সাম্প্রতিক

নবমী । তমাল রায়

তিথি

এই যে তুই শুয়েছিলি কতক্ষণ, সেই কখন থেকে। আমি কিন্তু ডাকিনি। আমাকেও তো কেউ ডাকেনা। এই যে তুই রাস্তা পার হলি, কার হাত ধরে? যারই হোক। তুই ঠিক জানিস পথ শেষে আমি দাঁড়িয়ে শুধু তোরই জন্য। এই যে তুই কেমন অস্থির, কেই নেই কোথাও তবু তুই হেঁটে চলেছিস একা এই নিঝুম পথ ধরে, জানিসও না পথের শেষে কি আছে, আমি কিন্তু তোর সঙ্গ ছাড়িনি। ওই যে বেড়াল ছানা কে তুই কোলে তুলে নিলি। আদর করছিস খুউব। ভাবছিস আমি জানিনা? জানি সব। তোর প্রতিটা পদক্ষেপ আমার জানা মন। পিরিয়ড থেকে পঞ্চমী সব। হ্যাঁ আমি তোকে অনুসরণ করি। কেউ তো করে। তোর গর্ব হয় না? না’কি এ পাগলের অপর কেবল রাগই সঞ্চিত…আচ্ছা নয়া পয়সার মত আমি জমালাম ভালোবাসা আর তুই উপেক্ষা, ঘৃণা…কেন? পাগলকে কেউ ভালোবাসবে না? সে তাহলে যাবে কোথায় বলতো? দেখ এই দুনিয়ার সব মানুষই তো পাগল। কেউ বেশী কেউ বা কম। আইনস্টাইন? বিনয় মজুমদার? ঋত্বিক ঘটক? রামকিংকর…আর বলব? আসলে আমিতো পাগল কি’না জানতাম না। তুই ভাবতিস মানসিক রুগী। সে ধারণা আমি ভাঙাই নি। কি লাভ! তোর তো বেরুনোর, পালানোর একটা রাস্তা চাই, তাই না?  দ্যাখ মা যেদিন চলে গেলেন সেদিনও নবমী, আজও তাই। এই সব দিনে শহরের পথে অনেক ভিখিরী, অনেক কলঙ্ক, অনেক ধূলো আর ধোঁয়া ঢেকে দেয় আমার শহর। কিন্তু চেয়ে দ্যাখ তোকে সেসবের কিছুই স্পর্শ করছে না কখনোই। না না কারণ অনুসন্ধান করতে বলিনি। আমি আসলে সেই আট বছর থেকে, মানে যেদিন থেকে তুই ইজের পরা আমি হাফ প্যান্ট, কেবল গোপনে, হ্যাঁ গোপনে অনুসরণ করে গেছি, আচ্ছা তিথি  বল কেন কেউ এমন করে? আমি জানি আমার তেমন যোগ্যতা নেই। আমায় কেউ ভালবাসার তেমন কোনো কারণই খুঁজে পাইনি কখনো। দ্যাখ তাই আমার সারা শরীরে ক্ষত চিহ্ন। কি ভাবছিস নিজেকে শাস্তি দিয়ে তোকে ভয় দেখাই, উহু তোর প্রতিটা ক্ষত কিভাবে যেন আমারও। একে কি বলবি তুই? কি নামে ডাকবি?

তিথি আমাকে নিয়ে  কোনো সমস্যা তুই যেন অন্তত ফিল করিস না প্লিজ। আমি আছি তো। এই দ্যাখ বুকের মধ্যে নিলাম তোর কল্লোল কে লেখা চিঠিগুলো। আর আমি চললাম… কালতো দশমী। ঠকুর বিসর্জন হবে। আর আমি? …?

আজ নবমী। মা নেই সেই কবে থেকেই। বাবা নেই বছর দুই, রীণা মানে আমার কাগুজে স্ত্রী নেই, সে আমার থেকে আরো কোনো যোগ্যর সাথে, তাই তো হয়… তিথি এমতাবস্থায় মানুষের মাথা খারাপ হবার কথা, কিন্তু দ্যাখ আমি ঠিক আছি একদম। কাঙড়া থেকে কুলু, লাদাখ থেকে সিল্ক রুট আমিও আর তুই ও।

কেউ নেই বিশ্বাস কর। হ্যা আমি আজ সত্যি ভিখিরি, আমায় ভালো বাসবি?

পঞ্চানন তলা আর হেলা বটতলার মাঝ দিয়ে যে রাস্তা চলে গেছে ওই রাস্তার শেষ আসলে বর্ডারে, আমি গত কদিন ধরে বর্ডার পার করারই চেষ্টা করে যাচ্ছি। আসলে সময় তো কখনো কাঁটাতার নির্মাণ করে, কিন্তু কি করি আমিএখন…?

অর্থ আসলে সব অনর্থের মূল। তা জানি বলেই সারান্ডার জঙ্গলে গিয়ে আমি হ্যা মেঘায়তবুরুর ওপর থেকে ছড়িয়ে দিয়েছিলাম  যা ছিলো পকেটে। দ্যাখ এবার আর আমার টাকা নেই পয়সা নেই, খাওয়া নেই, ঘুম ও নেই। আর হ্যাঁ ভালোবাসা তো সেই কবে থেকেই নিরুদ্দেশে । তিথি আমি তো তোর শৈশব সাথী। ভালোবাসা যায় না?

কল্লোল কে তোর লেখা সব চিঠি আমি পড়েছি। কি ও কেন আমি জানিনা। কেবল এটুকু বুঝেছি ওর লেখা তোকে টানে, আর তুই ওনার সাথে…

না তিথি আমাকে নিয়ে  কোনো সমস্যা তুই যেন অন্তত ফিল করিস না প্লিজ। আমি আছি তো। এই দ্যাখ বুকের মধ্যে নিলাম তোর কল্লোল কে লেখা চিঠিগুলো। আর আমি চললাম… কালতো দশমী। ঠকুর বিসর্জন হবে। আর আমি? …?

ভালোবাসা আসলে জানিস দেখা যায় না। এটা অনুভব আসলে।

এই দ্যাখ তোর পাগল আমি ড্যাং ড্যাং করে চললাম…নবমী নিশি পোহাইলে…

যদি কখনো সুযোগ আসে কল্লোলকে দেখাস আমি  আসলে তোকে পূজোই করতাম…নবমীর পূজা চলছে, রাত পোহালেই…

কিছু প্রস্তুতি কিছু অপ্রস্তুতিতে ওই দূরে শাঁখ বাজছে, আজান…বড় পবিত্র এই সময়, আমি জেগে। অপেক্ষা লাস্ট ট্রেনের… হুইসল বাজল, এবার…

আসিরে ভালো থাকিস।

ইতি—
তোর পাগল

Comments

comments

তমাল রায়

তমাল রায়

জন্ম-১৯৭০। বিজ্ঞানে স্নাতক, কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলাইয় স্নাততকোত্তর। ‘ঐহিক’ সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক। পেয়েছেন একাডেমি পুরস্কার-২০১৫, উনার বই বেরিয়েছে - তিতিরের নৌকো যাত্রা ও নিঝুমপুরের না রূপকথা

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: , ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি