টার্কের শাহবাগ, শাহবাগের স্মৃতি | ঈপ্সিতা বহ্নি

Untitl copy 2

এক বছর আগে এমনই এক ফেব্রুয়ারিতে আমি ছিলাম ব্র্যাকের সাভার ক্যাম্পাসে বন্দী। বইমেলায় যেতে না পারার দুঃখে কাতর।

এরই মধ্যে এক সন্ধ্যায় বাবা ফোনে জানালো যে, বাচ্চু রাজাকারের ফাঁসির আদেশ দিয়েছে আদালত। পরদিন কসাই কাদেরের রায় এবং জামাতের হরতাল।

তো পরদিন হরতালের জন্যে ক্লাস নাই, আমি সকাল থেকে একটু পরপর কখনো বাবাকে, কখনো মাকে, কখনো ল্যান্ডলাইনে ফোন করে যাচ্ছি। প্রায় সব অপরাধই প্রমাণের খবর পাচ্ছি, রায়ের অপেক্ষা!

শেষ যখন বাবাকে ফোন করলাম, বাবার গলা ভারী, তাতেই আমার মন খারাপ, বাবার কাছ থেকে ফোন নিয়ে মা জানালো, ‘মৃত্যুদণ্ড নয়, ৩০০ মানুষকে হত্যা করার শাস্তি- যাবজ্জীবন।’

“আচ্ছা, রাখি।” বলে আমি ফোন কেটে দিলাম।

সারাদিন বাসায় আর ফোন করিনি, কখনো  হ্যাপি রিডিং আবার কখনো বিথীকায় মন ভালো করার চেষ্টা। কিছুতেই কিছু হয় না। সন্ধ্যার দিকে মা ফোন করলো, “উপমা, সবাই শাহবাগে জড়ো হচ্ছে প্রতিবাদে…”

আমি ভাবছি, কি আর হবে? ডিনারের পর বাবার ফোন, “আরে গাধা, টিভি দেখ, খবর দেখায় না তোদের ওখানে?” ততক্ষণে খবর শেষ। পরের দিন থেকে আমার আর বইমেলার কথা মনে নেই- যত দুঃখ শাহবাগে থাকতে না পারার জন্যে।

সকালে লাইব্রেরি যেতাম শুধুই শাহবাগের খবর পড়বো বলে, রাতে আনন্দপুরে টিভিস্ক্রীনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকি; ছেলেদেরকে খেলার চ্যানেল পাল্টাতে বলি শুধু শাহবাগের স্লোগান দেখবো বলে। বাবা-মা, বন্ধুদের বলি, “শাহবাগ গেলে ফোন করো, একটু স্লোগান শুনব।” কোন টিচার ঢাকায় গিয়েছিল শুনলেই শুনতে চাই শাহবাগের কথা। তাঁদের অনুরোধ করি ছবিগুলো দেখানোর জন্যে, আমাদের একবার নিয়ে যেতে…।

আমরা যেমন সাভার ক্যাম্পাসে বন্দী, আমার মনোযোগ বন্দী শাহবাগে। বাবা-মা শাহবাগ যায় প্রায় প্রতিদিন, আমি তাদের সাথে কথা বলি, শাহবাগের সাথে কখনো কালো ব্যাজ পরি, কখনো নিশ্চুপ তিন মিনিট। দূরে থেকেও শাহবাগেই রাত; শাহবাগেই ভোর।

১৪ই ফেব্রুয়ারি ২০১৩। শাহবাগ থেকে ঘোষণা ছিল- যে যেখানে থাকবে সন্ধ্যার পর সেখানেই জ্বলবে মোম। সাভার ক্যাম্পাসে সেটা সম্ভব হবে, ভাবিনি। তবুও হল। চিশতীর নেতৃত্বে রেহান স্যারের পারমিশন পাওয়া গেল। স্টাডি আওয়ারে, সময় শুধুমাত্র ১০ মিনিট।

পুরো দেশ যেখানে এক, শাহবাগে মানুষের সংখ্যা যখন লক্ষ ছাড়ায়, যখন আমার বাবার S.M.S পাই যে আমার বাসার গলিতে বাচ্চারা মোম হাতে তৈরি, তখন আমরাও অল্পকিছু ইতিহাস জানতে চাওয়া ছেলেমেয়ে আমাদের ছোট্ট বন্দীক্যাম্পাসে, বার্থডের মোমবাতি জ্বালিয়ে, আমাদের সমস্ত ভালোবাসা নিয়ে প্রস্তুত। কিছুই না থাক, দেশ তো আছে!

রুমে ফেরার সময় দেখি আকাশে একটা নতুন চাঁদ, যেন আমাদের মোম থেকেই আলো পেয়ে জ্বলে উঠেছে, মোম গলে শেষ হয়ে যায়, আকাশে থাকে আমাদেরই আলো।

৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

দেশ নামের পরশমণি

তোমাকে ভালবেসে
চাঁদটাও জ্বলেছে আজ
মোমের আগুনে।

নেচেছে আগুন
আনাচে কানাচে
শহর গ্রামের মোরে
আঙ্গিনা ছাড়িয়ে রাজপথ থেকে
শাহবাগ আজ বাংলাদেশ,
হৃদয়, বিশ্বজুড়ে।

আমি নেই, আমি আছি শাহবাগে
থাকি বা না থাকি
শাহবাগ আছে
মন প্রাণ ক্ষোভ রাগে।
আছে শাহবাগ
যেমন রয়েছ
আকাশ- বাতাস,
সূর্য- তারার মাঝে
যেমন বয়েছ
রক্তধারায়
শিরা-ধমণীর সাথে।

মোম আর মন একি হল
আজ
আমি শাহবাগ এক।
দেশ, শাহবাগ
একি কথা
আজ
আমি শাহবাগ এক।

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩। মোমবাতি প্রজ্জ্বলনের পর, রাজাকারের ফাঁসির দাবিতে সংহতি, শাহবাগ আন্দোলন। অবস্থানঃ ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, রেসিডেন্সিয়াল ক্যাম্পাস, সাভার।

Comments

comments

ঈপ্সিতা বহ্নি

ঈপ্সিতা বহ্নি

কবি। বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর অধ্যয়ন শেষে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন। গবেষণা সহকারী হিসেবে নিযুক্ত। প্রকাশিত কবিতাবই : ‘বন্ধু শোনো এই কবিতা তোমার জন্য লেখা’; ভাষাচিত্র, ঢাকা।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: , , , , , , , , , ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি