সাম্প্রতিক

প্রবাল দুপুর । কেতু মন্ডল

মানুষের আনাগোনা কমে গেছে, রাত গভীর হয়েছে। কুকুরটি আমাকে শুঁকে সাথে চলতে থাকে, রাতে বাড়ি ফেরার পথে কুকুরটি আমার সাথি হয়, কোথায় যে থাকে তার কোনো হদিস নেই, কিন্ত ঠিকই আমার সাথি হবে। রাতের নির্জন পরিবেশে পাগল টেনিয়া সাথে কুকুরটি, আমাকে পৌঁছে দেয়। যদি টেনিয়াকে কিছু দিতে চাই, একগাল হেসে এমন ভাব করে যেন আমি ওর সাথে রসিকতা করিছি, ওকে আজ পর্যন্ত  আমি কিছু দিতে পারিনি। একদিন এক টুকরা রুটি ওকে খাওয়ানোর  চেষ্টা করি। কিন্ত ও রুটি নিয়ে যত্নকরে কুকুরটিকে খাইয়েছিল, তাতে আমি এমন রেগেছিলাম, আমার আঘাতে কুকুরটি খুঁড়িয়ে  হেঁটেছে।

টেনিয়ার সাথে কুকুরটির সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক আছে। রেল লাইনের পশ্চিমে পরিত্যক্ত বাড়িতে আবর্জনার মাঝে টেনিয়া স্বাচ্ছন্দে বাস করে। কুকুরটি মাঝে মাঝে ওখানে দেখি, মমতাময় করুণ চোখে দু’পা সামনে বিছিয়ে টেনিয়ার দিকে চেয়ে থাকে — কত রাত শীতে টেনিয়া কুকুরটিকে সাথে নিয়ে আগুনে শরীর তাতিয়েছে।

কুকুরটি আজও আমাকে সঙ্গ দিল, কিন্ত টেনিয়ার দেখা পেলাম না। কুকুরটিকে বেশ বিমর্ষ লাগছিল। আমি রেল লাইনের পশ্চিমের বাড়িতে উঁকি দিলাম। টেনিয়ার ব্যবহৃত কিছু জিনিসপত্র তেমনই অগোছালো পড়ে আছে, কিন্ত টেনিয়া নেই। পরিত্যক্ত বদ্ধ ঘরে আঁধার ঘুপটি মেরে বসে আছে। দেয়াশলাইয়ের আলোতে যতটুকু দেখা যায়—টিনের কৌটা, এ্যালূমিনিয়ামের থালা-বাটি যত্রতত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে; দেখে মনে হয় কেউ যেন মনের সুখে ইচ্ছে মতো নাড়াচাড়া করেছে, কুকুরটি এখানে এলো না।

আকাশে চাঁদ উঠেছে। মাধুরী দরজা খুলে দিলো।বাড়ির উত্তরে তিনটি ঘর নিয়ে ওরা ভাড়া থাকে। এখনও তুমি জেগে আছ তো! ঘুম আসছে না ছাদে উঠেছিলাম রাস্তায় আপনাকে আসতে দেখলাম।

ও ঘরে আলো কেন? সবাই তো ঘুমিয়ে পড়ার কথা— আমার সাড়া পেয়ে কানন তার ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। ও এলো কখন? কানন আমার বড় বোন, খুলনাতে এক বাণিজ্যিক অফিসে চাকুরি করে, তার চোখ ঢুলু ঢুলু।

কখন এসেছ, বিকেলে, তুই রাত করে বাড়ি ফিরলি যে?
মাধুরীকে সে খুঁজলো, মাধুরী তার ঘরে চলে গেছে।
প্রতিরাতে ওই মেয়েটি বুঝি তোর অপেক্ষা করে? আামি চমকে  যাই, এভাবে কেউ এতদিন ব্যাপারটা দেখেনি।
তুমি এখনও ঘুমোও নি কেন?
তোর জন্যে জেগে আছি, এখন ঘুমোবো,
সকালে তো দেখা হতোই,
তা হতো, তোর ঘরে কি জায়গা হবে?
কেন?
আমি অবাক হলাম, যে আমার বড় বোন, তাকে বেশ কুণ্ঠিত মনে হলো।
না, মানে আমার সাথে একজন এসছে।
ব্যাপারটা কি তা আমি বুঝলাম না, কিন্ত কাননকে বেশ সুন্দর দেখাচ্ছে, শরীরের বাড়তি মেদ ঝরে গেছে।

আমার এক সহকর্মী, মানে আমরা এক সাথে চাকরি করি, ক’দিন বেড়াবে বলে এসেছে। আমার নিজের বাড়ি থাকতে অন্য কোথায় তো থাকতে দেয়া যায় না, মানে হোটেলে আর কি।

আমি এর অন্তগর্ত অর্থ বুঝেও কিছু বলি না, এমন অনেক ঘটনা আছে তাতে আমি কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাই না।
ঠিক আছে, আমি না হয় বাইরের ঘরেথাকবো। অসুবিধা হবেনা।
কানন বেশ খুশি হয়, আমি বাইরের ঘরে তোর শোবার ব্যবস্থা ঠিক করে রেখেছি।
সব তোকরেই রেখেছ, আমার প্রয়োজন কোথায়; তবুও তো।

কাননের বিয়ে হওয়ার ছয় মাসের মাথায় ওদের ডিভোর্স হয়ে যায়, কেন যে ডিভোর্স হয়েছে তা আজও আমি জানি না, মা-ও এ ব্যাপারে আমাকে কখনও কিছু বলেনি, ওর আর যাই হোক দেয়ার হাত আছে, আমি খুশি হই ওর কাছে থেকে কিছু বাগানো যাবে ভেবে।

মার তার ঘরে ঘুমিয়ে আছে, আশ্চর্য প্রশান্তির ঘুম, সোমত্ত মেয়ে অন্য পুরুষ নিয়ে শোবার ঘরে হাজির, আমার থাকার ব্যবস্থা হয়েছে বাড়ির আঙ্গিনার দক্ষিণে অব্যবহৃত স্যাঁতস্যেঁতে ঘরে।

কানন আমার গালে চুমু দিতে চাইল, লক্ষী ভাই আমার, আমি ওকে পাশ কাটিয়ে বাইরের ঘরের দিকে গেলাম, যেখানে আমার শোবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঘরটি তেমন ব্যবহার করা হয় না, স্যাঁতস্যাঁতে ভেজা। আরশোলার আখড়া, তক্তপোষের উপর আমার বিছানা পাতা। আমি শুয়ে পড়লাম, সারাদিরে ঘটনাগুলো আমার ক্লান্ত মানসপটে ডাকটিকেটের মতো এঁটে রইলো, আমি ঘুমের জন্য চোখ বন্ধ করলাম, কিন্ত জোনাকির মতো ফুলঝুরি আমার মস্তিস্কের কোষ থেকে উৎসারিত হয়ে আমার চোখের বন্দরে ঝরে পড়তে লাগলো। সারাদিন কিছু না খাওয়ার জন্য পেটে তীব্র ক্ষুধা, তেষ্টায় গলা শুকিয়ে কাঠ, কিন্ত উঠে যেয়ে পানি পান  করতে ইচ্ছো করছে না। আমি যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকলাম, মনে হতে লাগলো সব ভেঙ্গে চুরমার করে দিই; স্বাভাবিক জীবনাচারের মুখে লাথি মেরে অস্বাভাবিক কিছু নিয়ে উল্লাসে মেতে উঠি। আমি জানি মাধুরী এখনও জেগে আছে, বিশেষ করে আজকে যখন কানন তার বন্ধু নিয়ে বাসায় এসেছে; আমার অনেক রাতে বাসায় ফেরা, না খেয়ে বাইরের ঘরে শয্যা গ্রহণ ; মাধুরী কখনোই ঘুমাতে পারবে না আমি অন্ধকার হাতড়িয়ে বাইরে এসে  দাঁড়াই। নিঝুম বাড়ির পশ্চিমে শজনে গাছের মাথায় কাস্তের ফালির মতো চাঁদ যেন হারিয়ে যাওয়া কোনো বালিকার মতো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে এক অনিশ্চিত শুণ্যতার দিকে।

মা’র মেজাজ বেশ ভাল, সে রকমারি বান্নার কাজে ব্যস্ত, কানন খোশ মেজাজে গুণগুণ করছে, বাড়ির পরিবেশ উপভোগ করার মতো।নিরীহ দিনটি মৃদু কম্পনে সব ছিন্ন করে অতিবাস্তব রূপ নিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠলো। লোক মুখে খবরটি আমাদের বাড়িতে পৌছল, কানন ছাড়া আমরা সবাই মুক হয়ে গেলাম।

আমার বুকের মাঝে মোচড় দিয়ে ওঠে, আমি মাধুরীর জন্য কষ্ট অনুভব করি— ওরা আমাদের ভাড়াটে, মায়ের কড়া নির্দেশ রয়েছে ভাড়াটেদের সাথে  না মেশার জন্য। মাধুরী তার বাবা, পাগল ভাই আর পঙ্গু মায়ের সাথে থাকে; ও বাড়িতেই সময় কাটায়, আমি তাকে এক-দুবার বাইরে যেতে দেখেছি। সারাদিন সে নীরবে সংসারের সব কাজ করে। পঙ্গু মায়ের সেবা, ভায়ের অত্যাচার, সংসারের দৈনন্দিন ঘানিটানা। সেই মাধুরীর জন্য আমার কষ্ট হয়, এখন আমার কষ্ট হতে থাকে কী কারণে তা আমার কাছে পরিস্কার নয়, আমার বুকের মাঝে, গলার কাছে কাঁটার মতো যেন কষ্ট বিধে আছে; কিন্ত কি কারণে তা আমি জানি না। ক্ষুধায়, তেষ্টায় আমার প্রাণ ছটফট করছে, চোখ জ্বালা করছে, ঘুম নেই; আমার মা ঘুমে অচেতন, আমার বোন তার বন্ধুর সাথে রাত যাপন করছে, মাধুরী এখনও জেগে আছে। মাধুরী জেগে আছে, এই ভাবনা আমার বুকে উৎলানো দুধের মতো কষ্ট জাগিয়ে তোলে, আমার চোখ জ্বালা করে এবং  আমি কাঁদতে থাকি। আমার পেটে ক্ষুধা, সারারাত আমি অভুক্ত থাকবো, মা নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে; আমার মনে পড়ছে বাবা আমাকে কোনদিন আদর করেনি, সে তার একমাত্র মেয়েকে হৃদয়ের মমতা উজাড় করে আদর করেছে, কিন্তু আমার দিকে ফিরেও তাকায়নি, এসব এখন আমার বেশী করে মনে  পড়ছে। কান্নার রেশ বেড়ে যাচ্ছে, বাবার আদরের মেয়ে আমার বড় বোন তার বন্ধুর সাথে রাত কাটাচ্ছে। আমি জানি, আমার ঘরে শোয়ার ব্যবস্থা করা প্রহসন মাত্র। সে মাকে যা বুঝাবে তিনি তাই বুঝবেন, কারণ মেয়ের কাছ থেকে অনেক কিছু পাওয়া যায়। আমি কিছু দিতে পারি না, বাবা কিছু সম্পদ, এ বাড়িটা না রেখে গেলে কী হতো ভাবা যায় না।আমার জন্মদাত্রী মা এসব আমাকে শোনাতে কখনও ভুল করেন না-কোথায় ঘুমাবো তা-না এখন এসব ভেবে শুধু মন খারাপ করা।

আকাশের চাঁদটার সাথে মাধুরীর তুলনা চলে, ও ঐ চাঁদটার মতো একা, নিজের নিভৃতে সে একান্তই নিজের হয়ে থাকে, আমার প্রতি তা অনুভবের প্রসারণ আমি বুঝতে পারি।

আমি কখনো কোনো প্রতিবাদ করতে পারি না, এ সুযোগে আামার বড় বোন বেশ দিন কাটিয়ে যাচ্ছে, কাননের বন্ধু বাড়িতে থাকার কারণে পাড়ার মাস্তান ছেলে বাতেন শিকদার, যাকে আমি কখনই পছন্দ করিনি, সে কাননের সুবাদে এ বাড়িতে ঢুকেছে। আমি প্রতিবাদ করতে না পেরে মরমে মরছি।

শুধু আমির আলি আমাকে ছায়ার মতো আগলে রাখতে চেয়েছে। তোমাকে ছেলের মতো স্নেহ করি, তুমি এখন থেকে চলে যাও, ভাইজান বেচেঁ থাকলে এমন হতো না।

ভাইজান অর্থাৎ আমার বাবা, তাকে আমির আলী ভাইজান বলে সম্বোধন করেন।আমির আলি আমার বাবার কর্মচারী ছিলেন।

আমির আলি লোকটি দেখতে সুপুরুষ, উজ্জ্বল শ্যামলা গায়ের রং, পেটানো শরীরে মাঝারী লম্বা, মায়াবী দু’চোখে যেন স্বপ্ন লেগে আছে। দেখে দয়ালু মনে হয়, কিন্তু তার মতো ধুরন্ধর আর কে আছে- টাকার জন্য পারেন না এমন কোনো কাজ নেই, এক সময় বাবার কর্মচারী ছিল, এখন সে শহরের একজন গণ্যমাণ্য ব্যাক্তি।

আমির আলি আমার ভাল চান, এ নিয়ে আমি বিব্রত। আমার ব্যাপারে তিনি যখন মার সাথে কথা বলেন, তাদের কথায়  ফুটে উঠে দ্বন্দ্ব-রঞ্জু ঢাকায় পাঠালে ভাল হয়, ওখানে পড়ালেখা করবে, মা বলেন, পড়ার খরচ ও কোথায় পাবে। সেটা না হয় আমি ব্যবস্থা করবো-এ ধরনের কথার কিছু অংশ আমার কনে আসে এসব ব্যাপারে আমার কোনো আগ্রহ নেই।

সকালে কর্কশ চিৎকারে ঘুম ভাঙ্গে। অনেক বেলা হয়েছে জানালা দিয়ে আসা রৌদ্রের আলোয় ভোরে গেছে ঘরটা।

আমি না দিলে সংসারে চলে না, আমার দিকে খেয়াল থাকবে না কেন, মায়ের ক্ষীন কন্ঠ শোনা যায়, পাঁচ মিনিট, সব হয়ে গেছে, এত হেনস্তা করার কি আছে; এ জন্যই আমি বাড়ি আসতে চাই না-কানন তার কর্তৃত্বে উপস্থিতি প্রকাশ করে, মা অসহায়ের মতো কাজ করে যায়, আমার যত জ্বালা আমার হাড় মাংস এক করে ছাড়লো-রাগে আমার প্রতি গজরাতে থাকে, আমি রান্না ঘরে যাই।

আজ ছুটির দিন, মাধুরীর বাবা বারান্দায় চৌকির উপর গরম চায়ের পেয়ালায় পরিস্থিতির জঘন্যতা আস্বাদন করেন। আমাকে দেখে মা গজগজ করতে থাকে- কী করতে হবে বললেই তো হয়; কেন কতবার বলে চা ফুরিয়েছে সেই কবে-মাধুরী চায়ের পাতা এনে দেয়; ও মায়াবী চোখে আমার দিকে চেয়ে থাকে। কাল রাতে খাওয়া হয়নি, আমার ক্ষুধা পেয়েছে-নবাজাদা, খাবার যেন বাঁদিরা তৈরী করে রেখেছে; নাস্তা এখনও হয়নি; বলি নাস্তা বানাবে কে-আমি রান্নাঘর থেকে সরে আসি।

কানন রাতের পোশাকে বাইরে এসে দাঁড়ায়, ওর দিকে তাকাতে সংকোচ লাগে, ও আমাকে কাছে ডাকে, তুই এত বেলা করে ঘুমোস কেন; রাতে ভাল ঘুম হয়নি;

মুখ ধুয়ে আয়, একসাথে নাস্তা করবো।

আমি অনিচ্ছা নিয়ে একসাথে নাস্তা করি। কাননেন বন্ধুকে ভাল লাগলো, আমাকে বেশ সহজ করে নিল। তুই ওকে নিয়ে বাইরে ঘুরে আয়, এখানে ঘুরলে ওর ভাল লাগবে।

ভদ্রলোক কাননকে উদ্দেশ্য করে বলে, তোমার ভাইকে বেশ লাজুক বলে মনে হয়; আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেন, তুমি কী করো?

তেমন কিছু না, পড়ালেখা শেষ করেছি।

কোন পর্যন্ত।
—বি.এ।
—সে তো অনেক, আমি এসএসসি পেরোতে পারলাম না।
—কানন ধমক দেয়, আর কোনো কথা পেল না।
—কানন চায় না আমি তার পড়ালেখার খবরাখবর জানি।

ভদ্রলোক বেশ কিছুদিন এখানে থেকে যায়, এটা কারোর নজর এড়ায় না। মাধুরীর বাবা ইতস্ততঃ করে আমাকে বলেই ফেললো, তোমাদের ওখানে যে ভদ্রলোক এসেছেন, তিনি কে? কাননের বন্ধু; দেখ বাবা, তুমি সবই বোঝ, আমার ঘরে সোমত্ত মেয়ে, কি করি বল।

আপনার যদি তেমন মনে হয় অন্য কোথাও চলে যেতে পারেন।
সেটাই বোধ হয় ভাল
মাধুরীরর বাবার কথার শানে নযুল আামি বুঝি, কিন্ত এ বিষয়ে মা’র সাথে কোনো কথা বলা যাবে না।
রাস্তায় বাতেন শিকদারের সাথে দেখা।

—কি রে চুদিরপুত।
—রাগে আমার কাজ গরম হয়ে উঠে।
—ওভাবে বলছেন কেন।
—আবে চুৎমারানি, তোর সাথে আবার কিভাবে বলবো, তুই মাঙ্গের পুত এত ভাব নিস কেন।

আমি ক্ষীণ স্বরে আবার প্রতিবাদ করি, কিন্ত সে আমার টুঁটি চেপে বলতে থাকে। তোর বোন খানকি অন্য দেশ থেকে নাঙ নিয়ে আসে কেন, আমার গায়ে কি ভোকরার গন্ধ-ওর কথার ধরনে বিশ্রি পরিবেশ তৈরী হয়, আমার টুঁটি চেপে ধরার জন্য ওর উপর আমার কোন রাগ হয় না, বরং আমি হত বিহবল হয়ে পড়ি, ভাবখানা এমন যে, এ সবের কি দরকার ছিল, কিন্তু মুল কথা বাতেন শিকদার যেমন খেপেছে তাতে ভয় পেয়ে গেলাম।

বাতেন শিকদারের অত্যাচার বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছল, রাতে মদ খেয়ে যা-তা গালাগালি করলো। মা-কে পর্যন্ত বাদ দিলো না— আমরা বাড়ির সবক’টা প্রাণী টু শব্দটি করলাম না, আমরা সবাই প্রহর গুনলাম গালাগালি দিয়ে চলে যাওয়া পর্যন্ত। কাননের সাথী ভদ্রলোক ঝিম মেরে গেলেন। কাননের চোখ হিংস্র বাঘিনীর মতে জ্বলতে লাগলো, শুধু অসষ্ফুট উচ্চারণ করলো, দেখে নেব।

পরদিন সকালে ভদ্রলোক চলে গেলেন। কানন তিন দিন ঘর থেকে বেরোলো না, বাড়িটা অসম্ভব রকমের থমথমে হয়ে উঠলো, মা আমার সাথে হম্বিতম্বি করা যেন ভুলে গেল, আমি কয়দিন বাড়ি থেকে বেরোনো বন্ধ রাখলাম।

এর কয়েকদিন পর আমির আলি বাড়িতে এসে হাজির। কানন কখনও তাকে পাত্তা দেয় নি, কাননের শরীরী আকর্ষণ যে কোনো পুরুষের পক্ষে এড়িয়ে যাওয়া কঠিন। আমির আলিকে কানন ডেকে পাঠিয়েছে, সে সরাসরি কাননের ঘরে প্রবেশ করে। তখন সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হয়ে গেছে, মা সারাদিনের কাজ সেরে জিরিয়ে নিচ্ছে।আমি ঘরের কোণে ঘুপটি মেরেপড়ে আছি-আমার মনের ক্যানভাসে একটি বিশেষ দুপুর বাঙময় হয়ে উঠছে, সে দুপুরের সর্বগ্রাসী চিত্র আমার মন থেকে মুছে ফেলতে পারি নি। আমির আলির উপস্থিতি মাকে চঞ্চল করে তুললো। আক্ষেপ করে বলতে থাকলো, এ সব দেখার আগে তার মৃত্যু হলো না কেন।

মাধুরী সন্ধ্যা তারার মতো ওদের বারান্দায় দাঁড়িয়ে উদাস আকাশের দিকে চেয়ে আছে। এ বাড়ির সবাই নিজের ভুবনে একাকী বন্দী, তারা পরস্পরের এত কাছেথেকেও যোজন দুরে এক অন্যের থেকে অবস্থান করে।

মাধুরীর মা দুচিন্তায় পঙ্গু জীবনে বেঁচে আছেন, ওর বাবা নিয়মবদ্ধতায় প্রতিটি দিন অতিবাহিত করেন। মাঝে মাঝে আমি মাধুরীর জীবনে অন্য স্বাদ দিতে চাই, কিন্ত আমার অভ্যন্তরীণ শিথিলতা আমাকে এমন অর্ন্তমুখী করে তোলে, নীরবে নিজের অভ্যন্তরে গুটিয়ে যাওয়া ছাড়া কোনো পথ থাকে না। একদিন দুপুর মাধুরীর সাথে যে সময় কাটিয়েছিলাম তা আমাকে তাড়িত করে আমার জীবনের সেই বিশেষ দুপুর অভিমুখে, সেদিন মাধুরী অনেক কেঁদেছিল, আমার ইচ্ছা ছিল কিন্ত তবু তার তৃষীত অধরে চুম্বন করি নি। যখন আমি মাধুরীকে এমন অবস্থায় পাই তখন দামাল  হাওয়ার রৌদ্র মাঝে এক অপূর্ব নারী মুর্তি আমার মানস পটে ভেসে ওঠে-হালকা শীররে হলুদ গাত্রবর্ণে লাল টকটকে শাড়িতে পিঠময় ছড়ানো কেশগুচ্ছ মধু ঝংকৃত কন্ঠে আমাকে যেন বলছে, এই ছেলে, তুমি আমার সাথে যাবে; আমি সারাক্ষণ সেই নারীকে খুঁজে ফিরি। অনেক রূপসী নারী দেখেছি, কিন্তু সেই নারী চোখে যে স্বপ্ন এঁকে দিয়েছে তা আমি মুছে ফেলতে পারিনি। ঘরের নিভৃতে তন্দ্রাজাগরণে আমি দেখতে পাই দিগন্ত বিস্তৃতি খাঁ খাঁ দুপুরে সেই নারী লাল শাড়ি পরা, আমার শিওরে বসে আছে, আমি পরম তৃপ্তিতে সে নারীর মধুর স্পর্শে অপরূপ কারুকার্যময় ভুবনে বিচরণ করি, আমি তাকে আমার জীবনাবেগের মার্ধুর্য ঢেলে এমন আদরে যেন আমার চেতনায় নক্ষত্র তরল আলোক ধারায় ঝরে পড়ছে। আমি প্রতিক্ষণের শিহরণে সপ্ত আকাশ উন্মোচন সে নারীর সকল গোপন সৌন্দর্য পেয়ে যাই, আমার সামনে গোলাপের পাঁপড়ি মেলানোর মতো সে নারী যেন বিকশিত হয়ে ওঠে এ কল্পনায় আমি সারাক্ষণ নিজেকে ডুবিয়ে রাখতে চাই। আমি অন্তলীন স্বপ্নে তলিয়ে যেতে থাকি।

তোমার বাবা যা বলেছেন তা ঠি, মাধুরীকে বলতে থাকি কিন্তু মাধুরী কিছু না বুঝে অবাক হয়,সে এক অনাস্বাদিত আনন্দে শিহরিত হয়-বাবা কী বলেছে তা আমার জানা নেই, তার চেয়ে এই সন্ধ্যা কি বেশী নয়। আমাকে কিছু বলতেই হবে, আশা করি তুমি তা শুনবে। —আমি আপনার সাথে তেমন আলোচনা করতে চাই না, আমাকে সেভাবে নাইবা বললেন, আমার ব্যাপারে আপনার যদি কিছু বলার থাকে তা মাকে বলতে পারেন।

কাননের ঘরের দরজা বন্ধ আমির আলির মৃদু কথা ভেসে আসে, কিন্তু তা অস্পষ্ট। কানন আমির আলিকে কখনও পছন্দ করে নি।তার প্রতি কাননের চাপা আক্রোশ ছিল, তা কাননের কথাতেই বুঝা যেত, কিন্তু আজকে যখন আমির আলীকে ডেকে পাঠিয়েছে তাতে আমরা অবাক হয়েছি।বাড়ির সদর দরজায় আমির আলীর নতুন ঢাউস গাড়িটি রাজহংসের মতো গ্রীবা উচু করে দাড়িয়ে আছে ।

—তোমার বাবা কোথায় ?
—ডাক্তারের কাছে গেছে ,রাতথেকে মার শরীর ভালোনা
—তুমি বিমর্ষ কেন?
—আনন্দ পাওয়ার কোন কারণ নেই ।
—জীবন আনন্দময়
—আমার কাছে নয় আমি জীবনের অন্য চেহারা দেখি
—তোমার কি ইচ্ছে করে না অন্যভাবে দেখতে
—তাতে আপনার কি এসে যায় ।
—না, আমার আবার কি তোমার জীবন তোমার কাছে ।

—আমার মাথায় একমাত্র চিন্তা আমির আলি কাননের ঘরে কি করছে, নিজের মতো করে ভাবার কারণে আমি পুলক অনুভব করি। আমার বোধে এমন ভাবনা জেগে ওঠে, মাধুরী আমার, আমি মাধুরীর সান্নিধ্য উপভোগ করি, ওর শরীর থেকে আমি এক ধরনের গন্ধ পাই, এ ধরনের গন্ধ মেয়েদের শরীর থেকে আসে কি-না, কাননের শরীর থেকেও এমন গন্ধ পেয়ে থাকি, মাধুরী  এখন তার শরীরী গন্ধে আমাকে মদির সৌরভে ভরে দিচ্ছে, আমার চেতানায়  সে গন্ধে থোকা থোকা বেলীফুল ফুঁটে উঠছে। আমি আবেশে বিমোহিত হয়ে পড়ি। আমার কন্ঠে কি ছিল জানি না, তবে মাধুরী আবেগময় দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকায় যখন আমি ওকে বলি, চল ছাদে যেয়ে বসি।

—আমার শরীর ঝিম ঝিম করতে থাকে।

—মাকে দেখে আসি, আপনি ছাদে যেয়ে বসুন। মাধুরী তার ঘরে গেল, আমি একাই সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকি, ও এসে আমাকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ক্ষুণ্ন হয়।

—আপনি নাচাতে ভালবাসেন
—কেন নাচা-নাচীর কি হলো?
—আপনি এখান থেকে চলে যান;

—আমি অপমানিত হই, আমার ভেতরে অস্থিরতা দেখা দেয়, অস্থিরতার কারণে আমি অসহিষ্ণু হয়ে পড়ি, আমার মাথা ঝিমঝিম করে, এ অবস্থায় আমার বোধ হ্রাস পেতে থাকি।

প্রায় ঘন্টা তিনেক পর আমির আলি কাননেন ঘর থেকে বেরোয়, তখন সময় রাতের দিকে গড়িয়েছে, ঘুটঘুটে অন্ধকার, বিজলী বাতির আলোতে আঁধার কিছুটা ফিকে হয়েছে। আমি মাধুরীর শরীরী গন্ধে আমেজে আয়াসে; আমির আলি আমাকে খুজঁছিল। মা চাপা আক্রোশে আমির আলিকে কী যেন বললো, বোঝা গেল না। আমির আলির কন্ঠ শোনা গেল, চেঁচামেচি করে কী হবে, কানন আমাকে ডেকেছে তাই আসতে হলো।

পরের দিন নতুন দিনের শুরু হয়। রাতে ঘুম হয়েছিল, ঘুমের আবেশে জড়িয়ে ছিল শরীরে মাধুরীরর মাধুর্য, আমি ঘুমিয়েছিলাম ওর লকলকে দেহের কলিষ্ঠ আবেষ্টনীতে। মা’র মেজাজ বেশ ভাল, সে রকমারি বান্নার কাজে ব্যস্ত, কানন খোশ মেজাজে গুণগুণ করছে, বাড়ির পরিবেশ উপভোগ করার মতো। নিরীহ দিনটি মৃদু কম্পনে সব ছিন্ন করে অতিবাস্তব রূপ নিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠলো। লোক মুখে খবরটি আমাদের বাড়িতে পৌছল, কানন ছাড়া আমরা সবাই মুক হয়ে গেলাম। আমি প্রচন্ড ধাক্কা খেলাম, যদিও বাতেন শিকদারকে আমি পছন্দ করি না, কিন্ত এমন সংবাদ তো আশা করি না। মায়ের পিছুটান, মাধুরীরর নীরবে গভীর দৃষ্টি, সবকিছু পেছনে ফেলে আমার সেই স্মৃতিময় দুপুর দিনের স্মৃতিময় জায়ড়ায় ছুটে যাই, সেখানে কিছু মানুষের জটলা। বাতেন শিকদারের রক্তাক্ত ছিন্ন মস্তক অসাড় দেহটা পড়ে আছে, একটু দুরে মাথাটা, জুটে যাওয়া মানুষগুলো অবাক হয়ে দেখছে, মাথা বিহীন দেহ কেমন দেখায়, তাদের দৃষ্টিতে কোনো অস্বাভাবিকতা নেই, এ যেন অহরহ দেখা নৈমিত্তিক দৃশ্যের অর্ন্তগত।

Comments

comments

কেতু মন্ডল

কেতু মন্ডল

জন্ম ও বেড়ে ওঠা লালনের ভিটে কুষ্টিয়ার আড়ুয়াপাড়ায়। কবিতার সাথে দিন রাত বসবাস ছেলেবেলা থেকে। তিনি জীবনের নানা ভাবনার মাঝে কেবল লিখে যেতে চান। 'পাঁজরের প্রতিধ্বনি' কেতু মণ্ডলের প্রথম কাব্যগ্রন্থ।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

Tags: , , , , ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি