কি হেই খবর আছে!”

প্রেসিডেন্ট আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। বললেন, “দুনিয়াবি কাজকামে এত ব্যস্ত থাকি যে ঠিকমত বাজার করারও সময় পাইনা”। প্রেসিডেন্টের চেহারায় একটা অপ্রস্তুত ও সলজ্জ ভাব ফুটে উঠল। আমি বুঝতে পারলাম, ফার্স্ট লেডির এমন সাংসারিক ক্ষিপ্র আচরণে প্রেসিডেন্ট ভেতরে ভেতরে কিছুটা অপমানিত বোধ করলেও চেহারায় প্রেসিডেন্ট-সুলভ উচ্চমার্গীয় আভিজাত্যের ভাবটা ধরে রাখতে চেষ্টা করছেন। ইতোমধ্যে শাশা হাতে একটা গেঞ্জি আর বাজার করার থলে নিয়ে ফিরে এসে প্রেসিডেন্টের হাতে দিয়ে “আব্বা, মায় কইছে বাজার লাগব” বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। প্রেসিডেন্ট বাজারের থলেটা অবহেলা ভরে একপাশে রেখে গেঞ্জিটা গায়ে জড়াতে জড়াতে বললেন- “একাই চলে এলেন? নুপুরকে নিয়ে এলেন না? আপনাদেরকে বিবাহোত্তর সম্বর্ধনা দেওয়ার জন্য হোয়াইট হাউস প্রস্তুত ছিল”।

প্রেসিডেন্টের এমন সহৃদয় ও আন্তরিক অভিব্যাক্তির জন্য আমার হৃদয়টা আবেগে বিগলিত হয়ে উঠল। আমি কাচুমাচু হয়ে বললাম— “মাফ করবেন মিস্টার প্রেসিডেন্ট, সপ্তাখানেক পরেই ওর একটা স্কুলে নিয়োগের জন্য নিবন্ধন পরীক্ষা আছে। পরীক্ষাটা পাশের জন্য বেচারি এইবার খুব কইরা কোমর বাইন্ধা লাগছে”।

প্রেসিডেন্ট বেশ উৎসাহের সঙ্গে বললেন, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, এটাকে আমি খুব আপ্রিশিয়েট করি। শিক্ষকতা একটা মহান পেশা। আমি শিক্ষকদের ভালবাসি। আপনি জানেন, ব্যাক্তিগত জীবনে আমিও একজন শিক্ষক ছিলাম। তাছাড়া আমার স্বর্গীয় মা আমার বাল্যকালে ইন্দোনেশিয়াতে কিছুদিন শিক্ষকতা করেছেন”।

কথা বলতে বলতে আমরা শয়ন কক্ষ থেকে বেরিয়ে বাহিরে বসার ঘরে এসে বসলাম। বসার ঘরটা ছিল খুবই জাঁকজমকপূর্ণ। সত্যিকার অর্থে প্রেসিডেন্টদের বসার ঘর যেমন হওয়া উচিৎ এটা ছিল ঠিক তেমন। দেয়ালে টাঙ্গানো ছিল দুর্লভ সব শিল্পকর্ম। এর মধ্যে অধিকাংশই ছিল মানুষের খুলি, স্কেলিটন ও শজারু আর কুমিরের হাড় দিয়ে তৈরি এবং বিলুপ্তপ্রায় পশুদের চর্বি দিয়ে আঁকা। আসবাবপত্র, ফার্নিচার ও বইয়ের আলমিরা থেকে ভেসে আসছিল চন্দন কাঠের সুবাস। দেয়াল ঘড়ির কাঁটাগুলো ছিল হরিণের শিং দিয়ে তৈরি। মিনিটের কাঁটার ওপর মুখ গোমরা করে একটা সোনালি রঙের পেঁচা বসে আমাদের দিকে তাকিয়েছিল। আমার বারবার মনে হচ্ছিল, এই গোমড়ামুখো পেঁচাটির ভাবগাম্ভীর্য প্রেসিডেন্টের বসার ঘরের আভিজাত্যকে আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে।

আমরা দুজন পাখির পালকের মত নরম গদিচেয়ারে বসলাম। গদিচেয়ারে আরাম করে বসে তিনি জানতে চাইলেন— “আপনার শাশুড়ির ডায়াবেটিসের এখন কি অবস্থা?”

“খুব খাটাখাটুনির ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন তিনি”। বললাম আমি। “তাছাড়া বুড়োটা অবসরে আসার পর থেকে মহিলার জীবনটা দিন দিন নরক হয়ে উঠছে”।

“হ্যাঁ, এটা ঠিক যে, এই বয়সের অবসরপ্রাপ্ত বুড়োগুলো যে কোনো সংসারি মহিলার পক্ষে একটা জ্বলন্ত অভিশাপ”। তিনি আমার সঙ্গে সহমত পোষণ করলেন। তারপর বললেন, “তো, এখন কি করছেন বুড়ো ভদ্রলোকটি?”

“নৌকা কিনেছেন একটা। সেটা দিয়ে সুরমা নদীতে মাছ ধরতে চলে যান। সারাদিন নদীতেই কাটিয়ে দেন। তো ইদানিং আবার সমস্যা হয়েছে আরেকটা”।

প্রেসিডেন্ট কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইলেন, “নতুন করে আবার কি সমস্যা বাঁধালেন ?”

“নদীতে মাছ ধরতেন। ভালই ছিল ব্যাপারটা। কিন্তু নদীর অন্যান্য জেলেরা একজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসারকে জেলে হিসেবে মেনে নিতে পারছে না। তারা বিষয়টা নিয়ে বেশ ঠাট্রা তামাশা করছে। তারা ঘোষণা দিয়েছে, নতুন করে তাদের নদীতে কেউ এসে বাগড়া দিক, এটা তারা কিছুতেই মেনে নেবে না”।

“বুড়োবয়সে এসে তাহলে বেশ ঝামেলায় পড়েছেন বেচারা। আহা!” একটা আন্তরিক সহমর্মিতা ফুটে ওঠল প্রেসিডেন্টের কন্ঠে।

“না মিস্টার প্রেসিডেন্ট”। আমি বিনয়ের সঙ্গে বললাম। “তিনি এখন আর নদীতে মাছ ধরেন না। উজানের সময় নৌকা নিয়ে হাওরের দিকে চলে যান। তিনি আমাদেরকে জানিয়েছেন, হাওরের দরিদ্র মৎস্যজীবীরা নদীর জেলেদের মত ততোটা বদমেজাজি নয়। তারা অনেক উদার এবং বন্ধুসুলভ। একসাথে গান গাইতে গাইতে তারা মাছ ধরেন। খুনসুটি করেন। আবার সন্ধ্যা হলে বাড়ি ফিরে আসেন”।

“এইসব দরিদ্র মৎস্যজীবীদের কল্যানে আমার সরকার কিছু উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেবে। অর্থ বরাদ্দ দেবে। আমি চাই তারা আরো সুখী জীবন যাপন করবে”।

“একজন প্রেসিডেন্ট হিসেবে এসবই আপনার যথাযথ উদ্যোগ, মিস্টার প্রেসিডেন্ট”। আমি বললাম।

আমার চোখের দিকে তাকিয়ে তিনি বেশ একটা ব্যাক্তিত্বপূর্ণ হাসি হাসলেন। দরিদ্র মৎস্যজীবীদের কল্যাণে তিনি কিছু করতে যাচ্ছেন, বোঝা গেল, এমন একটা ভাবনায় তিনি বেশ গর্ববোধ করছেন। তারপর টেবিলের ওপরে সাজিয়ে রাখা দুটি গ্লাসে বোতলের ছিপি খুলে মদ ঢাললেন। আমার দিকে একটি গ্লাস বাড়িয়ে দিয়ে নিজের গ্লাসটি হাতে নিয়ে চুমুক দিতে দিতে আবার সেই মৃদু অথচ খুবই প্রানবন্ত হাসিটি হাসলেন। এইরকম একটা ইতিবাচক ও অনুকূল পরিস্থিতির অপেক্ষায় আমি ছিলাম। মৎস্যজীবীদের কল্যাণে প্রেসিডেন্ট স্বপ্রনোদিত হয়ে যখন কিছু করতে চাইছেন তখন আমার বিষয়টাও উপস্থাপন করাই যায়।

“আমার বিষয়টাও যদি একটু বিবেচনা করতেন, মিস্টার প্রেসিডেন্ট” আমি বলতে লাগলাম “তাহলে খুবই বাপের কাজ হত। তাছাড়া আপনি জানেন, চাকরিটা হারিয়ে আমি একেবারে দিশেহারা হয়ে পড়েছি। বউটাকে এখনো তুলে আনতে পারছি না”। কোনো ভনিতা না করে কথাটা বলেই ফেললাম।

“নিশ্চয়, নিশ্চয়। আপনার বিষয়টা আমি অবগত আছি”। প্রেসিডেন্ট দৃঢ়তার সাথে বলতে লাগলেন। “আপনার শ্বশুরকে আমি অনুরোধ করব তিনি যেন তার পেনশনের একটা ভাল অংশ আপনার উন্নত জীবনমান নিশ্চিত করার জন্য ব্যয় করেন। প্রয়োজনে আমি বিষয়টা নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদে একটা প্রস্তাব ওঠাব”। তারপর গ্লাসে আরেকটা চুমুক দিয়ে বললেন, “আর চিন বা রাশিয়া যেন এতে ভেটো দিতে না পারে সে ব্যাপারটাও আমি নিশ্চিত করব। আপনাকে কথা দিলাম”।

প্রেসিডেন্টের এমন কথায় আমি যারপরনাই বেশ হতাশ ও মর্মাহত হলাম। আপনারা জানেন, সবসময় আমি চেয়েছিলাম একটা নিশ্চিত ও দুর্ভাবনাহীন জীবন। একটা ভাল চাকরি, যদিও সেটা কোনোদিনই আমার ভাগ্যে জুটেনি, যা দিয়ে আমি কোনোমতে বউটাকে নিয়ে কাটিয়ে দিতে পারব এবং আর কখনো অন্যের গলগ্রহ হতে হবে না। আমি ভেবেছিলাম প্রেসিডেন্ট হয়তো তার ক্ষমতা দিয়ে আমার একটা চাকরির ব্যাপারে কোথাও তদবির করবেন, এরকম একটা আশ্বাস বা নিশ্চয়তা আমাকে তিনি দেবেন। কিন্তু তিনি তা না করে উল্টো আমকে একটা অপ্রীতিকর, অনিশ্চিত ও বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দেওয়ার পাঁয়তারা করছেন। বিষয়টা আমার কাছে শালীনতার মাত্রাতিরিক্ত লঙ্ঘন বলে মনে হল। একবার আমি ভাবলাম বিষয়টার প্রতিবাদ করব। কিন্তু প্রতিবাদ করলে প্রেসিডেন্টের রোষানলে পড়তে পারি এমন একটা ভাবনা আমাকে তা থেকে অবদমিত করল। আবার ভাবলাম, প্রেসিডেন্টের কাছে আমার চাকরির বিষয়টাই শুধু সর্বাধিক গুরুত্ব পেতে পারে এমন কিছু তাৎপর্যপূর্ণ কথা অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে অবতারনা করব। কিন্তু সেই কথাগুলো দুই ঠোঁটের ফাক গলিয়ে বেরুনোর পূর্বে হন্তদন্ত হয়ে ঘরে একজন বৃদ্ধ ভদ্রলোক প্রবেশ করলেন।

“সর্বনাশ হয়ে গেছে মিস্টার প্রেসিডেন্ট”। বৃদ্ধ ভদ্রলোকটি হাপাতে হাপাতে বললেন। “আপনি দেখছি দুনিয়ার কোন খোজ খবরই রাখছেন না”।

লোকটাকে দেখেই আমি চিনতে পারলাম। বয়স হয়ে গেলেও লোকটার কন্ঠ ও শরীরী ভাষায় বেশ দেমাগ রয়েছে। লাদেন কে খুন করার জন্য অপারেশন নেপচুন স্পিয়ার চলাকালীন সময়ে প্রেসিডেন্ট যখন তার সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে বসে লাইভ দেখছিলেন, তখন এই লোকটাকে আমি টিভিতে প্রেসিডেন্টের পেছনে নীল ফুলহাতা শার্ট পরে বুকে হাত রেখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলাম। লোকটার নাম টম ডোনিলন। প্রেসিডেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা এডভাইজর। ক্লিন্টনের সময়ও বেশ ক্ষমতাধর ছিল সে। বসনিয়ার শান্তি চুক্তির সময় লোকটাকে ঘন ঘন দেখা যেত।

প্রেসিডেন্ট বেশ সন্ত্রস্ত হয়ে বললেন, “জাতির জন্য আবার কি দুঃসংবাদ নিয়ে এলেন মিস্টার এডভাইজর?”
“জাতির বারোটা বেজে যাচ্ছে মিস্টার প্রেসিডেন্ট। কান্দাহারে আমদের বিমান হামলায় এক গরিব কিষাণির পাঁচটা ভেড়া মারা পড়েছে”।
“কি বললেন?” প্রেসিডেন্ট নরম গদিচেয়ারে এতক্ষন আরাম করে হেলান দিয়ে বসেছিলেন। এবার সোজা হয়ে বসলেন।
“পাঁচটা ভেড়া মারা পড়েছে, মিস্টার প্রেসিডেন্ট। বেচারি খুব গরিব। এই ভেড়াগুলোই তার একমাত্র সম্বল ছিল”।
“পাঁচটা ভেড়া মরেছে তো কি হয়েছে? তাতে আমেরিকার কি আসে যায়”। বললেন প্রেসিডেন্ট।
“বিমান হামলায় মরা ভেড়াগুলোর সামনে বসে বেচারির আর্তনাদের দৃশ্য সারা দুনিয়ার টেলিভিশনে লাইভ হচ্ছে”। বেশ ক্রুদ্ধ ভঙ্গিতে বললেন টম ডোনিলন। “দুনিয়ার মানবাধিকারগুলা একজোট হয়ে গলা ফাটাচ্ছে আর বিবৃতি দিচ্ছে। মস্কো, প্যারিস আর হাভানার রাস্তাগুলোতে বিমান হামলা বিরোধী মিছিল শুরু হয়ে গেছে। আর আপনি বলছেন, মাফ করবেন মিস্টার প্রেসিডেন্ট, তাতে আমেরিকার কি যায় আসে? তাই না?”

প্রেসিডেন্ট হাতে রিমোট কন্ট্রোল নিয়ে টেলিভিশন চালু করলেন। দু তিনটা চ্যানেল ঘুরে একটা নিউজ চ্যানেলে এসে থামলেন। সেখানে লাইভ দেখানো হচ্ছিল দৃশ্যটা। আপাদমস্তক কালো বোরখায় ঢাকা এক দরিদ্র আফগান মহিলা পাঁচটি ঝলসে যাওয়া মৃত ভেড়ার সামনে বসে আকাশের দিকে দুই হাত তুলে কাঁদছিল আর চিৎকার করছিল। দৃশ্যটা শেষ হতেই আরেকটা দৃশ্যে দেখা গেল, হাভানার রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ কাঁধে ভেড়া নিয়ে আমেরিকা বিরোধী শ্লোগানে মিছিলে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে তুলছে।

‘হৃদয় বিদারক। খুবই হৃদয় বিদারক’। প্রেসিডেন্ট বিড়বিড় করলেন।

“পাঁচটা মানুষ মারা পড়লে অন্তত সন্ত্রাসী বলে চালিয়ে দেওয়া যেত”। খানিকটা বিধ্বস্ত কন্ঠে নিরাপত্তা এডভাইজর কথাগুলো বললেন, “কিন্তু পাঁচটি ভেড়া। তাও এক সহায়-সম্বলহীন গরিব মহিলার। আর এটাকে কেন্দ্র করে বিরোধিপক্ষ আমাদের একহাত নিচ্ছে। রুশ ভাল্লুকটা ইতিমধ্যে জাতিসংঘের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেছে। ভীষণ ভাবে আমেরিকার ইমেজ নষ্ট হচ্ছে মিস্টার প্রেসিডেন্ট”।

“পাঁচটা ভেড়ার বাজার মুল্য কত হতে পারে?” প্রেসিডেন্ট জানতে চাইলেন।

এবার আমি একটু নাক গলালাম। “মাফ করবেন মিস্টার প্রেসিডেন্ট, এখানে আমি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বলতে চাই, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী পাঁচটা ভেড়ার দাম পঁচিশ হাজার টাকা বা তিনশ ডলারের বেশী হবে না”।

“তাহলে প্রেস সেক্রেটারিকে খবর দিন”। প্রেসিডেন্ট নির্বাহী আদেশ জারি করলেন। “হোয়াইট হাউস কার্যালয় থেকে মহিলার জন্য ত্রিশ লাখ ডলারের একটা সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করা হোক। সংবাদ ব্রিফিঙে বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিন, শীঘ্রই আমরা মহিলাকে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ও ভাল চাকরির ব্যাবস্থা করে দেব”।

বারবার আমার মনে হচ্ছিল প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আমার এপয়েন্টেমেন্টের সময় এই বুঝি শেষ হতে চলেছে। সময়টা খুব দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এখনো আমার চাকরিটার ব্যাপারে ওনার সঙ্গে কোন ফলপ্রসু আলাপই হলো না। কান্দাহারের কিষাণির জন্য প্রেসিডেন্টের এমন ঘোষণায় আমি আবারো আশাবাদি হলাম। যদিও এই মুহূর্তে প্রেসিডেন্ট খুবই চাপের মুখে। এই পরিস্থিতিতে আমার চাকরির প্রসঙ্গটা পুনরায় উত্থাপন করা খুবই অপ্রাসঙ্গিক ও অবিবেচনাপ্রসূত,  তবুও আমাকে বলতেই হল, আমি হাতজোড় করে বলেই ফেললাম—“দয়াময় প্রেসিডেন্ট, আপনি গরিবের রাজা, বাদশাদের বাদশা, আমাকেও একটা চাকরির ব্যাবস্থা যদি করে দিতেন, তাহলে আমি হলফ করেই বলতে পারি, একেবারে বাপের কাজ হত”।

“ধুউরু মিয়া, রাখো তোমার চাকরি”। ন্যাশনাল সিকিউরিটি এডভাইজর আমাকে কর্কশ কন্ঠে ধমকে দিলেন। তিনি ঘর থেকে বের হতে হতে বলতে লাগলেন, “তুমি আছো তোমার চাকরি লইয়া আর আমরা মরি এম্রিকার মান-ইজ্জত লইয়া। দূরে গিয়া মরো”।

লোকটা বেরিয়ে গেলে প্রেসিডেন্ট হাফ ছেড়ে বাঁচলেন।

“বাঁচা গেল”। প্রেসিডেন্ট নরম গদি চেয়ারে হেলেন দিতে দিতে বলতে লাগলেন, “লোকটা আমাকে পাগল বানিয়ে ছাড়বে। ওর হাত থেকে রেহাই পেতে আমি হোয়াইট হাউস ছেড়ে দুনিয়ার যে কোন নির্জন দ্বীপে চলে যেতে রাজী আছি”। তারপর গ্লাসে আরেকটা চুমুক দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “জাতি এখন ক্রান্তিকালের মধ্যে আছে। এটা আমাদের জন্য খারাপ সময়। তবে সাময়িক। এখন আমাদের সকলের উচিৎ ধৈর্যের শিক্ষা গ্রহন করা এবং এর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া”।

প্রেসিডেন্টের কথায় আমি মাথা নেড়ে সায় দিলাম। কথা বলতে ইচ্ছে করছিল না। ধৈর্য ধারনের বিষয়টা কি আমাকে ইঙ্গিত করলেন নাকি জাতির উদ্দেশ্যে বললেন আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না।  তবে আমি এখন আর চাকরির বিষয়টা নিয়ে ভাবছিনা। ইতোমধ্যে বেশ কয়েক প্যাগ গলাধকরন হয়ে গেছে। এখন তার প্রতিক্রিয়া টের পাচ্ছি।

“এইসব দুনিয়াবি আলাপ ছেড়ে আমাদের উচিৎ নিজেদের আলোচনায় ফিরে আসা। আপনি কি বলেন?” প্রেসিডেন্ট বললেন।

‘প্রেসিডেন্টের দিকে খালি গ্লাসটি বাড়িয়ে ধরে আমি বললাম, “জী, আপনি ঠিক বলেছেন, মিস্টার প্রেসিডেন্ট, কারন আপনে যথার্থই একজন বানচোৎ প্রেসিডেন্ট”। মদ্যপানের প্রভাবটা আমি বেশ ভালই উপভোগ করছিলাম।

প্রেসিডেন্ট খিলখিল করে হেসে উঠলেন। এতে করে তার কালো মুখমন্ডলের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ওপরের একপাটি সাদা দাত বের হয়ে এল। আমার মনে হল, কালো মেঘের আড়াল থেকে বিনা নোটিশে শুক্লা দ্বাদশীর ভরা চাঁদ হঠাৎ করে বেরিয়ে এসেছে। আমার খুব ভাল লাগল।

প্রেসিডেন্ট আমার বাড়িয়ে দেওয়া গ্লাসে মদ ঢালতে ঢালতে বললেন, ‘আপনিও একজন যথার্থ অমায়িক-চোদা রসিক মানুষ!’

আমরা গ্লাসে চিয়ার্স করে খুব হাসলাম। হোয়াইট হাউস কাঁপিয়ে হাসলাম। হাসতে হাসতে একসময় আমাদের কান্না পেল। প্রেসিডেন্ট আমার গলা জড়িয়ে ধরে কাঁদলেন। আমি প্রেসিডেন্টের গলা জড়িয়ে ধরে কাঁদলাম। খুবই ঘৃণা মিশ্রিত কন্ঠে তিনি বলতে লাগলেন, “জিরাফের মত লম্বা এই মহিলাটাকে বিয়ে করে আমি ভুল করেছি। আমার জীবনটাকে সে হেল করে দিচ্ছে। ঘরে আর বাইরে দুই দিকে আমি নরকের মধ্যে আছি। মেয়েদুটার মুখের দিকে চেয়ে সব সহ্য করে যাইতেছি, নইলে দুনিয়ার মানুষ আমারে খারাপ বলবে। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, আমার মা বেঁচে থাকলে আজ আমার এই দূরবস্থা হতো না”। তারপর তিনি আমার গলা ছেড়ে চোখ মুছতে মুছতে বললেন, আপনার মা এখন কেমন আছেন?

প্রেসিডেন্ট মায়ের কথা বলতেই আমি চমকে উঠলাম। আমার মনে পড়ল মা আমাকে বাজার থেকে কিছু সিমেন্ট আর ইটবালু কিনে নিয়ে যেতে বলেছিলেন। ব্যাপারটা আমি একদম ভুলে গেছি।

ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আমি বললাম, “মিস্টার প্রেসিডেন্ট, আমাকে এক্ষুনি উঠতে হবে। ফেরার পথে বাজার থেকে মায়ের জন্য কিছু সিমেন্ট আর ইটবালি কিনে নিয়ে যেতে হবে”।

“সিমেন্ট আর ইটবালি দিয়ে আপনার মা কি করবেন?” প্রেসিডেন্ট কৌতূহল নিয়ে জানতে চাইলেন।

আমি নরম গদিচেয়ার ছেড়ে উঠতে উঠতে বললাম, “সে অনেকদিন আগের কথা। মায়ের বিয়ের পর প্রথমবারের মত যেদিন আমাদের বাড়ি বধু সেজে এলেন, সেদিন বিকেলেই মা কলসি কাঁখে নিয়ে পুকুরে পানি আনতে গিয়েছিলেন। আমাদের ওই অঞ্চলে তখন আর নতুন বউদের কলসি কাঁখে নিয়ে ঘাটে যাওয়ার রেওয়াজ ছিলনা। কিন্তু কিছুই করার ছিল না, মিস্টার প্রেসিডেন্ট। স্বামী সংসারে এসেই বৃদ্ধা শাশুড়ির দেখভালের ভার মা নিজের কাঁধে তুলে নিলেন। পুকুর থেকে পানি নিয়ে ফেরার পথে পা পিছলে পড়ে গিয়ে মা কোমড়ে খুব ব্যাথা পেলেন। আমাদের ঘর থেকে ঘাটের দুরত্বটা একেবারে কম না। মাঝখানে হাজিসাব দাদার ঘর তারপর মুজাফফর চাচার ঘর পেরিয়ে তবেই পুকুর ঘাট। আর সেদিনই মা প্রতিজ্ঞা করলেন, পা পিছলানো এড়াতে আমাদের ঘর থেকে পুকুর পর্যন্ত তিনি একটা ব্রিজ তৈরি করবেন। সেই যে সেদিন মা ব্রিজ বানানো শুরু করলেন, আজো তার নির্মাণ কাজ শেষ হয় নি। শুরু থেকে ব্রিজের নির্মাণ সামগ্রি যোগান দেওয়ার দায়িত্ব ছিল আমার বাবার ওপর। স্কুলে পড়ানো শেষ করে ফেরার পথে প্রতিদিন বাবা বাজার থেকে ইটবালু মাথায় করে নিয়ে আসতেন। এখন বাবার বয়স হয়েছে। আগের মত আর মাথায় ভার বইতে পারেন না। মায়ের ব্রিজের কাঁচামাল যোগান দেওয়ার দায়িত্বটা এখন আমার কাঁধে মিস্টার প্রেসিডেন্ট”।

“খুব প্রেরনা মূলক কথা বললেন আপনি”। প্রেসিডেন্ট সোৎসাহে বললেন। “আপনার মায়ের প্রতি আমার শ্রদ্ধাবোধ যে কোনো সময়ের তুলনায় বহুগুণ বেড়ে গেল। উদ্যম আর ব্যাক্তি উদ্যোগের এক উৎকৃষ্ট উদাহারন হতে পারেন তিনি”। বলতে বলতে তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। এগিয়ে এসে আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন “আমি আপনার মায়ের উন্নয়ন মূলক কার্যক্রম পরিদর্শনে যেতে চাই। আমাকে সাথে নিয়ে চলুন”।

আমি প্রেসিডেন্টকে না বলতে পারলাম না। আমরা হোয়াইট হাউস থেকে বেরিয়ে বাজারে এসে সিমেন্ট আর ইটবালু কিনলাম। আমি মাথায় ইটবালুর বোঝাটা তুললাম। সিমেন্টের বোঝাটা আমার মাথায় বেশী ওজন হয়ে যাবে তাই প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে স্বপ্রনোদিত হয়ে আমার ‘না, না’ করা সত্বেও সেটা মাথায় তুলে নিলেন। সিমেন্ট আর ইটবালুর বোঝা মাথায় করে বয়ে নিয়ে আমরা বাড়িতে এসে পৌঁছলাম। দরজাতে ধাক্কা দিতেই আমার ছোটবোন এসে দরজা খুলে গ্রাম্য লাজুক অথচ সপ্রতিভ মেয়েদের মত নিঃশব্দ হেসে দ্রুত চলে গেল।

ঘরে প্রবেশ করেই আমরা মায়ের কক্ষে গিয়ে ইটবালুসিমেন্টের বোঝা মাথা থেকে নামিয়ে দাঁড়ালাম। মা তখন ঘরের ভেতরেই ব্রিজ বানানোর কাজে ভীষণ ব্যস্ত। ছোট বোনটা মায়ের কাজে জুগালি দিচ্ছিল। মা কুঁজো হয়ে হাতে বেলচা নিয়ে ব্রিজের একটা পিলারে সিমেন্টের আস্তর করছিলেন।  আমাদের দিকে না ফিরেই মা ক্রুদ্ধ হয়ে চিৎকার করে বলতে লাগলেন, “এতক্ষনে তোর খবর হইল নাকি রে নবাবের বাচ্চা? বাড়িতে আর আসতে গেলি ক্যান? বাজারে থাইক্কা মরতে পারলিনা! বাজারের মাইনশে তোরে মাডি দিত আর আমি মছছিদে শিন্নি দিয়া আজাইর অইতাম!”

“একটু আস্তে কথা বলেন আম্মা। প্রেসিডেন্ট সাহেব এসেছেন আপনার সাথে দেখা করতে”।

“কে আইছে?” বলেই আম্মা মাথা ঘুরিয়ে তাকালেন আমাদের দিকে। তারপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বললেন, “অ, পেসিডেন সাব! তুই আমারে আগে কবি না!” আম্মার চেহারায় লজ্জার আভা ফুটে উঠল। দুইহাতে পরিধেয় শাড়িটা যথাসম্ভব ঠিক করে ঘোমটা টেনে বললেন, “আপনে আসছেন দেইখা আমার মনডা খুশিতে ভইরা গেছে। আপ্নেরে কি বইলা যে ধন্যবাদ দিমু বুঝতে পারতেছি না সাব”।

“ইটস ওকে, ইটস ওকে”। প্রেসিডেন্ট আন্তরিকতার সাথে বললেন। “তাছাড়া একজন প্রেসিডেন্ট হিসেবে আপনার প্রকল্প পরিদর্শন করা আমার দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে”।

“ছত্রিশ বছর ধইরা আমি এই মরার বিরিজ নিয়া পইড়া রইছি। আইজো শেষ করতে পারতেয়াছিনা। রইদ হউক বিষটি হউক আমার রথের কোনো জিরান্তি নাই। কত আর শইল্লে কুলায় বলেন! মাঝে মইদ্যে ইচ্ছা করে সব ভাইঙ্গা চুরমার কইরা পুকুইরের মইদ্যে ফেলাইয়া দেই”।

“না, না, এমনটা কিছুতেই করবেন না”। প্রেসিডেন্ট তীব্র ভাষায় প্রতিবাদ জানালেন। “আপনার দীর্ঘ অধ্যবসায়, পরিশ্রম আর একাগ্রতার ফলে ইতোমধ্যেই আপনি সারা বিশ্বের নারী জাতির রোল মডেলে পরিনত হয়েছেন। নিঃসন্দেহে এটা অনেক বড় ব্যাপার। একজন সাধারন নারী হয়ে সম্পূর্ণ ব্যাক্তি উদ্যোগে এরকম একটা সেতু নির্মাণ করছেন, এটা বিশ্ববাসীর নজর কাড়বে; এতে কোন সন্দেহ নেই”। প্রেসিডেন্ট মায়ের ভূয়সী প্রশংসা করলেন।

“আর কইয়েন না সাব”। খুব উদাসীন ও নির্লিপ্ত কন্ঠে মা বললেন। একলা একজন মানুষের দ্বারা আর কত সম্ভব? এই ছোট্র মাইয়াডা না থাকলে যে আমার কি অবস্থা হইত তা একমাত্র আল্লাই ভাল জানে।  বুড়াডা তো কোন কামেরই না। সারাদিন ঘরে বইয়া তজবি জপে আর আল্লা আল্লা করে আর কবরের গীত গায়”। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে মা বললেন, “পোলাডার কথা আর কি কমু। একবার যদি হাডা শুরু করে ত হাটতেই থায়ে সারাদিন। আর পাছাডারে যদি একবার মাডিত লাগাইতে পারে, মাশাল্লা, তয় আপনে দশ টনি কেরেন দিয়াও টাইন্না উডাইতে পারবেন না”। কিছুটা সময় চুপ করে থেকে মা আবার বলতে লাগলেন, “পোলাডারে কি দোষ দিমু, সব দোষ আমার কপালের, বুঝলেন। বুড়াডা ঘর বইডা হওনের পরে পোলাডাইত আমার বিরিজের কাঁচামালের যোগান দিত। চাকরিডা হারাইয়া পোলাডার অবস্থা এখন একদম বেগতিক”। এটুকু বলে মা একটা তীব্র দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।

“আপনার মায়ের দীর্ঘশ্বাসটা আমার বেশ পছন্দ হয়েছে! বেশ পছন্দ হয়েছে!” আমার দিকে তাকিয়ে স্বতঃস্ফূর্ত ভঙ্গিতে প্রেসিডেন্ট বললেন।

প্রেসিডেন্টের কথাটি আমি প্রথমে বুঝতে পারিনি। তাই আমি বললাম, “মাফ করবেন মিস্টার প্রেসিডেন্ট, আপনার কথাটি আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারি নাই”।

“শোনেন, আপনার মায়ের দীর্ঘশ্বাস টা আমার বেশ পছন্দ হয়েছে। আমি মনে করি এটা শিল্পকর্ম হিসেবে অসাধারন হতে পারে এবং শিল্পবোদ্ধাদের কাছে দুর্লভ শিল্পকর্মের মর্যাদা পেতে পারে। হোয়াইট হাউসে এটাকে সাজিয়ে রাখা যেতে পারে। ইউরোপ আমেরিকার যেকোন আর্ট গ্যালারী বা মিউজিয়াম এটাকে লুফে নেবে”।

প্রেসিডেন্টের কথাটা আমার মাথায় গেঁথে গেল। এটা খুবই ভাল আইডিয়া। মায়ের দীর্ঘশ্বাসটা শিল্পকর্ম হিসেবে বিক্রি করে দিলে মোটামুটি ভাল অংকের কিছু টাকা কামানো যাবে।

শিল্পকর্মের বিষয়টা মা বুঝতে পারেন নি। আমার আর প্রেসিডেন্টের দিকে তিনি হা করে তাকিয়ে রইলেন। আমি মায়ের কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বললাম, “আপনার দীর্ঘশ্বাসটা প্রেসিডেন্ট সাহেব খুব পছন্দ করেছেন, আম্মা। আপনি যদি রাজি থাকেন, তাহলে এটা বিক্রি করে দিলে আমার বউডারে তুলে আনার খরচ আর আপনার বিরিজ বানানোর খরচের ব্যাবস্থা হয়ে যাবে”।

মা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “তুই আমার দীর্ঘনিশ্বাসটারে বেইচা দিতে চাস!”

“জি আম্মাজান”। আমি আর প্রেসিডেন্ট একসাথে মাথা নাড়লাম।

“দূর হয়ে যা! আমার চোখের সামনে থেকে দূর হয়ে যা”। মা চিৎকার করে তেড়ে এলেন আমার দিকে। “তোর মত কমিনেরে পেডে লইয়া আমি ভুল করছিলাম”। হাতের বেলচাটা দিয়ে তিনি আমার মাথায় আর পিঠে আঘাত করতে লাগলেন। “তুই পারলি! শেষপর্যন্ত আমার দীর্ঘনিশ্বাসটা লইয়া ব্যাবসা শুরু করলি! তোরে পেডে লইয়া আমার পেডের অপমান হইসে”!  প্রেসিডেন্ট এগিয়ে এলেন আম্মার হাত থেকে আমাকে উদ্ধার করতে।  কিন্তু আম্মার বিরামহীন বেলচার আঘাতের নিষ্ঠুরতা থেকে স্বয়ং প্রেসিডেন্টও রেহাই পেলেন না। খুব জোরে জোরে আমাদেরকে মারতে লাগলেন। মারতে মারতে মায়ের হাতের বেলচাটা একসময় ভেঙ্গে গেলে ছোটবোনটা আরেকটা বেলচা এনে মায়ের হাতে দিল। সেই দিয়ে খুব করে তিনি আমাদের পেটালেন। প্রেসিডেন্টকে অশ্লীল ভাষায় গালাগালি করতে করতে বললেন, “তুই একটা নাফরমান, কালা মেচকি শয়তান, তোরে আমি অনেক ভালা মনে করছিলাম, তোর বাপটা অনেক ভালা আছিল। মা’টাও ভালাই আছিল। তুই এমুন ইতর হইলি কেমনে”। আমরা প্রান বাঁচাতে ঘর থেকে বেরিয়ে এলে মা দরজাটা বন্ধ করে দিলেন।

ঘর থেকে বেরিয়ে আমাদের বাড়ির পশ্চিমের পুকুর পারের পথ ধরে আমরা হাঁটছি। আমাদের কারো মুখে কোন কথা নেই। মায়ের আচরন, উপর্যপুরি বেলচার আঘাত আমাকে যতটা না বিধ্বস্ত করেছে তার চেয়েও বেশী বিধ্বস্ত করেছে প্রেসিডেন্টের প্রতি মায়ের এই অশোভন ও অনাকাঙ্ক্ষিত আচরন। তীব্র অপমান বোধে আমি পুড়ে মরছিলাম। মায়ের প্রতি খুব রাগ হল। তিনি এমনটা না করলেই কি পারতেন না? শতহোক, সারা দুনিয়ার প্রেসিডেন্ট তিনি। তিনি চাইলে কি না করতে পারেন! আমার গা শিরশির করে উঠল। মায়ের এমন আচরন আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না। আবার এটা ভেবে নিজের প্রতিও খুব রাগ হল আমার, সারাজীবন মায়ের প্রখর আত্মসম্মানবোধ বিষয়টা আমি খুব কাছ থেকে দেখে আসা স্বত্বেও কেন আমি প্রেসিডেন্টের প্রস্তাবটা মাকে দিতে গেলাম। এটা না করলেই কি আমি পারতাম না? নিজের প্রতি রাগ হতেই আমার প্রেসিডেন্টের প্রতিও খুব রাগ হল। তিনি সারাদুনিয়ার প্রেসিডেন্ট। অথচ এই পর্যন্ত আমাকে একটা চাকরির নিশ্চয়তা তিনি দিতে পারলেন না। উল্টো আমাকে শ্বশুর বাড়ি দেখাচ্ছেন। নিরাপত্তা পরিষদ দেখাচ্ছেন। আর শেষপর্যন্ত কিনা আমার মায়ের দীর্ঘশ্বাসটা বিক্রি করে দেওয়ার প্রস্তাব করলেন।

প্রেসিডেন্ট এতক্ষন একটা কথাও বললেন না। তীব্র অপমানবোধ, চাপা অসন্তোষ, বেলচার আঘাত সবকিছু মিলিয়ে তাকে বেশ বিধ্বস্ত লাগছিল।  তিনি আমার দিকে না তাকিয়ে মৃদু ও ফ্যাসফ্যাসে গলায় বললেন- “একজন শিল্পরসিক মানুষ হিসেবে আগেই আপনার মাকে শিল্প ও শিল্পের তাৎপর্য সম্পর্কে কিছু জ্ঞান দেওয়া আপনার উচিৎ ছিল”। একটা আহত অনুযোগ ঝরে পড়ল প্রেসিডেন্টের কন্ঠ থেকে।

আমরা হাঁটতে হাঁটতে বড় রাস্তার মোড়ে এসে পৌঁছলাম। ডান দিকের রাস্তার দিকে একটা পথনির্দেশক এ লেখা ছিল, ‘হোয়াইট হাউস এইদিকে’। আমি প্রেসিডেন্টের কথার কোন জবাব না দিয়ে বললাম, ভাল থাকবেন মিস্টার প্রেসিডেন্ট। আমার একটা ইন্টারভিউ আছে। ডান দিকের রাস্তা ধরে আপনি সোজা হোয়াইট হাউসে চলে যেতে পারবেন। আবার দেখা হবে।

নিতান্ত অবহেলা ভরে করমর্দন করে আমরা দুজন দুইদিকে চললাম।

Comments

comments

হাসান আহমদ

হাসান আহমদ

হাসান মূলত কবি। তার কবিতা বাংলাদেশের বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে। কিছুটা বোহেমিয়ান। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে একাডেমিক পড়াশোনায় আপাতত ইতি টানেন, চলে যান জাহাজের নাবিক হতে। কিছুদিন সমুদ্রে কাটিয়ে মাটিতে ফিরে আসেন। মাটি তাকে আর ছাড়ে না, কবিতা তাকে টানে। বর্তমানে চাকরিসূত্রে সিলেটে বাস করছেন। জন্ম চাঁদপুর জেলার কচুয়া উপজেলার আশারকোটা গ্রামে, ১৯৮৬ সালে।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: , , , ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি