সাম্প্রতিক

বব ডিলান কুড়িটা গান । জাহেদ আহমদ

বিসমিল্লায় বলে নেয়া ভালো, বব ডিলানের নোবেলপ্রাপ্তির সঙ্গে এই ক্ষীণপ্রাণ তর্জমাকার্যক্রমের যোগসাজশ প্রায় নাই বললেই চলে। একেবারেই নাই বলছি না, থাকতেও পারে যুক্ততা, প্রায় নাই বলছি। নিঃসন্দিগ্ধ গলায় কেন বলতে পারছি না নাই, জিগ্যেশ যদি করেই বসেন অত্যুৎসাহী কেউ, রিক্যোয়ার্ড সেইজন্যে একটা আস্ত ভূমিকাই। লিখছি তাই, সিগ্রেটের ছাই কিংবা বারফট্টাই, স্বীয় হস্তে চোঙ্গা ফুঁকিয়া করছি নিজেরে নিজেই জাস্টিফাই। কী বলতে চান, ষোলোকোটির পরানপাখি ডিলানের ক্ষেত্রে কোনো ডিব্রিফ দরকার নাই!

বিনীত নিবেদন এই যে, গেল বছরের জুলাইয়ের দিকটায় জিমার্ম্যান্ ওর্ফে বব ডিলানের গীতবিতান থেকে বেশকিছু পঙক্তি ইন্টেনশন্যালি বিকৃত করার বাংলা দায়িত্বে অবতীর্ণ হই। সিম্পলি নিজের একটা খামখেয়াল চরিতার্থ করবার উদ্দেশ্যপ্রণোদনা থেকে সেই বিকৃতি স্বীয় হস্তে টাইপ্ করে একাদিক্রমে ফেসবুকে আপ্ করতে থাকি। লিঙ্ক ধরে পেছিয়ে যেয়ে এই বিবৃতির সত্যতা যাচাই করে দেখতে পারেন আপনিও। ওইটা ব্যাপার না।

ব্যাপার হচ্ছে, একবছরেরও অধিক আগে আমি ঠিকই বুঝে গেছিলাম ববি ইজ্ গ্যনা বি সামথিং, ড্যাম্ নিশ্চিত হয়েই তর্জমায় কিবোর্ড ঠকঠকানো শুরু করেছিলাম যে ববি ডি নোবেলতলায় এইবার যাবেই যাবে! হ্যাঁ, যা ভেবেছিনু তা-ই, গিয়েছেই গিয়েছে। এবং সর্বোপরি উল্লেখ্য যে, ফেসবুকে সেই বিনিসম্মানী সম্প্রচারিত ‘ববি ডি ইন বেঙ্গলি’ শিরোনামের ভিতরেই ইঙ্গিত আছে ভ্যেরি স্যুন্ ববি ইজ্ গ্যয়িং টু গেট সেটল্ড পার্মানেন্টলি ইন্ বাংলাদেশ। হয়েছেও তা-ই, ঠিক এক্স্যাক্টলি, ডিলান বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত বলিয়াও জোর দাবি ওঠানো বর্তমানে ম্যাটার অফ টাইম্ মাত্র। শ্যুড বি, শ্যুড বি, ড্যুড!

গ্যুড। এখন, দি থিং ইজ্, ববি মিথুন রাশির জাতক। ফলে, স্বভাবতই, যেমন হয় মিথুনজাতকেরা, ভীষণ বন্ধুবৎসল। পরোপকারী। তিনি মহান। মানবদরদী। নিভৃত নীলপদ্ম লাগি’ তিনি ভ্রমরের ন্যায় বিবাগী। তিনি অত্যন্ত ধার্মিক। অত্যন্ত রাজনৈতিক। অত্যন্ত অমায়িক। স্বাস্থ্যবান। নিয়মিত ফলমূল খান। পুণ্যস্নান। সদা হাস্যোজ্জ্বল। অসাধারণ ফুট অসাধারণ ইঞ্চি টল্। দাঁতের মাড়ি চমৎকার শক্ত। সুশীলদের ভক্ত। দুঃশীলদেরও। সুবোধ। উদরাময়, ঈশ্বরের কিরা, নাই বস্তুত। উদার গণতন্ত্রী। তিনি বিপ্লবও।

ববির এই-সমস্ত গুণপনা আমি সিক্সটিজের গোড়া থেকেই জানি। তিনি আমার পাশবালিশের শেয়ারহোল্ডার। দৃশ্যত ববি সিক্সটিজে স্টেজমাতানো ম্যাটাডর হলেও প্রকৃত প্রস্তাবে সেভেন্টিওয়ানেই তিনি নোবেল অর্জনের হকদার হয়ে ওঠেন ম্যাডিসন্ চত্বরে একটা মাইফেলে গেয়ে। তিনি কন্সার্ট ফর বাংলাদেশের শিল্পী হিশেবে অ্যামেরিকায়-অ্যাফ্রিকায়-ল্যাটিনায়-ইংল্যান্ডে-অ্যাশিয়ায় ব্যাপক পরিচিতিপ্রাপ্ত। নিজেও জানেন না তিনি কায়মনোবাক্যে কতটা বাংলাদেশী। তিনি দিল্-কি-ধড়কন্। কবীর সুমন। বৈপ্লবিক মশামাছির ভনভন। তিনি মিউজিকের শামাদান্। তিনিই তো অত্যাধুনিক অন্ত্যমিলের শুদ্ধবাংলা গান।

সবই ঠিক আছে। এমনিতে কিন্তু ববির পিআর, মানে পাব্লিক রিলেশন, ঈর্ষণীয়। উনি বাংলাদেশের দৈনিক আখবারগুলো না-পড়ে ব্রেকফাস্ট সারতে পারেন না। ডাবল্-ডিমের ওম্লেটের মতো উনি বাংলা ডাবল্-স্ট্যান্ডার্ড দৈনিকীগুলো গোগ্রাসে গেলেন নিত্যি। বিশেষ কয়েকটা বাংলা কাগজের সঙ্গে তিনি বিশেষ খাতির বজায় রেখে চলেন সবসময়। বিশেষ কয়েক সম্পাদক, সহ-সম্পাদক ও পত্রিকামালিকেরে ডিলান এতই তোয়াজ করেন যে নোবেলনাইটে সেই বেচারা ডিলানফ্রেন্ডরা ঘুমনিদ্রা হারাম করে কেবল কিবোর্ডবোতামে ঠক ঠক করে গেছেন। খোদ ববি ডিলান অ্যামেরিকা থেকে উপর্যুপরি ফোনে বেচারা বাংলাসাংস্কৃতিক সত্তরছুঁই বিপ্লবী পত্রিকাবণিক দিয়া লিখাইয়া নিয়াছেন রাতারাতি নিজের গালগল্প। ওভারনাইট, ব্রো! বক্সট্রিটমেন্টে একটা গানও। পত্রিকা ছাপামেশিনে চড়ানোর আগে বায়তুল মোকারমের খতিব মশাইকে দিয়ে দেখাইয়া নিতেও কসুর করেন নাই।

কিন্তু জুম্মাবারের জন্য ববিই শুধু নয়, এই বাংলায় বেবাক দিনই বিটকেলে বাস্তবিক নথিপত্রের এবং শুক্কুরবারটাই শুধু ক্রোড়পত্রের, দেশবিশ্ববাসী অধীর প্রতীক্ষায় রাত্রিদিবা কাউন্ট ডাউন করছেন ফ্রাইডের জন্য। ওই পবিত্র সুবাসিত শুভদিনে পেপারওয়ালারা তাদের পরিবার ও গণগোষ্ঠী নিয়া ববিবন্দনায় মেতে উঠতে চলেছেন বলে খবরে প্রকাশ। খবরসোর্সের নাম গোপন রাখার নৈতিকতা মানা যাচ্ছে।

যে-ব্যাপারটা আগেই উল্লেখ কর্তব্য ছিল, বিলম্বে হলেও উল্লেখ করছি এই প্যারায়। বাংলার ব্যান্ডমিউজিশিয়্যানরা বাল্যকালে ববি ডিলানের গান শুনে দোলকেদারায় দোল খেতে খেতে ঘুমাইতে যেতেন। ববির গান তাদের সকলেরই প্রিয় লালাবাই। কিন্তু ঘুম হইতে জাগিয়া তাদিগের মনে রইত না লালাবাইগুলোর লাইনঘাট। ফলে, দেখা যাবে যে, বিগত চারদশকের পপ্যুলার বাংলা গানে একফোঁটাও ববিলিরিকের রেখাপাত নাই। শয়নে-স্বপনে না-শুনিয়া জাগরণে শুনিলে একটা ইম্প্যাক্ট নিশ্চয় থাকত। চোথাকাটা গানে-বাজনায় ব্যান্ডসংগীত সয়লাব, অথচ ডিলানের একটা লাইনও কোনো বঙ্গজ মিউজিশিয়্যান ভুলেও লইলেন না নিজেদের লারেলাপ্পা গানে। এবং উনাদের ইন্টার্ভিয়্যুগুলোতেও কোনোদিন ববির নাম উচ্চারিত হয়েছে বলিয়া নজির নাই।

লিট্রেচারের লাটসায়েবরা, বাংলায়, ডিলান-লালন হাইফেনে বেঁধে প্র্যাক্টিস্ করে এসেছেন স্মরণাতীত কাল হইতে। এই শোনাশুনিটা ব্যাপক আধ্যাত্মিক, ফলে একটা আঁচড়ও পড়ে নাই লিরিক্যাল্-ননলিরিক্যাল্ বাংলা গানাবাজানার বাস্তবে। ওদিকে ইন্ডিয়া আগুয়ান এই পয়েন্টে। ওদের আধুনিক বাংলা গান মানেই ডিলান। অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত উপায়ে বঙ্গায়িত বটে। অ্যানিওয়ে। অ্যাভেইলেবল্ সত্ত্বেও যদি মিল্কের বদলে ঘোল পান করে যেতে হয় আপনেরে, সেইটা যত ঘন ও সোয়াদেরই হোক ঘোল তো ঘোলই, কন্ডোলেন্স রইল।

বব ডিলান সায়েবেরে নোবেল দিয়া কমিটি ইনজাস্টিস করেছে। দ্যাখেন, ববি অত বড় শিল্পী নন। উনি ইন-ফ্যাক্ট জুনিয়র আর্টিস্ট। প্রমাণ চান? ঔকে! লেনন উনার একবছর আগে এসেছে দুনিয়ায়। লেনার্ড কোহেন উল্লিখিত উভয়ের যথাক্রমে সাত এবং ছয় বছরের সিনিয়র। এই তিনজনেরই নাম নেয়া হলো। কেননা তাদের মধ্যে বেশকিছু অমিলের পাশে বেশকিছু মিলমিশও আছে। এই তিনজনেরই মিউজিক্যাল্ অ্যালবামের পাশাপাশি পৃথক প্রকাশিত বই আছে। তিনজনেই পেইন্টিং করেছেন। কোহেনের গানে তো পোয়েটিক অন্তরালধর্ম অনেক বেশি। কিন্তু লেননের ব্যাপারটা আলাদা। আর তাছাড়া মরণোত্তর নোবেল এখনও পয়দা হয় নাই। কাজেই সিনিয়র আর্টিস্ট রাখিয়া জুনিয়রদেরে এইভাবে ল্যরিয়েট বানানো বরদাশ্ত করা খানিক প্রদাহকর।

আর-কিছু অবশিষ্ট আছে? হ্যাঁ, রেস্কোর্সের ময়দানে একটা নাগরিক গণসংবর্ধনা আয়োজন; এবং, অবিলম্বে, বাংলা অ্যাকাডেমি থেকে একটা সানন্দা ম্যাগাজিনের সাপ্লি প্রকাশের পাশাপাশি নোবেল কমিটির সঙ্গে একটা কোলাবোরেটিভ অ্যাওয়ার্ডের পত্তনি ও প্রবর্তনা। ম্যাডামের জন্য পয়লাটা বরাদ্দ রেখে ক্রমান্বয়ে শ্যামস্যু-সরকার ধরে একসময় মফস্বলের মদনভোদাই কবির কপালেও পুরস্কারশিকে ছিঁড়বে। সেই চান্সটা তো থাকে। এই শিল্পকলা-বাংলা অ্যাকাডেমিগুলো অর্থদোহন ছাড়া লাস্ট টেনইয়ার্সে কোন কাজটা করেছে বলেন দিকি? নোবেল কমিটির সঙ্গে জয়েন্ট ভেঞ্চারে একটা অ্যাওয়ার্ড গিভিং প্রোজেক্ট লঞ্চ করার অ্যাসাইনমেন্ট এদেরে দেয়া হোক, ফেইল্ করলে ম্যাডামের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে এদেরে যেন জঙ্গলে গেওয়া চাষ ও পরিচর্যায় পাঠিয়ে দেয়া হয়।

এখন বলি নিম্নলিখিত মালগুলো আপনি কীভাবে নেবেন। প্রথমত, মিলাইবেন না। শান্তি পাবেন না, পাবেন না, পাবেন না। কারণ এগুলো লেখা হয়েছে তর্জমাকারের শৈশবে আবিষ্কৃত কবিতানির্মাণ তরিকায়। কালীপ্রসন্ন সিংহের অমুক কবিতার পয়লা আটলাইন মুখস্থ লিখ, প্রশ্নপত্রে নির্দেশিত অনুজ্ঞার জবাবে এই তর্জমাকার দিব্যি লিখে এসেছিল গদ্যস্পন্দে কালীপ্রসন্নকবিতার পয়লা আটলাইন। সেই থেকে শুরু। মূল বিলকুল না-দেখে বানিয়ে বানিয়ে লেখার স্পর্ধা বাড়তে বাড়তে এহেন তর্জমাপর্যায়ে এসে ঠেকেছে। সেইজন্যেই বলছি, মিলাইতে যাবেন না, প্রেমিকা আমার, শান্তি পাইবেন না, পাইবেন না, পাইবেন না। তারচেয়ে বরং মূলানুগত্য-ভাবানুগত্য প্রভৃতি পাশরিয়া যান, আরাম পাইবেন, নগদানগদ ফলও লভিবেন। মূল ভুলতে না-পারলে ফুল্লপত্রপল্লবের দিকে আঁখি নিবিষ্ট করবার মওকা আপনি মৃত্যুর আগে পাইবেন বলিয়া আশা অল্প। অরিজিন্যালের মাস্তানি যুগপৎ ভুলে যেয়ে এবং মনে রেখে আপনি ভার্শনের সুরুয়া চাখবেন। টেইস্ট পাইবেন। না-পাইলে মূল্য ফেরৎ।

অদৃশ্য অজস্র ইমোটিকনের ব্যবহার রয়েছে এই প্রিফেসের যত্রতত্র সর্বত্র। আপনাকে সেগুলো নিজদায়িত্বে দেখে জায়গামতো বসিয়ে নিতে হবে। কেবল আপনি নিজে এইটা পাঠোত্তর অনুরক্ত অথবা বিরক্ত হয়ে যখনই ইমো খুঁজবেন বসাবার নিমিত্তে, দেখবেন কেবল অনামিকা আনাগোনা করিতেছে চারপাশে; ইংরেজি মিনিঙের অনামিকা। তাতে অসুবিধা নাই। নিশ্চয়, জরুর, দেখাইবেন অনামিকা। আর আপনার ট্রলপাঁয়তারা প্রার্থিতই রইল। তবে সবচেয়ে অ্যাপ্রিশিয়েব্যল্ হবে যদি নিম্নলিখিত তর্জমাভিঘাতে আপনিও অল্পস্বল্প সক্রিয় হইতে পারেন সৃজনের টেবিলে। দেখবেন একটু, উ্যড য়্যু প্লিজ্, ট্রলের ফাঁকে একেকটা গান হাতে নিয়া আরেকটা ভার্শন আপনিও উপহার দিতে পারেন কি না। পারবেন, আপনার সদিচ্ছাই সবকিছু, হুজুর ও হুজুরাইনের যেন মর্জি হয়।

যেইটা বলছিলাম শুরুতে। হ্যাঁ, এই ইনিশিয়েটিভের সঙ্গে স্যুইডিশ কমিটির সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত, বব ডিলানকে নোবেল প্রদানের সিদ্ধান্ত, অবশ্যই জড়িত। উনিশ শতকের সেই নিরানব্বই থেকেই ডিলানের নাম শর্টলিস্টে এসেছে একাধিকবার। তা, কী এমন ঘটল যে এই তর্জমাগুলো জাকার্বার্গের মালিকানাধীন পত্রিকায় আপ্লোড হবার একবছর প্লাস্ চারমাসের মাথায় শিকে ছিঁড়ল ববির নসিবে নোবেলের? এই ইঙ্গিত যারা বুঝবেন, তারা এরই মধ্যে নিজেদের নির্বাচিত রচনাপত্তর বোন্দা বেঁধে এই তর্জমাকার সমীপে প্রেরণের জন্যে সুত্লি খুঁজতেছেন হন্যে হয়ে। একবছরেরও কমে কেল্লা আপনার পায়ের তল্লায়।

এবং ববির লেখা ও গাওয়া গানগুলোর মূল নামটা বাংলায়িত করার বদলে ইংরেজিই রেখে দেয়া হয়েছে, যেন আইডেন্টিফিকেশনে বেগ পেতে না-হয়। কেউ কি বলতে পারবেন আমারে যে নেক্সট ইয়ারে আলফ্রেড নোবেল সায়েব অনুবাদসাহিত্যের জন্য পুরস্কার প্রবর্তনের চিন্তাভাবনা করছেন কি না? আশু কর্তব্য নয় কি সেইটা? আপনার মূল্যবান রায় আজই নোবেল পরিষদেরে জানিয়ে দেন। তবু, তবুও, সন্দেহ সরছে না তোমার নির্মম মন থেকে, প্রিয়তমা? আমি কিন্তু সত্যি সত্যি ইংরেজি জানি। যেমন, ধরো, আই ল্যভ য়্যু! অতঃপরও বলবা আমি ইংরাজি জানিনে, প্রিয়তম! ও হ্যাঁ, আরেকটা উক্তি, ডিলানকেও আমি চিনি। মিন্ ইট, মামা, রিয়্যালি! কিন্তু তবুও তর্জমায় যে-সমস্যাগুলো রয়ে গেল, রয়ে যাবে চিরদিনই আমার, সেসবের কারণ অন্য।

বব ডিলানের কুড়িটা গান শুরু-থেকে-শেষতক শুনতে হলে ক্রমশ নিচের দিকে যান।

14804919_10208718510612730_932271393_nদ্য টাইমস্ দ্যে’আর অ্যা-চেইঞ্জিন্

শোনেন শোনেন সুধীজনা শোনেন দিয়া কান
ঘোরাঘুরি কইরা যারা কাটাইছেন সময়
দ্যাখেন আপনার হাঁটুছোঁয়া পানির ঘূর্ণিটান
ঘোলাপানি বৃত্তাকারে বেড়ে কোমর ছোঁয়
বিলম্ব না-কইরা জনাব স্বীকার যান সত্বর
ডুইবা যাবার আগে হাঁকুন জীবনের মন্তর।
বদর বদর বলে যদি পলাইতে চান ভবে
পানিপথের লড়াই যদি বৃথা ভাবেন তবে
বাঁচবে সময় এবং স্বাস্থ্য শুরু করেন সাঁতার
নইলে জানবেন ডুইবা যাইবেন কাতারে-কাতার
সাহেব-বিবি-গোলাম সবাই দৃষ্টি রাখেন ধার
সময় দ্রুত বদলাচ্ছে বাঁক ভুবনদরিয়ার।

শোনেন শোনেন লেখক কবি এবং সমালোচক
কলম দিয়া যারা আঁকেন ভবিষ্যতের ছবি
দৃষ্টিটারে এইবার করেন দূরের প্রসারক
সুবর্ণ এই সুযোগ উস্তাদ হইবার পারেন নবি
কিন্তু গুরু যা বলবার তা বলবেন বুঝেশুনে
দ্যাখেন চেয়ে সেলাইমেশিন পেঁচাইতেছে ববিনের পর ববিন
কালের তাঁতে চলছে বয়ন পাগলা রাত্রিদিন
চালাচ্ছে কে মেশিনখানা তাহার বাড়িঘর
থাকলে মুরদ তল্লাশিয়া জানাই দিয়েন পত্রপাঠোত্তর
আর জাইনা রাখেন আজকে যারে ঠাওরাইতেছেন হারুপার্টির লোক
ফজর হবার আগেই আপনে বনিবেন উজবুক
লেখক-কবি-চিত্রী সবাই দৃষ্টি রাখেন ধার
সময় দ্রুত বদলাচ্ছে বাঁক ভুবনদরিয়ার।

শোনেন যত মন্ত্রী-এমপি-নেতা এবং আমলা হাতি-পাতি
সদয় কর্ণ পাইতা শোনেন সময়ের মন্দিরা
বাজিতেছে বেদম জোরে দ্যাখেন এই-না কালেরও সুখ্যাতি
পোষায় যদি থাকেন নইলে না-দেখিয়েন ফিরা
থামেন যদি নিজের দোষে গোত্তা খাইবেন গায়ে
আছাড় খাইয়া যাইবেন পইড়া ব্রহ্মনাদের পায়ে
দ্যাখেন চাইয়া বাহিরপানে কেমনধারা ধামড়া ষাঁড়ের শিং
দাবানলের মতন বাড়ছে বজ্রমুষ্ঠি এবং বিষের বীণ
সেই-না আওয়াজ আসিতেছে আপনাদিগের পিছে
ঝাঁকি দিয়া নামাই দিব নয়শ তলার নিচে
এমপি-মন্ত্রী-নফর-সান্ত্রী দৃষ্টি রাখেন ধার
সময় দ্রুত বদলাচ্ছে বাঁক ভুবনদরিয়ার।

শোনেন শোনেন শিশুর পিতা এবং শিশুর মাতা
আছেন যারা কানে তুলা দ্বারে দিয়া খিল
সময় গেলে সাধন হবে না হে ভগ্নি-ভ্রাতা
কানে যারা ঠসা তারাও দেখিছেন মিছিল
আপনে শরিক হবার আগে আপনের সন্তানেরা
বানের পানির লাহান আইসা পিটাইতাছে ঢ্যাঁড়া
দ্যাখেন চাইয়া আপনের হাঁটা আদ্দিকালের পথে
বেজায় বেগে দলিল অচল নতুন দস্তখতে
পারেন যদি হাতটা বাড়ান কান্ধে রাখেন কাঁধ
নয়া রাস্তায় না-পাতিয়েন ইঁদুর ধরার ফাঁদ
আব্বু-আম্মু-খোকাখুকি দৃষ্টি রাইখেন ধার
সময় দ্রুত বদলাচ্ছে বাঁক ভুবনদরিয়ার।

টাইনা রাখছে বান্দরেরা আজব লক্ষণরেখা
ভাগ্য গড়তে নাকি লাগে বহুকিছু শেখা
আজিকে যার গতিবিধি শামুকের মতো
দুইদিন পরে সে-ই হবে দ্রুত ও উন্নত
এই মুহূর্তে একচ্ছত্র পরাক্রমী দিন
চক্ষের পলকে হবে অতীতে বিলীন
বদলাতেছে দ্যাখেন চাইয়া চাক্কার গতিবিধি
নিমেষে যায় গদি উল্টে পাতালপরিধি
আজিকে যে বেপরোয়া ঘাউড়া মত্ত ঘোড়া
আগামী দিবসে তারে দেখবেন দৌড়ে খোঁড়া
ডাক দিয়া যাই মহোদয়গণ নজর রাইখেন ধার
সময়স্রোতের বাও বোঝা ভার ভুবনদরিয়ার।

 

মিক্সড প্ কনফিউশন্

পড়েছি ভীষণ ধন্দাবর্তে, ভাই
ধন্দে আমার প্রাণ করে আইঢাই

গাদাগুচ্ছের লোকাকীর্ণ এ-দুনিয়া
হাজার পেয়েও অখুশি এদের হিয়া

আমিও কোমরে বেঁধেছি পাগড়ি খুলে
হেঁটে চলিয়াছি নিঃস্ব বাউণ্ডুলে

এবং খুঁজছি সেই নারীটিরে হন্যে
আমারই মতো যে ধন্দে এ-জনারণ্যে

আর মাথায় আমার প্রশ্নেরা বিস্তর
খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বাড়ায়ে চলিছে জ্বর

আমিও চলেছি জবাবের পিছে ধেয়ে
ধাঁধায় ফেঁসেছি কারে-বা শুধাই যেয়ে

হাঁটছি তবুও খুঁজছি তবুও রফা
ধন্দে দীর্ণ তবু এখনও তো দেই নাই ইস্তফা

তাকায়ে দেখছি ঝাপসা যাবজ্জীবন
ভাঙতেছে, ফের লাগতেছে, দ্যাখো খোঁয়ারি কী বিভীষণ!

 

টকিন্ ন্যুইয়র্ক

বুনো পশ্চিমে ব্যাপক দিয়াছি টো-টো-কোম্প্যানি টহল
থেকেছি আবার ছেড়েও এসেছি শহরের রঙমহল
ভাবতাম দেখা হয়ে গেছে সারা আগাপাশতল দুনিয়া
আসলে এসবই মিথ্যে জেনেছি ন্যুইয়র্ক শহর ঘুরিয়া
এখানে মানুষ চলেছে নিত্য পাতালপুরীর টানে
দরদালানের উদ্বাহু ছুট উঁচা আকাশের পানে

ন্যুইয়র্ক শহরে নারকীয় শীত নেমে আসে সহসাই
উত্তুরা হাওয়া বয়ে আনে হেথা বেদম বরফচাঁই
ইতিউতি হাঁটি গলিঘুঁজি চিরে নিরুদ্দেশ্য অনিকেত্
দাঁতি-লাগা শীতে যেন শহরটা আজদহা এক প্রেত
আমার অবস্থা আরও সঙ্গিন কঁকানি শীতের কোপে
শেয়ালেরও আছে ডেরা লুকাবার আমি ঢুকি কোন ঝোপে!
খবরানুসারে এবারের শীত সর্ব রেকর্ডভাঙা
শুনিবামাত্র আড়মোড়া ভেঙে আমি হয়ে উঠি চাঙা

বাজাতেছিলাম দুলকিয়া চালে একলা একাকী গিটার
ভাঙা গ্যারেজের বর্জ্য গাড়িতে ব্যাপক সুরবিহার
মাতোয়ালা গানে নিজের সঙ্গে নিজের ভ্রমণ শেষে
ভেড়ালাম আমার নভোযানখানা শহরতলিটি ঘেঁষে
সেই শহরটা আমারই মতন ছন্নছাড়ার ধাম
এইখানে আছে নেশা আর নিশি গ্রিন্যুইচ ভিলেজ্ নাম

ইয়ারবখশি জুটে যায় বেশ জুটে ঘুমাবার স্থান
গলিটার মোড়ে পেয়ে যাই এক চাল্লু মদের দোকান
সেই দোকানেই একদিন উঠে দাঁড়াই গিটার ঝুলিয়ে
শুনে-টুনে গান দোকানমালিক বোদ্ধা মাথাটা দুলিয়ে
বলে বাছা তুমি মন্দ গাও না কিন্তু গলাটা ছ্যাঁচা
আজকাল লোকে এসব খায় না চায় আরও রকধাঁচা

ভাগ্যিস আমি পারতাম বেশ বাজাতে হার্ম্যোনিকা
গ্রাসাচ্ছাদন জুটাইতে কাজে লেগে যায় বাঁশিফোঁকা
ভেতরের দম চাপাশ্বাস ক্রোধ নিংড়ে বাহির করি
লোকের তারিফ শুনিয়া আমিও ফুসফুস সঁপে ধরি
শুঁড়িখানা ভরে উপচানো ক্রেতা চাকুরি পাক্কা আজ
একটিমাত্র ডলার খোরাকে বাজাবার বাঁধা কাজ

হপ্তার পর হপ্তা কাটিয়া মাসান্ত পরে ঘুরে এল নয়া বছর
বাউণ্ডুলের শিকেয় শেষে ধরা দিলো এই ভীষণ মহানগর
জুটল নোকরি ভদ্রসদ্র মোটামুটি মোটা মাইনের মাসোহারা
সঙ্গে পেলাম পাণ্ডা শ্রমিক ঝাণ্ডা সংঘ হলাম কর্জছাড়া

মনে পড়ে এক মহান ব্যক্তি কবে যেন বলেছিলেন
“বিদ্যাগাণ্ডু লোকেদের আছে গরিবমারার জ্ঞান
ধরা খাইতেও খুব বেশিদিন লাগে না ভণ্ডদের” —
উক্তিটি নয় এখানেই শেষ আরেকটু আছে এর —
“বেশুমার লোক এই দুনিয়ায় ভুখা পেটে থাকে বাঁচি
টেবিলে খাবার নাহি থাকলেও মজুদ ছুরি ও কাঁচি”
ভাতের ধর্ম ক্ষুণ্নিবৃত্তি ছুরির ধর্ম কাটা
মানুষের কাজ নয় চিরকাল নিজের আঙুল চাটা

আমারও কপালে সইল না বাপু ভণ্ড ভদ্র সুখ
ছুঁড়ে ফেলে এই নগদ দাস্য আমি এক উজবুক
বেরোলাম পথে মুক্ত বাতাসে দেখাইতে হিম্মৎ
বুনো পশ্চিমা গাঁয়ের মানুষ তুড়ি মেরে সহবত
সেই থেকে আমি যা করছি সব প্রকাশ্য দিবালোকে
কে আছে এখানে এই ন্যুইয়র্কে গোঁয়ারের পথ রোখে!

 

স্যং টু উডি

হাজার হাজার মাইলের পার ক্ষণপরিত্রাণহীন
বাড়িছাড়া আমি বিভূঁই-বিপথে নাই রাত নাই দিন
রোদে-মেঘে-মাঘে হেঁটে হেঁটে দেখি তোমারই সৃষ্টিলীলা
তোমারই ভিখিরি ক্ষেতমজুর আর নৃপতি ও হাড়গিলা

উডি গাথ্রি হে সেলাম উস্তাদ তোমারই জন্য সামান্য এই গান
দুনিয়ায় দেখি বিকট আমোদফুর্তি এবং তথাপিও ম্রিয়মাণ
রোগেশোকে তার জেরবার প্রাণ ক্ষুৎকাতর আর ক্লান্ত ছিন্নবস্ত্র
জন্মায় নাই জগৎশিশুটা তারই দিকে দেখি বিদঘুটে ব্যাধ-অস্ত্র

দ্রোণাচার্য উডি গাথ্রি হে আমি নিশ্চিত তুমি অবগত সম্যক
যা-কিছু ধরতে চেয়েছি এ-গানে ঢেরগুণে বেশি তোমার গানের ধক
তোমার যোগ্য গান বিরচিব অতটা গায়েন আমি কোনোদিন হতে পারব না ছাই
জগৎ ভ্রমিয়া দেখিলাম বাপু তুমি যা করেছ অতটা মায়েস্ত্রো খুব-বেশি কেউ নাই

তোমার যাহারা সংগতকার আলোর তৈয়ারি শিল্পী উহারা বাদ্যবিনীত যন্ত্রী এবং দোহার
তোমার যাহারা গানের সঙ্গী ইয়ারবখশি নিত্য তারাই প্রীত করে এই নৃশংস সংসার
এইখানে এই বিরানায় এসে তোমার আসরে তোমার কদমে রেখে গেলাম এই গান
ধূলি থেকে উঠে এসেছিলে তাই তোমারই প্রাপ্য দুরন্ত মরুকুজ্ঝটিকায় বীর লড়িয়ের সম্মান

রওয়ানা দেবার কথা ছিল কাল যদিও-বা আমি হচ্ছি রওয়ানা আজকেই
পথেই আবার পথের সওয়ার পথকুকুরের গল্পগাছার জানি দেখা হবে উডিপৃথিবীর সঙ্গেই
যাবার আগে এই একটা কথাই তোমার সকাশে সবিনয় চাই বলতে
আমিও অনেক মরু-গিরি ভেঙে গেহমাটিমায়া পশ্চাতে ফেলে এসেছি নিধুয়া গানের এই দিগন্তে।

 

ল্ অ্যালং দ্য ওয়াচটাওয়ার

“একটা-কিছু উপায় নিশ্চয় আছে”, মদের দোকানী বিদূষক বলে চোরেরে
“এ্যাত্ত ধন্দ দুনিয়া জুড়ে, বেহাল বুঝি-বা আমিই একলা অদৃষ্টের ফেরে
দ্যাখো বণিকের দল মদ খায় আর মাস্তি মারে, কম যায় না কামলারাও
দুনিয়ায় এত করাকরি দিয়া কোন আমড়াটা হয়, যে জানে তারেই জিগাও”

“হুদা মাথা-গরম কোরো না বাছা”, খাকারি দিয়া গলা ছাড়ে তস্কর
“সকলেই জানে জীবন হলো অনস্বীকার্য মশকরা মারার অতিকায় এক ঘর
শুধু তুমি আর আমি বিটকেলে এই তামাশার গোটা ভাজুংভুজুং জানি
কাজেই ফায়শা কথায় কাজ কি মিয়া, রাইতের মৌজ ভোরের আগেই পানি”

ওইদিকে দ্যাখো চৌকিমিনারশীর্ষে বসে শ্যেনদৃষ্টি সিপাই এবং স্বর্ণপ্রাসাদকন্যে
মহিলারা, আর আয়া-খানসামা, আসিয়া আবার গিয়াছে চলিয়া রাত্রির সৌজন্যে

হুলোবেড়ালের চাপা গোঙানিতে রাস্তাটা দূরে পাশ ফেরে ঘুমঘোরে
বাতাসহ্রেষার সঙ্গে যেন অশ্বারোহীর আবছা আদল দেখা যাইল অদূরে

 

সিস্টার

মাথা রাখিবারে চাই তোর কাঁধখানা
আমি নই বুবু বেগানা আগন্তুক
একই তো উৎস উদর ও ঔরস
অপরিচয়ের অবসান এবে হোক

আপা আমি বুঝি নই তোর সহোদর
নসিবে আমার জুটিবে না বোনস্নেহ?
সদাপ্রভু বলে দিয়েছিল করিবারে
একটাই প্রেম পরস্পর একদেহ

উঠিয়াছি বেড়ে দুইজনা ভাইবোন
দোলনা হইতে দাফনেও জুধা নই
মরেছি আবার ফিরেও এসেছি দোঁহে
বেঁচেছি অবাক সংবাদ এটুকুই

হৃদয়ের বোন কড়া নাড়ি তোর দরোজায়
ফিরিয়ে দিলেই নিঃস্ব ও নাজেহাল
সময়সিন্ধু অশেষ যদিও রহিয়াছে উপকূল
থাকব না আমি হয়তো আগামীকাল

 

টাইম্ পাসেস্ স্লোলি

ধীরে বেলা বহে এই পাহাড়চূড়ায়
সেতুতটে যাই ঘুরি ঝরনাঝোরায়
ধরি মাছ নিকটের খরস্রোতা খালে
ধীরে বেলা যায় যেন খোয়াবের জালে

এক ছিল রাধা তার মায়ার মুরতি
ছিল বসে হেঁশেলের কোণে ভবজ্যোতি
দৃষ্টি ছড়ানো তার তারাদের দেশে
বেলা যায় ভেবে তারে একা ভালোবেসে

বৃথাই শহরে যাই জুড়িগাড়ি হেঁকে
বৃথাই মেলায় ঘুরি হট্টগোলমালে
বৃথাই এখানে ফিরি ওইখান থেকে
বৃথাই আবর্ত যত দুনিয়া-পাতালে

বৃথা বেলা বয় এই দিবালোক ঘিরে
চেষ্টা ছাড়িনি পেতে সম্বিৎ ফিরে
যেমতি গ্রীষ্মে ফোটে গোলাপের রঙ
সময় বহিয়া যায় বিস্মরণং

 

ইফ গস্ রান্ ফ্রি

যদি কুকুরেও পায় ইচ্ছাস্বাধীন ছুটে বেড়াবার মওকা
আমি তবে কেন ঝাঁপাতে পারি না হাওয়ার সঙ্গে দমকা?
কান পেতে শুনি দূরাগত কোনো ধ্বনিক্ষীণ মূর্ছনা
আর ভেঁপুবাজা রেল, বৃষ্টির স্কেল, বলদের বন্দনা
শ্রেষ্ঠ যা-কিছু দূরেই বিরাজে ভবিষ্যতের গর্ভে
এই কথাটাই সান্ত্বনা দ্যায় গানের সূচনাপর্বে
রে পিপাসিত অন্তর বাজা, আপনা শাসনে আপনিই রাজা
সারমেয় যদি নিজে নিজে থাকে সবুজ বাতাসে তাজা।

যদি কুত্তারা পারে বেদম ছুটতে হুটোপুটি খেতে মাঠে
আমি কেন থাকি জ্বি-জাঁহাপনা বাইঞ্চোতেদের ঠাটে?
মাথার ভিতর খটর-খটর সুরের মেশিনল্যুম
হৃদয়পদ্মে রেশমি রঙিন জবর ছড়ার ধুম
আমার কাহানি নিয়া যায় বয়ে ব্যাপক বাতাসডানা
আমারে রেখো না স্মরণে কিন্তু মনে রেখো এই গানা
বাতাসের কাজ করে যেতে দিও তারে
মেরে-ধরে যেন রুখতে যেও না বাউলা কুত্তাটারে।

যদি কুকুরেরা পারে মুক্তকচ্ছ তুড়িস্ফূর্ত ছুট
তোমারেও তবে যুঝতেই হবে নিতে হবে কালকূট
প্রকৃত প্রেমের খপ্পরে দ্যাখো নলখাগড়াও তলোয়ার
বুক-টানটান খাড়া মাথা তার যেন কুঠারের ধার
জগতের এই জলসায় দ্যাখো মহাজাগতিক ধুন
সত্যিকারের প্রেমিকের নাই কমরেড প্রয়োজন
প্রেমেই মুক্ত আত্মা, আকাশের মতো উদাত্ত ও পূর্ণ সব্বে-সাত্তা
বাতাসের বেগে পাগলা কুত্তা প্রভুরে দ্যায় না পাত্তা।

 

ক্যাট্’জ্ ন্ দ্য ওয়েল্ 

কুয়ার ভিতর বিড়ালছানা ভালুক তারে খুঁজছে কুয়ার পারে
খুঁজতে খুঁজতে হয়রান হয়ে পেয়েছে বিলাইর লোমশ লেইঞ্জাটারে

কুয়ার ভিতর বিড়ালছানা বাড়ির ভিতর গিন্নি ঘুমে কাদা
কানে তাহার ঘুমের তালা বাকবিরহী নিরাই নিশীথ শাদা

কুয়ার ভিতর বিড়ালছানা মাটির উপর দুঃখমুখের উঁকি
দুনিয়াটা যে জবাই হচ্ছে এই লজ্জা কেমন করিয়া রুখি!

কুয়ার ভিতর বিড়ালছানা মাথা ঠুকছে দেয়ালগাত্রে ঘোড়া
রাখতে ব্যগ্র ভগবানবাবু সমুন্নত যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধমত্ত চূড়া

কুয়ার ভিতর বিড়ালছানা আব্বুসোনা পাঠমগ্ন সংবাদপত্তর
খবর পড়েই দিন ফুরলো সন্ধেবেলা কন্যার চাই বিবাহ সত্বর

কুয়ার ভিতর বিড়ালছানা ধানের গোলায় এক-দঙ্গল ষাঁড়
হরেক খানায় টেবিল ভরা রাত্রিশীর্ষে পড়েছে বেজায় জাড়

কুয়ার ভিতর বিড়ালছানা চাকর ব্যাটাও প্রস্তুত দরোজায়
তৃষ্ণার মদ মজুত আছে দেখব এবার জগৎ ডুবুক যুদ্ধের তমসায়

কুয়ার ভিতর বিড়ালছানা পাতারা ঝরিয়া গাছের মাথাটা ন্যাড়া
শুভরাত্রি প্রিয়তমা চাঁদু সদাপ্রভুর কৃপায় দোঁহে ভেড়ি এবং ভেড়া।

 

ব্লোয়িন্ ন্ দ্য উইন্ড

একটা মানুষ কতটা হাঁটবে হাঁপাতে হাঁপাতে একজীবনে সে কতটা ভাঙবে পথ
দয়াপরবশে এরপর তুমি মানুষ বলবে তারে?
একটা পায়রা সাগরসীমানা পারাতে পারাতে গাইবে কতটা বেদনার নহবত
বালিবিছানায় মেলান-পাখনা কবে পাবে ঘুমাবারে?
আরও কতবার বলো ছোঁড়া হবে দেশকালনাশা মারণতামাশা কামানগোলার অগ্নি
চিরতরে এই খেলাটায় তুমি ইস্তফা দেবে কবে?
দখিনা হাওয়ায় নিধুয়া পাথারে সুরাহার ধ্বনি শুনতে কি পাও বন্ধু ও ভ্রাতা-ভগ্নি
উত্তরমালা বাঁচতে চাইলে যথাদ্রুত পেতে হবে।

একটা মানুষ উঁচাতে উঁচাতে মাথাটা তাহার কতটা উর্ধ্বে কোনখানে নিয়ে ঠেকাবে
যেন বেচারাটা আকাশটারে একটু দেখিয়া মিটাইতে পারে আশ?
কতটা সামর্থ্য প্রয়োজন হয় শ্রবণিন্দ্রীয়ে একটা মানুষ শুনতে চাইলে কোমলে-রেখাবে
সংলগ্নজনের গোঙানি ফিসফিস ভয় হাহাজারি আর অপার নিরাশ্বাস?
কত জনতা মারা গেলে সেই কিমৎ চুকানো হয় যে একদিন দেখাইবে ডেকে-ডেকে
দ্যাখো লোকালয়ে এই ফাঁকতালে কত স্বজনের কাতারে-কাতারে লাশ?
হয়তো তুমিও জবাব জানো না পালাতেছ তুমি জবাবের চাবি পশ্চাতে ফেলে রেখে
জলে-স্থলে ও অন্তরীক্ষে এটুকু জবাব তোমার জন্য ঘুরে ফেরে বারোমাস।

একটা পাহাড় কতকাল বলো রহিবারে পারে অস্তিত্বের শর্তপূর্ণ অটুট ও অক্ষয়
বিলীন হবার আগে দেহ তার মহাসাগরের তলে?
একটা গোটা মানবজাতির কতটা সাধ্য মুফতে চালায়ে যাবে এহেন অকথ্য অপচয়
কতকাল তারা থাকবে এহেন দমচাপা শৃঙ্খলে?
একটা মানুষ কত-সহস্রবর্ষ বলো সয়ে যেতে পারে একনাগাড়ে এই দৃশ্যের মন্তাজ
এবং ভান করে যেন ব্যোমভোলানাথ এই ভুবনাঞ্চলে?
উত্তরগুলো উড়ছে তোমার চেনা চারপাশে তোমারেই তারা ডাকিতেছে দ্যাখো আজ
উত্তরগুলো উড়ছে দোস্ত মস্ত প্রশ্নছদ্মবেশে শুনিও সময় হলে।

 

পোলিটিক্যাল্ ওয়ার্ল্ড

অপরূপ এই রাজনৈতিক দুনিয়া
ভালোবাসাবাসি এখানে পায় না ভাত
গুজরাই দিন সময়ের বাঁধা খোপে
অপরাধকাজে ব্যস্ত ঝাড়ে ও ঝোপে
পাপে ও পুণ্যে চেহারায় নেই তফাৎ।

অপরূপ এই রাজনৈতিক দুনিয়া
আসমানজোড়া ধাড়ি বরফের চাঁই
বিবাহসানাই বাজিতেছে চারিদিকে
ফেরেস্তাদের নাচা দেখি অনিমিখে
মেঘের ছায়ায় তানবোলকারি-তেহাই।

অপরূপ এই রাজনৈতিক দুনিয়া
আস্তাকুঁড়ে সত্য এবং প্রজ্ঞা কয়েদখানায়
একটুকু জমি পেলেই ছড়াত শেকড়
অঙ্কুরেতেই নিকেশিত তার কল্লা হইতে ধড়
প্রজ্ঞার কচি বীজটাও যেন দূরীভূত হয়ে যায়।

অপরূপ এই রাজনৈতিক দুনিয়া
রাজার দলের ধেই ধেই নীতিকথা
মাফি মাঙবার মহত্ব অবারিত
এখানে জীবন পুনঃপুনঃ পরাজিত
যমদূত দ্যায় চম্পট দেখে সুদখোরদের মমতা।

অপরূপ এই রাজনৈতিক দুনিয়া
সাহস এখানে অতীতের গালগল্প
ঘরের ভেতরও ভয়াতুর মানুষেরা
বাচ্চাকাচ্চা চাইছে না মা-বাপেরা
বাঁচার সঙ্গে মরার ফারাক অল্প।

অপরূপ এই রাজনৈতিক দুনিয়া
কাউকে দেখেই চিনাজানা লাগে হয়তো
অথচ সত্যি সে-ই কি না লাগে ধন্দ
গাদাগুচ্ছের লোকলস্কর সকলেই নিস্পন্দ
যদিচ ইহাই বাস্তব ও অতিসত্য।

অপরূপ এই রাজনৈতিক দুনিয়া
আজনবি এর নিস্তরঙ্গ শহরে-গঞ্জে-গ্রামে
হাঁটি-হাঁটি-পা ভয়ে ভয়ে এক-সময়
দেখিবে তুমিও লভেছ গলায় জয়
কেন হেন জয়মাল্য গলায় ভাবিও মধ্যযামে।

অপরূপ এই রাজনৈতিক দুনিয়া
অনুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে যথা
হাঁটাচলা করে গিজগিজে অনুজীব
চলিও অথবা ঝুলিয়া পড়িও উদগ্রীব
ঝুলিবার তরে যথেষ্ট পাবে সুতা।

অপরূপ এই রাজনৈতিক দুনিয়া
ফালাইতে থাকো বোধিতরুটার ছালবাল
যতক্ষণ আছো জেগে ততক্ষণ সম্যক
তোমারে শেখানো হইবেই সহি সবক
কুমিরের তরে আরামের কোন খাল।

অপরূপ এই রাজনৈতিক দুনিয়া
শান্তি যেখানে আদৌ স্বাগত নয়
ফিরাইয়া তারে দেয়া হয় দ্বার থেকে
শান্তি এখানে কেঁদে ফেরে মুখ ঢেকে
দেয়ালে দেয়ালে শান্তি লিখিত রয়।

অপরূপ এই রাজনৈতিক দুনিয়া
তাবৎকিছুই বেগম এবং সাহেবের
দেখিয়া-শুনিয়া মাইক লইয়া হাতে
প্রভুদরবারে ফরিয়াদ পৌঁছাতে
চেল্লায়ে ফের ভাবছ উনি কি জীবনেও কোনো কাজের …

 

ল্ আই রিয়্যালি ওয়ান্ট টু ডু

চাইছি না আমি লিপ্ত হতে তোমার সঙ্গে বেহদ্দ প্রতিযোগে
ভুগছি না কোনো দুনিয়াশাসক ঠগের ন্যায় বৃথা ব্যাটাগিরি রোগে
চাই না বানাতে দেশীয় সহজ অথবা আদর্শ শ্রেণির
স্বীকার-অস্বীকার ফ্যাসাদে যেতে বা বলী বানাইতে বেদির
আমি যা চাইছি ঘোরপ্যাঁচহীন শাদামাটা সেই কথা
চাইছি নিঃশর্ত নিরুপম শুধু তোমার বন্ধুতা।

চাই না তোমার সঙ্গে যুদ্ধ চুন থেকে পান খসলে
ভয় দেখাতে বা বাঁধিয়া রাখতে সমাজের শৃঙ্খলে
টেনেহেঁচড়ে বা ম্লানমুখ তোমায় চাই না বাধ্যগত
হাতকড়া বা বকলস-আঁটা সর্বতোসম্মত
আমি যা চাইছি শাদামাটা সেই কথা
চাইছি নিঃশর্ত নিরুপম শুধু তোমার বন্ধুতা।

আমি তোমার পথরোধ করে দাঁড়াতে চাই না মোটেও
আচমকা দোরঘণ্টায় বা দ্বারবন্ধ করে হেয়
তোমায় বিশ্লেষিতে চাই না বা চাই না খাপের ভিতর পুরিতে
বিচারসালিশ করতে কিংবা আলাদা বাদ্যে বিজ্ঞাপিতে
আমি যা চাইছি ঘোরপ্যাঁচহীন শাদামাটা সেই কথা
চাইছি নিঃশর্ত নিরুপম শুধু তোমার বন্ধুতা।

চাই না তোমার মুখে ঝামা ঘষে বানাতে দারুণ ঝকমক
দৌড়াতে বা তাড়ায় রাখতে হন্যে খুঁজতে হেলায়-হারানো যখ
অপমান বা অপদস্থ নয় এবং নয় একটুও অবনমিত
চাই না তোমায় ব্যাখ্যেয় করে দেখতে কিংবা নিগড়ানুবর্তিত
আমি যা চাইছি ঘোরপ্যাঁচহীন শাদামাটা সেই কথা
চাইছি নিঃশর্ত নিরুপম শুধু তোমার বন্ধুতা।

খামাখা খাতির চাই না তোমার জ্ঞাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে
খেলনা লাটিম বানায়ে তোমায় নাচাতে চাই না অর্বাচীনের ঢঙ্গে
চাই না তোমারে দেখতে খুঁটায়ে চাই না ভাবতে বিশেষ বাছাইকৃত
প্রত্যাখ্যাতে চাই না তোমারে করতে চাই না ক্রমান্বয়ে পরীক্ষাপীড়িত
আমি যা চাইছি ঘোরপ্যাঁচহীন শাদামাটা সেই কথা
চাইছি নিঃশর্ত নিরুপম শুধু তোমার বন্ধুতা।

আমি তোমায় মেকি ও মিথ্যে প্রমাণ করতে চাই না
বাহুডোরে নিতে স্নেহে ঝাঁকাইতে ত্যাজিয়া যাইতে চাই না
আমি চাই না আমারই মনের মতন বদলায়ে নেব তোমায়
দৃষ্টিভঙ্গি ঠিক করাইতে চাই না আমারই পছন্দসই পন্থায়
আমি যা চাইছি ঘোরপ্যাঁচহীন শাদামাটা সেই কথা
চাইছি নিঃশর্ত নিরুপম শুধু তোমার বন্ধুতা।

 

জাস্ট লাইক অ্যা উওম্যান

ব্যথাবেদনার ছিটেফোঁটা নাই কোথাও
রয়েছি সড়কে একলা দাঁড়ায়ে বৃষ্টিতে ভিড় উধাও
ঘরে-ফেরা বাবু অপাঙ্গে দেখে জেল্লালাস্য মেয়েটা
রাস্তাবাতির গা ঘেঁষে ডাকছে লেলিহান সন্ধেটা
আমি দেখি তার নুয়ানো মাথার চুলে লেইসফিতামায়া
আমি দেখি তার গোটা অবয়বে গাঢ় ক্লান্তির ছায়া।
তার কাছে যেয়ে পুরুষেরা পায় পেশাদারী মনোভাব
অঙ্গে অঙ্গ গ্রহণে নিখুঁত সুঠাম নারীর ছাপ
প্রণয়কেলির সময়েও সে সবল নারীরই মতো
রভসে গোঙায় শীৎকারি যায় শৃঙ্গারসম্মত
সবকিছু যেন অভিজ্ঞ হাতে রমণীয় ঢঙে সামলায়
ব্যথা পেয়ে শুধু ফোঁপায় যখনই বাচ্চাটা বোঝা যায়।

সাবিত্রীবালা নামের মেয়েটা আমার বন্ধু হয়
বৃষ্টিজীর্ণ রাতে আমারে সে দিয়েছিল আশ্রয়
ভাবতে হবে না আপনাদিগেরে সাতপাঁচবারো মশাই
কৃপাময় তারে দেবে না আদৌ স্বর্গবাগানে ঠাঁই
কিন্তু যদিও মুখে বলে না সে মনে মনে ঠিকই জানে
রামবুজরুকি সীতাধারণায় বেদিশাগ্রস্ত দুনিয়াটা এইখানে
কেউ স্বীকৃত মহিয়সী কেউ মহাধিক্কৃত পাতকী
বোকাহাবা হেন রামকৌতুকে হেসে কুটিকুটি বিশ্বব্যাপিয়া জানকী।
তার কাছে যেয়ে পুরুষেরা পায় পেশাদারী মনোভাব
অঙ্গে অঙ্গ গ্রহণে নিখুঁত সুঠাম নারীর ছাপ
প্রণয়কেলির সময়েও সে সবল নারীরই মতো
রভসে গোঙায় শীৎকারি যায় শৃঙ্গারসম্মত
সবকিছু যেন অভিজ্ঞ হাতে রমণীয় ঢঙে সামলায়
ব্যথা পেয়ে শুধু ফোঁপায় যখনই বাচ্চাটা বোঝা যায়।

সেদিন বিকেল থেকেই বৃষ্টি হানা দিয়েছিল শহরে
ভেসে যেতেছিল গলি-কানাগলি আমারই মতোই ক্লিষ্ট করুণ জ্বরে
এককোণে দেখি কৃপাতরু তুমি বিবিক্তা একা দাঁড়ায়ে
শতবছরের শূল বয়ে যেন জিরিয়ে নিচ্ছ পথবাতিটির গায়ে
পায়ে পায়ে যাই তোমার ছায়ায় দেবশিশুটির মতো
অবিকল তুমি বিনুনিব্যাকুল খুকিমুখটুকু অভিমানে বিব্রত
কুটিরে তোমার নিয়ে গেলে এত সযতন সস্নেহে
পেয়ে গেছ যেন খেলাবয়সের বালকটি এই দেহে
কেঁপে উঠি আমি অপত্য প্রেমে কেঁপে উঠি বেদনায়
ঝেঁপে আসে জ্বর রোদনবহর লিরিক্যাল্ লেইসফিতায়
একটু পরেই বুঝতে পেরেছি তৃষ্ণা আমার না-মিটিবে এইভাবে
এই বিনুনিতে একটি জীবন রহিব মগন অনিদ্রার্দ্র খোয়াবে
সেই থেকে আমি চণ্ডালচোখে শ্মশানের মতো লোকালয়ে ঘুরে ফিরি
সাবিত্রীহীন সন্ধ্যাবাতাসে টের পাই তারে শান্ত ও ঝিরিঝিরি
দ্যাখো সাবিত্রী তিষ্ঠোতে আমি পারছি না এইখানে
একটু দুজনে জিরোই এসো অহেতুর এই গানে —

দ্যাখো সাবিত্রী শান্তি আসলে দণ্ড-দুইয়েরই তরে
যেখানেই থাকি নাটোরে কিংবা আটলান্টিকতীরের বিভূঁই ন্যুইয়র্ক মহানগরে
এ-জন্মে আর তোমার-আমার রেলগাড়ি ভিড়িল না
বৃষ্টিজলেই যায় ভেসে যায় আদরের নাওখানা
আবার যখন অন্যজনমে দেখা হবে আমাদের
হাতে নেব হাত শর্তমুক্ত বন্ধু পরস্পরের
পুরনো ঝড়ের রাতটার স্মৃতি চারণ কোরো না দোহাই
যে-রাতে একটি নিরাশ্রয়েরে তুমি দিয়েছিলে পেয়-ভক্ষ্য ও মাথাগুঁজবার ঠাঁই
তোমার ভুবনে দিয়েছিলে আমায় মানুষের অধিকার
আমি পারি নাই তোমারে দিতে আমার ভুবনে যেটুকু প্রাপ্য তোমার।
তার কাছে যেয়ে পুরুষেরা পায় পেশাদারী মনোভাব
অঙ্গে অঙ্গ গ্রহণে নিখুঁত সুঠাম নারীর ছাপ
প্রণয়কেলির সময়েও সে সবল নারীরই মতো
রভসে গোঙায় শীৎকারি যায় শৃঙ্গারসম্মত
সবকিছু যেন অভিজ্ঞ হাতে রমণীয় ঢঙে সামলায়
ব্যথা পেয়ে শুধু ফোঁপায় যখনই বাচ্চাটা বোঝা যায়।

 

হার্ড টাইমস্ ন্ ন্যুইয়র্ক টাউন্

শোনেন শোনেন সাহেব-মেমগণ শোনেন দিয়া মন
ন্যুইয়র্কনামা গানে গানে করিব বর্ণন।
যথাসাধ্য ছন্দে গাইব এড়াইয়া তালগোল
দুই-চাইরমাত্রা ইদিকসিদিক বিস্তর পাইবেন ভুল।
গল্পটা তো সবাই জানেন নতুন কিছুই নাই
নতুন-পুরান ভুইলা বোতলছিপি খুলবার চাই।
পূর্ব-উপকূলের শহর উদয়াস্ত মুখর
লোকের মনে বেজায় ফুর্তি পকেটভরা মোহর।
তবু কেন বলছি হেন দুঃখের গাথা গানে
এই শহরে বাঁচার লড়াই দিগ্বিদিকের প্রাণে।

পুরান ন্যুইয়র্ক মনে করেন দেখতে-শুনতে বেশ
ওয়াশিংটন হাইটস্ থেকে শুরু হার্লেম গিয়ে শেষ।
চারিদিকে বেদম ভিড়ের দাপুটে সব মানুষ
উঠতে চাইলে উষ্টা খাইবেন বসতে চাইলে ঢুঁশ।
বলছি তবু রুদ্ধশ্বাসে এই শহরের গাথা
বাঁচতে চাইলে নেবেন উল্টে এই-না খাতার পাতা।

মনে করেন যাইবার লাগলেন কাছের গোল্ডেন গেট
রকেফেলার প্লাজা থেকে এম্পায়ার এস্টেট।
বেদম উঁচায় বানছেন শহর রকেফেলার মশাই
বুইড়া দাদু এম্পায়ারও গরিব গোনেন নাই।
কিন্তু এ-গান পুরাতনী ভাঙা রেকর্ড নয়
এই শহরে বাঁচার জন্য ঘনায় দুঃসময়।

কামলা খাটবার আশায় ছুটলেন ফজর হবার আগে
দুপুর গড়ায় খাড়া রইদে হাঁটু কঁকায় রাগে।
থাকে যদি নগদ রেস্ত মাস্তি মারো কষে
ফকিন্নিরা থাকো গিয়া স্টেটন ঘাটে বসে।
এই-না দারুণ নগরকীর্তন গেয়ে ফিরি হেথা
দারুণ দুঃসময়ে মারি গিটার-গলায় কেতা।

আরও শোনেন হাডসনবাবু বইছেন নিরবধি
মিন্যুয়ে সায়েবের স্বপন পুরাইছে জলধি।
মিটাইয়াছে বড়লোকে শহর কিইন্যা খায়েশ
আমি কিন্তু ন্যুইয়র্কটারে বেচিবাম শেষমেশ।
স্মরণ করাই সুধীজনায় নগরের ব্যামোটা
ন্যুইয়র্কের আসমানে দ্যাখো মুসিবতের ছটা।

তারচেয়ে ঢের ভালো ধোঁয়ার ক্যালিফোর্নিয়া
আরও দারুণ ওক্লাহোমার ধূলি-কালিয়া।
রকি মাউনটেনের নিন্দা ক্যামনে করেন ভাই
ন্যুইয়র্কসম নাইকো ওদের অপরাধবালাই।
এতকিছুর পরেও কেন জয়-জিন্দাবাদ
এই নগরীর খালে-নালায় খাদ এবং ফাঁদ।

খবরখেকো বইন-ভাইয়েরা ছাপেন খবরখান
শুইনা যান এই ঘাউড়া লোকের শহরস্তুতির গান।
আমার কথায় বেজার হইলে গাইলা দিবেন বিচি
ন্যুইয়র্ক নগর তালাক দিতে ভাবনা মিছেমিছি।
শোনেন শোনেন শহরবাসী কানের তুলা ফেলি
দুঃসহ এই ভাগাড় ছেড়ে পলান বেলাবেলি।
গাইছি তবু রুদ্ধশ্বাসে এই শহরের গাথা
বাঁচতে চাইলে নিয়েন উল্টে এই-না খাতার পাতা।

 

উইথ গড ন্ আওয়ার সাইড

আমার নাম ধরো ঘোড়াড্ডিম
বয়স আমার ধরো হস্তিদুগ্ধ
সাকিন কোথা জানাই দিচ্ছি সহি
মিডওয়েস্ট নামে চেনে বিশ্বসুদ্ধ

ওখানটাতেই শিক্ষাদীক্ষাসাঙ্গা
আদব-লেহাজ মফস্বলীয় প্রায়
কিন্তু থাকি এখন ভূস্বর্গেই
ঈশ্বরেরই বিশেষ ব্যবস্থায়।

ইতিহাসের পাতায় লেখা দেখি
বর্ণনাটা ব্যাখ্যা-সবিস্তারে
সেপাই গিয়া বারুদ ভরে গোলায়
রেড-ইন্ডিয়্যান ধড়ফড়ায়া হারে

হেঁইয়ো বলে সেপাই চালায় গোলা
মাছির মতো মরে রেড-ইন্ডিয়্যান
দেশের তখন বাচ্চাবয়স হলেও
সঙ্গী ছিলেন স্বয়ং ভগবান।

অন্যদিকে স্প্যানিশ-অ্যামেরিক্যান
লড়াইটারও মাহাত্ম্য সাংঘাতিক
অল্প পরেই সিভিল ওয়ার এসে
স্বর্ণাক্ষরে লেখাইল সনতারিখ

পর্বে পর্বে এই বীরেদের নাম
মুখজবানি দিলাম গর্বভরে
হস্তে তাদের উদ্যত বন্দুক
দেশপ্রেমীরে খোদায় রক্ষা করে।

এর পরেতেই বিশ্বযুদ্ধ পয়লা
আসিয়া আবার ফুরাই গেল ফুশ্
বুঝতে যেয়ে সেই যুদ্ধের যুক্তি
জীবন ফুরায় নির্বোধ নির্ঘোষ

অবোধ আমি কিন্তু শ্রদ্ধাপূর্ণ
গ্রহণ করি বীরগরিমার গাথা
কাতার-কাতার মুর্দা লাশের শুমার
করতে বারণ সদাপ্রভুই ত্রাতা।

তারপরে সেই দ্বিতীয় দুনিয়াযুদ্ধ
যখন কি-না প্রায় শেষের পথে
ক্ষ্যামা দিয়াই দিলাম জার্মানিরে
এবং হলাম দোস্ত সন্ধিমতে

হের-জার্মানি সিক্সমিলিয়ন লোক
পোকার মতন ফ্রাই করেছে প্যানে
এখন দ্যাখো গোয়েবলসেরও পাশে
ঈশ্বর আছেন সস্নেহ সন্তানে।

ন্যাংটা থেকেই ঘৃণা রাশানদেরে
এই শিক্ষাই শিখেছি ইশকুলে
ফের যখনই বিশ্বলড়াই লাগে
অ্যাকশন নিমু রুশিয়া নির্মূলে

ঘেন্না জারি রাখুম জানেপ্রাণে
কচুকাটা করুম রুশির ধড়
খুনখারাবিতে বীরের লজ্জা নাই
বীরের সহায় যেহেতু ঈশ্বর।

এখন বিপুল অস্ত্রশস্ত্র আমার
রাসায়নিক ধূলির মন্ত্রপূত
চাঁদমারি ঠিক করাই আছে আর
ঘৃণাদর্শে একটুও নই চ্যূত

একটামাত্র বোতাম দিবাম চাপ
একটিপেতেই বিশ্ব ফৌৎ হবে
কে হে তুমি জিগাইবা তারপরেও
তোমার খোদা বাঁচাইলেনটা কবে।

বেলা গেলে অপার সন্ধ্যাকালে
হরিনামের জপের ফাঁকে ভাবি
যিশুপ্রভুর হন্তারকের পুঁজি
ছিল যিশুর সদাপ্রেমের চাবি

হুদাই আমি তোমার ভাবনা করি
নিজের ভাবনা নিজেই করো মন
ভাইবা দ্যাখো প্রভুরমণ বৎস্য
জুডাসেরও জুটিয়াছিল প্রভুর সমর্থন।

নটেশাকটা ব্যাগে ঢোকাই এখন
যাবার বেলায় ভীষণ চিন্তা হয়
যেই ব্যাপারে এই বান্দার ধন্দ
মনে এলেও মুখে আনতে ভয়

কেবল একটা বাক্য কেমন করে
ঠেলেঠুলে জবান ফুঁড়ে বেরোয়
ঈশ্বর যদি রিয়্যালি বিরাজ করেন
খুনখারাবি বন্ধ করুন ভুবনবিশ্বময়।

 

হোয়্যার টিয়ারড্রপস্ ফ্যল্

ঝিরিঝিরি বাতাসের দেশকাল ভুলে
এই মৃদু পবনের বন ছেড়ে দূরে
সেই দ্বীপে যাও মন পাততাড়ি তুলে
যেইখানে অবিরল অশ্রুরা ঝরে।

ছেড়ে চলো বহুদূর ঝড়ো রাত্তিরে
সুখের সাকিন ফেলে চলো অচেনায়
আঁধির ফোকরে সেথা আচমকা আলো
রহি রহি অশ্রুর ফোঁটা ঝরে যায়।

একদা বাজায়েছিনু প্রদোষের হাসি
নীল নভোতলে বাঁশি বিরহের সুরে
হৃদয় আমার চায় গেয়ে যেতে শুধু
গোধূলির মায়াগাঢ় ঘুমের নূপুরে
বহতা চাঁদের নিচে জোছনার ছায়া
আমারে দেখাবে ঠিক তবলার বাঁয়া।

আমার ফতুর দশা জামাজুতা নাই
নিঃস্ব হয়েছি কবে গেছি রসাতল
সূর্যকিরণে ফের তোমারেই চাই
তুমিদ্বীপে অশ্রুর ঋতু অবিরল।

অশ্রুনদীর ঘাট সুদূরের পারে
প্রেমে-কামে-মমতায় মাখা পারাবারে
এসো দোঁহে গাহি গান শুভবাসনার
অন্ধের সংসারে ব্যস্ত বাজারে
ব্যাকুল বসন্ত্ রাগে বেহাগবাহারে
এসো হই চিরজীবী নির্ভরতার।

গোলাপফুলের রঙ চিরকাল লাল
হামাগুড়ি দিয়া যায় নিত্য সময়
ফিরে ফিরে দেখে যাই আমি চিরকাল
তোমার চোখের তীরে অশ্রুনিচয়।

 

ক্যুয়িন্ জেইন্ অ্যাপ্রোক্সিমেইটলি

যখন তোমার জননী তোমারে দেখে না ফিরিয়া নজরে
এবং নিজের বাপেও বোঝায় তোমার আপন বোনেরে
তুমি নাকি এক হেরে-যাওয়া হাবা বাইরে এবং ভেতরে
বেঘোর ব্যথায় তুমি কি তখন কাঁদিতে আসিবা কাছে?
দ্যাখো ক্যুয়িন্ জেইন্ এই তো তোমার রোদনসখাটা আছে।

যখন মোড়ের ফুলবেচুয়াও শোধ চায় তার ধার
যদিও ফুলের কোরকে হারাম একটুও নাই খুশবু
যখন তোমার আত্মজেরাও হরদম করে জেরবার
বেঘোর ব্যথায় তুমি কি তখন কাঁদিতে আসিবা কাছে?
জেনো ক্যুয়িন্ জেইন্ তোমার একটা কাঁদার বন্ধু আছে।

একদিন তুমি যাদের জন্য করে গেছ প্রণিপাত
সক্কলে তারা অক্কা পেয়েছে যুদ্ধে কিংবা যাতনায়
বারেবারে এই ভাগ্যপ্রহারে তোমার তো নাই হাত
ঘোর হতাশায় তুমি কি তখন কাঁদিতে আসিবা কাছে?
শোনো ক্যুয়িন্ জেইন্ তোমার একটা কাঁদার জায়গা আছে।

যখন তোমার পাড়াপড়শীরা উপযাচকের মতো
তোমার দুয়ারে স্তূপ করে রাখে নানাবিধ উপদেশ
মুলামুলি করে তাড়াতাড়ি নিতে যেনতেন সিদ্ধান্ত
অস্ফুট ক্রোধে তুমি কি তখন কাঁদিতে আসিবা কাছে?
বোঝো ক্যুয়িন্ জেইন্ ভুবনে একটা কাঁদনবন্ধু আছে।

এতকাল ছিল দোসর যাহারা দারুণ তোমার সুখে
তারাই যখন তোমার পাছা উদোম করিতে ব্যগ্র
বেদিশা তুমিও খুঁজিছ যখন নিঃশর্ত বন্ধুকে
এমন সময়ে একবারটিও ডাকিবা আমারে কাছে?
ডেকো ক্যুয়িন্ জেইন্ যথাশিগ্গির সময় ফুরায় পাছে।

 

হোয়েন্ আই পেইন্ট মাই মাস্টার্পিস্

রোম্ নগরীর রাস্তায় দ্যাখো পলেস্তারার স্তূপ
পদছাপগুলো পুরানাকালের ধূসর প্রাচীনা মানুষের
মনে হয় যেন দেখছি প্রতিটি দৃশ্যের দ্বৈরূপ
গল্পটি হিম হাড়কিড়িমিড়ি শীতকবলিত প্রদোষের।

আমার তখন ফিরবার তাড়া হোটেলের কামরায়
যেইখানে বতিচেলির ভাতিজি আসবার কথা আজ
অদ্য রজনী কাটাইব দোঁহে কুজনমুখরতায়
নিজের শ্রেষ্ঠ রচনাটার আজ গুটায়ে আনব কাজ।

কলিসিয়ামের প্রত্নবস্তু ঘুরে ঘুরে দেখে যাই
সিংহশৌর্য ঘুরে ঘুরে দেখি চিত্রার্পিত মহাকাল
বনের রাজার বোবাকালা দশা কালান্ত করুণাই
ভীষণ পরিশ্রান্ত বেচারা কালগ্রাসে বেসামাল।

স্মৃতির স্লিপারে রেলগাড়িচাকা ধাবন্ত উত্তাল
নিস্তার পেতে বেয়ে উঠে গেছি উঁচা পাহাড়ের চূড়ায়
একদিন দেখো পেয়ে যাব ঠিক ছন্দোবদ্ধ বোলচাল
যখন তুলির শেষ পোচ দেবো আমার শ্রেষ্ঠ রচনায়।

ছেঁড়া ময়লা ও রঙ্গিলা এক পালতোলা নৌকায়
বেজায় হাওয়ায় দিনশেষে ফিরি কোকাকোলাদুনিয়ায়

ছেড়ে আসি রোম্ নয়া নগরীর অভিমুখে দেই উড়াল
বিকট ঝাঁকুনি দিয়া জাহাজটা ব্রাসেল্স নগরে নামে
যেখানে পাদ্রী-প্রমীলা মিলিয়া গাইছে শুভেচ্ছাচৌতাল
সকলেই ছিল উদ্বেলিত আমার ডানে ও বামে।

ক্যান্ডিচোষা সাংবাদিকেরা দাঁড়ায়ে রয়েছে জটলায়
নিরাপত্তার কর্মীবাহিনী নিরখিয়া যায় বেতালা ভিড়ের বন্যা
জানি আমি এই দৃশ্যের গোছা পাল্টাবে একঝটকায়
যেইদিন শেষ করিয়া আনিব আমার শ্রেষ্ঠ রচনা।

 

নকিন্ ন্ হ্যাভেন্’স্ ডোর্

বুক থেকে ব্যাজ্ খুলে নাও মাগো এইবার
আমার আর এটা লাগবে না কাজে কোনো
সন্ধ্যায় দ্যাখো আলোর সঙ্গে নিভিতেছে চারিধার
সফর আমার ফুরায়েছে মাগো শোনো —

কবরতোরণে এসে দাঁড়ায়েছি আমাকে গ্রহণ করো
কবরতোরণে এসে দাঁড়ায়েছি আমাকে গ্রহণ করো
কবরতোরণে এসে দাঁড়ায়েছি আমাকে গ্রহণ করো
কবরতোরণে এসে দাঁড়ায়েছি আমাকে গ্রহণ করো

বন্দুক রাখো ঘরের কোণেতে ফেলিয়া
মারণাস্ত্রের শৌর্যবীর্যে আমার কি যায় আসে
মরণের মেঘে আমারে ফেলিছে ঘেরিয়া
আমার সময় নাই মাগো শোনো বাঁশিসুরধারা বাতাসে

মাটির কবাটে কড়া নাড়িতেছি কবর গ্রহণ করো
মাটির কবাটে কড়া নাড়িতেছি কবর গ্রহণ করো
মাটির কবাটে কড়া নাড়িতেছি কবর গ্রহণ করো
মাটির কবাটে কড়া নাড়িতেছি কবর গ্রহণ করো

নক্, নক্, নকিন্ অন্ হ্যাভেন্’স্ ডোর্
নক্, নক্, নকিন্ অন্ হ্যাভেন্’স্ ডোর্
নক্, নক্, নকিন্ অন্ হ্যাভেন্’স্ ডোর্
নক্, নক্, নকিন্ অন হ্যাভেন্’স্ ডোর্

 

অ্যা হার্ড রেইন্’স্ অ্যা-গ্যনা ফ্যল্

ওরে, কই ছিলি তুই খোকা আমার, নীলনয়না বাছা আমার কই ছিলি তুই বল?
কোন বিরানায় ছিলি রে তুই তিফিল সোনামানিক আমার কলিজাগাছের ফল?
ছিলাম পড়ে মুখ থুবড়ে বারো পাহাড়ের খাঁজে
হামাগুড়ি দিয়া হাঁটতেছিলাম অক্রবক্র ছয় সড়কের ভাঁজে
যেতে যেতে দেখি ত্রিলোক-তমসা সাতটি বিষাদবন
অতিকায় বন পেরিয়ে পেয়েছি মরা সাগরের স্তন
হাজার হাজার মাইলের পারে গোরস্তানের মুখে
থেমেছি যখন বৃষ্টির তির বিঁধছিল দুই চোখে
উপর্যুপরি বর্শাফলায় ভীষণ উতলা বাঁধভাঙা বর্ষণ।

ওরে, কেমন দেখলি দুনিয়াদারি, নীলনয়না জাদু রে তুই কি কি দেখলি বল?
কোথায় কেমন বাও বুঝলি তিফিল নয়নপুৎলা আমার কলিজাগাছের ফল?
দেখেছি যে এক দুধের শিশু বনুয়া ভালুকে ঘেরা
সোনায়-বাঁধানো সড়কে দেখেছি নাই জনমানুষেরা
দেখেছি যে এক গাছের শাখায় তাজা রক্তের ধারা
মানুষ দেখেছি ত্রিশূলমিছিলে হিংসাপাগলপারা
দেখেছি একটা শাদা মই ঘিরে খলবল-করা পানি
বক্তা দেখেছি বেশুমার তার জিভকাটা কাৎরানি
খুদে শিশুদের দু-হাতে দেখেছি মারণাস্ত্রের মর্মর
দুনিয়াভাসানি বৃষ্টির তোড়ে ভেসে যেতেছিল চরাচর
ব্যাপক বর্ষাধারার কবলে দেশগাও দৌড়ানি।

ওরে, কি শুনে এলি খোকা আমার, দূর দেশ ঘুরে কেমন কাহিনিকিচ্ছা আনিলি বল?
কোন রূপকথা শুনে এলি তুই তিফিল তুর্কিঘোড়াটা আমার কলিজাগাছের ফল?
শুনে এসেছি ভীষণ বিদারী তীব্র বজ্রশব্দের শত সতর্কসংবাদ
ঢেউয়ের আওয়াজে বেবাক-ডুবানো মহাপ্লাবনের নাদ
দুন্দুভিঢাক বাজিছে শুনেছি আগুনঢুলির হাতে
বেশুমার লোকে ঠোঁট নেড়ে যায় কারো কান নাই তাতে
একজন করে ভুখা অনশন বাকি সব করে রব
সে-দেশী শিল্পী মরে যায় তবু মানেনাকো পরাভব
ভাঁড়ের বিকট কান্না শুনেছি কানাগলিকোণে সন্ধ্যায়
বিউগ্যল্ যেন ফোঁপাইয়া যায় ক্লিন্ন যোজনগন্ধায়
মিসমার হয়ে যেতেছিল তবু বর্ষণে গোটা দুনিয়া
বৃষ্টির সনে বজ্রঝলকে শিহরণক্ষরা হিয়া।

ওরে, কার কার সনে দেখা হলো তোর, খোকনসোনা মানিক রে তুই কারে দেখে এলি বল?
কোন লোকটার কেমন গল্প বল দেখি তুই তিফিল ময়নাপাখিটা আমার কলিজাগাছের ফল?
দেখলাম এক বাচ্চাকে তার মৃত ঘোড়াটার পাশে
শ্বেতাঙ্গ সেই লোকটা হাঁটছে সারমেয় নিয়া ঘাসে
দেখলাম এক যুবতীকে যার ঝলসানো তেজী তনু
তরুণীর সনে দেখা হলো যার দুইহাতে রংধনু
দেখলাম এক প্রেমিক পুরুষ প্রেমাবেগে প্রাণ যায় যায়
আরেক পুরুষ দেখলাম যার বুক ভরে আছে ঘৃণায়
এরই ফাঁকে ফাঁকে দেখে গেছি তিরতীক্ষ্ণ বর্ষাপাত
দেখে গেছি শুধু অন্ধ নয়নে নেমেছে আঁধার রাত।

ওরে, এখন তবে কি করবি তুই, নীলনয়না বাছা আমার করবি কি তুই বল?
কোন কলে তুই জীবন কাটাবি তিফিল সোনামানিক আমার কলিজাগাছের ফল?
ফিরে যাব ফের ঠিক করেছি বৃষ্টি শুরুর আগে
হেঁটে যাব ওই বিষাদের বনে বিপন্ন অনুরাগে
যেখানে ব্যাপক জনঅরণ্যে রিক্তেরা দলে ভারী
বিষের বাসনে ধুঁকিছে যেখানে বিষণ্ণ সংসারী
যেখানে কেবল কয়েদখানার মৃত্যু-উপত্যকা
গারদে এবং ঘরে-বন্দরে হন্তারা পায় মওকা
যেখানে ক্ষিধের কদর্য রণ আত্মার বিস্মরণ
যেখানে বর্ণ কৃষ্ণ এবং মানুষেরা অগণন
তাদের গল্প তাদের ভাবনা তাদের কথা তাহাদের নিঃশ্বাস
উঁচা পাহাড়ের চূড়ায় উঠিয়া গাইব সেসব জীবনের উদ্ভাস
অতঃপর আমি নিমজ্জনের পূর্বে ঢেউয়ের শিখরে দাঁড়াব সটান
গাইবার আগে বুঝে নেব ভবা গাহিতেছি কার গান
এবং তখনও বুনোবৃষ্টির বলশালী বরাভয়
বেগে বয়ে যাবে তিরের ফলারা ব্যাকুল ক্রমান্বয়।

  • সংগৃহীত ফোটোগ্রাফ অবলম্বনে ব্যানার বানিয়ে দিয়েছেন গ্র্যাফিক আর্টিস্ট উসমান গনি

Save

Save

Save

Save

Save

Save

Save

Save

Comments

comments

জাহেদ আহমদ

জাহেদ আহমদ

অনিয়মিতভাবে লেখালেখিলিপ্ত, মূলত নোটক, মুখ্যত প্রকাশবাহন ফেসবুক

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: , , , ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি