ডেনভার ফরেভার । জাহেদ আহমদ
সাম্প্রতিক

ডেনভার ফরেভার । জাহেদ আহমদ

ফ্রাঁসোয়া ত্রুফোর সিনেমায়, ‘দ্য উওম্যান নেক্সট ডোর’, একটা দারুণ সুন্দর মুহূর্ত পাওয়া যায়; একটা তো নয় আসলে, অ্যা সিরিজ্ অফ দুর্ধর্ষ মুহূর্ত ত্রুফোর যে-কোনো ম্যুভিতেই মিলবে র‌্যান্ডোম্ চয়েসে গেলেও, তবে এই সিনেমার একটি বিশেষ দৃশ্য, বলা ভালো সংলাপিকা, আমার কাছে যেন শুশ্রূষার মতো, অথবা দৃশ্যটা আসলেই কিন্তু রোগশয্যার, সেইখানে কিছু সংলাপ ভীষণ সুন্দর ও সত্যের মতন আততায়ী। সিনেমার নায়িকা যখন নার্ভাস্-ব্রেইকডাউনজনিত কারণে হাসপাতালে চিকিৎসাখাটে মুমূর্ষু দশা, নায়ক ভিজিটিং আওয়ারে দেখতে এসে তারে — আমাদের নায়িকা এবং দর্শনার্থী নায়কের প্রেমিকারে, (এবং উল্টাটাও হতে পারে না তা কে বলবে, যে, আমাদের প্রেমিকা আর দর্শনার্থী নায়কের নায়িকারে) — দেয়াল-ঘেঁষে-রাখা রেডিয়োয় নিউজচ্যানেল্ অন্ করে দেবে কি না জিগ্যেশ করছে। সেই-সময় নায়িকা তারে উত্তরে বলে এই কথাগুলো : বরং গানের কোনো রেডিয়োস্টেশন্ ছেড়ে দিয়া যাও। গান কখনো মিথ্যা বলে না। সবচেয়ে বাজে-বিচ্ছিরি গানটাও বলে চেনা-চেনা মানুষেরই কথা, মানুষের মায়াভরা আকুতি ও মিলন-বিরহের গূঢ় ইচ্ছার কথা, বলে প্রাগৈতিহাসিক ভালোবাসা-বাসনাকামনার কথা। গানগুলো সবসময় এই সত্য কথাটাই চিরায়ত বলে চলে ঘুরায়েফেরায়ে — এই চিরায়ত ওষধি মিথ্যামালাটা — আমি তোমাকে ভালোবাসি … তোমায় ছাড়া আমি বাঁচব না … আমারে ছেড়ে যেও না প্রিয় … “খোদার কসম, জান্, আমি ভালোবেসেছি তোমায়” … এবং ইত্যাদি। মির‍্যাক্যল্ এই মিথ্যে, এই জীবনপথ্য, অলীক ভেষজ ও বনস্পতি, এইসব সত্য। সুন্দর এইসব। শুনতে ক্ষ্যাত্ শোনালেও কথাগুলো তো প্রমিত-অপ্রমিত ঝগড়ার ন্যায় কিছু নয়, কিংবা নয় যিশুর অনুসারীদের ন্যায় বন্ধুহন্তা। “জানি না জুডাস্ কেন ভালোবেসে যিশুকে খোঁজেনি” … আহা! … “জানি না এ-পৃথিবীর ঘাতকরা গান শোনে কি না / জানি না লালন শুনে ভাসে কেন বুকের আঙিনা … জানি না বয়স হলে প্রেমে কেন এত পাক ধরে / জানি না হৃদয় কেন রাত জেগে পায়চারি করে … জানি না কাঁদায় কেন সহজ সুরের শয়তানি …” — জানি না, সত্যি, জানি না। “ক্যাক্টাস, তুমি কেঁদো না / যিশুর মুকুটে কাঁটা …” — কার ধ্যানস্থ রক্তে চরাচর এমন নতজানু, তথাগত, জানো তুমি? কিংবা বাংলা গানের প্রেমে নাস্তানাবুদ অ্যান্টোনি ফিরিঙ্গির আনন্দ-বেদনা? জানি না, হে দিগ্গজ পণ্ডিত, ওহে ও মদ্যডুবন্ত পদ্যকার সবজান্তা চাঞ্চল্যকর বন্ধু আমার, আমি জানি না, আমি সত্যি জানি না। আবছাভাবে এইটুকু শুধু বুঝতে পারি যে, একদা মানুষ গানের টানে, স্রেফ গান শোনার গরজে, স্রেফ সুরের শরণ নিতে, যেত বনে-জঙ্গলে, যেত সন্ন্যাসব্রতে, যেত প্রব্রজ্যায়-বানপ্রস্থে, যেত গুরু ধরিবারে, যেত সংসার ও লোকালয়ের বাইরে, যেত অগস্ত্য যাত্রায়। সেকালে গানোন্মাদ সুরগ্রস্ত লোকেদের জন্যে এ-ই নিদান ছিল। ভক্তিমার্গ বলি, কিংবা তারে এক্সপ্লোয়েট করে গড়ে-ওঠা নানাবিধ বুজরুকি, এর চারধার বেষ্টন-করা গান ও সুরের কারবার। একালে রেকর্ডিং ইত্যাদির কল্যাণে — শব্দসংরক্ষণ যন্ত্রাদি বিকাশের এই সময়ে — সুর ও গান সর্বত্র বিরাজে; — এবং অসুরও শয়ে-শয়ে, যেমন ভক্তিমার্গের পাশাপাশি বিস্তর ভণ্ডামি বিরাজিত পৌরাণিক-উত্তরপৌরাণিক-পুরাণান্তিক সর্বকালে-সর্বভূখণ্ডে; — একালে জেবের ভেতরে, সুরোন্মাদের করপুটে, যার যার সুরমুর্শিদ, গানের গুরু ও পিরফকির, গানবাজনার ঋষি ও দরবেশ। তবুও যুদ্ধ, কুরুক্ষেত্র, স্বজনের বিরুদ্ধে শানানো ছুরিকার হিংসা আপন স্বজনেরই, পিট্ সিগ্যারের সেই বিপন্ন প্রশ্ন : হোয়েন উইল দ্যে এভার লার্ন? — উই রিয়্যালি ডোন্ট নো, সত্যিই, আমরা জানি না।

কাজেই জীবনে এই গানশ্রবণ, এই সুরপ্রস্রবণ, গানসান্নিধ্য, সুরের সংশ্রব ও সংশ্রয়, আমাদিগেরে সংলগ্ন করে রাখে জীবনের সঙ্গে। এই মিনিয়েচার জীবনে এইটুকু মহান বোধের উদয় আমাদের প্রত্যেকেরই হয়েছে, হয়, মৃত্যুর আগে কোনো-না-কোনো এক পর্যায়ে। একেকটা গানের সঙ্গে লেপ্টে থাকে জীবনেরই একেকটা পার্ট, ফেলে-আসা লাল-কমলা-হলদে-সবুজ-আসমানী-নীল-বেগুনি জীবনের ডক্যুমেন্টারি গানগুলো, সুরগুলো, সৌহার্দ্যগুলো। জন ডেনভার সেই জীবনেরই কিয়দংশ জুড়ে রেখেছেন। অনেকাংশ জুড়ে, সেই জীবনের, যেমন শঠতা আর পৃষ্ঠদেশে-ছুরিকাহত-করা আজন্মসুহৃদের আখ্যান — অসত্য নয় সেই নিঠুরা জান্তবতার জীবন ও জীবিকা — তদ্রুপ অসত্য নয় হেন সুরপারাবার, এই নিরুপম জীবনমল্লিকার মায়াবাহার। এই নিবন্ধ সম্পর্কে এইটুকু তথ্য অবহিত করা প্রারম্ভিকায় কর্তব্য হয় যে এইটা কোনোভাবে ডেনভার মেমোরিয়্যাল্ স্পিচ নয়, ডেনভারের গান ও সুর ভর করে এইটা আমাদেরই জীবনভ্রমণ বস্তুত প্রস্তাবে, এইটা আমাদের অবলুপ্ত কৈশোর স্মারক বক্তৃতা বলা যেতে পারে; ডেনভার সম্পর্কিত সমস্ত কথাবার্তা এখানে এসেছে তার গানের লিরিক্সটেক্সট থেকে নিবন্ধকারের কল্পনাবাহিত হয়ে, প্লেবয়  ম্যাগাজিনের একটা দীর্ঘ ইন্টার্ভিয়্যু কল্পনাচাগানো কথাবার্তাগুলোকে একটু সমর্থন যোগাতে ব্যবহৃত হয়েছে, এর বাইরে যেসব তথ্যসংগ্রহণসূত্র প্রযুক্ত হয়েছে সেগুলো উইকি ইত্যাদি নিতান্ত কমন কিছু জায়গা থেকে, সেসবেরও উল্লেখ রচনার কোথাও-না-কোথাও রয়েছে পরিকীর্ণ। অত্যন্ত ব্যক্তিগত এই নিবন্ধিকায়, এই নিরুদ্দিষ্ট সুরভ্রমণে, ডেনভার ভর করে দেখা যাক স্পর্শা যায় কি না আমাদেরই জীবনের একাংশ বর্ণচক্রিকা।

আধেক লীন ছুটির দিন

অনেক অনেক দিন বাদে এমন ঘটনা; — আধেক লীন হৃদয় দূরগামী / ব্যথার মাঝে ঘুমিয়ে পড়ি আমি। হোয়েন আই ঔক-আপ নেক্সট মর্নিং, য়্যু নো, থিংস অলমোস্ট রিমেইন আনচেইঞ্জড। ফুটন্ত রোদ্দুর শুধু রাত্রিচ্ছায়ার স্থলে। একই সেই গান। কোথাও বেদনা নাই তাতে, ব্যথা নাই, স্মৃতিসুরস্ফূর্ত সংগীত মাত্র। তবু কোত্থেকে-যে ছুটে আসে হেন ক্রন্দন, করুণাধারাপাত, কোত্থেকে হেন প্রচ্ছায়া! গানটার মধ্যে লেশমাত্র ক্রন্দন নাই, তা-ও কেন এমনধারা কান্নার রেশ? ভুল বলা হলো বটে। একটাও গান কি দুনিয়ায় দেখানো যাবে যেখানে কান্না নাই? নিরঙ্কুশ ফুর্তিফার্তা দিয়া গান হয় না। নিরঙ্কুশ ফুর্তি দিয়া গান কেন, কিচ্ছুটিই হয় না।

আর কোন গান কখন আপনি রিলেট করে উঠবেন, কোন গান কখন রিলেভেন্ট হয়ে উঠবে আপনার কাছে, এ তো সম্ভব নয় আগে থেকে বলে দেয়া। গাইছে ডেনভার, তার বাস্তবতার সঙ্গে আপনার বাস্তবতার তো কোনো মিল নাই। তবু কেন জন ডেনভার শুনে এত-এতকাল পরেও ফুরফুরে হেন ছুটিদিনে বাষ্পাচ্ছন্ন চরাচর? “হুররেই … হুররেই … ইট’স হোলি হলিডে” — অ্যাবা  ব্যান্ডের বা বনিঅ্যাম-এর এমন কোনো ড্যান্সবিট গানেই তো ছুটিদিন উদযাপিত হবার কথা। তা তো হয় না। বা হলেও পশ্চাতে সেই বিষাদেরই কারসাজি। কোনো-না-কোনো অবসাদ অপনোদনে মানুষ ড্যান্সফ্লোরে যেয়ে নেচে আসে কয়পাক, পান করে, স্খলিত গলায় মুক্তকচ্ছ খিস্তি দিতে দিতে অ্যাভেন্যু ধরে গেহে ফেরার। বেদনারাগিণী বিনে হয়নাকো গান, যেমন হয় না বালির অনুপ্রবেশ ব্যতীত মুক্তোমণি ঝিনুকের উদরে।

অ্যাজ্-অ্যা-রেজাল্ট, লক্ষ করবেন, রৌদ্রকরোটিতে কেমন সকরুণ ছায়া থাকে মিশে। ঝলমলে রোদেলা গানের সুর, মেলিফ্ল্যুয়াস টেম্পো সুরপ্রবাহের, তবু তাতে মেলাঙ্কলিয়া মাখা! নাকি যে শুনছে, মেলাঙ্কলিয়া তারই মনগড়া? শেষেরটাই প্রথম হবে। হ্যাঁ, মেলাঙ্কলিক মুহূর্ত উদ্বোধনে একটা ভালো গান সফলকাম হয়ে থাকে। একদম কমিক কোনো টিউন শুনে আপনার কোনো অতীতদিনের সুখস্মৃতি ফিরে এসে যদি-বা ঝাপ্টা মারে, তো জানবেন, মেলাঙ্কলিয়া জাগে তন্মুহূর্তেই। না-হলে তো মঞ্চে যেমন আপনি নাচিতেছিলেন, একঘেয়ে সেই নৃত্যলহরী আপনার থামায় কার সাধ্যি! মিউজিক আপনাকে রিক্যাপিচ্যুলেটে বাধ্য করে প্রতিদিন।

ধরা যাক ডেনভারের এই অ্যালাস্কা অ্যান্ড মি  — I dreamed I was flying over mountains and glaciers — এইটা তো আপনারও লাইফের চিত্র। দুই চিত্রের স্পেস ভিন্ন, এসেন্স একই। কি কি নাই আপনার, এখানে এই লাইনে, সেই হিসাবটা আসুন করা যাক এইবার। ড্রিম তো আছে আপনার, আছে না? ফ্লাই তো আছেই, বলা ভালো ওইটাই তো পুরা আপনি, তাই না? মাউন্টেন তো অল্প হোক বিস্তর হোক আছে। নেই কেবল গ্লেসিয়ার। একেবারেই কি নেই? সিনেমায়-যে গ্লেসিয়ার দেখেন, কত কত সিনেমায়, সেই গ্লেসিয়ার কি আপনারই নয়? সিনেমার গ্লেসিয়ারগুলো সব একান্তই আপনার, বাস্তবের গ্লেসিয়ারগুলোর মালিক হয়তো অন্য প্রজাতন্ত্র, হিসাবটা এইবার পাক্কা। তারপর ধরুন এই পঙক্তিটি — I felt like a loser but I turned out the winner — আপনিই কি নন? তাকিয়ে দেখুন ভালো করে। হয়তো-বা  life in a chosen country আপনিও যাপন করছেন। সম্ভাবনার দেশ হোক অথবা না, লাইফ লিড করার মতো একাধিক ওপশন তো একদা আপনার হাতেও ছিল। আপনিও তো sleep near the sound of a slow running river এবং wake up most mornings to a drizzling rain; হয়তো আপনার আর আমার নদীটির নাম ভিন্ন ভিন্ন। হয়তো আমাদের বৃষ্টির ব্যাপ্তিকাল সমমাপের নয়। কিন্তু সুরমর্মরে আপনিও ঘুমাতে যান রোজ রাতে রিভার সুরমা শিয়রে রেখে, কিংবা মাতামুহুরী-করতোয়া-সোমেশ্বরী, ফের রোজ ভোরে ঘুম ভাঙে বৃষ্টিনির্ঝরে। এই বিবৃতি মিথ্যে তো নয়। এবং we live every day like the first or the last one; কেউ অদৃষ্টবাদী, খটখটে বাস্তববাদী কেউ, কেউ ঐশী বিশ্বাসে বলীয়ান, কেউ-বা নিরীশ্বরবাদী; কিন্তু এই কথাটি তো সকলের ক্ষেত্রেই সমান প্রযোজ্য : we live every day like the first or the last one — নয় কি? কিই-বা হারাবার আছে, কাজেই, কিই-বা আসে-যায় স্বর্গনসিব লাভের আশায় থেকে? দিস্ ইজ্ ইট, ইয়েস! ফর অল দ্য বিউটি মাই চিল্ড্রেন উইল সি  …

রিওয়াইন্ড শুনতে শুনতে একসময় দেখি চিলতে-ফিতা বারান্দার গ্রিলফোকরে, ফ্রগআই-ভিউ-শটে, সন্ধ্যাতারার হাসি …

একটা গান, একনদীতে অসংখ্যা স্নান

সম্পূর্ণ মনে নেই ওইবারই পয়লা কি না, আগে থেকেই হতে পারে এমনকি না-ও হতে পারে, কিন্তু ওই সময়টাতেই ডেনভারের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ-করমর্দনের শুরু হচ্ছিল। বরফগলন তথা আইস্-ব্রেইকিং আরও বছরদিন লেগে যাবে পুরো সমাধা করে উঠতে। কিংবা ভালো করে বলতে গেলে চেনাজানাজানির মাঝখানেই বিমানে উড়ে গেলেন ডেনভার অমরলোকে, লেজেন্ডদিগের জগতে, সে-জগৎ অলমোস্ট সুনসান হলেও জন ডেনভার অদ্যাবধি সুরমুখর। তো, ওইবারই প্রথমবার কি না তা জানাটা জরুরিও নয়। যে-কোনো গান শুনে যদি আপনার ভালো লেগে যায়, সেইটা ভালো অথবা মন্দ যা-ই হোক, গানটা যদি আপনাকে ছেয়ে ফেলতে পারে, অ্যাট-লিস্ট গানশ্রবণমুহূর্তের আপনাকে ছেয়ে ফেলে একেবারে ছেদ করে যেতে পারে যদি গানটা, তখন মনে হয় যেন বহুকাল ধরেই শুনছিলেন এইটি, মনে হয় যেন শুনিয়া যাবেন শুমারবিহীন আরও বহুকাল, ওই বাছুরবেলার প্রেমের মতন, ল্যভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট, মনে যেন হয় আহা চিনি উহারে, জন্মজন্মান্তরের সখা সে আমার, এমন বোধোদয়ের ব্যাখ্যাবিশ্লেষ কিংবা নেপথ্য কারণ খোঁজা প্রায় দুষ্কর। ভাগ্যিস, খুব বেশি নেই এমন গান, একজন মানুষের লাইফটাইমে এমন গান অসংখ্য হয় না সাধারণত।

বলছি ‘টেইক মি হোম, কান্ট্রিরোডস’ গানটার কথা। প্রথমবার কখন শুনেছিলাম বা কোথায়, মনে নেই। কিন্তু প্রথম শোনার সেই দিনগুলোর আশেপাশে কোনো-একসময় এইটা আমাদের দেশীয় ব্যান্ড ফিডব্যাকের ব্যান্ডলিডার ফুয়াদ নাসের বাবুর গলায় শুনেছিলাম এইটা স্পষ্ট মনে আছে। সময়টা হবে ৯২ কি ৯৩, কোনো-এক ঈদের সিজনে, বিটিভি প্রচারিত একটা ব্যান্ডমিউজিক্যাল শো-তে এই গানটা বাবু কিবোর্ডের সঙ্গে গেয়েছিলেন। আজও ভুলি নাই সেই গাওয়াটা। ভালো ও মনকোমল একটা ভাব তিনি রেখেছিলেন গানটা গাইতে যেয়ে আগাগোড়া। বাবু তো ফিডব্যাকের কাণ্ডারী, লিড-ভোক্যাল যদিও মাকসুদ তখন, ম্যানেজমেন্ট ইত্যাদি দায়িত্বগুলো বাবু সামলাতেন বলে জানি। কিবোর্ড বাজাতেন দলের সঙ্গে, এবং অকেইশ্যনালি গাইতেন, ইংরেজি সফ্ট-রক সেমি-ব্লুজ বা সেরিও-ব্লুজ বাবুর গলায় বেশ লাগত। কান্ট্রিরোডস গানটা গাওয়ার সময় তিনি তার গলার সঙ্গে মেলবাঁধা বাদ্যযোজনা বজায় রাখার কারণেই হোক বা অন্য কোনো কারণে এমন নরম অথচ খোলতাই হয়েছিল যে এমনকি সেই টিভিসেটে উপস্থিত-মুহূর্তে-গাওয়া গানটার ইম্প্রোভাইজেশন আজও ভুলি নাই। কিন্তু এইটাও ঠিক যে বাবুর গলাটা ইংরেজি গান গাওয়ার খুব উপযুক্ত বলে মনে হতো তখন, সুমিষ্ট হওয়াটা ইংরেজি গান গাওয়ার শর্ত নয় যেহেতু যতটা বাংলা গানে মিষ্টান্ন অত্যাবশ্যক শর্ত বলেই যেন মনে করি আমরা, ওইরকম আরও দুইয়েকজন আমার খুব ভালো লাগত ইংরেজি গানে, একজন যেমন রেনেসাঁ-র বোগি। অ্যানিওয়ে। সেই ঝিরিঝিরি শান্ত ছ্যাঁচা গলায় বাবুর গাওয়া কান্ট্রিরোডস রেন্ডিশনটার স্মৃতি ডেনভার যতবার শুনি ততবার মনে পড়ে। বাচ্চাদের মনোজগৎ, সাচ্চা বর্ষীয়ানগণে ইগ্নোর করুন।

অদ্ভুত একটা ব্যাপার আমার মনে হয় এই গানটার লিরিক্স খেয়াল করে দেখলে। একদম পয়লা লাইনেই দেখবেন দুইটা মাত্র শব্দ বাদ দিলে বাকি সব-কয়টা শব্দই কিন্তু ওখানকার জায়গানাম। কঠিন উচ্চারণের শব্দ দিয়া গান শুরু করে এত সফ্ট টোন্যাল এফেক্ট তৈরি করা, গান জুড়ে সেই সফ্ট টেম্প্যো বজায় রেখে যাওয়া, চাট্টেখানা কথা না এমনকি ইংরেজিতেও। শব্দগুলোর ওজন খেয়াল করুন : ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া, ব্লু-রিজ, শ্যানাডোয়া ইত্যাদি। এবং প্রথম লাইনেই শ্রোতাকে একদম আবিষ্ট করে ফেলা, পেড়ে-ফেলা যাকে বলে, আপনি লিরিকের মধু পান করুন কি না-করুন সুর ও সুরাবেষ্টন আপনাকে আচ্ছন্ন-আচ্ছাদিত করবেই। ইন্ট্রো লাইনটা এ-ই : Almost heaven, West Virginia, Blue Ridge Mountains, Shenandoah River.

এই গানের তুল্য কোনো বাংলা গান, ভাবসাবের দিক বিচারে তুলনার কথা ভাবা হচ্ছে এখানে, আছে কি না ভাবছিলাম। নিশ্চয় আছে, থাকবে না কেন, তবে একেকজনের গোচরে এবং একেকজনের বিচারে একেকটা আসবে গানের নামোল্লেখ। রবীন্দ্রনাথের একটা গানের কথা মনে পড়ছিল : গ্রামছাড়া ওই রাঙামাটির পথ / আমার মন ভোলায় রে। এবং আরেকটা গান হেমন্ত মুখুজ্জের গাওয়া, খুব মশহুর গান কিন্তু লিরিক্স উপস্থিত-মুহূর্তে মুখে যোগাচ্ছে না বলে গাইতে পারছি না, একটু উল্লেখ করলেই মনে পড়ে যাবে আপনার : “পথের ক্লান্তি ভুলে স্নেহভরা … / কতদূর আর কতদূর বলো মা”  … এইটা সত্যি বাড়িফেরার গান বলেই মনে হয়েছে আমার কাছে সবসময়, সেই টেলিকম কোম্প্যানির বিজ্ঞাপনী ঝাপটার ফলে এমন মনে হচ্ছে তা না কিন্তু। বিজ্ঞাপনী গানাবাজানা তো এই সেদিনের মামলা। অথচ মনে হয় যেন কতকাল! আর কতকাল! অনাদি অশেষ বিজ্ঞাপনী ইল্যুশন-ইশারা … যা-ই-হোক, এই ‘পথের ক্লান্তি ভুলে’ গানটাতে ডেনভারের গানের সেই নির্ঝরা বিষাদ আর চিরকেলে হাহাকার শান্তচিত্তে লেপ্টে বসে আছে বলেই মনে হয়েছে আমার কাছে সবসময়।

একনদীতে দুইবার স্নান করা যায় না, কার্যত যুক্তি দিয়া এইটা সিদ্ধ বটে, আজকে যে-নদীতে চান করে এয়েচেন জবাকুসুমসঙ্কাশংবেলায়, সেই একই নদীতে পরক্ষণে আপনি যদি চান করিবারে যান তো সেইটা আলাদা তটিনী, তার আলাদা স্রোত, আলাদা ঢেউ, আলাদা নিঃশ্বাস, আলাদা ঊর্মিমালা। তা ঠিক আছে। কিন্তু গানের বেলায় এই যুক্তি কি খাটে? একেকটা গানে একেকটা আস্ত যৌবন আমরা পার করে দেই, জীবন বইয়ে দেই একেকটা সুরের সংশ্রয়ে, এর একটা মানে বের করা দরকার না? মানে তো ওই একভাবেই বের করা যাবে। ডেনভারের এই একটা গানেই উদাহরণ সীমায়িত রাখুন, দেখেন যে এই একটা গান আপনি প্রতিবার একই মন নিয়া শোনেন না। এবং এই গান শোনার সময় আপনি রোজ রোজ একই ফিলিংস ত্বকে অনুভব করেন না। এবং শোনা শেষ করে একই ফিলিংস নিয়া আপনি শ্যানাঁডোয়া নদীটির নীলজল তটরেখা হইতে ফেরেন না। প্রতিবার কোনো-না-কোনোভাবে নতুন হয়ে ফেরেন আপনি আপনার পছন্দের গানটির ঝর্ণাতলায় স্নান সেরে।

ক্যাসেটযুগে ডেনভার ও অন্যান্য শ্রবণোপভোগ

একদা এক যুগ ছিল ক্যাসেটযুগ নামে, এই দেশে, এই দুনিয়ায়। সেসব অনেক অনেক কাল আগের কথা। ক্যাসেটপ্লেয়ার ছিল তখন, স্টেরিওপ্লেয়ারও বলা হতো, ওই যন্ত্রে ফিতেক্যাসেট পুরে প্লে করতে হতো। এরও আগে ছিল লং প্লে ডিস্ক। অবশ্য আমরা ক্যাসেটযুগের শ্রোতা সাধারণ। আমাদের আত্মীয়বর্গের ভেতর যারা খানিক অবস্থাপন্ন ছিলেন, তাদের আলমিরাতে কালেক্টর্স আইটেম এলপি রেকর্ডের শরীরশোভা দেখেছি ছোটবেলায়। অ্যাবা, ক্যারেন কার্পেন্টার্স, বিটল্স, লেনন, ডিলান, বায়েজ, মার্লে, হ্যারি বেলাফঁৎ প্রমুখ সিঙ্গারদের এলপি ডিস্ক দেখেছি। কিন্তু আমরা এগুলো শুনেছি ক্যাসেটে।

ডেনভার তার ক্যারিয়ার শুরু করেছেন এলপি ডিস্কের যুগে, এর অব্যবহিত বছর-কয়েকের ভেতরেই ক্যাসেটযুগের বোধন হয়। ডেনভার বা ডিলান প্রমুখের গান আমরা আগাগোড়া ক্যাসেটে শুনেছি। তদ্দিনে আমরা নিজেরাও সংগ্রাহক হয়ে উঠেছি বটে। দুই নাম্বারি রাস্তার সংগ্রাহক বলা যায়। নিজেরা ক্যাসেট কপি করতাম নিজেদের পছন্দের বিটের মিউজিক দিয়া। অ্যান্থোলোজি বানাতাম, সম্পাদনা করতাম এর গান ওর গান একত্র করে একেকটা বারোয়ারি গানসংকলন, জমাতাম সেগুলো।

তখন লোক্যাল মার্কেটে এই কায়দার ক্যাসেট, সংকলিত গানের ক্যাসেট, ব্যবসাসফল ছিল। বলছি ইংরিজি গানের কথা। বাংলাদেশে এই ধারার সংকলিত ইংরিজি গানের অ্যালবাম বাজারে ছাড়ত সম্ভবত জিসিরিজ  নামের একটা অডিও বিপণনপ্রতিষ্ঠান। ভুলও হতে পারে আমার। তবে যেটুকু ছবি ভাসছে স্মৃতিতে, তাতে দেখতে পাচ্ছি যে ক্যাসেটখাপের পুটে জিসিরিজ  লোগো। কখনো কখনো সিডি  নামের একটা লোগোও চোখে ভাসে। এগুলো, আমার অনুমান, কপি করে বাজারে ছাড়া হতো। কপিরাইট দৃষ্টিকোণ থেকে এই ব্যাপারটা সামলানো হতো কেমন করে, চ্যানেল-কম্যুনিকেশন সেকালে কেমন ছিল তা তো সহজেই অনুমেয়, কারা আংরেজি নতুন গানের সর্বশেষ-প্রকাশিত অ্যালবাম প্রভৃতির খোঁজপাত্তা রাখতেন, কারা সিলেকশন প্রোসেস ইনিশিয়েইট করতেন, লগ্নিবিনিয়োগ প্রভৃতির সাইজ কেমন ছিল, মোটমাট বিক্রিবাট্টা কেমন হতো, ইন্টার্ন্যাশন্যালি এইটা নিয়া ঘাপলা হতো কি না বা পার্মিশন সিক্ করার কোনো ফর্ম্যাল চ্যানেল ছিল কি না, মোদ্দা কথা কারা এই ইংরিজি গান বাজারজাতকরণজনিত কমার্শিয়্যাল ভেঞ্চারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন ইত্যাদি নিয়া জানা হয় নাই কোনোদিন। জানতে সাধ হয়, যদিও, জানার উপায় দেখি না আজও।

তবে এইটা অস্বীকারের উপায় নাই যে আমরা এই কায়দার বিজনেসওয়ালাদের সার্ভিস পুরামাত্রায় পেয়েছি। কয়জনের আত্মীয়স্বজন এমনটি ছিলেন যে মাসিক-ষান্মাসিক ন্যুয়র্ক-ক্যানাডা যাওয়া-আসা করছেন আর টপচার্ট দেখে অ্যালবাম নিয়ে এসে গিফ্ট করছেন ভাতিজা-ভাগ্নেদেরে? এক-আধবার এমন হয়েছে হয়তো পুরা লাইফটাইমে। কাজেই এইসব কপিয়ার ক্যাসেটকোম্প্যানিগুলো না-থাকলে কেবল আইয়ুব বাচ্চু কিসিমের নকলনবিশ লম্ফঝম্প আর ন্যাকামি দিয়াই জিন্দিগি তৃপ্তিঢেঁকুরে গুজরানো লাগত। নকলনবিশি কথাটার ব্যাখ্যালাপ এইখানে তোলা যাচ্ছে না সাডেনলি ভাল্লুকজ্বরে পড়ে এই নিবন্ধকার বিশেষভাবেই কাতর বিধায়। কিন্তু সরাসরি ডিসক্লোসার দিয়া বাংলানুবাদিত ইংরেজি গান অ্যালবামাকারে বের করার একটা এফোর্ট চালু হয়েছিল, কপিয়ার  নামে বা প্রতিচ্ছবি  ইত্যাদি নামে কয়েকটা অ্যালবামের কথা মনে পড়ে যেখানে পরবর্তীকালে আর্কের ভোক্যাল্ হাসান বা টুলু বা বাপ্পি খান নামে একজন গাইতেন, কপিয়ার  সিরিজাকারে একাধিক অ্যালবাম বেরিয়েছিল মনে আছে, এবং মন্দ ছিল না ব্যাপারটা। কিন্তু অচিরে এই ধারাটা বন্ধ হয়ে যায়। এবং শুরু হয় অ্যাক্নোলেজ না-করে দেদারসে ইংরিজি গান নকল করে ব্যান্ডদলগুলোর গান করার হিড়িক। এই লাইনের বিরাট নকলিস্ট বলা যায় এবি কিচেনের বাবুর্চি মশাইকে। নামজাদাদের মধ্যে অন্যরাও করত। সোলস  করত বা অবস্কিউর, সেগুলোকে অসদুপায় না-বলে একটা স্বাদবদলের চেষ্টা হিশেবে দেখা যাইতে পারে, যেমন ফিডব্যাক  তথা মাকসুদ অ্যাক্নোলেজ করে ইংরিজি গানের ঋণ স্বীকার করতেন সতর্কভাবে। কিন্তু বাচ্চু এক্ষেত্রে পাক্কা নকলিস্ট, পরীক্ষাপাশের পূর্বরাত্রিতে চোথা কাটার উস্তাদ। ক্ষতি করেছেন অনেক, এরা, এই আইয়ুব বাচ্চু কোং বাংলাদেশের বাংলাগানের। সম্মানী লোকের মানহানি উচিত হচ্ছে না। খামোশ!

নানা রকমের নাম দিয়া অ্যালবাম বেরোত, একক শিল্পীর একক অ্যালবাম ছিল, সবচেয়ে বেশি বিক্রি হতো বা আমরা কিনতাম চয়নিকা টাইপের ক্যাসেটগুলো। কবিতার ক্ষেত্রে বাংলাঞ্চলে যেমন ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ সিরিজ গ্রন্থের কাটতি খুব, তদ্রুপ ইংরেজি গানের ক্ষেত্রে প্রেফার করতাম আমরা বেস্ট  তকমা-আঁটানো সংকলনগুলো খরিদ করতে। এই সিরিজের প্রচুর পণ্য ছিল বাজারে। এবং উপকারী ছিল সমস্তই। ছিল এইরকম : বেস্ট অফ বব ডিলান, বেস্ট অফ বব মার্লে, বেস্ট অফ জোয়ান বায়েজ, বেস্ট অফ বিটল্স, বেস্ট অফ জন লেনন, বেস্ট অফ বনি-এম, বেস্ট অফ অ্যাবা, বেস্ট অফ মাইকেল্ জ্যাকসন্, বেস্ট অফ এল্টন্ জন্, বেস্ট অফ বন্ জোভি, বেস্ট অফ ইগল্স … অনেকানেক আরও আরও। বেস্ট অফ ম্যাডোনা, বেস্ট অফ মারায়া কেরি, বেস্ট অফ স্টিভি ওয়ান্ডার, বেস্ট অফ ব্রায়ান্ অ্যাডাম্স প্রভৃতি ছিল। হুইটনি হিউস্টন্ শুনেছি এই তরিকায় ‘বেস্ট অফ’ সিরিজের অন্তর্ভুক্ত অ্যালবাম থেকে। টুপাক্ শাকুর প্রমুখ র‌্যাপ সিঙ্গারের ‘বেস্ট অফ’ অ্যালবামও খুব কাটতি গিয়েছে একসময়। এইভাবে একসময় বেস্ট অফ জন্ ডেনভার শোনা হয়েছে। সেইটা কবে, কোনকালে, নির্ণয় ন-জানি।

আরেকটা সিরিজের ইংরিজি গানের ক্যাসেটমালা ছিল বাংলাদেশের সাধারণ শ্রোতার নাগালে। এভারগ্রিন ল্যভ স্যংস্ শিরোনামে সেই সিরিজ বেরোত বাজারে। সেইটার কাছেও আমাদের ন্যায় কমন লিস্নারদের ঋণ অনেক। নানা ক্যাটাগোরির ব্যান্ডের ও সোলো-আর্টিস্টের গান স্থান পেত সেই সিরিজে। এছাড়া আলাদাভাবে অ্যালবাম ক্রয় করা যেত মশহুর টপচার্টগুলো। বব ডিলানের ব্লোয়িং ইন দ্য উইন্ড  নামে একটা অ্যালবাম পাওয়া গিয়েছিল, পরে একটা ফর দ্য টাইমস দে আর অ্যা চেইঞ্জিং  শিরোনামে। ডেনভার আলাদাভাবে অ্যালবাম পূর্ণাঙ্গ পাইনি কোনোদিন, তার অ্যালবামওয়াইজ কোনটাতে কি গান আছে বা কোনটা আগে কোনটা পরে এইসব জানতে পেরেছি ইন্টার্নেটযুগে এসে, কিন্তু ডেনভারের গানগুলোর কয়েকটা এভারগ্রিন ল্যভ স্যংস্  সিরিজের আওতায় পেয়েছি এবং ইংলিশ কান্ট্রিমিউজিক  অভিধায় একটা ক্যাসেটসিরিজ বেরিয়েছিল সেইখানে ডেনভারের আগে-না-শোনা গান পেয়েছি বেশকিছু। তো, ফুরিয়ে এসেছে আয়ু এইভাবে। কেবল মনে আছে যে ডায়ানা প্রয়াণের পরে এল্টন জনের ‘ক্যান্ডল ইন দ্য উইন্ড’ নামে — যে-গানটা এল্টন বেঁধেছিলেন মেরিলিন মনরো অন্ত্যেষ্টিদিনের অনুষ্ঠানে ট্রিবিউট জানাতে এবং “গুডবাই নোর্মা জিন্” পঙক্তি দিয়া স্টার্ট-করা সেই গানটাই প্রিন্সেস ডায়ানার মৃত্যুসৎকারদিনে গেয়েছিলেন “গুডবাই ইংল্যান্ড’স্ রৌজ্” পঙক্তি দিয়ে লিরিক্সে নেসেসারি এডিটিংগুলো করে — এবং অন্যান্য নানান নামে নানান মোড়কে একাধিক অ্যালবাম এসেছিল বাজারে। ম্যাডোনা-জ্যাকসন-কেরি এমনকি জ্যানেট জ্যাকসনের অ্যালবামও মার্কেটে আলাদাভাবে পাওয়া যেত প্রত্যেকটা বেরোবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে।

এছাড়া আর্টিস্ট মারা গেলে, বিশেষত অপঘাতে অক্কা পেলে, আমরা মার্কেটে যেতাম খোঁজপাত্তা লাগাতে অ্যালবাম এল কি না নতুন কিছু। দোকানদারের আশ্বাস মিলত এবং অব্যবহিত কিছুকালের মধ্যে আশ্বাস রূপ নিত বাস্তবে। এইভাবে ক্যুর্ট ক্যুবেইন শোনা হয়েছে, নির্ভানা জানা হয়েছে, ডেনভারপ্রয়াণের পরে যেমন অনেক গানের সমাহারে একাধিক অ্যালবাম বাজারে ছাড়া হয়েছে। এর মধ্যে একটার নাম ছিল ‘লিভিং অন অ্যা জেটপ্লেইন’, জ্বলজ্বলে ক্যাসেটখাপটা ভাসছে স্মৃতির মুকুরে। স্মৃতির মুকুর? জিনিশটা কি গো? কোন মার্কেটে অ্যাভেইলেবল এই কমোডিটি? কী জানি, ঠাকুরপো, বলতে পারি না। বাজার বুঝলে তো আর ছাদের চিলেকোঠায় সেদিন মরতে যেতুম না। আজ্ঞে, সেইটাই।

কিন্তু এই ইন্ডাস্ট্রিটা কারা চালাতেন, কেমন করে অপারেইট করা হতো গোটা ব্যাপারটা, ভারি ইচ্ছা হয় জানতে। এইগুলো জানা আবশ্যকও মনে হয়, বাংলা গানের বাজারে পাইরেসি-রয়্যাল্টি ইত্যাদি ইশ্যুতে আমাদের ‘বামবা’ নাকি কিসব অ্যাক্টিভিটি করে বেড়ায় শুনি, কী ছাতার মাথা কাম করে বুঝি না। খালি তো দেখি মান-অভিমান, সম্মান নিয়া ভাবনাভাবনি, আর লম্বা বেঞ্চে লাইন ধরে লঙ্গরে বসে মানভঞ্জনমূলক সাংবাদিক সম্মেলন। পারলে এইসব পুরানা কাসুন্দি ঘাঁটুক, ইতিহাস লিখুক অডিও ইন্ডাস্ট্রির উন্মেষকালের, কাজের কাজ হবে একটা। বাকিটুকু করার লোক তখন আপনাআপনিই আগায়া আসবে। এইসব করলে টেলিভিশনবাইট কম পড়বে হে! এইসব করলে ফোনোলাইভে যেয়ে গোবাদিজন্তুর গলা-ফেইল-করা আলাপপ্রলাপ করবে কে! এইসব করলে অ্যাঙ্কর অপ্সরার সামনে মিনি ইন্টার্ভিয়্যু আর ডেইলি নিউজপেপারের ফানম্যাগাজিনে রম্য গুগলিবলে ব্যাট করবে কে! কাজেই এইসব করা যাবে না। ফায়্শা বাত এসব। আমরাই ইন্ডাস্ট্রি। আমরাই ইতিহাস। অডিওশিল্পের বাপ-মা আমরা। কাজেই আর কারো কন্ট্রিবিউশন নিয়া আলাপ জমাবার দরকার আমাদের নাই। খালি মাঝে মাঝে একটু রয়্যাল্টি-পাইরেসি নিয়া বিপ্লবী-হৈদরি হাঁকডাক ইত্যাদি আমাদের রুটিনকাজের আওতান্তর্ভূত। জয় বামবা ভোলানাথ! জয় মধ্যরাতের অ্যাঙ্করপটানো ফোনোলাইভ!

শীতশুক্রবার আর জন্ ডেনভার

হলিডেহোমের মধ্যাহ্নরোদে উড়ছে ডেনভারের সুর … শ্যাংহাই ব্রিজেস  গানের ঝিরিঝিরি লাইনগুলো উড়ে উড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে সোনালি ডানার মিহি চিলবর্ণা শুকনো-স্বচ্ছ দুপুরে, লঘুডানা ঘাসফড়িঙের ভোরে, কলাপাতাসান্দ্র সন্ধ্যার পুকুরে … Shanghai breezes cool and clearing, evening’s sweet caress / Shanghai breezes soft and gentle, remind me of your tenderness … এ-ই তো জীবন, ভাইবন্ধুপ্রিয়তম, মুখোমুখি বসে একটুখানি জিরিয়ে নেবার অবকাশবাতাস … এ-ই তো, দোবারা না-মিলেগি ইয়্যে জিন্দেগি, দিস্ ইজ ইট, ইয়্যে হ্যায় ইটার্নিটি ইয়্যার, হিংসায়-কেলেঙ্কারিতে-কর্দমকেলি-কূটকচালিতে ভেসে থেকে মরিয়া যাবার আগে একটাবার জিনে-লো, থোড়া-সা সানশাইনি ওয়াইন পিনে-লো, বয়ে যায় বেলা ওহো, বহিয়া যায় বিনালে-বেতালে যেটুকু তোমার আপনা ভাগের জীবন বরাদ্দ, হুঁশ-মে আও মেরি মুন্না, আ যা নাচ লে, এ-ই তো ফুড়ুৎ উড়িয়া যায়গা যামিনীদিবসো, তোমার বড়াই-বারফট্টাই তোমার সাধের জীবন তোমার সময় সখা হে, এ-ই তো … তোমার আশনাইপ্রিয় মহাচিরকল্য, তোমার গরিমার মনোবৈকল্য ও কলাকৈবল্য … মন ভরে শুনে নেবার জন ডেনভার রহিয়া রহিয়া গাঙের অদূর দিয়া যায় বহিয়া … I just can’t seem to find the words I’m looking for to say the things that I want to say … And your face in my dreams is like heaven to me … And your love in my life is like heaven to me … ইন দি সেইম স্যং, শুরুর দিকটায়, এবং ব্যালাড আঙ্গিকের গানটায় রিফ্রেইনের ন্যায় ফিরে ফিরে শেষে-শুরুতে-মধ্যপথে এই লাইনগুলো ছোঁয়া যায় : And the moon and the stars are the same ones you see / It’s the same old sun up in the sky / And your voice in my ear is like heaven to me / Like the breezes here in old Shanghai …

সকালবেলার ঝুমকোজবার ঝাড়, সকালবেলার হলুদ-সবুজ প্রিন্টের পাতাবাহার, সকালবেলার বাতাসে খুশবু সুরমা নদীটার। শক্তি চাটুজ্জের কবিতার ন্যায় দ্যাখো সকালবেলাটা আজিকা সাধ্যাতীত ভালোবাসিবার। বুদ্ধ বসুর ‘চিল্কায় সকাল’ যেমন — কী ভালো লাগল আমার আজ এই সকালবেলায় — অবিকল না-হলেও সকালটা আজি তেমনই অনেকটা, দ্যাখো। সরোদ মিঠা হাওয়া দ্যাখো গুঞ্জরিছে : এ-ই, হ্যাঁ, এ-ই হয় শীতশুক্রবার। শীতের হাওয়ায় লাগল নাচন অড়বড়ইয়ের স্নিগ্ধা পাতায়, কাণ্ডবাসী পিঁপড়াগায়ে, ডালে ডালে। কেমন করে এই শীতশুক্রবার, এই সকালবেলাটা, সনাক্ত করবে সঠিক? প্রশ্নটা আদৌ কঠিন নয়, এবং উত্তরও তো কমন। সকালবেলা কোনোকালেই বিকেলবেলা নয়, শীতশুক্রবার নেভার এভার ছাইগ্রীষ্মবুধবার। আর শীতশুক্রবার সনাক্ত করার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ডিটেক্টর হলো জন ডেনভার। অবশ্যই জীবনানন্দও। শোনো সুপুরিবিরিখে নারকেলশিরে লতিয়ে-চুঁইয়ে ডেনভারের হার্মোনি। গিটার উড়িছে তা-তা-থৈ-থৈ ঘুড়ির মতো রৌদ্রাঢ্য প্রভাতাবহ জুড়ে। দ্যাখো অবকাশ গাছে গাছে, গুল্মঝোপে, সঘন নীলিমায়। দ্যাখো পোর্টিকোর অদূরবর্তী ঝিমন্ত প্রগাঢ় কার্তিকী। চিরিপচুরুপ চড়ুইঠ্যাঙে অবকাশ দ্যাখো উড়িয়া উড়িয়া যায় …

শীতের সকালের তুল্য সুন্দর ও সাংসারিক সুগন্ধিস্নিগ্ধ কিছুই হয় না আর। শীতকালে, সকালের দিকে, কী মর্ম-উচাটন ম-ম সুঘ্রাণে ঘিরে থাকে পৃথিবী ও পরিপার্শ্বস্থ সমুদয় পরিমণ্ডল! এত ঘন ও গাঢ় শৈশবমুখর মুহূর্ত অন্য ঋতুতে সহজে পাওয়া যায় না। শীতসকালের রোদ দেখলেই চোখে ভেসে ওঠে ছেলেবেলাসেল্যুলয়েড। মনে পড়ে যায় ছেলেবেলার শীতরোদে বারান্দাকোণে কিংবা উঠোনে বসে বা জানালাশিক ধরে কী করতাম, কী খেতাম, কী চাইতাম। মনে পড়ে — কেবল কবিতায়-কত-করে-ডেকে-ফেরা সাহচর্যের সর্বোচ্চ লক্ষ্য তদানীন্তন জনৈক রুবি রায় নয় — থেকে থেকে মনে পড়ে কমলালেবুর খোসা। কাকাতুয়া কালারের সূর্যশস্য সকালবেলাকার রোদ-পোহানো। মৌসুমী ভৌমিকের একটা গানে এই শীতসকালবেলাটা এসেছে একবার। “ছেলেবেলার পাহাড় আমায় ডাকে / হাওয়ায় হাওয়ায় মায়ের গন্ধ থাকে” — এই দুইটা লাইন দিয়া গানের শুরুয়াৎ। পরে একটা জায়গায় এসেছে এমনটা : “মায়ের গন্ধ / হাওয়ায় / কমলালেবুর গন্ধ থাকে”। এই এলাকাটার সঙ্গে মৌসুমীজির গাঁটছড়া বাল্যকালের, করিমগঞ্জ-শিলচর এলাকায় কেটেছে শৈশব তার, শ্রীহট্টেরই এক্সটেনশন জলবায়ুভূগোলবৈশিষ্ট্যের দিক থেকে এক-অর্থে। কে-না জানে সেই মশহুর অ্যানেকডোট্যাল, যেখানে সৈয়দ মুজতবা আলী গিয়েছেন গুরুদেবের শান্তিগৃহে, এবং জবান শুনে গুরুদেব মুজতবামুখবিবর হইতে কমলালেবুর গন্ধ লভেছিলেন? অতএব ব্যাপারটা তো গুরুদেব কর্তৃক প্রত্যয়নপ্রাপ্ত তথা সার্টিফায়েড যে এতদঞ্চলের জলবায়ু কমলালেবুগন্ধা। আমাদের ছেলেবেলাকার কীর্তিকলাপের সঙ্গে শীতসকালের রয়েছে ভারি ওতপ্রোত যোগ। শৈশব আর শীতকাল, আমাদের জীবনাভিধানে, সমার্থক যেন। তাই বলে গ্রীষ্মকালিক ছেলেবেলাস্মৃতি স্পষ্ট মনে পড়ে না তা-ও নয়। কেমন যেন শীত এলেই হুড়মুড়িয়ে এসে যায় শৈশব। মৌসুমী ভৌমিক জানেন, আর জানেন জন্ ডেনভার, যুগপৎ মাতৃগন্ধ ও কমলালেবুগন্ধবহা হেথাকার শীতশুক্রবার।

গানটা স্টার্ট করছে কেমন উইন্টারবিউটি নিয়ে যেন, মনে হয়, সুরে ও লিরিকে মাখোমাখো সুপর্ণা শীতটুকু সেই : It’s funny how you sound as if you’re right next door / When you’re really half-a-world away — এর দুই লাইন পরে যেয়ে বলছে : I can’t remember when I felt so close to you / It’s almost more than I can bear / And though I seem a half-a-million miles from you / You’re in my heart and living there — এ তো সুপর্ণাকাল! এভাবেই ইন্টার্প্রেট করতে বেশ লাগে, শীত তো কেবল ভাস্কর চক্কোত্তিরই নয়, পৃথিবীনিবাসী আরও-আরও অনেকেরও সে প্রেমিকাঋতু। কবে এসেছিলে তুমি জীবনে মম, কবেকার কোন ধূসর অতীতে, সহে না এত সুদীর্ঘা যাতনাবাহী বিরহবর্ষাবাদ্যি। ডিয়ার উইন্টার, ডিয়ার ডিয়ার শীতশুক্রবার, আইসো জয়রাধে হে! নেক্সটডোর নেইব্যর আমার, “রাধা তো সামান্য নয় গো শ্যামের মনজোড়া”, য়্যু’য়ার ইন মাই হার্ট অ্যান্ড লিভিং দ্যেয়ার। ঋতুশ্রেষ্ঠা উইন্টার, প্রিয় সুপর্ণাকাল, তুমি কার? উত্তর : সদ্য যে প্রেমে পড়ে পর্যুদস্ত নাস্তানাবুদ, সেই নিয়তিনির্দিষ্ট বোকাটার। There are lovers who walk hand in hand in the park / And lovers who walk all alone / There are lovers who lie unafraid in the dark / And lovers who long for home … সেইটাই। কাজেই, জীবনানন্দে যেমন : “হাতে হাত ধরে ধরে গোল হয়ে ঘুরে ঘুরে ঘুরে / কার্তিকের মিঠে রোদে আমাদের মুখ যাবে পুড়ে” — ডেনভারেও অনেকটা বাংলারাজ্যির উইন্টার লাভ করা যায়।

অ্যালাস্কা, অ্যাস্পেন্, ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া

জিয়োগ্রাফিগ্রন্থ তথা ভূগোল বইয়ের তথ্য অনুসরণ করে গেলে অ্যালাস্কা জায়গাটা পাওয়া যাবে অ্যামেরিকায়। এইটা অ্যামেরিকার দুইটামাত্র স্টেইটের মধ্যে একটা যার চারধার খোলা, মানে এর সীমান্তরেখায় বেষ্টন-করা অন্য কোনো স্টেইট নাই, অ্যামেরিকার স্টেইটগুলোর মধ্যে এমন বৈশিষ্ট্যের দ্বিতীয় ভূমিখণ্ড হলো হাওয়াই। অ্যামেরিকার অন্য যে-কোনো অঙ্গরাজ্যের তুলনায় এখানে, এই অ্যালাস্কায়, সমুদ্রোপকূলরেখা দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে বেশি। এর সাউথে আছে প্যাসিফিক ওশ্যান এবং নর্থে আপনি পাবেন অ্যার্কটিক ওশ্যান। ল্যান্ড অ্যারিয়ার দিক থেকে অ্যালাস্কা হচ্ছে অ্যামেরিকার লার্জেস্ট স্টেইট। আয়তন ৫,৭০,৩৮০ বর্গমাইল তথা ১৪,৭৭,৩০০ বর্গকিলোমিটার। দ্বিতীয় বৃহত্তম স্টেইট হচ্ছে টেক্সাস। আয়তনের দিক থেকে টেক্সাসের দুই গুণেরও অধিক অ্যালাস্কাভূখণ্ড। ভূখণ্ড না-বলে জলখণ্ড বললেও হয়, কিংবা হিমবাহখণ্ড, কেননা অ্যালাস্কার বৃহত্তর অংশই তো বরফ। বরফের বন, বরফপাহাড়, বরফেরই উপত্যকা-অধিত্যকা আর চড়াই-উৎরাই। ফ্রোজেন ওয়াটার, গ্লেসিয়ার/হিমবাহ ফর্মে, অ্যালাস্কার ওয়াইল্ডার্নেস্ অধিকতর দুর্ধর্ষ করে রেখেছে। অ্যাপ্রোক্সিমেইটলি ১৬০০০ স্কয়ারমাইল বা ৪১০০০ স্কয়ারকিলোমিটার জুড়ে রেখেছে গ্লেসিয়ারগুলো। ফলে এখানকার রোদ, এখানকার ঝড়, এখানকার রাত্রি ও সন্ধ্যা ও দুপুরগুলো আপনি কল্পনা করে নিতে পারেন। অভিযানপ্রিয় হলে সেই কল্পনায় আপনি অ্যালাস্কার খানিকটা টেইস্ট জিভে পেয়ে যেতে পারেন বৈকি।

কিন্তু ভূগোলবইয়ের বাইরে একটা অ্যালাস্কা আছে, সেইটে পেতে পারেন আপনি সিনেমায়, সেই অ্যালাস্কা আপনার দু-নয়নে ঘোর ঘনায়ে আনবে, আপনার নিদ্রা হারাম করে তুলবে, আপনার পায়ের তলায় সর্ষের সুড়সুড়ি দিয়া আপনেরে দিব্যোন্মাদ বানায়ে ফেলবে, শেষমেশ আপনি বাধ্য হবেন পয়সা ও প্রেরণার অভাবে অ্যালাস্কাস্বাদ সিলেটের দুর্গম হামহাম ঝর্ণা বা বিছনাকান্দি কিংবা জাফলং-জৈন্তা এলাকায় যেয়ে বা উল্টোদিকে যেমনটা বান্দরবনের নীলগিরি বা খাগড়াছড়ির কোনো ওয়াইল্ড সেটিংসে যেয়ে মেটাতে। এখন দুধের স্বাদ ঘোলে হইলেও মেটাতে পারা গেলেই তো হলো। তো, ম্যুভিতে আপনি অসংখ্যবার অসংখ্যভাবে অসংখ্য ফ্রেমে পেয়েছেন অ্যালাস্কার দেখা। অ্যালাস্কার ক্যাল্ভিং গ্লেসিয়ার, ম্যাটানাস্কা গ্লেসিয়ার, তার কিনাই পেনিনসুলা আর কিনাই নদীটি, তার মাউন্ট স্যানফোর্ড, সাউথইস্ট অ্যালাস্কার নয়নাভিরাম ঝিমলাগা পাথুরে-বরফভেদ্য নদীদৃশ্যাবলি, বিশালাকার ওই দ্বীপমহারাজ্য জুড়ে ছড়ানো জ্যান্ত অগ্নিগিরিগুলো, টেক্সাস-ক্যালিফোর্নিয়া-স্যানফ্র্যান্সিস্কো অঞ্চলের ওয়াইল্ড ওয়েস্টার্ন অ্যাটমোস্ফিয়ার আপনি পেয়েছেন প্রচুর ম্যুভিতে। একটি সিনেমা এখানে একটু স্মরণ করা যাক। শন্ পেন্ এইটা বানিয়েছেন ২০০৭ সালে। যাকে বলে সত্যি-ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্র। ইন্টু দ্য ওয়াইল্ড  সেই সিনেমার নাম। সমনামী একটা আখ্যান অনুসৃত ম্যুভিতে লেখ্যরূপের আখ্যানকার জন ক্রেইকর ক্রেডিটলাইনে অ্যাক্নোলেজমেন্ট পেলেও শন্ পেন্ ম্যুভিটা বানিয়েছেন চলচ্চিত্রিক চোখ বজায় রেখেই। ননলিনিয়ার ন্যারেটিভে এগিয়েছে সিনেমা, আগুপিছু গল্পের সুতা নানান জায়গায় ছিটিয়ে-ছড়িয়ে, কিন্তু করতে যেয়ে সিনেমাকারের কের্দানি দেখাইতে ব্যস্ত হন নাই ডিরেক্টর। ফলে এইটা অ্যালাস্কা ট্র্যাভলগ ম্যুভি হিশেবে একটা আনফর্গেটেবল ম্যাগনামোপাস। বায়োগ্রাফিক্যাল ড্রামা আঙ্গিকের ম্যুভি। ক্রিস্টোফার ম্যাকক্যান্ডলেস্ নামে এক তেইশবর্ষীয় তরুণের বিয়োগান্ত অভিযানোপাখ্যান। গৌতম বুদ্ধের ন্যায় একদিন সহসা সেই তরুণ ক্রিস্, সদ্য গ্র্যাজুয়েশন কম্প্লিট-করা ঝাঁ-চকচকে অ্যামেরিক্যান উচ্ছ্বল যুবা, বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে সারাক্ষণ-ঝগড়াঝাটিরত ধনাঢ্য বাপ-মা আর একমাত্র ছোটবোন কাউকে কিচ্ছুটি না-জানিয়ে, ঘটনাটা নব্বইয়ের গোড়ার দিককার, বেরোবার আগে স্বেচ্ছায় নিজেকে কপর্দকশূন্য করে নেয় ক্রিস্। এরপর দু-বছর ধরে তার অভিযান আমরা দেখতে পাই ক্রিসেরই দিনলিপি ফলো করে যেতে যেতে, যে-দিনলিপিটি ক্রিস্ লিখে গেছে প্রতিদিন শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও গভীর ধ্যানের সঙ্গে, ধূলিঝড় আর তুষারঝঞ্ঝা সমস্তকিছুর ফাঁকে-ফাঁকে, এই দিনলিপি ভর করেই ১৯৯৬ সনে জন ক্রেইকর তাঁর উপন্যাসখানা লেখেন মর্মে আমরা সিনেমার ক্রেডিটকার্ডে দেখে উঠব অন্তিমে, এবং শন্ পেন্ ম্যুভি বাঁধেন ক্রিস-পরিবারের সকলের সম্মতি ও সাপোর্ট নিয়ে ২০০৭-এ এসে। উল্লেখ্য, ক্রিস্ গোড়া থেকেই চেয়েছে অ্যালাস্কায় যেয়ে ইন্টু দ্য ওয়াইল্ড বসবাস করবে, ন্যাচারের সঙ্গে নিজেরে লেপ্টে লাইফ লিড্ করবে। বহু ঘটনার পরে সে পৌঁছায় অ্যালাস্কা অঞ্চলে। একটা পার্বত্য জঙ্গুলে ব্যারেন জায়গায় শেষমেশ পরিত্যক্ত একটা গাড়ির ভেতরে সে তার আস্তানা/ক্যাম্পকটেজ বানায়ে নেয়, যে-বাসগাড়িটাকে ক্রিস্ তার ডায়রিতে উল্লেখ করেছে ম্যাজিক বাস্ বলে, দুই-বছরের একটু অধিক কালের শেষটায় ক্রিস্ ঘটনাচক্রে পয়জোনাস্ প্ল্যান্ট খেয়ে ধীরে ধুঁকে ধুঁকে মারা যায়। মৃত্যুর দু-হপ্তা বাদে এক শিকারীদলের মারফতে দুনিয়া জানতে পারে এই বুদ্ধপ্রতিম গৃহত্যাগী অ্যালাস্কাফ্যাসিনেইটেড অভিযাত্রীর খোঁজ। পাওয়া যায় তার বইপত্র, অল্প কয়েকটা জামাকাপড়, খাদ্য সংগ্রহের নিমিত্তে হাতে-বানানো সরল অস্ত্র গুটিকয়, শিকারযোগ্য পয়েন্ট-টুটু ক্যালিবার একটা রাইফেল, ক্যামেরা, এবং পাওয়া যায় ক্যামেরার আনডেভেল্যপড ফিল্মের ভেতর ক্রিসের একটা সেল্ফপোর্ট্রেইট ফোটোগ্রাফ, যেখানে ম্যাজিকবাসের গায়ে হেলান-দিয়া হাসিমুখ বহুদিনের-না-কামানো শ্মশ্রুমণ্ডিত বিষণ্ন-অথচ-সুখী ক্রিস্, পাওয়া যায় পানির জ্যারিক্যান, নোটবুকগুলো আর কাঠখণ্ডে-গাছবাকলে লেখা আরও কত কথাবার্তা ক্রিসের প্রকৃতিজীবনের! ক্রিসের দেহাবশেষছাই নিয়া তার সহোদরা অ্যালাস্কা অঞ্চলে ছিটাইয়া দিয়া আসেন পরে, হেলিকপ্টারের উইন্ডো দিয়ে, এইটা সিনেমার এন্ডনোটে লিখে দেখানো হয়। এবং এই সিনেমার গান আর গতি আর সুর! অনন্যসাধারণভাবে পার্ফেক্টলি পুট করা হয়েছে এর ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক। নামভূমিকায় টেরিফিক অভিনয় করেছেন এমিল্ হির্শ। রয়েছেন ক্যাথ্রিন কিনার, অনেকটা জায়গা জুড়ে, যারা সাধারণ-সুরতে-ও-বেশভূষায় অসাধারণ এই প্রায়-প্রৌঢ় অভিনেত্রীটির প্রেমিক তারা অনেকদিন পরে একটা ম্যুভিতে দেখবেন তাঁকে যথারীতি সুন্দর ও স্নিগ্ধ অর্থে সম্মোহনীয়। অবয়বে-ও-অভিনয়ে পিচ্চি ক্রিস্টেন স্ট্যুয়ার্ট ছোট্ট একটা রোলে এক্টিং করেছেন, যথাপূর্ববৎ, নট সো ইম্প্রেসিভ। সর্বোপরি এখানে অভিনয় করেছে ক্রিসের ডায়রিগুলো, বইগুলো, সেই জিপ্সি ওয়াগনভ্যানগুলো, জঙ্গলে অ্যাব্যান্ডোন্ড সেই ম্যাজিক বাস্, বরফপাথারের পথঘাটের গাড়িঘোড়ামানববিরল ট্রেইলগুলো। সর্বোপরি অভিনয় করেছেন সুমহান-সুকান্তকায়া অ্যালাস্কা।

খালি সিনেমায় নয়, অ্যালাস্কার সঙ্গ-স্পর্শ ও সাক্ষাৎ লাভ করা যায় গানেও। ইংরিজি গানে। স্পেশ্যালি ইংলিশ কান্ট্রি মিউজিকে। ডেনভারের গান ও জীবন উপচে-ওঠা অ্যালাস্কায়, অ্যাস্পেন ও ওয়েস্ট-ভার্জিনিয়া এলাকার অগোছানো নিসর্গে, রকিপার্বত্য প্রকৃতির বুনো ঐশ্বর্যে, শ্যান্যাঁডোয়া নদীটির শিরশিরি হাওয়ায়। ডেনভার যদিও নিজের নিবাসভূম গড়েছেন পরে অ্যাস্পেন অঞ্চলে, অ্যাডাল্ট লাইফের পুরোটা তিনি ওই কলোর‌্যাডো লোক্যালিটিতে স্বোপার্জনে-গড়ে-তোলা বাড়িটির প্রেমে বাঁধা ছিলেন আষ্টেপৃষ্ঠে, ডেনভারের লেখা ও গাওয়া ‘অ্যাস্পেন গ্লু’ গানটা দ্রষ্টব্য ও শ্রবণব্য, কিন্তু জন্ম থেকেই তিনি বাপের মিলিটারি জীবিকার সুবাদে কাটিয়েছেন নানান জায়গায়। অ্যাস্পেন বলি বা কলোর‌্যাডো, ওয়েস্ট-ভার্জিনিয়া বা টেক্সাস বা আরও-অন্যান্য-যে-কোনো মেক্সিক্যান বর্ডার টেরিটোরির লোক্যালিটি, সবখানকার প্রকৃতি কিন্তু অভিন্ন না-হলেও সমনৈসর্গিক। বর্ণিত সমস্ত অঞ্চলরাজির ভেতর অ্যালাস্কাফ্লেভ্যর দুর্লক্ষ নয়। এবং জিন্দেগিভর ডেনভার যত গান লিখেছেন ও গেয়েছেন — মোটের ওপর ডেনভারের গাওয়া শ-তিনেক গানের মধ্যে প্রায় দুইশ গানের লিরিক্স তার নিজের লেখা — সর্বত্রই নিসর্গশোভা অ্যালাস্কা না-হলেও অলমোস্ট অ্যালাস্কাই। বিখ্যাত তিনি কলোর‌্যাডো রকি মাউন্টেন এবং স্যারাউন্ডিং ন্যাচারের ভাষ্যগীতিকার হিশেবে। অ্যালাস্কাই কি নয় সেইসব এলাকার রৌদ্রবৃষ্টিগুলো, অটম ও স্প্রিংগুলো, ঝকমকা পাহাড়চূড়া আর অগোছানো রুখোশুখো প্রস্তরবন্ধুর পথের পাশের গিরিশৃঙ্গগুলো? স্থানিক নাম হিশেবে অ্যালাস্কা এসেছে একের-পর-এক গানে, এসেছে অ্যাস্পেন, কলোর‌্যাডো তো বটেই, ওয়েস্ট-ভার্জিনিয়া আর অন্যান্য অনেকানেক। শব্দ হিশেবে অ্যালাস্কা হয়তো গীতিস্তবকে নাই কিন্তু বর্ণনানুসারে সেইটা অ্যালাস্কাই — এমন তো তার প্রায় সব-কয়টা গানই। কলোর‌্যাডো অঙ্গরাজ্যের ঘোষিত পোয়েট লরিয়েট তিনি সেই নাইন্টিন-সেভেন্টি-ফোর থেকে অদ্যাবধি। রিসেন্টলি, ২০০৭ সালে এসে, ডেনভারের ‘রকি মাউন্টেন হাই’ গানটাকে স্টেইট স্যং করে নিয়েছে কলোর‌্যাডো রাজ্যপ্রশাসন। গোটা ক্যারিয়ারে এই গানটা ডেনভার গেয়েছেন বেশুমার কন্স্যার্টে, রেকর্ডে, নানান লেবেলের সংকলনে। এই প্রেম, এই উন্মাদনা, এই পাথর-চেরা পার্বত্য ঝর্ণা আর ঈগলের-খরশান-চক্ষুজাত ঔদাস্য অঙ্গে লয়ে ডেনভার দেহ ছাড়লেন অ্যালাস্কাপ্রাকৃত সমুদ্রতটরেখাকিনারায়, এবং তারও দেহভস্ম ছড়িয়ে দেয়া হলো উড়োযানের উইন্ডো গলিয়ে অ্যালাস্কাপ্রান্তেই।

অ্যালাস্কা নিয়া বাংলায় একটা কবিতা আপনি পড়ে নিতে পারেন, কবিতাটা ‘আলাস্কা’ নামে লিখেছেন কবি সুমন রহমান, ‘সিরামিকের নিজস্ব ঝগড়া’ নামে যে-একটা কবিতার বই আছে দুনিয়ায় সুমন রহমানের, সেইখানে এইটা সুলভ। ভুল বলা না-হলেও কথাটা আদৌ ঠিকও বলা হলো না যে কবিতাটা অ্যালাস্কা নিয়ে লেখা। আদতে কবিতা কোনোকিছু নিয়ে লেখা হয়ও না। মানে একটা-কিছু উপজীব্য/উপলক্ষ্য করে লেখা হলেও কবিতা শেষ-পর্যন্ত ওই উপব্যাপার থেকে বেরিয়ে এসে ব্যাপ্ত করে ফেলে আরও অনেককিছু। যদি না-করতে পারে, সেইটা তাইলে তো কবিতাই না। বা কবিতাই, জীবনানন্দের সেই বিখ্যাত ‘কবিতা অনেকরকম’ উক্তির লাইসেন্স তো মর্দে-মিল্লাত বেঙ্গলি পোয়েটের পাছপকেটে কালাশনিকভের ন্যায় সদা জাগ্রত ও আগুনোদ্গীরণে উদ্যত, যা নিয়ে লেখা হইল তার ইঞ্চিখানেক দূরে না-যেয়ে বরং তাহাতেই ঘুরপাক খাইতে থাকিল ধরনের কবিতাও জরুর জীবনোবাচ সো-মেনি-টাইপ-অফ কবিতার একটা টাইপ। অ্যানিওয়ে। এই কবিতাটা, আলাস্কা,  অ্যাফার্মেটিভলিই একটা রিয়্যালি রিডেবল কবিতা বলে মনে হবে আপনার। গিভ ইট অ্যা ফেয়ার ট্রাই। আস্ত কবিতাটাই দিচ্ছি লটকিয়ে নিচে। কবিতাটা শুরু হয়েছে একটা এপিগ্রাফ দিয়ে, ডেনভারের ‘অ্যালাস্কা অ্যান্ড মি’ গানের লাইনজোড়া দিয়া বানানো এপিগ্রাফ, সেই দুই লাইন : “Here’s to my life in a chosen country / Here’s to Alaska and me” … লেট্’স্ গ্য, নিম্নানুচ্ছেদগুলোতে, কবিতাটা পড়ি :

তোমার হস্তলিপির চেয়ে স্বচ্ছ, শরৎময় কোনো দিনে, শ্যালো ইঞ্জিনের নিরবচ্ছিন্ন বৃষ্টিধারায় আমাদের নদীসভ্যতার গভীরে আলাস্কা নামের কোনো গ্রাম। হয়ত আলাস্কা নামে কোনো গ্রাম নাই, হয়ত আলাস্কা নাই; আছে বিদ্যাকূট আর উরখুলিয়ার মাঝামাঝি এক রোদ-অবকাশ, তাকে তুমি আলাস্কা ডাকছ। কিন্তু, মাঠকর্মীদের উল্টো-করে-শুকাতে দেয়া ল্যাট্রিন প্যানগুলো যখন শরৎপরিস্থিতির ওপর চড়ে বসছিল — যেমন আমি ভাবছিলাম সিমেন্টের শত শত সীল মাছ ওরা, অঘটনের নেশায় স্তব্ধ হয়ে আছে, যেন ওদের নৈপুণ্য আমাকে দেখাবার নয়, যেন ওদের উচ্ছ্বাস পাল্লা দেয় করলেংকোর নৈশঝড়ের সাথে!

আমার সম্পত্তি বলতে একটা কাঁটাঝোপ-গজানো রেললাইন, আর দু’তিনটা অকশনে-ওঠা রেলবগি। আমার স্বত্ব বলতে একটিমাত্র গল্পের ওপর, খুব বস্তাপচা ত্রিভূজ গল্প সেটা, ভরা যৌবনে এক আলাস্কা-কুমারী একটি ছন্নছাড়া ভালুকের প্রেমে পড়েছিল, আর ভালুকটি তখন হাবুডুবু খাচ্ছিল ওর হাত ফসকে যাওয়া একটি রূপালি ট্রাউটের প্রেমে।

কোথায় আলাস্কা ? ফাঙ্গাস পড়া মনপর্বত, কোথায় সে ? যে হিমবাহটি গড়িয়ে গড়িয়ে নামছে তাকে তোমার পছন্দের শাখানদীর ভেতর ঘুম পাড়িয়ে দাও। তারপর নিবিষ্ট হও : আলাস্কার মহান সাইলেন্সে একটি ঝরন্ত পাতার জীবনীর মধ্যে। দেখো ঈগল তার তীক্ষ্ম টর্চ তোমার পিঠে বুলিয়ে দিচ্ছে, আধামিনিটের জন্য উৎকর্ণ একপাল চিত্রাহরিণ, ঘণ্টি বাজছে ঘুমন্ত গ্রিজলির সদাজাগ্রত নাসাপথে। পাইনের পাতাঝরার বৃত্তান্তসহ এবার তুমি আলাস্কায় ঝরো।

হতে পারে আলাস্কা নেই। তাই তাকে নিয়ে লিখব বলে গোটা শরৎকাল ধরে ভেবেছি, এই ভাবনা ছিল তোমার বয়সন্ধির নীল পতাকার চেয়ে সুন্দর। আলাস্কাহীন আমার কবিতা যাবতীয় বিরহের আলোকিত-অপর-পৃষ্ঠার মত, বহুযুগ ধরে কারো রক্তে দ্রবীভূত না-হওয়া নাইট্রোজেনের ঘনশ্বাসের মত।

শন্ পেনের ম্যুভিতে, ডেনভারের গানে, বাংলা কবিতায় যে-অ্যালাস্কা আছে, সেই অ্যালাস্কা সামগ্রিক অর্থে না-হলেও ধরাছোঁয়া যায় এবং টু-অ্যা-গ্রেইট-এক্সটেন্ট ম্যুভি থেকে গান থেকে কবিতা থেকে সেই অ্যালাস্কা বের করে এনে পার্শ্ববর্তিণীকে দেখানোও যায়। কিন্তু আপনার ভেতরে যে-অ্যালাস্কা বিরাজে — মনের মণিকোঠা বা মনের বাইরেকার মুকুরের ন্যায় ট্র্যাশ জায়গাগুলোর কথা বলছি না, বলছি আপনার ভেতরের কথা — “হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোনোখানে” — এই অ্যালাস্কা আপনি কেমোনে দেখাইবেন সখি? জীবনভর আকুলিবিকুলি যাবেন, মনিবের উদ্ভট ভ্রমণগপ্পোগুলের খান্দানি চিপায় ক্ল্যাসিক্যাল হরিপদ কেরানির কলে-পড়া জন্তুজন্ম যাপিয়া যাইবেন, অ্যালাস্কা যাওয়া আপনার হবে না আর। না-গেলেন, মনে করেন, হঠাৎ-পাওয়া আলস্যরঙিন রবিবারে কি শুক্কুরবারে ডেনভারের গান শুনতে শুনতে ব্যাকপ্যাক বেঁধেছেঁদে রাখতে তো আপনেরে কেউ মানা করে নাই। মনে মনে। মেলিয়া রাখুন আকাশপারের আস্ত ডানাটাই। ইন্টু দি ডিপ ইনসাইড।

অ্যানি, প্রিয়তমা!

সারাজীবনে যে-দুইশতাধিক গান ডেনভার নিজে লিখে বেঁধেছেন-গেয়েছেন, সর্বসাকুল্যে ডেনভারের গাওয়া গানসংখ্যা প্রায় তিনশ বলে একটা লাম্-সাম্ হিসাব রয়েছে, এদের মধ্যে অ্যানির গান  সম্ভবত শ্রোতাগ্রাহ্য সবচেয়ে বেশি। প্রেমগাথা আরও বেঁধেছেন-গেয়েছেন তিনি, এমনকি অ্যানির গান  সাফল্যের ইন্সপিরেশন হিশেবেই হোক অথবা আর-কোনো কারণেই অ্যানির আরেকটা গান  বাঁধলেন তিনি বছর-দুয়েকের ভেতর, কিন্তু দুনিয়াজোড়া আদ্বিজচণ্ডালে ডেনভার মনোহর কৃষ্ণকানহাইয়া হয়ে রইলেন ওই অ্যানির গান  গেয়ে। এইটা বাঁধা হয়েছিল, দুইটাই, অ্যানির জন্যে। ডেনভারের ধর্মপত্নী তথা তার নর্মসহচরী অ্যানি মার্টেল দুইটা গানেরই নামভূমিকা ও মর্মপ্রেরণা।

সিক্সটি-এইট থেকে এইটি-এইট পর্যন্ত, কুড়ি বছর গোটা জীবনের জন্য অনেক দীর্ঘ একটা কালখণ্ড, ডেনভার-অ্যানি কাপলের কঞ্জুগ্যাল লাইফ। অত্যন্ত সেলেব্রেইটেড একটা দাম্পত্য জীবন। দুনিয়ার মশহুর সমস্ত সাময়িকপত্রের কাভারস্টোরি হয়েছে এক-থেকে-একাধিকবার এই মিষ্টি দম্পতি ঘিরে। সেইন্ট পিটার নামের একটা অ্যারিয়ায়, মিনেসোটা অঞ্চলে অবস্থিত, অ্যানিদের পৈতৃক বাড়িঘর ও বসবাস। সেইখানে একটা কন্স্যার্টে যেয়ে ডেনভারের সঙ্গে অ্যানির দেখাদেখি ও আলাপ। তখনও ডেনভারের সোলো ক্যারিয়ার শুরু হয়নি অবশ্য, পার্ফোর্ম করতেন ‘শ্যাড মিশেল ট্রায়ো’ গ্রুপের সঙ্গে। ল্যভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট — অন্তত ডেনভারের দিক থেকে — পরে একাধিক ইন্টার্ভিয়্যুতে ডেনভার জানিয়েছেন। ১৯৬৮ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত নববিবাহিত জুটি হিশেবে ডেনভারদম্পতি মিনেসোটার এডিনায় একটানা থেকেছেন। ‘রকি মাউন্টেন হাই’ রেকর্ডের সাফল্য ওইসময়টায় ডেনভারকে অভাবিত খ্যাতি এনে দেয়। এবং ওই গানের লভ্য অর্থ দিয়ে ডেনভার একটা বাড়ি খরিদ করেন কলোর‌্যাডোর অ্যাস্পেনে। এই বাড়িটিরই প্রেমে বিভোর থাকতে দেখব আমরা ডেনভারকে আমৃত্যু। মিনেসোটা থেকে অ্যাস্পেনে ডেনভারদম্পতি শিফ্ট করেন এবং সেখানেই পাকাপাকি নিবাস গড়ে তোলেন।

ঘরপ্রিয় নারী ছিলেন অ্যানি, আমরা অ্যানির নিজের জবানি দিয়েই এইটা জানি। একদম টিপিক্যাল ঘরণী, ইন অ্যা সেন্স, অন দি আদার হ্যান্ড ডেনভারকে স্পেইস্ দিয়েছেন প্রচুর। ডেনভার-ক্যারিয়ারের উন্মেষ ও বিকাশ এবং শীর্ষস্পর্শন তিনটিই ঘটেছে অ্যানিপ্রেরণায় — এইটা আজ তো প্রমাণ বাহুল্য। যদিও স্বভাবে ডেনভার ছিলেন ভ্রমণপ্রিয়, ‘টেইক মি হোম কান্ট্রিরোডস্’ গানের এই মানুষটা ড্রাইভপ্যাশনেইট ছিলেন, উড়ালপঙ্খির পাখা ছিল স্বভাবে তার, ছিলেন উড়োজাহাজফ্যাসিনেইটেড, স্থলপথে আর উড়ালপথে যেমন চরৈবেতি ন্যাচার ছিল তার তেমনি তিনি ঈগলের ন্যায় ছিলেন নৈসঙ্গবিহারী। কিন্তু লয়্যাল ছিলেন ফ্যামিলি অ্যাফেয়ারের প্রশ্নে। দূরে যেয়ে ফের ফিরতে চাইতেন ঘরে। কন্স্যার্ট ইত্যাদি কারণে ডেনভারকে ঘর-ও-বাইরের মাঝখানে একটা দোটানা জায়গায় গুজরান করে যেতে হয়েছে জীবনভর। এই দোদুল্য দোটানা তার গানে রেখাপাত করে যেতে দেখব আমরা নানা ভাবে ও ভাবান্তরে। ডেনভারের সংগীতে এই ক্রন্দন ও শেরপার ন্যায় শীর্ষস্পর্শী নিঃসঙ্গতা ছায়া ফেলে ফেলে যেতে থাকে শিল্পোজ্জ্বল সুষমায়। এই গৃহকাতরতার ব্যাপারটা অ্যানি নিজেই নানা জায়গায় জানায়েছেন, ডেনভার তো বলেছেনই প্লেবয়  কিংবা রোলিং স্টোন্স  বা পিওপল  প্রভৃতি পত্রিকার সাক্ষাৎকারে, টেলিভিশনটকগুলোতে তো বটেই, জানিয়েছেন টেইক মি হোম  শিরোনামক অটোবায়োগ্রাফিগ্রন্থে, এবং এই সমস্তই এখন আমরা হাতের নাগালে চাহিবামাত্তর পেয়ে যাই।

কিন্তু ডেনভার-অ্যানি দাম্পত্যজীবনের কেমিস্ট্রি কি কেবলি এই লয়্যাল্টি কিংবা কেবলি এই গৃহঘোরগ্রস্ততা? তা তো বটে যে এই দুইটাই সাস্টেইনেবল কঞ্জুগ্যাল লাইফের দুই ম্যাজর উপাদান। তবে এইসবেরও উপরে প্রেম সত্য, কথাটা বৈষ্ণব অথবা প্লেটো মশাইয়ের তত্ত্ব প্রভৃতি কিচ্ছুটি দিয়াই ইক্যুয়েশন মিলাইবার মতো মেড-ইজি জিনিশ না, আবার ফেসবুকা কাকতর্ক করার মতন জটিলস্য জট্টিল গোছের কিছুও নয়। এইটা গান দিয়াই সমীকৃত হবার মতো। সুরেই এর সুরাহা সম্ভব। অ্যানি নিজেই বলেছেন যে এই গানটা, অ্যানিস্ স্যং,  একটা প্রার্থনার মতো মনে হয়েছে তার কাছে সবসময়। এবং অধিকাংশ শ্রোতৃবর্গের কাছেও সম্ভবত এইটা যার যার প্রেম-ও-অন্যান্য জৈবনিক বাস্তবতায় প্রার্থনাগানই। দি মোস্ট মেলিফ্ল্যুয়াস ল্যভ-ব্যালাড। কোথাও গানটার মধ্যে অ্যানির নামোচ্চার করা হয়নি, কেবল গানশীর্ষে ছাড়া, ফলে এইটা যে-কোনো পরিস্থিতিতে যে-কোনো সত্তা-উজাড়ি নিবেদনোদ্যত প্রেমিকার/প্রেমিকের/প্রেমগ্রস্তের নৈবেদ্য।

ডজনখানেক ডেনভারগানের মেইকিং হিস্ট্রি, ইন্সপিরেশন সোর্স, গোড়া থেকেই শ্রোতার জানা। সানশাইন বলি কিংবা কান্ট্রিরোডস্, রকি মাউন্টেন বলি কিংবা মন্টানা স্কাই, শ্রোতার কাছে এগুলোর নির্মাণেতিহাস অজ্ঞাত নয়। যেমন এই গানটা, অ্যানির গান,  মাত্র দশ মিনিটে লিরিকটা লেখা ও টিউন করা। অ্যানি ও ডেনভার কপোত-কপোতী মিলে মিনেসোটার এডিনায় স্কি-লিফ্ট করছিলেন, পাহাড়ের উঁচু দিয়ে টেনে-নেয়া ক্যাবলকারের বগির ভেতরে দুইজনায় প্রেমখুনসুঁটি করছিলেন আর নিম্নে নির্জন উপত্যকা-অধিত্যকাবহুল পাহাড়চুড়ো পরখ করে দেখছিলেন তারিয়ে তারিয়ে, এমন সময় এই গানের কম্পোজিশন ডেনভারের কাছে ধরা দেয়। সুরটা গুনগুনিয়ে অ্যানিকে ডেনভার শুনিয়েও দেন তক্ষুণি। তড়িঘড়ি গৃহে এসে ডেনভার নোটেশন করেন গানটার এবং পূর্ণাঙ্গ কম্পোজিশনের দিকে নিয়ে যেতে থাকেন। পরে ডেনভারের মিউজিক প্রোডিউস্যর কাম ম্যানেজার গানের মুখড়াটুকু শুনে এর সঙ্গে চাইকোফস্কির পঞ্চম মূর্ছনার দ্বিতীয় তরঙ্গের আভাস রয়েছে মর্মে মতপ্রকাশের প্রেক্ষিতে ডেনভার পিয়ানোতে যেয়ে বসেন এবং আধঘণ্টা বাদে ফের পুরো গানটার রেন্ডিশন শোনান। বর্তমান ও চিরকালীন চেহারা পায় অ্যানিস্ স্যং  এবং গানের মুখড়ায় চাইকোফস্কির ফিফথ্ সিম্ফোনির সেকন্ড ম্যুভমেন্টের সচেতন ব্যবহার অধিকতর স্পষ্ট হয়ে ওঠে এর শুরুর পাঁচটা নোটে। এরপর তো ইতিহাস। অ্যানিকে ডেডিকেইট করে বেরোয় গোটা অ্যালবাম ব্যাক হোম অ্যাগেইন,  পপ্যুলার্লি অ্যানিস্ স্যং  নামেই অ্যালবামটা মশহুর হয়ে আছে শ্রোতাসন্নিকটে। এইসব নাইন্টিন-সেভেন্টি-ফোরের দিককার ঘটনা।

তিন-স্ট্যাঞ্জার গান। ছোট্ট। শুরু-হতে-না-হতেই ফুরায়ে যায়, একদম চড়ুইয়ের মতন, কিন্তু রেশ রয়ে যায় দীর্ঘক্ষণ। সুরের আবেশটুকু রয়ে যায়। বিষাদপিয়ানো, বিষাদগিটার, সব মিলিয়ে শেষমেশ যা থাকে অবশেষ তার নাম অবশ্য বিষাদ নয়, চিরন্তন উদ্ভাস বলা যেতে পারে। হ্যাভেনলি স্প্লেন্ডার কি এইটেকেই বলে না লোকে? এবং অদ্ভুত যে গানের কথাটুকুও মোটেও বিষণ্ন টোনের নয়, আবার ফুর্তিরও নয়, স্যুইটেস্ট ওয়ার্ডস আর স্যুইটেস্ট মেলোডি নিয়ে এক অনির্বচনীয় স্যুইট স্যাডনেস্। কী সরল আর স্বচ্ছ বাণীমঞ্জরি! তিন-স্তবকের গান হলেও আদতে এর স্তবকসংখ্যা দুই। স্টার্টিং স্ট্যাঞ্জাটাই ফিরে আসে কনক্লুডিং স্ট্যাঞ্জা হিশেবে। একফোঁটা কাঠিন্য অথবা গেরামভারী কচকচানি নাই কোথাও। সিম্পল, ট্র্যান্সপ্যারেন্ট, বিউটিফ্যুল। শুরুর, সেইসঙ্গে শেষেরও, স্ট্যাঞ্জাটা এ-ই : “You fill up my senses like a night in the forest, / like the mountains in springtime, like a walk in the rain, / like a storm in the desert, like a sleepy blue ocean. / You fill up my senses, come fill me again” — এবং মাঝখানের স্তবক সমানভাবেই নিরাভরণ, নিরলঙ্কার, নিপুণ ও নিখাদ অনুভব-সুবেদী : “Come let me love you, let me give my life to you, / let me drown in your laughter, let me die in your arms, / let me lay down beside you, let me always be with you. / Come let me love you, come love me again” — এত সিম্পলিসিটি নিয়া গান, অথচ এতটা আরাধনাসাধ্য, ডেনভার গাইলেন এবং আগাগোড়া তা-ই গেয়ে গেলেন জীবনভর। আরও মনে রাখা চাই যে এইসব গান ডেনভার বাঁধছেন-গাইছেন এমন একটা সময়ে যখন ইংরিজি গানে এবং অলমোস্ট গোটা দুনিয়ায় শিল্পে-সাহিত্যে-গানে-সিনেমায় ফিলোসোফি আর পোলিটিক্যাল ম্যানিফেস্টেশনের রমরমা। মার্লে গাইছেন, ডিলান গাইছেন, মিক জ্যাগার তো বটে এমনকি পিঙ্ক ফ্লয়েডও সম্ভবত এসে গেছে স্টেজে। লেনার্ড কোহেনের কথা তো বলাই হলো না। কাজেই, সময়টা লক্ষণীয়, এমন একটা টাইমে ডেনভার নিজের পথ করে নিতেছেন এবং এমন একটা কায়দায়, ভাবা যায়!

‘অ্যানির আরেকটা গান’, অ্যানিস্ আদার স্যং,  ডেনভার গাইবেন প্রথমা-সাফল্যের অনুপ্রেরণায় স্পৃষ্ট হয়েই সম্ভবত, অচিরাৎ। ওইটাও, স্বভাবত, সুন্দর ও সুরকথাকারুঋদ্ধ নন্দনোত্তীর্ণ রচনা। আগেরটার মতোই সিম্পল ও অ্যামিয়েবল, অমায়িক, অনাড়ম্বর কথাবাদ্যমণ্ডিত। স্পন্দন, ডেনভারগানের, কদাপিও চড়া বা উঁচা তারে বাঁধা না। অ্যানির আরেকটা গান  অবশ্য ব্যাপ্তিতে নাতিদীর্ঘ-অনতিহ্রস্ব। চারটে স্ট্যাঞ্জা সাকুল্যে। এর একটা, দ্বিতীয় স্তবকটাই, এমন : “Had a wonderful time in the city, I smile when I recall. / The space, the songs, the company, I really had a ball. / It’s a funny set of circumstances, sends me out on the road alone. / With the moon looking over my shoulder, I’m finding my way back home. / I’m bringing me home to you, that’s all that I have to give. / My life, my love, my everything, it’s you I choose to be with”  — ডেনভারকেই তো দেখি লাইন-কয়টায়, চেনা যায় না? গানের শুরুটুকুও সুস্থায়ীভাবে ডেনভারেস্ক : “I’m bringing me home to you, that’s all that I have to give, / my life, my love, my everything, it’s you I choose to be with”  — এর পরেও জোড়া-স্ট্যাঞ্জা, যথাযোগ্য ডেনভারীয়। গোটা ক্যারিয়ার জুড়ে ডেনভার যা-ই গেয়েছেন, শ্রোতা-সাধারণ্যে সেসব প্রেমগান হিশেবেই গণ্য হয়েছে, এবং ডেনভারগানে ঘুরেফিরে অ্যানিকেই আসতে দেখেছে লোকে, ডেনভারগানের ‘তুমি’/‘য়্যু’ মানেই অ্যানি জ্ঞান করেছে ডেনভারশ্রোতারা।

অ্যানির স্বভাবসৌন্দর্য, অনুমান অসাধ্য নয় যে, উল্লেখ করবার মতো। রকারদের, সিঙ্গার-স্যংরাইটারদের, দাম্পত্যকলহ ও কেলেঙ্কারী নিয়া বাংলা-অ্যামেরিকা-জার্মান-গ্রেইটব্রিটেইন-প্যারি-মস্কো সর্বত্রই মিডিয়া ও অন্যান্য সর্ববিধ দুনিয়াদারি তক্কে তক্কে থাকে খবরগন্ধ শুঁকে শুঁকে। অ্যানি-ডেনভার যুগলের কোনো হ্যাপেনিং-অকারেন্স আমরা খাবারের পাতের পাশে খবর হিশেবে হেরি নাই। এছাড়া আরেকটা ব্যাপার দেখব যে, ব্যান্ড বা সোলো মিউজিশিয়ানদের স্ত্রীরা নানাভাবে স্বামীর কাজে বেড়ির ন্যায় নিজেকে বিস্তার করে রেখেছেন, মিউজিকমেইটদের সঙ্গে এ নিয়ে মনোমালিন্যও কমন ঘটনা, বিটল্সের ক্ষেত্রে এইটা তো নজরে পড়বেই। উদাহরণ হিশেবে লেননের স্ত্রীর নাম নেয়া যাক। ইয়োকো ওনো। খুবই সেক্রিফাইসিং নারী, অন্তত জন লেননের অটোবায়োগ্রাফিক ভাষ্যমতে, লেননজীবনে ইয়োকো ওনোর কন্ট্রিবিউশন অনস্বীকার্য। তবু লেননের ব্যান্ডমেইট ও বন্ধুরা ওনোকে পছন্দ করতেন না, ভাইস-ভ্যার্সা ওনোও পছন্দ করতেন না বলেই মনে হয় লেননসতীর্থসারথীদেরে, এদের অনেকেই ইয়োকো ওনোকে লেননজীবনে একটা রাহুগ্রাস/ডাইনি জ্ঞান করতেন। প্রমাণ আছে লেখাপত্রে। কিন্তু অ্যানি ছিলেন আনকন্ডিশন্ড ডেনভারের ওপর আস্থাশীল, ডেনভারও তা-ই। ফলে অ্যানিকে কেন্দ্র করে ডেনভারের দুনিয়া/ক্যারিয়ার কখনো দ্বিবিভাজিত হইতে দেখা যায় নাই। মিডিয়া — টাইম ম্যাগাজিন থেকে শুরু করে অ্যামেরিক্যান টেলিভিশনচ্যানেলগুলো — অ্যানিকে আগাগোড়া ভালোবেসেছে, যেমন জনসাধারণও পছন্দ করেছে বারবার এই দম্পতিকে ম্যাগাজিনপ্রচ্ছদে দেখতে। এ-ই হচ্ছে, অতি সংক্ষেপে, গেল শতকের অতি খ্যাতিসম্পন্ন দম্পতিগাথার বিবরণ। এ-ই হচ্ছে, ইন শর্ট, একটা গানের ইতিবৃত্ত ও অসংখ্য গানপ্রেরণার প্রবেশদুয়ার।

কুড়ি কুড়ি বছরের পরে হলেও দুনিয়াবাস্তবের প্রেম ফুরায়ে আসে একদিন। যদিও শিল্পের প্রেম, গানের প্রেম, অম্লান-অফুরান চিরভাস্বর রয়েই যায়। অ্যানি-ডেনভার যুগলের পালঙ্ক পৃথক হয়ে যায় একদিন, কুড়ি কুড়ি বছরের পরে হলেও। বড় প্রেমের তা-ই তো ধর্ম, শরৎচন্দ্রীয়, কাছে যেমন টানবে তেমনি ঠেলে দেবে দূরেও। ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে ডেনভার দ্বিতীয় দার পরিগ্রহ করেন। অবশ্য অ্যানির সঙ্গে ডিভোর্স হয়ে গিয়েছিল বছর-ছয় আগে, ৮২-তে, একটানা দু-বছর কোর্টশিপের পর অস্ট্রেলিয়্যান অ্যাক্ট্রেস্ ক্যাসান্ড্রা ডেলানিকে বিয়ে করেন। শর্ট-লিভড্ ম্যারেজ ছিল, সুখের হয়নি মোটেও, দু-বছরের মাথায় ভেস্তে যায়। ৯১-তে ভিন্ন শয্যা, ভিন্নবাস, ৯৩-তে যেয়ে পাকাপাকি বিচ্ছেদ। পরে ডেনভারকে এই বিয়ে নিয়ে বেশ তিক্ত প্রতিক্রিয়া প্রকাশিতেও দেখব আমরা যা কিনা তার স্বভাববিরুদ্ধই বলা যেতে পারে। অ্যালকোহলিক হয়ে পড়েন ক্রমে। স্মিত স্বভাবী ছিলেন, সংসারী ছিলেন, অন্তত যদ্দিন অ্যানির সঙ্গে। কম তো নয়, বিশ-বিশটা বছর!

টানা কুড়ি বছরের দাম্পত্যসাম্পানে এক-আধবার যে খিটিমিটি হয়নি তা তো নয় নিশ্চয়। কিন্তু অ্যানি স্বভাবে অ্যাকোমোডেটিভ হওয়ায়, এবং ডেনভার শর্তাতীত-প্রশ্নাতীত কেয়ারিং হওয়ার  কারণে, ব্যাপারটা খারাপের দিকে গড়ায়নি কখনোই। ব্যতিক্রম হয়েছিল একবারই। সেইটা ওই গোড়ার বছরগুলোতে। এইটা জানা ইম্পোর্ট্যান্ট, এই দম্পতির রসায়নঘনত্ব সম্পর্কে আন্দাজ পেতে চাইলে, এবং একটা গানের শক্তিসামর্থ্য সম্বন্ধেও সম্যক আইডিয়া পাওয়া যায় এহেন ঘটনা জানার পর। ঘটনাটা ডেনভার তার জীবনের প্রায় সমস্ত কথালাপে-কথিকায় গিয়েছেন প্রকাশ করে, এই নিয়া তার কোনো গুড়গুড়-ঢাকঢাক বা কোনোই ইনহিবিশন ছিল না। ঘাপলাটা বাঁধে দাম্পত্যের শুরুর দিকে যখন ডাক্তারী নিরীক্ষণে প্রমাণিত হয় ডেনভার স্টেরাইল, মানে অফলা, মানে ডেনভারের ঔরস সন্তান-জন্মদানে অক্ষম। খবরের প্রথম ধাক্কায় অ্যানি মুষড়ে পড়েন। ন্যাচারালিই। ডেনভার মিউচ্যুয়াল সেপারেশনের স্পেসটুকু দিতে দূরে একটা স্টেটে চলে যান। কিন্তু প্রথম রাতেই অ্যানি বুঝে ফেলেন, অসম্ভব! ডেনভার বিনে ক্যায়সে জিউ! “তু হি রে, তু হি রে, তেরে বিনা ম্যায় ক্যায়সে জিউ / আ যা রে, আ যা রে, য়্যু হি তাড়পা না তু মুঝকো” — এআর রাহমানের সেই গানের ব্যাপারই যেনবা। অ্যানিকে ডেনভার পরদিন ফোন দেন, অভ্যাসমাফিক, সঙ্গে সঙ্গে অ্যানি বুঝতে পারেন এর সঙ্গেই নিঃসন্তান জীবন কাটানোই ঈপ্সিত তার। সেই-যে একত্রিত হয়েছিলেন, একটানে কুড়িটা বছর কাটিয়েছেন এরপর। ডেনভারের খ্যাতি যখন শনৈ শনৈ বাড়ছিল, তখন ফের একটু নড়বড়ে হয়েছিল সম্পর্কটা, অ্যানির মনে হচ্ছিল এত খ্যাতি তিনি স্থিরচিত্তে নিতে পারছেন না, অচিরে ডেনভার অ্যাস্পেনে পাকাপাকি নিবাস গেঁড়ে সামলে নেন ও অনেকটাই নিজেরও রাশ টেনে ধরেন। দত্তক নেন দু-দুটো সন্তান, জ্যাকারে এবং কেইট, এদের নিয়ে একাধিক গানও লিখবেন অচিরে সুন্দর সুরে ও সংগীতে। এইসব কথাবার্তা আমরা অ্যানির জবানেও শুনতে পাই, ডেনভার তো বহু জায়গায় এককভাবে অ্যানিকে ক্রেডিট দিয়েছেন সংসারযাত্রাসাফল্যের জন্যে, স্টেরিলিটির ব্যাপারটা সেন্সর করে এই প্যারায় বর্ণিত কাহিনির পুরোটাই বিবৃত করতে দেখব ডেনভার জীবিতকালে এবং মৃত্যোত্তর মেমোয়ার্সে অ্যানিকে। এই সেন্সর করাটা যে কেমন অনির্বচনীয় শ্রদ্ধার প্রকাশ, বুঝতে পারাটা আদৌ অসম্ভবও নয় হয়তো। অবশ্য ডেনভার নিজের শুক্রানুত্রুটি নিয়া রাখঢাক করেন নাই, ছিলেন বরং সবিনয় ঋজু ও স্বচ্ছ, ছিলেন অ্যানির প্রতি কৃতজ্ঞনতচিত্ত। অন্তত অটোবায়োগ্রাফে, ইন্টার্ভিউতে, এইটা প্রামাণ্য।

হিচহাইকার ও অন্যান্য

অনেকেই চিনবেন নাম বললে, কেউ হয়তো ফেসবুকিশ কায়দায় শ্রাগ করবেন তুচ্ছাতিতাচ্ছিল্যসূচক, একজন কবি কিছুদিন আগেও জলজ্যান্তভাবে বেঁচে ছিলেন এই বাংলায়, এই বাংলাদেশে, দেহ ছেড়েছেন ২০০৭ সালে। হেন কোনো সাহিত্যসাময়িকী নেই যেগুলোর একটা-না-একটায় ফি-হপ্তান্তে তার কবিতা ছাপা হতো না। আমার ভালো লাগত, এখনো মন্দ লাগবে না মনে হয় হাতের নাগালে পেলে পড়তে। কিন্তু স্বদেশের গ্রন্থমণ্ডপগুলোতে এই বিদেহী কবির বই/কবিতাসমগ্র বহু বিছড়াইয়াও পাওয়া যায় না। নাই। লিখতেন সুধীন্দ্রনাথ-আঙ্গিকে আঁটোসাঁটো চৌকোবর্গীয় কবিতা, টাল খেতো না তার কবিতা মাপেজোখে একটুও, সেই কারণেই ভালো লাগত। শুদ্ধবাদী কবিতানুশীলকদের প্রতি অ্যালার্জি সত্ত্বেও উনার কবিতা ভালো লাগত কেন জানি না। তা, এইটাও অসত্য নয় যে সেই সময়টায় এন্তার কবিতা পাচ্ছিলাম আমরা সাময়িকীপৃষ্ঠায় নিস্তারহীন রাহমানীয় ধাঁচে, রাহমান খোদ লিখে যাচ্ছিলেন একের-পর-এক বইভরা ন্যাতানো ফোঁপানি, বাকিদের কবিতা চানাচুরের মতো মুখরোচক লাগত পড়তে বেশ পয়লাপাঠে, পেট ভরত না। আর সভাসমিতিতে আবৃত্তিযোগ্যতাবহ কবিতায় দেশ ছেয়ে গিয়েছিল। বড় উল্লাসেরই দিন ছিল বঙ্গীয় কবিতার জন্য, ওই দিনগুলো, বটে! এহেন অকালদিনে এই কবির কবিতা পড়ে মনে হতো, হোক-না প্রাচীনগন্ধী, তিরিশি মাপাজোখা লাইনঘাটের সুধীন্দ্র-খটোমটো কবিতাঙ্গিক, তন্বিষ্ঠভাবে এইধারা আঙ্গিকচর্চা বরং রাহমানানুবর্তনের চেয়ে সগুরুত্ব লক্ষণীয়। ওই অসহ সময়ে এই কবির কবিতা আমাদেরকে একটু হলেও কবিতানুধ্যায়ী রাখতে বেশ কাজে এসেছিল স্বীকার্য। অজস্র লিখেছেন ইনিও, গ্রন্থ সে-তুলনায় একদম অল্প, কবিতাকারবারীদের ফোক্যাস ছিল রাহমান-মাহমুদে আগাগোড়া ব্যস্ত। অবশিষ্ট ফোক্যাস/ক্যামেরাশাটার লভেছেন কাদরী-সিকদার-গুণ-মহাদেব এমনকি ওমর আলীও। ছয় কি সাতটা কবিতাবই আছে তার, একটা গদ্যের বইও আছে ‘বাংলার রূপকথা’ নামে অ্যান্থোলোজি — নরম-স্বচ্ছ-সুন্দর সিন্ট্যাক্সে লেখা বাংলায় এবং বইটা খুবই কাজের জিনিশ এতদ্বিষয়ে অনুসন্ধিৎসুদের কাছে। এমন কয়েকজন কবি আছেন যাদের কবিতাবইয়ের শিরোনামে আকৃষ্ট হয়ে তাদের কবিতায় ধাবিত হয়েছি, একজন যেমন আবু কায়সার, ইনিও প্রয়াত, তার একটা কবিতাবইয়ের নাম ‘সারাদিন একটা লাল গাড়িকে আমি’ — ভাবা যায়! একই কবির একটা বই আমরা বালকবেলায় পড়েছি সবাই, মিষ্টি শিশুসাহিত্যের নজির, ‘রায়হানের রাজহাঁস’ সেই বইয়ের নাম। আবিদ আজাদের একটা বইয়ের নামও খুবই সুন্দর। না, ‘ঘাসের ঘটনা’ বইটার কথা বলছি না এখানে, ‘বনতরুদের মর্ম’ মনে পড়ছে। এমন আরেকজন কবি, ইনি দুইহাতে লিখে চলেছেন এখনও এবং ভালো লিখছেন তার নিজের ধরনে, সরকার মাসুদ। সরকার মাসুদের একটা বইয়ের নাম কী সুন্দর, কী মিষ্ট ও বিষণ্ন নরম, ‘প্রিয়তমার নৌকাঘাটে’। এখানে যে-কবিকে নিয়ে আমরা বলছিলাম, তার প্রত্যেকটা বইয়ের নামই ভীষণ সুন্দর ও শ্রুতিদৃশ্যনন্দনীয়। এর মধ্যে একটা মারাত্মক মধুর, অভাবনীয় ও অপূর্বভাবিত, ‘জলৌকা হে নীল যমুনার’ — ডাকাতিয়া নাম নয় কি? হে নীল যমুনার জোঁক — কবিতাবইয়ের নাম — ভাবতে পারো! অন্য কয়েকটা বইয়ের মধ্যে একটা ‘চিরবিরিঞ্চির তরু’, আরেকটা হচ্ছে এই ‘হিচহাইকার ও অন্যান্য কবিতা’ নামের বইটা। শামসুল ইসলাম এই কবির নাম। আমরা কি তারে ভুলেই গেলাম? উইকিপৃষ্ঠায় এই কবি সম্পর্কে একটাও ভুক্তি নাই দেখি। ফেনী তার জন্মজেলা। সাংবাদিকতা দিয়ে পেশাজীবন শুরু করেন, পরে বেতারে জয়েন করেন এবং সেখান থেকেই ডিআরডি তথা ডেপুটি রিজিওন্যাল ডিরেক্টর হিশেবে রিটায়ার করেন। আমৃত্যু মঞ্চপ্রদীপ ছাড়াই কবিতা লিখে গেছেন।

যাকগে, যে-কথাটা বলছিলাম, ডেনভারের একটা গান আছে হিচহাইকিং নিয়ে, একজন হিচহাইকার উপজীব্য করে। হিচহাইকিং ব্যাপারটার সঙ্গে আমরা পরিচিত বই পড়ে বা সিনেমাবাহিত অভিজ্ঞতা দিয়ে। যদিও হিচহাইকিং সেই-অর্থে নেই আমাদের দেশে। যে-কোনো সখিরে পার করিতে আমরা আনা-পাই বুঝিয়া তারপরে নৌকায় নেই, আর প্রাণসখিরে পার করিতে তো উনার কানের সোনা ছাড়া আলাপ-ঘটকালির প্রশ্নই ওঠে না। “বলো কী তোমার ক্ষতি / জীবনের অথৈ নদী / পার হয় তোমাকে ধরে / দুর্বল মানুষ যদি” — তা, হাজারিকা আসাম অঞ্চলের মানুষ, অহমিয়া ভাষায় জন্ম ও বিকাশ তার, বাংলার লাভক্ষতি-সুদকষার ফের্কা তার মাথায় থাকার কথাও না। আমরা পারি কেবল পগারের পার হতে নিজেরা, কাউকে পার করাতে যেয়ে তার বারোটা বাজাই নিপুণভাবে। হ্যাঁ, হিচহাইকিং আছে বিদেশে। এইটা অ্যামেরিকা-য়্যুরোপে এখনও পার্ট-অফ-দ্য-কাল্চার। বৃদ্ধাঙ্গুলি বাতাসে ভাসিয়ে হাইওয়েকিনারে চেষ্টা চালায়ে গেলে জন-ও-যানবিরল রাস্তার পনেরোটা গাড়ির মধ্য থেকে একটা-না-একটা থামবেই, আপনার থাম্বিং সফল হবে, পেয়ে যাবেন মুফতে মাগনা মঞ্জিলে পৌঁছুবার নিশ্চয়তা। গানে এমনই এক বুড়ো হিচহাইকারের ভূমিকায় পেয়ে যাই আমরা গানস্থিত কথক/ন্যারেটরটিকে, পেয়ে যাই ডেনভারকে, কপর্দকহীন তথা টাকাকড়ির আবশ্যকতা গৌণ-জ্ঞান-করা এক বোহেমিয়ানকে, পাই এভাবে : I’m an old hitchhiker, I wonder what’s awaitin’ ’round the bend / I don’t know what I might see and I don’t need no guarantee / Just a ride from here to there and back again … আমাদের জেমসের একটা গান আছে এ-রকম ভবঘুরে অনিকেত মানুষ উপজীব্য করে : পথের বাপই বাপ রে মনা / পথের  মা-ই মা / পথের মাঝেই খুঁজে পাবি / আপন ঠিকানা … ইত্যাদি। ডেনভারে শুনুন : the highway is the only home I know / Where you’re headed I don’t mind / I ain’t been there in some time / And it’s just exactly where I want to go … বা গানের শেষে যেয়ে এই দৃঢ় প্রত্যয় প্রাপ্য : I’m an old hitchhiker lookin’ to the far side of the hill / Some people say I’ll settle down / Build a home in some small town / But within my heart I know I never will … এই হিচহাইকার একেবারেই বিনিময়-হাদিয়া না-দিয়া পার হবে তা নয়, দেবে সে, দেবে তার লাইফের, তার তিরিশ বছরব্যাপী হিচহাইকিঙের, ক্রেইজি কাহানিগুলো। যদি আপনি শুনতে রাজি থাকেন তবেই, নিমরাজি হলেও সে তার আপনমনে আপনাকে শুনায়েই যাবে, নেহায়েত আপনি গররাজি হলে অবশ্য সে আপনার ড্রাইভিং হুইলের পাশে বসে থেকে তার সস্তা লিক্যর খাবে আর আধনেভা চুরটের পাছা খানিক পরপর প্রাণপণে টানবে, কষে দম দেবে তার সযত্নরক্ষিত মারিজুয়ানায়। ব্বাস্। জীবনের কাছে তার এর বেশি কিছু আর নাই চাইবার। … I was only seventeen when I took the open highway / Took it for my teacher and a friend / I’ve been thirty years a-thumbin’, / some might call it bummin’ / It’s better than just cryin’ in the wind … ছেঁড়া ছেঁড়া তার গল্পের রেখাগুলো সুতোয় গেঁথে তুলুন, দেখবেন কিছু-একটা আবছাভাবে দেখতে পাচ্ছেন যাকে আপনি নিকষিত হেম না-বলুন ফেলনা ভাবতে পারবেন না সার্টেইনলি। … I can tell you how I started in the circus as a barker calling people in from far and wide / They never did regret the dollar that it cost ’em we always left ’em feelin’ good inside / We were headed for Montana when we hired us a dancer, her beauty it was more than I can say / Then one summer night she set my soul on fire, Lord, I wish that she was here with me today … এই হলো মোটামুটি ‘হিচহাইকার’ গানটার স্টোরিলাইন। এইটুকুই কাহানি। কিন্তু খতম এখানেই নয়। … If you’re drivin’ down the road and you come across an old man / Holdin’ out his thumb in the rain / You can pull off to the side /  Let the poor boy have a ride / He can tell you all the crazy things he’s seen … ঘুরে ঘুরে বেজে যায় সেই লাইনটা কানে এবং মনে, সেই লাইনগুলো, I was only seventeen when I took the open highway / Took it for my teacher and a friend / I’ve been thirty years a-thumbin’, / some might call it bummin’ / It’s better than just cryin’ in the wind … “পথের সুরই সুর রে মনা / পথের গানই গান / পথে নেমেই ভুলে যাবি / ঘরের পিছুটান … জেমসের গানের সঙ্গে মিলিয়ে শোনা যায় না? … পথের বাপই বাপ / রে মনা / পথের মা-ই মা” … তা যাবে না কেন, যায়, শোনা যায় তো কত-না-ভাবেই।

কিন্তু জন ডেনভার তার সারাজীবনে যত গান গেয়ে বেড়িয়েছেন, সর্বত্র ভবঘুরে ব্যাপারটা ছিল আগাগোড়া। গানের লিরিকেই ছিল, মিউজিকেও। ঝটপট কয়েকটা গান মনে করে ফেলা যাক। যেমন একটা গান, ‘লাস্ট হোবো’, ভবঘুরেদের দুনিয়াটাও তো ফুরিয়ে এসেছে। যেমন একসময় এই দুনিয়া চরিয়া বেড়াইত লাল ইন্ডিয়ান আদিবাসীরা, “আজ তারা নেই কোনো খবরে”। “নিখিলেশ প্যারিসে মইদুল ঢাকাতে … ব্যান্ডের গিটারিস্ট গোয়ানিস্ ডি-সুজা ঘুমিয়ে আছে-যে আজ কবরে”। অ্যানিওয়ে। শেষ ভবঘুরেটির দিনও তো ধামাকাদীর্ণ সভ্যতায় ক্ষীয়মাণ, সঙ্কুচিত, নিঃশেষ-প্রায়। … Now he’s The Last Hobo / Riding the last boxcar / On the last freight train / Leaving here … Now he’s The Last Hobo / Riding the last boxcar / On the last freight train / Away from here … এবং এরপর আছে শেষদিকে যেয়ে এই স্তবক : Now he knows every railroad bull along the right of way / And every hobo jungle from New York to Santa Fe / He’s looked for his Ramona on the far side of the hill / Now his sun is sinking lower and he’s looking for her still … আমাদের মনে পড়ে যেতে পারে যে হোবোদের নিয়ে বব ডিলানের একটা গান আছে এমনই অনবদ্য। শুধু বব ডিলান কেন, ওই সময়ের অনেকেরই গানে হোবোদেরে দেখতে পেয়েছি আমরা, বব মার্লে উল্লেখ্য, অথবা আরও অধিকতর কবিতাশ্রয়ে লেনার্ড কোহেনের গানে এসেছে এই হোবোরা। ষাটের দশকে একটা আন্দোলনই দানা বাঁধল ওখানে, গড়ে উঠল হিপি কাল্চার, যা কিনা চালচুলোহীন এই হোবো বোহেমিয়ানা দ্বারা প্রাণপ্রতিষ্ঠাপ্রাপ্ত, হোবোদের জীবনধারা-যাপনাচরণ প্রভাবিত ও পথপ্রদর্শিত। গোটা অ্যামেরিকা-য়্যুরোপে এই ম্যুভ অভিঘাত রেখে গেছে। এমনকি বাংলা মুলুকেও, পশ্চিমবঙ্গজনপদে, সিক্সটিজে হিপিদের আনাগোনা-শ্মশানযাপনা এবং গিন্সবার্গ প্রমুখের প্রভাবে বাংলা কবিতায় এবং অংশত পোস্ট-নক্সালাইট ফ্রাস্ট্রেটেড কাল্চারাল অ্যারেনার সঙ্গে জড়িত-যোজিত জনমানুষের জীবনাচারে তথা তাদের বিহেইভিয়্যারাল অ্যাটিট্যুডে হিপি-ইনফ্ল্যুয়েন্স লক্ষ করব। রফিক আজাদ প্রমুখের স্যাড জেনারেশনেও ঘটনাটা ছায়াপাত করেছে দেখা যাবে। এহেন দুনিয়াচারানি হিপিইজম, দুনিয়ার থার্ড চ্যাপ্টারে তো সবকিছুই ট্রিকল-ডাউন ফর্ম্যুলানুগামী, এই চিহ্ন কাজেই ইংরেজি গানে থাকবেই।

বাংলা গানে এই জিনিশ আছে অন্যভাবে। যেমনটা আছে বাংলার সংস্কৃতি ও নিত্যাচরণে, আছে কৃত্যাদিতে, এসেছে তেমনিভাবেই আমাদের গানে। এইটা আমরা দেখব বাউল, ফকির, অন্ত্যজ অনেক পেশাজীবীদের মধ্যে। ব্যাপারটা আমরা আধুনিক গানে কয়েকটা কমন শব্দ জুতে সেরে নিতে চেয়েছি; শব্দগুলো মুখ্যত আউলবাউল, উদাসী, বিবাগী, পাগল, নগরবাউল, অভিমানী, ফেরারী, জিপ্সি, বেদে/বেদেনি, যাযাবর, ভবঘুরে ইত্যাদি। ডিটেইলিং সেভাবে নেই, ডিলান-কোহেন-ডেনভারে যেভাবে আছে। কিন্তু বাউল-ফকিরদের গানে ব্যাপারটা আছে, সেইটা তাদের নিজস্ব ভোক্যাব্যুলারি নিয়েই, তা যত-না গান তারচেয়ে বেশি বরং তাদের নিজেদের দর্শন ও ধর্মাচরণ। নগুরে মধ্যবিত্ত-ও-বৃত্তবলয়ের গানে ব্যাপারটা ঝাপসাভাবে এসে একটুকু ঘষা দিয়ে ফের চলিয়া যাইতে দেখা গেছে। কেন ও কোন পরিস্থিতি-বাস্তবিকতার কারণে, সেইসব অবোধগম্যও নয়, এখানে এ-যাত্রা এই নিবন্ধে অগম্য যদিও।

কথা হচ্ছে যে ডেনভার তার নিজের লেখা প্রায় সমস্ত লিরিক্সে এই হিচহাইকিং, এই বোহেমিয়ানা, বাউলিয়ানাটা চেতনে-অবচেতনে রেখে গেছেন। সমস্ত গানেই দেখা যাবে ডেনভার হয় বাড়ি ছেড়ে দূরযাত্রাপথে বেরিয়েছেন, অথবা উল্টোটা, দূরভ্রমণ শেষে বাড়ির পানে পথ ধরেছেন। পুরা ব্যাপারটা রাস্তায়, স্মৃতিচারণে, ভবিষ্যকল্পচারিতায়, পথিমধ্যে ঘটতে দেখা যাবে। ব্যতিক্রম কদাচিৎ। পথ হতে পারে উড়াল, স্থল, অথবা জল। কখনোই ডেনভার প্রিয়তমার কাঁখ ঘেঁষে বসে, বা বাগদত্তার বাহুডোরে কিংবা অঙ্কশায়িনীর ক্রোড়ে ক্রেডলে দোল খেতে খেতে নৈকট্যন্যাকামো করছেন না। ডেনভার সংলগ্ন হয়ে গেয়ে ওঠেন দূরে যাবার গান, দূরে যেয়ে ফের গাইতে থাকেন সংলগ্ন হবার মার্সিয়া। ‘ক্যারোলিনা ইন মাই মাইন্ড’ গানে দেখুন : In my mind I’m going to Carolina. Can’t you see the sunshine, can’t you just feel the moonshine? / Ain’t it just like a friend of mine to hit me from behind? / Yes, I’m going to Carolina in my mind. অথবা শুনুন ‘ড্রিমল্যান্ড এক্সপ্রেস্’ : I caught a ride on the dreamland express last night, I was sailing on an ocean of blue / When right there by my side, much to my surprise was you. স্বপ্নেও সমুদ্রপথে ডেনভার দূরের পর্যটক, — অভিযাত্রী; — ঘুমে-নিদ্রায়, আধো তন্দ্রায়, আর জাগরণ তো হেমবর্ণ চরৈবেতি মন্ত্রে। অ্যানিওয়ে। অতি উদাহরণে তাঁতি নষ্ট, ভোঁতা হয় মাকুযন্ত্র, তাঁতবস্ত্রের তো দফারফা।

ভিটেভূমিতে-ফলানো পুরুষ্টু রঙিন টোম্যাটোগুলো

ঘরোয়া আর আটপৌরে গৃহী মানুষের সচ্ছল ও সম্পন্ন স্বপ্নকল্পচিত্র জন ডেনভারের গানসমগ্রে একটা ভালো ও বড়সড় জমিন জুড়ে রয়েছে দেখা যাবে। ডেনভারই নন কেবল, সমস্ত ফোক/কান্ট্রিমিউজিশিয়ানের কাজে এই দিকটি বিশেষভাবেই দৃষ্টিগোচর হবে। দৈনন্দিনের যাবতীয় বিপন্নতা সত্ত্বেও সহুজে জীবনাচরণ ও সহজিয়া দর্শন তারা রাখেন তাদের রচনায়। যেমনটা আমরা আমাদের বাউল-সুফি তরিকার পদকর্তা-গাইয়েদের মধ্যে দেখতে পাই, কিংবা দেখি গ্রামগীতির চারণকবিয়াল-গাতকদের মধ্যে, সেইরকমই অনেকটা। হাজারও খোয়াইশের মধ্যে এরা তাদের নিজের দমের সাধনা, আত্মদৈন্যভজনা, আর খাঁচার ভেতরে এক অচিন পাখির আনাগোনা নিয়া ভাবনাভাবনি নিছক নন্দনতাত্ত্বিক নাচাগানার উর্ধ্বে নিয়ে তুলতে পেরেছেন, ডেনভার বা সিগ্যার বা ক্যাশ্, কিংবা হ্যারি বেলাফঁৎ, অথবা ডলি পার্টন বা অলিভিয়া নিউটন জোন্স, অনেকাংশে জোয়ান বায়েজ প্রমুখ গানকারেরা কান্ট্রিমিউজিকটাকে এই পর্যায়েই নাড়াচাড়া-নার্চার করেছেন, যত্নআত্তি করে কান্ট্রিমিউজিকের জগৎ ফ্লারিশ করে গেছেন। তারা তাদের প্রেজেন্ট, তাদের পাস্ট, তাদের ফিউচার সহজিয়ানা ব্যাহত না-করেই গেঁথে রেখে যেতে পেরেছেন গানের গলায়।

ডেনভার তার গানে ম্যানিফেস্ট করেছেন মূলত মহাজীবনের বিস্ময়বিথার, সমস্ত কলুষ ও কৌটিল্য সত্ত্বেও জীবনের আশাকরোজ্জ্বল দিকচক্রবালের দিকেই তিনি দিয়াছেন প্রসারিয়া তার দৃষ্টি। ইংরেজি কি বাংলা বা পাঞ্জাব-পশতু মহাজনশিল্পীরা তা-ই করেছেন যুগে যুগে, সহুজে যাপনের জয়গাথা রচেছেন ও গেয়েছেন। অন্য ঘরানার শিল্পীদের মধ্যেও সহজিয়ানা ভাবচিত্র হাজির হয়নি এমন নয়। যেমন বব ডিলানের কথাই ভাবা যাক। ডিলানের গানে ট্যাম্বুরিনবাদকের প্রতি যে-আর্তি প্রকাশ হইতে দেখি, তা-ও মুখ্যত সহজেরই আরাধনা। তারপরও ডিলান রোজকার জঙ্গম-জটিলতা থেকে ক্ষণিকের পরিত্রাণ চেয়ে ফের জঙ্গমেই ফিরতে চেয়েছেন, উতরোল ওই বিষাদনগরই তার আরাধ্য, অবসাদেই তিনি থাকতে চেয়েছেন স্থিত। অধিকাংশ মডার্ন/পোস্টমডার্ন মানুষ তা-ই চায়। Hey Mr Tambourine Man play a song for me / I’m not sleepy / And there’s no place I’m going to … In the jingle-jangle mornin’ / I’ll come followin’ you … তুলনীয় কবীর সুমনের “ও গানওলা / আর-একটা গান গাও / আমার আজ কোথাও যাবার নেই / কিচ্ছু করার নেই” … ডিলানের ছায়াবলম্বিত হওয়া সত্ত্বেও কবীর সুমনের ‘গানওলা’ তাম্বুরাবাদকের চেয়ে একেবারেই ভিন্ন দ্যোতনাবহ … সুমন এখানে আলোচ্য নন বলা বাহুল্য, বরং ডেনভারসূত্রে একটুখানি ডিলান আলোচ্য … সকালবেলাটা সাঙ্গ হলেই তিনি — ডিলান — তার ভোরের ভাবালুতা ভুলে ফের প্রবিষ্ট হয়েছেন ব্যোদলেয়্যরীয় নগরহট্টগোলে, ক্লেদজ কুসুমে, নারকীয় মধুবিষভরা নাগরিকতা ব্যাখ্যানে-আখ্যানে। এইখানেই ডিলানের সঙ্গে ডেনভারের একটা ফারাক আমরা ঠাহর করি। ডেনভার এই বীভৎস রসালো পোলিটিক্যালিটিদীর্ণ দুনিয়াদারির মাঝারেই একটা মাউন্টেন, একটা ফাউন্টেন, একটি ঈগল, একটা বাজপাখি, একটা কান্ট্রিরোড, একটা অ্যালাস্কা, একটা অ্যাস্পেন ধরে রাখেন গানে তার বারেবারে। এইটা আদৌ পলায়নী মনোবৃত্তি নয়, এইটা বরং রসেবশে বেঁচে থাকারই কায়মনো প্রচেষ্টা। এইটা বিপুলা বৈচিত্র্যবৈভবপূর্ণ ধরণীর বিভা আরও উজ্জ্বল না-হোক অবিকল রক্ষণের এক মরিয়া উদযোগ। ‘প্রথম মায়ের চুম্বন’, প্রথম ঊষালোক সংরক্ষণ, প্রথম ও আদিম গাছনিঃশ্বাস-হাওয়াবাতাস বাঁচানো। ধরণীকে তার প্রথম উদ্ভাসনমুহূর্তের সংলগ্ন করে রাখার কোশেশ, ধরণীপৃষ্ঠস্থ সন্তানসন্ততিদিগেরে তাদের প্রথমদিনের স্মৃতির অনুবর্তী করে রেখে যাওয়া প্রাণপণ। ডেনভারের গানে এইটাই পোলিটিক্স, এ-ই তার পোলিটিক্যালিটি। ইটার্ন্যাল মেমোরির রেনেসাঁ তার গানের অভীষ্ট। চন্দ্রসূর্যগ্রহজলমাটি নিমেষহীন অনিঃশেষ ধরতে চায় ডেনভারের গান। মুহূর্তের বিহ্বলতা ও বুদ্বুদগুলোকে তিনি চিরন্তনের ফ্রেমে ফেলে ক্যানভাস ভরে তুলতে জানেন জলরঙে, তেলরঙে, বাতাসরঙে, রৌদ্ররঙে।

ডেনভারের একটা গান আছে বসতভিটেয় নিজের-হাতে-ফলানো টোম্যাটোতরু ও ফসলোত্তোলনের সুখ ও সৃজনোল্লাস উপজীব্য করে লেখা ও গাওয়া। কাওবয় মিউজিক এইটা। গানটা ফ্ল্যাট একটা পাঠ হাজির করে টেক্সট লক্ষ করলে, কিন্তু সুর সহ শুনলে এর ব্যঞ্জনা পাওয়া যায় ঠিকঠাক আমাদের অভিপ্রায়ের সন্নিকটবর্তী। There ain’t nothing in the world that I like better / Than bacon and lettuce and homegrown tomatoes / Up in the morning, out in the garden, get you a ripe one, don’t pick a hard one / Plant ’em in the spring, eat ’em in the summer / All winter without ’em is a culinary bummer … এইভাবে শুরু করে পরে হোমগ্রোন টোম্যাটোপ্রোডাক্টের ডিটেইলিং, এবং কনক্লুশনে যেয়ে এমন কথারূপ : If I was to change this life I lead / You could call me Johnny Tomatoseed / ‘Cause I know what this country needs is homegrown tomatoes in every yard you see / When I die, don’t bury me in a box in a cold dark cemetery / Out in the garden would be much better ’cause I could be pushing up homegrown tomatoes … গানের ঘটনা এইটুকু। সহজ সরল কথার গান, প্যাঁচপয়জারহীন, সহজ সরল সুরের গান। নিরলঙ্কার, নিরহঙ্কার, নিরাভরণ। শুধুই ব্যথার মতন সুখের এক সুর, আবেশ, হৃদিঝিমঝিম নৈসর্গিক সবুজপাতা যাপনের লোভ। মনে পড়বে আমাদের অনেকেরই যে, এই সেদিনও শীত সিজনে আমরা প্রায় প্রত্যেকে খুন্তি-কোদাল-খুপ্রি আর জলঝাঝরি হাতে নেমে পড়তাম ভিটা-লাগোয়া বাগান রচনায়, শীতকালীন সব্জিবাগান ঘরে-ঘরেই ছিল যতটা-না অ্যাগ্রিকাল্চার তারচেয়ে বেশি কাল্চারের পার্ট, হোমস্টেড ভেজিটেবল গার্ডেনিং বা কিচেন গার্ডেন ছিল পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে আমাদের কমন-পড়া আইটেম, এমনকি রাজধানীর ধানমণ্ডি অ্যারিয়ার অলমোস্ট অধিকাংশ রেসিডেন্সের সামনে একচিলতে লন্ বহাল থাকতে দেখেছি আমরা কেউ কেউ, এবং দেখেছি সেইসব লনচত্বরে ব্যাডমিন্টন কোর্টের পাশে ঘের-দেয়া রাইশর্ষে-বেগুন-টোম্যাটো ও ধনেপাতাবিথার। ঢাবি-ক্যাম্পাসের ভেতরে এই-তো কয়েক-বছর-আগে নব্বইগোড়ায় লেখক আহমদ ছফা লাউ-কুমড়া-বেগুনের জাঙাল রচেছেন সুবিস্তৃত, ফলিয়েছেন পরে সেই-অভিজ্ঞতাভিত্তিক অনবদ্য উপন্যাস ‘পুষ্প বৃক্ষ ও বিহঙ্গ পুরাণ’, জাস্ট ইম্যাজিন! শস্য নয়, সচ্ছলতা-প্রতিপত্তি নয়, শিশির শিকার করে নিয়ে যেত বরিশালজন্মা সেই জীবনদাশের ন্যায় আমাদেরও চক্ষুহৃদয়। একদিন, হায়, সেই কোন-এক কালে! যেন কোনো ধূসর ধূসরতর অনেক অতীতে! বেগুনের ঘন-থকথকে পাতায় শিশিরের এফেক্ট, আর টোম্যাটোপত্রে জমা-হওয়া ঝিরিঝিরি শিশিরের সঙ্গে শিমপাতায়-শিমফুলে ভাসমান শিশিরের স্বচ্ছ ক্রিস্ট্যালিটি ঠিকঠাক সনাক্ত করতে আমরা জানতাম তখন। গাইতে জানতাম মৈমনসিংহগীতিকার গান : নয়া বাড়ি লৈয়া রে বাইদা লাগাইল বাইঙ্গন / সেই বাইঙ্গন তুইলতে কইন্যা জুড়িল কাইন্দন গো জুড়িল কাইন্দন।

আপাতদৃষ্টিতে এই-রকম অনেক ফুর্তির গান গেয়েছেন ডেনভার জীবনভর। স্য্যুইটেস্ট সেইসব গান আমাদেরে স্যাডেস্ট থটের দিকেই ধাবিত করতে চায় যেন। সমস্ত শিল্পেরই মোক্ষ এই স্যুইটনেসের ভিয়েন চড়িয়ে স্যাডনেসের দিকে নিয়া যাওয়ায়। ডেনভার স্বতস্ফূর্ত স্বরে এহেন অপার্থিব ফুর্তির গান অনেক গেয়েছেন। নিজের দাদিমা নিয়া গানে, প্রেম ও প্রেমিকা নিয়া গানে, মেরি-গো-রাউন্ড গানে, এডপ্ট-করা পুত্রকন্যা নিয়া গানে এই নিখিলধন্য ফুর্তির টোন ফিরে ফিরে এসেছে ডেনভারে। এইসব গানের অনেকাংশ সংগৃহীত বটে। ডেনভারের গাওয়া তাতে ডেনভারীয় ডাইমেনশন যুক্ত করেছে নিশ্চয়। একটা গান শোনা যাক এইরকমই : Be sure it’s true when you say, I love you,  It’s a sin to tell a lie / Millions of hearts have been broken, Just because these words were spoken / I love you, Yes I do, I love you, If you break my heart I’ll die / So be sure it’s true, When you say I love you, it’s a sin to tell a lie … Cross my heart, hope to die, I’ll never, never ever tell another white lie … এইসব দুষ্টুমিষ্টি বিষাদের ভালোবাসার গান, বাৎসল্যের গান, গেয়েছেন ডেনভার। উড়িয়েছেন বাতাসে পাখির ফুর্তিশিস, তাতে বুলবুলির বিষাদাবহ পুরে রেখেছেন কী-এক দুর্জ্ঞেয় কৌশলে যেন। ফোক মিউজিকে এই ম্যাজিকস্পেল, এই জাদু, সর্বদেশে সর্বকালে সর্বভাষে সর্বসুরান্তরে বিরাজে। এইটা বাংলায় একইরকম লভ্য। তবে আমরা আনন্দও প্রকাশ করি দুঃখসুরে, উদাহরণ রবীন্দ্রসংগীত, ইংরেজি গানে উল্টাটা। মানে তারা আনন্দগরজনে তাদের দুঃখ প্রকাশ করে, চটজলদি উদাহরণ দেয়া যাবে রক্-ন্-রল্ থেকে। কান্ট্রিমিউজিকের ক্ষেত্রে এর ব্যত্যয় দেখা যাবে না বৈকি। ব্যাঞ্জো, গিটার, হার্ম্যোনিকা আর মুখনির্মিত বাদ্য তথা শিসধ্বনি কিংবা হাততালিয়া দিয়া কান্ট্রিমিউজিকে এই স্পেলবাউন্ড সুরচর্যা আধুনিক জমানার ঢের আগে থেকেই কেল্টিক-আইরিশ রাখালিয়ারা চালু করেছিল তাদের কওমের ভেতরে, ডেনভারে এসে সেই সুরের সেই ঘরানারই বিস্তার আমরা দেখে থাকি।

ভুবনভ্রমণ, গ্লোবট্রটার, গগনবিহার ও জন্ ডেনভার

পিচঢালা এই পথটারে ভালোবেসেছি / তার সাথে এই মনটারে বেঁধে নিয়েছি — এইটা বাংলা ছায়াছবির একসময়কার লোকপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে একটা। আজও লোকের মুখে মুখে ফেরে এই গান, এমনকি রিসেন্ট পোলাপানদেরেও গলা ছেড়ে গানটা গাইতে দেখা যায় একলা বা বান্ধববৃত্তীয় অক্যেইশনে। এই কথাটা প্রায় প্রামাণ্য যে দেশভাষাকালসীমা নির্বিশেষে বেদুইনস্বভাব/বেদেন্যাচার ব্যাপারটা মানুষের ভেতর বিরাজে বলেই মানুষ পথ ও পথিকের প্রতি প্রেমাকর্ষণবোধ তথা ফ্যাসিনেশন টের পায়, মুসাফিরের দর্শন ও গান ভালোবাসে এবং গায়, বেড়াতে যায় গ্রীষ্মে-শীতে দূরে কোথাও সমুদ্রে-পাহাড়ে-সমতলে এবং অপরাহ্নে হাওয়া খেতে বেরোয় গাঙপারে, রাত জেগে কামরার ভেতর ইতস্তত পায়চারি করে, এমনকি নিদ্রিত মানুষ ঘুমের ভেতরেও খোয়াবে ঘরবাহির করে।

ডেনভারের সমস্ত গানে একটা ব্যাপার দেখা যাবে যে তিনি চরৈবেতি মন্ত্রপূত মানুষের ও সভ্যতার ছবি আঁকছেন। চলতি-কা নাম গাড়ি — হিন্দি সিনেমাবাক্যের ন্যায় নিরন্তর বহতা জীবনেরই জয়গাথা গায় ডেনভারের গানগুলো। দুইটি-তিনটের মামলা না, প্রায় সমস্ত গানে ডেনভার সেই সচলায়তনের সাইটস্ অ্যান্ড সাউন্ডস্ পুরে রেখেছেন। স্বচ্ছ, স্বাভাবিক, ঝর্ণাঋজু সহজিয়াভাবে। এইটা তার একদম প্রথম হিটনাম্বার ‘কান্ট্রিরোডস টেইক মি হোম’ থেকে শুরু করে অ্যালবাম হিশেবে স্টুডিও-রেকর্ডেড অন্তিম অ্যালবাম ‘অল অ্যাবোর্ড’ পর্যন্ত গোটা ক্যারিয়ারে ডেনভারের গাওয়া তিনশতাধিক গানের মধ্যে একটা গানও দেখানো মুশকিল যেখানে ডেনভার স্থবিরতার জয়কীর্তন করছেন। গোটা-তিরিশেক স্টুডিও-অ্যালবাম তার, সিঙ্গেলস্ এবং কম্পাইলেশন প্রভৃতি ক্যালক্যুলেশনের আওতায় নিলে অ্যালবামসংখ্যা আরও অনেক বেশি, কোথাও মরণেচ্ছা নাই, মৃত্যুমুখরতা নাই, জীবনস্তুতি ও জীবনফল্গুস্ফূর্তি সর্বত্র। ১৯৯৭ সালে মৃত্যুর মাত্র দুইমাস আগে রিলিজড ‘অল অ্যাবোর্ড’ অ্যালবামের গানগুলো শুনলে যে-কেউ কথাটার সত্যতা হাজির পাবেন। ডেনভারের জীবনতৃষ্ণা, থার্স্ট ফর লাইফ এবং একইসঙ্গে ডেনভারের লাস্ট ফর লাইফ, টের পাওয়া যায় অ্যালবামের নামকরণ থেকেই। নিসর্গঘনিষ্ঠ-প্রকৃতিপ্রীতিনিষ্ঠ সেইসব অ্যালবামনামের মধ্য থেকে ‘আই ওয়ান্ট টু লিভ’ এবং ‘টেইক মি টুমরো’ শুনলেই বোঝা যায় ডেনভারের রৌদ্রকরতালিমুখর জীবনপিপাসা কেমন ছিল ও কতটুকু ছিল।

উদাহরণ খুব বেশি দেবার দরকার নাই। ইউটিউবের যুগে, ইন্টারকানেক্টেড এই ওয়েবগ্লোবে, লেখার সঙ্গে এক্সাম্পল মোটেও জরুরি কিছু নয় আজ আর। লেখকের কাজ নয় মিহি কেরানিগিরি করা। উদাহরণদাতা হবার গরজ বা জোর প্রয়োজন কোনোদিনই ছিল না লেখকের, যদিও কমন টেন্ডেন্সি এইটাই দেখা যাবে যে লেখক লিখতে লেগে খালি উদাহরণই দেয়, কামের নামে লবডঙ্কা। মানে একহাতহ্রস্ব বক্তব্যের/অনুভবের/পর্যবেক্ষণের তেরোহস্ত লম্বা দৃষ্টান্ত! ফলে পাঠকও হয়েছে দুনিয়ার অলস, কুঁড়ের ঠাকুর, প্রমাণ চায় কেবল কথায় কথায়। নিজে একটু উদ্যোগী হয়ে একটু শ্রমনিষ্ঠ সময় বিনিয়োগ করে ইউটিউবে একটা ঠাপ দিলেই তো রবীন্দ্রসমগ্র ছাব্বিশটন উদাহরণ উপস্থিত।

বলা হচ্ছিল যেমনটা যে ডেনভারের যে-কোনো গানেই তার ট্র্যাভেলার সত্তার হাজিরানা পাওয়া যাবে, ব্যাপারটা আক্ষরিক ও অন্য সমস্ত অর্থেই ঠিক তা-ই। বিমানের ন্যায়, পারাবতের ন্যায়, পাখির ন্যায় ডেনভার উড়ে উড়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন, এখানে ওখানে, এক স্টেইট থেকে আরেক স্টেইটে। এক কন্স্যার্ট থেকে আরেক কন্স্যার্টে শিফ্ট করার বিরতিটুকু সড়কের ওপর গাড়িতে কেটেছে সহশিল্পীদের সঙ্গে। নিজের কোআর্টিস্টদেরকে, অ্যারেঞ্জার-বাজনাদার-ম্যানেজার-টিমমেইটদেরকে, ফ্যামিলিমেম্বার জ্ঞান করতেন। লটবহর নিয়ে একের-পর-এক কন্স্যার্ট মুজরোতে গেয়ে গেয়ে কেটেছে লাইফের থ্রি-ফোর্থ। বায়না থাকত বছরজোড়া। কাজেই নিরুপম ভ্রমণেই ইয়ারএন্ড-উইকএন্ড ফুরাইত। সুরপর্যটন, গানভ্রমণ, নন্দনানন্দপরিব্রজন। বাহন হিশেবে মিনিভ্যান, ওয়াগন, ল্যান্ডক্র্যুজার তো ছিলই একদম গোড়ার দিকটায়; একসময় অ্যারোপ্লেইন হয়ে ওঠে ডেনভারের নিত্যবাহন। কন্স্যার্টে যেতেন উড়োজাহাজে চেপে। ডেনভার ছিলেন দক্ষ একজন অ্যাভিয়েটর। একাধিক এয়ারক্রাফ্ট খরিদ করেন ক্যারিয়ারের মধ্যগগনে পদার্পণের আগেই। নিজে সেস্না চালিয়ে কন্স্যার্টে যেতেন। এই জীবনযাত্রা, ভ্রামণিক এই সত্তা, গানে ভালোভাবেই পোর্ট্রে করেছেন ডেনভার।

ফলে এই রাস্তাচারণ ডেনভারের গানে, অলমোস্ট প্রত্যেকটা গানে, চেহারা দেখায়েছে ফিরে ফিরে। একডজনেরও অধিক গানে রেলগাড়ি বিষয়ভিত্তিশীর্ষ হয়েছে দেখতে পাই। উড়ালযান তো সমস্ত গানে রেখেছে তার উড্ডয়নবিস্তার আর প্রোপেলারপাখার পাখসাট। সমুদ্রাভিযানও অনুপস্থিত নয়। ডেনভারের গান শুনলেই মনে হবে যে ট্রেনের জানালা দিয়ে দৃশ্যমায়া আর দৃশ্যবিষাদ দেখতে দেখতে চলেছেন তিনি। যেমনটা আমরা রবার্ট ফ্রস্টের কবিতাপাঠোত্তর দেখতে পাই যে এই কবি ট্রেনবাতায়নে ক্রমাপসৃয়মাণ দৃশ্যচূর্ণের সিনেম্যাটোগ্রাফার। ডেনভার ঈগলের ন্যায় নেত্র প্রসারিয়া দেখেন নিম্নে-উতলা ধরণীতল। দেখার অভিজ্ঞতায় একসময় ক্যানভাস ভরে তোলেন সুরে আর ছন্দে। ‘স্যেইল অ্যাওয়ে হোম’, ‘স্টারউড ইন অ্যাস্পেন’, ‘শি ঔন্ট লেট মি ফ্লাই অ্যাওয়ে’, ‘দি ঈগল অ্যান্ড দ্য হ্যক’, ‘লিভিং অন অ্যা জেটপ্লেইন’, ‘ফ্লায়িং ফর মি’, ‘ফ্লাইট’, ‘দি উইংস দ্যাট ফ্লাই আস্ হোম’, ‘ফ্লাই অ্যাওয়ে’, ‘ব্যাক হোম অ্যাগেইন’, ‘অন দ্য রোড’ প্রভৃতি অসংখ্য গানে ট্র্যাভল্যগ রেফ্রেন্স উপজীব্য সরাসরি।

দুই-তিনটে লাইনের উদাহরণ আওড়ানো যাক এবার। নমুনা উদাহরণ। ‘স্টারউড ইন অ্যাস্পেন’ গানে দেখি : It’s a long way from L.A. to Denver, it’s a long time to hang in the sky / It’s a long way home to Starwood in Aspen, my sweet Rocky Mountain paradise … Springtime is rolling ’round slowly, gray skies are bringing me down / Can’t remember when I’ve ever been so lonely / I’ve forgot what it’s like to be home, can’t remember what it’s like to be home / I think of my lady’s sweet memory, I think on my children’s sweet smiles / I think of my home at Starwood in Aspen, all my friends and the snow-covered hills / Oh, my friends are the snow-covered hills … এইভাবে ডেনভারের জীবনের বড় সময়টা কেটেছে ‘হ্যাং ইন দ্য স্কাই’, আকাশে ঝুলে থেকে ডেনভার কাটিয়েছেন বেলা। আকাশ থেকে নেমে ফের ‘অন দ্য রোড’, গাড়ির উইন্ডশিল্ড, ভিয়্যুমিরর, ভিয়েকল-উইন্ডো। পছন্দও করতেন ক্লান্তিহীন ভ্রমণ-পর্যটন-পরিব্রজন, বিশেষভাবেই আকাশচারিতা, অবসরে অ্যাস্পেনে কান্ট্রিসাইড বাড়িটার বুনো-জংলা চারিধার। এরই মাঝখানে লিখেছেন, সুর করেছেন, গেয়েছেন। অন্তহীন উড়ালকাহিনি, নিরুপম নিরুদ্দেশযাত্রার ভ্রমণাখ্যান, সমুদয় ডেনভারস্যংস্।

ঈগল, ক্যানিয়ন্, ক্লিফ, মাউন্টেন্

মঞ্চপরিচয় হিশেবে যে-নামটা ক্যারিয়ারসূচনায় নিজের সঙ্গে জুড়ে নিয়েছেন, তখন তো কল্পনাও করা যায় নাই যে এই নামেই পৃথিবীর নিরাময়-উপশমপ্রদায়ক সুরসংগীতকথাকার হয়ে উঠবেন এই লোক কখনো অচিরে, এ-থেকেই কিছুটা বোঝা যাবে ডেনভার কী ভীষণ পাহাড়প্রেমিক ছিলেন। “আমার হৃদয় চায় পাহাড়ে নিবাস, পাহাড়ী জীবনযাপন” — মাই হার্ট লংড্ টু লিভ ইন দি মাউন্টেইন্স —  বলেছেন এ-রকম কথাবার্তা গানে, সাক্ষাতে এবং অটোবায়োগ্রাফে। ক্যাথিড্র্যালসদৃশ সুউচ্চ মিনারের ন্যায় পাহাড়ে — যে-পাহাড় দেখলেই গির্জাচুড়োর ঘণ্টিধ্বনি গম্ভীর অনুনাদ তোলে ডেনভারের ভেতরে, যে-পাহাড় পবিত্র-ও-সমাহিত উদ্ভাসে উদ্দীপিত-উজ্জীবিত করে ডেনভারের দেহ ও অন্তর্জগৎ, যে-পাহাড় আমাদেরও অন্তর বিকশিত করে জাফলং-শুভলং-ক্যালিম্পং গেলে — সেই পাহাড়ের টানে ডেনভার খররৌদ্রে-চঙ্ক্রমিত ঈগলের ন্যায় চক্কর দিয়ে ফিরেছেন জীবনভর গানে গানে; এবং রক্তের ভেতরে একটা অপরাধবোধ সবসময়  বয়ে বেড়িয়েছেন শুভ্রদেহ স্বগোত্রের হাতে প্রবঞ্চিত-প্রহৃত-নিহত সেই আদি-অ্যামেরিক্যান পাহাড়সন্তান ঈগল ও বাজপাখির বন্ধুসত্তা লাল-মানুষগুলোর পবিত্র স্মৃতিতে, সেই চিহ্ন বিধৃত তার অনেক রচনায়। রেড-ইন্ডিয়ানদের পবিত্র প্রতীক ঈগল ও বাজপাখি, ঈগলপাখনাপালক ও বৃক্ষপত্রালিবাকলের উষ্ণীষ-মুকুট প্রভৃতি শৌর্যপ্রসঙ্গ যখনই ডেনভারগানে এসেছে, সেই প্রকৃতিবিস্তৃত সরল-সবল-সাহসী মানুষগুলোর স্মৃতি নিয়েই শ্রোতার চোখে ধরা দিয়েছে। ‘ঈগল ও বাজপাখি’ শিরোনামের গানে যেমন রক্তমাখা পালকের ঈগল ও বাজপাখির গলা ধার করে ডেনভার গাইছেন, স্বগোত্রের সেই অপরাধেতিহাস মনে পড়িয়ে দিচ্ছেন লোক-সকলেরে : I am the eagle, I live in high country in rocky cathedrals that reach to the sky / I am the hawk, and there’s blood on my feathers / But time is still turning, they soon will be dry / And all those who see me, and all who believe in me / Share in the freedom I feel when I fly. এবং এর লাস্ট স্ট্যাঞ্জায় যেয়ে এই আহ্বান ধ্বনিত হতে শোনা যায় : Come dance with the west wind and touch on the mountain tops / Sail o’er the canyons and up to the stars / And reach for the heavens and hope for the future / And all that we can be, and not what we are. এই প্রসঙ্গে আরেকটা গানও স্মরণ করা যেতে পারে, Wooden Indian, যেখানে ডেনভার নিজেকে এক বুনো ও লড়াকু লোহিতবর্ণা মানুষের জায়গায় প্রতিস্থাপিত করে গেয়ে উঠছেন : I was a red man, I was proud, I was strong / You were the white man and you stole away my home / Now I am a wooden Indian, painted dreams inside my head / Times the way you bring me down make me wish that I was dead. স্বগোত্রের শ্বেতবর্ণা মানুষগুলোকে এই গানে যেন অভিসম্পাত করছেন ডেনভার অন্তর থেকে, এবং আপন প্রপিতামহের পিতার কসম কেটে এহেন সঙ্কল্প প্রকাশিছেন : I swear by my grandfather’s father, we’re gonna rise again. বলছেন : I was a red man, in my passing made no sound / You were the white man and you drove me in the ground / Now I am a wooden Indian standing silent in the rain. বলছেন, এখন আমি নিষ্প্রাণ-নির্জীব কাষ্ঠবৎ হলেও এইটেই চিরসত্য নয় জেনো; বলছেন, আমার ঠাকুর্দার বাপের কসম আবারও সটান দাঁড়াব আমি এই প্রিয় জন্মভূমিতে একদিন! কত-না আগের লেখা-গাওয়া গান, উডেন ইন্ডিয়ান, ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে রিলিজ-পাওয়া ‘দি লোন রেইঞ্জার’ দেখতে দেখতে এই গানটা মনে পড়ছিল, জনি ডেপ এই সিনেমায় ন্যাটিভ অ্যানশিয়েন্ট অ্যামেরিক্যানের যে-রোল করেছেন, দুর্ধর্ষ সুন্দর সেই টন্টো নামভূমিকার ক্যারেক্টারটার সঙ্গে গোটা ম্যুভি জুড়ে ট্র্যাভেল করতে করতে ডেনভারের ‘উডেন ইন্ডিয়ান’ সুর ও গানের কথাগুলো মনে পড়ছিল। অত্যন্ত কৌতূহলউদ্দীপক একটা তথ্য এখানে আমাদের মনে পড়বে যে, ডেনভারের প্রিয় ঘোড়াটার নামও ছিল টন্টো, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় এই ঘোড়াটা উপস্থিত হয়েছিল মর্মে আমরা কাগজে পড়েছিলাম মনে আছে আজও। মনে পড়ে যাবে যে, আমাদের মনে পড়ে যাবেই যাবে, একজন অন্তত আছেন বাংলায় যিনি এই ঈগলের ক্ষিপ্র গতি ও ক্রোধ-বেদনামিশ্রিত গলায় গেয়েছেন এই মধুরিমা গানের দেশে, এই পুতুপুতু প্রণয়গীতের সোনালি ধানের ষড়ঋতুরঙিন দেশে। কবি তিনি, শিল্পী, কফিল আহমেদ। কফিলের গানে গরু-মোষ গোঙায়, সগর্জন শুনায়ে যায় বেদনা ও বঞ্চনার গাথা, গাছপালা-পাখিপোকা-ঘাসফড়িং-তরুলতাপাতা কথা কয় কেঁদে ও কাঁদিয়ে আমাদেরে, রেগে ওঠে ও রাগায় আমাদেরে, স্তম্ভিত করে রাখে চরাচর। পাখির ডানায় দারুণ শক্তি, আহা, গরুর চোখে মায়া। আর কিছু? গরুর চোখে লেগে থাকে মায়া, আর তার শিঙে জাগে সাহস। এই গান কোনো মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির মালিকের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ নয়, এই গান সরাসরি আমার ও আপনার, এই গান খোলা ও উদাত্ত ও উদ্দাম অশ্বত্থতলার, এই গান বাংলাপ্রান্তরের, এই গান গোরস্থানের গোর-ফুঁড়ে-ওঠা শান্তির, এই গান ঝলসানো দুপুরবেলাকার, এই গানের মেটাফর ও সিমিলি নির্মাণকৌশল বাংলাগানভাণ্ডারে এর আগে হেরি নাই আমরা, আর এই গানই কফিল আহমেদ গাইলেন গোটা একটা মানবজীবন ব্যয়িত-নিঃসৃত করে। স্বজাতির যৌথচৈতন্য কফিল ধারণ করেন নিজের রচনায়, একের-পর-এক গানে তিনি বাজপাখির খরশান আঁখিবিকিরণ ঘটায়ে চলেন। এই এক কবি, শিল্পী তিনি, নিঃশর্ত বন্দিত হবেন একদিন যবে এই মিডিয়াডামাডোল থিতিয়ে আসবে; ডেনভারের গানে যেমন এক উডেন ইন্ডিয়ানের, বুনো ও উদ্দাম স্বপ্নের সরলসিধা মানুষের, পরাজিত অসহায়তা সত্ত্বেও নিভৃত-সুদৃঢ় সংকল্পনা — বাপঠাকুর্দার বাপের কসম এই নির্জীব-নৈরব্য রইবে না চিরদিন অপরিবর্তিত এইভাবে, একটা গোটা জাতি নিশ্চেতন-নিশ্চেষ্ট কুটিল সিন্ডিক্যাটে মেতে ম্যাড়ম্যাড়ে মাকালগাছের তেজারতি নিশ্চয় চিরকাল বহাল থাকবে না। সাতটা শঙ্খ, পুরোটা সপ্তক, একসাথে বেজে উঠবেই একদিন। And reach for the heavens and hope for the future / And all that we can be, and not what we are. আমরা তা-ই, যা আমরা হতে পারি — কি হয়েছ তুমি, সেইটা বড় কথা না, তুমি কি হতে পারো, তোমার অভাবিত অপার সম্ভাবনা, সেইটাই বড় কথা, সেইটাই তুমি প্রকৃত প্রস্তাবে। 

ডেনভারের দিকে দেখি

সিয়িং ইজ বিলিভিং — কথাটা এমনিতে ঠিকই আছে, দেখাবাদী হওয়া আদৌ মন্দ কিছু তো নয়, কিন্তু দেখা ছাড়া আদৌ কোনো দয়ামায়া নাই কিসিমের কট্টরপন্থা ভালো উপায় না কোনোভাবেই। ঠিক তেমনি অদেখা মানেই বিউটিফুল, অদেখাই শক্তি অদেখাতেই মুক্তি, অদেখাই পরম পূজ্য অদেখাতেই ভক্তি — এইটা আবার আরেক ব্যামো, মহাব্যামো। মোদ্দা কথাটা এ-ই যে দেখাশাসন ও অদেখাশাসন উভয়েই সমভাবে ত্যাজ্য। কোনোপ্রকার শাসনপ্রস্তাব উত্তম কোনোকালেই নয়কো। দুয়ের স্বাভাবিক জোড়বন্ধন, অথবা দুয়ের মধ্য থেকে যে-কোনো একের যথাস্বতঃস্ফূর্ত উপস্থাপন, অভিপ্রেত। তবে একটাকে শ্রেয় আর অন্যটাকে হেয় করা কাজের কথা নয়। এইটা আমাদের কাল্চারে দেখা যায় যে, এতদঞ্চলে তথা বাংলায়, দেখার চেয়ে অদেখাকে উচ্চতর আসন দেয়া হয়। দেখার দরোজা আঁটোসাঁটো সংকীর্ণ, মনে করা হয়, অদেখার দরোজা বুলন্দ। চর্মচক্ষুটারে আমাদের মাটির গানে এবং কৃত্যসংস্কৃতিতে ছোটনজরে দেখার ব্যাপারটা ভারি ইন্ট্রেস্টিং। বলা হয় আঁখি মুঞ্জিয়া দেখিবারে রূপ ও যৌবন। ঘটনাটা জালালুদ্দিন রুমির সুফি কালামে যে-অর্থে, হাসন রাজার গানে যে-অর্থে, সাধারণ্যে সংস্কার-আচারে সে-অর্থে তো প্রতিভাত হয় নাই। ফলে আমরা আমাদের শোণিতে-মজ্জায় এই ব্যাপারটা ইঞ্জেক্ট করে নিয়েছি যে দেখনদারি নিচুমানের ব্যাপারস্যাপার। দেখার আনন্দে ভরপুর দেখা যাবে ডেনভারের গান। শুধু ডেনভার বলছি কেন, ইংরেজি গানে দেখাটাকে উচ্চাসন দেয়া হয় চিরকাল। আমরা অদেখার হস্তে সঁপিয়া দিয়াছি ঠাকুরকাব্যের ভারতেশ্বর শাজাহানের ন্যায় জীবন-যৌবন-ধন-মান। ফলে বাংলা গানে, বাংলা কবিতায়, এত ধোঁয়াশা।

ব্যাপারটা গোড়ায় কিন্তু একটাই, ডেস্টিনেশনও অলমোস্ট অভিন্ন, শুধু মাঝখানে বিরাট ফাঁকা জায়গা। বাংলা গানে-কবিতায় আপনি দেখবেন যে একটা আখাম্বা অ্যাবস্ট্রাকশন সুলভ, যেইটা আপনি কৃপাময়ের হাজার করুণাতেও কুলকিনার খুঁজে পাবেন না। আপনি তখন বুঝবেন যে এইখানে অদেখা বিরাজিছেন, অদেখাকে বোঝা আপনার-আমার ন্যায় ভ্যাগাবন্ডদের কম্ম নয়। বেঙ্গলের কবিতায়-গানাবাজানায় সিয়িং/দেখা ব্যাপারটা আদৌ কুলীন কিছু নয়, একদম প্রোমোট করা হয় না দেখা বা দেখনদারিকে, অদৃশ্য ও অধরার জয়জয়কার সেথায়। দেহহীন চামেলীর রমরমা কারবার, অনঙ্গ দয়ালের বা প্লাতেরো-প্লেটোনিক দয়িতার বা বিদ্যাপতির অতিশয় অপার্থিবা কাতরতার, কায়াহীন দিগবালিকাছায়ার কম্যার্শিয়্যাল প্রোমো দিয়া বাংলা নাচাগানা ভরপুর। রিয়েল চামেলিপুষ্প, এমনকি সেল্যুলয়েডের চিক্নি-চামেলি ক্যাট্রিনা কাইফ, গড়াগড়ি যায় রাস্তায় — সেদিকে বেঙ্গল জিনিয়াসদের খবরবার্তা নাই। জিন্দিগিভর খালি অধরা আর অদেখা আর অশরীরীর পিছে ধাওয়া করো, না-হলে মিউজিকে-পোয়েজিতে কামিয়াবি বিলকুল না-মুনকিন ইস্-মুল্ক-ম্যে। অ্যানিওয়ে। যে-দেশে যেমনটা বাওবাতাস। যস্মিন দেশে যদাচার।

একেকটা ভাষার একেক দেশের গান বলি বা প্রাণস্ফূর্তি বলি বা সংস্কৃতিসংস্থান সমস্ত আলগ-আলগ। ফলে ইংরেজি গানের যা চাল ও চলন, উর্দু গজলের বা ফার্সি বয়েতের যা ভাবভঙ্গিমা, বাংলার তা-ই হতে হবে টায়ে-টায়ে এমন উদ্ভট আব্দার অর্বাচীনও করতে লজ্জা পাবে। তেমনটা আব্দার করা হচ্ছেও না এখানে। কেবল বলবার কথাটা এ-ই যে, দেখাযন্ত্র তথা দর্শনেন্দ্রিয়কে হেলাফেলা করার এমন ঘটনা, দেখাজাত উপলব্ধি ফেলনা জ্ঞান করার এহেন নজির বঙ্গবাজার ব্যতীত অন্য কোথাও সুলভ কি না জানি না, থাকলে ন্যাক্কারজনক ও অবশ্যই রিডিকিউলাস্। যদিও অদেখাকৈবল্য যেমন অনুরূপভাবে দেখাকৈবল্যও সমান পরিহাস্যকর। দুনিয়ায় এসেছেন আপনি তিন-চারটে দিবারাতের মেয়াদে, উর্ধ্বে পাঁচদিন কি পঞ্চাশ-পঁয়ষট্টি বছরের কড়ারে, মরিলে তো অদেখারে দেখিবেন-জানিবেন। কাজেই অদেখা-অনঙ্গরূপারে একটু তফাতে রেখে যেট্টুক পারেন দেখেশুনে নেন এবং সেইসব দেখাশোনাজাত উপলব্ধি নিবিড়-নিবিষ্ট নয়ন ও মননে তুরন্ত্ হাজির করুন আপনার সন্নিহিত কোণের দুনিয়াধামে। এইটুকু কথাবার্তা পাক্কা। জিন্দিগি তো দোবারা না-মিলেগি, ইয়ারোঁ ম্যেরে! ডেনভার স্বর্গে গেলে সুলভ বলিয়া মথি লিখিত সুসমাচারে কিংবা ল্যুক বা আরও মহাপ্রিচারদের কোনো গস্পেলে লেখাজোখা নাই।

না-দেখা আর দেখা — দুই দিয়াই আপনি কিন্তু অভিন্ন একটা জায়গায় যেতে চাইছেন। জায়গাটা, গন্তব্যটা, আপনি নিজে বৈ ভিন-কেউ নয়। কিংবা আপনার মঞ্জিল-এ-মকসুদ হয়তো অদৃশ্য স্পর্শন ও অধরা ধারণ। দেখার ভেতর দিয়া যাওয়া, বা অদেখার-অদৃশ্যের-অব্যাখ্যেয় অন্তরাত্মার ভেতর দিয়া, মামলা যেয়ে একটা জায়গাতে ঠেকে। সেইটা পাঠকেরে-শ্রোতাদেরে-দর্শকেরে অনির্বচনীয়ের আস্বাদ পাইয়ে দেয়া। ইংরেজি মিউজিকে, ডেনভারের গানে, ব্যাপারটা দেখার ভেতর দিয়ে যেয়ে রূপলাভ করে। রূপ থেকে অরূপে যায় শ্রোতা, আপনমনে নিজের মাপে নিজের অরূপ খুঁজে নেয় কিংবা না-নেয়ার নৈরাজ্যিক রাজাও হয়ে থাকবার অবকাশ/পরিসর/স্পেস্ পায়। এদিকে আমাদিগের গানবাজনা আবার অরূপ থেকে ঠারেঠোরে প্রাণপণ রূপে ফেরার চেষ্টা। বাংলায় দেখাকে নানাভাবেই নিরুৎসাহিত করা হয়। যেমন, উদাহরণ, দেখবেন বলা হয়ে থাকে খুব বিতৃষ্ণার সঙ্গে যে গান বা কবিতা আজকাল আর শোনার বা পড়ার বা উপভোগের ব্যাপার না-হয়ে দেখার ও দেখানোর উপলক্ষ্য হয়ে গেছে। এহেন উচ্চারণে দেখতে পাই আমরা আমাদের দেখন-ডিমোটিভেশনের চিহ্ন। ঘটনাটা স্বাতন্ত্র্যদ্যোতক বটে এবং মন্দ নয়, কিন্তু কোনোকিছু মনোপোলি/একচ্ছত্র-হয়ে-যাওয়া ভালো কথা না আদৌ। সুপ্রভাবের পাশাপাশি বাংলা গানে এর কুপ্রভাবও পড়েছে। ডেনভারের রচনায়, অ্যামেরিক্যান কান্ট্রিমিউজিকে কি ইংলিশ ফোক মিউজিকে দেখার জয়জয়কার। আমাদের গানে-কবিতায়-কথাবার্তায়-ঈমানে-নিশানে-আচরণে কেবল অদেখার-অদৃশ্যের ব্যোমভোলানাথগিরি। এইটা ভারি স্যেল্যুকাস্। বিচিত্র বৈভবের অনুপ্রবেশ আমরা চাই না, মুফতে পেয়ে গেলেও তা আত্মরক্তগ্রন্থির অভ্যাসবশত অধিকৃত করে ফেলি না।

ঠাকুর একটি চিঠি লিখেছিলেন জীবনকে, একটি চির্কুট, দাশবাবুর পাঠানো বইপাঠোত্তর। বলেছিলেন, তোমার বই চিত্ররূপময়, এই রস এমন যে এতে তাকিয়ে দেখার আনন্দ আছে। অ্যানিওয়ে। কোটেশন্ মারি নাই, স্মৃতি মেরেছি, তাই কোটেশনমার্ক বসাই নাই। কিন্তু ঘটনাটা ওই ‘তাকিয়ে দেখার আনন্দ’ ব্যাপারটায়, চিত্ররূপময়তায়। শিল্পের কাজ, শিল্পের মোক্ষ, শিল্পের ক্যাথার্সিস এইখানেই। এই তাকিয়ে দেখতে পারা, তাকানোর দূরবীন যোগানো সমস্ত শিল্পের লক্ষ্য। পিঞ্জিরায় পাখিটি পূর্ণাঙ্গ অঙ্কনে ডেনভার মনোযোগী, পিঞ্জিরার চতুর্ধারের পরিবেশ-পরিচিতিও যথাবাস্তব আঁকেন তিনি, নিজে থেকে শ্রোতা/ভোক্তাবর্গের সামনে কোনো স্বর্গনরক আঁকেন না। একটা রাস্তা, একটা জায়গা, একটা যাত্রাকাহিনি, একটা পাহাড়, একটা সমুদ্দুর যেমনভাবে ডেনভার ভোগ করেন অলমোস্ট অবিকলভাবেই কম্পোজিশনে পেশ করেন। এতে করে ইম্যাজিনেশন বিন্দুমাত্র খর্ব/ব্যাহত হয় না তার, উপরন্তু কম্পোজিশন হয় রেখাবৈচিত্র্যবহ, রঙধনাঢ্য। বৈশিষ্ট্য বলি কিংবা ক্যারেক্টারিস্টিক্স — ডেনভারগানের — এইখানেই। ইংরেজি গানেরই ইন-ফ্যাক্ট। তারা দেখাটাকে নেগ্লেক্ট করে না। অদেখাকে এত উচ্চ মহিমান্বিত করে কি কখনো, আমাদের মতো? নৈব চ। মূর্তি বলুন, অথবা বিমূর্তি, অন্তিমে ভোক্তাকে একটা তাকিয়ে দেখার আনন্দের দিকে নিয়ে যেতে না-পারে যদি তাহলে তার ষোলোআনা আন্দুধুন্দা ফাউল। আমাদের এদিককার বেশিরভাগ বুজরুকি বিমূর্তিকরণ-কুহকায়নের সারাংশ কতিপয় শিশুবোল আওড়ানো — ওয়াহ্ ওয়াহ্, ক্যায়া বাত, লা-জওয়াব! তারপর? — কবিতা পিয়্যুর জিনিশ, মিউজিক তো পিয়্যুরের প্রপিতামহ-প্রমাতামহীতুল্য, ওইসব বোঝানোর বা ব্যক্তকরণের মামলা না বাবুমশয়! তাই বিষয়াশয় বেড়েই চলে বদখত অদৃশ্যের, রহস্যের, বিমূর্তির। মূর্তি নিন্দনীয়, বিমূর্তি নন্দনীয়, আমাদিগের গানে ও কবিতায়। ডেনভারের গানে তাকিয়ে দেখার আনন্দটা পাওয়া যায় যথেষ্ট পরিমাণে। ডেনভার যেমনভাবে দেখেন তেমনভাবেই আঁকেন, ফলে শ্রোতা তার নিজের মতো করে নিজের অবস্থানবাস্তবতা থেকে নিজের ছবিটা বানিয়ে নেবার মওকা পায়। নিজের শৈশব, নিজের কৈশোর, নিজের দুর্বিষহ যৌবরাজ্য অঙ্কনে ডেনভারের ক্যানভাস ও প্যালেট সহায়তা বাড়িয়ে দেয় এশিয়ার শ্রোতাকে, অ্যাফ্রিকার শ্রোতাকে, জ্যাপানের শ্রোতাকে, ব্র্যাজিলের এমনকি বাংলাদেশের শ্রোতাসাধারণকে।

ডেনভার ডুগডুগি আঁকেন, সবুজবরন লাউডগা, লাউডুগির দুধশাদা ফুল, ভুল-করা কন্যা আঁকেন, কন্যার লাগি’ আনচান-করা মনও আঁকতে ভোলেন না, ঠিক যেমনটা হুমায়ূন আহমেদ। লাউয়ের পিছে যে-বৈরাগী, নিবিড় মমতায় ডেনভার সেই বৈরাগীকেও আঁকেন। কিন্তু তার আঁকাআঁকি কখনো অদেখাশাসিত নয়, দেখতে দেখতেই যাওয়া তার, দেখার ভেতর দিয়াই তার সৃজন-ভজন, বিস্ময়বিপন্ন দর্শনদারির ভেতর দিয়াই গড়ে-ওঠা ডেনভারজগৎ।

ডেনভার আর তার উত্তরাধিকার

বায়োলোজিক্যাল্ নয়, মিউজিক্যাল্ প্রেডেসেসরদের কথা পাড়া হচ্ছে এইখানে। হ্যাঁ, সাংগীতিক উত্তরাধিকার; জৈবযৌক্তিক উত্তরাধিকার হেথা সার্চ করা হচ্ছে না। কারা কন্টিন্যু করছেন, কারা ভালো করেছেন বা করছেন বা আদৌ করছেন কি না কান্ট্রিমিউজিক এখন একবিংশ শতকের এই দ্বিতীয় দশকে এসে, এইসব খোঁজপাত্তা খানিকটা করা যায় কি না দেখা যাক। তবে রেফ্রেন্স ঘেঁটে বের করার শ্রম ও অন্যান্য লগ্নি-বিনিয়োগ না-করেই কিঞ্চিৎ পলকাভাবে চেষ্টা, তা আগেভাগেই বলিয়া রাখা ভালো। পলকা, কারণ গভীর-গভীরতর অভিনিবেশের জন্য গবেষক-সন্দর্ভরচক রয়েছেন, তারা নিশ্চয় মহাকালের সার্ভারে ছড়িয়ে রেখেছেন এতদ্বিষয়ে তাদের মূল্য-সংযোজক সন্ধান। বরং আমরা লাইটডিগ্রি টোনে এফোর্ট চালাই। তাতে ধারে কাটবে না, আবার ভারেও ভারিক্কি হবে না, কাজেই ইনভেস্টিগ্যাশন হবে নিরীহ ও নখদন্তহীন। উইকিযুগে এসে রেস্টোরেশন/রিক্যাপ/রিভিয়্যু অফ হিস্টোরি জরুর না-হলে লেখাব্যাপ্তি বিপুলবপুকরণ তথা রচনা ফ্যাটেনিং প্রকল্পেরই খোরাক হয় হিস্টোরিক্যাল ইনফোগুলো।

প্রথমত মনে হয় যে এখন ওইভাবে ডেনভারেস্ক কান্ট্রিমিউজিক ধারাটা ইংরেজি গানে নেই। এখন কোনো ধারাই ঠিক একচ্ছত্রভাবে প্রবাহিত হয় না গানে বা সাহিত্যে বা সিনেমায়-শিল্পকলায়। এখন হয় ফিউশন, ব্লেন্ডিং, এমনকি জাক্সটাপোজিশন করাটাও এখন একটা চর্চিত টেক্নিক। শুধু রক, শুধু ফোক, শুধু সাইক্যাডেলিক এখন খুঁজিয়া পাওয়া ভার। সমজদারিতা পাল্টায়, এবং ভাইস-ভার্সা, পাল্টায় গানের আঙ্গিক-ধাঁচ ও পরিবেশনভঙ্গি। আরেকটা কথাও উল্লেখ থাকা দরকার যে, ফোক মিউজিক আর কান্ট্রিমিউজিক দুইয়ের ভেতরকার চিকন-মোটা ফারাক নিয়া বাহাস আমরা না-করলেও চলবে। যেমন আমরা বাংলায় দেশাত্মবোধক ও পল্লিগীতি নিয়া বাহাস করে স্ট্যামিনা হারাব হুদাই।

কিন্তু কত-না বাহারী নামেই ডাকা হয়েছে আদিকালে, এখনও হয়, কান্ট্রিমিউজিক ব্যাপারটাকে! একসঙ্গে এন্তার স্টাইল, জেনর, সাবজেনর বোঝানো হয়ে থাকে কান্ট্রিমিউজিক আম্ব্রেলা-টার্মটার ছায়ায়। কাওবয় মিউজিক, ওয়েস্টার্ন স্যুইং, হিলিবিলি বুগি, এমনকি আউট ল’ কান্ট্রিস্যং প্রভৃতি বিচিত্র নামের আন্ডারে একই জিনিশ লক্ষ করা যাবে। নামকরণ তো যারা গাইত তারা দিত না, যারা শুনত তারাই দিত। যারা গাইত তারা পাহাড়িয়া অঞ্চল থেকে নেমে আসত, বুনো মানুষ বলিয়াই ট্রিটেড হতো তারা শাহরিক সভ্যদের কাছে, এবং পানশালায় তাদের পরিবেশনা শুনে/দেখে আমোদিত হতো শহরসভ্যরা আর নানান নামে লেবেল সাঁটাত গানগুলোর গায়ে। একসময় সিনেমায় যখন এই মিউজিক ব্যবহার শুরু হয়, তখন ওয়েস্টার্ন মিউজিক নামে এইটে পপ্যুলার হয়ে ওঠে। ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যায়ে এসে এই গান আলাদাভাবে স্টুডিয়োতে রেকর্ড করা হতে থাকে। একসময় এই মিউজিক টপচার্টগুলো দখল করতে থাকে একের-পর-এক। পত্তনি হয়েছিল টুয়েন্টিজের দিকে, সিক্সটিজে এসে প্রতিষ্ঠা। সংক্ষেপে এ-ই হিস্টোরি। 

নাইন্টিজে এসে কান্ট্রিমিউজিকের সেই আদি-অকৃত্রিম টিউন ও রেন্ডিশন বদলাতে থাকে দ্রুত। ডেনভার দেহান্তরের পর এখন কান্ট্রিমিউজিক ব্যবহৃত হতে দেখি নানানভাবে, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ কান্ট্রিস্যং নজরে ঠেকে না বা মরমেও পশে না আর। নাইন্টিজের কান্ট্রিমিউজিক প্রভাবিত হতে থাকে লাইন-ড্যান্সিং নামে একপ্রকার নৃত্যকৌশল দ্বারা। তারপর তো এমটিভি ইত্যাদি স্যাটেলাইটওয়ার্ল্ডে এই মিউজিকের সুরবস্থা-দুরবস্থা দুই-ই দেখেছি আমরা। তারপরও পুরনোদের মধ্যে এফোর্ট সচল ছিল কিছুদিন। বয়স তো একটা ব্যাপার, তাছাড়া ইন্ডাস্ট্রির চাহিদা ইত্যাদি আছে। অ্যানিওয়ে। একটা সময় পর্যন্ত দুনিয়ায় ছিন্নমূল মানুষ ছিল প্রচুর, ছিল তাদের শেকড়স্মৃতি, এখন তো মনে হয় যে শেকড়বোধটাই নাই। নিরঙ্কুশ-নিরালা কান্ট্রিমিউজিক কাজেই থাকাটা খানিক অবাস্তবও। মানে কন্টিন্যুয়েশন না-থাকার ব্যাপারটা এইভাবে দেখা যায় একবার খতিয়ে। সেজন্যে সময় ও সঙ্গতি দরকার হবে। কিন্তু কান্ট্রিবোধ না-থাকলে কান্ট্রিমিউজিক থাকবে কি না ব্যাপারটা ভাববার অবকাশ দাবি করে বটে।

আজকেই দিন পয়লা আমার বাকি জিন্দিগির

অনেক অনেক দিন আগে, সেই কবেকার কোন ধূসর শতকে, সেই বিগত সহস্রাব্দে একটি বিষাদোজ্জ্বল কবিতা পড়েছিলাম এক বাঙালি কবির। ওই ডিপার্টমেন্ট যদিও আমার না, মানে তেমন সুবিধা করে উঠতে পেরেছি কম কবিতা পড়েই, তারপরও গুটিকয় কবিতার সান্নিধ্যে এসেছিলাম এককালে। একটার কথা প্রাসঙ্গিকভাবেই ইয়াদ হচ্ছে এখানে এখন। নব্বইয়ের শুরুতে এই কবির কিছু কবিতা পড়েছিলাম। ছোটকাগজে বেইসিক্যালি। চিনি না, কবিকে চেনাচেনির চেয়ে কবিতাপাঠ উত্তম, মাহবুব কবির নাম তার। পয়লা বইয়ের নাম ‘কৈ ও মেঘের কবিতা’, দোসরা বই ‘ফুলচাষি মালি যা-ই বলো’ এবং এরপরেও আরেকটা-কী বই বেরিয়েছে দেখেছি কিন্তু পড়া হয় নাই। কিন্তু যে-কবিতাটা প্রাসঙ্গিক এখানে, সেইটা মাহবুব কবিরের অভিষেক বইয়ের একদম বিসমিল্লার কবিতা। নাম ‘পৃথিবী’। আগে কবিতা, বাদে বাতচিত — এই পলিসি যাদের, তারা ছাড়া বাকিদের ছুটি। কাজেই পড়ে দেখি :

বাহ্ পৃথিবীটা দেখছি একেবারে নবীনা
এর নদীতে ডুব দেওয়া ভালো।
এরকম সচ্ছল নদীর ছলচ্ছলে
মনপবনের নাও ভাসিয়ে দেওয়া মন্দ নয়।
বাইসন ম্যামথের পেছনে ছুটতে ছুটতে
একদিন এরকম একটি পৃথিবীর সঙ্গে
দেখা হয়েছিল,
তার কথা মনে পড়ে।

 আমি প্রতিদিন নতুন নতুন পৃথিবীর
সাক্ষাৎ পেতে ভালোবাসি।
আমি জানি অতীত মানে পুরনো নয়;
সে প্রতিদিন অষ্টাদশী রমণী, প্রতিদিন
বিবাহবার্ষিকী, প্রতিদিন দাঁত ব্রাশ করা।

পৃথিবী রজঃস্বলা চিরকাল,
আমি এর সঙ্গে খেলা করব এখন।

যদিও কবিতাটা প্রাতঃস্মরণীয়, এ-বয়সে কেই-বা আর প্রাতঃকালে শয্যা ত্যাজি পৃথিবীর সনে খেলিবারে চায়, শীতকালে হোক অথবা গ্রীষ্মকালে এই কবিতা আপনাকে ভোরের বিস্ময়াবেশ উপহার দেবে, যেমন ভোরস্বচ্ছ অনুভূতি শিরা-ধমনীর ভিতরে ইঞ্জেক্ট করে দেয় ডেনভারের গান। অবশ্য জন ডেনভারের গলায়, গায়কীতে, সুরে ও কথারূপে এই মর্নিংগ্লোরি বিস্তর এবং এইটাই তার গানের লিড ফিচার বলা যায়। যে-কোনো শোকসঞ্চারক কথাবস্তুর গানে ডেনভার এই শিশুবিস্ময়ের ভোর তথা প্রত্যুষের অনুভূতি চারিয়ে রেখেছেন। একপ্রকার হিলিং এফেক্ট, শুশ্রুষাবাতাস। স্মর্তব্য ডেনভারের যে-কোনো গান। সুরের ভেতরকার রৌদ্রালোক ও মৌচাক সর্বত্র ডেনভার এই ম্যাজিক রেখে যেতে পেরেছেন।

উপর্যুক্ত কবিতার পাশাপাশি রেখে একটা গান শোনা যাক। ‘টুডে ইজ্ দি ফার্স্ট ডে অফ দি রেস্ট অফ মাই লাইফ’ সেই গানের শিরোনাম ও পয়লা পঙক্তি। শোনার সঙ্গে সঙ্গেই মনে হবে, একেবারে ভেতর থেকেই নির্গত হবে এই বিচ্ছুরণ ও সকালবেলার স্ফূর্ত বিস্ময় : বাহ্! পৃথিবীটা দেখছি একেবারে নবীনা! এবং পরক্ষণেই মনে হবে, এইবার এর জলে ঝাঁপ দেয়া যাক, একটু ডুব দিয়া আসা যাক এর পুকুরে-নদীতে-সমুদ্দুরে দিনভর দাপিয়ে-ঝাঁপিয়ে! ম্যামথের আর বাইসনের সনে ছুটতে ছুটতে যে-পৃথিবীর স্তনে বেড়ে উঠেছিলাম, প্রথম মায়ের চুম্বন হয়ে সেই পৃথিবীটা আমাদের মনে পড়ে যাবে, এবং দুর্বহ-দুঃসহ দিন খানিক সহনীয়-বহনীয় হয়ে আসবে ক্রমে। গানের শুরুর স্তবক : Today is the first day of the rest of my life, I wake as a child to see the world begin / On monarch wings and birthday wonderings, want to put on faces, walk in the wet and cold / And look forward to my growing old, to grow is to change, to change is to be new / to be new is to be young again, I barely remember when. এরপরের স্তবকে এই লাইনগুলো : My memories are stolen by the morning, blotted out by the suns hypnotic eye / I’ll abide the sun’s hypnotic eye. এবং শেষে যেয়ে রিফ্রেইন হিশেবে ফের : Today is the first day of the rest of my life, I wake as a child to see the world begin / On monarch wings and birthday wonderings, want to put on faces, walk in the wet and cold / And look forward to my growing old. এ-ই হলো ডেনভারের গান। ভোরবেলাকার ইনোসেন্স থ্রুআউট অল ডে লং। এবং তেজ। সকালবেলার রৌদ্রকরের তেজ। সকালবেলার মধুকুম্ভের তেজ ও সুধাবস্তু। সকালবেলার, শীতরৌদ্রের, কমলালেবুর চনমনে তেজ। ছড়িয়ে আছে ডেনভারের গানে।

ডেনভার অন পোলিটিক্স

মনে রাখতে হবে যে সেই সময়টা ষাটের দশক, দুনিয়া জুড়েই দৃশ্যপটবদলের তুঙ্গ মুহূর্ত মঞ্চায়িত হয়ে চলেছে এখানে-ওখানে সর্বত্র, প্রথম-দ্বিতীয়-তৃতীয় ও গোটা ভাণ্ডব্রহ্মাণ্ড জুড়ে রাজনীতি রিভিয়্যু-রিশেইপ হচ্ছে। এর অভিঘাত এসে লাগছে লিট্রেচারে, সিনেমায়, গানে। ডেনভার প্রস্তুতি নিচ্ছেন সেই শীর্ষ সময়মঞ্চে। সেই বিখ্যাত ফোক-রক ফেস্টে পার্টিসিপেইট করছেন, প্রোটেস্ট প্রোসেশনে পা মিলিয়ে হাঁটছেন, কমিটেড সমস্ত নতুন-পুরনো গ্রেইট মিউজিশিয়ান যথা ফ্রাঙ্ক সিনাত্রা বা জোয়ান বায়েজ বা পিট সিগ্যারের সঙ্গে দেখালাপ হচ্ছে। এমন একটা কালে ডেনভার মহলা দিচ্ছেন নিজের গানবাজনার, অথচ তার গানে সেভাবে পোলিটিক্যাল স্ট্যান্ড বা রাজনৈতিক দর্শনটা নাই — ক্রিটিকদের এ ছিল বরাবরের আক্ষেপ। ঘটনা কতকটা তা-ই, ক্রিটিকদের কথা কানে হেফাজতে রাখবেন, না বের করে দেবেন ঝেঁটিয়ে কানের বাইরে — সেইটা শ্রোতাসাধারণ যার যার বিবেচনা, কিন্তু ঘটনা আবার ঠিক তা-ও নয়।

সেই বিখ্যাত ফোকফেস্টের পর, যেখানে জিমার্ম্যান তথা বব ডিলান সহ পরবর্তীকালে-দুনিয়া-দাবড়ানো অনেকেই পার্ফোর্ম করেছিলেন, ফোকসিঙ্গার/ফোক-রকসিঙ্গার সকলেই-প্রায় পোলিটিক্যাল ম্যানিফেস্টেশন ঘটাচ্ছেন তাদের গানে ও জীবনযাপনে। ডেনভারকে এখানেই ক্রিটিসাইজ করা হচ্ছে যে তিনি তখন সেভাবে পোলিটিক্যাল স্ট্যান্ড নেন নাই। ঘটনা কি সত্যিই তা-ই? রিপ্লাই দিতে যেয়ে ডেনভার বলছেন যে, না, ঘটনা আদৌ সত্যি না। প্লেবয়  পত্রিকার সঙ্গে একটি ইন্টার্ভিউতে ডেনভার এ-প্রসঙ্গে যে-কথাগুলো বলেছিলেন, মোটামুটি তা এ-ই : “ইয়াদ হবে কি না আপনাদের, আমি জানি না, কিন্তু স্মৃতিটুকু স্পষ্ট আমার কাছে যে সেই ১৯৬৮ সালে ক্যাপিটোল নামের শহরে একটি বিক্ষোভোদ্যোগে শামিল হয়ে আমি প্রায় হাফ-অ্যা-মিলিয়ন মানুষের সামনে গেয়েছি ‘লাস্ট নাইট আই হ্যাড দি স্ট্রেইঞ্জেস্ট ড্রিম’ গানটা। ব্যাপারটা আমার গোটা ক্যারিয়ারে অত্যন্ত স্মরণীয় এবং আমি তা আজও ভুলিনি। ভীষণ উত্তেজনানন্দের ছিল আমার কাছে যে আমি সেখানে একমঞ্চে গেয়েছি ‘পিটার, প্যল অ্যান্ড ম্যারি’, ফিল অক্স এবং পিট সিগ্যার প্রমুখ গাইয়েদের সঙ্গে। যদ্দুর মনে পড়ে তিন-তিনটে প্রতিবাদযাত্রা আয়োজিত হয়েছিল ওয়াশিংটনে এবং আমি সেই সব-কয়টিতেই ছিলাম। আর আমার রাজনীতিচৈতন্যের বাড়বৃদ্ধিটা তো ওই ‘মিশেল ট্রায়ো’ গ্রুপের সঙ্গে গানবাজনা করার সময় থেকেই শুরু হয়েছিল। ওরাই কিন্তু আমাকে একটা আগলমুক্ত চৈতন্যের দোরগোড়ায় যেয়ে পৌঁছাতে প্রেরণা জুগিয়েছিল। খোদার দোহাই, বিগিনিং সময়টায়, এমন তো হরহামেশা হতো যে লোকে আমার কাছে ব্যাখ্যা চাইছে কেন অমুক লাইনটা ফানি কিংবা গানের অমুক অংশটায় যেয়ে কেন অডিয়েন্স উত্ফুল্ল-হাস্যোজ্জ্বল হয়ে ওঠে ইত্যাদি! এখন, রাজনীতিচৈতন্য বলতে যদি বোঝায় এমনধারা আজিব কিসিমের কিছু, আমাকে কবুল করতেই হবে যে তেমনটা আমাকে দিয়ে হবার নয়। আমার রাজনীতিচেতনা বলতে আমি বুঝি যে ঢের বুদ্ধিমান হয়েছি আমি আগের চেয়ে বা এভাবেও বলা যাক যে বেশ ডিসিপ্লিনড হয়েছি নির্বাচনে ক্যান্ডিডেট সমর্থনের ক্ষেত্রে অথবা কোনোকিছু সম্পর্কে স্ট্যান্ড নিতে যেয়ে বা স্পেসিফিক কোনো ইশ্যু ডিফেন্ড করতে যেয়ে হয়েছি ট্যাক্টিক্যাল।” প্রসঙ্গচক্রে উল্লেখ্য যে এক-পর্যায়ে দেখব — মধ্য-সত্তরের দিকে — অ্যামেরিকার ন্যাশন্যাল ইলেকশনে ডেনভার ডেমোক্র্যাট জিমি কার্টারের পক্ষে ক্যাম্পেইনে অংশ নিচ্ছেন।

ডেনভার সারাজীবন যত গান বেঁধেছেন, হয় প্রেমের কিংবা পাহাড়চারণের বা প্রাকৃতনৈসর্গিক দৃশ্যরূপস্তুতির, সর্বত্রই তো চৈতন্যে রাজনীতি পোরা রয়েছে। একটি শিশুর জন্য বাসযোগ্য ভূমি চাইবার গানপঙক্তিগুলো, সুকান্তকবিতার মতো, পোলিটিক্যালি স্ট্রং নয় কি? কিংবা যুদ্ধবিরোধী গানগুলো? ববি তথা বব ডিলানের মতো অত কবিতাঢ্য স্ট্রোক না-হলেও ডেনভারের গান তার নিজের কায়দায় ভিন্নতর। আর, এমনও তো নয় যে, গানে কিংবা সাহিত্যবর্গীয় রচনাদিতে পোলিটিক্যাল ওভারটোন থাকলেই দৃষ্টিগ্রাহ্য হবে, না-থাকলে হবে না; না, নিশ্চয়ই তা না। আন্ডারটোন ধরবার কান থাকলে শ্রোতাপাঠকের মরমে তা পশিবেই। ডেনভারের গানে যেটুকু পোলিটিক্যাল স্ট্যাটমেন্ট/স্ট্যান্ড হাজির, সেটুকু শাশ্বত, সেটুকু পরিবর্তিত-সমস্ত-পরিস্থিতিতেই দৃষ্টিগ্রাহ্য।

ঘটনাটা এ-ই যে, ডেনভারজবানি থেকে ব্যাপারটা ক্লিয়ার, পোলিটিক্যাল কনশ্যাসনেস্ বলতেই যদি বোঝানো হয় গানে কোমলতা আনয়ন নিষেধ অথবা হাসতে মানা বা রামগড়ুরের ছানা মার্কা রাজনৈতিক সিরিয়াসনেস্, ডেনভার ওই দলে নেই। অ্যালফ্যাবেটের এফ-বর্গীয় আদ্যবর্ণের ওয়ার্ড উচ্চারণের ভেতরেই হিরোয়িক জোশ-ও-জজবা প্রকাশক পোলিটিক্যাল বিয়িং ডেনভার নন। ওই জিনিশ, কথায় কথায় ‘ফাকিয়্যু’ উচ্চারণের ব্যাটাগিরিমার্কা রাজনৈতিক জাহিরিপনা আজকালকার বাংলা সাহিত্যেরও পরানভোমর, বঙ্গজ ভেতো কবিরা তো ফাকিয়্যু উচ্চারেই বিপ্লব জারি-ও-দীর্ঘজীবী করিয়া যাইছেন মুহূর্মুহূ বঙ্গাল কবিতার। ওইরকম বাংলা স্লাভো জিজেক কায়দার পোলিটিক্যাল কনশ্যাসনেস্ বা অ্যাক্টিভিজম ডেনভারে নেই বটে। একটা পাহাড়ের পক্ষে গাওয়া, একটা ঈগলের পক্ষে গিটার কর্ডিং, একটা পাথুরে গ্রামজনপদের অধিবাসী খনিশ্রমিকদের সেন্স-অফ-হিউম্যর গানে ফোটানোর মধ্য দিয়েই ডেনভারের রাজনৈতিক অবস্থানপত্র প্রকাশিত। মোটমাট কথাটা এ-ই যে ডেনভারের পোলিটিক্যাল পজিশনপেপার আবহমানের পক্ষ নিয়ে কথা বলতে চেয়েছে আগাগোড়া। তাছাড়া সাম্প্রতিকতা নিয়ে ডেনভারের অ্যাক্টিভিটিও অনুল্লেখ্য নয়। নিউক্লিয়ার এনার্জি তথা পারমাণবিক প্রতাপ রোখার ম্যুভমেন্টে ডেনভার শরিক থেকেছেন শুরু থেকেই, অ্যান্টি-টেরোরিস্ট ম্যুভ অর্গ্যানাইজ করার সঙ্গে শামিল হয়েছেন, ফান্ড রেইজ করেছেন পারমাণবিক বোমাবৃত্তির বিরুদ্ধে ক্যাম্পেইন পরিচালনার পক্ষে, নিউক্লিয়ার সেইফগার্ড প্রোপোজিশনের সমর্থনে টেলিভিশন ও রেডিয়োর জন্য কম্যার্শিয়্যাল বানিয়েছেন, অ্যামেরিকার ছয়টি স্টেটে একটানা কন্স্যার্ট করেছেন তহবিল উন্নয়নে এবং সর্বোপরি লিখেছেন গান। পরিবেশ সুরক্ষা ও ক্ষুধামুক্ত দুনিয়া গড়ার আন্দোলনে ডেনভারের অবদানও স্মরণার্হ। সবকিছুই কি নয় এক-ও-অভিন্ন লক্ষ্যে ডেনভারের পোলিটিক্যাল প্রোফাইল?

পোলিটিক্যাল ওভারটোন ডেনভারগানে একদমই পাওয়া যাবে না। কংগ্রেসম্যান বা রিপাব্লিক-ডেমোক্র্যাটদের পানে ছোঁড়া গালাগালি কি ক্রোধোক্তি, যা কিনা ওই সময়ের গানে ছিল প্রচুর পরিমাণে, ডেনভারে নেই। আই রিফিয়্যুজ্ টু পোলিটিসাইজ্ মাই কন্স্যার্টস্ — বলেছেন কথাপ্রসঙ্গে একটা আলাপাড্ডায়। নিউক্লিয়ার এনার্জি নিয়ে সোচ্চার হবার দরকার বোধ করলে, উদাহরণ দিয়েই তিনি জানিয়েছেন প্লেবয়  ম্যাগাজিনের সঙ্গে সেই আলাপে, এই বিপজ্জনক তৎপরতার বিরুদ্ধে তিনি তার উচ্চারণের আখর রেখেছেন স্বীয় হস্তে সৃজিত সংগীতে তথা তার গানে। সেজন্যে ডেনভার নিজের কন্স্যার্টগুলোকে তখনকার ট্রেন্ড অনুসারে রাজনীতিকীর্ণ করে তোলেন নাই কখনো। বলেছেন : “সর্বদা আমি খেয়াল রাখার চেষ্টা করি লোকে আমার কাছ থেকে কি পেতে চাইছে। আমার মনে হয় না কখনোই যে তারা আমার কাছ থেকে নিউক্লিয়ার শক্তি সম্পর্কে বাগ্মিতাচাতুর্যপূর্ণ ক্রোধী কথামালা শুনতে আগ্রহী। কিংবা খাদ্যাভাব-ক্ষুধা বা প্রাণবৈচিত্র্যসংহরণকারী মরুকরণপ্রক্রিয়ার ওয়ার্ল্ডওয়াইড অপতত্পরতা বিষয়ে বক্তৃতা শুনতেও তো-আর লোকে আমার কন্স্যার্টে আসে না। তারা চায় যেন আমার গানগুলোই আমি আরও ভালোভাবে গাই।” এবং, বলা বাহুল্য, কন্স্যার্ট থেকে ফিরে যেয়ে এই মানুষগুলোই যার-যার ভূমিকায় অবতীর্ণ হবার নতুন জোশ ও দিশা পাবে ডেনভারের কোয়ালিটি রেন্ডিশন দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে। অডিয়েন্সের ভেতরে ডেনভারের গানের বিক্রিয়া মাপা যাবে এইখানেই, রিয়েল-লাইফ স্ট্রাগলটাকে তারা কতটা শান্ত ও স্থির ধীঋদ্ধ প্রজ্ঞার ভেতর দিয়া আগায়ে নিতে পারছে — এই নিরিখে। ডেনভার যদি ডিরেক্টলি রাজনীতিলিপ্ত হয়ে পড়েন, তখন কি ঘটবে তা-ও অনুমেয়। পোলিটিশ্যানের চেয়ে বেহতর ও ভালো পোলিটিক্যাল ট্যাক্টিক্স তো ডেনভারের করায়ত্ত নয়, যেমন একজন রাজনীতিকও অপারগ ডেনভারের মতো সংগীতোৎপাদনে তথা গান গাইতে। যে যেইটা ভালো পারে, সে সেইটা আরও ঔৎকর্ষ সহকারে করে যাবে — এইভাবেই বৃহত্তর ম্যানকাইন্ড সার্ভ করা যায়, ডেনভার বিশ্বাস করতেন। অন্যথা হলে পরে যা হয়, কিংবা হবার আশঙ্কা থাকে, সেই দৃষ্টান্ত ডেনভার দেখাতে চেয়েছেন এভাবে : “একটা দীর্ঘ সময় ধরে শার্লি ম্যাক্লেইন্ পোলিটিক্সে ইনভলভড্ হয়েই ছিলেন, আমরা দেখেছি। তিনি চায়নায় যেয়ে একটা ফিল্ম বানায়েছিলেন, এবং রাজনীতি বিষয়ে ছিলেন অত্যন্ত সোচ্চার। একটা সময়ে ব্যাক করেন তিনি ফের পার্ফোর্মিঙে, দেরি হয়ে গেছিল যদিও অনেকটা, লাস্-ভেগাসে শো করেন। যদিও তদ্দিনে তার ফোকাস্ ব্যাহত হয়ে গেছে। এমন ঘটনাই ঘটেছে লক্ষ করা যাবে জেইন্ ফন্ডা বা জোয়্যন্ বায়েজ্ প্রমুখ শিল্পীদের ক্ষেত্রে। এমনটা হামেশাই দেখা যায় যে শিল্পী হিশেবে সফলকাম যারাই পোলিটিক্সে জড়িয়েছেন, তাদের ফোকাস্ নষ্ট হয়ে গেছে, অডিয়েন্স হারিয়েছেন তারা ব্যাপক মাত্রায় কিংবা আংশিক হলেও কোয়ালিটি একাংশ, এবং এইসব করে সবচেয়ে বড় ও অপূরণীয় ক্ষতি যেইটা হয়েছে তা হচ্ছে এ-ই যে তারা তাদের পোটেনশিয়্যাল্ এফেক্টিভনেস্ হারায়েছেন।”

পুরো কথালাপের কোথাও বব ডিলানের উল্লেখ অন্তত পোলিটিক্স প্রসঙ্গে ডেনভার করেন নাই, অনুমান হয় যে ডেনভার হয়তো মৌন স্বীকৃতিই দিচ্ছেন ডিলানের আনপ্রেডিক্টেবিলিটিকে। সিঙ্গার এবং স্যংরাইটার হিশেবে ডিলান অবিস্মরণীয়ভাবে ব্যতিক্রম, যার লিরিক্স ও স্টেজ-পার্ফোর্ম্যান্স পোলিটিক্যালি লিপ্ত-তত্পর হওয়া সত্ত্বেও ববির পোটেনশিয়্যাল এফেক্টিভনেস্ হারায়নি বিন্দুপরিমাণ, বরং হয়ে উঠেছে উত্তরোত্তর পোয়েটিক এবং অডিয়েন্স হয়েছে পুনঃপুনরান্দোলিত। ডিলানের ক্ষেত্রে ঘটেছে অন্য ব্যাপার, যা উপর্যুক্ত প্লেবয়  পত্রিকার সঙ্গে ডেনভারের আলাপনে একবারও আলোচিত হয়নি, এই নিবন্ধপ্রতিম আধাখেঁচড়া বাংলা রচনাতেও ওই ব্যাপারটা আপাতত অনালোচিত থাক। তবে ডিলান প্রসঙ্গে এহেন সন্দেহ অনেকেই প্রকাশ করেছেন যে এই শিল্পীর স্বভাবে একপ্রকার পলায়নী মনোবৃত্তি গোড়া থেকেই দুর্লক্ষ ছিল না। ক্যারিয়ারের তুঙ্গ মুহূর্তে গান থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়া, গানানুষঙ্গিক সমস্ত তৎপরতা তো বটেই এমনকি জীবনযাপনে জনসমক্ষের বাইরে নিয়া যাওয়া নিজেকে, এই সবকিছুই ডিলানকে একটা-ডিগ্রি-পর্যন্ত প্রশ্নাপেক্ষী করে রেখেছে। এইটা তারপরেও অনস্বীকার্য যে, পোলিটিক্যাল কারেক্টনেসের দিক থেকে ডিলানের কাজ আনপ্যারাল্যাল। তুলনীয় হতে পারেন আরেকজন কেবল, তিনি লেনার্ড কোহেন; বব মার্লির নামটাও ভুলিয়া যাবার নয়; এবং, অধিকন্তু ন-দোষায় একজন, কবীর সুমন। যদিও শেষোক্তজন পশ্চিমী মিউজিকের গীতগ্রথনকলার প্রেরণায় বাংলায় গাইতে শুরু করবেন আড়াই/তিনদশক বাদে।

ওই ইন্টার্ভিয়্যুতে এক-জায়গায় যেয়ে ঠেস দিয়ে ডেনভারকে এমন একটা খোঁচা মারা হচ্ছে যে, ডেনভারোক্ত ফন্ডা-বায়েজ-ম্যাক্লেইন প্রমুখ শিল্পীরা গানটা যা-হোক গেয়েছেন এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও তো অবদান অল্পবিস্তর যত-অনুল্লেখ্যই-হোক রেখেছেন; কিন্তু, লোকে শিল্পীর কাছ থেকে গানটাই শুনতে চায় রে ভাই রাজনীতি নৈব চ … অথবা আর-কিছু-চাইনে-আমি-গান-ছাড়া টাইপের গা-বাঁচানো কথাবার্তা আদৌ মুর্গিবিষ্ঠা ছাড়া আর-কীই-বা যায় বলা — এমন খোঁচাপ্রশ্নের উত্তরে ডেনভার বলছেন : “… মনে হয় না যে এর সন্তোষজনক সদুত্তর দেয়া কারো পক্ষে সম্ভব। তবে আমি মনে করি, নিজের অবস্থান সুস্থায়ী করার মধ্য দিয়েই আমি নিজেকে নিত্য কার্যকর রাখতে পারি; আমার কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ভেতর দিয়ে, আমার গান-গাওয়া আমার কন্স্যার্ট আমার টেলিভিশনশো আমার অ্যালবাম ইত্যাদি দিয়াই আমি নিজের ভূমিকা পালন করে যেতে পারি তুলনামূলক ভালোভাবে, এবং এসব করার ভেতর দিয়েই পৃথিবীর ক্ষমতাকাঠামোর কানে আমার কথাগুলো আমার প্রত্যয়-ও-প্রত্যাখ্যানগুলো পৌঁছাতে পারি ইফেক্টিভলি এবং শুনতে বাধ্যও করতে পারি ভালোলোক ও বদলোক বদমায়েশগুলোকে। দেশের যে-কোনো ক্ষমতাধর ব্যক্তিকে আমি আমার অনুষ্ঠানে ডেকে আনতে পারি বা এমনকি আমার বাসগৃহে; এবং এই অ্যাক্সেসটা আমি গান দিয়েই নিতে পারি ভালোভাবে … ডেকে এনে এদের কাছে এক-দুইটা আইডিয়াও গছাতে পারি বিবদমান-এবং/ও-বিদ্যমান অচলায়তন সচলকরণে এবং এর মধ্যে একটা আইডিয়া গ্রহণেও উদ্বুদ্ধ করতে পারি হয়তো। ঘটনাগুলো আমি গান ছাড়া আর-কিছু দিয়ে এমন সফলভাবে ঘটাবার সামর্থ্য তো রাখি না। অ্যামেরিকাতেই নয় শুধু, ধরুন আমি অস্ট্রেলিয়াতে যেয়ে একই কাজ করতে পারি যে-কোনো সময় এবং করতে পারি য়্যুরোপেও। মনে করুন সবকিছু সুপ্রসন্ন থাকলে এরই মধ্যে একদিন হয়তো-বা আমি রাশিয়া বা চায়নায় যেয়ে একইভাবে তত্পর হতে পারি এবং সেখানে যেয়ে পয়লাই যা করব তা হলো ‘রকি মাউন্টেন হাই’ গানটা তাদিগেরে শোনানো।”

একই ইন্টার্ভিউতে ডেনভার শুনিয়েছেন তার  জ্যাপানট্যুরের অভিজ্ঞতা। কুড়িহাজার অডিয়েন্সের দুই-তৃতীয়াংশ, যারা ইংরেজি স্পিকিং তো দূর এমনকি বুঝতেও অপারগ, শুনেছে ডেনভারের গান এবং গলা খাপে-খাপ মিলিয়ে দোহারকি দিয়েছে ওয়ার্ড-টু-ওয়ার্ড। রকি-পর্বতমালার জীবন এরা কেউই যাপন করেনি, কিন্তু যেভাবেই হোক রকি-পার্বত্যাঞ্চলের গান এদেরকেও ছুঁয়েছে। এইটা, গান, দারুণ শক্তিসিদ্ধ অস্ত্র এক। এই আয়ূধের অপব্যবহার বা অবহেলা উচিত নয়। এইটা, গানের এই ভাষাতিরেক ম্যাজিকের দিকটা, হাল্কাভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। তখন কোনো পোলিটিক্স দিয়াই কিছু করা যাবে না; — গান ব্যর্থ হলে গলা ও গালিগালাজ দিয়া কিচ্ছুটি করা যাবে না। ডেনভার তথাকথিত পোলিটিক্যাল ইনভলভমেন্টের চেয়ে বরং ব্যস্ত থাকতে চান নিজের গলাটা ধার দিতে গাছ-পাহাড়-সমুদ্র ও বোবা এই বসুন্ধরাকে, গোটা গ্রহটাকে তিনি গান-গাওয়া শেখাতে সময় ব্যয় করার কাজে আগ্রহী। তিনি ভালো করেই জানেন যে একেকটা গানেই বরঞ্চ অনেক বেশি করে সম্ভব ইনক্রেডিবল সমস্ত পোলিটিক্যাল স্টেটমেন্ট পুরে-রাখা। আর ডেনভার তা আগাগোড়াই করেছেন, পুরে রেখে গেছেন আবহমানের আওয়াজ, শাশ্বতীর স্বর, সংশপ্তকের অনাবিল লড়াই, তার গানে।

অলিম্পিক্স রুখে-দেয়া গান

একটা গান রুখে দিয়েছিল ১৯৭২ সালে কলোর‌্যাডো অঙ্গরাজ্যে পরিকল্পিত-ও-ঘোষিত শীতকালীন অলিম্পিক্সের আয়োজন। কর্তাব্যক্তিরা ভেবেছিলেন ওই অঞ্চলের ডেনভার শহরটা তো খাসা, ভালোই তো অলিম্পিক্সফ্রেন্ডলি ফ্যাসিলিটিজ মজুদ রয়েছে সেথাকায়, কাজেই লাগাও ধামাকা, মাচাও শোর! দ্য শো উড বি স্পেক্ট্যাক্যুলার, যদি-না গানটা ঘাপলা পাকাত।

কলোর‌্যাডো, তথা ডেনভার সিটি, বরফশোভিত উইন্টারের জন্য অলিম্পিক্সওয়ালাদের নিকট লোভনীয়-সমাদরণীয় মনে হওয়া আদৌ অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। স্কিয়িং করা যাবে দেদার অনায়াস-আরামে, সেইসঙ্গে বরফভাঙা হ্রদে রোয়িং, অ্যাক্রোব্যাটিক নানান কসরতের জন্যও পার্ফেক্ট প্লেস, জিমন্যাস্টিক্সের জন্য তো বটেই, চাই-কি স্নো-মাউন্টেইনিয়ারিং, স্নো-ভোলিবল, ইন্ডোর গেইমগুলো তো অনুষ্ঠানপ্ল্যানে রাখা যাবেই, কিছুটা খাটাখাটনি করে সিনক্রোনাইজড ড্যান্সের জন্যও পরিসর বানায়ে নেয়া যাবে উষ্ণ-প্রস্রবণের টেম্পারেচার আর্টিফিশিয়্যালি মেইন্টেইন করে হলেও, সব-মিলিয়ে একটা গ্র্যান্ড ইভেন্ট হবে সেইটা, গালা দ্য অলিম্পিক্স!

জোরেশোরে চালানো হচ্ছিল প্রচারণা, এন্তার মিসিনফোর্মেশন, ধামাকা জমানোর সমস্ত আঞ্জাম রয়েছে ডেনভার সিটিতে এবং সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে যে উইন্টার অলিম্পিক্সের মোস্ট ইম্পোর্ট্যান্ট থিং স্নোফল থাকবে এখানে এই-সময়টায়। কিন্তু কলোর‌্যাডো-অঞ্চলবাসীরা মানতে চাইছিল না অলিম্পিক্সওয়ালাদের এইসব ধানাইপানাই। আবার উন্নয়নের জোয়ার-প্রোমোটার তথা ইনফ্রাস্ট্রাকচার-ডেভলেপমেন্টওয়ালারা অ্যায়সা কানমন্ত্র জপছিল যে ডেনভার সিটির অধিবাসীরা খানিক দোনোমোনোও করছিল বটে। গেঁয়ো পর্বতভূতগুলো কুড়িকোটি ইউএস ডলারের মামলা ঠাহর করে দেখতেই রাজি হচ্ছিল না। আচ্ছা ফ্যাসাদ তো! ওই-সময়েই আসে এই গান, যে-গানটার কথা চালানো হচ্ছে এখানে, এবং লোকের দোনোমোনো মনমর্জি দিশা খুঁজিয়া পায় যেন।

জন ডেনভারের গান। রকি মাউন্টেন হাই। কি ছিল, কি আছে, এই গানে? “His life is full of wonder, but his heart still knows some fear — / Of a simple thing he can not comprehend / Why they try to tear the mountains down to bring in a couple more — / More people — more scars upon the land” … কে সে? কে এই He? লিরিকের স্টার্ট-স্ট্যাঞ্জায় এইভাবে এসেছে এঁর পরিচয় : “He was born in the summer of his 27th year, coming home to a place he’d never been before / He left yesterday behind him, you might say he was born again / You might say he found a key for every door / When he first came to the mountains, his life was far away on the road and hanging by a song / But the strings already broken and he doesn’t really care / It keeps changing fast, and it don’t last for long” … কে এই আজনবি? কে এই লোক — এই আগন্তুক? গানের টেক্সটে বলা হচ্ছে, এ সেই লোক যে তার বন্ধু হারায়েছে বহুদিন আগে কিন্তু ধরে রেখেছে হারানো বন্ধুর স্মৃতি সযতনে। এখন সে হেঁটে বেড়ায় নির্জনতার ভেতর দিয়া মাইলের-পর-মাইল, জঙ্গল ও ঝর্ণা পারায়ে যায় একের-পর-এক, প্রতিটি পদবিক্ষেপে সে একটু রহম্ খুঁজে বেড়ায়। দৃষ্টি ঢুকিয়ে নিয়েছে এদ্দিনে সে তার নিজের ভেতরে, একটি নিষ্কলুষ নীল পার্বত্য হ্রদের প্রশমিত সমাহিতি সে এইবার চায় পেতে এবং চায় সেই স্নিগ্ধাশান্তি নিজের ভেতরে বুঝে নিতে। সে ক্যাথিড্র্যালওয়ালা পাহাড় বেয়ে উঠেছে শিখরে তার, দেখেছে রুপোরঙ মেঘখণ্ড নিচের জমিনে চেয়ে। দেখেছে এখানে মেঘ গাভীর মতো চরে, দেখেছে এখানে পরাঙ্মুখ নালিঘাস শুয়ে আছে আলসেমি নিয়ে দুপুরভর। এইসব কথাবার্তা, বা কথার ভেতরকার অব্যক্ততাগুলো, আমরা শুনতে পাই কিংবা গানের রেশ থেকে যেন শুনে নিতে চাই আমরা। ঝাপসা কুয়াশার মতন শীতরহস্যমৃদু, জোছনালোকিত উইন্টার যেন গানগুলো। বুঝতে পারি, কিংবা আসলে বুঝতে পারি না, রেড-ইন্ডিয়ানদের কথা বলা হচ্ছে; কিন্তু সত্যিই কি তা-ই? কিংবা তা-ই না? লাল আদিবাসী ওই মানুষগুলোই ছিল কলোর‌্যাডো অঞ্চলের হেফাজতকারী। এরা হারায়ে গেছে ঢের বছর হলো। খুন করা হয়েছে একটা জাতিকে, গোটা একটা আদিম ও অকৃত্রিম সভ্যতাকে, একশ বছরও হয় নাই আমাদের মডার্ন সিভিলাইজেশনের সেই ব্যাটাগিরি ভিক্টোরির। সত্যিকারের আদিবাসিন্দারা অ্যামেরিকার পেটে গিয়েছে সকলেই, বাঘের বা হায়েনার পেটে যায় নাই একটাও। শুধু ধরে রেখেছে সেই স্মৃতি, বন্ধুবিয়োগজনিত শোক, অ্যাপাচিদের চিরবন্ধু বনভূমি ও পাহাড় ও বরফাচ্ছাদনের ছাড়া-ছাড়া বাড়ি আর হিমশৈলগুলো।

অতএব এই স্মৃতি পবিত্র। এই স্মৃতিই কি-না আবিল করে তোলা হবে একজোড়া হাইজাম্প-লংজাম্প আর দুইটা স্কিয়িং-রোয়িং দিয়ে, এইটা তারা — কলোর‌্যাডোজনপদের লোকেরা, ডেনভারবাসীরা — মানতে চাইছিল না। এনভায়রনমেন্ট সুরক্ষা আন্দোলনের লোকেরা একজোট হচ্ছিল, জুটে যান জন্ ডেনভারও। ‘কলোর‌্যাডো রকি মাউন্টেন হাই’ জন্ম নেয়। ভেস্তে যায় পাহাড়-পর্যুদস্ত-করে বরফপ্রান্তরে লাফঝাঁপের ফুর্তিকীর্তনের প্ল্যান। ভাগ্যিস! হতো যদি বাংলাদেশ, গুমখুন-গ্যাঞ্জামের গণপ্রজাতন্ত্রী, পাহাড়খেকোদের ঠেকাতে-আসা আন্তর্জাতিক অভিনন্দনপ্রাপ্ত পরিবেশকর্মকের পরিবার জিম্মি করে একহাত শায়েস্তা করে নেয়া হতো বেচারিকে। এরপর হয়তো ওবামার হস্তক্ষেপে দয়াপরবশ হয়ে কিংবা আঁতাত করে জিম্মিকর্তারা মুক্তিপণ আদায়-উসুল ব্যতিরেকে জানমাল ওয়াপাস ফেরায়ে দিত। তদ্দিনে বেচারা পরিবেশবাদীর শিক্ষা হয়েছে, তিনি গুটায়ে নিয়েছেন নিজেকে, বন্ধ হয়েছে তার পাহাড়কর্তন-ভূমিদখল-জাহাজভাঙাঘাটায় ঠেকানোমূলক ‘উন্নয়নবিরোধী’ আনাগোনা। বাংলাদেশে এই রিয়েলিটি আমরা ধরে রেখেছি। মধ্যদিনে গান বন্ধ করে দিতে বাধ্য হওয়া এদেশে পাখির ডেস্টিনি।

বাংলান্তরিত জন ডেনভার

অনুবাদে যেটুকু হারায়ে যায়, ট্র্যান্সল্যাশনে যা লস্ট হয়, তা-ই কবিতা, সেটুকুই কবিতা, সেইখানেই বিরাজে কবিতা। আমরা জানি এবং বলা যায় মেনেও নিই এই কথাটা। তাহলে গান? গানের বেলায় একই কথা খাটানো যাবে? ট্র্যান্সল্যাশন হয় গানের? কিংবা ট্র্যান্সফর্মেশন বা ট্র্যান্সক্রিয়েশন? খুবই ডিফিকাল্ট এর উত্তরে এককথায় কিছু প্রকাশ করা। ডন-কো পাকাড়না মুশকিল নেহি, না-মুমকিন হ্যায় — ডন মিয়াকে ধরা আদৌ কঠিন কিছু না, ধরা তো যায়ই, কিন্তু অসম্ভব — গানের বেলাতেও কথাটা টানা যায়। গানের অনুবাদ কঠিন কিছু না, করা তো যায়ই, থোড়া-সা বর্ণান্তর-শব্দান্তর-বাক্যান্তর করে নিয়েই আপনি দাবি করতে পারেন যে আপনি গানানুবাদ করেছেন। কিন্তু গানানুবাদ আদতে অসম্ভব। অন্তত টেক্সটুয়্যালি তা-ই। টিউন হয়তো অ্যাডপ্ট করা যায়, সেইটা আপনি যখন সুর করবেন তখনকার মামলা, কিন্তু টেক্সট ট্র্যান্সল্যাইট অলমোস্ট ইম্পোসিবলের কাছাকাছি। গানের ছায়া অবলম্বন করে সুরান্তরণ হতে পারে, হয়, কিন্তু কথান্তর খুবই ডিফিকাল্ট। কবিতা বরং অনুবাদ করা যায়, গিয়েছে অনেক কবিতার সফল ও সমর্থ অনুবাদ পাওয়া আমাদের পাঠাভিজ্ঞতায়। কিন্তু গানের বাণীগত অনুবাদ সহজসাধ্য/সহজলভ্য নয়।

একটা উদাহরণ মনে করে দেখা যাক ঝটপট। কবীর সুমন কয়েকটা গান গেয়েছেন এমন যেগুলো বব ডিলান বা পিট সিগ্যারের গান-অনুসৃত সৃজন বলে সুমনের বরাতেই জেনেছি আমরা। হাতে নিয়ে উৎসগানের টেক্সট এবং অনূদিত গানের টেক্সট পাশাপাশি মিলিয়ে পড়লে বোঝা যাবে অনুবাদে ফেলতে হয় কতটা আর রাখতে হয় কতটা বা কতটাই-বা হয় নতুন করে জুড়তে। ‘হেই মিস্টার ট্যাম্বুরিনম্যান প্লে অ্যা স্যং ফর মি’ গানটার সঙ্গে ‘ও গানওলা, আর-একটা গান গাও’ কিংবা ‘হাও ম্যানি রোডস মাস্ট অ্যা ম্যান ওয়াক ডাউন’ গানের সঙ্গে ‘কতটা পথ পেরোলে তবে পথিক বলা যায়’ মিলিয়ে পড়লেই ধরা যাবে ব্যাপারটা। আমাদের দেশে বেশ-কয়েকটা ব্যান্ড এমনকি ঢালিউডি সিনেমায় লেভ স্যেয়ার নামে একজনের একটা খুবই জনপ্রিয় গান ‘আই ল্যভ য়্যু মৌর দ্যান আই ক্যান স্যে’ কিংবা স্টিভি ওয়ান্ডারের ‘নো নিউ ইয়ার্স ডে টু সেলেব্রেইট … আই জাস্ট কল্ড টু স্যে আই ল্যভ য়্যু’ প্রভৃতি যখন অনুসৃজিত হয়, টেক্সট মিলিয়ে দুই ভাষার দুই ভার্শন নজর করে গেলে দেখা যাবে ব্যাপারটা আদৌ টেক্সটুয়্যাল ট্র্যান্সল্যাশন নয়, একদমই নয়। তেমনি ফিডব্যাকের, মাকসুদ থাকাকালীন ফিডব্যাকের, বা দলছুটের কয়েকটা খুবই দীপ্তবুদ্ধির গানানুসৃজন রয়েছে, ব্যাপারটা তারিফ করার মতো। বিলি জোয়েলের গান, লেড জেপ্লিনের গান, বা সাইমন অ্যান্ড গার্ফাঙ্কলের গান ইত্যাদি বাংলাদেশের ব্যান্ডে মেধাদীপ্তভাবে অনুসৃত হয়েছে সুরকাঠামোর দিক থেকে; এইগুলোই শুধু নয়, বলা বাহুল্য, এক্সাম্পল্ হিশেবে এগুলো বলা হলো।

অনুসৃজন হতে পারে গানের, অনুসরণে সৃজন, তবে এইটাই এক্সপার্ট হাতে পড়ে এমন ঘটনা ঘটে যে এমনকি কখনো-কখনো মনে হয় যেন মূল গানকেও ছাড়িয়ে যেতে লেগেছে অনুসৃজিত গানটা। আবারও কবীর সুমনের নাম নিতে হবে এর সহজ উদাহরণ চয়নের গরজে। এবং, কেন নয়, ফের একবার সর্বত্র-স্মরণযোগ্য রবীন্দ্রনাথের নাম নিতেই তো হবে। একটু আগে যে-একটা গানের কথা উঠেছিল, স্টিভি ওয়ান্ডারের গানটা, বহু ভার্শনের বাংলা শোনার পর সুমনের ভার্শন শুনে দেখলে বোঝা যায় ঠিক কোথায় যেয়ে একটা গানের লিরিক্সের টেক্সট অনুবাদে বাধাটা আসে। যে-তিনটা গানের কথা বলা হলো কবীর সুমনের, এছাড়াও রয়েছে বেশ-কয়েকটা তারই হাতে ছায়ানুসৃতিমূলক গান, এগুলো মূল গানের টেক্সটের সঙ্গে রেখে দেখলে শেখা যায় কিছু জিনিশ। শেখা যায় কেমন করে একটা ল্যান্ডস্কেপের গান আরেকটা ল্যান্ডস্কেপে এনে মেশামেশি করাতে হয় সেই দ্বিতীয় ল্যান্ডস্কেপের জলমাটিহাওয়ায়। এইটা করা সম্ভবই নয় যদি-না আপনি অনুবাদ ব্যাপারটা ভুলতে পারেন। সুমনের এমনকি ‘চাইছি তোমার বন্ধুতা’ গানটাও বব ডিলানের অবলম্বী, কিন্তু বোঝার কোনো কুদরত নাই ইংরেজির সঙ্গে এর কোনো সাদৃশ্য রয়েছে, এমনকি সুরের সাদৃশ্যও মুছে দিতে পেরেছেন সুমন তার এই কয়েকটা কাজে। কেবল স্টিভি ওয়ান্ডারেরটার ক্ষেত্রে সুরটা ডিফিউজ করেন নাই। স্টিভির বাংলাটা কবীর সুমনের ওয়েবক্ষেত্রে পাওয়া যায়।

কিন্তু সুমনের ন্যায় এই-রকম উৎসগানের সুরচিহ্নটাও লোপাট করে দেয়া চাট্টেখানি কথা তো নয় কিংবা নয় যার-তার পক্ষে সম্ভব। তবে এইখানে যেইটা আলোচ্য তা এ-ই যে সুমন কিংবা অন্য কেউই লিরিক্স হুবহু অনুবাদের চেষ্টাও করেননি। ভাগ্যিস! করলে এই গানগুলো তো পেতামই না, উপরন্তু পণ্ডশ্রম হতো গোটা কারবারটা। কাজেই আপনি যদি গান অনুবাদের চেষ্টা করেন, আপনাকে অবশ্যই সুরবোধসম্পন্ন হতে হবে, সুরসাক্ষর হতে হবে, ইনস্ট্রুমেন্টগুলো আপনি চালাতে পারুন বা না-পারুন সেগুলোর চলন সম্পর্কে একটা আইডিয়া থাকতে হবে আপনার। গাইতে পারুন না-পারুন আপনার জনপদের সুরমানচিত্র সম্পর্কে একটা জানাশোনা থাকতে হবে আপনার। না-হয় তো উদ্ভট উটের পিঠে চড়াবেন কয়েকটা দারুণ সুন্দর ঈশ্বরী-সৃজিত প্রতিমাকে। এরচেয়ে টেক্সট না-শুনে/না-বুঝে কেবল সুর ফলো করে গেলেই ইনসাফ হয়।

এর মানে এ-ও নয় যে বাংলায় ইংরেজি থেকে গানের ট্র্যান্সল্যাশন হয়নি। বিস্তর হয়েছে। বিস্তর হয়ে থাকে হামেশা। একটা ছোটকাগজে একবার লেনার্ড কোহেনের ‘স্যুজ্যান’ ইত্যাদি খুবই দুর্ধর্ষ কতিপয় লিরিক্স ও জনপ্রিয় গানের একগোছা অনুবাদ পড়ে সেই তরুণ অনুবাদকদের অতিসততার কারণে এদেরে একমুখ বকাবকি করবার খুব খায়েশ হয়েছিল। শাকিরার একগোছা গানের অনুবাদ একটা গাট্টামোটা লিটলম্যাগে একবার পড়ে এদের গানবোধ নিয়ে এতই তিতিবিরক্ত হয়ে গেছিলাম যে একনাগাড়ে একহপ্তা পর্যন্ত বোবা থাকতে হয়েছিল। বব ডিলানের গানের অনুবাদ তো পশ্চিমবঙ্গীয় কতিপয় লিটলম্যাগে এ-পর্যন্ত চাক্ষুষ করেছি। বিদঘুটে অভিজ্ঞতা। এমনকি আমাদের সৈয়দ হকের ‘বিম্বিত কবিতাগুলো’ নামে একটা কিতাব আছে ট্র্যান্সল্যাটেড কবিতার, সেখানে ডিলানের ‘ব্লোয়িং ইন দ্য উইন্ড’ গানটার বঙ্গজন্ম পড়ে সৈয়দের সততানিষ্ঠার জন্য করুণা জাগিয়াছিল। সর্বশেষ নোবেল অর্জনোত্তর ববির গান নিয়া বাংলাদেশী দৈনিকীগুলোতে একটা আমোদে হুজ্জৎ হয়ে গেল। দরকার নাই। গানের অনুবাদের কোনো দরকার নাই। নিতান্ত অনুবাদের দরকার হলে সেখানে সততা-মূলানুগততা প্রভৃতি ট্র্যাশ জিনিশের দরকার বিলকুল নাই বলেই মনে হয়। যেইটা দরকার তা হলো উৎসভাষার গানের বিটগুলো বুঝে বুঝে, মেপে মেপে, ওজন করে করে, গন্তব্যভাষার ভেতর সবচেয়ে কাছাকাছি যেই বিটগুলো/ছন্দগুলো/অনুছন্দগুলো আছে তার দ্বারস্থ হওয়া এবং কন্টেক্সট্যুয়্যালাইজ করে নেয়া।

আমরা কেউ কেউ ছোটবেলায় এমনকিছু বোকামি করেছি যে একেকটা ইংরিজি গান শুনে সেইটা বাংলায় লিখে রেখেছি অনেকটা সত্যেন্দ্রনাথ দত্তীয় ছন্দে বা বড়জোর রবীন্দ্রনাথীয় ধরনে। ডেনভারের গান থেকে এমন একটা উদাহরণ দিয়ে দেখানো যাক টেক্সট্যুয়্যাল ট্র্যান্সল্যাশনের ব্যর্থতা। ‘অ্যানির গান’ থেকে : “ভরেছ আমায় নিশীথে যেমন সঘন-গহন রজনীতৃপ্ত বন / পর্বত যথা গাছভরপুর বসন্তিকায়, যেমন বরিষনদিনে বৃষ্টিতে হণ্টন / মরুভূমি যথা বালিতে বিপুলা, সাগরে যেমন ঘুমের নীলাঞ্জন / তেমন করেই দিয়াছ ভরি’ ইন্দ্রিয়গুলো আমার / এসো এসো ওগো পুনরায় এসে পূর্ণ করো আমায়”; — কিংবা ‘অ্যানির আরেকটা গান’ থেকে একাংশ : “ফিরছি বাড়ি, ফিরিয়ে আনছি আবার আমায় / দিচ্ছি তুলে তোমার হাতে ফের আমাকে / এইটুকুনি দিতে পারি দিচ্ছি তোমায় সবটুকু আমার / আমার জীবন আমার প্রেম আমার যাপন সমস্তটা / ভাগেযোগে এসো কাটাই দোঁহে বাকি জিন্দিগিটা” — বা ডেনভারের পালিত পুত্র-কন্যা নিয়ে একটা ছোট্ট লিরিকের পুরোটা : “জ্যাকারে নামেই ডাকিব পোলারে পালিব-পুষিব পাহাড়ে / নাওয়াবো হিরের ঝর্ণাধারায় হাসাবো সূর্যমাঝারে / জেনিফার নামে ডাকিব মেয়েরে নাচাবো ফুলের খামারে / গাওয়াবো গ্রীষ্মঝরোঝরো সুরে সময়ের সুধাবাহারে / বাঁচিবারে চাই চিরদিন দেখে দর্পণে ভাবীকাল / দোঁহে মিলে চাই সামলায়ে যেতে সুখ ও দুঃখের হাল।” ইত্যাদি। কিন্তু মধ্যযুগীয় বাংলা কবিতা হিশেবে এইগুলো হজম করা গেলেও চিরসবুজ সুরের আবহমান গান হিশেবে এই টেক্সটগুলো মেনে নেয়া মুশকিল। অবশ্য শ্রোতাভেদে থাকতে পারে মতভিন্নতাও।

অঞ্জন দত্ত জন ডেনভারের কয়েকটা গান অবলম্বনে টিউন করেছেন, সেগুলো সুরের আখর ধরে চেনা যায় ডেনভার বলে, কিন্তু লিরিক্স একদম অনুরূপ ডেনভার নয়। ‘এই বুড়ো পুরনো গিটার’ গানটার পাশাপাশি ‘দিস্ ওল্ড গিটার’ শুনে/পড়ে দেখার প্রস্তাব করা যেতে পারে, কিংবা ‘টিভি দেখো না’ গানটার পাশে রেখে ‘ব্লো আপ য়্যুর টিভি’ শুনে দেখুন বা পড়ে, একদম কোনো মিল নাই থিম্যাটিক। বাংলাদেশের একটা ব্যান্ড ‘সুমন ও অর্থহীন’ নামে, সেই ব্যান্ডের ভোক্যাল-কাম্-ব্যান্ডলিডার সুমন, ব্যাজগিটার ভালো বাজাতে পারেন বলে বেশ বিখ্যাত যিনি, একটা অ্যালবামই করেছিলেন ডেনভারগান নিয়ে, সেইখানে ‘অ্যানির গান’ ইত্যাদিও ছিল, টেক্সট্যুয়্যাল দিক থেকেও যথেষ্ট মূলানুগ ছিল অবশ্য, মন্দ হয় নাই। কিন্তু সব-মিলিয়ে এইটা একটা ব্যাপার ধর্তব্য যে, গানের ধ্বনিগত অনুবাদ হলেও কথাগত অনুবাদ সত্যিই ডিফিকাল্ট। অসম্ভব হয়তো নয়, ভালো হাতে পড়ে বেশ উতরে যেতেও পারে, কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাণীমঞ্জরির অনুবাদ সুখশ্রাব্য/সুখপাঠ্য হয় না। আবার ভুয়া বাংলায়নও মায়েস্ত্রো মিউজিশিয়ানের হাতে পড়ে মহাজাগতিক সুরের অভিজ্ঞতা হয়ে-ওঠাও বিচিত্র কিছু নয়।

এখন বলবার কথাটা এ-ই যে গানে কি আদৌ বক্তব্য থাকে? হ্যাঁ, গানের সংজ্ঞাতালাশে না-লেগে জীবনানন্দের বহুলোদ্ধৃত কবিতাকথার সেই নিরুক্তিসদৃশ সুভাষণ মনে রেখে বলা যেতে পারে যে গান অনেকরকম; হতে পারে বক্তব্যমূলক গান, প্রচারণাগান, তর্ক ও তরজামূলক গানও হতে পারে, যেমন মরমি বা আরও সহস্র ধরনধারণের গানও রয়েছে দুনিয়ায়। কিন্তু সত্যিকার অর্থে একটা ভালো গানে আমরা সুরের এক্কাগাড়িতে চড়ে ছবি দেখে বেড়াই, দেখি চলচ্চিত্র, রৌদ্রছায়াছবি; এই ছবি কোনো অন্তরীক্ষছবি কিংবা ভূমিচিত্র নয়, এইটে অনুভূতিচিত্র, মনশ্ছবি। গানের সত্যিমিথ্যা এবং গানের যুক্তিবিদ্যা, যেমন কবিতারও, দুনিয়াবি সত্যিমিথ্যা-যুক্তিবিদ্যা থেকে আলাদা; গানের ব্যাপারস্যাপার এমনকি কবিতার ব্যাপারস্যাপার থেকেও অনেকটা আলাদা। না, মালার্মে বা আরও-আরও প্রতীকবাদী কবির কথা না-জানলেও চোখ বুঁজে এই কথাটা মানতে বেশি বেগ পেতে হয় না। কাজেই অনুভবছবি তর্জমা/ভাষান্তর করবেন কী করে! গান বঙ্গানুবাদিত হতে যেয়ে হামেশা বাংলান্তরিত হতেই দেখব আমরা, গানের পাঠকৃতিগত অনুবাদনের এই এক বিপদ ও বিপত্তির দিক, বাংলায় মেহমান-গানকে নেমন্তন্ন জানায়ে আনতে যেয়ে যেন আমরা বাংলাছাড়া না-করি বেচারিকে।

মেঘের দেশে ডেনভার

জন ডেনভারের ৯টা গান বাংলায় গেয়েছেন সুমন। বাংলাদেশে ‘সুমন ও অর্থহীন’ ব্যান্ডের ব্যাজবাবাখ্যাত সুমন বেশকিছু সুন্দর-সুষ্ঠু সংগীত উপহার দিয়েছেন বাদ্যযন্ত্র বাজানোর বাইরে নিজের লিরিক্সে স্বকণ্ঠে গাইতে যেয়ে। এমনিতে সেগুলো উচ্ছ্বসিত হবার মতো সুর-উদ্ভাবনা বা গীতিকবিতা না-হলেও ওই সময়ের কন্টেক্সটে উল্লেখযোগ্য ছিল। সুমন যখন ‘সুমন ও অর্থহীন’ ব্যানারে অ্যালবাম রিলিজ্ শুরু করেন, তখন বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতে মিক্সড্ অ্যালবাম ইত্যাদির অপপ্রভাবে হোক কিংবা আর-কোনো কারণে চলছিল ধুমধাড়াক্কা খিচুড়ি লিরিক্স ও মিউজিকের মোচ্ছব। অন্যদিকে কলকাতাকেন্দ্রী মিউজিকে বেশ ভালো সুর ও কথাখচিত সংগীতের সুসময় এসেছিল সমনামী আরেকজনের কল্যাণে। এহেন সময়ে বাংলাদেশের সুমন মোটামুটি নিরিবিলি লিরিক্যাল্ কথাভাগে সুর বসিয়ে গিটারে টেনে টেনে যখন গাইতে শুরু করেন, অঞ্জনাচ্ছন্নতা বা কান্ট্রিমিউজিকের সরাসরি ছাপ সত্ত্বেও শুনতে মন্দ লাগত না। শান্ত-সমাহিত স্বরে এবং পরিমিত বাদ্যযোজনায় নিচু স্কেলে রেখে সুমনের গায়ন তখন অনেককে আশান্বিতও করেছিল নতুন মোড়ের মুখে দাঁড়াতে, উঠতি গাইয়েদের অনেকেই গিটার আর ড্রামস্ খানিকটা ভাবনাচিন্তা করে একটু রয়েসয়ে সামলেসুমলে আরও সৃজনী বিস্তার দিয়ে বাজাবার পথ ঢুঁড়তে শুরু করেছিলেন। পরের দশকে এসেই বিচিত্রবিস্তৃত ফলও ফলেছে এর, সো-ফার আমার দেখাদেখি দিয়া অনুমিত, অর্ণব ও অন্যান্য থরে-বিথরে বাংলাদেশের গানে বুদ্ধিদীপ্ত বৈচিত্র্যের হাওয়া লেগেছে ক্রমে।

এইখানে ডেনভার প্রসঙ্গে সুমনের একটা অ্যালবাম হাতে নিয়া আমরা কথা চালাতে চাইছি। নিজের মিউজিক-ক্যারিয়ারের রজত-জয়ন্তীলগ্নে সুমন একটা অ্যালবাম করেছিলেন, সোলো উদযোগের সঙ্গে এলিটা নামের এক শিল্পীকে ফিচার করা হয়েছিল সেই অ্যালবামে যিনি পরবর্তীকালে গেয়ে সুপরিচিত হয়ে ওঠেন, গোটা অ্যালবামটা ছিল ডেনভারের নয়টা গানের বঙ্গানুবাদের উপস্থাপন। বছর-দশেক আগে, ২০০৫ সালে, অ্যালবামটা বেরিয়েছিল ‘জি সিরিজ্’ থেকে; অ্যালবাম মার্কেটিং করেছিল গীতাঞ্জলী। ইন্ ফ্যাক্ট, দশটা গান অ্যালবামে থাকলেও আদতে অ্যানি’স্ স্যং  গানটা দুইবার করা হয়েছিল; একবার সুমন-এলিটা রেগ্যুলার বিটে এবং অন্যবার টেম্পো পাল্টে জে-মিক্স। মন্দ হয় নাই গোটা ব্যাপারটা। আর মন্দ হয় নাই বলেই তো মনে আছে; এবং মন্দ হলে এখন এই কথাবার্তাও বলার দরকার হতো না। যা-হোক, অ্যালবামের টাইট্যল্ ‘মেঘের দেশে’ এবং উপশিরোনামায় ‘অ্যা ট্রিবিউট টু জন ডেনভার’ কথাটা কাভারমুখে লেখা রাখা ছিল। প্রত্যেকটা গানের সঙ্গে মূল ইংরেজি শিরোনাম ব্র্যাকেটে এবং বঙ্গানুবাদিত শিরোনাম বোল্ড হরফে ছাপানো হয়েছিল। সব-কয়টা গানের অনুবাদক সুমন। বাজিয়েছেন জেমস থেকে শুরু করে জুয়েল এবং অনেকেই। গিটার্স, ড্রামস্, কিবোর্ডস্, পার্কাশন্ ইত্যাদি দিয়াই মিউজিকট্র্যাকগুলো যোজিত। সবই ঠিক আছে। এরপরও অস্বস্তির জায়গাটা ভারি ভুগিয়েছিল শ্রোতা হিশেবে আমাদেরে এবং আজও অভিজ্ঞতাটা ইয়াদ আছে। একটু পরেই বলছি সেইটা।

গানগুলো ছিল সর্বজনপ্রিয় কয়েকটার মধ্যে উল্লেখস্থানীয়; জন্ ডেনভারের শ্রোতা মাত্রেই লিরিকগুলো ওষ্ঠস্থ রাখেন। যথা — অ্যানি’স্ স্যং, লিভিং অন অ্যা জেটপ্লেন, টেইক মি হোম কান্ট্রিরোড, ড্রিমল্যান্ড এক্সপ্রেস, পোয়েমস প্রেয়ার্স অ্যান্ড প্রোমিজেস্, গার্ডেন স্যং, দিস্ ওল্ড গিটার, ফ্লাই অ্যাওয়ে, এবং পারহ্যাপ্স ল্যভ। সুমনের বঙ্গানুবাদে ডেনভার-মিউজিক শুনতে শুনতে একসময় খেয়াল হয়, আরে! একটা গানই যেন শুনছি ফিরে ফিরে! এইটা কেন হবে? ডেনভারের গানগুলো সিগ্নেচারমার্ক সত্ত্বেও তো মনে হয় না যে একঘেয়ে বা একটা গানই শুনছি, তাহলে এখানে এমন হচ্ছে কেন? ঘটনাটা মনে হয় সুমনের গায়কী-সীমাবদ্ধতার কারণে যতটা-না তারচেয়ে বেশি গানানুবাদের কারণেই। মিউজিকের অনুবাদ হয় না, ‘মেঘের দেশে’ অ্যালবামের সুমন-কম্পোজিত সুর-কথানুবাদগুলো শুনে এই অভিজ্ঞতাটা আমাদের হয়েছিল তখন। যদিও কথার অনুবাদ হতে পারে, হয় আকছার, যেমন কবিতার বিশ্বস্ত টেক্সট্যুয়াল ট্র্যান্সফর্ম/ট্র্যান্সল্যাশন্ হয়। বিশ্বস্ত যতই হোক, তবু অনুবাদে যা হারায় তা-ই কবিতা — আমরা জানি এবং মানি। কিন্তু গানের ক্ষেত্রে বোধহয় ট্র্যান্সল্যাশনে কিছুই প্রায় থাকে না। আস্ত লোপাট হয়ে যায় ভাবের বা অনুভবের। ব্যাপারটা হয় তখন না-ঘরকা না-ঘাটকা।

গানের ছায়ানুসারে গান হতে পারে। গান ভেঙে গান হতে পারে। এই দুই প্রক্রিয়াই আসলে গানের বিশ্বস্ত সঞ্চারপ্রক্রিয়া। গান-টু-গান অনুবাদ আসলে হয় না। কাব্যানুবাদ বা গদ্যানুবাদ যদিও সম্ভব লিরিক্সের, কিন্তু সুরের-সংগীতের অনুবাদ! মনুষ্য অসাধ্য। অসুন্দরও। সুমনের ডেনভারগানের অনুবাদচেষ্টা ট্রিবিউট হিশেবে বেশ, সংগীত-অভিজ্ঞতার বিচারে এইটা যাচ্ছেতাই।

কিন্তু অন্যদিকে এই কথাটা তো সৌরালোকের মতো ট্রু যে দেশে দেশে গানের অনুবাদই হয় আসলে। দেশে দেশে, যুগে যুগে, কালে ও কালান্তরে। সেই প্রক্রিয়াটা লক্ষণীয়। সাইদুস সালেহীন সুমনের প্রক্রিয়ায় সেইটা সম্ভব না। ঠাকুরের প্রক্রিয়ায় সেইটা সম্ভব, কাজীর প্রক্রিয়ায় সেইটা সম্ভব, এবং সম্ভব কবীরের প্রক্রিয়ায়। এইখানে কবীর বলতে আমরা বলছি কবীর সুমন। বাংলা গানে একটা হাওয়া এনেছিলেন সুমন কোন প্রক্রিয়ায়, এইটা আমরা আজ পুরোপুরি হৃদয়ঙ্গম করতে পারি বোধহয়। এই জিনিশটা কবীর সুমনের কাছ থেকে আমরা শিখে রাখতে পারি।

কিন্তু শ্রদ্ধার্ঘ্য হিশেবে ‘মেঘের দেশে’ অ্যালবামটা আসলেই সুন্দর। ফর অ্যা চেইঞ্জ এমনটা আরও হতে পারে অন্যান্য মায়েস্ত্রোদের ক্ষেত্রে। যদিও অর্থহীনখ্যাত সুমন ইংরেজি গানের কথাগুলো সুরের সঙ্গে সংগতিবিধানে যেয়ে ল্যাবগ্যাবে করে ফেলেছেন, আপোস করতে করতে একেবারে নার্সারি শিক্ষার্থীর বাংলা করে ফেলেছেন, এবং শুনতে বেশ লাগলেও পড়ার অভিজ্ঞতা হয় ভীষণ বদখত। মূল গানের স্মার্টনেস্, মূল গানের মেলোডি, কথায় একদমই নিখোঁজ।

ফিতার যুগের ক্যাসেট তখন অন্তিমে। ফ্ল্যাপকথন থাকত ক্যাসেটগুলোর সঙ্গে। ‘মেঘের দেশে’ ক্যাসেটের খাপে ডেনভারের ৯টা গানের অনুবাদক সুমন যা বলেছিলেন, টুকে রাখি নিচে।

“অক্টোবর ১২, ১৯৯৭। তখন অনেক সকাল। টেলিফোনে একটি সংবাদ পেয়ে থমকে যাই। জন ডেনভার আর পৃথিবীতে নেই। চোখদুটো ঝাপসা হয়ে ওঠে। যার গান আমার এই সংগীতজীবনে অসম্ভব রকমের ছায়া ফেলেছে, সেই মানুষটি আজ নেই। ব্যাপারটা কেমন জানি অবিশ্বাস্য লাগছিল। ডিসেম্বর ৩১, ২০০৩। জন ডেনভারের জন্মদিন। মনটা হঠাৎ করে খুব খারাপ হয়ে গেল। সবসময় একটা সুপ্ত বাসনা ছিল এই মানুষটার কিছু গান গাবো নিজের ভাষায়। তার গাওয়া আমার সবচেয়ে প্রিয় গান অ্যানি’স্ স্যং শুনতে শুনতে গানটা বাংলা করে ফেললাম। জি-সিরিজের কর্ণধার খালেদভাই গানটা শুনেই বলল, একটা ফ্যুল অ্যালবাম করে ফেলেন, আমি রিলিজ্ করে দেবো। কথাটা প্রথম যখন শুনলাম নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছিল না! স্বপ্নটা হয়তো বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে! মাঝে বেশ কিছুদিন অসুস্থ থাকার কারণে আমার সংগীতচর্চা অনেকখানি থেমে যায়। মনের মাঝে তখন একটা কথা ঘুরপাক করত, আমার এই স্বপ্নটা হয়তো আর পূর্ণ হবে না। সৃষ্টিকর্তার অসীম কৃপায় আবার পুরোপুরিভাবে সুস্থ হয়ে উঠলাম। পূর্ণ উদ্যমে নতুন করে শুরু করলাম জন ডেনভার ট্রিবিউট অ্যালবামের কাজ। আমার স্বপ্ন সার্থক হলো। পঁচিশ বছরের সংগীতজীবনে অনেক কিছুই পেয়েছি (সুখ, দুঃখ বা কষ্ট)। আমার না-পাওয়ার কষ্টগুলো কিছুটা হলেও লাঘব হলো এই অ্যালবামটি প্রকাশের মাধ্যমে। অ্যালবামটি উত্সর্গ করছি জন ডেনভারের স্মৃতির উদ্দেশ্যে। আশা করি আমার এই প্রচেষ্টা জন ডেনভারের ভক্তদের ভালো লাগবে। যারা কখনো জন ডেনভারের গান শোনেননি তাদের কাছে একটা অনুরোধ, অরিজিন্যাল গানগুলো একবার শুনে দেখুন। হয়তো-বা নতুন করে সংগীতের দ্বার উন্মোচিত হবে আপনাদের মাঝে।” দস্তখত অন্তে প্রদত্ত তারিখ, অক্টোবর ২০০৫।

জীবন রে, ও জীবন, ডোন্ট গ্য অ্যাওয়ে

কী অদ্ভুত সাদৃশ্য, লক্ষণীয়, জন ডেনভারের একটা গানের সঙ্গে আবহমান বাংলা একটা গানের! বাংলা গানটা আবহমান বলা হচ্ছে, কেননা গানটা আমরা বহুকাল ধরেই শুনছি, সেভাবে গানকর্তার নাম না-জেনেই। এইটা বাউল গানও নয়, কেননা বাউল গান তো এই সেদিনের ব্যাপার ইন-ওয়ান-সেন্স, যে-কোনো মরমিচৈতন্যসংবাহক গানে এবং বাউল-ফকিরি অন্যান্য সমস্ত ঊনিশশতকী কিংবা তারও আগের কৌমচর্যাধারার গানে পদকর্তাদের নাম ভনিতাপদে বা সমাপনপদে বা গানের এমনকি রিফ্রেইন-লাইনে পাওয়া যাবে। এর বাইরেও রয়েছে বিপুল ও অতিকায় বাংলা গানের যে-সম্ভার, রয়েছে যে-প্রাণ-ও-গানবৈচিত্র্য, সেসবের নগণ্য-অংশ নজির হিশেবে একজীবনে শুনেই বিদায় নিই এ-মরজীবন ছেড়ে, যেখানে গানমহাজন-পদকর্তার নামোল্লেখ থাকে না। আমরা গ্রামবাংলার গান বা পল্লিগীতি লেবেলে একটা কামরায় এই গানগুলো রেখে দিয়ে অভ্যস্ত। সেইসব আবহমান গানেরই একটা এইখানে চয়িতব্য গানটা। বাংলার এপার-ওপার দুইপারেই গানটা চালিত, অল্প হেরফেরও ঘটতে দেখি নানাজনের গাওনায়, লিরিক্সের হাল্কা লোক্যালাইজেশন। অবশ্য এর আগে ইংরেজি গানটা, মাত্র চারলাইনেরই গান, ছোট্ট গান, অল্প ব্যাপ্তির, তুলনায় বাংলা পুরাতনী চিরায়ত গানটা বড়-কলেবর ও পূর্ণাঙ্গ। জন ডেনভার গাইছেন : Sweet, sweet life, I’m living today, don’t bring me down, don’t go away / Give me just one more chance to make you want to stay / Sweet, sweet, sweet life, I’m living, I’m living today. Don’t bring me down, don’t go away / Don’t go away, please, don’t go away. এদিকে বাংলা গানটার লিরিক্সের কিয়দংশ : “জীবন রে, ও জীবন, ছাড়িয়া যাইস না মোরে / তুই জীবন ছাড়িয়া গেলে মাইনষে কইব মরা জীবন রে …”; যে-জিনিশটা বাংলা গানটায় আছে, কিন্তু ইংরেজি গানটায় নেই, এইখানে, সেইটা গানের ভেতর চোলাই-করা/চারায়ে-দেয়া তাৎপর্যবৈভববাহী হিউম্যর। তুই জীবন ছাড়িয়া গেলে মাইনষে কইব মরা জীবন রে।

এমন সাদৃশ্য, সমাপতনের এমন বিস্ময়, শুধু এই গানেই নয়, ডেনভারের অন্যান্য কয়েকটা গানেও লক্ষ করব আমরা বাংলাগানশ্রোতারা। আস্ত গানের না-হোক, কোনো-না-কোনো অংশে কোনো-না-কোনো দৃশ্যে কোনো-না-কোনো কল্পচিত্রশোভায় এমন মিল আমরা পাবো। মোটেও অস্বাভাবিক নয়। ঘুমপাড়ানি মাসিপিসি বাড়িতে ডেকে একেবারে আমার সন্তানের শিয়রে বসানোর গান বা চাঁদমামা নামায়ে এনে খুকিটার কপালে চুমু খেয়ে যাবার গান বা পরীদের ডানা আমার খোকার গালে বুলিয়ে যাবার গান তো বাংলাতেই কি আর হিব্রুতেই কি, জিনিশ তো সদৃশ হবেই। ডেনভার খোকাখুকিদের নিয়ে এমনিতেই গেয়েছেনও অনেক, এর মধ্যে ঐতিহ্যবাহী ব্যালাড-লালাবাই তো রয়েছেই, কান্ট্রিস্যংগুলোর প্রচলিত ও সংগৃহীত লিরিক্স তো গেয়েছেনই, কিংবা কাওবয় স্যংস, আর নিজের গানে দেদার আত্মসাৎ করেছেন এগুলোকে — এ তো আর বলতে হয় না। আর বাংলাতে, কি আরবিতে, কি হিন্দি-পশতুতে এইসব অনুষঙ্গ-চিহ্নাবলি ঘুরেফিরেই তো রয়েছে যুগ-যুগ ধরে।

কাজেই কোইন্সিডেন্স বা সমাপতন বলা যাবে না পুরোপুরি। তাছাড়া সাতসুরে বাঁধা দুনিয়া, তদুপরি ঘুরন্ত যুগ-যুগান্তব্যাপী পৃথিবী ও অন্যান্য গ্রহ-তারা-রবি, তারসপ্তক বলুন বা মন্দ্রসপ্তক নাম বদলে সব গানভাষাতেই বিরাজে। আর গান তো মানভাষাও বোঝে না, ঢাকাইয়া রক্-ন্-রল্ লিঙ্গুয়াফ্রাঙ্কাও বোঝে না, গানের ব্যাপারটা জীবনানন্দকথিত ওই “ভোরের আলোর মূর্খ উচ্ছ্বাসে হঠাৎ নিজেকে পৃথিবীর জীব” বলে ভাবতে পারার মতন একটা নায়িভিটি ও ডাবশাঁসের ক্রিস্টালক্ল্যারিটি ও নরমাভার ব্যাপার। গা-জোয়ারি কিছু সুরে খাটে না। বাহিত হয় গান আপসে-আপ।

বাবরের প্রার্থনা আর ডেনভারের গানাবাজানা

ঈশ্বর পাটনির সেই বিখ্যাত প্রার্থনা আমাদের রক্তে ইঞ্জেক্ট করে দেয়া আছে, সেই পরহিতব্রতের প্রার্থনা, দেবীকে খেয়াপারানিয়া পাটনি নির্বিঘ্নে নদী পার করায়ে দিয়ে সেরে বর চাইবার মওকা পেয়ে বেচারা যা চায় তা আমরা জানি সকলেই। চাইবার ছিল অনেক, চাইবার আছে অনেক, চাইবার থাকে অনেক। মাঝি ব্যাটা নিতান্ত দরিদ্র, নুন-আনতে-যেয়ে-পান্তা-ফুরনো হতদরিদ্র, অন্তত একখানা শ্যালোইঞ্জিননৌকা বা স্পিডবোট চাইতেই পারত। রক্তে তার ইঞ্জেক্ট-করা অন্য গান, অন্য প্রার্থনা, বোকার মতন তাই স্পিডবোট না-চেয়ে এমন বর চাইল যার পার্থিব বিনিময়মূল্য সহসা নাই। কিন্তু মতান্তরে এইটাই ডিপ্লোম্যাসির আদ্য উদাহরণ। ঈশ্বর পাটনি যা মাগিল বর দেবী-সকাশে, তাতেই নিহিত জগতের যাবতীয় মঙ্গল, এইটে অগ্রাহ্যকর-নগণ্য মোটেও নয়। সে চেয়েছিল তার সন্তান যেন দুধেভাতে থাকে। সে যেভাবেই হোক নুনে-পান্তায় নেবে হরিদ্বার পর্যন্ত ঠেলেঠুলে চালায়ে, কিন্তু তার সন্তানপ্রশ্নে ছাড় নাই, যেন সন্তানেরা থাকে তার দুধেভাতে সুখে। কে এই ঈশ্বর? পুরাণের প্রোট্যাগোনিস্ট শুধুই? “ঈশ্বরীরে জিজ্ঞাসিল ঈশ্বর পাটনি / একা দেখি কুলবধূ কে বলো আপনি” — এই বলে তো ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর কবিতা লিখেছেন। খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, এই কবিতাবয়স কড়ে-আঙুলে গোনা যাবে, এখনও সমকালীন, পলাশীর যুদ্ধ যে-বছর হয় সেই বছরের পিলার থেকে পঞ্চাশটা বছর পেছিয়ে গেলেই মিলবে এই কবিতাটা রায়গুণাকর টাটকা সকালে সবেমাত্র লিখে সেরে উঠেছেন।

এই নিয়া, পাটনির দেবীপারাপার ও বর মাগবার আখ্যান নিয়া, ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর লিখেছেন। আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে। এই নিয়া আমাদের বাপ-মা যুগযুগান্ত ধরে যার যার দেবেদ্বিজে মেগে আসছেন নানান বরন ল্যাঙ্গুয়েজে একটাই প্রেয়ার, এক-ও-অভিন্ন দোয়া, অ্যা প্রেয়ার ফর দি ওয়েলফেয়ার অফ তাদিগের যার যার সন্তানসন্ততি। কিন্তু সবাই দুধেভাতে থাকছে এমন হয়তো নয়, এইটা ওই-রকম পরিণামদর্শী রিক্যোয়েস্টও নয়, এর রেজাল্ট/ইম্প্যাক্টও অতএব পরিণাম দিয়া বিচারিলে ন্যায্য হবে না। মান্নতেই মুহাব্বাত বিধৃত এইখানে, এই মুনাজাতে, এইটা সাধারণ বরযাচনা নয়। এইটাই গোটা একটা জাতির সামষ্টিক চৈতন্যশোণিতে, জাতিতে জাতিতে, ইঞ্জেক্ট করা আছে একদম সনাক্তি-দুঃসাধ্য কবেকার কাল থেকে। এইটাই মিথের কাজ, পুরাণের কর্তব্য ও ভূমিকা এইখানেই, এই রক্তগুপ্ত কথনগুলোকে পরম্পরাবাহিত করা, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে স্প্রেড করে দেয়া। আমরা আদৌ ক্লদ-লেভি-স্ত্রস্ পড়ি নাই, কিংবা জোসেফ ক্যাম্পবেল, কিন্তু ওইটুকু নলেজ আমরা রাখি নিশ্চয়। এবং পুরাণ/মিথ প্রজন্মান্তরে প্রবাহিত হবার গরজে বেছে নেয় শিল্পকলার নানা শাখা : গানে, কবিতায়, সিনেমায়, চিত্রপটে, আখ্যান-উপন্যাস প্রভৃতি বিবিধ বাহনে চেপে এই মিথ কালান্তর ভ্রমণ করে বেড়ায়, সিভিলাইজেশনের লাইটহাউজ হয়ে ক্রিয়া করে চলে।

এবং মিথের এই এক অবাক-করা ব্যাপার যে, এইটা মানুষের খুব বেইসিক জায়গাগুলো স্পর্শ করে কথা বলে, একদম এমনকিছু জমিজিরেত যেখানে আমাদের যুক্তিশৃঙ্খলগুলোও ব্যাহত হয়ে যেতে চায় যেনবা, মিথগুলো শেষমেশ এমন হয়ে থাকে দেখা যাবে যে, যা ভাঙলে তেমনকিছুই পাওয়া যায় না, এতটাই মৌলিক এলাকা নিয়া কাজকারবার মিথের, শব্দে যেমনটা ধাতু, শব্দধাতু ভাঙলে তেমন অবশেষ পাওয়া যায় না, বা পাওয়া গেলেও ওতে তেমন অভিপ্রেত অর্থ তোলা যায় না বা ব্যাখ্যা করা যায় না। তা, আমরা এইগুলো অবগত।

অনেক অনেক কাল বাদে, — ঈশ্বর পাটনি তথা দেবীপারাপার আখ্যানপুরাণের, — এবং/অথবা অনেক অনেক কাল আগে, সেই মুঘল আমলে, একটা প্রায়-ঈশ্বরতুল্য ঘটনা আমরা পাই ইতিহাসপাতায়। এম্পিরর বাবর তখন মসনদে, ক্যারিয়ারের মধ্যগগনে, মুঘল সালতানাতে সম্রাট বাবর মশহুর নানা কারণেই। কিন্তু যে-ঘটনাটা আমরা এখন স্মরণ করে উঠতে চাইছি, এই নিয়া বাংলাভাষার একটি হীরকখণ্ডতুলনীয় কবিতা রচেছেন শঙ্খ ঘোষ, পিতা বাবর তার পুত্র হুমায়ুনের রোগমুক্তি প্রার্থনা করেন নিজের জীবনবিনিময়ে। এই ঘটনা আমাদের সামষ্টিক স্মৃতিচৈতন্যে কেবল সন্তানবাৎসল্যের নজির, তা নয়, তা হয়েও অনেক বেশিকিছু। শঙ্খ ঘোষ এই ঘটনাটাকে একজন প্রকৃত কবির কর্তব্য অনুসারে একটা অনেক বড় প্রেক্ষিতে দেখে ওঠেন, অনেক বড় পরিসরে নিয়ে স্থাপন করেন। কবিতাটা আছে তার ‘বাবরের প্রার্থনা’ কাব্যগ্রন্থে। এই বইয়ের নামকবিতাটা, মুখস্থ থাকলে মুখস্থ অথবা পাতাভ্রমণ করে সেই বইয়ের, একটাবার রিসাইট/আবৃত্তি করে নেয়া যাক।

এই তো জানু পেতে বসেছি, পশ্চিম
আজ বসন্তের শূন্য হাত —
ধ্বংস করে দাও আমাকে যদি চাও
আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক।

কোথায় গেল ওর স্বচ্ছ যৌবন
কোথায় কুরে খায় গোপন ক্ষয়!
চোখের কোণে এই সমূহ পরাভব
বিষায় ফুসফুস ধমনী শিরা!

জাগাও শহরের প্রান্তে প্রান্তরে
ধূসর শূন্যের আজান গান;
পাথর করে দাও আমাকে নিশ্চল
আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক।

না কি এ শরীরের পাপের বীজাণুতে
কোনোই ত্রাণ নেই ভবিষ্যের?
আমারই বর্বর জয়ের উল্লাসে
মৃত্যু ডেকে আনি নিজের ঘরে?

না কি এ প্রাসাদের আলোর ঝলসানি
পুড়িয়ে দেয় সব হৃদয় হাড়
এবং শরীরের ভিতরে বাসা গড়ে
লক্ষ নির্বোধ পতঙ্গের?

আমারই হাতে এত দিয়েছ সম্ভার
জীর্ণ করে ওকে কোথায় নেবে?
ধ্বংস করে দাও আমাকে ঈশ্বর
আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক।

না-বললেও অনুমেয় যে এই কবিতার একাধিক লেভেল থেকে পাঠ-পাঠান্তর সম্ভব। পশ্চিম বলতেই কিব্লা যেমন ভুল নয়, তেমনি পশ্চিম বলতে এখানে পশ্চিম/ওয়েস্ট হিশেবে পড়লেও ভুল হয় না। আর দ্বিতীয়োক্ত পথে এর পাঠোদ্ঘাটন পোলিটিক্যালি এর হার্মেন্যুটিক্স লেভেলটাকে অনেক দূর পর্যন্ত নিয়া যাবার সম্ভাবনা থাকে। যে যেমন ইচ্ছে তেমন ধরনেই পড়বেন, তবে সেকন্ড/থার্ড রিডিংও-যে সম্ভব, বলবার কথাটা এইটুকুনি। কিন্তু যতভাবে, যেমনভাবে, পড়া হোক — গোড়ার কথাটা হারায় না যে এই কবিতার কেন্দ্রে সেই পিতৃপ্রাণা বাৎসল্যবোধ, বাংলা-অবাংলা সর্বত্র এই কল্যাণচিন্তা হাজির সর্বকালে সর্বভাষে সর্বসমাজে, এবং বড় পরিসর থেকে দেখলে এইটে সেই নিরন্তর-বহমান শুভবোধ, মানুষের ঔৎকর্ষাভিলাষ, নিজের শরীরী স্বার্থ জলে ফেলে আরও-বড়-কলেবর অগ্রগমণের ভাবনাটা ভাসিয়ে রাখা, বা আদতে একটা আরও বড় আত্মচিন্তা-আপনস্বার্থ উর্ধ্বে তুলে ধরা, বাঁচায়ে রাখা আখেরে নিজেকেই।

ডেনভারের গানে একটা বড় অংশ জুড়ে এই চিন্তাটা হাজির দেখা যাবে। এইটা থাকতেই হবে যে-কোনো মহত্তর শিল্পীর কাজে, যে-কোনো মহত্তর শিল্পকর্মে এই চিন্তাচৈতন্য অবশ্যম্ভাবী। ডেনভারের গানে ছেলেবেলা খুঁজে ফেরা বারে-বারে, ছেলেবেলা উদযাপন করা, এইগুলোর ছলে মনে হয় তিনি নিজের ভেতরে সেই শিশুটিকেই স্তন্য জুগিয়ে চলেছেন। বটেই তো। অসংখ্য প্রেমের গানে ডেনভার কোনো-না-কোনো পঙক্তিতে এই বাৎসল্যবোধের চিহ্ন রেখে গেছেন। স্বীয় সন্তানদের নিয়া গান তো গেয়েছেনই একের অধিক, ঘুমপাড়ানিয়া গানের কয়েকটা ভার্শন তাকে যেমন গাইতে দেখা যাবে, এবং ঐতিহ্যানুবর্তী শিশুসন্তানস্তুতিগানের পাশাপাশি ক্রিসমাসক্যারলগুলোতেও জন ডেনভার সেই ঈশ্বর পাটনি কিংবা সন্তানান্তপ্রাণা বাবর অথবা আমাদেরই পিতা-পিতেমোর মতন অনাগত সমুখের অনন্ত জলরাশিতুল্য ভবিষ্যের দিকে তাকিয়ে-থাকা বাপ এক, অথবা মানুষের নিঃসন্দিগ্ধ ভবিষ্যমঙ্গলার্থী। ডেনভারের গানে যে-সানশাইনি স্প্লেন্ডার, যে-র‌্যাডিয়্যান্ট কালার হুইল লক্ষণীয়, সেইটে এই চিরশুভার্থী হৃদয়েরই উৎসারণ বৈ কিছু নয় আর, এই চিরকল্যাণকামনা, এই ফিরে-ফিরে গেয়ে-যাওয়া আগামীর সদর্থ আবহমানতা, সন্তানের ভেতর দিয়ে এই নিজেকে পূর্ণ করে তোলার চিরবাসনা, মরজীবনে এ-ই আমাদের অবিনশ্বর সংহিতা, আমাদের নন্দনচেতনা, আমাদের শাশ্বতিকী। ডেনভারের গানের-পর-গান থেকে লাইনের-পর-লাইন উৎকলণপূর্বক একগাদা প্যারা বাড়ানো উত্তম, না খান-পাঁচেক গান ঝিম বসে শুনে ফেলা? র‌্যান্ডোমলি, দৈবচয়ন প্রক্রিয়ায়, যে-কোনো পাঁচটা গান শুনে নেয়া যেতে পারে এই-সমস্ত কথাবার্তা গ্রাহ্য/নস্যাৎ করতে চাইলে।

ডেনভারগানের বিষয়াশয়, ইতিউতি চিহ্নাবলি ইত্যাদিবৃত্তান্ত

খুবই সোজাসাপ্টা প্রেজেন্টেশন, সহজ টেক্নিক সরল প্রকরণাঙ্গিক, কথোপকথনের মতো করে গেয়ে যাওয়া গানগুলো জন ডেনভারের। কোনো গিমিক নাই, লিরিকের ভেতর ট্যুইস্ট করার টেন্ডেন্সি অ্যাবসেন্ট, কিংবা নাই গিটারের-গায়নশৈলীর গিমিক। লিরিক্স নয়, যেন গল্পের আখ্যানভাগ, ডেনভারের একেকটা গানে একটা আস্ত শর্টস্টোরি যেন পড়ে ওঠা যায়। এবং স্টোরিটেলিং কৌশলের ভেতরেও অনুপস্থিত কোনো চমক-লাগানিয়া চাঞ্চল্য। চপলতা নাই, কিন্তু গুরুগম্ভীরতাও অহৈতুক উপস্থিত নয়, ক্যালিপ্সো ধাঁচের গান অনেক গাইলেও অদ্ভুতভাবে সেসব গানে প্যাথোস্ পুরে রেখেছেন।

ভণিতা নাই, রিয়্যাল-স্যুরিয়্যাল-ম্যাজিকরিয়্যাল প্রভৃতি লিটের‌্যারি ইজমপ্রভাবিত কোনো পঙক্তিনির্মাণ করে তিনি বেহুদা গানের প্রাণনাশের অপচেষ্টা করেন নাই, ক্যাকোফোনি তৈয়ার করে বেমক্কা দাবি করে বসেন নাই — আনিলাম ধরণীতে অশ্রুতপূর্ব অভাবিত অপরিচিতের স্বর। সাউন্ডের হার্শ মিক্সচার নাই, ডিসকর্ড/নয়েজ/ডিসোন্যান্স প্রভৃতি বিষয়ে ডেনভারের কড়া কান ছিল গোড়া থেকে শেষ-পর্যন্ত। যেটুকু না-হলেই নয় সেটুকুই গিটার বাজিয়েছেন, ক্যারদানি দেখাইতে যান নাই, গিটার হাতে নিয়ে বেশিরভাগ শিল্পী-গাইয়ে-বাজিয়েই হাতযশ দেখাইতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন লক্ষ করব। গলা যেখানে যতটুকু চড়ানো দরকার ততটুকু চড়িয়েছেন ঠিকই, খাদেও নুইয়েছেন যথাবশ্যক, ঈগলের ক্ষিপ্রতা বা স্টর্মি এফেক্ট আনয়নের তাগিদে ডেনভারের গলা ক্যাথিড্রালসদৃশ পর্বতচূড় ছুঁয়েছে, ফের জলের স্বতশ্চল-সাবলীল কুলুকুলু মধুগুঞ্জর আনয়নে ডেনভার গলা নামিয়ে এনেছেন হ্রদ-নদী-নিঃশব্দসমুদ্রশরীরস্পর্শা খাদে।

লক্ষণীয় জন ডেনভারের গানের থিম্যাটিক ট্রিটমেন্ট। খুবই নিরলঙ্কার আর সহজিয়া তার গানের বিষয়াশয়, এবং ঘুরেফিরে একই অনুষঙ্গ, একই লোকালয় একই নির্জনতা একই বনভূমি একই বিন্ধ্যাচল একই শিখরদেশে ঈগলচক্কর একই বিষাদ একই নিখিলের নৃত্যস্ফূর্তি একই তৃণপ্রান্তর একই হ্রেষা ও বৃংহতি একই কেকা ও কাকলি-কুজন, দুনিয়ার যেমন সেই আদি চাঁদ আদি সূর্য আদি রৌদ্রজগৎ। পুনঃপুনরাবর্তিত বিষয়ব্যাপারগুলো সংক্ষেপে এই-কয়েকটা : ভালোবাসা, প্রেম, গৃহ, বন্ধুত্ব, নৈরব্য, পরিবার, বিপুলা বাহিরভুবন, সংসার, মনোটান ও মায়াসুর। প্রকৃতিস্থিত ও আবহমান জীবনঘনিষ্ঠ সঙ্গ-অনুষঙ্গ-প্রসঙ্গ উপজীব্য হয়েছে ডেনভারের গানে। সেদিক থেকে দেখতে গেলে ডেনভার ক্ল্যাসিসিস্ট, ধ্রুপদী, মৌহূর্তিক সমকালীনতার উর্ধ্বে যেয়ে এক মহাসমকালীনতাই ছিল অন্বিষ্ট তার। এই বিষয়নির্বাচনজনিত স্বাতন্ত্র্যের কারণে অ্যামেরিক্যান সংবাদপত্র ও উপরতলাকার মহলে ডেনভার ব্যঙ্গবিদ্রুপের শিকার হয়েছেন বহু, সয়েছেন হাসিঠাট্টা, ধ্যানচ্যুত হন নাই তবু। প্রেসগুলো, বিশেষভাবেই, নির্মম-নৃশংস আক্রমণ করে গেছে বেচারাকে একের-পর-এক। প্রকৃতিপ্রেম, নিসর্গবন্দনা আর আত্মজৈবনিক উপাদান গানে লগ্নি করার কারণে তাকে নার্সিসিস্ট বলা হয়েছে বারবার; গোটা ব্যাপারটাকে নন্দনবিবেচনার বাইরে যেয়ে ‘অসহ আত্মরতি’ বা ‘রিপেলেন্ট নার্সিসিজম’ বলিয়া সাব্যস্ত করা হয়েছে। কেউ বলেছে ডেনভার হইলেন গিয়া আধুনিক যুগের ‘তুলসীপাতাবাবা’, ইংরেজিতে এইটেকে তারা বলছে ‘মিস্টার ক্লিন’, যা-ই হোক। অপরাধ এ-ই যে ডেনভার ছিলেন মার্জিত কথাবার্তা আর সদাচরণের সেলেব্রেটি, সেক্সস্ক্যান্ডাল নাই, আর স্ক্যান্ডাল নাই তো সেল্ নাই। কাজেই প্রেসের কাছে এই লোক তো রিডিকিউলড হবেই। ক্রিস্ট্যালক্লিয়ার ইমেজের জন্যই ডেনভারকে ভেংচানো হয়েছে বারবার। সকল কাঁটা ধন্য করে ফুল-ফোটানোর দুর্মর আশাবাদ প্রকাশের জন্য তাকে ডাকা হয়েছে ‘প্লাস্টিক পলিয়ানা’ বলে, “ধবধবে-অযৌন ধর্মযাজক ও ধর্মযাজিকার মাঝখানে দণ্ডায়মান নিষ্প্রাণ ক্রুশকাঠ” বলা হয়েছে ডেনভারকে, তার কাজকর্ম ‘মিলিয়নেয়ার মিডিয়োক্রিটি’ বলে তাচ্ছিল্য করা হয়েছে আমৃত্যু। আরেকটা কারণে ডেনভার রিডিকিউলের লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন ঘুরেফিরে, কেতাদুরস্ত চলতি-হাওয়ার-পন্থী পোশাকপরিচ্ছদ না-পরার কারণে। আর্বান পরিসরে, যে-আর্বান পরিসর ট্রেন্ড সেট করে দেয় আমাদের প্রাত্যহ যাপনতরিকা আর জীবনশৈলীর, ডেনভার অসহনীয় উপহাসের পাত্র হয়েছেন শুধু পোশাকপরিধান আর চোখের চশমাটার জন্য। চরম আনফ্যাশন্যাবল ছিলেন তিনি, অ্যামেরিক্যান প্রেসের সমালোচনানুসারে, বৃদ্ধা দাদিমাদের আদলে চেহারাটা আরও পুরানাকালিক হয়ে উঠত চোখের গ্র্যানিগ্লাসটার জন্য। কোনো ভ্রুক্ষেপ ছিল না ডেনভারের, এইসব কথাবার্তার কোনো প্রতিক্রিয়া না-জানিয়ে গিটার বগলে চেপে বা ব্যাঞ্জো গলায় ঝুলিয়ে ছুটে যেতেন কোনো গীর্জাচুড়োর গম্ভীর হাওয়াবাহিত মন্দ্রনৈস্তব্দ্যলীন পর্বতসানুদেশে কিংবা সমুদ্র-অরণ্যের নিরুদ্দেশে, পেছনে রইত পড়ে ডেনভারের ফ্যাশনচৈতন্যাভাব নিয়া আলু-পটলালোচকদিগের সিরিয়াস ডিস্কাশনগুলো।

অক্লান্ত হর্ষমুখ এই শিল্পী ছিলেন স্বভাবে ডেলিবারেইট, ডিটারমাইন্ড প্রোফেশন্যাল, ম্যুডি এবং সেল্ফ-কোয়েশ্চোনিং, সংলগ্ন অথচ সুদূর, ঘরোয়া আটপৌরে হয়েও তবু কোথাও অভেদ্য পর্দা-আবডালে যেন রয়ে যেত জন ডেনভারের চালচলন-প্রতিকৃতি, সহজের ভেতরেই থাকে প্রকৃত কুহক — কথাটা বোধহয় মিথ্যে নয় — ডেনভারকে দেখলে এইটে মেহসুস হয়, ছিলেন তিনি নিরন্তর মায়াময় এবং সৃজনস্পৃহ ও অক্লান্ত কর্মোদ্যোগপূর্ণ, প্রাণপ্রচুরতা আশ্চর্যরকমে ডেনভারে ছিল অঢেল অফুরান। ননস্টপ গান গাইতে পারতেন তিনি বন্ধুবৃত্তে, সেলেব্রেটিসুলভ অথবা গায়কজনোচিত কোনোপ্রকার দেমাগ তার বেলায় ছিল গরহাজির, গাইবার সময় তিনি কোনো গাইগুই করতেন না, টায়ার্লেসলি গিটার বাজিয়ে গেয়ে যেতে পারতেন মধ্যনিশীথ থেকে ভোরের সূর্যস্ফুটন অব্দি, তিনি গাইতেন অশিল্পী আমরা যেমনভাবে কথা বলি ঠিক সেইভাবে, মেলিফ্ল্যুয়েন্টলি, গিটার-ব্যাঞ্জো ছাড়া আর-কিছু অত্যাবশ্যক ছিল না তার সাপোর্ট ইনস্ট্রুমেন্ট হিশেবে। এইসব তথ্য আমরা জানতে পারছি বিভিন্ন সময়ে ডেনভারসান্নিধ্যে যারা কাটিয়েছেন, অনুষ্ঠানের বাইরে যারা তার সঙ্গে ক্যাম্পিং বা পাহাড়পর্বতাভিযানে বেরিয়েছেন এবং গান শুনেছেন ঘরোয়া আড্ডায় কিংবা সরাইখানাছাদে-সমুদ্রবেলাভূমে, তাদের স্মৃতিচারণ থেকে। জানতে পারছি নিকটজনদের ডেনভারস্মৃতিরোমন্থন ও সংবাদজীবী-সাক্ষাৎকারগ্রাহীদের নানাবিধ প্রতিবেদনোক্ত ভূমিকাভাষ্য-ফুটনোট থেকে। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা, এনসাইক্লোপিডিয়া টাইটানিকা, জন ডেনভার অফিসিয়্যাল ওয়েবসাইট, অনলাইনভিত্তিক ডেনভার ফ্যানক্লাব ফোরামগুলো তো রয়েছেই, এবং সর্বঘটে কাঁঠালির মতো উইকিপিডিয়ার কথা তো তথ্যসূত্র হিশেবে বলা বাহুল্যই।

তিনি তার গানের ইন্সপিরেশনের পেছনে অভিযানপ্রিয়তা আর বহির্ভুবনের প্রতি মুখিয়ে থাকার ব্যাপারটাকে অ্যাক্নোলেজ করেছেন নিজের মুখেই। একনিষ্ঠ উন্মাদ পাহাড়প্রেমিক ছিলেন, এই তথ্য এমনকি তিনটে-চারটে ডেনভারগানের শ্রোতাও লহমায় নেবেন বুঝে। এঞ্জয় করতেন ক্যাম্পিং, হাইকিং, ব্যাকপ্যাকিং, ফিশিং এবং উপত্যকা-অধিত্যকাবাহিত দুর্ধর্ষ পর্বতাভিযান। ছিলেন গল্ফার, ফোটোগ্রাফার, পাইলট, এবং পছন্দ করতেন নিজের কাজে ডেয়ারডেভিল থাকতে। একটা খবরকাগজের সাক্ষাৎকারপরিগ্রাহকের কাছে একবার বলেছিলেন, “আমার সেই বিকাশবেলায়, যে-সময়টায় বেড়ে উঠছিলাম, আমার প্রথম ও প্রকৃষ্ট বন্ধু ছিল বহির্ভুবন, অন্তহীন অপলক বহির্ভুবনের হাতছানি। আর যখন থেকেই কি-না আমি নিজেকে এক্সপ্রেস করতে শিখছি, নিজের প্রকাশাভিব্যক্তি নিজে নিজে রপ্ত করছি যেমনটা সকলেই করে থাকে উন্মেষকালে, আমি তখন থেকেই ন্যাচার থেকে প্রকৃতিনিসর্গ থেকে ইমেইজেস্ নিয়ে দৃশ্য ও দৃশ্যকণা নিয়ে নিজেকে প্রকাশ করতে শিখেছি।” নিজের গানে, নিজের সারাজীবনের হিউম্যানিট্যারিয়ান কাজে, এই শিক্ষাটা আগাগোড়াই বিনিয়োগ করেছেন ডেনভার, অবিশ্বাস্য নৈপুণ্য ও পারদর্শিতার সঙ্গেই বিনিয়োগফল সকলের তরে রেখে গেছেন তার গানগুলোর ভেতরে।

একটা আস্ত চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন, ‘ওঃ, গড!’ সেই সিনেমার নাম, ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে রিলিজড। গত শতকের মধ্য-সত্তরে ডেনভার গান গেয়ে বাণিজ্যসফলতার শীর্ষ স্পর্শ করেন। এই সাফল্যের পেছনে আলীবাবার কোনো গুপ্তভাণ্ডার নয়, কিংবা ড্রাগডিলার-মার্সেইন্যারি কোনো গডফাদারের প্যাট্রনশিপ জড়িত ছিল না, ছিল কুল্লে দুইটা ব্যাপার মুখ্য ও একমাত্র তুরুপের তাস : তার ক্লিয়ার টেনর ভয়েস্ এবং তার নিজের লেখা লিরিক্স। মধ্য-সত্তর থেকে আশির দশক পুরোটা জুড়ে ডেনভার একের-পর-এক সিঙ্গেলস ও পূর্ণাঙ্গ অ্যালবাম উপহার দিয়েছেন, প্রচুর টেলিভিশন-শো করেছেন, চ্যারিটি ওয়ার্ক করেছেন প্রচুর। ইউনিসেফের সঙ্গে একটানা কুড়ি বছর কন্টিন্যু করেছেন ক্ষুধা-ও-দারিদ্র্যমুক্ত দুনিয়া সাজানোর কাজে, নিজে প্রতিষ্ঠা করেছেন সোশ্যাল ডেভল্যপমেন্ট সংঘ ‘উইন্ডস্টার ফাউন্ডেশন’। সবকিছু মিলিয়ে একজন ডেনভার ক্রমে ব্যাপ্ত হয়েছেন মনুষ্য সংসারে, মানবের মহাবিশ্বে, গান দিয়া দ্বার খুলেছেন জগতের যত বদ্ধঘরে এবং ছড়িয়েছেন নিজেকে গানের হৃদয়দেশে, গানের গহনে, ফের গান ছাড়িয়ে আরও দূর কোনো মহাগানের মহাজাগতিক বন্দরে।

ডেনভারের শেকড় ডালপালা

রসোয়েল নামে যে-একটা জায়গা আছে দেখবেন নিউ-মেক্সিকো শহরে, অ্যামেরিকায়, সেইখানে ডেনভার ভূমিষ্ঠ হন ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দের নববর্ষসন্ধ্যায়; নিউ-ইয়ার্স ইভ তথা থার্টিফার্স্ট সাঁঝের মায়ায়। পিতৃদেব ছিলেন আর্মিম্যান, অ্যায়ারফোর্স কর্নেল, পোস্টিং বদল হতো ঘনঘন — যদ্রুপ হয়ে থাকে আর্মি-পিওপলের। ফলে একটা লাভ হয়েছিল ডেনভারের এ-ই যে ছেলেবেলা থেকেই পিতার কর্মচারণ-সুবাদে বেশ ঘোরা হয়ে যায় হেথা-হোথা নানা আনকা শহর ও দেশ-দেশান্তর। যদিও মিলিটারি ব্র্যাট হিশেবে ডেনভারের শৈশব-কৈশোর সুখের ছিল না মোটেও। জনকের কর্তৃত্বপ্রাবল্য, কড়া শাসন, হুকুমজারি ইত্যাদি ছিল প্রচণ্ড। খণ্ডকালীন নিবাস হিশেবে অ্যারিজোনা-অ্যালাব্যামা-ওক্লাহোমা ইত্যাদি সিটি ছাড়াও জ্যাপান ও টেক্সাসে ছেলেবেলা কেটেছে ডেনভারের। শৈশববেলার এই ঘোরাঘুরিপর্ব পরবর্তীজীবনে ডেনভার স্মরণ করেছেন বারবার। এই ঘোরাঘুরি এই যাযাবরচর্যা বাকি-পথটুকুতে ডেনভারের পদতলে সর্ষেপ্রেরণা হিশেবে কাজ করেছে দেখা যাবে। একের-পর-এক ভ্রমণে-প্রব্রজ্যায়-পর্যটনে, সেইটা গান গাওয়ার গরজে হোক অথবা ব্যক্তিগত পরিব্রজন-সফরসূত্রে, ক্যারিয়ার ভরে আছে ডেনভারের। ছেলেবেলার সেই পাহাড়িয়া পাতাচারণের সুরে ভরা ডেনভারের গান।

হেনরি জন ড্যুশেন্ডোর্ফ, জুনিয়র, জন্মনিবন্ধনের সনদে এই নামেই নিবন্ধিত জন ডেনভার। বাপের নামও ওইটাই; ব্রিটেনে-অ্যামেরিকায় এই জিনিশ দেখা যায় যে একমাত্র/প্রথম পুত্রসন্তানের নাম রাখা হয় পিতৃপুরুষের/পিতৃব্যপুরুষের নামে, যেমন বিল ক্লিন্টনের বাপের নামও বিল ক্লিন্টন অথবা বাপ-পুত্র জর্জ বুশ। জন ডেনভার পরে যখন য়্যুনিভার্সিটি যান উচ্চতর শিক্ষাগ্রাহক হিশেবে, টেক্সাস প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন স্থাপত্যবিদ্যায় বিদ্বান হবার মানসে, সেই-সময় তিনি শিক্ষাদীক্ষার চেয়ে ব্যান্ডে গানবাজনা পার্ফোর্ম করার দিকে ঝুঁকে পড়েন এবং পাহাড়ের প্রতি প্যাশনবশত পিতৃদত্ত নাম পাল্টে ডেনভার নামধারণ করেন। সেই থেকেই তিনি জন ডেনভার, পরবর্তীকালে যিনি পৃথিবী প্রোজ্জ্বল করে তুলবেন তার সুর ও গায়কী দিয়া, পাহাড়প্রেমেই যিনি নিত্য মশগুল রইবেন, আকাশে হেলান দিয়ে ঘুমজড়িমা পাহাড় হবে ধ্যান-জ্ঞান-গানের লক্ষ্য ও উপজীব্য যার।

জড়সড় সঙ্কুচিত এক বালক, সৈনিকস্বভাব কর্তৃত্বস্বর বাপের ধাঁতানিতে যে কি-না জেরবার-তটস্থ ও ব্যতিব্যস্ত, সংক্ষেপে ছেলেবেলায় এ-ই ছিল জন ডেনভারের চেহারা। আর ওই সময়টায় তার আত্মার দর্পণ ও সত্যিকারের বন্ধু হয়ে ওঠে একটি গিটার — দ্বাদশ বর্ষে পদার্পণমুহূর্তে গ্র্যান্ডমার কাছ থেকে পেয়েছিলেন এইটে — একটি গিবসন্ গিটার। সেই আর্মিবাপের রেজিমেন্টেড কড়াকড়িতা আর শাসনানুশাসনের নিগড়ে এই গিটারখানা, দাদিমার দেয়া বাদ্যযন্ত্রটা, বালক ডেনভারের নিকট অন্ধের যষ্টি হয়ে ওঠে। ফ্যামিলিস্মৃতি রোমন্থন করতে যেয়ে ডেনভার তার মা এমা ড্যুশেন্ডোর্ফ অথবা সহোদর ছোটভাইটিকে সেভাবে যতটা-না স্মরণ করেছেন, অনেক বেশি করেছেন তার এই গিটার-গিফ্ট-দেয়া দাদিমাটিকে এবং এই নিরুদ্ধ শৈশবকৈশোরসখি গিটারটিকে; বারে-বারে ফিরে এসেছে এই দুই চিহ্ন তার জীবনে ও গানে।

টেক্সাস টেক্নো য়্যুনিভার্সিটিতে যেয়ে আর্মিডিসিপ্লিন্যারি ফ্যামিলি অ্যাটমোস্ফিয়ারের বাইরেকার জীবনাবহাওয়ার সঙ্গে ডেনভারের পয়লা সাক্ষাৎ ঘটে। এর ফলও ফলতে দেখা যায় অবিলম্বে। ব্যান্ডের সঙ্গে বাজাতে শুরু করেন পুরোদমে, সেখানকার লোক্যাল প্রোগ্র্যামগুলোতে এন্তার শো করতে থাকেন ব্যান্ডমেইটদের সঙ্গে, শিকেয় ওঠে অ্যাকাডেমিক লেখাপড়া, গাড়িঘোড়া চড়াচড়ির সুবচন বিলকুল ভুলেই বসেন ডেনভার সুরবিহারে নেমে। একটানা আড়াই-বছর আর্কিটেকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে আধপথে, জুনিয়র ইয়ারের মাঝামাঝি, ছেড়ে দেন; শুধু গানবাজনার সুবিধে হবে ভেবে রওয়ানা হন লস্-অ্যাঞ্জেলেস্ অভিমুখে। এ-ক্লাবে সে-ক্লাবে বাজিয়ে শেষে ডেনভার গিয়া খাড়া হন অডিশনের লাইনে, ‘শ্যাড মিশেল ট্রায়ো’ তখন ভোক্যাল্ হান্ট করছিল মিশেলের রিপ্লেসমেন্ট হিশেবে, ডেনভারের এইখানেই বিগ-ব্রেইকটা আসে; আড়়াই-শতাধিক অডিশনার্থীদের মধ্যে ডেনভারের কপালে লেগে যায় ভি-চিহ্ন; যদিও ওইদিন ঠাণ্ডালাগাজনিত কারণে ডেনভারের গলা ছিল বসানো-ধসানো ও গাইবার-পক্ষে-প্রতিকূল; মিল্ট ওক্যুন, ‘ট্র্যায়ো’-র রেকর্ডপ্রোডিউস্যর এবং পরবর্তীকালে ডেনভারের অ্যালবামপ্রযোজক, “ডেনভারকে সেদিন ভয়াবহ বিদঘুটে শোনাচ্ছিল” বলে সেইদিনের অডিশনের স্মৃতিচারণ করেন, সঙ্গে এ-ও যোগ করেন, “কিন্তু আমার মনে ধরেছিল বিশেষভাবেই তার পার্সোন্যালিটি। হি ওয়াজ্ ফ্যুল অফ লাইফ, অসম্ভব জীবনবন্ত মনে হয়েছিল ওকে। শ্যাডের কণ্ঠকোয়ালিটি যেমনটি ছিল, অতটা ভালো গলা ডেনভারের না-থাকা সত্ত্বেও ওইদিন রৌদ্রকরোজ্জ্বল করে তুলেছিল অডিশনকক্ষটিকে ডেনভার একলাই। হি লিট্-আপ্ দ্য রুম।” প্রণিধানযোগ্য বটে এই কথাটা। নাথিং এক্সট্রাঅর্ডিন্যারি, নাথিং নিউ, তবু উজ্জ্বলালোকিত করে তোলেন ডেনভার গলার স্পন্টেনিটি দিয়া তার চারিপাশ, নিতান্ত অর্ডিন্যারি গলা দিয়াই বিশ্বচরাচর করে তোলেন সানশাইনি তিনি।

পাক্কা আড়াই-বছর পার্ফোর্ম করেছেন ‘মিশেল ট্রায়ো’ গ্রুপে, সেইটা ছিল মধ্যষাটে সংঘটিত লোকগানের রমরমা টাইম, মিড-সিক্সটিজে ফোক এক্সপ্লোশন, জন ডেনভার ওই আড়াই-বছরে আয়ত্ত করেছেন প্রোফেশন্যাল স্টেজক্র্যাফ্ট এবং স্যং-রাইটিং প্রভৃতির খুঁটিনাটি। ‘লিভিং অন অ্যা জেটপ্লেইন’ ওই-সময়ে লেখা ও সুর-করা তার ফার্স্ট হিট, টপচার্টের নাম্বার ওয়ান অধিকৃত করে রেখেছিল অনেকদিন গানটা, গাওয়া অবশ্য ‘পিটার, প্যল্ অ্যান্ড ম্যারি’ গ্রুপটার; পরে এইটে ডেনভারকেও গাইতে দেখব আমরা একাধিক অ্যালবামে। এক-পর্যায়ে, ১৯৬৮ সালে, ‘মিশেল ট্রায়ো’ গুটায়ে গেলে ডেনভার নিজের ক্যারিয়ার গোছাতে বেরিয়ে পড়েন, ধর্মপত্নী অ্যানিকে নিয়া অ্যাস্পেনে বাসস্থানান্তরিত হন এবং গোড়ার দিকটায় সেখানকার কলেজ-কন্স্যার্টগুলোতে, সোলো-পার্ফোর্মিং ক্লাব-পাবগুলোতে, গেয়ে বেড়ানো শুরু করেন; এইবার নিজের গানরচনা ও সুরসৃজন সমানতালে চলতে থাকে, হ্যান্ডস্ যারা তার সঙ্গে সঙ্গত করতেন, তাদেরকে ডেনভার নিজের গানের সঙ্গে ইন্ট্রোডিউস্ করিয়ে নিতে থাকেন, পুরোদস্তুর নিজের কথাগুলো-সুরগুলো শ্রোতা-পার্টিসিপেটরদের সামনে নেয়ার ব্যাপারে ডেনভার ক্রমেই নির্দ্বিধ হতে থাকেন এই-পর্যায় থেকেই; শিগগিরই, একটু-একটু করে অবিলম্বে, অ্যাপিলিং আর্টিস্ট এবং ‘অ্যা নাইস্ ইয়াং ম্যান’ হিশেবে বেশ নামডাক হয় ডেনভারের। জীবনপর্বে এই সময়টার স্মৃতি ফিরিয়ে এনে বেশ-একটা প্রাউড গলায় ডেনভার অনেক-বাদে এক ইন্টার্ভিয়্যুতে বলেন, “আই ওয়াজ্ ইনভাইটেড ব্যাক টু এভ্রি সিঙ্গল ক্যাম্পাস অন হুইচ আই পার্ফোর্মড্।”

দুইটা ক্লাইম্যাটিক ব্রেক-থ্রু ঘটে ডেনভারক্যারিয়ারে; — এর মধ্যে একটি হচ্ছে ‘টেইক মি হোম কান্ট্রিরোডস’ গানটা, যেইটা ট্যাফি ড্যানোফ ও বিল ড্যানোফের সঙ্গে ডেনভারের সামবায়িক সৃজন, ডেনভারের নিজস্ব রেকর্ডিং হিশেবে এই গানটাই প্রথম একলাখ বিক্রির দাগ পার হবার গরিমা অর্জন করে; যে-ব্যাপারটা আরও অধিকতর দিশা পাল্টায়ে দেয় ডেনভারক্যারিয়ারের, সেইটে হচ্ছে সেকালে-ইমার্জিং জেরি ওয়েইনট্রবের সঙ্গে ডেনভারের গানব্যবসায়িক গাঁটছড়া — যিনি ডেনভারের ম্যানেজার, আজীবনের বন্ধু এবং ‘জন ডেনভার’ নামে আবিশ্বপরিচিত ফেনোমেনাটার স্থপতি। এরপরের ঘটনাবলি দিগ্বিজয়ী এক অশ্বারোহীর, সুর দিয়ে যে মৃগয়ারণ্যে বসিয়েছে প্রেমপরিপ্লুতা বাঘ ও হরিণ পাশাপাশি।

শৃঙ্খলাপ্রাধান্যদর্পী পিতার কড়া শাসনে শৈশব খোয়া গিয়েছিল যে-বালকটির, বাকি জিন্দেগি সে গানে গানে তার শৈশব খুঁজে বেড়িয়েছে, তল্লাশিয়া ফিরিয়াছে তার হারানো কৈশোর বনে-বনান্তরে এবং বুনো-পাহাড়িয়া ভালোবাসায় ভিজিয়ে রেখেছে সে তার গানের বাণীশরীর। পরবর্তীকালে সেই কিশোরকালে-উপহার-পাওয়া গিটার, দাদিমার সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো ও মুখর স্মৃতিনিচয়, ডেনভারের গানে একাদিক্রমে স্পেস্ করে নিচ্ছে দেখা যাবে। গ্র্যানির মেমোরি উপজীব্য করে একাধিক গান রয়েছে ডেনভারের, এর মধ্যে একটা ‘দাদিমার পালকবিছানা’ সবিশেষ উল্লেখযোগ্য, এমনকি ডেনভারের নিত্যসঙ্গী দৃষ্টিবন্ধু চশমাটাও বুড়ি দাদিমার আদল এনেছে তার অবয়বে, হেনস্থাও হয়েছেন সংবাদজীবী নৃশংস সংগীতবোদ্ধা ভাম ও ভদ্দরনোকদের হাতে এই বৃদ্ধাসদৃশ চশমা পরিধানের জন্যে, ডেনভার চোখ থেকে চশমা নামান নাই।

নিজের এই নিখোঁজ/অর্ধলব্ধ শৈশবের জন্যেই হয়তো সংসারজীবনে এত ঘরপ্রিয়/গৃহ-উদগ্রীব ছিলেন এই শিল্পী। নতুবা অ্যামেরিক্যানদের মধ্যে, তদুপরি দি-টপ-মোস্ট সেলেব্রেটি, এত ঘরপূজারী ডেনভারের হবার কথা না। ডালপালা প্রসারিয়া, ছায়া বিস্তারিয়া, শেকড় গভীর-গহন মাটিতে পুঁতিয়াই তিনি যাপন করে গেছেন সংসার। আশ মিটিল কি না, বা না-মিটিতে আশা ভাঙিল খেলা কি না, তা অবশ্য চুয়ান্নবছর ব্যাপ্তিকালের জন্যে জোরালো জবাবের কোনো প্রশ্ন নয় নিশ্চয়।

সরলা দাদিমা আর পরানকথার গন্ধমাখা গানের খাটপালঙ্ক

আমাদের ঠাকুমাদের, আমাদের দাদিদের, উপজীব্য করে লেখা গান বা কবিতা বাংলায় খুব-একটা আছে বলা যাবে না। বাংলা ছায়াছবিতে এক-ধরনের ফানমেইকিং আইটেম হিশেবে দাদি ক্যারেক্টারটা দেখা গেলেও যত্ন ও মমতা নিয়ে দাদিমাকে আঁকা হয় নাই সেভাবে। কদাচিৎ ইন্ডিরেক্টলি কবিতায় — যেমন জসীম উদদীনের কবিতায় “ওইখানে তোর দাদির কবর ডালিম গাছের তলে” ইত্যাদি বা তার নকশিকাঁথা-সুজনবাদিয়া নাট্যাখ্যানে বা তার ‘বউ টুবানির ফুল’ উপন্যাসে পেয়েছি দাদিকে কাহিনির পার্পাস সার্ভ করার কাজে, কিন্তু এইগুলোও ঠিক দাদিমা ক্যারেক্টারটার পুরামাত্রার রোয়াব প্রকাশ করে না। শিশুসাহিত্যে, রূপকথায়, লোকোপাখ্যানে অবশ্য দাদিমা তার লড়াই-সংগ্রাম-মমতা-নিষ্ঠুরতা নিয়াই হাজির রয়েছেন তুলনামূলক ভালোভাবে।

একটা গান, বা এইটা আসলে গল্পও, ম্যুভি/সিনেমা বলতেই-বা আপত্তি কিসে, এইখানে সেঁটে দিচ্ছি। ক্রিয়েট করেছেন জন ডেনভার। আমাদের শৈশব ও আমাদের দাদিমাদের নিয়াই তো গোটা জীবনের সবচেয়ে ঝলমলে এপিসোড রচিত, কাজেই গানটা আমাদেরকে ঝলমলে করে তুলতে পারে, আমাদের অনেকেরই শৈশব অল্পকিছু মোটিফ এদিক-ওদিক করে নিলে ডেনভারের মতনই তো। শুনে দেখা যায়, এমনকি পড়লেও তো ক্ষতি হয় না। গানটা আত্মজৈবনিক, শিল্পীর অটোবায়োগ্র্যাফিক প্রচুর রেফ্রেন্স/ইনগ্রেডিয়েন্টস্ এই গানে যায় পাওয়া, গানের শীর্ষনাম Grandma’s Feather Bed, নিম্নে টেক্সট পুরোটুকু প্রোভাইড করা গেল :

When I was a little bitty boy, just up off a floor, we used to go down to
Grandma’s house every month end or so.
We’d have chicken pie and country ham, homemade butter on the bread.
But the best darn thing about Grandma’s house was her great big feather bed.
It was nine feet wide, and six feet high, soft as a downy chick
It was made from the feathers of forty-eleven geese,
took a whole bolt of cloth for the tick.
It’d hold eight kids and four hound dogs and a piggy we stole from the shed.
We didn’t get much sleep but we had a lot of fun on Grandma’s feather bed.

After supper we’d sit around the fire, the old folks would spit and chew.
Pa would talk about the farm and the war, and Granny’d sing a ballad or two.
I’d sit and listen and watch the fire till the cobwebs filled my head,
next thing I’d know I’d wake up in the morning
in the middle of the old feather bed.

It was nine feet wide, and six feet high, soft as a downy chick
It was made from the feathers of forty-eleven geese,
took a whole bolt of cloth for the tick.
It’d hold eight kids and four hound dogs and a piggy we stole from the shed.
We didn’t get much sleep but we had a lot of fun on Grandma’s feather bed.

Well I love my Ma, I love my Pa, I love Granny and Grandpa too.
I been fishing with my uncle, I ras’led with my cousin, I even kissed Aunt Lou,ew!
But if I ever had to make a choice, I guess it oughta be said
that I’d trade ’em all plus the gal down the road for Grandma’s feather bed.
I’d trade ’em all plus the gal down the road…
I’ll have to reconsider ’bout the gal down the road:

It was nine feet wide, and six feet high, soft as a downy chick
It was made from the feathers of forty-eleven geese,
took a whole bolt of cloth for the tick.
It’d hold eight kids and four hound dogs and a piggy we stole from the shed.
We didn’t get much sleep but we had a lot of fun on Grandma’s feather bed.
We didn’t get much sleep but we had a lot of fun on Grandma’s feather bed.

ডেনভার তার ছেলেবেলার অনেক গুমর ফাঁস করছেন এইখানে, এমনকি তা আমাদের ন্যায় একান্নবর্তী গিরস্তসংস্কৃতির সেমি-আর্বান অর্ধগেঁয়ো-অর্ধশহুরে দেশের দশক-দুই-পূর্বেকার শৈশবস্মৃতির সনে খাপে-খাপ না-হইলেও অনেকটাই মিলিয়া যায়। নিউক্লিয়াস ফ্যামিলি, ন্যানো পরিবার, ইত্যাদি তো সবেমাত্র প্রবেশিল বঙ্গমুলকে; — সেইসঙ্গে একতা কাপুরের স্যোপ-অপেরার কূটকচালভরা দাদিমারা। আগেকার দিনে এমন ছিল না হে, একতা কাপুর দিয়া মার্কেসগল্পের চেয়েও বৈভবভরা আমাদের দাদিমাদিগেরে ম্যেজার করতে যেওনাকো, বুঝলা ভায়া! কাকা/মামার সনে মাছ-ধরা, কাজিনদের সনে কুস্তি, দিনভর মাস্তি, এমনকি ছোটফুপি/খালামণিকে পিচ্চিবেলার প্রথম-পাপমনে চুমু করে ফেলা — গানে ডেনভার স্বীকার করছেন; বেশ তো, সদৃশ না? আর এইসব, সমস্তকিছুই, অব্লিভিয়্যনে গেলে ডেনভার সইবেন, এমনকি খিড়কি-লাগোয়া সাগরিকা ছায়াছবির নায়িকাচেহারার ন্যায় মিষ্টিশোভা মনোনীতাটিকেও জলাঞ্জলি দিতে নিমরাজি হয়ে যাবেন শিল্পী, কিন্তু গ্র্যান্ডমার ফিদারবেড হাতছাড়া করতে একদম নারাজ। আর আমাদের দাদিমার গোটা গতরখানাই কি ছিল না আমাদের জন্য পাখিবিছানা, পালকের ওম ও উষ্ণতাবাহী, তাতে লেগে থাকত না শ্যাওলাঘ্রাণের জলসবুজাভা আর পৌরাণিক কিচ্ছাকাহিনি-গীতালেখ্যসৌরভ?

এই বয়সে এসে বুঝতে পারি যে, আমাদের দাদিদের জেনারেশন অনেক বেশি আনপ্রেডিক্টেবল্, অন্তত আজকের যুগের নারীদের তুলনায়, অনেক বেশি রেক্লেস্, অনেক বেশি সিদ্ধান্তগ্রহণক্ষম ছিল। অপার সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ওই পরিসরটুকু করে নিতে পারতেন তারা। আজকে যেমন কর্পোরেট-কন্ট্রোল্ড উওম্যান এন্ট্রাপ্রেন্যুয়ার্শিপ দেখতে পাই, সেই জিনিশটা আগাপাশতলা যত বুক্নি, আমাদের দাদিযুগের উদ্যমী-ও-উদ্যোক্তা-হয়ে-ওঠা ব্যাপারটা ন্যাচারাল ছিল অনেক বেশি, জেন্যুয়িন ছিল অনেক। মুখে মুখে দাবি আদায়ের ধুয়া, অধিকার ফলানোর বারফট্টাই, সোয়ামির নিকট আব্দার করে পাওয়া বা না-পাওয়াজনিত ফোঁপরা-ফাঁপা আওয়াজ, ফুলে-ফুলে-ঢলে-ঢলে ফেমিনিজম প্রভৃতি ছিল না, তা মানছি। কিন্তু আমাদের দাদিরা, আমরা দেখেছি, অধিকারচিৎকার না-করে অধিকারচর্চা করেছেন চুপকে-চুপকে, যেই ডিউটি নিজেরা ভালো পারেন কম্প্যারেটিভলি সংসারের অন্য সদস্যের চেয়ে, সেই ডিউটি পালন করে গেছেন প্রয়োজনে গঞ্জনা সয়ে হলেও, অনুশীলন করেছেন আপন দক্ষতার, একসময় ঈগল-সিংহের চেয়েও মহাপরাক্রমশালী কর্তাব্যক্তি স্বামীও এন্ডোর্স করে নিয়েছেন অ্যাক্নোলেজ্ করেছেন তার সেই এক্সার্সাইজ্, অ্যাক্নোলেজ্ করতে বাধ্য হয়েছেন, নানান এক্সপ্রেশন দিয়া সংসারের আর-দশজনও সেই নারীর এক্সপার্টাইজ্ স্বীকার করেছেন, নির্ভর করতে বাধ্য হয়েছেন করিৎকর্মা সেই নারীটির উপর। এইভাবে আমাদের দাদিরা তাদের অবস্থান করে নিয়েছেন বিপুলায়তন সংসারের অলমোস্ট কেন্দ্রে, একদম সংসারকেন্দ্রেই আসলে, ইভেন জমিজিরেত সামলানোর ন্যায় বাইরেকার জগতেও উনাদের দাপট ছিল দেখার মতো। দেখেছি এইসব, তখন-তখনই বুঝেছি এমন না, আজ বুঝতে পারি সেসবের মর্মার্থ।

কয়েকটা শব্দের তো খুব চল আমাদের মডার্ন সমাজস্পেসে, দেখে চলেছি বুঝ হবার পর থেকে, যেমন — স্বাবলম্বন, স্ব-ক্ষমতায়ন, স্বাধিকার ইত্যাদি। এইসব শব্দ যখন আমাদের কানে ও মগজে ঢুকতে শুরু করেছে, এবং ফুটতে শুরু করেছে খৈয়ের মতন মুখে আমাদিগের, তখন এইসব শব্দের কোনো দৃষ্টান্ত সেভাবে আমাদের নয়নসমুখে ব্যাপ্ত সমাজের চলনবিলে কোথাও হাজির ছিল বলা যাবে না। থাকলেও টর্চ জ্বালিয়ে দেখার মতন আবডালে এক-দুই উদাহরণ কেবল। অথচ এইসব জার্গনমার্কা শব্দের জন্মের আগে থেকেই আমাদের দাদিরা ইত্যাকার শব্দনিহিত এসেন্স ও গুণাগুণ তাদের  জীবনাচরণে তাদের যাপনে কেমন স্বভাবজারিতভাবে ব্যবহার করে চলেছিলেন, এইটা খেয়াল করার মতো। তখন শব্দগুলো ছিল না সোচ্চার, তবে দৃষ্টান্তগুলো ছিল চোখের সামনেই। কিন্তু অবাক লাগে ভাবতে যে, আমাদের সেইসব দাদিদের মধ্যে কেউ তো অক্ষর পেটে নিয়া সংসারযাপন করেননি। বেশি-থেকে-বেশি কেউ কেউ হয়তো কেবল দৈনিক পত্রিকাটা বাংলায় বানান করে পড়তে পারতেন, টিভিস্ক্রলগুলো বা নাটকের নামটা পড়ে ফেলতে পারতেন, সময় নিয়া নিজের নামটাও সই দিতে পারতেন জমির দলিল বা ব্যাঙ্কের চেকবুকে। এই বিদ্যা নিয়া তারা যা করে গিয়েছেন, তাদের সেই অ্যাক্টিভিটিলিস্ট দেখলে আজকের সোশ্যাল অ্যাক্টিভিস্টরা মাথা খানিক নমিত করবেন বললে বেশি তো বলা হয় না। একগাদা ছেলেমেয়ে একা-হাতে বড় করেছেন, সংসারের বিরোধ ভঞ্জন করেছেন, জিইয়েও রেখেছেন অনেক, সেসবের সঙ্গে বিবদমান ভেস্টেড ইন্টারেস্ট গ্রুপগুলোকে দাবড়িয়ে রেখেছেন, বংশের মানসম্মান ও গ্রামের দশজনের বিচার-অনাচার নিয়াও সোচ্চার হয়েছেন। সবকিছু মিলিয়ে এক বর্ণাঢ্য লাইফ কাটায়ে গেছেন তারা। কারো প্রতি অনুযোগহীন চুপকে-চুপকে এক সত্যিকারের লড়কে-লেঙ্গে লাইফ। মর্যাদার, সাহসের, সঞ্জীবনের।

আমাদের দাদিদের জেনারেশন লক্ষ করলে একটা ব্যাপার চোখে পড়বে যে, এদের বেশিরভাগেরই বৈবাহিক জীবনকালের মধ্যভাগে এসে বা প্রারম্ভিক অধ্যায়েই স্বামী পরলোকগত। বয়সব্যবধান তো আধাআধি স্ত্রী-স্বামীতে, কাজেই যাবার বেলাটার ফাঁকও হইত অনেক প্রকাণ্ড। বলছি না যে এইটাই একমাত্র ফ্যাক্টর আমাদের দাদিদের ব্যক্তিবিকাশের পেছনে, তবে এইটা একটা কারণ তো বটে। আমার মনে হয় এইটা একটা বড় কারণ। নিজের সংসারের ভার নিজের কাঁধে নিয়েছেন প্রয়োজনেই, শখে নয়, ফলে সাচ্চা ও স্বাভাবিক হয়েছে দায়িত্ব পালন। কৃত্রিমতা ছিল না তাতে, প্র্যাক্টিক্যাল পুরাটাই, দেখানোপনা বা নাসিক্য ক্রন্দনধ্বনির কোনো মেলোড্রামাও ফলে ছিল গরহাজির। আজকাল উওম্যান এম্পাওয়ার্মেন্ট যারা মাপজোখ করেন, হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইন্ডেক্সিং করেন যারা, তারা আমাদের দাদিমা তথা ঠাকুমাদের যাপিত জীবনের স্টোরিগুলো সংগ্রহ করে ইন্ডিকেইটর সেট করতে পারেন, বেঞ্চমার্ক ধরতে পারেন ওই নারীদের যাপনের অগ্রগমন-পশ্চাদপসরণের ফিডব্যাকগুলো।

সৈয়দ হকের অটোবায়োগ্রাফির দুইটা পর্ব আমাদের হাতের নাগালে আছে। প্রথম পর্ব প্রণীত জীবন  ও দ্বিতীয় পর্ব তিন পয়সার জ্যোছনা । প্রথম পর্ব জুড়ে তিনি তাঁর মায়ের জীবনের যে-ছবিটি এঁকেছেন, আমি জিন্দেগিতে ভুলব না। সেখানে একটা জায়গায় সৈয়দ হক বোল্ডলি বলছেন যে, তিনি দ্বিধাহীন এই সাক্ষী দিতে পারেন পরিণত বয়সে এসে, তাঁর পিতার মৃত্যুর পর তিনি তাঁর মাকে পরিপূর্ণ ব্যক্তি হিশেবে ডানা মেলতে দেখেছেন। পিতার বর্তমানে তার মায়ের যে-জীবন তিনি কালিতে বা কিবোর্ডে এঁকেছেন, সেই নিষ্ঠুর অথচ দরদী চিত্র দ্বিতীয়বার বর্ণনা আমার পক্ষে মনে হয় না সম্ভব। কিন্তু পাঠক মাত্রই বইটা পড়ে এই কথাটা স্বীকার যাইবেন যে, আমাদের জেনারেশন অব্দি নিজচোখে-দেখা মায়েদের জীবন তো এইটাই। স্বামীর ভালোবাসা-শাসন-সোহাগে চোখ-তুলিয়া-তাকাইবার ফুরসত না-পাওয়া এক জীবন। তো, আমাদের দাদিদের বিকাশ বুঝবার ক্ষেত্রে এই বইটা পাঠোপকরণ হিশেবে ভীষণ ভালো।

আমাদের দাদিরা যেই ফ্রিডম ভোগ করেছেন, আমাদের মায়েদের যুগে সেই ফ্রিডম অর্ধেকের নিচে নেমেছে, এরপর কি হইল না-হইল তা জানেন এনজিও-উদ্যোগপতি ও সমাজবক্তিমাবাজগণ। আমরা যা জানি, তা বলতে আপত্তি নাই, স্পন্সর পাইলে রেলগাড়ি চালাইতে চেষ্টা করব স্মৃতি-সত্তা-বর্তমান ও ভবিষ্যতের ইশটিশন জুড়ে। এইখানে নিতান্ত প্রসঙ্গ এইটুকু যে, এই দাদিমাদিগেরে আমরা আমাদের গানে পাই না, আমাদের কবিতায় পাই না, নাটকে পাই না, ছায়াছবিতে পাই না, পূর্ণ-স্বল্প কোনো দৈর্ঘ্যেরই কোনো উপন্যাসে-গল্পে পাই না। আমাদের সাহিত্য যুগ-যুগান্ত ধরে করেটা কি তাইলে? ভেরেণ্ডা ভাজে? সেইটাও যদি ঠিকঠাক পারত তবে তো কথা ছিল না। “প্রাণে গান নাই মিছে তাই রবিঠাকুরমূর্তি গড়া” — আমাদের সাহিত্যে ‘একতা কাপুর এন্টার্টেইনমেন্ট কোম্প্যানি’-র দেশের নকলনবিশি হাইলি রেপ্যুটেড, প্রাইজম্যনি-শংসাপত্র-উত্তরীয় বরাদ্দ উহাদের তরে, তরুণ কবিটিও বুড়োদের আচরণ করে, আর বুড়ো অণ্ডকোষভাণ্ড কবিরা কাঁটাবনে-ইস্কাটনে রেস্লিং-স্যুমোকুস্তি লড়ে, ছেচল্লিশে এসেও নব্বই দশকিয়া ন্যাকামি তিরোহিত হয় না নকলনবিশ ইম্যাচিয়্যুর বুকরিভিয়্যুয়ারের! এ-ই আমাদের ষড়ঋতু, অপরূপা বাংলা সাহিত্য।

আমরা কি ভুলিয়া যাইব আমাদের দাদিমাদের? আমরা কি বছরের এ-মাথা ও-মাথা একবারটিও স্মরণ করব না তাদের? করব, করতে পারি, ইউনিলিভার দিলে ডাক, অন্তত কোনো মুঠোফোনকোম্প্যানি। ইংরেজি একটা গানসূত্রে, ডেনভার কথানুষ্ঠানে, হেন প্রত্যয়ে শুখো-গলায় সমস্বরে বলিনু, — ত্রয়ী উল্লাস! — পোস্টমডার্ন পুষ্টিহৃষ্ট কবি-সাহিত্যিকের মর্দামো দারুর তারতম্যে ওঠে আর নামে, কামেকম্মে নিকাম্মা নাড়ুগোপাল অলমোস্ট বইরিভিয়্যুয়ার কবিছেলেবুড়ো সব-কয়টাই। কিন্তু, কোয়েশ্চন হলো, ক্ষমতা কোথায় থাকে? — এই প্রশ্নের উত্তর নিশ্চয় মিশ্যেল ফ্যুকো জানেন; এবং জানতেন, সম্ভবত, আমাদের দাদিমাগণ। ক্ষমতা থাকে চুপানোতে, ক্ষমতা থাকে ক্ষমতা-না-দেখানোতে, শো-আপে না-যেয়ে নিজের কাজটা আপনমনে করে যাওয়াতে; জাহিরিপনায় এম্পিরর লহমায় ক্লাউন হয়ে যেতে দেখিনি কি আমরা অতীতে বহুবার? পোশাকপ্রদর্শনেচ্ছু উলঙ্গ রাজার কিচ্ছা আমরা নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী পড়ার অনেক আগে আমাদের দাদিমার কাছেই শুনিনি কি? সেই শিক্ষক দাদিমা, দার্শনিক দাদিমা, আমাদের গানে নেই — প্রাণেই তো নেই আজকাল আর, প্রাণে থাকলে তো গল্পে-গানে এক-না-একভাবে সে আসত; তবে ডেনভারের গানে এই দাদিমাকেই ফিরে-ফিরে পাই — পৃথিবীতে আমাদের প্রথম টিচার, প্রথম মেন্টর, প্রথম ফিলোসোফার দাদিমাকে।

কিছুদিন সুখে যায় কিছুদিন শোকে

এমন নয় যে একেবারে খাপে খাপ মিলিয়ে দেখা যাবে, এমন সবসময় ঠিকও হয় না গানের সনে নানা ব্যাপার টানা, এরপরও দেখবেন যে একটা গান বা কবিতা বা একটা গল্প টেনে আনে যাপিত জীবনের অন্য অনেক অভিজ্ঞতার অংশবিশেষ। যেমন একটা গান প্রায়শ টেনে আনে আরেকটা গানের শ্রবণাভিজ্ঞতা। পাশাপাশি মিলিয়ে হয়তো শুনি না আমরা, কিন্তু কোথাও অনুষঙ্গগুলো এবং যোগসূত্রটা ঠাহর করা যায়। আর কোথাও-না-কোথাও, কোনো-না-কোনোভাবে, যোগসূত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারি বলেই আমরা আনভাষার একটা গান বা গল্প নিজের মতো সমঝিয়া লই। অনুবোধন এবং অনুধাবন প্রক্রিয়াটা আদৌ সম্পন্ন হয় না যোগসূত্রায়ন ব্যতিরেকে; রেফ্রেন্সের এক অনিঃশেষ খেলার ব্যাপারটা যাবতীয় বোঝাপড়ার নেপথ্যেই ক্রিয়াশীল। উপভোগের ব্যাপারটা আদ্যোপান্ত পূর্বসূত্রায়িত। স-চেতনায় সেইটা না ঠাওরাইতে পারলেও। বোধগম্য হবার আগে একটা গান বা কবিতা আচ্ছন্ন করবে, সংক্রামিত হবে অনুভূতিদেশে, সেক্ষেত্রেও সুরের বা ভাবের একটা সামীপ্য অ/অব-চেতনে রেফ্রেন্স হিশেবে থেকে যায়।

ডেনভারের একটা গান প্রসঙ্গত উৎকলন করা যাক। অন্য কোনো শিল্পীর, আপনার শ্রবণাভিজ্ঞতাভুক্ত যে-কোনো শিল্পীর, গান হাতে নিয়া সাধারণভাবে এই পরীক্ষাটা করে দেখতে পারেন। দেখবেন যে অ্যা-প্রায়োরি বিনে, রেফ্রেন্সেস্ ব্যতিরেকে, একপা আগানোও সহসা যায় না। ব্যতিক্রম থাকতে পারে; ব্যতিক্রম তো টপিক্ হবার নয় এখানে। অ্যানিওয়ে। ডেনভারের যে-গানটার কথা ভাবছিলাম, সেইটা আগে প্লে করি। ‘সাম্ ডেইজ্ আর ডায়মন্ড’ নামেই গানটা পরিচিত। পরিণত ক্যারিয়ারের শেষদিকে ডেনভারের যে-গানগুলো বলা যায় অ্যামাং দ্য বেস্ট, এই গানটা তাদের মধ্যে একটা। বেশি দীর্ঘ নয়, আস্থায়ী দুই স্তবক আর অন্তরা আছে বার-তিনেক পুনরাবর্তিত : “Some days are diamonds, some days are stone / Some times the hard times won’t leave me alone / Some times the cold winds blow a chill in my bones / Some days are diamonds, some days are stone” — এই রিফ্রেইন্ ছাড়া গানের মুখটুকু হলো : “When you ask how I’ve been here without you / I like to say I’ve been fine, and I do / But we both know the truth is hard to come by / And if I told the truth, that’s not quite true”, এবং এরপরে একটাই প্যারা : “Now the face that I see in my mirror, more and more is a stranger to me / More and more I can see there’s a danger in becoming what I never thought I’d be” — এইটুকুই গান। সিম্পল্ কিন্তু কম্প্যাক্ট। সম্পূর্ণত জন্ ডেনভার ফ্লেভ্যরটা পাওয়া যায় গায়কী এবং সুরসংশ্রয় থেকে। একেবারে চূড়ায় ওঠে গলা, আবার সমুদ্রমধ্যভাগে যেন সমাহিতি পায়, খাদে নামে না একবারটিও। যদিও মন্দ্রিত গলা থাকে যেখানে-যেমন-প্রয়োজনীয় ওঠানামা সমেত। অপেরা গায়কী দিয়ে ডেনভারের গান এইটাই একমাত্র নয়, আরও আছে।

এই গানের সঙ্গে তুলনীয় পঙক্তির কবিতা বাংলাদেশে এবং ইন্ডিয়ায় একাধিক পেয়েছি সিক্সটিজের কবিদের মারফতে। যেমন মহাদেব সাহার একটা কবিতায়, ‘চাই বিষ অমরতা’ কাব্যগ্রন্থভুক্ত, সিমিল্যার কিছু পঙক্তি : “কিছুদিন শোকে ছিলাম, মোহে ছিলাম, কিছুদিন নারীতে / শোকাচ্ছন্ন ছিলাম / … কিছুদিন শিশুর গন্ধ, কিছুদিন দীর্ঘ দাহ, কিছুদিন / অধীনতা / … আমি কোনো মূর্তি চাই না / আরো কিছুদিন চন্দ্রাসক্ত, আরো কিছুদিন ঘুমিয়ে পড়বো / আরো কিছুদিন।” শুধু মহাদেব সাহা নয়, এমন পঙক্তি সিক্সটিজের আরও কবির হাতে অ্যাভেইলেবল্। শক্তির যেমন, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের, রয়েছে একই ধাঁচের উচ্চারণসম্বলিত কবিতা। গানটার ফ্লাইট মনে হয় এখানে-উদ্ধৃত কবিতার চেয়ে বেশি দূরডানা বিস্তারী।

ঠিক একইভাবে একটা বাংলা গানের মুখড়াটুকুর সঙ্গে ডেনভারের এই গানের গীতিবলয়ের কিঞ্চিৎ সাদৃশ্য খুঁজে পেয়ে একটা আত্মীয়তার আনন্দ হয়। একটা ছায়াছবির গান। নব্বইয়ের দশকের মধ্যভাগে বাংলাদেশের অভিনেতা আলমগীর এবং ইন্ডিয়ার জয়াপ্রদা জুটি বেঁধে সেই সিনেমায় পার্ট করেছিলেন। কুমার শানু এবং কবিতা কৃষ্ণমূর্তি ডুয়েট। ছবিটার নাম মনে নাই, কিংবা সুরকার-গীতিকার প্রভৃতি তথ্যও অজানা আমার। সম্ভবত যৌথ প্রযোজনার নাম ভাঁড়িয়ে একটা বাংলাদেশী সিনেমা। গানের সূচনালাইনদ্বয় এমন : “আগুনের দিন শেষ হবে একদিন / ঝরনার পাশে গান হবে একদিন” … কিন্তু পরের পঙক্তিগুলো সুরে-চড়ানো শুনতে বেশ লাগলেও পড়তে বেজায় ক্ষ্যাত লাগে : “এ পৃথিবী ছেড়ে চলো যাই / স্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে সীমাহীন” … পরের লাইনগুলো তো অকহতব্য আরও, যদিও সুরে-ডোবানো শুনতে বেশ লাগে বলা বাহুল্য : “হৃদয়ে জ্বলছে যে বহ্নি / সে একদিন তারা হয়ে জ্বলবে / জোৎস্নায় লীন হবে অমনি / সেই আলোর পথ ধরে চলবে” … দুর্বল অন্ত্যমিল, ক্লিশে শব্দপাত, কমন সমস্যা বাংলা বাণিজ্যিক গানের। তবু অদ্ভুত যে এই গান শুনতে শুনতে খামাখাই মনে পড়ে ডেনভারের “সাম্ ডেইজ্ আর ডায়মন্ড, সাম্ ডেইজ্ আর স্টোন / সাম্ টাইমস্ দ্য হার্ড টাইমস্ ঔন্’ট্ লিয়িভ মি অ্যালোন” গানের মুখটুকু। হয় এ-রকম, হামেশাই হয়, গান শ্রবণকালীন আমাদের প্রায় সকলেরই। কেউ খেয়াল করি কিংবা কেউ হয়তো সংগীতে বিভোর হয়ে ব্যাপারগুলো লক্ষ করি না।

অবারিত মন্টানা স্কাই এবং গিফট অফ ম্যাজাই

ইন্টারমিডিয়েট অধ্যয়নপর্বে একটা চ্যাপ্টার ছিল, মনে পড়বে সেকেলে অনেকেরই, ‘দি গিফট অফ দি ম্যাজাই’ ছিল সেই চ্যাপ্টারের নাম। শর্টস্টোরি। লিখেছেন ও’ হেনরি। রাইটারের তখল্লুস্ এইটা, জেনেছিলাম তখন, আসল নাম উইলিয়্যম্ সিডনি পোর্টার। পরে এর আরও গল্পগাছা গ্রাস করেছি অবশ্য বঙ্গানুবাদে। আউটবই বদৌলতে। সেই মিষ্টি যোগাযোগসুবিধাস্বল্প গুহার আঁধার যুগে যেটুকু প্রভাতপাখিগীতিকা আমাদের মরমে এসে পশেছিল, তৎপশ্চাতে এইসব সিলেবাসভুক্ত সংকলনগুলোর ভূমিকা ভালো উল্লেখযোগ্য বলতে দ্বিধা নাই। ডিগ্রি লেভেলের কম্পালস্যারি বাংলা বইটার কথাও স্মরণ করি। সৃজনশীল পদ্ধতির নামে এখন আজিব কিসিমের তথ্যভিত্তিক প্যারাগ্র্যাফ তুলে দিয়ে বলা হয় কম্প্রিহেন্ড করো আর নিম্নলিখিত আইটেমের উত্তর লেখো। জবাব দো জবাব দো করা ছাড়া নাহিদ কোম্প্যানির সৃজনশীল প্রশ্নপত্র/পাঠ্যসূচিক্রমের অন্য কোনো মর্মসুতা আমার নারকেলঠুলিতে এখনও ঢোকে নাই।

কিন্তু তখনও আমরা ভালো গল্প খুঁজতাম না, আমাদের অনুসন্ধান ছিল ল্যভস্টোরি পড়ার দিকে। এখনও কি সিচ্যুয়েশন্ বদলেছে এই নিচু বোধওয়ালা পাঠকের ক্ষেত্রে? অ্যানিওয়ে। সেইসময় আমরা নিজেরাই নিত্য দুনিয়াকাঁপানো গল্পের জন্ম দিয়া চলছিলাম অবশ্য। যদিও ল্যভস্টোরিহিরো হবার জন্য ছুঁকছুঁক করে ফেরা সত্ত্বেও সুযোগটা পাইতে একটু অতিবিলম্ব হয়ে গেছিল পরিস্থিতির পয়মালিতে চ্যাপ্টাচিঁড়ে হয়ে। সেইসময় ইন্ডাস্ট্রিতে হিরোয়িনসঙ্কটও অনুল্লেখ্য নয় এই বিলম্বের পেছনে। যেইটার অভাব, সেইটার জন্য লোকে ঢুঁড়ে মরবে স্বাভাবিক কারণেই। আমাদের ভালো গল্পের অভাব ছিল না তৎকালিক সমৃদ্ধ উজিরমারা সাহিত্যশৈশবে, ছিল প্রণয়গল্পের অপ্রতুলতা। মায়েস্ত্রো ও’ হেনরির এই ‘দি গিফট অফ দি ম্যাজাই’ গল্পটা আজও স্মরণীয় প্রথমপাঠের স্মৃতিবিভূতিবিম্বিত। অনবদ্য প্রণয়গল্প। তখনকার আমলে প্রবেশিকা পর্যায়ে একটি ছিপছিপে টেক্সটবুক ছিল ‘ইংলিশ প্রোজ্ অ্যান্ড পোয়েট্রি কালেকশন্’ শিরোনামে পরিচিত এবং বইটা আজকাল কোথাও দেখা যায় না বাজারে কি শিক্ষকবেসাতি বিদ্যাদোকানে। এনসিটিবি প্রকাশিত বইয়ের আর্কাইভ যদি থেকে থাকে, সেইখানে একবার খুঁজে দেখলে হয়তো সন্ধান পাওয়া যাবে। এই বইয়ের একটা ব্যাপার এ-ই যে, এখানে গুটিকয় লেখার উপস্থিতিবিন্যাস ঘটিয়েই ইংরেজি লিট্রেচার বিষয়ে একটা গাধাটাইপ শিক্ষার্থীকেও উদ্যমী করে তোলা গেছিল। তবে এই নিবন্ধে হেনরিকিসসা বা পাঠ্যবইকিসসা প্রাসঙ্গিক নয়। কিসসার হিরো-হিরোয়িন্ জুটি জিম্-ডেলা প্রাসঙ্গিক নয়। বেথেলহেমের সেই খড়গাদা আস্তাবলে একটি শিশুর জন্মোদযাপনকল্পে সমবেত উপহারসমেত সপ্তর্ষির বুজুর্গ বাতচিতও নয় এইখানে রেফ্রেন্স। ঘটনাটা ডিসেম্বরের, এইটুকু শুধু উল্লেখপ্রাসঙ্গিক।

জন ডেনভারের জন্মও ডিসেম্বরে। এবং জিসাস্ ক্রাইস্টের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয় এই জন্মও। জন ডেনভার জন্মেছেন থার্টিফার্স্ট সন্ধ্যায়, ডিসেম্বর-অন্তিমদিনে, অ্যামেরিকার স্ট্রিট ও বিল্ডিংগুলোর ফ্রন্টগেটে তখন বর্ষবরণের আলোসজ্জা। ম্যাজাইদের উপহারপ্রাপক সেই শিশুটির জন্মস্থল খড়গাদাটিও ছিল অপার্থিব সন্দীপিত। উভয়ের জন্মমুহূর্তের সাদৃশ্য দীপ্তিজনিত। দুইজনেই ছিলেন সুরপ্রচারক, দুইভাবে অবশ্য, দুইয়ের সুরের প্রভাবও দূরবিস্তারী হয়েছে কালক্রমে। একজনের প্রচারণার সু এবং কু দুই ফলই পৃথিবীতে ফলেছে, ফলিয়াই চলেছে; আরেকজনের, তথা ডেনভারের, ফলবন্ত বাগানে কু ধরিবার কোনো আশঙ্কাই নাই, অনাবিল সু ফলিয়া যাবার অনন্ত সম্ভাবনা আছে।

ডেনভারের বার্থডে এলে সেই গানটা আপনার ভিতরে গুঞ্জরণ তুলবেই। ওই যে, ‘ওয়াইল্ড মন্টানা স্কাইজ্’ গানটা। মাঝে মাঝে এমনও মনে হয় যে এইটাই ডেনভারের দি বেস্ট কি না। থাক, বিচারসভায় কিংবা ভোটাভুটিপ্রহসনে না-বসি। কিন্তু গল্প বলুন কিংবা কম্পোজিশন্ বলুন, সবদিক দিয়েই এইটা আশ্চর্য সৌন্দর্যস্ফূরিত সংগীতের অভিজ্ঞতা আপনাকে দেয় প্রত্যেকবার। হিলিং ইফেক্ট তো জন্ ডেনভারের সমস্ত সুরেই রয়েছে। এইটায় এসে যেন শুশ্রূষা আরও প্রোফাউন্ড হয়েছে।

এমনিতে মনে হতে পারে এইটা ডেনভারেরই অটোবায়োগ্র্যাফিক্ স্কেচেস্ সম্বলিত। যদিও তা না। আমরা ডেনভারের জন্মতথ্য বিস্তারিত অবগত বলেই এইটা ভাবতে পারি যে এইটা আত্মজৈবনিক না। আত্মজৈবনিকতার অবশ্য রয়েছে রকমফের অনেক। কাজেই পুরোপুরি অটোবায়োগ্র্যাফিক্ না বলাটাও ভুল। জন ডেনভারের পরিবারপ্রীতি সম্পর্কে জ্ঞাত যারা, তারা এই গান জনের আত্মজীবনের না-হওয়া সত্ত্বেও অনাত্মজৈবনিক মনে করেন না। মাতৃমোনাজাতের সেই স্তোত্রপঙক্তিটুকু তো জনেরই হৃদয়ার্তি, যেখানে জন্মদাত্রী শিশুর মুখে প্রথম স্তন্য দিয়েই উন্মুক্ত উদার মন্টানানিসর্গের কাছে ব্যাকুল দোয়া রাখছেন : “ও মন্টানা, গিভ দিস্ চাইল্ড অ্যা হোম্ / গিভ হিম্ দ্য ল্যভ অফ অ্যা গুড ফ্যামলি অ্যান্ড অ্যান্ উওম্যান্ অফ হিজ্ ঔন্ / গিভ হিম্ অ্যা ফায়ার ইন্ হিজ্ হার্ট, গিভ হিম্ অ্যা লাইট ইন্ হিজ্ আইজ্ / গিভ হিম্ দ্য ওয়াইল্ড উইন্ড ফর অ্যা ব্রাদার অ্যান্ড অ্যা ওয়াইল্ড মন্টানা স্কাইজ্।”

ও’ হেনরির গল্পটা যেমন, জন ডেনভারের এই গল্পটাও, দুনিয়ার অবিস্মরণীয় ল্যভস্টোরির কাতারে উল্লেখযোগ্য জ্ঞান করি। এই দুই গল্পের একটা লাইনেও অতিরিক্ততার বালাই নাই। বিদঘুটে কেমিস্ট্রি-ফিলোসোফি-ফিজিক্স নাই। ডেনভারের জন্মদিনে ‘ওয়াইল্ড মন্টানা স্কাইজ্’ গল্পটা আদ্যোপান্ত গাই।

He was born in the Bitteroot Valley in the early morning rain.
Wild geese over the water, heading north and home again.
Bringing a warm wind from the south, bringing the first taste of the spring.
His mother took him to her breast, and softly she did sing:
Oh Montana, give this child a home.
Give him the love of a good family and a woman of his own.
Give him a fire in his heart, give him a light in his eyes,
give him the wild wind for a brother and the wild Montana Skies.

His mother died that summer and he never learned to cry.
He never knew his father and he never did ask why.
He never knew the answers that would make an easy way,
but he learned to know the wilderness and to be a man that way.
His mother’s brother took him in to his family and his home,
gave him a hand that he could lean on and a strength to call his own.
And he learned to be a farmer, and he learned to love the land,
and he learned to read the seasons and he learned to make a stand.
Oh Montana, give this child a home.
Give him the love of a good family and a woman of his own.
Give him a fire in his heart, give him a light in his eyes,
give him the wild wind for a brother and the wild Montana Skies.

On the eve of his 2lst birthday, he set out on his own.
He was 30 years and running when he found his way back home.
Riding a storm across the mountains and an aching in his heart,
said he came to turn the pages and to make a brand new start.
Now he never told a story of the time that he was gone.
Some say he was a lawyer, some say he was a John.
There was something in the city that he said he couldn’t breathe,
there was something in the country that he said he couldn’t leave.
Now some say he was crazy, some are glad he’s gone.
Some of us will miss him and try to carry on,
giving a voice to the forest, giving a voice to the dawn.
Giving a voice to the wilderness and the land that he lived on.
Oh Montana, give this child a home.
Give him the love of a good family and a woman of his own.
Give him a fire in his heart, give him a light in his eyes,
give him the wild wind for a brother and the wild Montana Skies.
Oh Montana, give this child a home.
Give him the love of a good family and a woman of his own.
Give him a fire in his heart, give him a light in his eyes,
give him the wild wind for a brother and the wild Montana Skies.

আঁটকুড়ে ডেনভার আর তার সন্তানসন্ততি

ক্লিশে শোনালেও কথাটা আদৌ অসত্য নয় যে একজন সৃষ্টিশীল মানুষের সন্তানসন্ততি প্রকৃত প্রস্তাবে তার সৃজনকর্মসমূহ। জন ডেনভারের ক্ষেত্রে এই কথাটা, বা ডাচ পেইন্টার ভিন্সেন্ট ভ্যান গ্যখের ক্ষেত্রে, আরও অধিকতর সত্য। জন ডেনভারের ঔরসজাত সন্তানাদি ছিল না, আমরা জানি, আগেও তথ্যটা জ্ঞাপিত হয়েছে যে তিনি ছিলেন স্টেরাইল। প্রজননসহায়ক ছিল না তার ঔরস। অথবা আরেকটু বড়তর পরিসরে যেয়ে একই কথাটা খানিক উল্টানোও সম্ভব; — ভুল হবে না বললে একবিন্দুও যে ডেনভারের ছিল শ-তিনেক সন্তানসন্ততি। ভীষণ গান-ও-সুরবৎসল ছিলেন এই নিমগ্ন-হাসিখুশি শিল্পী; নিজের একেকটা গান তার কাছে যেন সন্তানের মতো, — বলেছেনও কথাটা আলাপে-আড্ডায়, যেমন বলে থাকেন ক্রিয়েটিভ ডোমেইনের লোকজন হরহামেশা। কিন্তু ডেনভারের ক্ষেত্রে কথাটা স্রেফ ভাবাবেগ নয়, এইটাই সত্যি যে ডেনভার বায়োলজিক্যালি বংশবিস্তারে সক্ষম ছিলেন না; আঁটকুড়ে ছিলেন, স্টেরাইল, অথবা গানগুলোই তার শরীরী বিস্তার। দত্তক নিয়েছেন, এক নয় দুই নয়, তিন-তিনটে সন্তান। খুবই সন্তানবৎসল ছিলেন, অ্যাডপ্টেড হলেও জন ডেনভারের জীবনযাপন-গানগল্পে এই সন্তানেরা উপজীব্য হয়েছে বারবার, পিতাদায়িত্ব পালনে এতটুকু কসুর করেননি কোনোদিন।

বলা হচ্ছিল ডাচ পেইন্টার ভিন্সেন্টের কথা। ভাই থিয়ো গ্যখের কাছে লেখা চিঠিপত্রে যেটুকু খুলেমেলে ধরেছিলেন নিজেকে, সেইখানেই আমরা তার শিল্পচিন্তা-আঁকাভাবনা-যাপনক্রোধ খুঁজিয়া পাই, সেসব চিঠিপত্তর বঙ্গানুবাদনে পেয়েছি বটে। একটি চিঠিতে এমন-একটা বাক্য ভিন্সেন্ট উচ্চারণ করছেন, অন্তত বঙ্গানুবাদনে যেমনটা পাচ্ছি, তা এ-ই যে : শিল্পকে ভালোবাসলে প্রকৃত ভালোবাসা হারিয়ে যায়। এখন, এই কথাটা বাংলায় ঠিকঠাকভাবে এসেছে বলে মনে হয় না যদিও, কথাটার এ-রকম অর্থ তোলা যায় যে শৈল্পিক কামনাবাসনা কারো-কারো জৈবনিক কামনাবাসনাগুলোকে ব্যাহত করে, পরাভূত হয় জীবনমোহ শিল্পপ্রেমের কাছে। কেউ কেউ, সকলেই নয়, এমন ছিলেন আপাদমস্তকহৃদি শিল্পমগ্ন ও জৈবনিক বিচারে বেদনা-ও-নক্ষত্রমৌন। ডেনভারও, মনে হয়, অন্তিমে এই শেষোক্ত গোত্রের শিল্পী; জীবনানন্দ যেমন, জৈবনিক সন্তানাদি বিদ্যমান সত্ত্বেও।

জনন-অসামর্থ্য সনাক্ত হবার পর, ব্যাপারটা জানবার পর, হ্যান্ডল করা খানিক ডিফিকাল্ট হয়েছিল নিশ্চয়? — এহেন প্রশ্নের জবাবে প্লেবয়  ম্যাগাজিনে সেই ইন্টার্ভিয়্যুতে ডেনভার বলেন, “হ্যাঁ এবং না। হ্যান্ডল করা ডিফিকাল্ট হয়েছিল আবার তেমনকিছু কঠিন হয়নিও। অব্যাখ্যেয় হলেও অনুভূতিটা আমার হয়েছিল বছর-তেরো বয়সে প্রথম। অনুভূতিই স্রেফ, সহসা আমার এমন-একটা ফিলিংস্ হয়েছিল যে আমি নিঃসন্তান রয়ে যাব। যদিও অনুভূতিটা কারো সঙ্গে শেয়ার করা হয় নাই সে-সময়, বিয়ের পরে অ্যানিকে বলি। অ্যানিও শুনে বলে যে আচ্ছা ঠিক হ্যায় আমরা নিঃসন্তান দম্পতিই রয়ে যাই অসুবিধা নাই। কিন্তু পরে যখন উদ্যোগী হই সন্তান নিতে, বিয়ের অব্যবহিত পরের প্রাথমিক ওড়াউড়িদিনগুলো জুড়িয়ে এলে, একটানা চার-পাঁচবছর চেষ্টা চালাই, কিন্তু নাথিং ওয়াজ্ হ্যাপেনিং। একগাদা টেস্ট ইত্যাদি করাই দুইজনেই, ইন্টারেস্টিং যে দুনিয়াসুদ্ধু সব্বাই ভাবছিল প্রোব্লেমটা অ্যানির। পরিবারবর্গের সকলেই ইন-সাচ-কেইসেস্ অঙ্গুলি ওঠায় ফিমেল পার্টনারের দিকে, এক্ষেত্রেও ঘটনা তা-ই হয়েছে, এবং তারা অ্যানিকে সেপারেইটলি টেস্টফেস্ট করাইতে নিয়া যায় এবং দ্যাখে যে, না, অ্যাবসোল্যুটলি নাথিং রং উইথ অ্যানি। এরপর মাত্র পনেরো মিনিটের একটা ডাক্তারিবিদ্যার পরীক্ষায় বেরিয়ে আসে এই তথ্য/সত্যটা : আ’য়্যাম স্টেরাইল, জন্মবন্ধ্যা, আমিই জন্মেছি বন্ধ্যাত্ব নিয়ে, অ্যানি নয়। তেরো-বছর-বয়সের অদ্ভুত অনুভূতিটা এইভাবে একটা বাস্তব ভিত্তি পায়। কাজেই এইটা আমার কাছে সেভাবে শকিং কিছু ছিল না আদৌ। কিন্তু অ্যানির জন্যে ব্যাপারটা তো আর একই-রকম হয় নাই, বেচারি বিষণ্ন ও বেদনার্ত ছিল অনেকদিন, দুঃখ পেয়েছিল আমারই দুঃখে এবং সম্ভবত দু-জনের শোকেই ছিল অনেকদিন অব্দি কাতর। মাঝেমধ্যে আমাকেও অসহ শূন্যবোধ ও বিষণ্নতা-যে একেবারেই ঘিরিত না তা নয়, নিজের জন্য এবং অ্যানির জন্য এবং আমাদের উভয়ের জন্যই ডিপ একপ্রকার ডিপ্রেশন আমাকে একদম গ্রাস করে ফেলত মধ্যে-মধ্যে। এরপরেই আমরা অ্যাডোপশনের কথা ভাবি এবং বছর-কয়েক হলো দু-জন সন্তান আমাদের।”

অ্যাডপ্ট করেছেন অ্যানির সঙ্গে সংসারকালীন দু-দুটো সন্তান, পুত্র কন্যা, যথাক্রমে জ্যাকারে এবং কেইট, এই দুইজনে ডেনভারের গানে এসেছে বেশ কয়েকবার। পরে ডেলানির সঙ্গে — ক্যাসান্ড্রা ডেলানি, অস্ট্রেইলিয়্যান, মোটামুটি-মানের সিঙ্গার ও অল্প-খ্যাত অ্যাক্ট্রেস্ — দেড়-দুইবছরদীর্ঘ সংসারকালীন দত্তক নেন আরেক সন্তান। এবং রয়েছে তার আরও শ-তিনেক সন্তান — এর আধাআধি নিজের ঔরসজাত, কথা-সুর-সংগীত সমস্তই স্বীয় হস্তে-মেধায়-কল্পনায় সৃজিত, অন্যরা নানাভাবে অ্যাডপ্টেড তথা দত্তক হিশেবে গৃহীত ও অপত্য ডেনভারস্নেহে পালিত-বর্ধিত — অজর ও অমল-ধবল ডেনভারের গানসকল।

গানধ্যানী গিটারিস্ট গিমিক বিহীন

গিটারটা তার শরীরের একটা বাড়তি অঙ্গের চেয়েও অধিক কিছু, গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ বলাটাই বরঞ্চ শ্রেয়তর। ডেনভার গাইতেন ঠিক ততটাই স্বতঃস্ফূর্ত-সাবলীল, যতটা স্বাচ্ছন্দ্যসমেত কথাবার্তা বলি আমরা সাধারণ অগায়কেরা; তার মানে, ডেনভার নিজের সৃজনাবশ্যকীয় অনুভূতিবিচ্ছুরণ অথবা ভাবোদ্ভাসের প্রয়োজনে যে-যন্ত্রটা ব্যবহার করতেন, নির্ভর করতেন মুখ্যত যেই-যন্ত্রটার ওপর, সেই যন্ত্রটার নাম গিটার। বাপের দুর্দান্ত ব্যাটার মতন গিটার বাজিয়ে থাকে এমনকি ইদানীংকালের কলেজকিড রোমিয়োরাও। তবে কি-না যন্ত্রে প্রাণপ্রতিষ্ঠা, যান্ত্রিকাচরণের বাইরে একে নিয়ে যেয়ে টোট্যাল সুরটার ভেতর গানটার ভেতর মিশিয়ে দেয়া; — বেশিরভাগ সময় গিটারে, ব্যাঞ্জো কখনো-কখনো, এই কাজটাই করতেন ডেনভার। গিটারদক্ষ অনেকেই আছেন, কিন্তু গিটারের সঙ্গে গলা হার্মোনাইজ-করা গাইয়ে নেহায়েত কম সবসময়; ডেনভারের গলা পার্ফেক্টলি গিটারের সঙ্গে হার্মোনাইজড।

“ইদানীং মনে হচ্ছে যে, হ্যাঁ, এইবার আমি সিঙ্গার হিশেবে বেশ ভালো হয়ে উঠছি। কণ্ঠটা ভালোই ম্যাচিয়্যুর হচ্ছে দিন-কে-দিন এবং গলা ব্যবহার করবার বুদ্ধিটাও খোলতাই হচ্ছে যেন। মনে হয় এখন পূর্বাপেক্ষা ভালো স্যংরাইটার হয়ে উঠছি, যেহেতু স্বপ্রকাশাভিব্যক্তি বিষয়ে এদ্দিনে বেশকিছু খুঁটিনাটি শিক্ষাদীক্ষা আয়ত্ত হয়েছে বলেই বোধহয় এবং জানি কীভাবে অধিকতর বুদ্ধিদীপ্ত ও পরিণত ভিয়্যুপয়েন্ট থেকে নিজেকে প্রকাশ করতে হয়। গিটারপ্লেয়ার হিশেবে খুব-যে ভালো আমি, তা না। আমি এদিক থেকে প্যল সাইমনকে অ্যাডমায়ার করি ক্ল্যাসিক্যাল গিটারবাদনে তার ইম্যাজিন্যাশন ও ডেডিক্যাশন লগ্নি করার জন্যে। গিটারধুন সৃজনে তিনি ব্যাপক অনুধ্যানী, এইটা আমি বুঝতে পারি। নিজের ক্ষেত্রে বলতে পারি যে আমি প্যলের বাজনা এক্সপ্যান্ড করে গেছি। গিটারবাদনে তার মতন ভ্যারাইটি অফ রেইঞ্জ, ভ্যারাইটি অফ এক্সপ্রেশন আমার নাই”, — ইন্টার্ভিয়্যুতে ডেনভার এই কথাগুলো বলেছেন — যোগ করেছেন আরও সেইসঙ্গে, “ব্যাপারটা হচ্ছে গিয়ে যে আমি কম্যুনিকেইট করি মাত্র। আমার এক-ধরনে ডেফিনিটিভ স্টাইল রয়েছে এবং আমার গানগুলো মনে হয় শ্রোতাসাধারণ সকলকে একটু হলেও স্পর্শ করে। আমার গান যখন শুনতে যান আপনি, নিঃসন্দিগ্ধ সনাক্ত করতে পারেন তখন গানটা কার, কে গাইছে এইটা আপনি ঠিকই নির্ণয় করতে পারেন। অন্য কারোর মতনই না আমার গাওয়াটা। ক্ষেত্রবিশেষে একটা ক্রিটিসিজম যথার্থ মনে হয় আমার, সেইটে এ-ই যে আমার অনেক গানই শ্রোতাকানে একই-রকম শোনায়; এই ক্রিটিসিজম অসত্য মনে হয় না আমার কাছে। কে-একজন বলেছেনও শুনেছি যে ডেনভারের অনেকাংশ সুরসূচনা, গানের শুরুটা, স্টার্টিংটা, একই-রকম শোনানোর একটা কারণ রয়েছে, সেই কারণটা মনে হয় এ-ই যে ডেনভার গিটারটা ভালো বাজাতে পারে না।” মানে, ডেনভার নিজেই স্বীকার করছেন, গিটার তিনি বাজিয়েছেন গোটা গানটাকে সাপোর্ট দেবার জন্যে, গিটারে খ্যাতি পেতে কিংবা কীর্তি গড়তে নয়। এর ফলে যেইটা হয়েছে যে ডেনভারের গিটারপ্লেয়িং অনেক বেশি আত্মিক, অনেক আন্তরিক, গিমিকটা নাই বিলকুল।

গিটার নিয়া গান আছে ডেনভারের, গিটারবন্দনা বা গিটারপ্রেমের গান, ‘দিস্ ওল্ড গিটার’ সেই গানের শিরোনামা। দাদিমার দেয়া সেই ভিন্টেইজ গিবসন গিটারটা গানের প্রতিপাদ্য। অঞ্জন দত্ত এইটেকেই বাংলায় এনেছেন নিজের কথা পুরে : “এই বুড়ো পুরনো গিটার … কলের গানের সুরে হারিয়ে গিয়ে খুঁজে পাওয়া নিজেকে আবার / পৃথিবীর কত কথা কাছে এনে দিয়েছে আমার পুরনো গিটার / জন লেননের সোচ্চার ভালোবাসা, বব ডিলানের অভিমান / হুট করে ভালো লেগে ভালোবেসে কাউকে তাড়াহুড়ো করে লেখা গান … এই বুড়ো পুরনো গিটার দিয়েছে কতকিছুই দিয়েছে / জীবনে প্রথমবার ভালোবাসা হারানোর যন্ত্রণা ভুলিয়ে দিয়েছে” … ইত্যাদি। কিন্তু অঞ্জনলিখিত কথামঞ্জরি ডেনভারলিরিক্সে নেই। উৎসগানে, ডেনভারলিখিত ‘বুড়ি গিটার’ গানে, এইধারা লাইনগুলো ওড়াউড়ি করেছে তিনটে স্ট্যাঞ্জা জুড়ে : This old guitar gave me my lovely lady / It opened up her eyes and ears to me / It brought us close together / I guess it broke her heart / It opened up the space for us to be / What a lovely place and a lovely space to be … ইত্যাদি।

গানলেখক, সুরদায়ক, গায়ক

পরিতৃপ্তির ঢেঁকুর নয়, ফের ঠিক অতৃপ্তিতেও ভুগতেন না ডেনভার নিজের মিউজিশিয়ান সত্তা নিয়া। লিরিসিস্ট হিশেবে ভেতরে-ভেতরে অতৃপ্তি/অপর্যাপ্তবোধ কাজ করে কি না, এমন এক প্রশ্নের জবাবে ডেনভার সটান বলেন, “নাহ্। মনে হয় যে বেশকিছু চমৎকার লিরিক্স আমি লিখতে পেরেছি। এবং সব-কয়টাই প্রিয় আমার। আপনি নিশ্চয় এ-কথার সঙ্গে একমত নন, ঠিক বলিনি?” নিজের লিরিক্স সম্পর্কে বলতে যেয়ে ডেনভার আরও বলেন, “আমার বিশ্বাস যে আমি বেশ চমৎকার ও বাঙ্ময় কবিতাভাষায় লিখতে পারি লিরিক্স। ইমেইজারি দিয়া সাধারণ শ্রোতার খেই-হারানো নয়, প্লীহা চাবকানো নয় শ্রোতার, একভাবে-না-একভাবে সেই লিরিক্সের সঙ্গে যেন সবাই রিলেটেড ফিল করে এবং সহজবোধ্য ও শ্রবণসুগম হয়, লিরিক্স রচনার সময় এই বিষয়গুলো বজায় রাখার চেষ্টাটা আমার দিক থেকে আমি করে থাকি।” নিজের লেখা গানগুলোর মধ্যে কোনগুলো/কোনটা তার প্রিয় সবচেয়ে? — “ক্যালিপ্সো  গানটা দারুণ মনে হয়, লিরিক এবং মেলোডি উভয় বিচারেই দারুণ। গানের কোরাস অংশটুকু সত্যিই ইন্সপায়ারিং। ঘরভরা মানুষ যখন ওই গানটা সমবেত গলায় গাইছে, খেয়াল করবেন, এক-লহমায় সেই বৃন্দকণ্ঠ আপনাকে চেয়ার থেকে দাঁড় করায়ে দেবে। অ্যানিস্ স্যং  সোজাসাপ্টা গান, তবু সুর ও কথা সবকিছু মিলিয়ে এই গানটি বিউটিফুল এবং ম্যাজেস্টিক। রকি মাউন্টেন হাই  সত্যিকার অর্থে একটা ভালো গান। ‘পোয়েম্স, প্রেয়ার্স অ্যান্ড প্রোমিজেস্’, ‘ব্যাক হোম অ্যাগেইন’ … কী বলব, স্বরচিত রচনাগুলোই আমার প্রিয় সংগীতের তালিকায় শীর্ষস্থানাধিকারী!”

যে-গানটাকে ডেনভার উল্লেখ করেছেন নিজের সেরা কাজ হিশেবে, শিল্পীর নিজস্ব নন্দনাভিপ্রায় একটা আলগ মনোযোগ দাবি নিশ্চয় করে শ্রোতা-সমজদারদের কাছে, সেই গানটা একবার স্মরণ করা যাক। ক্যালিপ্সো  গানটার উপজীব্য ব্যক্তিত্ব ক্যাপ্টেইন জ্যাক ক্যস্টিয়্যু, সমুদ্রপরিবেশ-জলজীবন ও সমুদ্রপ্রাণির বিপন্নতা রোধকল্পে নিরলস কাজ করে গেছেন আমৃত্যু, জন ডেনভার ক্যস্টিয়্যুর সান্নিধ্যে যেয়ে এই মানুষটার এবং তার কাজের প্রতি ভীষণ ইম্প্রেসড্ হন। ক্যস্টিয়্যুর বোটে চেপে সমুদ্রভ্রমণের অব্যবহিত পরেই স্পৃষ্ট-মন্ত্রাবিষ্ট ডেনভার ক্যালিপ্সো  গানটার লিরিক্স লেখেন ও সুর কম্পোজ করেন। প্রোক্ত কথাচারিতায় নিদর্শিত কোরাস অংশটুকু : “Aye, Calypso, I sing to your spirit, the men who have served you so long and so well / Aye, Calypso, the place’s you’ve been to, the things that you’ve shown us, the stories you tell” … শুনলেই ইন্সপায়ার্ড হওয়া যায় এমন কোরাস। গোটা গানটা জুড়ে যেন সমুদ্রচিলের উড়াল, জলদেশতলাকার নিরিবিলি মীনভুবনের কথাস্তব্ধ মুখরতা, আর ‘দৃশ্যত সুনীল কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে স্বচ্ছ জলে’ কিংবা বিনয়বিজ্ঞান কিঞ্চিৎ ভুলে যেয়ে দৃশ্যত-ও-বস্তুত সুনীল সমুদ্রজলে উড়ন্ত উজ্জ্বল ডলফিনের ডাইভ দেখে ওঠা যায়। দেখতে পাই আমরা, শ্রোতারা, গানের বাণীভাগে কোথাও ডলফিন-সিগাল প্রভৃতির সুস্পষ্ট উল্লেখটা না-থাকলেও। যদিও ডলফিনের নামটা একবার উঠেছে, একবারই বস্তুত। ঘটনাটা ঘটেছে, মনে হয়, এর অর্কেস্ট্রেশনে; এবং, অবশ্যই, ডেনভারের রেন্ডিশনে। ইংরেজি গানের অর্কেস্ট্রেশন ব্যাপারটা সবসময় এমন যে, ডেনভারের তো বটেই, এতে সমুদ্রজলরাশির সুপরিসর ব্যাপ্ততা আর সুবিশালাকাশের সৌম্য প্রশান্তিশীলন অনুভূত হয়; — যেমন বাংলা গানে এবং বাদ্যযন্ত্রে বর্ষাকালিক বৃষ্টি ও বিধৌত নদীর কুলুকুলু ধ্বনিপুঞ্জ গুঞ্জরিত হতে দেখি। কিন্তু খুব বেশিকিছু কথাবার্তা নাই প্রাগুক্ত সংগীতে; — “…to live on the land we must learn from the sea / To be true as the tide and free as a wind swell, joyful and loving in letting it be” … ইত্যাদি গুটিকয় পঙক্তি, আর ওই কোরাস পুনঃপুনঃ; মূলত কোরাসটাই গানের আলাপ, ঝালা ও বিস্তার; ওই কোরাসেই গানটার পাখা, প্রাবল্য ও উড্ডয়ন।

পুরস্কৃত হয়েছেন গানের নানান শাখায়, নানান ঘরানার গানে, কিন্তু কোন ঘরানায় ডেনভার নিজেকে দেখতে চেয়েছেন? পুরস্কৃত হয়েছেন তিনি — স্বীকৃতি লভেছেন — কান্ট্রি, পপ, মিডল অফ দ্য রোড, ফোক প্রভৃতি ক্যাটাগোরিগুলোতে। ডেনভার জানাচ্ছেন, “আমি বলব যে এর সবগুলোতেই কিছু-না-কিছু কাজ রয়েছে আমার। এছাড়া, আমার ধারণা, আমি ঠিক রক বা জ্যাজ ধারার নই। কিন্তু পপ, এমওআর, কান্ট্রি, ফোক — এই সব-কয়টিতেই আমায় দেখা যাবে।”

মিউজিশিয়ান হিশেবে ব্যর্থতা আছে কি না, বা নিজের ফেইলিংগুলো কোথায়, এমন জিজ্ঞাসার জবাবে ডেনভার উবাচ : “মোস্ট স্পেসিফিক্যালি, আমার গিটার প্লেয়িং। আর আমার মিউজিক্যাল নলেজ, আমার সংগীতজ্ঞান খুব-একটা ভালো বলা যাবে না। আমি পিয়ানো শিখতে চাই, পিয়ানোটা আয়ত্ত করতে পারলে পরে আমি কিছু অন্যরকম গান কম্পোজ করতে পারব বলে আমার বিশ্বাস। কিন্তু নিজের খামতিটা এখানেই যে আমার অভিপ্রায় এবং অর্জনযোগ্যতা প্রায় মেরুদূরবর্তী।”

ইনফ্ল্যুয়েন্স এটেসেট্রা

ডেনভার যে এত গান গাইলেন, কম তো দীর্ঘ নয় ক্যারিয়ার তার, গোটা একটা সময়কে সুরমগ্ন-সুরাচ্ছন্ন করে রাখলেন, কে বা কারা তাকে প্রভাবিত করেছিলেন, অথবা আদৌ করেছিলেন কি না তারে কেউ প্রভাবিত, কে বা কারা তার সাংগীতিক পথপ্রদর্শক — এমন প্রশ্নের উত্তরে ডেনভার : “প্রথমত এলভিস প্রিসলি। ঠিক নায়ক বলব না, কিন্তু উনিই ছিলেন প্রথম যাকে দেখে আমি শিখেছি কীভাবে শ্রোতাসাধারণের সঙ্গে সংগীত দিয়ে কম্যুনিকেইট করা যায়। প্রিসলির শুরুর দিককার কাজগুলোর কথা বলছি। এরপরে একে-একে ববি রাইডেল, প্যল অ্যাঙ্কা প্রমুখ। আমি এদের গান শুনেছি বিস্তর, গেয়েছিও, তবে এরা কেউই ঠিক প্রভাবক নন আমার ক্ষেত্রে। তারপর, যখন ফোক মিউজিক ব্যাপারটা শুরু হলো — দ্য কিংস্টন ট্রায়ো  — তখনকার অসংখ্য আর্টিস্ট প্রভাব রেখেছেন আমার ওপর। জোয়ান বায়েজের চেয়ে বরং জুডি কলিন্স প্রভাবিত করেছেন আমায়; এবং টম প্যাক্সটন বড়সড় প্রভাব রেখেছেন আমার সংগীতজীবনের সূচনায়। একদিন আমি হয়তো টম প্যাক্সটনের কয়েকটা গান বাছাই করে একটা অ্যালবাম করব কখনো। তারপর ধরেন ‘নিউ ক্রিস্টি মিন্সট্রেল্স’ উপভোগ করতাম সেই-সময় — র‌্যান্ডি স্পার্ক্স আমাকে সিঙ্গার হিশেবে পয়লা কাজটা পাইয়ে দেন, স্মরণ করতে চাই, লস্-অ্যাঞ্জালিসের একটা ক্লাবে। এরপর, যখন আমি ‘মিশেল ট্রায়ো’ গ্রুপে জয়েন করি, আমার কাছে ফিল্ অক্স এবং ‘পিটার, প্যল্ অ্যান্ড ম্যারি’ ইম্পোর্ট্যান্ট মনে হয়েছে। বলা বাহুল্য ‘বিটল্স’, অবশ্যই, সবসময় এদের গান ভালোবেসে এসেছি আমি। কিন্তু সম্প্রতি যারা গাইছেন তাদের মধ্যে ঠিক কার বা কাদের কাজ আমাকে গ্রস্ত করে ভেবে দেখি নাই সেভাবে; এইটুকু শুধু বলি, যাদেরটা আমার শোনা হয়, এদের মধ্যে আই থিঙ্ক স্টিভি ওয়ান্ডার ইজ দি বেস্ট।”

অবাক করে বৈকি, স্টিভি ওয়ান্ডার তো শুনেছি আমরা আশি-দশকের শেষপাদ থেকে গোটা নব্বই জুড়ে, ডেনভার-ঘরানার সঙ্গে স্টিভির তো ওইভাবে তেমন সদৃশতা-সাযুজ্য নজরে ঠেকে নাই। কিন্তু পছন্দ-অপছন্দ তো চুম্বকধর্ম মেনেও হয়, বিপরীত স্বর ও ঘরানাও পরস্পর আকর্ষণ তো করতেই পারে। ডেনভার যদিও বলছেন যে, “এক-ধরনের প্যাশন এবং অসম্ভব জীবনস্ফূর্তি স্টিভিমিউজিকের সম্পদ বিশেষ। সে খুবই ইনক্রেডিব্লি মিউজিক্যাল, অ্যা গ্রেইট সিঙ্গার, সন্দেহ নাই। এবং আমি মনে করি যে স্টিভি ও আমি, আমরা উভয়েই, ডুয়িং দি সেইম থিং। আমরা দুইজনে দুই ডিফ্রেন্ট পয়েন্ট-অফ-ভিয়্যু এবং দুই ভিন্ন অভিজ্ঞতার জায়গা থেকে এ-জগতে এসেছি, ভিন্নতাটুকু উভয়ের কাজেই রিফ্লেক্টেড, কিন্তু সবকিছুর পরও মনে হয় যে আমরা দুইজনে অ্যালাইনমেন্টের দিক থেকে এক-ও-অভিন্ন।”

এছাড়াও হ্যারি নিলসনকে ডেনভার মনে করতেন অসম্ভব ভালো গায়ক; নিলসনের একাধিক অ্যালবাম ডেনভারের বিবেচনায় “বেস্ট থিংস আই হ্যাভ এভার হিয়ার্ড” …। পরের দিককার উইলি নেলসন পছন্দের তার, কিংবা ফ্লিটউড ম্যাক। পছন্দ করতেন ‘দি ইগল্স’ গ্রুপের ‘হোটেল ক্যালিফোর্নিয়া’ অ্যালবামটা। আর জেইম্স ট্যেইলর সবসময়েরই ফেব্রিট তার। কিন্তু তখনকার ক্রেইজ কার্লি সাইমন পছন্দ করেননি। ক্রিস্টোফার্সোনের গাওয়া তার পছন্দের না-হলেও স্যংরাইটার হিশেবে ওর তারিফ করেছেন ‘ব্রিলিয়্যান্ট লিরিসিস্ট’ বলে, এবং অন্যদের গলায় ক্রিস্টোফার্সোনের গান এঞ্জয় করেন বলেই স্বীকার করেছেন।

দুই জন্, ডেনভার ও লেনন

গুণগত তুলনামূল্যাঙ্কন নয়, শিল্পের এবং শিল্পীর আদৌ তুলনামূল্যাঙ্কন হয় না, কারিগরের তথা কারিগরি স্কিলের তুলনামূল্যবিচার হয়তো হতে পারে। ডেনভার এবং লেনন উভয়েই আকণ্ঠহৃদয় শিল্পসমর্পিত। উভয়েই জীবন কাটিয়ে গেছেন উদয়াস্ত বাগদেবীচরণে প্রণামী দিয়ে। ডেনভারের সমকালীন যে-কয়জন ইংরেজি মিউজিশিয়্যান আমাদের এই বাংলা মুলুকেও আবাল্য পরিচিত, জন্ লেনন তাদেরই একজন। দুইজনের পৃথকতর দুই শিল্পীসত্তা। তাদের ঘরানা ও গায়নশৈলী ভিন্ন বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। তবু, বলা যায়, কোনো-না-কোনো দুরান্বয় পাই বলেই আমরা একের অধিক এমনকি শতাধিক শিল্পীকে একজীবনে একযোগে ভালোবাসতে পারি।

নিশ্চিতভাবে ডেনভার ও লেনন ঘরানায়-গায়নে আলাদা হলেও স্বচ্ছসহজ সুরের-কথার বিনিয়োগে একেকটা গানের নির্মিতি দেখে উভয়ের একটা সাধারণ মিলবিন্দু কল্পনা করা আদৌ অসাধ্য হবে না শ্রোতার পক্ষে। যেমন তাদের ব্যক্তিজৈবনিক সোজাসাপ্টা আচরণে, পেসিফিস্ট ম্যুভমেন্টে নিজেদের শামিলকরণে, গানের চরণে প্রেম ও শান্তির বাণী লগ্নিকরণে একটা সাদৃশ্য তো রয়েছেই। মিল রয়েছে মেলোডির জায়গাতেও। রক্ ঘরানায় লেননের ক্যারিয়ার বিল্ডআপ হলেও সফ্ট-সাউন্ডিং গীতিমালায় বিটলসকালীন এবং বিটলসবহির্ভূত জন্ লেনন লব্ধপ্রতিষ্ঠ। জন্ ডেনভার কান্ট্রিমিউজিকের ভিতরকার শাঁসটুকু উপস্থাপন করেছেন অপার্থিব সুরেলা বাতাবরণে, এনেছেন আধার ও আধেয় উভয় বিবেচনাতেই সিগ্নিফিক্যান্ট উন্নয়ন নিজের এবং গোটা আংরেজভূখণ্ডের সংগীতে।

ডেনভার এবং লেননের জন্মসনানুসারে ব্যবধান সাত বছরের। লেনন বয়োজ্যেষ্ঠ। সংগীতের আসরেও ডেনভারের আবির্ভাব লেননের পরে। লেনন ষাটের এবং ডেনভার সত্তরের শিল্পী হিশেবেই পরিচিত। তবু সমসাময়িক শিল্পীদের মধ্যে যে-একটা আদানপ্রদানের পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ সম্পর্ক থাকে, ডেনভার-লেননের মধ্যে সেইটা কি ছিল আদৌ? মঞ্চে একসঙ্গে গেয়েছেন কখনো? উত্তরে একবাক্যে না-বাচক ঘাড় নাড়া যায়। কিংবা বলা যায় যে এই নিবন্ধকারের নজরে পড়ে নাই। ব্রিটিশ এবং মার্কিন সৃজনশীল কবি-শিল্পী-বিনোদনজীবীদের মধ্যে একটা পারস্পরিক অবজ্ঞা-অস্বীকারের ব্যাপার তো আছেই আগাগোড়া, আর ডেনভার তদুপরি চ্যানেলঘাট মেইন্টেইন করতে না-পারা ট্র্যাডিশন্যাল্ গাঁইয়া অ্যামেরিক্যান মানুষ, অন্যদিকে ব্রিটিশ হওয়া সত্ত্বেও প্রায় বিট জীবনাচারে অভ্যস্ত লেননও ঝড়ো জীবনই যাপিয়া গেছেন। তবে ডেনভার বিভিন্ন সময়ে স্টেজে লেনন তথা বিটলসের গান করেছেন, জ্যোন বায়েজের সঙ্গে একই মঞ্চে ‘লেট ইট বি’ গেয়েছেন, ‘হোয়েন আয়্যাম্ সিক্সটিফোর’ বা ‘ইম্যাজিন’ গেয়েছেন, বিটলসের গান পছন্দ করার কথা অকপটে বলেছেন সাক্ষাৎকারে।

ডেনভার ও ডিলান

দুইজনার গানে এবং জীবনযাপনে বা স্বভাববৈশিষ্ট্যে মেরুদূরের মিলটুকুও সম্ভবত খুঁজে পাওয়া যাবে না। সাদৃশ্য খুঁজতে কেউ যাচ্ছেও না এখানে। ডেনভার থেকে ডিলান সম্পূর্ণ আলাদা। তারপরও দুইজনে একইসময়ে ক্যারিয়ারের শীর্ষ ছুঁয়েছেন। দুইজনেই অ্যামেরিক্যান। খুচরোখাচরা বাহ্যিক কিছু মিল-বেমিল এইভাবে বের করা যাবে না তা নয়। দেখাসাক্ষাৎ হয়েছিল? নো, নো, উল্লেখ করার মতো হয় নাই।

ডিলান, সন্দেহাতীতভাবেই, ডেনভারের চেয়ে সাংগীতিক ইনোভ্যাশনের দিক থেকে বেশি হিম্মতওয়ালা। বাংলাদেশে, যেমনটা সারাদুনিয়ায়, ডেনভারের চেয়ে ডিলান অধিকতর পরিচিত। নোবেল অ্যাওয়ার্ডেড হবার কারণে সেই পরিচয়ব্যাপকতা আরও বেড়েছে। এই হিসাবে ডেনভার অনেক পেছিয়ে। এমনকি জীবদ্দশায় ডেনভারের শুধু গুটিকয় গানই বিশ্বমাত করেছে, অ্যালবাম আস্ত পরিচিত হয়ে ওঠে নাই সেইভাবে, সেদিক থেকে ডিলানের বরাতজোর ঈর্ষণীয়। জন ডেনভার সাধারণ দুনিয়াবাসীর মধ্যে বেশি রিচ করেছেন আকস্মিক প্লেইনক্রাশে এক্সপায়ারের পরে। এখনও বব ডিলানের অ্যালবামের শিরোনাম এবং অ্যালবামঅয়াইজ্ মোড়ফলকগুলো সমুজদার শ্রোতা আলোচনায় নিয়া আসেন। জন্ ডেনভারের এক ‘ফেয়ারোয়েল অ্যান্ড্রোমিডা’ ছাড়া বাকি প্রায় গোটা-তিরিশেক স্টুডিয়ো-অ্যালবামের নামগুলো সবাই ইয়াদ করতে পারবে কি না, খোদ জনির স্বদেশেই, সন্দেহ।

জন্ ডেনভারের সুদীর্ঘ যে-সাক্ষাৎকার হয়েছিল প্লেবয় পত্রিকায়, সেখানে ডেনভার তার স্বভাবসুলভ প্রশংসা করেছেন বহু অগ্রজ-অনুজ সংগীতশিল্পীর, ডিলান সম্পর্কে একটাও নোক্তা নাই। ঠিক যে সেখানে ডিলানপ্রসঙ্গ উত্থাপিতও হয় নাই। তিক্ততা ছিল কোনো, উভয়ের মধ্যে? দেখা যাচ্ছে, প্লেবয় পত্রিকাতেই ১৯৭৮ সনে রন্ রসেনবম্ কর্তৃক গৃহীত সাক্ষাৎকারে ডিলান একটা আচমকা বাক্য উচ্চারণ করছেন, গোটা সাক্ষাৎকারটা বাংলা হয়ে বেরিয়েছে অভিজিৎ বসু ও সন্দীপন ভট্টাচার্য সম্পাদিত ‘বব ডিলান : চার দশকের কথা ও গান / গিটার আর একটা অন্ধকার রাস্তা’ শীর্ষক গ্রন্থে। সেখানে একজায়গায় এক প্রশ্নের জবাবে ডিলান বলছেন, “আমি যখন নিউ ইয়র্কে আসি, গিন্সবার্গ তখনই বেশ প্রতিষ্ঠিত বলা যায়। তবু বলতে কোনো দ্বিধা নেই যে প্রথমদিকে গিন্সবার্গ বা জ্যাক কেরুয়াক আমাকে যথেষ্ট অনুপ্রাণিত করে। আমি যেখান থেকে এসেছিলাম, সেখানে কোনো আধুনিক পরিবহনব্যবস্থা ছিল না, ফলে আমাকে আসতে হতো প্রায় পায়ে হেঁটে। যে-সময়ের কথা বলছি, সে-সময়ে জন ডেনভার নেহাতই এক পার্শ্বচরিত্র। বহু লোকই ঐ সময়ের মধ্যে দিয়ে এসেছে। অভিনেতা, নৃত্যশিল্পী বা রাজনীতিক — অনেকেই তো ঐ বিশেষ সময়পর্বে যুক্ত ছিল।” কোন সময়টা? “খাঁটি ছয়ের দশকের গোড়ার দিকের কথা বলতে চাইছি” — ডিলান নিজেই রিপ্লাই দিচ্ছেন। খটকা লাগে “ডেনভার নেহাতই এক পার্শ্বচরিত্র” কথাটায়; ডেনভার কেন্দ্রচরিত্র ছিলেন কবে যে পৃথকভাবে ‘পার্শ্ব’ বলতে হয়? এ কী তবে বিখ্যাত সেই ডিলানীয় ঔদ্ধত্য ও আত্মসর্বস্ব উপেক্ষা? তা, হতেও পারে, না-ও হতে পারে। এত খোঁজাখুঁজির অবসর আপনারে কে দেবে!

ডেনভার কিন্তু ববি ডি-র হিম্মতের প্রতি ট্রিবিউট জ্ঞাপনে কসুর করেননি; করবার কথাও নয়, কেননা ষাটের গোটাটাই ডিলানের বিপুল সৃজনপ্রতাপে তপ্ত। জন্ ডেনভার সেই সময়েই নিজের কায়দায় পাশ দিয়ে গেয়ে যাচ্ছিলেন আনমনা আনন্দে। ডেনভার দু-দুটো আস্ত কাভার-স্যং করেছেন ডিলানের, ‘ব্লোয়িন্ ইন্ দ্য উইন্ড’ এবং ‘মিস্টার ট্যাম্বুরিন্ ম্যান্’; যদিও বব ডিলান নিজের সংগীতগুরু উডি গাথ্রি থেকে শুরু করে পিট সিগ্যার, ফ্রাঙ্ক সিনাত্রা সহ অনেকেরই গান করেছেন মঞ্চে বা অ্যালবামে, লেনার্ড কোহেনেরও, হোক-না ‘হালেল্যুইয়্যা’ কুল্লে, ডেনভারের কোনো গান কখনো মঞ্চে-ময়দানে করেছেন মর্মে এই নিবন্ধকারের অনুসন্ধানে ধরা যায় নাই।

নিজের গান ও অন্যের গান

গোটা ক্যারিয়ারে শ’-তিনেক গানের মধ্যে প্রায় আধাআধিই হবে ডেনভার কাভার-স্যং করেছেন। যখনই যার গান ভালো লেগেছে, গেয়েছেন সেই ভালোবাসা জানাতে প্রকাশ্যে। ডেনভারের লেখা ও গাওয়া গানেরও প্রচুর ভার্শন হয়েছে এবং হয়ে চলেছে প্রতিদিন। পরিবেশনার ক্ষেত্রে এইটা ইংরেজি গানে বেশ পুরনো ও মর্যাদাপূর্ণ সংস্কৃতিই বলতে হবে। ব্যাপারটা বাংলা গানে সেভাবে নেই এখনও। হয়তো অচিরে এই জিনিশটা বাংলাতেও প্রোফেশন্যালি হবে, সেই আলামত পাওয়া যাচ্ছে ইউটিউবে এবং অন্য নানাবিধ প্রাযুক্তিক মাধ্যমে।

একটা রাফ হিসাবে দেখা যাচ্ছে যে ডেনভার একশ’ দশেরও অধিক অন্যের গাওয়া গান নিজে ফের কাভার করেছেন। সম্ভবত জুডি কলিন্স, জ্যোন্ বায়েজ প্রমুখ কয়েকজন ছাড়া সেইসময়ে এতসংখ্যক কাভার-স্যং করবার শ্রম খুব কম শিল্পীই করেছেন। পুরাতনী ইংরেজি গানগুলোর কথা তো বলাই বাহুল্য। জন ডেনভার ইংলিশ ট্র্যাডিশন্যাল পল্লিগীতি নিয়েছেন নিজের গানে সুরকাঠামো হিশেবে, তেমনি নিজে সেই গানগুলোকে অ্যালবামে গেয়েছেনও সরাসরি। এবং ডেনভার সেই কাভারগানগুলো করেছেন এমনভাবেই যে নিজের মৌলিক গান থেকে সেগুলোকে পৃথকীকরণ আমাদের মতো অল্পশোনা শ্রোতার পক্ষে বেশ দুষ্কর। বর্তমান নিবন্ধে, আশঙ্কা করি, এমনকিছু গানানুষঙ্গ হয়তো চক্রেপাকে এসে গেছে আলাপে যেগুলো জন্ ডেনভারের গাওয়া হলেও অন্যের লিখিত ও সুরযোজিত।

সবচেয়ে বেশি কাভার-স্যং করেছেন যে-দুইজনের, তারা হলেন টম প্যাক্সটন এবং বিল্ ড্যানোফ। এই দুইজনের কথা সাক্ষাৎকারে বলেছেনও, সকৃতজ্ঞ প্রশংসার কণ্ঠে, বলেছেন বিশেষ করে প্যাক্সটনের গোটা অ্যালবাম প্রকাশের ইচ্ছার কথা প্লেবয় সাক্ষাৎকারে। এছাড়া যাদের গেয়েছেন, তাদের মধ্যে এদেশে যারা আমাদের শোনা, যেমন : পিট সিগ্যার, ফিল্ অক্স, বব ডিলান, জেমস্ টেইলর, সাইমন অ্যান্ড গার্ফাঙ্কেল, পিটার প্যল্ অ্যান্ড ম্যারি এবং লেনার্ড কোহেন প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।

তোমার প্রিয় গায়ক জন ডেনভারের শেষ দিনগুলো

নগরবাউল বললেই চিনে নেয়া যায় তারে, জেমস তিনি, গেয়েছিলেন সেই-যে একটা গান, অদ্ভুত কবিতা সেই, ‘প্রিয় আকাশী’, গীতিকার অবশ্য লতিফুল ইসলাম শিবলী, হিস্ট্রিপৃষ্ঠায় জেমসের দুর্ধর্ষ কয়েকটা গানের লিরিসিস্ট এই শিবলী, কিন্তু কথা এইখানে সেইটা না; কথা হচ্ছে ‘প্রিয় আকাশী’ নানা কারণেই লিরিক্যাল-চন্দ্রপুষ্পমধুমণ্ডিতা বাংলা গানের কন্টেক্সটে, প্রেমের গানের উভয়-বঙ্গীয় গোলার্ধে, ট্রেন্ডস্যেটার ভায়োলেন্স এক, সুমধুর নৃশংসতা, আবহমান জোয়ান-বুড়ো মহান বাংলা গানে এইটা আরেক ফাল্গুন, ঘুমভাঙানো ভোমরাটার গুনগুনানি স্প্রিংটাইম নয়, এ হচ্ছে অশোক-কিংশুক-উপড়ানো বসন্তমদমত্ততা বাংলা গানে; একারে-ওকারে বিবিধ বাহানা আর আকারে-প্রকারে জেমস নামোচ্চারে যারা মার্ক নফ্লারে যেয়ে ঠেকায় তাদের আখাম্বা মাথা ও মুণ্ডি, ইংরিজিগাণ্ডু উহাদের থোতা-মুখ ভোঁতা করিবারে নাকি বিচ্ছুদল বঁটিদাও লইয়া শানাইছে একাগ্রচিত্ত গোকুলধামের দাওয়ায় দিব্যোন্মাদ বসিয়া দিবারাত্র! ওই আসে ভৈরব হরষে, শোনা যায় জ্যান্ত ধ্বনি এইটুকুনি এই মর্গের সংস্কৃতিনিসর্গদেশে, চেয়ে দ্যাখো, উঠেছে নতুন সূর্য, উঠেছিল, পথে পথে রাজপথে, ভেবে দ্যাখো, ভেসেছিল সর্বনাশকতানাশী বিদ্রোহরঙ, তোমার তবু ঘুম ভাঙল না বাছা! গান শোনার কথা ছিল সারারাত তোমার, শোনানোরও, নৌকাও ছিল ঘাটে ভেড়ানো, তুমি তবু শুনলে না গান প্রিয়তমঃ, নমস্তস্যৈ নমো-নমঃ, তুমি তবু চুল খুলে পথে নামলে না, হায়, ভিয়েনার তারাজ্বলা রাত্রির আকাশের দিকে তাকিয়ে কেন তবু মনে তার পড়েছে তোমায়, এই মনে-পড়াপড়িটুকু জন্মজন্মান্তরের, হাজার বছর ধরে হেঁটে ফিরিতেছে সে বনলতামাদুলি গলায় ঝোলায়ে ব্যস্ত-ঘোরগ্রস্ত বোহেমিয়ানদের মতো ঘুরে ঘুরে বাংলাহাওর থেকে মাদ্রিদ-হামবুর্গ-নিউক্যাসল্-নেপোলি-প্রাগ-বুখারেস্ট-মেসিডোনিয়ায়, দেশে-দেশান্তরে গেয়ে ফিরিছে সে নানা ভাষা নানা সুরে কেবল বাংলা আকুতি ও দর্দ মিশিয়ে গলায়, এই সিস্ট্যাইন-চ্যাপেলের সামনে দাঁড়িয়ে একবার নক্ষত্রের পানে ফের ছত্রিশবার বেদনামুখের নেকাব-সরানো উঁকিঝুঁকি চিরটাকালের, এই চিরটাকাল সঙ্গে রইবার লকলকে লেলিহান সাধ, তারই লাগি কেন এত সাধাসাধি / অবুঝ আঁধারে কেন মরি কাঁদি, তোমার কুসুমবনে আমি আসিয়াছি ভুলে / কাঁদাতে এসেছি আমি হৃদয়নদীর কূলে, এই ফিলিংস্, এই জেমস, রবি রক্স, কাজী ব্লুজ, নগরবাউল, এই ডিলান, কবীর ও কোহেন, বব মার্লে, লালন সাঁই আর জন লেনন, এই ডেনভার। এই সুর, বেঁচে-থাকার, এই ভোর, মুহূর্তগুলো দুপুর ও দয়িতার, এই নিভন্ত চুল্লি ও চ্যাপ্লিনের জ্যোকার, এই নিধুয়া মাটিজলহাওয়ার সার ও সারাৎসার, জীবনে কেঁচোযাপন ও ফ্রেন্ডশিপফুর্তির ফার্টিলাইজার, এই বিপন্ন বিস্ময় এবং অন্তর্গত রক্তপুরস্কার, এই কীর্তন ও অষ্টপ্রহর সংসার, টোয়েন্টিফোরাওয়ার্স ফড়িয়াদের টালবাহানার, এই গল্প স্বরলিপিহীন সুরকীর্তিত ভুবনডাঙার। এই হৃদয়, প্রেমের শীর্ষ, গান ও গায়িকার। এ-জীবন অপরূপায়িত কথার, মূর্ত ও বিমূর্ত মন্ময়তার, আর তারচেয়েও অধিক-অধিকতর গভীর-গহনগামী নীরবতার। কথা সেইটা নয়। এইখানে কথা এইটাই যে, জেমসের সেই ‘প্রিয় আকাশী’ গানে একটা লাইন মনে পড়ছিল : তোমার প্রিয় গায়ক জিম মরিসনের শেষ দিনগুলো কেটেছে এই প্যারিসে …। না, আমরা সেই ‘দি ডোরস্’ বরপুত্রের সর্বনাশা গান-কবিতা আপাতত তুলছি না আলাপে, একদিন নিশ্চয়ই জিমের সঙ্গেও মোলাকাত হবে আমাদের অ্যাথেন্সের কফিশপে কিংবা আজিজ বোর্ডিঙে অথবা বাংলার যে-কোনো রোডসাইড টিস্টলে আড্ডা দিতে দিতে। ডেনভারের শেষ দিনগুলো বলে নিয়ে এ-যাত্রা আমরা এই স্মৃতিনিবন্ধ থেকে বেরিয়ে রাস্তার ভিড়ে মিশিয়া যাই বরং।

আশি-দশকের মাঝামাঝি থেকে ১৯৯৭ অব্দি জীবনের শেষ দশকটা ডেনভারের ক্যারিয়ারে সবচেয়ে অপ্রসন্ন দশক। একের-পর-এক বিপর্যয় পিছু ছাড়ছিল না শিল্পীর, বিপর্যয় যেমন প্রোফেশন্যাল ক্যারিয়ারে, তেমনি বিঘ্ন ব্যক্তিগত ও সংসারজীবনেও। অন্তিম দশকে বের-হওয়া অ্যালবাম ও সিঙ্গেল্সগুলো কম্যার্শিয়্যাল ফুটহোল্ড ধরে রাখতে ব্যর্থ হচ্ছিল। দুই-দুইবার এই নির্ঝঞ্ঝাট-নির্বিরোধ সদা হাস্যোজ্জ্বল শিল্পী মদ্যপ অবস্থায় ড্রাইভ করতে যেয়ে অ্যারেস্ট হন। প্রথমবার ১৯৯৩ সালে, অ্যাস্পেনে, এর অব্যবহিত পরের বছর পুনরায় একই চার্জে এবং ওই অ্যাস্পেনেই। দ্বিতীয় বিয়ে এই সময়েই, নব্বইয়ের গোড়ায়, অস্ট্রেলিয়্যান অ্যাক্ট্রেস্ ক্যাসান্ড্রা ডেলানির সঙ্গে, এবং বছর-দুয়েকের মাথায় বিচ্ছেদ ও তিক্ত সমাপয়েৎ। ১৯৯৪ সালে পাব্লিশ করেন ‘টেইক মি হোম : অ্যান অটোবায়োগ্র্যাফি’। মিউজিক্যাল ক্যারিয়ার প্রায় ভেস্তে যাবার মুখে ডেনভার হিউম্যানিট্যারিয়্যান কাজকর্ম বাড়িয়ে দেন এবং শুরু করেন পুরোদমে ফ্লায়িং; এই ফ্লায়িং, উড়ালচারিতা, ডেনভারের ভাষায় তার ফার্স্ট ল্যভ। কুড়ি বছরের পুরনো অভিজ্ঞ ও অনুমোদিত বৈমানিক ডেনভার তার শেষের বছরগুলোতে একের-পর-এক পরীক্ষণ-উড়োযান খরিদ করার দিকে ব্যস্ত হয়ে পড়েন; এমনই এক এক্সপেরিমেন্ট্যাল্ এয়ারক্র্যাফ্ট, দ্বি-আসনওয়ালা ফাইবারগ্লাস্ উড়োজাহাজ, ডেনভার খরিদ করেন মৃত্যুর ইমিডিয়েট আগের দিনটায়। মন্টেরি উপকূলের কাছাকাছি শিল্পী একটা বাড়ি ভাড়া নিয়েছিলেন অবকাশ যাপনের জন্য। ঘটনার দিন ১২ অক্টোবর ১৯৯৭। সদ্য-পার্চেজ-করা প্লেনটা চালিয়ে ডেনভার সান্তা মারিয়া থেকে মন্টেরি আসেন। ইচ্ছে ছিল উড়োযানখানা ভালোমতো বোঝা। খানিক জিরিয়ে নিয়ে দুপুরের দিকে একদম নিচু মণ্ডল দিয়া টাচ-অ্যান্ড-গ্য অনুশীলন করছিলেন, তিন-তিনটা ল্যান্ডিং করেছিলেনও সফলভাবে, শেষবার ফ্যুয়েল ফুরায়ে যাওয়ায় রিজার্ভট্যাঙ্ক কানেক্ট করাতে যেয়ে কিছু-একটা বিপত্তি দেখা দেয় এবং মুখ থুবড়ে পড়ে গোটা উড়োযান মন্টেরি উপকূলে। ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যায় ডেনভারের দেহ। লোক্যাল লোকজন দেহবিচ্ছিন্ন গোটাকয়েক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কুড়িয়ে ব্যাগে পোরেন। অন্ত্যেষ্টি-সৎকার সমাপনের পরে ডেনভারের আত্মজা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় একটা উড়োজাহাজে চেপে তার বাবার দেহছাই প্রিয় কলোর‌্যাডো রকি মাউন্টেনের মাথায়-শরীরে ছিটিয়ে ছড়িয়ে দেন। অসম্ভব ডিপ্রেশনে ভুগছিলেন ডেনভার, দেখে যদিও বোঝা যেত না টেলিভিশনস্ক্রিনে, মৃত্যুর পরে নানান জায়গায় স্মৃতিচারণে ডেনভারের ঘনিষ্ঠজনেরা জানিয়েছেন।

সালাম নমস্তে

বর্ষিত হউক শান্তিবৃষ্টি, তোমার ওপর, ওগো পরমপ্রিয়! তোমার ভেতরে যেই মৃদুপবন-ঝিরিঝিরি ঈশ্বরী বিরাজিছেন, অয়ি বিপত্তারিণী বিপদ আমার, প্রণত হই তব সকাশে তাহার সম্মানে। এই শান্তি, এই স্নিগ্ধ কোমল গান্ধার, এই সুরমল্লার। “একদম একলা ব্যক্তিভূমিকা দিয়েও দুনিয়া পাল্টানো সম্ভব অল্প-অল্প করে — এমন নয় যে চেইঞ্জ সাধনের জন্যে একদল বিদ্রোহী কিংবা গাদা-গাদা তদ্বিরকারী-লবিয়িস্ট অত্যাবশ্যক। দুনিয়ার দিন বদলাইতে সেই লোকটাই কাফি যে নিজের ভেতরে দেখতে-পাওয়া সাচ্চা পথে নিজে হাঁটে এবং অপরের হাঁটার সুবিধার্থে পথটা সাধ্যানুসারে সুগম রাখতে সচেষ্ট থাকে। তেমন কঠিন কোনো ব্যাপার না আদৌ। মুদিদোকানে, তেমাথার ভিড়বাট্টায়, আপনার সামনে এসে খাড়ানো হন্তদন্ত লোকটাকে একটু সুযোগ না-হয় দিয়েই দিন দ্রুত তার কর্ম-সমাধার — শান্তি এইটেকেই বলে, দ্যাট’স্ পিস্, এই সহিষ্ণু পরহিতবাসনা।” আরও অল্পস্বরে ডেনভার অন্যত্র বলছেন, পিস্ ইজ অ্যা কনশ্যাস্ চয়েস্। প্রত্যেকে আমরা পরের তরে এসেছিনু সংসারে, এই কথারই যেন প্রতিধ্বনি শুনি যখন ডেনভার বলেন : “আমি বিশ্বাস করি যে এই পৃথিবীতে একে-অপরের জন্যে জন্মেছি আমরা এবং বেঁচে আছি একে-অপরের জন্যে, একে-অপরের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ-কদাচারের জন্যে এখানে কেউই আসিনি আমরা। এই জিনিশটা আমাদের প্রত্যেকেরেই স্বীকার করে নিতে হবে যে এখানে একজনের কাছে আরেকজন আমরা আশ্চর্য উপহারস্বরূপ — তুমি তা যা-ই হও, তোমার ও আমার মধ্যে যত বৈরী ঝগড়াঝাপট-বেমিল-ডিফ্রেন্স থাকুক-না-কেন, উপহার যেন অমর্যাদা না-করি কভু।” দুনিয়াটা তো কঠিন কিছু না আদৌ, সহজিয়া সামুদ্রিক সাবলীলতাই তো দুনিয়ার আদি থেকে অন্ত অব্দি ছড়ানো, অন্ত দেখা না-হলেও অন্তেরই দিদার-নিদর্শন পাওয়া যায় আদিতে। এ-ই ইতিহাস, জীবনের, মহাবিশ্ববৈভবের : older than the trees, younger than the mountains, blowing like a breeze. এবং এই পৃথিবীই তো মহাশূন্যসমুদ্দুরে ‘অলমোস্ট হ্যাভেন’, যে জানার সে ঠিকই জানে এই কথাটার অন্তর্নিহিত মানে, যে জানার সে ঠিকই জানে এই কথাটার কতটুকু মিথ্যে এবং কতটুকু সত্যি। পৃথিবীর ইতিহাস তো ওয়ার্ল্ডব্যাংক-ওভ্যালঅফিস-পেন্টাগনের নথিপত্তরে নেই, থাকার কথা না, পৃথিবীর ইতিহাস আছে গানে। কেবল ইতিহাসই নয়, এমনকি বিজ্ঞানের আদি সূত্র ও দর্শন গুঁজে রেখেছে মানুষ গানের কোডিফিকেশন প্রক্রিয়ায়; এখানে, ওখানে, এই বিপুলা দুনিয়াদারির সবখানে; যেমন বাংলার লজিকগুলো যত অনক্ষর আউলাবাউলা মানুষগুলোর মুখবাহিত ও স্মৃতিবিতরিত শ্লোকে বেঁধে-রাখা, ড্যারিডা-ফ্যুকো-স্যস্যুরের ন্যায় কিতাবের পেইজে নয়, বাংলার দর্শন-যুক্তিবিজ্ঞান সমস্তই গানের গতরে সুরে পুরে-রাখা; গানসংবাহিত দর্শনভূখণ্ডের বাসিন্দা আমরা। সালাম, নমস্তে, সদাপ্রভু মঙ্গল করুন সর্বজনের, সাব্বে-সাত্তা সুখিতা ভবন্তু।

Comments

comments

জাহেদ আহমদ

জাহেদ আহমদ

অনিয়মিতভাবে লেখালেখিলিপ্ত, মূলত নোটক, মুখ্যত প্রকাশবাহন ফেসবুক

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: , , , , , , , , , , ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি