সাম্প্রতিক

বাবার প্রস্থান । অনুবাদ: আফসানা বেগম

নিরিবিলিতে গ্রামের রাস্তার পাশে লম্বালম্বি সারি করে বাড়িগুলো দাঁড়িয়ে আছে। দেয়ালগুলোতে ফুল-ফল-লতাপাতা আঁকা। ফুলে উপচে পড়া লতা এমনভাবে বেণি পাকিয়ে ঝুলে আছে যেন সামনের ছাদ প্রায় দেখাই যায় না। ফেলনা ইট দিয়ে তৈরি বেড়া বেয়ে উঠেছে টমেটো আর ডেইজির গাছ। বাগানের একদিকে ঘেরা দেয়া জায়গায় হাঁস-মুরগির খাঁচা আর কিছু শূকর; কিন্তু যে বাড়িটা থেকে সে বেরিয়ে এসেছিল সেখানে শূকর থাকত না।

পোস্ট অফিসটা পাতলা লম্বা লম্বা কাঠের টুকরো দিয়ে বানানো। ছাদ থেকে ঢেউ ঢেউ ছোট পর্দা ঝোলানো। আর পোস্টঅফিসের চিহ্ন তো যে কোনো ভাষায়, যে কোনো জায়গায়ই চেনা যায়। যদিও তখন এমন একটা সময় যখন এয়ারমেইল ছিল না। তাই এয়ারমেইলের চমৎকার পাখিটি নয়, ফিতা দিয়ে বাঁধা একটা বাঁকা বাঁশির ছবি ছিল। এখান থেকে দেখলে মনে হয়, বাঁশিটি রাখতে গিয়ে নামের অক্ষরগুলোর আর জায়গা কুলোয়নি। সামনের বেঞ্চে এক মহিলা জবুথুবু হয়ে বসে মটরশুঁটির খোসা ছাড়ায়; গায়ে লম্বা ঝুলের জামা আর মাথায় একটা কালো স্কার্ফ বাঁধা। দাঁতবিহীন মুখ এমনভাবে বন্ধ করে রাখে যে দেখলে মনে হয় ঠোঁট নেই। আচ্ছা, তার বয়স কত হতে পারে?

এমন একজনের বয়স আন্দাজ করতে হবে যে কখনও ইস্ট্রোজেন, সূর্যের তাপ বা চামড়ার ভাঁজ থেকে বাঁচার ক্রিম ব্যবহার করেনি আবার চুলে বিভিন্ন লালচে-বাদামি রঙও লাগায়নি। মহিলাটি ছেলেটির জন্য গোছগাছ করে রেখেছিল। শীতের কাপড়ই দিতে হয়েছিল কারণ ছেলেটির অন্য কোনো কাপড় ছিল না। মহিলাটি যাওয়ার ভাড়াটা দেয়া থেকে শুরু করে ফুটো হয়ে যাওয়া মোজা, টুপি, কোট আর যা যা আছে, সবই সেলাই করে দিয়েছিল। বেড়াতে গেলে পরবে অথবা পরে কখনও লাগবে ভেবে কেউ শখ করে বানিয়ে না দিলে তের বছর বয়সের ছেলের কাছে হয়ত যেমন-তেমন একটা কোটও থাকে না।

ঘোড়ার গাড়িগুলো ঘণ্টা বাজাতে বাজাতে শহরের রাস্তা বেয়ে চলে যায়। ওয়াগনগুলো ধীরে ধীরে দুলে দুলে রাস্তা ছাড়িয়ে রাস্তার ধারের পায়ে চলা পথের উপর চলে আসে। গাড়ি আর বাস এখানে এসে পৌঁছতে যেন আরও এক শতাব্দী বাকি। ছেলেটি স্যুট আর টুপিটা পরে, হাতে ব্যাগ নিয়ে একটি ঘোড়ার গাড়িতে লাফিয়ে উঠে পড়ে। বুটগুলো এক আত্মীয়ের কাছে থেকে ঠিক করে নিয়েছে যার আগে জুতার ব্যবসা ছিল। তাদের পরিবারেই একজন জুতা তৈরির ব্যবসার সাথে জড়িত। ছেলেটি তার দেখাদেখি জুতা বানানোর কায়দাটা শিখতে পারত কিন্তু সে ঠিক করেছিল ঘড়ি বানানো শিখবে। বাসার লোকেরা তাকে ম্যাগনিফাইং গ্লাস, ছোট্ট স্ক্রু-ড্রাইভার আর স্ক্রু, চুলের মতো সরু স্প্রিং আর মাছের আঁশের তৈরি ঘড়ির ডায়ালের ঢাকনা এনে দিয়েছিল। খুঁজলে তার ব্যাগেই হয়ত সেসব পাওয়া যাবে। ধর্মীয় কিছু বই-টই, একটা শাল আর কিছু মাফলারও থাকতে পারে। মহিলার এসব গুছিয়ে দিতে ভুল হওয়ার কথা না। মাত্র তের বছর বয়স ছেলেটির। ধর্মীয়ভাবে তাকে একজন ’পুরুষ’ ঘোষণা দেয়ার আগপর্যন্ত বাড়িতে সে বেশ ভালোই ছিল; অনায়াসে খাচ্ছিল-দাচ্ছিল, ঘুরে বেড়াচ্ছিল।

স্টেশনে এসে দেখে পাশের বার-এ জিপসিরা বসে গান গাচ্ছে। রাতের বেলা। ছেলেটি পাশেই  ব্যাগ নিয়ে ট্রেনে ওঠার অপেক্ষায় ছিল। ছাড়ার আগে শরতের ঠাণ্ডার ভেতরে ট্রেন বাষ্পের কুয়াশা ছাড়ল। মহিলাটি হয়ত তার সাথে স্টেশন পর্যন্ত এসেছিল, তবে না আসার সম্ভাবনাই বেশি। ছেলেটি যখন হাত-পা দিয়ে আঁকড়ে ধরে উঁচু ঘোড়ার গাড়িতে উঠছিল সেটাই ছিল তার সাথে শেষ দেখা। সে আর কখনই ছেলেটিকে দেখেনি। পরিবারের প্রধান, দাড়িওলা মানুষটি অবশ্য স্টেশনে ছিল। ট্রেনের টিকেট আর জাহাজের ভাড়ার টাকা সে-ই দিয়েছিল। আয়োজন করে বিদায় জানানো তো হলোই না, আর মদে ডুবে থাকা জিপসিদের হই-হল্লার মাঝে দুঃখিত হওয়ার কোনো সুযোগও পাওয়া গেল না। তাদের উন্মত্ততায় ভাঙাচোরা বার উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল; ঠিক যেন শীতের প্রকোপে রাতের অন্ধকারে জ্বালানো আগুনের আভা। দাড়িওলা মানুষটি তার ছেলের সাথে সমুদ্র বন্দর পর্যন্ত যাচ্ছে। এটাই তার শেষ দায়িত্ব। ছেলেকে জাহাজের নিচের তলায় কোথাও একটা জায়গা করে টিকেটটা তাকে বুঝিয়ে দেবে। আর দেবে কয়েক টুকরো কাগজ যা কিনা ভবিষ্যতে ছেলেটির পরিচয় জানাবে।

রাস্তায় খাওয়ার জন্য আমরা ধোঁয়ায় সিদ্ধ করা পাপরিকা সসেজ আর কিছু পানীয় নিয়েছিলাম। সবকিছু মিলিয়ে জিনিস এত বেশি হয়ে গেল যে একটা গাড়িতে আটছিল না, তাই মনে হলো ট্রেনেই যাওয়া যাক। ছড়িয়ে থাকা শটগান হাতে আটকানোর ভারী বেল্ট আর চামড়ায় খোদাই করে নকশা করা বন্দুকের খাপগুলোর মাঝখানে বসে আমরা গান-বাজনা করছিলাম। একজনের গানের উত্তরে আরেকজন কে গান ধরবে, জানতে আমরা প্রতিবার বোতল ঘুরিয়ে মুখটি কার দিকে তাক করে তা দেখার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। ফ্রান্সের লোকটির কাছে বুড়ো আঙুলের মাপে বানানো রুপার একটি গোল খাপ ছিল যা আঙুলে পরে সে রাজধানীর হোটেলে কেনা লম্বা ডাঁটাওলা ছুরি দিয়ে সসেজগুলো সহজেই টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলল। ইংরেজটি কবেটের রুরাল রাইডস—

বাবা তার সাথে চিৎকার করে কথা বলছিল আর সপ্তাহের বেতনটা তার দিকে এমনভাবে ছুঁড়ে দিয়েছিল যেন তার বেতন পাওয়ার কথাই ছিল না। আমি বুঝতে পেরেছিলাম, বাবা চাইত সবাই তাকে ভয় পাক। একটা শিশু খুব সহজেই ভয় পেতে শেখে আর যে ভয় দেখায় তার প্রতি অনীহা আর ঘৃণাও জন্মায় খুব সহজে…

এর একটি সংখ্যা পড়তে শুরু করেছিল কিন্তু সেটা তার কোলের উপরেই পড়ে থাকল আর সে ডুবে গেল সাদা লিকারে। আগে কখনো দেখেনি এমন এক মেয়েকে ক’দিন বাদে বিয়ে করতে যাওয়ার আনন্দে সে তখন বিভোর। মানুষজন অস্থির হয়ে কম্পার্টমেন্টের ভেতরে-বাইরে যাতায়াত করাতে বাইরের তরতাজা বাতাসের ঝাপটা বারবার গায়ে লাগছিল। কেউ কেউ করিডোরের জানালায় কপাল ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। বাইরে কেবল গাছপালা, আঁকাবাঁকা নদীতে ডুবে ডুবে পঁচতে থাকা নৌকা, রঙ-রূপ অস্পষ্ট হতে থাকা পূর্ব ইউরোপের গ্রীষ্ম। আর এত মেঘলা যেন সমস্ত কিছুই সূর্য থেকে অনেক দূরে।

বাইরের লোকেরা  সবার সাথে যোগ দিতে আবার ভেতরে ফিরে আসে; কেউ কাউকে এক বোতল ওয়াইন বের করার অনুরোধ করছে। কেউ আবার কাউকে লম্বা লেন্সওলা নতুন ক্যামেরায় কী করে ছবি তুলতে হয় তা বেশ মনোযোগ দিয়ে বোঝাচ্ছে। শহরের স্টেশনে রেইল লাইনের ওপর দিয়ে মালগাড়ি ফ্যাক্টরিতে বানানো কোনো জিনিস বোঝাই করে অথবা ফেলে দেয়া কোনো কিছু নিয়ে চলে যাচ্ছে। যেখান থেকে আমরা আসছি তার উল্টোদিকে তেমনই কোনো জায়গায় চলে যাচ্ছে। মালগাড়ির করিডোরে স্যুটকেস রেখে তার উপরে মানুষ বসে আছে। একজন কৌতূহল নিয়ে আমাদের কম্পার্টমেন্টে কোনোভাবে জায়গা হবে কি না দেখছে। কেউ তার ভাষা বলতে জানে না আর সে-ও জানেনা আমাদেরটা কিন্তু আশ্চর্য হলেও সত্যি যে ওয়াইন আর সসেজ মুহূর্তের মধ্যে তার সাথে আমাদের যোগাযোগ করিয়ে দেয়। সে বুঝুক আর না বুঝুক, আমরা তার সাথে কথা বলছিলাম। সে ঘাড় নাচিয়ে কখনও আন্তরিকতা আবার কখনও না বোঝার অসহায় ভাব দেখিয়ে একটু হাসে। অপরিচিত মানুষদের মাঝে এভাবে আটকে যাওয়াতে তার নিজেকে বোধ হয় বোকা বোকা লাগছে। সে শুধু পানীয়ের গ্লাসটা তুলে ধরে মাঝে মাঝে এখানে থাকাটা জানান দিচ্ছে যেটা বিদেশিরা সব সময় করে। এরপর শিকার বিভাগ থেকে পাওয়া ম্যাপ নিয়ে আমাদের মধ্যে যখন তর্কাতর্কি লেগে গেল আমরা তার কথা ভুলেই গেলাম। ম্যাপটা সামাজিক বা ভৌগলিক নয় তবু আমরা যেদিকে যাচ্ছিলাম তার পানি বা জঙ্গলের অবস্থানগুলো বোঝাচ্ছিল। আমি দেখলাম

সে একে একে আমাদের সবাইকে তীক্ষèভাবে লক্ষ করছে। অচেনা কতকগুলো অভিব্যক্তি দেখে আন্দাজ করার চেষ্টা করছে আমরা কী ধরণের জীবন থেকে উঠে এসেছি। বোঝার চেষ্টা করছে সে কি আমাদের হিংসা করবে, না কি আমাদের থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেবে, না কি আমাদের সাথে এক হয়ে আনন্দ-ফুর্তিতে মেতে থাকবে। তারপর হঠাৎ সে ঘুমিয়ে পড়লে আমি তাকে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলাম।

শিকারের জন্য আমরা যে লজ-এ উঠব সেখানকার কেউ গ্রামের স্টেশনে আমাদের নিতে আসেনি। শরতের হিমশীতল রাত। কোনোরকমে দাঁড়িয়ে ছিলাম আর শীতে আমাদের পা ঠকঠক করে কাঁপছিল। সেখানে কোনো স্টেশন মাস্টার নেই এমনকি কোনো টেলিফোন বুথ নেই। থাকলেও কাকে আর আমরা ডাকতাম? কথা হয়েছিল পুরো ব্যবস্থাটাই তাদের, সব জায়গায় একজন গাইড আর দোভাষী আমাদের সাথে থাকবে। এ কারণেই আমরা লজের কোনো টেলিফোন নাম্বার সাথে রাখার প্রয়োজন মনে করিনি। অন্ধকারে একটা ভাঙামতো কাঠের ঘর দেখা যাচ্ছে। হলুদ আলোয় অস্পষ্ট হয়ে আছে। বেশ জোরে শব্দও শোনা যাচ্ছে- নিশ্চয়ই একটা বার! আমাদের দলের

ছেলেদের মধ্যে যাদের কোনো ক্লাবের সদস্যপদ ছিল তারা বারের দিকে রওনা দিল। এ ধরণের সদস্যপদ নিয়ে যে কোনো বারে ঢুকে যাওয়া যায়। মেয়েরা অনিশ্চয়তায় ভুগছিল যে তাদের স্বাভাবিকভাবে মেনে নেয়া হবে কি না। কোথাও দেখা যায় ইচ্ছে করলে তারা তাদের বুক খুলে যেতে পারে আবার কোথাও লম্বা প্যান্ট পরা রীতিমতো অভদ্রতা। যাই হোক প্রতিটি দেশের নিজস্ব নিয়মকানুন তো মানতেই হবে। ইংরেজ লোকটি ফিরে এসে জানাল যে ছেলেরা বারের ভেতরে দুর্দান্ত সময় কাটাচ্ছে। মনে হচ্ছিল যেন একটা উৎসব! খোঁচা খোঁচা দাড়ির কৃষ্ণাঙ্গ মাতালদের সাথে তাদের বেশ ভাব হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। ট্রেনের ফেলে যাওয়া বাষ্পের কুয়াশার ভেতরে আমরা আমাদের ব্যাগগুলোর উপরে বসে ছিলাম। চারদিকে অন্ধকারের জাল আর বার থেকে ঠিকরে আসা হলুদ আলোয় সবকিছু অস্পষ্ট লাগে। আমাদের পৃথিবী প্ল্যাটফর্মের শেষ মাথায় গিয়েই যেন হঠাৎ ফুরিয়ে গেছে। তারপর ওদিকে আর কিছু নেই। বলা নেই কওয়া নেই, কোনো উদ্দেশ্যবিহীন যাত্রার এক অচেনা মোড়ে যেন ঠায় দাঁড়িয়ে আছি।

স্টেশনের সামনে পুরনো এক গাড়ি হঠাৎ উদয় হলো। লজের ম্যানেজার রেসের গাড়ির ড্রাইভারের মতো তড়িঘড়ি নেমে এলো। ব্যাজ আর পালক লাগানো সবুজ উলের টুপি তার মাথায়। ভালোই হলো, সে আমাদের ভাষাতেই কথা বলে। বার থেকে দলের ছেলেরা বেরিয়ে এলে ম্যানেজার জানাল, এখানে খুব সাবধানে থাকতে হবে। বেশীর ভাগ জিপসিরা নাকি কোনো কাজ করে না, কেবল চুরি করে। আবার অনেক বাচ্চা জন্ম দেয় যেন সরকার সবসময় তাদের আরও বেশি পয়সা দিতে থাকে।

nadine

চাঁদটা এখন তার পেছনে চলে গেছে। এখানে আসার প্রথম যে জিনিসটা তার নজরে এলো, তা হলো দক্ষিণ গোলার্ধে চাঁদ দেখা যাচ্ছে উল্টোদিকে। সূর্য অবশ্য পূর্ব দিকেই উঠছে আর পশ্চিম দিকে ডুবছে। কিন্তু এটা তো ঠিক, যে আকাশ তার গ্রামকে ঢেকে রেখেছে সেই একই আকাশ সারা পৃথিবীকে মুড়িয়ে রেখেছে। তবে চাঁদ কেন অন্য দিকে চলে গেল? রাতে আকাশের দিকে তাকালেই বোঝা যায় জায়গাটা গ্রাম থেকে কত দূরে!

জাহাজে আসতে আসতে সে কিছু ইংরেজি শব্দ শিখে ফেলেছে। তার চেয়ে এক-আধ বছরের বড় একজনের সাথে দেখা হয়ে গিয়েছিল। তাকে এমন একটা ট্রেনে উঠিয়ে দিয়েছে যেটা দু’দিন ধরে শুধু পাহাড়-পর্বত আর লতা-গুল্মে ঠাসা মাঠের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল। তারপর সবার শেষে পেয়েছিল মরুভূমি। অবশ্য জাহাজ থেকে নামার আগেই দক্ষিণে চলে আসার কারণে স্যুট গায়ে তার প্রচ- গরম লাগছিল। একজন আত্মীয়ের কাছে ভরসা পেয়ে সে এই উঁচু মালভূমির সোনার খনিতে এসেছে। আত্মীয়টি চিঠিতে তার আসার খবর জেনে আনন্দ প্রকাশ করেছিল। কিন্তু শেষে তার বউ বিষয়টি খোলাসা করে জানায়, তারা আসলে এত গরিব যে তাকে থাকতে দিতে পারবে না। কী আর করা! তার কাছে ঘড়ি বানানোর যা সরঞ্জাম ছিল সব নিয়ে সে খনির দিকে রওনা দিল। আর তারপর? সে মাঝে মাঝে খনির শ্বেতাঙ্গ শ্রমিকদের দাঁড় করিয়ে তাদের সাথে কথা বলত, ট্রলির চাকাগুলোর ভারসাম্য ঠিক করে দিত, আর তার ফাঁকে তাদের ঘড়িতে সমস্যা থাকলে ঠিক করে দিত। কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিকদের থাকার জায়গায় গিয়ে সে দেখে তারা দাসত্বের সেকলে নতুন করে ধরা দিতে ঘড়ি ব্যবহার করার সুযোগ পেয়ে বেশ গর্বিত। ঘড়ি তাদের সাহায্য করত যেন সময়মতো কাজে যেতে পারে। এখন যদিও এটাই তাদের নিজেদের দেশ কিন্তু তারা সবাই তারই মতো অন্য দেশ থেকে এসেছে। তার মতো তাদেরও ইংরেজি শব্দের ভাণ্ডার সীমিত। খনি শ্রমিকদের নির্দেশ দেয়ার জন্য ইংরেজরা যে সংক্ষিপ্ত শব্দগুলো ব্যবহার করে সে সেসব শিখতে শুরু করল। যেমন যখন তারা বলে ’ফানাগালো’, তখন শ্রমিকরা বুঝত যে তাদের যে কাজটি করতে বলা হচ্ছে তা কীভাবে করতে হবে তা দেখিয়ে দেয়া হচ্ছে। শব্দগুলো শুধু আদেশ দেয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহার হতো। শুরুতেই সে বুঝে গিয়েছিল যে সে গরীব আর অচেনা মানুষ হলেও শ্বেতাঙ্গ আর কমান্ডারদের মতো ইংরেজিকে ভেঙে ভেঙে বলতে পারে বলে তাকে কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিকরা বেশ উঁচুদরের মানুষ বলে ভাবত। কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিকদের ঘড়িগুলো এত সস্তাদরের যে নষ্ট হলে ঠিক করার আর কোনো মানে হতো না। ঠিক করতে সে যত টাকা চাইত তত টাকায় তারা আরেকটা নতুন ঘড়ি কিনে ফেলতে পারত। তাই সে সামান্য কয়েকটা’ জোবো’ পকেট ঘড়ি নিয়ে শ্রমিকদের এলাকায় ফেরি করে বেড়াত। ক্রেতা কৃষ্ণাঙ্গ হওয়াতে শ্বেতাঙ্গ ঘড়িবিক্রেতা সহজেই একজন ব্যবসায়ীর মর্যাদা পেয়ে গেল। আর তারপর? জোবো ঘড়িতে ছিল গোল, মোটা আর শক্ত ধাতব ডায়াল, টিকটক শব্দটিও খুব জোরালো। সে এক কোণে ঢেউটিনের ছাদের নিচে ঘড়ি ঠিক করার দোকান দিয়ে বসল। সেখানে নানারকম ঘড়ি আর বাগদান বা বিয়ের আঙটিও বিক্রি হতো। খনির শ্বেতাঙ্গ মানুষদের নিয়ম ছিল যে তারা বিয়ের প্রতিজ্ঞা করার সময় আঙটি দিয়ে কথাটি পাকাপোক্ত করত। আঙটিটি তারা কিনত কিস্তিতে। তারা মাসে মাসে যা পারে তাই দিত; মাসের শেষ শুক্রবারে যখন তারা বেতন পেত। সেদিন তাদের গায়ে ব্র্যান্ডির গন্ধ থাকত। হোটেলের বার থেকে ব্র্যান্ডি খেয়ে তারপর আঙটির কিস্তির টাকা জমা দিতে আসত তারা। সে নিজেনিজেই এসবের হিসাবনিকাশ রাখা শিখে গিয়েছিল। কেউ কোনো মাসে টাকা না দিলে সে সেটা খেলাপী ঋণ হিসেবে লিখে রাখত। তার তিরিশ বছর বয়সের জীবনে সেটাই হতো এক ধরণের ব্যর্থতা।

ততদিনে সে বিয়ে করে বাচ্চাকাচ্চার বাবাও হয়ে গিয়েছিল। হয়ত গ্রামের লোকেরা তার জন্য একটি মেয়েকে ঠিক করে রেখেছিল। তাদেরই কারো মেয়ে যাকে সে তার নিজের ভাষায় ভালবাসতে পারবে, যে তার জন্য পছন্দমত রাঁধতে পারবে। এটা ছিল গ্রামের নিয়ম। তাকে সম্ভবত কিছু টাকাও নিতে বলা হয়েছিল। কিন্তু ব্যবসায়ী হওয়ার আগে সে যেখানে থাকত, সেই দোকানের পেছনে ফেলে আসা ছোট্ট টিনের কুঁড়েঘরটির কথা যদি তারা জানত তবে নিশ্চয়ই সেখানকার হোটেলে, যেখানে খনির শ্বেতাঙ্গরা পান করে আর কৃষ্ণাঙ্গদের রান্না করা খাবার খায়, সেখানে তাকে রাখার কথা কল্পনাও করতে পারত না। সে গান শিখতে শুরু করল যেন সহজেই উচ্চবংশীয় সমাজের ভেতরে ঢুকে যেতে পারে। আরও বড় নতুন দোকান করল। দোকানের পেছনে নতুন অফিসের বিশাল কাঁচ মোড়ানো টেবিলের উপরে সাইনবোর্ড লাগানো হলো, ’ঘড়ি, সোনা এবং রূপার গয়না প্রস্তুতকারী’। তার পাশে ডিম্বাকৃতি সোনালি ফ্রেমে বাঁধানো উচ্চবংশের চিহ্নস্বরূপ এ্যাপ্রন গায়ে তার একটা ছবি। এর মধ্যে সে আরও একটা চমক দেখাল, একটি মেয়েকে পটিয়ে ফেলল যার মাতৃভাষা ইংরেজি। তারপর যে গ্রামে চাঁদ অন্য দিকে দেখা যায় সেখান থেকে একটি বিয়ের উপহার এসে পৌঁছল; সিল্কের সুতোয় কারুকাজ করা ফুল, লতা-পাতায় ভরা একটি লম্বা ছাইরঙা কাপড়। সেই যে পোস্ট অফিসের সামনে যে মহিলা বেঞ্চে বসে থাকত সে-ই একসময় এই অনুষ্ঠানের কথা ভেবে বানিয়ে রেখেছিল। বিয়ের সময় আসতে আসতে ততদিনে সে অন্ধ হয়ে গিয়েছে। তার হয়ে অন্য কেউ উপহারটির সাথে একটি চিঠি লিখে তা জানিয়েছে। মহিলাটি একটি সাজানো নিষ্ঠুরতার শিকার। ছেলের সেই ফেলে আসাকেই কি তাকে বাস্তব বলে মেনে নিতে হয়নি? কিন্তু বাস্তবের চেয়েও সত্য যে তার কপালে ছিল শুধু সীমাহীন ভোগান্তি। চোখে নিশ্চয়ই ছানি পড়েছে, গ্রামে কোনো ডাক্তারও নেই। নাতি নাতনিরা হঠাৎ একদিন তাদের দাদির কাপড়ের আলমারিতে বালিশের খোলের মধ্যে ল্যাভেন্ডারের গন্ধমাখানো তোয়ালায় প্যাঁচানো এই কারুকাজ করা কাপড়টি পেয়েছিল। হয়ত তারা এটাকে তাদের খেলনা পুতুলের ঘরের কার্পেট হিসেবে কিছুদিন বিছিয়েও রেখেছিল।

ইংরেজ বউটি পিয়ানো বাজাত আর বাচ্চারা তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে গান গাইত কিন্তু সে গান ধরত না; সে আসলে তেমন করে শেখেইনি। তার ব্যাপারে বউটি শুনেছিল যে সে নাকি উচ্চবংশীয়দের অনুষ্ঠানে দরাজ গলায় টেনিসনের ব্যালাড গেয়েছিল। বউ তার বান্ধবীদের সাথে তাকে নিয়ে প্রায়ই হাসাহাসি করত। সে কি আর জানত টেনিসন কে! ততদিনে তার ছোট্ট মেয়েটি অফিসে ঝোলানো বিরাট উত্তল কাঁচের নিচে তার ছবিটির ব্যাপারে প্রশ্ন করতে আরম্ভ করল। সে অভিজাতদের সভায় যাওয়া বন্ধ করে দিল। সেরকম কোনো সভা থেকে ফিরে সে যখন গ্যারাজের দেয়াল পেরিয়ে ভেতরে ঢুকত, বারবার তাকে নানান প্রশ্ন করে হেনস্থা করা হতো। সে আসলে অভিজাত বংশীয় পরিচয়টা ভালোয়ভালোয় ছেড়ে দিলেই পারত। কারণ যতবার সে সভা থেকে ফিরে অন্ধকারে শোবার ঘরে ঢুকত, তার গায়ের হুইস্কির গন্ধ পেয়ে বউ চরম বিরক্তিতে মুখ ঘুরিয়ে নিত। তার পুরনো ট্রাঙ্ক ভরা ঘড়ি ঠিক করার স্লিপ, বংশ পরিচয়ের চিরকুটগুলো আর তার মাথার টুপি যদি সে আগেভাগেই গায়েব করে দিত তাহলে বাচ্চারা সেগুলো কোনোদিন দেখতে পেত না। ক্ষমা চাওয়ার নির্দিষ্ট দিনে সে জুইশদের প্রার্থনার জায়গায় যেত। তার আত্মীয়দের মৃত্যুবার্ষিকীতে, যাদেরকে তার বউ কখনও দেখেনি, সে সেখানে মোমবাতি জ্বালিয়ে ব্রত পালন করত। তেজের সাথে প্রশ্ন উঠত, এরা কারা যাদের জন্য সে ব্রত পালন করে? স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়ার মধ্যে বউটি জেনে গিয়েছিল যে তারা ছিল মূর্খ আর নোংরা। বউটি হয়ত এ ধরণের মানুষদের বিষয়ে কোথাও কিছু পড়েছিল যা সেই মুহূর্তে তাকে আঘাত করার মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিল; তুমি চুলার পাশে রসুনের গন্ধের মধ্যে জীব-জন্তুর মতো পড়ে ঘুমাতে? তুমি সপ্তাহে একদিন গোছল করতে? আমার বাচ্চারা জানে পরিষ্কার না থাকাটা কত খারাপ। তারপর বউ রাগে ফুলে-ফেঁপে ওঠে, বলে, আমি জানি তুমি এই দেশের সবচেয়ে নিচু স্তরের একটা মানুষ। আমাদের দেশের সবচেয়ে নীচ তুমি।

—তুমি আমার সাথে এমন করে কথা বলছ, যেন মনে হচ্ছে আমি একজন কালো কাফ্রি ছিলাম?

শীত আসতে না আসতেই শীতের দেশের মতো নিস্তব্ধতা চারদিকে ছেয়ে গেছে। কাদার রাজ্যে যেখান থেকে গ্রামের রাস্তাটি ভেজা চুলের মতো দুটি ভাগে ভাগ হয়ে যায় সেখানে এখনও যুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভটি মুকুটের মতো হারিয়ে যাওয়া সা¤রাজ্যের চিহ্ন হয়ে দাড়িয়ে আছে। সাম্রাজ্যটি কেউ আবার দখল করছে তারপর আবার অন্য কেউ দখল করে ফেলছে। এরকম একটা জায়গায় তারা থাকত। জুতা আর ঘড়ি ঠিক করে জীবন চালাত। রসুন দেয়া খাবার খেত আর দিন শেষে চুলার পাশে কু-লী পাকিয়ে ঘুমিয়ে পড়ত। কবরস্থানে একের পর এক নাম লেখা পাথর বেড়ে উঠত, যার যার পেশা আর বিভিন্ন বিপ্লবে মারা যাওয়ার কথা লেখা থাকত। জোবো ঘড়ির সময় ধরে একে একে সবাই চলে যেত। বয়স্ক মহিলাটি একইভাবে বেঞ্চে বসে মটরশুঁটির খোসা ছাড়াত আর দাড়িওলা লোকটি আর এক দিকে মাটির ঢিবির কাছে স্মৃতিস্তম্ভের পাশে দাঁড়িয়ে থাকত । সৌধের গায়ে লেখা নামধামের পুরনো ভাষা সে ভুলে গেছে আর তার মেয়েরাও কখনও শেখেনি। স্কুলফেরত বাচ্চাদের কলকাকলিতে জায়গাটা মূখর হয়ে যায় যেন একটা স্তম্ভ ঘিরে অসংখ্য কবুতরের ভিড়। তাদের কথাবার্তা বোঝা না গেলেও তাকানোর ভঙ্গি, ধ্বনি এমনকি তাদের মনে জেগে ওঠা প্রশ্নও আঁচ করা যায়। যেমন সেই যে ট্রেনে সেই লোকটির গলার স্বর, মুখের অভিব্যক্তি, জানার আগ্রহ— সবই বোঝা যাচ্ছিল।

—তুমি কে? কোথা থেকে এসেছ?

কে যেন লাঠি দিয়ে কাদার উপরে আফ্রিকার একটা ম্যাপ এঁকে ফেলে। আফ্রিকা! বাচ্চারা এক অন্যকে ছুঁয়ে নিজেদের পরিচয় পেয়ে খুশিতে লাফিয়ে নেচে ওঠে। তারা কাছাকাছি আসে। তাদের মধ্যে একজন আরেকটি ছোট্ট কালো, কুকুরছানার মতো কোঁকড়া চুলের মেয়ের কানের সোনালি দুল দেখিয়ে বলে, এই যে সোনা।

বহু আগে থেকেই আফ্রিকার সবাই জানত সোনার কথা। গরিব আর অবহেলিত মানুষরা তো সারাক্ষণ কোথাও না কোথাও সোনা পাওয়ার স্বপ্ন দেখতেই থাকে। এজন্য সে তের বছর বয়সেই পুরুষ হয়ে গেছে ভেবে তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী তাকে গোছগাছ করে সোনা খোঁজার জন্য ছেড়ে দিয়েছিল। বিকাল চারটার সময়ে পুরনো চাঁদটা ধূসর আকাশে রক্তিম আভা ছড়ায়। শিকারের সুবিধার জন্য কিছু মানুষ ঝোপঝাড় থেকে পাখি তাড়িয়ে খোলা জায়গায় নিয়ে আসে। মানুষগুলো কোমরের বেল্টের চারদিকে ওক গাছের পাতা আর শিকার করা মৃত পাখিদের পালক ঝুলিয়ে রাখে। চাঁদের আলো ফুটলেই ভুট্টার ক্ষেতের মাঝখান দিয়ে তারা একযোগে বেরিয়ে আসে। গোধূলির আলোয় শিকারিদের বন্দুকগুলো প্রতীক্ষায় থাকে। যেখানে আমিও অপেক্ষায় থাকি, একাকী যাতায়াতের পথ থেকে একটু দূরে লুকিয়ে থাকি। পাখিদের অস্থির ছোটাছুটির শব্দ শুনি। তাদের পালকগুলো লতা-পাতায় ঘষা খায়। মুরগির টানা ডাকে সবাই সতর্ক হয়ে যায়; মানুষগুলোর লাঠির আঘাতের শব্দ পেয়ে শিকারেরা আর্তনাদ করে এদিক-ওদিক ছুটোছুটি করে। কোনদিকেই-বা পালাবে তারা যখন একদিকে লাঠি হাতে মানুষই শুধু নয়, অন্যদিকে বন্দুক হাতেও মানুষ তাদের আশায় বসে আছে। তাদের পাখা আছে কিন্তু সবার মাঝখান দিয়ে উড়ে যাবার সাহস নেই।

গ্রাম বা মাঠ কোনো দিকেই তারা আর দৌড়ে বাঁচতে পারে না। লুকিয়ে হামাগুড়ি দেয়া প্রাণীগুলোকে ঘোড়সওয়ারের মতো মাথা উঁচিয়ে আঘাত করতে হয়। কাঁটাচামচ যেমন আকুল হয়ে এক টুকরো মাংসকে গেঁথে ফেলতে চায় তেমনি বেয়নেটের ব্যাকুলতা শিকারিকে উঠিয়ে নিয়ে যায় আধমরা কোনো প্রাণীর কাছে। মৃত্যু যখন ধেয়ে আসে তখন আর কোথাও পালানো যায় না।

গুলি ছোটার সাথে সাথে আগুনের হলকায় সামনে আর কিছুই দেখা যায় না, কেবল আন্দাজে হাতড়ে হাতড়ে মটরশুঁটির খোসা ছাড়ানোর মতো গুলির খোলটা ফেলে দিতে হয়। চারপাশে বিস্ফোরণের শব্দ আর ডানা ঝাপটানোর সাথে সাথে তীব্র আর্তনাদ। আমি যেন এই সমস্ত শব্দ আর দুঃসহ দৃশ্য থেকে নিজেকে একটু আড়াল করতে চাই, কিন্তু আমার ভেতরের ঘোড়সওয়ারটি জেগে উঠে শেষপর্যন্ত ব্যথায় কাতরাতে থাকা প্রাণীকে পরাজিত করে। ওপর থেকে আমার ঘাড়ে ধাক্কা খেয়ে পাশের নরম পাতার বিছানার উপর মরা পাখিটি ধপ করে পড়ে।

আমার বাবার দেশ থেকে ছয়টি পাতা নিয়ে যাচ্ছি।

তার দোকানেই তাকে প্রথম চেনা শুরু করেছিলাম। জানতাম আমি এমন একজনের কোলে বসে আছি যে আমার থেকে অনেক আলাদা। দোকানের অন্যদিকে দাঁড়িয়ে থাকা কৃষ্ণাঙ্গ লোকটি যে ঘর মোছে আর দৌড়ে এটা ওটা এগিয়ে দেয়, বাবা তার সাথে চিৎকার করে কথা বলছিল আর সপ্তাহের বেতনটা তার দিকে এমনভাবে ছুঁড়ে দিয়েছিল যেন তার বেতন পাওয়ার কথাই ছিল না। আমি বুঝতে পেরেছিলাম, বাবা চাইত সবাই তাকে ভয় পাক। একটা শিশু খুব সহজেই ভয় পেতে শেখে আর যে ভয় দেখায় তার প্রতি অনীহা আর ঘৃণাও জন্মায় খুব সহজে।

শরতের চমৎকার লালচে ছোপওলা পাতাগুলো আমি খুঁজে খুঁজে একসাথে করেছি- কোনো আবেগ-অনুভূতি থেকে নয়। শিকারের জন্য লজটি যে গ্রামে সেটি আমার বাবার গ্রাম নয়। আমি আসলেই জানতাম না এই বিরাট দেশের মধ্যে তার ছোট গ্রামটি কোথায়। শুধু সেই বন্দরটির নাম জানতাম যেটা পিছনে ফেলে সে চলে গিয়েছিল। তার গ্রামের কথা আমি কখনও জানতে চাইনি। সে-ও বোধ হয় কোনোদিন বলেনি অথবা আমি-ই শুনিনি। হাতের মুঠোয় পাতাগুলোর দিকে তাকিয়ে ভাবি, কখনও কি ভেবেছিলাম, এখানে, এই জঙ্গলের মধ্যে আমি সেই গ্রামটা খুঁজে পাব! হঠাৎ কেন যেন মনে হয় পাখি তাড়ানোর লোকেরা আমার চারদিক থেকে হই হই করে ধেয়ে আসছে। সারা পৃথিবীর সব পাখিকে যেন তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।

Comments

comments

আফসানা বেগম

আফসানা বেগম

অনুবাদক ও কথা সাহিত্যিক। পড়াশুনা করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্মান এবং স্নাতকোত্তর। বেশকিছু বই প্রকাশ পেয়েছে, ততমধ্যে মৌলিক রচনা: দশটি প্রতিবিম্বের পাশে (ছোটোগল্প), কাগজ প্রকাশন, প্রকাশ : ২০১৪, জীবন যখন থমকে দাঁড়ায় (নভেলা), সন্দেশ প্রকাশনী, প্রকাশ : ২০১৪, প্রতিচ্ছায়া (উপন্যাস), সন্দেশ প্রকাশনী, প্রকাশ : ২০১৬। এবং অনুবাদ বেরিয়েছে : ঝাঁপ ও অন্যান্য গল্প (অনূদিত ছোটোগল্প), মূল লেখক : নাদিন গোর্ডিমার, সন্দেশ প্রকাশনী, প্রকাশ : ২০১৩, রোমান সাম্রাজ্য (অনূদিত ইতিহাস), মূল লেখক : আইজ্যাক আসিমভ, সন্দেশ প্রকাশনী, প্রকাশ :২০১৪, লেখালেখি তাদের ভাবনা (বিশ্বখ্যাত এগারো জন লেখকের লেখালেখি বিষয়ক প্রবন্ধের অনুবাদ), দিব্যপ্রকাশ, প্রকাশ : ২০১৫, পলাতক (অনূদিত ছোটোগল্প), মূল লেখক : অ্যালিস মানরো, সন্দেশ প্রকাশনী, প্রকাশ : ২০১৬ ইমেল : afsanapushkin@gmail.com

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

Tags: , ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি