সাম্প্রতিক

মেজো খালার আচার ঘর । ঈপ্সিতা বহ্নি

অনেকদিন পর দুপুরবেলা বাসায় ভাত খেতে বস্‌ছি।

খাওয়ার মাঝামাঝি পর্যায়ে মা এক বাটি আচার দিয়ে বললো, “উপমা, এটা খাস, তোর মেজো খালার আচার।”

এক ধাক্কায় আমি পৌছে গেলাম মিরপুরের একটা দোতলা বাসার সিক্রেট আচারের রুমে, বয়স আমার কমতে কমতে পৌছে গেলো এক অঙ্কের সংখ্যায় যখন শুক্রবার মানেই মেজো খালার বাসা। সেই বাসায় ছাদ ভর্তি গোলাপ ফুল, সুষোমনির পাগলামি, খালুর নিত্য নতুন ইনভেনশন আর সুষোমনির রুমের আড়ালে লুকানো আরেকটা রুম, সেই রুম ভর্তি হাজার পদের আচার, আর আমার প্রিয় আমের কাষ্মীরি আচার।  ‘ইন্দি বিন্দি সিন্ধি’ শুনতে শুনতে, লুকিয়ে লুকিয়ে আমার আচার খাওয়া চললো যতদিন না পর্যন্ত আমরা বড় হতে হতে স্কুল-কলেজ-কাজের চাপে নিজেদের ছোট মানুষী দুনিয়াটাকে একেবারেই ছোট করে ফেললাম। তখন শুক্রবার হয়ে গেল মাসে একদিন, মাসে একদিন হয়ে গেল বছরে একবার, বছরে একবার হয়ে গেল “আচ্ছা, ছুটি পেলে না হয় গিয়ে দু’দিন থেকে আসবো” থেকে “একদমই ছুটি পাইনা”- তে।

যা কিছু সারাজীবন থেকে যাবে ভেবে আর আঁকড়ে ধরিনি তার সব ধীরে ধীরে দূরে চলে যাচ্ছে, যা কিছু ফিরে আসবে ভেবে আর খুঁজতে যাইনি তাঁর অনেকটাই আর কখনো ফিরবেনা। তখনো বুঝিনি গাঁদা ফুলের গাছ দেখলে নানীবাড়ির যেই উঠানের কথা মনে হয়, সেটা আরেকবার দেখার আগেই বদ্‌লে যাবে, দূরের আযান শুনলে চোখের সামনে দাদীবাড়ির যেই তারা ঢালা ছাদের ছবি ভেসে উঠে, সেখানে বসে নারকেল পাতার আড়ালের চাঁদ দেখতে দেখতে গানের কলি খেলতে চাইলে, শুধু কান্নাই পাবে।

আমরা বড় হয়ে গেলাম, আমার পৃথিবীটা সিক্রেট আচারের পৃথিবীটার চেয়ে বড় হয়ে গেল! তবুও সেই আচারের ঘরটা যে একসময় আমার পৃথিবী থেকে পুরোপুরি উধাও হয়ে যাবে, সেটা কখনোই ভাবতে পারিনি। খালা বেশ অনেক বছর হলো আমেরিকায়, খালু চলে গেছেন না-ফেরার দেশে। মিরপুরের সেই আঁচারের দুনিয়াটা এখন একদম অন্যরকম! খালার সাথে আম্মু প্রায়ই কথা বলতে চায়, আমি স্কাইপে অ্যাড করবো, এই করবো সেই করবো বলতে থাকি।তেমনভাবে কারো সাথেই আমার যোগাযোগ হয় না, কথাও হয় না, খালার সাথেও হয় না। সময় পেলে আলসেমী ছাড়া কিছুই করিনা!

কয়েক বছর আগে কেউ একজন প্রশ্ন করেছিল যে কখনো নস্টালজিক অনুভব করি কি না। খুব সম্ভবত আমার উত্তর ছিল, খুব কম! তখনও বুঝতে পারি নি,  যা কিছু সারাজীবন থেকে যাবে ভেবে আর আঁকড়ে ধরিনি তার সব ধীরে ধীরে দূরে চলে যাচ্ছে, যা কিছু ফিরে আসবে ভেবে আর খুঁজতে যাইনি তাঁর অনেকটাই আর কখনো ফিরবেনা। তখনো বুঝিনি গাঁদা ফুলের গাছ দেখলে নানীবাড়ির যেই উঠানের কথা মনে হয়, সেটা আরেকবার দেখার আগেই বদ্‌লে যাবে, দূরের আযান শুনলে চোখের সামনে দাদীবাড়ির যেই তারা ঢালা ছাদের ছবি ভেসে উঠে, সেখানে বসে নারকেল পাতার আড়ালের চাঁদ দেখতে দেখতে গানের কলি খেলতে চাইলে, শুধু কান্নাই পাবে।

কাউকেই আমি মিস্‌ করি না, তবুও আমের কাশ্মীরি আচার দেখলে আমার সবার আগে মেজো খালার আচার ঘরের কথা মনে পরবেই, লাবণী আপুর হলুদের ঝাপসা একটা ছবি, সুষ্‌মী আপুর পাগ্‌লামী, খালুর ইঞ্জিনিয়ারিং আর হাসীব ভাইয়ার ক্রিকেট খেলার মেডেল এর কথা মনে পরবেই।

Comments

comments

ঈপ্সিতা বহ্নি

ঈপ্সিতা বহ্নি

কবি। বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর অধ্যয়ন শেষে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন। গবেষণা সহকারী হিসেবে নিযুক্ত। প্রকাশিত কবিতাবই : ‘বন্ধু শোনো এই কবিতা তোমার জন্য লেখা’; ভাষাচিত্র, ঢাকা।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি