সাম্প্রতিক

আমাদের মানচিত্র থেকে ‘রক্তের’ দাগ আর শুকায় না । ইরফানুর রহমান

গুলশান এটাক নিয়ে ইনবক্সে কথা হচ্ছিলো একজনের সাথে, তিনি যেহেতু ইনবক্সে মেসেজ করেছেন, তাই তাঁর প্রাইভেসির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে নাম প্রকাশ করলাম না। কথা প্রসঙ্গে এক সময় উনি জিজ্ঞেস করছিলেন আমি কেনো এই এটাককে শুধুই ইসলামি জঙ্গিবাদ হিসেবে দেখছি না। আমি জবাবটা ইনবক্সে না দিয়ে এখানেই দেই, উনি তো দেখবেনই, অন্যরাও দেখতে পাবেন।

দ্যাখেন, ইসলামি জঙ্গিবাদ বাস্তব সমস্যা সে আমি মানি, ইসলামের নামে কিছু মানুষ নারকীয় সমাজ তৈরি করতে চায় সেটা স্পষ্টতই চোখে পড়ে। কিন্তু ইসলামি জঙ্গিবাদের উত্থানের একটা প্রেক্ষাপট থাকে, ইসলামি জঙ্গিরা জিবরাইলের মতো কোনো ফেরেশতা না, যে তারা আকাশ থেকে নেমে আসবে অলৌকিকভাবে। এই প্রেক্ষাপটটাকে গুরুত্বের সাথে নেয়াটা অনেক জরুরী, যদি সত্যি সত্যিই, আপনি ইসলামি জঙ্গিদের রাজনৈতিক উত্থান ঠেকাতে চান।

মধ্যপ্রাচ্যে জঙ্গিবাদের উত্থান নিয়ে কিছু কথা বলি। ২০০৩এর আগেও সেখানে কিছু ইসলামি জঙ্গি ছিলো। কিন্তু তারা কোনোদিনও ফ্যাক্টর হয়ে ওঠে নাই। কারণ সাদ্দাম হোসেন আর বাশার আল আসাদরা যে আরব জাতীয়তাবাদ আর সমাজতন্ত্রের খিচুরি পাক করে খাইয়েছেন অই দেশ দুটির মানুষজনকে, সেটা এমন এক ফ্যাশিস্ত রাজত্ব তৈরি করেছিলো, যেখানে ক্ষমতাকাঠামোর বাইরে কারো পক্ষেই ফ্যাক্টর হয়ে ওঠার কোনো স্পেস ছিলো না। তা সে জঙ্গি হোক আর লিবারাল/কমিউনিস্টই হোক। আশির দশকে সাদ্দাম হোসেন ছিলেন মার্কিন প্রিয়পাত্র, ইরান ইরাক যুদ্ধের সময় সাদ্দামকে ওয়েস্টার্ন মিডিয়ার চোখে সেকুলারিজমের পোস্টারবয় মনে হয়েছে, কারণ তখন তিনি লড়ছিলেন ইসলামি বিপ্লব-উত্তর ইরানের বিরুদ্ধে। সেই সময় ইরাকের কুর্দিদের নার্ভ গ্যাস দিয়ে হত্যা করে সাদ্দামের সেনাবাহিনী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান কুর্দিদের কাছে এর আগে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছিলেন ইরান-ইরাক যুদ্ধে ইরানের পক্ষ নিলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা দেবে, কিন্তু কুর্দিরা ইরানের পক্ষ নিয়ে যুদ্ধে নামলে রিগ্যানের কাছ থেকে কোনো সহায়তা আসে নাই।

ইন্টারেস্টিং বিষয়, ইরান ইরাক যুদ্ধের কারণে ইরানে মোল্লাতন্ত্রের কিন্তু কোনো ক্ষতি হয় নাই, বরং তারা ইরাকি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে নিজেদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গ্রহণযোগ্য করে তোলার সুযোগ পেয়েছে।

সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন আফগানিস্তানে আগ্রাসন চালিয়েছিলো, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সোভিয়েত-বিরোধী মুজাহেদিনদের ব্যাপক মদদ দেয়, তাদের পলিটিকাল সিলেবাস তৈরি হয়েছিলো নেব্রাস্কা ইউনিভার্সিটিতে। জিমি কার্টার তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট, সোশালিস্ট পোল্যান্ড থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পলিটিকাল এসাইলাম নেয়া বিগনিউ ব্রেজেনস্কি ছিলেন তাঁর ন্যাশনাল সিকিওরিটি এডভাইজার, তাঁকে এক ইন্টারভিউয়ে যখন জিজ্ঞাসা করা হচ্ছিলো এভাবে মুজাহিদিনদের কেনো মদদ দেয়া হচ্ছে তখন তিনি কি জবাব দিয়েছিলেন জানেন? বলেছিলেন মানব সভ্যতাকে সোভিয়েত ইউনিয়ন আর পূর্ব ইউরোপের কমিউনিস্টদের হাত থেকে “মুক্ত” করা নাকি অন্য যে কোনো মানবিক বিবেচনার চেয়ে জরুরী!

নব্বইয়ের দশকে যুগোশ্লাভিয়া যুদ্ধের সময় সার্বরা বসনিয়ায় ভয়াবহ এক গণহত্যা ও ধর্ষণযজ্ঞ চালাচ্ছিলো। সার্বদের পেছনে ছিলো রাশিয়া, বসনিয়ার পেছনে আমেরিকা। স্নায়ু যুদ্ধের হ্যাং ওভার পলিটিকস চলছিলো তখন। ওয়েস্টার্ন মিডিয়া শুধু সার্বদেরকে পারপিট্রেটর হিসেবে দেখিয়েছে। আর বসনিয়ার মুসলমানদেরকে দেখিয়েছে ইনোসেন্ট ভিকটিম হিসেবে। বসনিয়ার মুসলমানরাও যে সার্ব ক্রিশ্চানদের ওপর আক্রমণ করেছে, ক্রিশ্চান মেয়েদেরকে ডিটেনশন সেন্টার তৈরি করে ধর্ষণ করেছে, এটা স্রেফ ওয়েস্টার্ন মিডিয়া হাওয়া করা দিয়েছে। অর্থাৎ একটা গৃহযুদ্ধকে তারা জেনোসাইড হিসেবে দেখিয়েছে।

পশ্চিমের কুমিররা তখন ‘বসনিয়ার মা-বোনদের’ জন্য কাঁদছিলো। তাদের সাথে সাথে ‘মুসলিম উম্মাহর’ বেকুবগুলিও কাঁদছিলো। কান্নার আসল কারণ বুঝা গেল বসনিয়া-হার্জেগোভেনিয়া ‘স্বাধীন’ হওয়ার পর, যখন দেখা গেলো বসনিয়ার মাটির নিচের সব খনিজ সম্পদ চলে যাচ্ছে মার্কিন কর্পোরেশনগুলোর দখলে, এটা বুঝা গেলো যে কুমিররা এমনি এমনি কাঁদে না কোনোদিন।

বাংলাদেশের জনগণ যদি আন্তরিকভাবে চান তাহলে আওয়ামি জোট, বিএনপি জোট, এবং সিভিল-মিলিটারি-কর্পোরেটদের এই ক্ষমতার পাশা খেলার শিকার হওয়া বা হাতিয়ার হওয়ার নির্মম বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন। কিন্তু সেই জন্য গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তুলতে হবে জনগণের ভেতর থেকে, রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায়, এবং এটা একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া যার কোনো শর্টকাট নাই।

যা হোক, আল কায়েদার জন্য আশীর্বাদস্বরূপ ছিলো অই যুদ্ধ, কারণ কসভো লিবারেশন আর্মি নামে যে সেনাবাহিনী গড়ে উঠেছিলো সিআইএ নিজ হাতে তাতে রিক্রুট করেছিলো অসংখ্য আল কায়েদা অপারেটিভকে।

২০০৩এ ইরাক আগ্রাসনের আগে সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে দুটি অপপ্রচার চালিয়ে কনসেন্ট ম্যানুফেকচার করা হয় সামরিক আগ্রাসনের স্বপক্ষে।

একটি হচ্ছে ইরাকে গণবিধবংসী অস্ত্র আছে, আর অন্যটি হচ্ছে, সাদ্দাম হোসেন নাকি আল কায়েদার সাথে জড়িত।

সাদ্দাম ফ্যাশিস্ত ছিলেন, ক্ষমতার স্বার্থে শেষের দিকে তাঁর দেশের উলেমা লিগ টাইপের কিছু প্রতিক্রিয়াশীল লোকজনকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারও করেছেন, কিন্তু আল কায়েদার সাথে সম্পর্ক ছিলো না তাঁর। আর গণবিধবংসী অস্ত্র খুঁজে পাওয়া যায় নাই। যার অস্তিত্ব নাই তা পাওয়া যায় না।

অথচ এই ফলস গ্রাউন্ডে ইরাকে আমাদের সময়ের নিকৃষ্টতম যুদ্ধাপরাধগুলো সংঘটিত করা হয়েছে, গণহত্যা চালানো হয়েছে, দখল করে কেটে টুকরো টুকরো করে মিলিটারি-ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্সের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। নুরেমবার্গ ট্রায়ালের নজির ফলো করলে এন্টায়ার বুশ এডমিন্সট্রেশনকে একসাথে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেয়ার কথা! কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধাপরাধের বিচার কে করবে?

আবু গারিব কারাগারে কি সভ্যতার বিকাশ ঘটেছে? সেখানে কি রুশো ভলতেয়াররা এনলাইটেনমেন্টের চর্চা করেছেন?? ইরাকিদের আলোকিত করেছেন???

ইরাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটা কমিউনাল কার্ড খেলেছে, আগ্রাসনের কিছুকাল পরেই, শিয়া নূরী আল মালিকীকে ক্ষমতায় এনেছে তাঁরা। শিয়ারা ইরাকে সংখ্যাগুরু, টোটাল পপুলেশনের ৬৫%, ইন ফ্যাক্ট নাজাফে আলী আর কারবালায় হোসেনের মাজার থাকায় ইরাককে অনেকেই শিয়া ইসলামের দোলনা বলেন। আর সুন্নীরা সংখ্যালঘু। সুন্নী সমপ্রদায়ভুক্ত হওয়ার কারণে সাদ্দাম হোসেন নিজে এমন কোনো ধার্মিক ব্যক্তি না হলেও শিয়াদেরকে কোনঠাসা করে রেখেছিলেন। আর কুর্দিরাও সংখ্যালঘু, তাঁদের ওপরও অত্যাচার হয়েছে। নূরী আল মালিকী পাশার দান উলটে দেন। তিনি ক্ষমতায় আসলে তাঁর বিশ্বস্ত শিয়া ক্লেরিক মুকতাদা আল সদরের বাহিনী এবং অন্যান্য শিয়া মিলিশিয়া সুন্নীদের ওপর প্রচণ্ড সাম্প্রদায়িক অত্যাচার করে।

সুন্নীরা শিয়া নূরী আল মালিকী সরকারের বিরুদ্ধে একটা গণতান্ত্রিক আন্দোলনেও নেমেছিলো, আমার একুরেটলি মনে নেই তবে সম্ভবত ২০০৭-৮এর দিকে, সেই আন্দোলনকে স্টিমরোলার চালিয়ে স্রেফ পিষে ফেলা হয়েছে। ইরান সক্রিয়ভাবে মালিকী সরকারকে সমর্থন দিয়ে গেছে। এই সুন্নীবিরোধী সাম্প্রদায়িকতায়।

আইএস (আরবিতে দায়েশ) মূলত ছিলো আল কায়েদার ইরাকি শাখা, একটা সময় পর্যন্ত, যা খুবই লিমিটেড ক্যাপাসিটির ছিলো। শিয়া মিলিশিয়া যখন সুন্নীদের ওপর অত্যাচার চালায়, খুন ধর্ষণ করে, তখন এরা সুন্নীদের মধ্যে পপুলার হয়ে ওঠে। ২০১০এ এরা মসুল দখল করে নেয়, কয়েক লাখ সৈন্যের ইরাকি সেনাবাহিনী মাত্র কয়েক হাজার জঙ্গির সাথে পারে নাই, ইউনিফর্ম ফেলে পালিয়েছে।

গণতান্ত্রিক প্রতিরোধ-আন্দোলনকে দমন করলে ফ্যাশিস্তদের উত্থান ঘটে। এটা ইতিহাসের শিক্ষা। ইরাকে সেটা একেবারে হাতে কলমে প্রমাণিত হয়েছে।

যুদ্ধটা যদি শুধুই ইরাকের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকতো, তাহলে, সুন্নী ইসলামি জঙ্গি আইএস খুব বেশিদিন টিকতে পারতো না। কিন্তু আমরা থাকি তো একটা বিশ্বায়িত দুনিয়াতে। আবার ইরাকে শিয়ারা সংখ্যাগুরু হলেও সামগ্রিকভাবে, অর্থাৎ সারা দুনিয়ার মুসলমানদের মধ্যে, সুন্নীরা সংখ্যাগুরু। তাই দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আইএসের রিক্রুটরা আসে যাদের অনেকেই তাদের বুঝমতো সুন্নী খেলাফত কায়েম করতে চায়। কিন্তু ইরাকের সুন্নী ছেলেদের অনেকেরই খেলাফত নিয়ে কোনো হেডেক নাই, হুরপরীর লোভেও আইএসে যায় না তারা, যায় শিয়া মিলিশিয়ার হাতে অত্যাচারিত হওয়ার কারণে সাম্প্রদায়িক জিঘাংসার বশবর্তী হয়ে প্রতিশোধ নেয়ার অন্ধ আকাঙ্ক্ষায়। এই সাম্প্রদায়িক রাজনীতি এই ভূখণ্ডেও আমরা দেখেছি। সেই চল্লিশের দশকে।

শিয়া, সুন্নী, কুর্দি। হিন্দু, মুসলমান, শিখ। দ্যাট ওল্ড গেইম অফ ডিভাইড এন্ড রুল বাই দি কলোনিয়াল পাওয়ারস।

সিরিয়ান রিফিউজি ক্রাইসিস নিঃসন্দেহে আইএসের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। কিন্তু সিরিয়াতে যে কোনো মূল্যে বাশার আল আসাদকে ক্ষমতা থেকে সরানোর যে সর্বনাশা খেলা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শুরু করেছিলো সেটাকেও আমলে নিতে হবে আপনার। সেখানে একদিকে আসাদ-ইরান-চীন আর অন্যদিকে আমেরিকা-ইজরায়েল-তুরস্ক-সৌদি-ইইউ মিলে একটা নিওকলোনিয়াল ওয়ার চালিয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। আইএস, জাবাত আল নুসরা, আর ইসলামিক ফ্রন্টের মতো ইসলামি জঙ্গিরা চাইছে সিরিয়ার ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে। তিন পক্ষের যুদ্ধে লাখো মানুষ মারা যাচ্ছে। সিরিয়ার শিশু তুরস্কের সমুদ্রতীরে মরে পড়ে থাকছে। এই অমানুষদের যুদ্ধে কোন পক্ষ নেবেন আপনি?

লিবিয়ার কাদ্দাফিও নিঃসন্দেহে একজন ফ্যাশিস্ত শাসক ছিলো। কিন্তু কাদ্দাফিকে উৎখাত করে কি লিবারাল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেয়েছে নাকি দেশটি পরিণত হয়েছে ইসলামি জঙ্গিদের সেইফ হ্যাভেনে? হিলারি ক্লিটন একা দেশটিকে ধবংস করে দিয়েছেন, ওয়ালস্ট্রিটের সেই মহীয়সী লিবারালরা যাকে ভালো ভাবেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের চেয়ে!

আপনারা বিশ্বাস করেন ওয়ার অন টেররের রূপকথায়? সুন্নী ইসলামি জঙ্গিবাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক সৌদি রাজতন্ত্র আর পাকিস্তানের আইএসআই, আজ পর্যন্ত এদের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোনো ব্যবস্থা নেয় নাই, বরং এদের কোলে নিয়ে “জঙ্গিবাদ নির্মূলে” নেমেছে। আপনি যার নির্মূল করতে চান তার ইয়ারদোস্তদের সাথে হুইস্কি গিলে আপনি তারে কোন গায়েবি তরিকায় নির্মূল করবেন?

এবার আমি আমার সোনার বাংলার মানচিত্রে ফিরি।

আমাদের এখানে ইসলামি জঙ্গিবাদ ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করে সেই বিএনপি-জামাত জোট সরকারের সময়ে। সেই একই সময় চালু হয় ক্রসফায়ার কালচার। র‍্যাব গঠিত হয় ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্টের ইচ্ছায়। শুরুতে জেএমবির বাংলা ভাইদেরকে স্থানীয় পুলিশ ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে স্থানীয় কমিউনিস্ট নিধনে, পরে যখন ইসলামি জঙ্গিবাদ একটা ন্যাশনাল ইস্যু হয়ে ওঠে, কিছু ইসলামি জঙ্গিকে শাস্তি দেয়া হয়। এইটা একটা খেলা। কর্পোরেট পুঁজির অবাধ প্রবেশাধিকারের জন্য সুপরিকল্পিত খেলা। ক্রিয়েটিং আ গুড ইনভেস্টমেন্ট ক্লাইমেট বলে এটাকে।

১/১১এর ব্যাসিস অনেক আগে থেকেই তৈরি হয়েছিলো। বিএনপি-জামাত বোঝে নাই। যখন বুঝেছে ততোদিনে অনেক দেরী হয়ে গেছে।

আওয়ামি লিগ সরকার ক্ষমতায় আসে ২০০৯ সালে। ২০০৯ থেকে এখন পর্যন্ত যে পলিটিকাল এন্ড ইকোনমিক ডেভলাপমেন্ট, সেটা যদি খুব ক্লোজলি লক্ষ্য করেন, তাহলে দেখবেন ভারত-রাশিয়া-চীন এই সরকারের কাছ থেকে যা পেয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার একশ ভাগের এক ভাগও পায় নাই। শুধু টিকফায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পেট ভরে না। এবং আওয়ামি লিগের ফার্স্ট টার্মের শুরুতেই বিডিআর বিদ্রোহের কারণে আরেকটু হলে আর্মি আবার ক্ষমতায় চলে আসতে যাচ্ছিলো। শেখ হাসিনা যেহেতু শেখ মুজিবুর রহমানের মেয়ে, রাজনীতি ভালোই জানেন, তাই সেই যাত্রায় গদি রক্ষা করতে পেরেছেন। এবং সরকারও তাই আর্মিকে প্রচুর সুযোগসুবিধা দিচ্ছে। কিন্তু যেই বাঘ একবার রক্তের স্বাদ পেয়েছে, সে খাঁচায় থাকতে চাইবে না, এমনকি সোনায় মোড়ানো খাঁচাতেও না। এবং এই জামানায় আর্মি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের মতো আকস্মিকভাবে যাত্রাদলের বিবেকের মতো ঘোষণা দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে না, এটা আশির দশক না, এটা ওয়ার অন টেররিজমের কাল। তনু ধর্ষণ হত্যার কেইসটা বিবেচনা করতে পারেন। শেখ মুজিবের আমলে ক্যান্টনমেন্টে ধর্ষিতার লাশ পাওয়া গেলে, যতো বড়ো আর্মি অফিসার বা তার রিলেটিভই যুক্ত থাকুক না কেনো, খুব দ্রুত বিচার হয়ে যেতো। কারণ তখন আর্মির সাথে দ্বন্দ্ব ছিলো আওয়ামি লিগের, বা আরো বিশিষ্টভাবে বললে, রক্ষীবাহিনীর। আজকে এই যে তনুর পরিবার বিচার পেলো না, কেননা আওয়ামি লিগ এখন আর আর্মিকে আগের মতো খারাপ চোখে দেখে না, আর দেখলেও আর্মি ইনভলভড এমন কোনো ক্রাইমের বিচার করার নৈতিক সাহস নাই তার। পুলিশ আর র‍্যাব পরিণত হয়েছে আজকের রক্ষীবাহিনীতে। তবে এরাও আজ আর্মির প্রতি বিরূপ না, অন্তত ১৯৭১ পরবর্তী-কালের রক্ষীবাহিনী আর সেনাবাহিনীর দ্বন্দ্ব, আজকের পুলিশ-র‍্যাব আর আর্মির মধ্যে ঐতিহাসিক কারণেই পাবেন না। যখনই ফাহিম বা শরিফুলের মতো কোনো জঙ্গি ধরা পড়ছে, তাদেরকে ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধের নামে মেরে ফেলা হচ্ছে, কারণ সরকার জানে জঙ্গিদের পেছনে অনেক বড়ো কারো মদদ আছে। কোনো তদন্ত ছাড়া সরকার বিএনপি-জামাতের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দিচ্ছে আর দাবি করছে দেশে নাকি কোনো জঙ্গি নাই। এখান থেকে স্রেফ একটা সিদ্ধান্তেই পৌঁছানো যায়।

হয় সরকার নিজেই সমস্ত জঙ্গিকে পৃষ্ঠপোষকতা করছে, অথবা যারা করছে, সে তাদের সাথে আপোস করে থাকতে চাইছে। ক্ষমতায় থাকতে চাইছে। আমার ধারণা দুটি সম্ভাবনার মধ্যে দ্বিতীয়টি সত্য।

সেই ক্ষেত্রে সে কাকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে? এই দেশে আওয়ামি জোট আর বিএনপি জোটের বাইরে এমন কোনো সংগঠিত শক্তি আছে যাদের জঙ্গিদের মদদ দেয়ার মতন অর্থ, অস্ত্র, ইন্টিলিজেন্স সবই আছে? অনুমান করতে পারেন?

হ্যাঁ, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। আমার কাছে কোনো সলিড এভিডেন্স নাই অবশ্য। তবে ঘটনাপ্রবাহের বিকাশ তাদের দিকেই ইঙ্গিত করে।

আর্মি চাইছে একটা মাস হিস্টেরিয়া তৈরি হোক। সিভিল সোসাইটি আর কর্পোরেট পুঁজির যেই সেকশনগুলো আওয়ামি আর বিএনপি জোট উভয়ের ওপর বিরক্ত এবং ১/১১ থেকেই সেনাবাহিনীর গুণমুগ্ধ, তারা, আর্মির এই মাস হিস্টেরিয়া প্রজেক্টে অংশ নিচ্ছে। তারা দেশে একটা সিভিল-মিলিটারি-কর্পোরেট ডেমোক্রেসি দেখতে চায়।

শাহবাগ আন্দোলন কোনো একমাত্রিক আন্দোলন ছিলো না, সেখানে বিভিন্ন ধরণের সামাজিক শক্তির সমাবেশ ঘটেছিলো, যারা বিভিন্ন মতাদর্শের। শাহবাগ আন্দোলনকারীদের যেই অংশটা আওয়ামি লিগ সমর্থকও না, আবার লেফটিস্টও না, আমার কেনো জানি মনে হয় তাঁদের অনেকেই বুঝে না বুঝে আর্মির এই রাষ্ট্রপ্রকল্পের অংশীদার হয়ে যাচ্ছেন। যেহেতু আওয়ামি লিগ সরকার লাগামহীন লুটপাট আর সীমাহীন সহিংসতার মাধ্যমে দেশে একটা ফ্যাশিস্ত রাজত্ব তৈরি করেছে; বিএনপি বিলুপ্ত, জামাত দিশেহারা, আর বামপন্থীরা বিভক্ত; তাই এরা যে-কোনো মূল্যে আওয়ামি লিগ সরকারের পতন দেখতে চান। সেটা সিভিল-কর্পোরেট ফেইসে আসা সামরিক শাসন হলেও। আর্মি এটাই চায়। যতো ইসলামি জঙ্গিরা লাইমলাইটে আসবে, যতো নৃশংসতার শিকার হবেন ব্লগার-পাদ্রী-পুরোহিত-মুয়াজ্জিন-ভিক্ষু-শিয়া-শিক্ষক, ততোই সামরিক শাসনের জন্য সম্মতি উৎপাদিত হবে। এই দেশের জঙ্গিরা মধ্যপ্রাচ্যের জঙ্গিদের তুলনায় এমেচার, এদের পক্ষে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করা সম্ভব নয়, তবে এদেরকে ব্যবহার করে পানি ঘোলা করে আর্মির পক্ষে ক্ষমতায় যাওয়া খুবই সম্ভব।

গুলশান এটাককে আমি এই প্রেক্ষাপটেই স্থাপন করবো। বাংলাদেশের জনগণ যদি আন্তরিকভাবে চান তাহলে আওয়ামি জোট, বিএনপি জোট, এবং সিভিল-মিলিটারি-কর্পোরেটদের এই ক্ষমতার পাশা খেলার শিকার হওয়া বা হাতিয়ার হওয়ার নির্মম বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন। কিন্তু সেই জন্য গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তুলতে হবে জনগণের ভেতর থেকে, রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায়, এবং এটা একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া যার কোনো শর্টকাট নাই।

খেলা হবে, তবে আপনি নিজে খেলবেন না অন্যের খেলার পুতুল হবেন, সেই সিদ্ধান্তটা কিন্তু আপনাকেই নিতে হবে।

Comments

comments

ইরফানুর রহমান

ইরফানুর রহমান

শিক্ষার্থী, (চতুর্থ সেমিস্টার) আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: 

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি