সাম্প্রতিক

মা । তমাল রায়

পুতুল তো পুতুল, তার নাক চোখ টেঁরা না বাঁকা এ নিয়ে না ভাবলেই হত। তবু ও ভাববেই। যেমন ধর কারো হাত লম্বা,কারো বেঁটে, সেতো তার দৈহিক গঠনরীতি মেনেই তৈরী। তা নিয়ে তোমার ভাবার কি আছে হে। যার লম্বা যার বেঁটে সে বুঝুক তার সমস্যা। বাকিদের বুঝে কি হবে। ইনকা কিন্তু ভাববেই। হয়ত তাকে ভাবতে হয় এসব। ও বলে আর কেউ ভাবে না তাই ও ভাবে। ধুর এ কোনো লজিক। তবু ও বলে আমরা শুনি। র‍্যাদার শুনতে হয়। আসলে ও কি খুব খুঁতখুঁতে? কই তেমন কিন্তু জানিনা। ও কি খুব শুচিবায়ুগ্রস্তা ? জানিনা, আসলে জানার রাজ্য এত বিশাল, এত জেনে কি লাভ ভেবে আমি ঘুমোতে থাকি নাক ডেকে। আর ইনকা আমায় ঘুম থেকে তুলে জিজ্ঞেস করে, হ্যাঁগো আজ ওই লোচনের বৌকে দেখলে?

— না’তো

— দেখোনি?

— সত্যি বল?

— আরে জমাদারের বৌ দেখে বেড়াবো আমি? ভাবোটা কি,আমায়?

— যাক বাঁচালে।

— কেন? কিভাবে বাঁচলে, ঘুম জড়ানো গলায় বলি।

— না, ওর ব্লাউজটা পুরো ছেঁড়া, পুরো বুক দেখা যাচ্ছিল।

— মানে? হোয়াট ডু ইউ মিন, এম আই সো মিন? যে জমাদারের বৌ এর বুক দেখব! আর ইউ ইনসাল্টিং মি?

— নো আই এম নট, কিন্তু স্কুলের কলিগরা সব বলে তো,পুরুষরা এমনই। মেয়ে হলেই হল। তাই,ভাবলাম…

মাথাটা গরম হচ্ছিল। বাট, ইনকাকে আমি বহু দিন চিনি, বিয়ের আগে আরো প্রায় বছর সাত। তাই রেগে মাথা গরম করিনা। পাশ ফিরে ঘুমাতে চেষ্টা করি। ও কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে বলে, ওই মেয়েটাকে আমার শাড়িটা দিয়ে দিলাম, সাথে ম্যাচিং ব্লাউজটাও।

—ভালো করেছ, ঘুম জড়ানো গলায় বলি।

—কোনটা বলত?

নিজেই বলে যেতে থাকে,সেই যে পৌষ মেলায় খেসের যে শাড়িটা কিনে দিলে, শান্তিনিকেতন থেকে,সেটা। এবার আমি তড়াক করে উঠে বসি। —মানে, ওটাতো তুমি একবারও পড়নি!

—হ্যাঁ,পড়িনি। কাউকে দিলেতো ভালোই দিতে হয় বল।

উঠে পড়ি। সিগারেট ধরাই। বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখি নীচের ডাস্টবিনে কুকুরদের সাথে লড়াই করে খাবার কাড়ছে আমাদের লাল্টু পাগল।

দেখি পাশে ইনকা এসে কখন যে দাঁড়িয়ে গেছে। বলছে -লাল্টুর কষ্টটা কেউ বোঝেই না। হাসি পায়,সত্যি কেন যে এই পাগলকে বাছলাম। কানে ফুঁ দিই। একটু কাঁপে। ফের বলতে শুরু করে, জানো লাল্টু সেদিন আমার হাত ধরে টানছিল। পাড়ার ছেলে গুলো এগিয়ে এসে ওকে মারতে শুরু করল। ইস! মানুষ এত নিষ্ঠুর কেন বলতো? রক্ত পড়ছে। আমি বলি — কই বলনিতো আগে,

— বললে যদি তুমি বক, তাই

— তারপর?

— আমি ওদের হাত জোড় করে বললাম,প্লিজ ছেড়ে দিন। ওরা কেমন ভ্যাবাচাকা খেয়ে চলে গেল, ছেলে গুলো।

ইনকার কথা শুনে আমি চমকে উঠছিলাম। কি যে বলে, সবটা বুঝেই উঠিনা। ইনকা আবার শুরু করল—

— জানো, এরপর থেকে লাল্টু এসে এই বারান্দার নীচে দাঁড়িয়ে থাকে। আমি আসলেই তাকিয়ে থাকে জুল জুল করে। ও কিছু বলতে চায়?

— জিজ্ঞেস করে দেখতে পারো তুমি। আমি কি করে বলব!

—ধুর ও কি আমার কথা বুঝবে!

—সেতো আমিও বুঝিনা তোমার সব কথা। তা বলে কি আমি তোমার কথা শুনিনা?

—পাগল বলছ, আমায়?

—কই না’তো।

কথার মাঝখানেই ইনকা কাঁদতে শুরু করে। আমি আর সামলানোর চেষ্টা করিনা। আগে করতাম,ও বুঝতো, অথবা বুঝতো না…বিছানায় গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি।

ভোর হলে রান্নার মাসি আসে। খাবার বেড়ে রাখে টেবিলে। খেয়ে নিয়ে রওয়ানা দিই অফিস। কাজ শেষে বাড়ি ফিরতে হবে দ্রুত, এমন আর মনে হয় না। ইনকাতো নিজের জগৎ নিয়েই ব্যস্ত। সে জগৎ ঠিক কেমন, আমি বুঝতেও পারিনা, আর সত্যি বলতে কি বোঝার মত চেষ্টা অল্প কদিন করেছি,আর ইচ্ছে করেনা। বাবা চলে গেছেন কিছু দিন,তার ব্যাংকের ঝামেলা মেটাও, ডেথ সার্টিফিকেট আনো, হাজার ঝামেলা, মা এর মধ্যেই অসুস্থ আবার। নিজের হাজার ঝামেলায় মাথা খারাপের দাখিল। এর মধ্যে ইনকার অদ্ভুত সমস্যা গুলো শুনে বিরক্তিই বাড়ে। কি করব আমিও তো মানুষ! 

সংসার, আসলে মায়া। আমার নামের মধ্যেও আসলে এই মায়ার এক বিস্তৃত সভ্যতার টের পাই। এই দেখ না তোমায় যখন চিঠি লিখছি, পাশে এসে বসেছে ওরা, আমার চোখ বেয়ে কেন জানিনা জল নামছে, হয়ত ধুলোবালি কিছু পড়েছে। ওরা আমার জল মুছিয়ে দিচ্ছে

রাতগুলো এভাবেই কাটে,দিনের গায়ে দিনগুলো শ্যাওলার মত জড়িয়ে যায়। আমার খিদে তেষ্টা আছে, যৌনতার তাগিদ আছে, কিন্তু আমার সঙ্গীনি ঠিক কী,বুঝে উঠতে পারিনা, ফলে এ সমস্তর বাইরে তার একটা আপন জগৎ টের পাই,যেখানে আমি রিচ করে উঠতে পারিনা কিছুতেই। অবশ্য চেষ্টাও খুব করেছি বলতে পারবো না। শত হোক পুরুষ তো। কেন বেন্ট হব? ইনকাকে সেদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম,যা বল,যা কর-তার সবটার অর্থ বুঝেই কর?

ও কিছুক্ষণ চুপ থাকলো। পরে বলল —তুমি কেন জন্মেছিল জানো?

সত্যি তো কেন? বললাম তুমি জানো? ও বলল -না, জানিনা। জানতেও চাইনি। সব কি অর্থ বুঝে হয়! বলে ও আউড়াতে লাগল— কোনো যে মানে নেই সেটাই মানে/ অন্ধ চোখ থেকে বধির কানে ছোটে যে বিদ্যুৎ সেটাই মানে,কোনো যে মানে নেই সেটাই মানে,বন্য শুকরী কি নিজেকে জানে আমি চুপ। কবিতা টবিতা আমার কোনো কালেই আসেনা। আমি নিছক কাঠ খোঁট্টা না হলেও সাধারণ  মানুষ। অত বুঝে কি করব। দিব্যি খেয়ে পড়ে কেটে যায়, আমি তাতেই সন্তুষ্ট। ওই সব ইনকার করা প্রশ্ন আর তার উত্তর নিয়ে ভেবে কি হবে। ও যে কেন আমায় বিয়ে করল কে জানে। দিব্যি  খাচ্ছিল তাঁতি তাঁত বুনে…

ইনকার কি একটা হয়েছে বেশ কদিন যাবৎ। আমি ঘাঁটাই না। ও দেখি কিছু বলে না আমায়। কি জানি কেন। মাঝ রাতে হঠাৎ দেখি বিছানায় পাশে নেই,আমি আর উঠে খুঁজি না। জানি বাথ রুম বা বারান্দায় আছে। যাবে আর কই। চলছিল এভাবেই। সেদিন বাজার করতে গেছি রোববার সকালে, দেখি পাশের বাড়ির অলোক কাকু ডাকছেন,ভাবলাম দূর্গা পুজোর আর দেরী নেই,হয়ত চাঁদা নিয়ে কিছু বলবেন। কাকু যা বললেন শুনে আমি থ’। ইনকা না’কি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় মাঝ রাতে। বেরিয়ে পাগলা লাল্টুর সাথে কথা বলে। তার হাত ধরে কি সব বোঝায়। বাড়ি ফিরলাম। সারা দিন খুব গম্ভীর হয়ে রইলাম। রাতে আগেই খেলাম। ইনকা কিছু বলেও না। নিজের জগতেই। আমাদের প্রথম সন্তান অজাত। কারণ জানা নেই,তবে ডাক্তার ইনকাকে বলেছিলেন — ‘এত ব্লিডিং হল কাউকে কিছু বললেন না?’ আমায় খুব ভর্ৎসনা করলেন। আমি চুপ ছিলাম। এর পর থেকে  আমাদের আদর বন্ধ। কে কার প্রতি অভিমানে,আমিও তা ঠিক জানিনা। তবে দূরত্ব যে তৈরি হয়েছে তা বুঝতাম। সে যাই হোক রাত গাড় হল। আমি চোখ বুজে মটকা মেরে পড়েছিলাম কখন যে  ঘুমিয়ে পড়েছি জানিনা ঠিক,পাশে হাত দিয়ে দেখি নেই, তড়াক করে উঠে পড়লাম। বারান্দায় গেলাম, দেখি কেউ নেই নীচে।দৌড়ে নীচে নামলাম।  দরজা খোলা। তাহলে? খুঁজলাম আশপাশ। পেলাম না। উঠে আসছি,টেনশন ও হচ্ছে খুব। পুলিশ কে খবর দেব কিনা জানিনা।

দেখি ড্রয়িং রুমে আলো জ্বলছে। উঁকি দিয়ে দেখি লাল্টু পাগল বসে,লাল্টুর সামনে রাখা ভাত ডাল মাছ আর ইনকা তাকে বলে চলেছে — তুমি সেদিন কি কিছু বলছিলে লাল্টু? তুমি কেন অমন করে চেয়ে থাকো আমার দিকে? বল উত্তর কর। শুনছি আর আমার ভেতর অবধি জ্বলতে থাকে। — বল কেন চেয়ে থাকো,বল? আমার মাথা গেল গরম হয়ে,ভেতরে ঢুকে লাল্টুর সামনের ভাতের থালায় লাথি দিলাম সপাটে,উলটে গেল,খাবার। ইনকা আমায় থামাতে এলো। — অভুক্ত কে খাবার দিয়েছি,তুমি লাথি মারছ! অমানুষ তুমি? আমি এবার চুল ধরেছি ইনকার। ও বলছে — ছাড়ো  ছাড়ো,লাগছআর…দিলাম ছুঁড়ে তাকেও। কপালে লাগল। লাল্টু সরে যাচ্ছে,ধীরে ধীরে। আমি তো ডুয়েলে। শালা,তুই পাগল? আমার বাড়ি ঢুকে,আমার বৌ এর সাথে লাইন মারিস,তুই পাগল? এলো পাথারি মারছি ওকে,হিড় হিড় করে টানতে টানতে বার করে দিলাম দরজার বাইরে। মা’র ঘুম ভেঙেছে — কিরে, বেড়াল না’কি? বললাম -না মাছি। ইনকা পড়ে মেঝেতে। আমি উঠে গেলাম দোতলায়। থাকুক পড়ে। আমার এসব পোশাচ্ছে না। ঘুমাবো। মাথা কেমন করছে। পাগল না ছেনালি মেয়েছেলে কে জানে। এবার নিজের কৃতকার্যের জন্য অপরাধী লাগছে।

সকাল হল। গায়ে হাতে পায়ে ব্যথা খুব। অনেক বেলা হল। আজ আর অফিস যাওয়া হল না। মা আমার বিছানার পাশে বসে -ইনকা কই?

—সে কথা জিজ্ঞেস করতেই আমিতো বসে। ভাবলাম ঘুমাচ্ছিস। তাই ডাকিনি। এটা কি দেখতো? বৌমা বোধহয় কিছু লিখেছে।

হাতে নিলাম। লেখা রয়েছে-’Insanity is relative. It depends on who has who locked in what cage’ সত্যি কি পাগল হল ইনকা? কি করল? কেন? রাগ,টেনশন অভিমান সব একসাথে হচ্ছে,কোথায় খুঁজবো আমি? মা মারা গেছেন ওর অনেককাল, বাবাও  বছর দুই হল। আর তো তিন কুলে কেউ নেই। কোথায় খুঁজবো? পুলিশে গেলে হাজার ঝামেলা। পাড়াঘরে কেউ তেমন জানেনা,তাই বাঁচোয়া। আমাদের উত্তর কোলকাতায় এ এক মহা সমস্যা। এখনও লোক লোকের খোঁজ রাখে,না রাখলে বাঁচা যেত তবু।  পাগল পাগল লাগছে। এতো মহা মুশকিলে পড়া গেল। আমার তিনকুলে পুলিশে তেমন চেনা নেই। তবু খোঁজ খবর করে বাবার এক পুরনো বন্ধুর ছেলে ডি এস পি র‍্যাঙ্কে কাজ করে, তাকেই ধরলাম। সে সব লিখে নিলো। এরপর কি হয় দেখা যাক। লাল্টুকে এলাকায় আজ সকাল থেকেই দেখছি না। ভয় পেয়ে পালালে বুঝবো মালটা সেয়ানা,পাগলের অভিনয় করে,আসলে পাগল নয়। আরে পাগল তো পাগ,তায় সুন্দরী মহিলা দেখলে হাঁ করে গিলতে হবে? সে ডাকলে সুন্দরীর ঘরে চলে যেতে হবে। না’কি ইনকা ওকে ইনভাইট করেছিল,না’কি আরো কিছু করতে…ইসস কি সব ভাবনা আসছে মাথায়। এই জন্য বলে দুঃসময় এলে মাথা ঠান্ডা রাখতে হয়। কি করি এখন? ধুর বেরিয়ে পড়লাম গঙ্গার ধারে। খানিকক্ষণ পায়চারি করলাম।

তিনটে সিগারেট দু কাপ চা খেলাম,মুখটা কেমন কষাটে লাগছে। বেরিয়ে পড়লাম সুদেষ্ণার বাড়ির দিকে। আমার ইয়ে মানে বন্ধু মানে প্রেমিকা। ইনকা জানত না, সময় পেলেই আসতাম। হাজব্যন্ড মন্ট্রিওলে পোস্টেড। ও ওর দুই ছেলে মেয়েকে নিয়ে এখানেই থেকে গেছে। রোজ রোজ বদলির চাকরিতে খুব অসুবিধে। বাচ্চাদের স্কুলিং খুব হ্যাম্পারড হয়। ওখানে গেলে আমার  যা সুবিধে তা হল রাতের খাবার,প্লাস প্লাস…বাচ্চা গুলো তো ঘুমিয়েই পড়ে নটার মধ্যে। ওদের মর্নিং স্কুল। আর আমি আর সু…দিব্যি,আরে আমাকেও তো বাঁচতে হবে। সাধু তো নই,আর সাথে একটু আধটু ঢুকু ঢুকু ও। দিব্যি লাগে। এবার ইনকা মরুক আমায় কিছু দিক না দিক,নিজের পাগলামীর জগতে থাকুকগে আমার কি যায় আসে। আজ সু এর কাছে এসেছি ওই মানেটা জানতে কি বললো ঠিক? ’Insanity is relative. It depends on who has who locked in what cage’ ও অনেক বোঝে,ঠিক বুঝিয়ে দেবে আমি নিশ্চিত। যাক আছে সে। ফোন করতে ভুলেই গেছি তালে গোলে,হুট করে এমনতো আসিনা। সু ও রাগ করে।বলে চোখ কান খোলা রাখাই ভালো। বাচ্চা দুটো নেই। ও একাই। আজ কেন জানি আমার মাথায় একটু ইয়েও চাগছে। হ্যাঁ সেক্স। এমন অসময়ে এমনটা হবার কথা নয়।তবু চাপছে। না আজ অন্য রকম দিন। যাই হোক বৌ তো। চলে গেছে আমার মন খারাপ তো হওয়া উচিৎ। সু দরজা লাগালো,আমি ঘাড়ে মুখ ঘষছি…

দিন গুলো এমনই,সোজা সাপ্টা না এসে টেঁরা বেঁকা হয়েই আসে। কোনো দিন লম্বা তো কোনো দিন বেঁটে। কোনটার হাত বাঁকা তো কোনোটার পা বাঁকা। আর তুমি যখন সমস্যায় পড়বে দিন গুলোও তিলে খচরামি শুরু করে। না কোনো খবর পাইনি ইনকার। সবই মায়া বলছিল সু। আমি মাথা নেড়ে ছিলাম। বলল – ওর নামই তো ইনকা, মায়া থেকে আর সে কতদূর। সেই কবে ইতিহাস পড়েছি,অত মাথায় রাখতে পারিনা। সু বলাতে মনে হল আরে তাই তো,ইনকা সভ্যতার সাথে তো মায়া সভ্যতার নিবিড় যোগ ছিল। সু সেদিন শুরুতে ঠিকই ছিল,পরে সব শুনে কেমন বোমকে গেল। বলল – তোমার লজ্জ্বা করে না? তুমি কি মানুষ! আজ ও এসেছ? বলে কাঁদতে লাগল। যা শালা! আমি তো হতভম্ব। সু তো চিরটাকাল ইনকাকে নিয়ে ঠারে ঠোরে কত মজা কত ব্যঙ্গ করত। সেদিন  হঠাৎ  এত দরদী কেন হয়ে গেল বুঝিনি। আমি বেরিয়ে আসি। র‍্যাদার পালিয়ে আসি। রাত হলে একটু ঘরটা ফাঁকা ফাঁকা লাগে, ব্যালকনি থেকে নীচের দিকে তাকাই,না লাল্টু নেই। মদের বোতল খুলে বসি। খাই কয়েক পেগ। মাথাটা বেশ রিম ঝিম করে। একটু থ্রি এক্স চালাই। দেখতে দেখতে শরীর উত্তেজিত… সু বলছিল হেসে-কে যে কোন খাঁচায়,কিভাবে বন্দী হয় কখন,কে জানে,জানো মনের ও এমন অনেক খাঁচা। আমি অত্ত বুঝিনা । পালিয়ে আসি। সুতনু ও কোনো খবর করতে পারেনি। বলছিল প্রতিদিন কত মানুষ এ দেশে নিরুদ্দেশ হয় জানেন, তারা যদি ধরা না দিতে চায়,কে খুঁজে পাবে। বুঝে গেছি খবর হয়ত আর পাবোই না। কি আর হবে একটা জীবন দিব্যি কেটে যাবে। কিন্তু লাল্টুর সাথে পালালো? এটা মাথা থেকে কিছুতেই যাচ্ছে না। নইলে তো লাল্টুকে দেখতে পেতাম। কিন্তু লাল্টু কে নিয়ে ও যাবে কই? এটা সম্ভব? ধুর…অত ভেবে কাজ কি। মরলে মরেছে, বাঁচলে বেঁচে আছে। আমি শালা নিজেকে নিয়েই থাকি। ওই পাগলামীর জগৎ থেকে তো মুক্তি।

বাড়ি ফিরেছিলাম আজ তাড়াতাড়িই। একটু চেঞ্জ করে সু এর বাড়ি যেতে হবে ও তলব করেছে, মানে আজ কিছু হবে। হয়ত ওর ইচ্ছে হয়েছে। এর মধ্যে সু এর বাড়ি আর যাইনি। কে অত বাতেলা শুনবে। আমার যা ঠিক মনে হয়েছিল সে রাতে করেছি। সরি কিসের। হ্যা পরে একটু মন খারাপ হয়েছিল। হয়নি একেবারে বলব না। আমিও তো মানুষ,একেবারে জন্তু নই। সু দরজা খুলে দিল,বসতে বলল। বসলাম লক্ষ্মী ছেলে হয়ে। জল দিল এগিয়ে, খেলাম। কেমন একটা খুব সাইলেন্স। ঠিক বুঝছিনা। এসে বসল। একটা সিল্কের নাইটি পড়েছে, ওপরে হাউসকোট।, যেমন পড়ে। পা এর ওপর পা তুলে বসেছে। সাদা পায়ের গোছ দেখা যাচ্ছে। একটু লোভ লাগছে। কিছু মুখে বলতে পারছিনা। ও একটা চিঠি এগিয়ে দিল-

সুদেষ্ণা দি,

এ চিঠি তোমাকেই লিখলাম। লিখতে বাধ্য হলাম। তোমার সাথে আমার কখনো সাক্ষাত হয়নি। সেদিন ওর একটা মেসেজ তোমার কাছে না গিয়ে আমার কাছ না আসলে, জানতেই পারতাম না তোমার কথা। জেনেও কখনো অতিরিক্ত আগ্রহ দেখাইনি, সন্দেহ করিনি তোমাদের সম্পর্ককে। যা জানিনা তা নিয়ে সন্দেহ করা আমার কাজ কখনোই এমনটাই শিখেছিলাম বাবার কাছে। বাবা খুব অল্প বয়সেই মারা যান আমার,তার আগে যেটুকু শিক্ষা দিয়ে যান, সেটা আজীবন বহন করেছি। তুমি যদি ওর খুব কাছের হও, ও আমাকে অনায়াসে বলতে পারতো,আমি কিছুই মনে করতাম না,যার যেথা মজে মন,কিবা হাড়ি কিবা ডোম। আমি কি করতেই বা পারি বল। মেনে নেওয়া ছাড়া। আমার ঘরে শরীর,আর মনের বসত অন্য কোথা,ঠিকই বোঝা যায় জানো। বৃষ্টি যখন আসে, তুমি ঘরের দুয়ার এঁটে যতই বসে থাকো, ঠিক বোঝা যায়। কিছু বলিনি। মুখ বুজে থেকেছি,দূরত্ব বেড়েছে ক্রমশ, জানতাম শেষ হয়ত এমনই। অপেক্ষা করেছি যদি… জানো আমার মা ছিলেন  মানসিক রুগী। আমার শৈশব, কৈশোরের অত প্রিয় মানুষটা কি করে যেন হঠাৎ অচেনা হয়ে গেল।

আর চারদিকের লোক জন পাগল বলে মাকে ডাকত,আমি হয়ে গেলাম পাগলের মেয়ে। খুব অসম্মানিত লাগত। দোর বন্ধ করে কাঁদতাম মাকে জড়িয়ে। মা’কে বাঁচাতে পারিনি আমি। পরে কত মানুষ দেখি মারই মতন, তারা তো কোনো অপরাধী নয়,কারো চোখ খারাপ হলে যেমন সে মানুষটা খারাপ হয় না। মাথা ফাটলে যেমন সে খারাপ হয় না, তেমন এই যারা মনের রুগী তাদেরটাও তেমন, কিন্তু জানো কেউ তা বুঝতে চায় না। আসলে যারা সভ্য তারা কি সত্যি সভ্য? তাহলে এত অশিক্ষিত, অসভ্যের মত আচরণ করে কেন করে? ওদের পাড়ার যে লাল্টু পাগল আমার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকত, আমি ও আর সকলের মতই ভাবতাম খুব অসভ্য, একদিন রাস্তায় আমার হাত ধরে টানা টানি করল, আর বাকি যারা তথাকথিত সুস্থ তারা ওকে কি প্রবল মারলো, মুখ দিয়ে রক্ত পড়ছে। এভাবে কেউ মারে?

মানুষতো! সেদিন ও অস্ফুটে কি যেন বলছিল,বুঝিনি। আমি তাকে বাঁচাতে গেলে পাড়ার লোকজনের কত রস আর রসিকতার পাত্র হয়ে উঠলাম।

শুনতে চেয়েছিলাম ও কি কিছু বলতে চাইছে আমায়? একি সত্যিই সভ্যতা বল দিদি? মানুষ নিজেকে এমনভাবে গড়ে তুলছে, অন্যের কথা শোনার সময়ই নেই তার, শুধু সে বলবে। তোমার বন্ধুটিও এমন। তাই ভাবি জানো মানুশ মানষের কথা শুনবে না,বিশ্বাস রাখবে না,এ কেমন দুনিয়া? আমার বাচ্চাটা জন্মালনা, মিসক্যারেজ।খুব কাঁদতাম প্রথম প্রথম। পরে ভাবলাম এত অসুস্থ পৃথিবীতে না জন্মে ভালোই করেছে। কি দিতাম রক্ষাকবচ? এমনিতো সুযোগ নেই, তাই একদিন মাঝরাতে নেমে এসেছিলাম লাল্টুর কাছে। সেদিনও আমাদের ব্যালকনির দিকে ঠায় হাঁ করে তাকিয়ে ছিল।

আমি কাছে আসতেই বলে উঠলো ‘মা’ বিশ্বাস করবে কি’না জানিনা,আমার সারা শরীর ঝিম ধরে গেল,মাথায় কুয়াশা। আমি কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে ঢুকে আসি, বাড়ির ভেতর।তোমার বন্ধু দিব্যি ঘুমোচ্ছে। আমি তো কেমন ঘোরে থাকতাম মিসক্যারেজের পর থেকেই।সেই না হওয়া সন্তান কে দিনে রাতে সারাটাক্ষণ দেখতে পেতাম। জানি এটাও সুস্থতা নয়। কিন্তু তুমি বল- সে অর্থে কে প্রকৃত সুস্থ? লাল্টু ‘মা’ সেদিনও বলেছিল। মা বলেই হাত ধরতে এসেছিল। আর মার খেয়েছিল,রক্তাক্ত হয়েছিল। আমি বোঝার চেষ্টা করছিলাম সেদিনও, কিন্তু এত সুস্থ! মানুষ আমাদের ঘিরে ধরল, আমি আর বুঝতে পারিনি গো। লাল্টুকে আমাদের বাড়ি, সরি তোমার বন্ধুর বাড়িতে(মেয়েদের আসলে নিজেদের কোনো বাড়িই হয়না) পরদিন রাতে ডেকে খাওয়াচ্ছিলাম,আর কাঁদছিলাম,খুব।তোমার বন্ধু সুস্থ! তাই কিছু না জেনেই, ভাবল,এ এক গোপন প্রেম কাহানী। আসলে জানো যে নিজে যা,বাকি দুনিয়াকেও তেমন করেই ভাবে,হয়ত তার মানসিক গঠন তাই,ওকে দোষ দিই না, আমাদের সমাজ তো এমনই। মাকে দিয়েই তা দেখেছি একাধিক বার। মারলো আমাকে, লাল্টুকে। আমার না হওয়া সন্তানটি যদি এমন হত মানসিক ব্যধিগ্রস্ত, তাকে কি আমি ফেলে আসতাম? বল তুমি সুদেষ্ণা দি?

আমি প্রথম জ্ঞান হারালাম।  পরে সে কালরাত ফুরোলে যখন ভোর হল,ভোরের আলো মেখে ওই লাল্টুকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। সকাল তো সত্যিই সকাল, যখন সে আলো দেয়। ভাবলাম সুখে ঘর কন্যা সকলের হয় না,আমি না হয় এদের নিয়েই সময় কাটাবো,পেরে যাবো জানো। মানুষ ঠিক পেরে যায়। মেন্টাল রিটার্ডেশন নিয়ে আগেই একটা ডিপ্লোমা করেছিলাম, এবার তাদের নিয়েই থাকবো স্থির করলাম,আমার সংস্থার নাম দিয়েছি ‘উদার আকাশ’। হ্যাগো এরা আর পাঁচজন সুস্থর থেকে অন্তত উদার, ব্যথা বোঝে। আর দুটি বাচ্চাকে কুড়িয়ে এনেছি কাছের স্টেশন থেকে,ওরা আমার কথা শোনে, আমি কাঁদলে চোখের জল মুছিয়ে দেয়,সুস্থরা কিন্তু নিজের ছাড়া ভাবে এমন দেখেছি কই? তোমার বন্ধুকে মাথায় রেখেই বললাম। এর বেশী তো আমি কিছু চাইনি কারো কাছে।আর চাইলেই কি সব পাওয়া যায়? একটা জীবন ঠিক কেটে যাবে। তুমি পারলে ওকে একটু দেখ। আমার খোঁজ ও তেমন করেছে বলে মনে হয় না, তেমনতো না ও। আর যদি খোঁজ করতে চায়, বোলো লাভ নেই কোনো। বুঝেছি এ সংসার, আসলে মায়া। আমার নামের মধ্যেও আসলে এই মায়ার এক বিস্তৃত সভ্যতার টের পাই। এই দেখ না তোমায় যখন চিঠি লিখছি, পাশে এসে বসেছে ওরা, আমার চোখ বেয়ে কেন জানিনা জল নামছে, হয়ত ধুলোবালি কিছু পড়েছে। ওরা আমার জল মুছিয়ে দিচ্ছে।

ভালো থেকো।

পুনঃ— তোমার ঠিকানাটা আমি কোনো ভাবে জোগাড় করেছিলাম। আমার তো কোনো ঠিকানা কখনো তৈরী করতে পারিনি,এবার চেষ্টায়,দেখা যাক। হয়ত পারবো না,হয়ত পারবো। মানুষ তো চেষ্টা তবু করেই। আমিও তেমনই।একটু মানুষ হয়ে ওঠার চেষ্টায়…

—ইনকা

সু থম মেরে বসে। আমি উঠে পড়লাম। ধুর। কেমন একটা অস্বস্তি। সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসছি হঠাৎ কেন জানি মনে হল কে যেন আমায় অনুসরণ করছে,একটা ছোট বাচ্চা কি? বুঝলাম না গতি বাড়ালাম,সেও আরো দ্রুত পিছু ধরেছে,কিন্তু কে? তবে কি আমার…না হওয়া সন্তান? কেমন একটা অন্ধকার লাগলো,মাথা ঘুরে গেল। বসে পড়লাম ধুপ করে। ঘাম দিচ্ছে, হেসে উঠলাম হঠাৎ,মোবাইলটা বেজে যাচ্ছে একনাগাড়ে,একটা টেক্সট মেসেজ এলো,পড়তে গেলাম পারলামনা। মনে পড়ল  insanity is relative. It depends on who has who locked in what cage’

কোথায় যেন গান বাজছে-তোমার ঘরে বসত করে কয়জনা…মাথা ঘুরছে। চোখে ধাঁ ধাঁ। কিছু দেখতে পাচ্ছিনা,আর। মা’র কথা মনে পড়ল,যেতে হবে একবার অন্তত। চোখ বেয়ে জল নামছে। ‘মা’ বলে আরো একবার ডাকলাম। অস্থির লাগছে,কোথা থেকে যেন গান ভেসে আসছে —তোমার ঘরে বসত করে কয়জনা,আমি কোথায়,বুঝলাম না,অনেক রাত তখন…

Comments

comments

তমাল রায়

তমাল রায়

জন্ম-১৯৭০। বিজ্ঞানে স্নাতক, কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলাইয় স্নাততকোত্তর। ‘ঐহিক’ সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক। পেয়েছেন একাডেমি পুরস্কার-২০১৫, উনার বই বেরিয়েছে - তিতিরের নৌকো যাত্রা ও নিঝুমপুরের না রূপকথা

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি