সাম্প্রতিক

এক গুচ্ছ কবিতা । সজীব মেহেদী

সমুদ্র বাজি

শেষমেশ,
আমার বাঁচোখ বাজি রেখেছি জুয়ার আসরে।
এবং
যখন হেরে যাচ্ছিলাম,
তখন
নিরুপায় হয়ে বাঁচোখ বাঁচাতে আমি ডানচোখও বাজি রাখলাম।
যখন বুঝে ফেললাম,
জুয়ায় হেরে যাচ্ছি,
অর্থাৎ
চোখ দিয়েই দেখছি দুটি চোখের নির্মম পরিণতি,
বিষণ্ণতা চোখ গলে বেড়িয়ে পড়লো আমার।

আমি কাঁদছিলাম,
আর বলছিলাম,
মা’কে একটু দেখবো শেষবারের মত।
মা বলতে,
দৃষ্টিশক্তি মরে যাওয়া এক বৃদ্ধার কথা,
যিনি কিনা জুবুথুবু হয়ে বসে ইশ্বরের মৃত্যু কামনা করেন।

রাজি হলো না, জানেন!
মানুষ এতটা নিষ্ঠুর হয় কি করে জানা নেই।
উল্টো তাড়া দিলো,
আর নিজ কন্যার অন্ধত্বের কথা বলে চেঁচিয়ে উঠলো।

অপারেশন থিয়েটারে কনকনে ঠান্ডা,
জানলা নেই। জানলা না থাকাটাই বোধহয় নিয়ম। যদিও জানলাই একটা বদ্ধ রুমের চোখ।
আমার চোখ দুটো যে সুন্দর, চোখের ভেতরও যে সমুদ্র থাকে,
সে কথা জানতাম না আমি,
নওরীণই প্রথম বলেছিলো।
সেতো দুযুগ আগেকার কথা, কলেজের ব্যালকনিতে।

নওরীণ,
এখন কোথায় জানা নেই,
কাজল দেয় কি চোখে!
খিলখিল করে কি হেসে উঠে!
কান্না পেলে কি কামড়ে ধরে নিজের আঙ্গুল!
হায়! কিসব ভাবছি!

আমার চোখ দুটো নিয়ে যাওয়া হবে কিছুক্ষণ পর,
একটি কিশোরী সে চোখ দিয়ে সমুদ্র দেখবে, দেখবে বৃষ্টি এমনকি স্বর্গের বিভৎসতাও।
আচ্ছা, সে কি কখনো অন্ধকার আকাশে এ্যারোপ্লেনের লালনীলবেগুনী বাতির মিটমিট করা চোখ টিপুনি দেখে,
বিষণ্ণ হয়ে উঠবে!
কিংবা কখনো কি মুখোমুখি হবে নওরীণের, যে কিনা কিশোরিকে বলবে- তোমার চোখে সমুদ্রঝড়।

অপারেশন শেষে বাড়ি ফিরে মায়ের পাশে বসে চেঁচিয়ে জানতে চাইবো,
কিরে জগলু কয়টা বাজেরে!
এখন কি দুপুর! জগলু! এই জগলু! কোথায় গেলি, হারামজাদা!

মাস্ক মুখে, এ্যাপ্রোন পরিহিত চিকিৎসক,
দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে ছিলেন চোখাচোখি,  কাঁপাকাঁপা আদুরে কন্ঠে জানতে চাইলেন, আমি প্রস্তুত কিনা।
মৃদু হাসলাম, মারাত্মক রসিকতা ছাড়া আর কিছুই মনে হলো না আমার।

একজন নার্স, একটি ইঞ্জেকশন পুশ করলেন।
এবং তৎখনাৎ আমি একটি ঘোরে প্রবেশ করলাম, নিউরন গুলো নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে। চিকিৎসক আমার দিকে তাকিয়ে আছে সমুদ্রসজল চোখে।

আমি আলতো স্বরে জিজ্ঞেস করলাম,
ডাঃ আপনার নাম কি?
ততক্ষণে আমার চোখের পাতা বুঝে গেলো,
ভাসাভাসা শব্দে শুনতে পেলাম, ডাঃ বলছে, আমি নওরীণ।

কি আশ্চর্য! মারাত্মক রসিকতাও ছাড়া আর কিছুই মনে হলো না আমার।

চন্ডাল

চিতায় লাশের ওপর কাঠ সাজিয়ে রেখে বৃদ্ধ চন্ডাল ভাবে না, রবিবার সন্ধ্যায় সেও মরে যেতে পারে।
সে জানে না,
মরে গেলে মানুষ ছাই হয়ে যায়,
ভস্ম থেকে জন্ম নেয় ফিনিক্স পাখি।
শুধু রাতে ঘরে ফেরার পথে ফুল দোকানটি খোলা থাকুক, এই তার প্রার্থনা।
ফুল দোকানে তেরো বছর বয়েসি একটি মেয়ে থাকে, তার নাম বেলি।
বৃদ্ধ চন্ডালের খুব ইচ্ছে হয় মেয়েটির মৃতদেহে যত্ন করে কাঠ সাজিয়ে রাখার। চন্ডাল ভাবে, মেয়েটিকে পোড়ালে নিশ্চয়ই বেলি ফুলের ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়বে সবটুকু শ্মশান জুড়ে।

কবি

নরকের আগুনে কয়েকটি মাছ সাঁতরাচ্ছে; এই দৃশ্যের পর, আমার মগজে ঢুকে পড়ল পৃথিবীর জরায়ু। কয়েকজন কবি সেখান থেকে বেরিয়ে দৌড়ে ঝাঁপ দিলো আগুনে। তৎখনাত দেখতে পেলাম উনারা কয়েটি মাছ হয়ে আগুনে সাঁতরাতে লাগলেন।

Comments

comments

সজীব মেহেদী

সজীব মেহেদী

শামুক; যে শুধু নিজেকে গুটিয়েই রাখে না, অল্পটুকু জায়গা পেলে নিজের ভেতরেই বাস করে, ভালোবাসে তাও নিজেকে। বেঁচে থাকে এমন একটি বর্ষার জন্য, যে বর্ষায় মাঠ পেরিয়ে চলে যাবে গাঙে, যেখানে অজস্র বেদনারা থৈথৈ করে। শামুকের সাথে ভিষণ মিল জীবনের।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

Tags: 

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি