সাম্প্রতিক

গ্রোসারি শপে ভাংতি লওয়া টিয়া পাখিটা । হাসান শাহরিয়ার

গ্রোসারি শপের ভিতর শ্যাম্পু কিনতেছিলাম। একটা টিয়া পাখি কই থেইকা যেন আসলো। সত্যি সত্যি টিয়া পাখি। কোয়ার্টারের ভিতর বিল্ডিংয়ের আশপাশে আমগাছে নারকেল গাছে যেইসব টিয়া পাখি উড়ে; তাদের মত। তারও একটা শ্যাম্পু দরকার। মনে হয়, লেজের পালকে খুশকি হইছে। আমি শ্যাম্পু নিয়া বাইর হইয়া যাইতেছিলাম। টিয়া আমার দিকে তাকাইলো। তারে একটু অসহায় লাগতেছিল। জিজ্ঞাস করলাম, ঠিক আছে সবকিছু?

সে মাথা নাড়াইলো। লেজটাও নড়লো। বললো— আপনে আমারে এক হাজার টাকা ভাংতি দিতে পারবেন? দুইতিনটা মিনিপ্যাক শ্যাম্পু নিলে দোকানি আমারে ভাংতি দিবে না।

আমি বললাম— ভাংতি টাকা আনেন নাই কেন?

— ঘরে ভাংতি ছিল না।

আমি তারে কিছু ভাংতি ধার দেয়ার প্রস্তাব দিলাম। সে প্রস্তাবে রাজি হইলো। আমি তারে আমার জানালায় মাঝে মাঝে বইসা গান গাওয়ারও প্রস্তাব দিলাম। সে এইটাতেও রাজি হইলো। আমি তারে বললাম— আপনের রঙটা খুব সুন্দর। ভাল লাগে আমার। সে হাইসা দিলো। আমি গ্রোসারি শপ থেইকা ঘরে ফিইরা আসলাম।

আমার আচমকা মনে হইলো, আরে, টিয়ার নামটা কেন জিজ্ঞাস করতে ভুইলা গেলাম। তার ত একটা নাম থাকার কথা। এইরকম ত হইতে পারে, রাস্তা দিয়া যাইতেছি কোথাও। সে আমারে উপর থেইকা ডাক দিলো। বলল- চিনতে পারছেন? তারে কি আর চিনবো আমি? কত টিয়ারেই ত দেখি। হাটে বাজারে। সুপারশপে। সবাইরে একরকমই ত লাগে। কারো লগে মাঝে মাঝে একটু ধাক্কা লাগে। আমি সরি বলার আগে তারাই আমারে সরি বলে। আমি তাড়াতাড়ি বলি— না না, ঠিক আছে। আপনে উইড়া আসতেছেন, এইটা খেয়াল করি নাই।

ত, আমি তারে কেমনে চিনবো? নাম বললে তারে জলদি চিইনা ফেলা যাইত। নাইলে আমি অবাক হইলে তারে আরো কিছু কথা বলতে হইবো তখন। যেমন— ঐ যে গ্রোসারি শপে; আপনে আমারে শ্যম্পু কিনার টাকা ধার দিছিলেন? টাকা নিবেন না?

ধুর, অল্প কয়টা টাকা। এইটা নিতে হয় নাকি? আমি কেন তার নামটা জিজ্ঞাস করলাম না? আর দেখা হইলে বলত আমারে— আমি রুম্পাটি। নাইলে মিতুটি। নাইলে বলত, আমি রানিয়াটি। টিয়া পাখি ত। নামের শেষে তাদের এইরকম ‘টি’ থাকে।

সারাদিন আমার ভালো গেল না। অনেক কারণেই। যেমন আমার প্রেমিকা আমারে ছাইড়া গেছে। আচমকা আমারে একদিন বলল— তোমারে আর দরকার নাই। তুমি আর আইসো না।

আমি আর গেলাম না। যেহেতু আমারে আর দরকার নাই তার। সারাজীবন আমি তার দরকার থাকবো; এইরকম কোন মেকানিক্স বাইর করতে পারি নাই আমি। কীভাবে তার কাছে যাবো?

আমি ভাল ক্রিকেট খেলতাম। একদিন হাঁটু ভাইঙ্গা গেল। ডাক্তার কইলো, লিগামেন্ট ছিঁইড়া গেছে। চিকিৎসায় অনেক খরচ। অস্ট্রেলিয়া যাইতে হইবো। ত, আর খেইলেন না। এমনিতে দেশি চিকিৎসায় চলাফেরা করতে পারবেন। আমি বললাম- ঠিক আছে। অস্ট্রেলিয়া যাবার টাকা যেহেতু নাই। না খেলাই ভাল।

একটা চাকরি করতেছি ইদানিং। ভাল লাগতেছিল প্রথম প্রথম। এখন আর লাগতেছে না। বসের মুখে কষাইয়া থাপ্পড় মারতে ইচ্ছা করে মাঝে মাঝে। মারা হয় নাই। বসের বয়স বেশি। মুরুব্বির গায়ে কেমনে হাত উঠাই?

সন্ধ্যা হইয়া আসলো। আমি জানালার কাছে বইসা ছিলাম। টিয়ার কথা মনে পড়লো। সে আইলে ভাল হইত খুব। তার লগে কিছু আলাপ করা যাইত। তার প্রেমিকের কথা জিজ্ঞাস করা যাইত। তার ঘর কই, এইটা নিয়াও কিছু কথা হইতে পারত। সে আমারে একটা গান শুনাইতে পারত। অথবা আমার কাঁধে বইসা আমারে বলতে পারত, বাইরে কোনখান থেইকা তারে ঘুরাইয়া নিয়া আসতে। কিছুই হইলো না। সন্ধ্যার আবছা অন্ধকারে আমারে আর কোন রাস্তা খুঁজতে হইলো। হারাইয়া যাবার। কোনখানে উধাও হইয়া যাবার।

কোথাও হারানো গেল না। কোথাও উধাও হওয়া গেল না। সন্ধ্যা থাকলো। জানালায় তার আবছা অন্ধকার থাকলো। আমিও থাকলাম; একই রকম। টিয়া পাখিটাও আসলো না।

Comments

comments

হাসান শাহরিয়ার

হাসান শাহরিয়ার

জন্ম ৮ নভেম্বর ১৯৮৫, একটি কবিতার বই রেরিয়েছে ‘বালির ঘর’ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ jhs.phy@gmail.com

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি