মিলান কুন্ডেরা সাক্ষাৎকার অনুবাদ । শফিউল জয়

উপন্যাসিক মিলান কুন্ডেরার জন্ম অখণ্ড চেকোস্লোভাকিয়াতে, ১৯২৯ সালে। মধ্যবিত্ত আবহে বেড়ে ওঠা কুন্ডেরার বাবা ছিলেন একজন সংগীততাত্ত্বিক, যার প্রভাব স্পষ্টতই দেখা যায় তার লেখনীতে। পিয়ানোবাদক কুন্ডেরার উপন্যাসে সংগীত, আরও সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে ধ্রুপদী সংগীতের অনুষঙ্গ ব্যবহারে বাস্তবতাবোধন তার গদ্যের ক্যালাইডোস্কোপিক বৈশিষ্ট্য বলে চিহ্নিত করা যায়। উপন্যাসের ক্রম বিবেচনা করে পাঠ করার পর পাঠক হিশাবে সম্ভবত দুইটা ব্যাপারে আমরা ইঙ্গিত পাই — প্রথমত, কুন্ডেরার ভিন্ন ভিন্ন উপন্যাসজগৎ আসলে অখণ্ড একটা সময়ের ধারার কথা বলে বিভিন্ন থিমের প্রেক্ষাপট থেকে, এবং দ্বিতীয় প্রথমটা থেকেই আগত — উন্নিশশো পঁচাত্তর সালে চেক-রিপাব্লিক থেকে নির্বাসনের পর উপন্যাসের থিম্যাটিক্যাল পরিবর্তন, অর্থাৎ উপন্যাসের অন্তর্গত থিম ও প্লটের সাথে তাঁর যাপন ও বাস্তবতার অভিঘাতের সম্পর্ক। জীবনের নানা পর্যায়ের পট পরিবর্তন তাঁর উপন্যাসকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।   

এই সাক্ষাৎকারটার আলোচ্য বিষয় মূলত কেন্দ্রীয় ইউরোপ ও পশ্চিমা সভ্যতায় তার অবদান, ইউএসএসআরের পূর্ব-ইউরোপ আগ্রাসন ও তাঁর উপন্যাস ‘দ্যা বুক অফ লাফটার অ্যান্ড ফরগেটিং’।

মিলান কুন্ডেরা সাক্ষাৎকার ।। মূল : ফিলিপ রথ ।। ভূমিকা ও বঙ্গানুবাদ : শফিউল জয়

দুটা ভিন্ন কথোপকথন একত্রিত করে সাক্ষাৎকারটা নেয়া হয়েছে। সাক্ষাৎকারটা নিয়েছিলাম কুন্ডেরার ‘দ্যা বুক অফ লাফটার অ্যান্ড ফরগেটিং’ পড়ার পর। কুন্ডেরা যখন প্রথম লন্ডনে আসেন, তখন প্রথম বৈঠকটা হয়; দ্বিতীয়টা যুক্তরাষ্ট্রে। সাক্ষাৎকারের সময় কুন্ডেরা বিক্ষিপ্তভাবে ফরাসিতে কথা বলছিলেন, কিন্তু বেশিরভাগ উত্তরই দিচ্ছিলেন চেক ভাষায়। এবং তার স্ত্রী  ভিরা আমাদের অনুবাদক হিশেবে কাজ করেছিলেন। পিটার কাসি চেক থেকে ইংরেজিতে ভাষান্তর করেছেন।  —ফিলিপ রথ

প্রকাশকাল : ৩০/১১/১৯৮০

tumblr_ndpr7x4qx91qalavso1_500প্রশ্ন : আপনার কি মনে হয় পৃথিবী শীঘ্রই ধ্বংসের মুখোমুখি হবে?
কুন্ডেরা : সেটা নির্ভর করে আপনি ‘শীঘ্রই’ বলতে কী বোঝাচ্ছেন তার ওপর।

প্রশ্ন : আগামীকাল কিংবা পরশু।
কুন্ডেরা : পৃথিবী ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে — এটা খুব প্রাচীন অনুভূতি।

প্রশ্ন : তাহলে দুশ্চিন্তার কিছু নেই আমাদের।
কুন্ডেরা : অন্যদিক থেকে দেখলে, মানুষের মনে এরকম একটা ভয় যদি দীর্ঘকাল ধরে বিরাজ করে, তাহলে ভাববার মতো অবশ্যই কিছু আছে।  

প্রশ্ন : আমার মনে হয়েছে, আপনার সর্বশেষ বইয়ে ঘটনাপ্রবাহগুলো সর্বক্ষেত্রে এই বিবেচনার উপর ভিত্তি করেই প্রতিষ্ঠিত, যদিও সেগুলো বেশ হিউমারসম্পন্ন।
কুন্ডেরা :  ছোটবেলায় আমাকে যদি কেউ বলতো একদিন তোমার জাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে, আমি তাহলে সেটাকে বাকোয়াজ বলেই ধরে নিতাম। এমন কিছু তো ভাবতেই পারতাম না। একজন মানুষ জানে সে মারা যাবে, কিন্তু তারপরেও ধরে নেয় তার জাতি অমর। গত পঞ্চাশ বছর ধরে চল্লিশ মিলিওন ইউক্রেনিয়ান কিংবা লিথুনিয়ান যেভাবে আস্তে আস্তে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, ১৯৬৮ সালের রাশিয়ার আগ্রাসনেরর পর চেকরাও নিজেদের এই ধরণের পরিণতির কথা ভাবা শুরু করে। আতঙ্কিত হয়ে ওঠে এই ভেবে— হয়তো ইউরোপে তাদের কোন অস্তিত্বই থাকবে না। আপনি কি জানেন ১৭ শতাব্দীতে লিথুনিয়ানরা শক্তিশালী ইউরোপীয় জাতি ছিল? আর এখন লিথুনিয়ানদের রাশানরা অর্ধ-বিলুপ্ত জাতি হিশাবে হীনদৃষ্টিতে বিবেচনা করে। লিথুনিয়ানদের অস্তিত্ব সম্পর্কে কেউ যাতে জানতে না পারে, সেজন্য পর্যটকদের কাছে থেকেও তাদেরকে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়। জানি না আমার জাতির ভবিষ্যতে কী লেখা আছে। এটা নিশ্চিত যে রাশানরা তাদের সভ্যতার সাথে সবাইকে একীভূত করার জন্যে সবকিছুই করবে। তারা সফল হবে কী না —এই ব্যাপারে কারো কিছু বলার নাই। কিন্তু সম্ভাবনা আছে। এবং আমার উপলব্ধিটা হচ্ছে, এরকম একটা সম্ভাবনার অস্তিত্ব জীবন সম্পর্কে কারো বোধ পাল্টে দেয়ার জন্যে যথেষ্ট। এমন কী, আমি তো ইউরোপকেও এখন পলকা, নশ্বর হিশেবে দেখি।          

প্রশ্ন : এবং তারপরেও, পূর্ব ইউরোপ আর পশ্চিম ইউরোপের নিয়তি কি র‍্যাডিক্যালি ভিন্ন ব্যাপার না?
কুন্ডেরা : সাংস্কৃতিক ইতিহাসের ধারণায়, পূর্ব ইউরোপ হচ্ছে রাশিয়া — যার সাথে বাইজেন্টাইন বিশ্বের নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক সম্পর্ক প্রোথিত। অস্ট্রিয়ার মতো বোহেমিয়া, পোল্যান্ড, হাঙ্গেরিও কখনোই পূর্ব ইউরোপের অংশ ছিল না। একেবারে সূচনা থেকেই তারা পশ্চিমা সভ্যতার যাত্রার অংশীদার ছিল — গথিকে, রেনেসাঁয়। রিফর্মেশন আন্দোলনের সূতিকাগার এই অঞ্চলেই। মধ্য ইউরোপেই আধুনিক সংস্কৃতি তার প্রণোদনা খুঁজে পাইছে— সাইকোঅ্যানালিসিস, কাঠামোবাদ, ডডেক্যাফোনি, বার্টুক মিউজিক, কাফকা এবং মুসিলের নব্য নন্দনতাত্বিক উপন্যাসের ধারণা আসছে এই অঞ্চল থেকেই। যুদ্ধের পর মধ্য ইউরোপে রাশান সভ্যতার দখলদারীর কারণে পশ্চিমা সংস্কৃতি তার ভরকেন্দ্র হারায়। পশ্চিমের ইতিহাসে এইটা আমাদের শতাব্দীর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। মধ্য ইউরোপের বিনাশ সামগ্রিকভাবে ইউরোপের উপসংহারের সূচনা হওয়ার আলামত — এমন সম্ভাবনাকে আমরা উড়িয়ে দিতে পারি না।

প্রশ্ন : প্রাগ বসন্তের সময়, ‘দ্যা জোক’ উপন্যাস ও গল্প ‘লাফেবল লাভস’ দেড় লক্ষের এডিশনে প্রকাশিত হয়। রাশিয়ার আগ্রাসনের পর আপনি ফিল্ম অ্যাকাডেমির টিচিং পোস্ট থেকে পদচ্যুত হন এবং সমস্ত পাব্লিক লাইব্রেরির তাক থেকে আপনার বই সরিয়ে ফ্যালা হয়। সাত বছর পর আপনি আর আপনার স্ত্রী গাড়ির পেছনে কিছু বই আর কাপড়চোপড় নিয়ে সোজা ফ্রান্সে চলে আসেন, যেখানে আপনি সর্বাধিক পঠিত বিদেশি লেখকদের একজন। ইমিগ্র্যান্ট হিশেবে ক্যামন লাগে?
কুন্ডেরা : একজন লেখক হিশেবে একাধিক দেশে বাস করা বর পাওয়ার মতো। জগতকে তখনই ভালোভাবে বোঝা যায় যখন নানা দিক থেকে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়ে ওঠে। আমার শেষ বইটা, যেটা ফ্রান্সে বের হয়েছে একটা নতুন ভৌগলিক স্থানকে উন্মোচিত করেঃ  প্রাগে যে ঘটনাগুলো, সেগুলো দেখা হইছে পশ্চিমা ইউরোপের চোখে, আর আর ফ্রান্সে যা হইছে তা প্রাগের চোখ দিয়ে। এটা দুইটা বিশ্বের মুখোমুখি সাক্ষাৎ। একদিকে আমার নিজের দেশ, অর্ধ শতাব্দীর ধারায় সেখানকার উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলা যেমন গণতন্ত্র, ফ্যাসিজম, বিপ্লব, স্টালিনিস্ট আতঙ্করাজ এবং একই সাথে  তার পতন, জার্মান আর রাশিয়ার দখলদারি, গণ নির্বাসন, পশ্চিমের  নিজ ভূমিতে তার মৃত্যু — এসব কারণে সে ইতিহাসের ভারের নিচে ডুবে যাচ্ছে এবং সমগ্র পৃথিবীর দিকে তীব্র সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকায়। অন্যদিকে হচ্ছে ফ্রান্স। এই স্থান শতাব্দী ধরে পৃথিবীর কেন্দ্র বলে বিবেচিত হয়ে আসছে, যা সাম্প্রতিককালে  মহান কোন ঐতিহাসিক  ঘটনা জন্ম দেয়ার অক্ষমতার কারণে এক ধরণের যন্ত্রণায় ভুগছে। ফলে, র‍্যাডিকল আইডিওলজির মনোভঙ্গিতে সে বুঁদ হয়ে আছে। ফ্রান্সের নিজের মহান কিছু কৃতিত্বের কারণে আবেগপ্রবণ, স্নায়ুরোগীর  মতো নতুনত্বের প্রত্যাশা আছে তার, যেখানে কোন প্রাপ্তি আসছে না। এবং আর আসবেও না।   

milan_kunderaপ্রশ্ন : ফ্রান্সে কি নিজেকে বহিরাগত মনে হয়, না কি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন এখানে?
কুন্ডেরা : আমি ফরাসি সংস্কৃতির অনুরাগী এবং ব্যাপকভাবে ঋণী। বিশেষ করে পুরনো ফরাসি সাহিত্যের। সব লেখকের মধ্যে র‍্যাবেলে আমার সবচেয়ে প্রিয় লেখক। এবং ডিডেরাত। তার ‘জ্যাক লে ফাতালিস্ত’ লরেন্স স্টার্নের মতই ভালবাসি। উপন্যাসের ফর্মে এগুলা সর্বকালের শ্রেষ্ঠ নিরীক্ষার উদাহরণ। তাদের নিরীক্ষার প্রকরণ ছিল উপভোগ্য, আগাগোড়া আনন্দদায়ক। এই বৈশিষ্ট্যগুলো এখন ফরাসি সাহিত্য থেকে হাওয়া হয়ে গেছে, যেগুলোর অনুপস্থিতিতে শিল্প তার তাৎপর্য হারায়।  স্টার্ন এবং ডিডেরট উপন্যাসকে ব্যাপক ক্রিয়া  হিশেবেই বুঝতো। উপন্যাসিকতা ফর্মে হিউমার  তাদের আবিষ্কার। যখন উপন্যাসের সম্ভাবনা নিঃশেষিত হয়ে যাওয়ার বিতর্ক শুনি, তখন আমার অনুভূতিটা থাকে ঠিক বিপরীত। ইতিহাসের ধারায় উপন্যাস তার অনেক সম্ভাবনাকেই মিস করে গেছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ডিডেরাত আর স্টার্নের উপন্যাসে ফর্মের অগ্রগতির যে প্রণোদনা লুকায়িত  ছিল, তার উত্তরসূরিরা কেউই সেই পথে  বিচরণ করে দ্যাখে নি।        

প্রশ্ন : আপনার সর্বশেষ বইকে উপন্যাস বলা হয়নি, তারপরেও টেক্সটে আপনি ঘোষণা দিয়েছেন : বইটা বিভেদনের ফর্মে একটা উপন্যাস। তাহলে, এটা কি উপন্যাস?
কুন্ডেরা : আমার নন্দনতাত্ত্বিক বিবেচনায় অবশ্যই উপন্যাস, আসলেই একটা উপন্যাস। কিন্তু এই মতামত আমি অন্যের উপর চাপিয়ে দিতে আগ্রহী না। উপন্যাসিকতার ফর্মে ব্যাপক সুপ্ত স্বাধীনতা আছে। কোনো-একটা স্টেরিওটাইপড কাঠামোকেই শুধুমাত্র উপন্যাসের অলঙ্ঘনীয় সত্ব বলে বিবেচনা করাটা ভুল।

প্রশ্ন : কিন্তু তারপরেও কিছু একটা আছে যেটা উপন্যাসকে উপন্যাস করে তোলে, এবং স্বাধীনতার সীমারেখা টেনে দেয়।
কুন্ডেরা : উপন্যাস হচ্ছে উদ্ভাবিত চরিত্রের ক্রিয়ার বুনিয়াদের উপর দীর্ঘ সিন্থেটিক গদ্য। এটাই একমাত্র সীমাবদ্ধতা। সিন্থেটিক বলতে আমি বোঝাচ্ছি উপন্যাসিকের তার বিষয়কে সর্বদিক থেকে এবং সকল সম্ভাব্য পূর্ণতার ব্যাপারটাকে হাতের মুঠোয় আনার প্রশ্নটা। সশ্লেষ গদ্য, উপন্যাসিকতামূলক আখ্যান, আত্মজৈবনিক খণ্ড, ঐতিহাসিক সত্য, কল্পনার খেয়াল — উপন্যাসের এই সিন্থেটিক শক্তি সবকিছুকে পলিফনিক মিউজিকের মতো একটা সমন্বয়কারী একক হিশাবে মিশ্রণের সক্ষমতা রাখে। একটা বইয়ের সামগ্রিক ঐকতান শুধুমাত্র প্লট থেকে উৎসারিত না, থিম থেকেও বিকশিত হতে পারে। আমার সর্বশেষ বইয়ে তেমন দুইটা থিম বিদ্যমান —   অট্টহাসি এবং বিস্মৃতি।   

প্রশ্ন : অট্টহাসি সবসময়ই আপনার বিষয় ছিল। আপনার বইগুলো হিউমার অথবা আয়রনির মাধ্যমে অট্টহাসির উদ্রেক করে। কোনো চরিত্র যখন মর্মপীড়ার অথবা দুর্দশার সম্মুখীন হয় তার অন্যতম কারণ তারা এমন একটা দুনিয়ার ঝাঁকুনি খায়, যেখানে সবাই সেন্স অফ হিউমার হারায়া ফেলছে।
কুন্ডেরা : হিউমারের মূল্য শিখছি স্ট্যালিনের আতঙ্করাজের সময়। আমার বয়স তখন বিশ। আমি মানুষের হাসি দেখেই বুঝতে পারতাম কে স্ট্যালিনিস্ট ছিল না, যাদের দেখে আমার ভয় পাইতে হবে না।  সেন্স অফ হিউমার ছিল একটা বিশ্বাসযোগ্য মূল্যায়ন। সেই সময় থেকেই একটা দুনিয়ার ভয়ে থাকি যেখানে সবাই সেন্স অফ হিউমার হারায়া ফেলছে।  

প্রশ্ন : আপনার শেষ বইয়ে আরও কিছু ব্যাপার সম্পৃক্ত। একটা ছোট্ট প্যারাবলে আপনি ফেরেশতা আর শয়তানের হাসির পারস্পরিক তুলনা করেছেন। শয়তান হাসে কারণ সৃষ্টিকর্তার দুনিয়া তার কাছে অর্থহীন; আর ফেরেশতা হাসে কারণে সৃষ্টিকর্তার দুনিয়ায় সবকিছুরই একটা অর্থ আছে।
কুন্ডেরা : হ্যাঁ। মানুষ দুইটা ভিন্ন অধিবিদ্যামূলক আচরণ প্রকাশ করে একই ধরনের শারীরিক অভিব্যক্তি দিয়ে — ‘অট্টহাসি’। কারো হ্যাট হয়তো একটা সদ্যখোড়া কবরের কফিনে পড়ে গেছে, এবং সেই মুহূর্তেই শেষকৃত্য এর অর্থ হারায় এবং অট্টহাসির জন্ম হয়। প্রেমিক-প্রেমিকা হয়তো খোলা মাঠের  ভেতর দিয়ে হাত ধরাধরি করে আগাচ্ছে, হাসতে হাসতে। তাদের হাসির সাথে কৌতুক অথবা হিউমারের কোনো সম্পর্ক নাই, ফেরেশতার সচ্চিদানন্দ এই  হাসির ভেতর দিয়েই। দুই ধরনের অট্টহাসিই জীবনের প্রতি তুষ্টি থেকে আসে। কিন্তু একই সাথে এটা একটা দ্বৈত দিব্যজ্ঞানের নির্দেশ করে : উগ্র ফেরেশতা-বিশ্বাসীরা নিজেদের জগৎ নিয়ে এতটাই প্রণোদিত যে, যারা তাদের আনন্দের অংশীদার হচ্ছে না, তাদেরকেই ফাঁসিতে ঝুলায়া দেয়ার জন্যে ব্যগ্র হয়ে উঠছে। আর অপর অট্টহাসিটা আসে ভিন্ন দিক থেকে যেটা দাবি করে সবকিছুই অর্থহীন। তাদের মতে শেষকৃত্য হাস্যকর, এবং গ্রুপসেক্স নিছক পুতুলনাচ ছাড়া কিছু না। মানবজীবন এই দুই গহ্বর  দ্বারা সীমায়িত : একদিকে অন্ধ বিশ্বাস, আরেকদিকে পরম সংশয়।      

djfjjdfkd-yপ্রশ্ন : আপনি এখন যাকে ফেরেশতাদের অট্টহাসি বলছেন, তা আপনার পূর্ববর্তী উপন্যাসে উল্লেখিত ‘জীবনের প্রতি ভাবাকুল মনোভাব’ এর জন্যে নতুন একটা পরিভাষা। কোনো-একটা বইয়ে আপনি স্ট্যালিনের জমানার আতঙ্ক আর ধরপাকড়কে জল্লাদ আর কবির রাজত্ব বলে উল্লেখ করেছেন।
কুন্ডেরা : টোটালিটারিয়ানিজম শুধু দোজখ না, এটা বেহেশতের স্বপ্ন — এমন একটা দুনিয়ার মঞ্চায়ন যেখানে সকলের সংগতিপূর্ণ বসবাস, পরস্পরের কোনো ধরনের গোপনীয়তা নাই, একটা সাধারণ স্পৃহা আর বিশ্বাসে একতাবদ্ধ সবাই। অ্যান্ড্রি ব্রেটনও গ্লাসহাউজ সম্পর্কে বলতে গিয়ে এমন একটা জায়গায় থাকার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন, একটা বেহেশতের স্বপ্ন দেখছিলেন তিনি। টোটালিটারিয়ানিজম যদি এরকম একটা আদর্শগত অবস্থানের কথা প্রচার না করত, তাহলে এত মানুষ হয়তো এর প্রতি আকৃষ্ট হতো না প্রাথমিক অবস্থায়। এই ধারণাটা আমাদের সবার ভেতরেই কাজ করে, যা প্রত্যেকটা ধর্মের ভিত্তিগত অবস্থানে উপস্থিত। একবার যখন বেহেশতের আইডিয়াটার বাস্তবায়ন সূচিত হয় এবং কেউ তার পথরোধক হয়ে দাঁড়ায়, তখন মানুষজন সেটার বিরুদ্ধে নানা জায়গা থেকে একত্রিত হওয়া শুরু করে। ফলে স্বর্গের স্থপতিরা ইডেনের পাশে গুলাগ (সোভিয়েত ইউনিয়নের ফোর্সড লেবার অ্যাজেন্সি) স্থাপনে বাধ্য হয় এবং আস্তে আস্তে গুলাগ বিস্তৃত হতে থাকে, এবং সংলগ্ন বেহেশতের জায়গা সংকুচিত হয়ে আসে।

প্রশ্ন : আপনার বইয়ে ফরাসি কবি পল এলুয়ারকে বেহেশত আর গুলাগের উপর গান গাইতে গাইতে ভেসে থাকতে দ্যাখা যায়। ঐতিহাসিকভাবে ইঙ্গিতটা কি যথার্থ?
কুন্ডেরা : যুদ্ধের পর এলুয়ার পরাবাস্তববাদ পরিত্যাগ করে টোটালিটারিয়ানিজমের একজন প্রদর্শক  হিশেবে  সোচ্চার হয়েছিলেন। তিনি  ভ্রাতৃত্ব, শান্তি, ন্যায়বিচার, সুন্দর ভবিষ্যত, কমরেডশিপের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন, সেই ভাব সব জায়গায় প্রচার করা শুরু করেন এবং যে কোন ধরণের নৈরাশ্যবাদ, বিচ্ছিন্নতাবাদের বিরুদ্ধে ছিল তাঁর তৎকালীন অবস্থান। ১৯৫০ সালে বেহেশতের শাসকেরা যখন প্রাগে তাঁর পরাবাস্তববাদী বন্ধু যালভিস কালান্দ্রাকে  ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়, এলুয়ার সুপ্রা-পার্সোনাল আদর্শের কারণে বন্ধুত্বের ব্যক্তিগত অনুভূতিকে দাঁত দাঁত চেপে দমন করে জনসম্মুখে কমরেডের এই শাস্তির প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেছিলেন। এলুয়ার গান গাচ্ছিল, যখন জল্লাদ হত্যা করছিল।   

এবং শুধুমাত্র কবি না। স্ট্যালিনিস্ট পিরিওডের সমস্তটাই ছিল একটা যৌথ ভাবাকুল প্রলাপ। এরই মধ্যে সবাই ব্যাপারটা ভুলে গেছে, কিন্তু এটাই ছিল মূল সমস্যা। মানুষজন বলে বেড়াত- বিপ্লব সুন্দর, কিন্তু সেটা যে ধরণের টেরর জন্ম দেয়, তা অশুভ। এটা সত্য না। সুন্দরের ভেতর অশুভ ইতিমধ্যেই বর্তমান। দোযখ আগেভাগেই বেহেশতের স্বপ্নে ডুবে আছে, এবং আমরা যদি দোজখের সারবত্তাটা বুঝতে চাই তাহলে বেহেশতেরটাও বুঝতে হবে, যে বেহেশত থেকে দোজখের উৎপত্তি। গুলাগের সমালোচনা করা খুবই সহজ,  কিন্তু টোটালিটারিয়ানিজমের বিশেষ ভঙ্গিটা, যেটা কী না বেহেশতের রাস্তা দিয়ে  গুলাগ সৃষ্টির পথে নিয়ে যায়, সেটাকে বাতিল করা সবসময়ই কষ্টসাধ্য। আজকাল পৃথিবীর সবাই সমস্বরে গুলাগের আইডিয়াটা বাতিল করে দিতেছে, কিন্তু তারপরেও তাঁরা একধরণের টোটালিটারিয়ানিজমের অভিব্যক্তি দ্বারা নিজেদেরকে সম্মোহিত করে রাখছে। পল এলুয়ারের সেই একই গানের সুরে তাঁরা নতুন গুলাগের দিকে হেঁটে যাচ্ছে, যে সুরে এলুয়ার সর্বোচ্চ সম্মানিত ফেরেশতার মতো গান গাইতে গাইতে প্রাগের আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছিল আর কালান্দ্রার শবের ধোঁয়া শ্মশানের চিমনি দিয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছিল আকাশে আকাশে।

প্রশ্ন : আপনার গদ্যের একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো আপনি পাব্লিক এবং প্রাইভেটকে ক্রমাগত মুখোমুখি দাড়া করিয়ে দেন। কিন্তু প্রাইভেট গল্পগুলো তেমনভাবে কোনো রাজনৈতিক দৃশ্যপটে সংঘটিত হয় না, তবে এমন না যে ব্যক্তিগত জীবনে রাজনৈতিক ঘটনার অনুপ্রবেশ নাই। আপনি সবসময় দ্যাখাতে থাকেন — ব্যক্তিগত আর রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ একই সূত্র দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। ফলে এইদিক থেক আপনার গদ্যকে রাজনীতির সাইকোঅ্যানালিসিস বলা যায়।
কুন্ডেরা : মানুষের পাব্লিক এবং প্রাইভেট স্পেইসের অধিবিদ্য মূলত একই। বইয়ের অন্য থিমটা বিবেচনা করেন, বিস্মৃতি। এটা মানুষের সবচেয়ে বিস্তৃত ব্যক্তিগত সমস্যা : আত্মের ক্ষয় হিশেবে মৃত্যু। কিন্তু এই আত্মটা কী? আত্ম হচ্ছে আমাদের সমগ্র স্মৃতিসমষ্টি। তাই আমরা অতীতের ক্ষয়ের কারণে মৃত্যু নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকি না। বিস্মৃতি হচ্ছে মৃত্যুর একটা রূপ যা জীবনকালে সবসময়ই উপস্থিত। নায়িকার জটিলতা এটাই, যে চায় নিজের মৃত স্বামীর স্মৃতিকে জিইয়ে রাখতে। কিন্তু বিস্মৃতি রাজনীতিরও একটা বড় সমস্যা। একটা বিরাট শক্তি যখন ক্ষুদ্র একটা দেশকে তার জাতীয় চেতনা থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে চায়, তখন সে পরিকল্পিত বিস্মৃতির টেক্নিক ব্যবহার করে। বোহেমিয়াতে এখন তা-ই হচ্ছে। সমসাময়িক কোনো চেক সাহিত্য গত বারো বছরে পাব্লিশ করা হয় নাই। ফ্রাঞ্জ কাফকা সহ দুইশো চেক লেখককে নির্বাসিত করা হইছে। ১৪৫ জন ইতিহাসবিশেষজ্ঞকে পদচ্যুত করে নতুন ইতিহাস লেখা হচ্ছে, মনুমেন্ট সব গুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। যে-জাতি তার অতীত সম্পর্কে বিস্মৃত হয়, সে ধীরে ধীরে নিজেকে হারায়া ফ্যালে। ফলে রাজনৈতিক অবস্থাটা পৈশাচিকভাবে খুব সাধারণ একটা অধিবিদ্যাগত সমস্যাকে আলোতে নিয়ে আসতেছে প্রতিনিয়ত আমরা যার মুখোমুখি হচ্ছি, কিন্তু কোনো বিকার নাই আমাদের। রাজনীতি ব্যক্তিগত জীবনের অধিবিদ্যাকে উন্মোচিত করে, আর ব্যক্তিগত জীবন রাজনীতির অধিবিদ্যাকে।        

14794143_10208748041590986_92655027_nপ্রশ্ন : বিভেদনের এই বইয়ের ছয় নাম্বার অধ্যায়ে মূল নায়িকা তামিনা এমন একটা দ্বীপে যায় যেখানে শুধুমাত্র শিশুরা আছে। এবং শিশুরা শেষমেশ তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। এটা কি একটা স্বপ্ন, রূপকথা নাকি রূপক?
কুন্ডেরা : কিছু থিসিস তুলে ধরার জন্যে লেখকের উদ্ভাবিত গল্প- রূপক যদি এরকম কিছু হয়ে থাকে, তাহলে রুপকের ধারণাটা আমার আয়ত্তের বাইরে। বাস্তব কিংবা কল্পিত যাই হোক না কেন — প্রত্যেকটা ঘটনা তার  নিজস্ব শক্তি এবং কাব্যময়তা দিয়েই পাঠকের কাছে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠাটা জরুরি। ইমেইজটা দ্বারা আমি বহুদিন তাড়িত ছিলাম এবং জীবনের একটা পর্যায়ে  স্বপ্নেও ঘুরেফিরে ব্যাপারটা আসছে। স্বপ্নটা এমন : একটা মানুষ নিজেকে শিশুদের বিশ্বে আবিষ্কার করে, যেখান থেকে পালানোর কোন পথ নাই। এবং হুট করে সে বুঝতে পারে, যে শৈশবকে সে খুব ভাবাবেগ আর ভালোবাসার জায়গা থেকে দেখে আসছে, সেটা হয়ে ওঠে ভয়াবহ আতঙ্কের। ফাঁদের মতো। গল্পটা কোন  রুপক না। কিন্তু আমার বইটা একটা পলিফোনি যেখানে ভিন্ন ভিন্ন গল্পগুলো নিজেদেরকে ব্যাখ্যা করে, পরস্পরকে তুলে ধরে, এবং একে অপরের পূরক হিশাবে কাজ করে। বইয়ের মূলগত আখ্যানটা একটা টোটালিটারিয়ানিজমের গল্প, যা সাধারণকে তার স্মৃতি থেকে বঞ্চিত করে শিশুদের জাতি হিশেবে ঢেলে সাজায়। সব টোটালিটারিয়ানিজমই এই রাস্তায় হাঁটায়। এবং সম্ভবত ভবিষ্যতের হুজুগ তুলে, অতীতের প্রতি উদাসীন থেকে, চিন্তায় বিশ্বাস না করে আমাদের টেকনিক্যাল যুগও একই কাজ করে । এবং এরকম বিকারহীন কৈশোর সমাজে স্মৃতি এবং পরিহাসে ঋদ্ধ একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তামিনার মতো শিশুদের দ্বীপে থাকার অনুভূতি দ্বারা আক্রান্ত হতে বাধ্য।     

প্রশ্ন : আপনার প্রায় প্রত্যেকটা উপন্যাসেই, এমনকি আপনার শেষ বইয়ের আলাদা অধ্যায়গুলোও রতিক্রিয়ার দৃশ্যের মাধ্যমে এক ধরনের বোঝাপড়ায় পৌঁছায়। এমনকি নিরীহ গোছের নামধারী ‘মা’ অধ্যায়ও প্রোলোগ আর এপিলোগ সহ তিন ধরনের উপায়ে বিশদ মৈথুনদৃশ্য উপস্থিত। একজন উপন্যাসিক হিশাবে যৌনতাকে কীভাবে দেখেন আপনি?
কুন্ডেরা : যৌনতা তো সাম্প্রতিককালে ট্যাবু বলে বিবেচিত হয় না আর। নিছক বর্ণনা, যৌনতা সম্পর্কিত স্বীকারোক্তি এসব বেশ একঘেয়ে হয়ে গেছে। লরেন্স, এমনকি হেনরি মিলাররের অশ্লীল ভাবোচ্ছ্বাসকেও কত পুরনো মনে হয়! কিন্তু তারপরেও জর্জ বাতাইলের ইরোটিক প্যাসাজের একটা স্থায়ী ছাপ আছে আমার ওপর। তার কারণ সেগুলো লিরিক্যাল না, অনেক ফিলোসফিক। আপনার পর্যবেক্ষণের সাথে একমত, আমার সবকিছুরই একটা ইরোটিক দৃশ্যের ভেতর দিয়ে সমাপ্ত হয়। আমার মনে হয়, শারীরিক ভালোবাসার  দৃশ্য একটা তীক্ষ্ণ আলোর সৃষ্টি করে। এবং সেই আলোতে আকস্মিকভাবে একটা চরিত্রের অন্তর্গত ভাব উন্মোচিত হয় এবং তাদের জীবন পরিস্থিতিকে স্পষ্ট করে তোলে। হুগোর সাথে যখন তামিনার শারীরিক সম্পর্ক হয়, সে-মুহূর্তে তামিনা আকুল হয়ে তার মৃত স্বামীর সাথে ছুটি কাটানোর ঘটনাগুলো চিন্তা করার চেষ্টা করছিল। ইরোটিক দৃশ্যটা হচ্ছে কেন্দ্রবিন্দু যেখানে গল্পের সকল থিম মিলিত হচ্ছে, এবং যেখানে আমাদের গভীরতম গূঢ়গুলোর অবস্থান।                

lead_960প্রশ্ন : বইয়ের শেষ অধ্যায় প্রধানত যৌনতা বিষয়ক। এই অধ্যায়টাই কেন সমাপ্তি অধ্যায়? ছয় নাম্বার অধ্যায়ে যখন নায়িকার নাটকীয় মৃত্যু হয়, সেটাও তো শেষ অধ্যায় হতে পারত।
কুন্ডেরা : মেটাফরিক্যালি বলতে গেলে, তামিনা মারা যায় ফেরেশতার অট্টহাসির ভেতর দিয়ে। সপ্তম অধ্যায়ে একই ধরনের অট্টহাসি ধ্বনিত হয়, কিন্তু একেবারেই বিপরীতার্থক একটা জায়গা থেকে। এই অট্টহাসি শুনতে পারি যখন সবকিছু তার অর্থ হারায়। অনর্থ এবং উদ্ভটের উর্ধ্বেও এক ধরনের সূক্ষ্ম কাল্পনিক ভেদরেখা আছে। একটা মানুষ নিজেকে জিজ্ঞেস করে : আচ্ছা এটা কি অর্থহীন না যে আমি প্রতিদিন সকালে উঠি? কাজে যাই? কিছু পাওয়ার জন্যে চেষ্টা করি? একটা জাতিতে আমি অন্তর্ভুক্ত শুধুমাত্র সেখানে জন্মানোর কারণে?  মানুষ এই সীমানার খুব নিকটে বাস করে, এবং এবং সহজেই নিজেকে সীমানার অন্যপাশে আবিষ্কার করতে পারে। এই সীমানা সব জায়গায় উপস্থিত, মানবজীবনের সর্বক্ষেত্রে। যৌনতার মতো গভীরতম এবং সবচেয়ে জৈবিক বাপারেও তা বিরাজ করে। এবং জীবনের সবচেয়ে গভীরতম জায়গা বলেই  যৌনতার কাছেই গভীরতম প্রশ্নটা করা। এর জন্যে আমার বিভেদনের বইটা কোনো বিভেদনে না গিয়ে এখানেই শেষ হইছে।      

প্রশ্ন : তাহলে যেখানে পৌঁছালেন শেষ পর্যন্ত, সেটাই কি আপনার নৈরাশ্যবাদের চূড়ান্ত সীমা?
কুন্ডেরা : আশাবাদ, নৈরাশ্যবাদ এই শব্দগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছুটা সাবধান থাকতে চাই। একটা উপন্যাস দৃঢ়ভাবে কোন কিছু বলে না,  উপন্যাস অনুসন্ধান করে এবং প্রশ্ন তোলে। জানি না আমার জাতি ধ্বংস হয়ে যাবে কী না, এটাও জানি না আমার কোন চরিত্রগুলা সঠিক। আমি গল্প বানাই, একটার সাথে আরেকটার সাক্ষাৎ ঘটাই, এবং এইভাবেই প্রশ্ন করি। দন কিহতো যখন বাইরের জগতে যায়, পুরা জগত তার কাছে রহস্যময় প্রতিভাত হয়েছিল। প্রথম ইউরোপিয়ান উপন্যাস হিশেবে এটাই ছিল পরবর্তী উপন্যাসগুলোর জন্যে উত্তরাধিকারস্বরুপ। উপন্যাসিকরা পাঠকদের বলে জগতকে একটা প্রশ্ন হিশেবে উপলব্ধি করতে। এই মনোভাব প্রজ্ঞা এবং সহিষ্ণুতার। অলঙ্ঘনীয় আদর্শিক বাস্তবতায় পরিচালিত বিশ্বে উপন্যাস মৃত। টোটালিটারিয়ান দুনিয়াটা প্রশ্নের দুনিয়া না, সেটা একটা উত্তরের দুনিয়া; তা মার্ক্স, ইসলাম বা অন্য যে-কোন কিছুর উপরেই ভিত্তি করে হোক না কেন। এমন দুনিয়ায় উপন্যাসের কোন স্থান নাই। আমার মনে হয় দুনিয়াব্যাপী মানুষ এখন কোন কিছু অনুধাবনের থেকে জাজ করতেই বেশি আগ্রহী। ফলে মানুষ যাকে বিবেচনাহীনভাবে নিশ্চিত বলে ধরে নিচ্ছে, সেই গোলযোগপূর্ণ নিনাদকে ছাপিয়ে উপন্যাসের ধ্বনি খুব কমই অনুরণিত হয়।           

Save

Save

Save

Comments

comments

শফিউল জয়

শফিউল জয়

শিক্ষার্থী, নৃতত্ত্ব।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: , , ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি