সাম্প্রতিক

পাণ্ডুলিপি থেকে । এহসান হায়দার

লাল পাহাড়ের রহস্য

দুপুরের ভাত খাবার সময়েই বাবার সাথে মুখোমুখি হয়ে গেলাম আজ। যেই না টেবিলে গিয়ে বসেছি ওমনি বাবা এসেও বসলেন। কী ব্যাপার রুমি, আজকাল স্কুল থেকে ফিরে তুমি না’কি কোথায় চলে যাও? ফেরো সেই সন্ধ্যের পর! আমি কোনো উত্তর না দিয়ে চুপচাপ খেয়ে যাচ্ছিলাম। বেশ জোরেই বাবা আবার বলল— কী ব্যাপার কোথায় থাকো তুমি? তখন মা এসে বলল— আহ ছেলেটা খাক না আগে তারপর শোনা যাবে। আমার তো পিলে চমকে গেল মার কথায়। ইস রে আজকের ম্যাচটা নিশ্চয়ই বিগড়াবে। সাড়ে তিনটা বাজে আড়চোখে দেখে নিলাম ডাইনিংয়ের ঘড়িটায়। বিকাল সাড়ে চারটায় খুব গুরুত্বপূর্ণ ফুটবল ম্যাচ। ঠিক সময়ে মাঠে না গেলে খবর আছে। পশ্চিমপাড়ার সাথে আমাদের ক্লাবের আজ সেমি ফাইনাল। এবার যদি ফাইনালে না উঠতে পারি তবে আর বোধহয় উঠতে পারব না। কিন্তু বাবাকে কাটিয়ে কিভাবে আজ মাঠে পৌঁছাবো? ইস বাবার আজ কোনো কাজ ছিল না না’কী, আজ-ই বিপদে পড়লাম এখন কী করি? গত বছর একবার খেলতে গিয়ে পা ভেঙ্গে বিছানায় পড়ে ছিলাম তিন মাস। বাবা যদি শোনে আমি আবার ফুটবল খেলতে শুরু করেছি তখন কী হবে তা কে জানে? আমার অলরেডি ঘাম ঝরা শুরু হয়ে গেছে। আল্লা রে আজকে দিনটা মাফ করো।

আমি আর না বলে কোথাও যাবো না। আমার খেয়ে উঠতে দেরি দেখে বাবা খেয়ে চলে গেল। ভাবলাম খাবার পরে রিমান্ডে নেবে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। তাই ধীরে ধীরে খাচ্ছিলাম। খাওয়া শেষে রুমে গিয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকলাম বাবা ডাকে কি’না। এরপর বাবার ঘরের দিকে আস্তে আস্তে যাচ্ছিলাম। মা দেখে বলল— তোমার বাবা ঘুমুচ্ছে। রাতে কথা বলবে, এখন যাও। তোমার কাজ করো গে। ওহ মা তুমি বাঁচালে বলে, মাকে একেবারে জড়িয়ে ধরে ভোঁ দৌড় দিলোাম। যাক আজকে বাঁচা গেল। কিন্তু পথে দেখা হয়ে গেল বড়াপুর সাথে। কি রে রুমি কোথায় যাচ্ছিস? আমি বললাম এইতো রবিদের ওখানে। আচ্ছা তুই কখোন আসবি আমার একটু বাজারে যাওয়া লাগবে রে। আসবো আসবো তুমি যাও। আমি দৌড়ে মাঠে গিয়ে হাজির হলাম।

দেখি সবাই তৈরি। আমি দ্রুত জার্সি, প্যান্ট আর বুট পরে নিলাম। কিন্তু মাঠের এক কোণায় হাতি ভাঙ্গা ক্লাবের দুইজনকে দেখলাম হাসতেছে দাঁত বার করে। হাসির তোয়াক্কা না করে মাঠে নামলাম। সবাই মিলে বেশ কিছু সময় শরীর চর্চা করলাম। দলের কোচ টুলু ভাই বলল— কেউ ঘাবড়াবে না। জনিকে বলল— রুমিকে টাইম টু টাইম হেল্প করো, সর্ট পাসে খেল বল না বানাতে পারলে জিততে পারবে না কিন্তু। আর রুমি বল পেয়ে নো চান্স সোজা গোলে মারবে।

জনি ঘাড় নাড়লো।

রেফারী হলো শঙ্কর স্যার, এম এম কলেজের ক্রীড়া শিক্ষক। লম্বা আর উন্নত নাসিকা নিয়ে স্যার বেশ রেফরীতে সুনাম কামিয়েছেন। থানা শহরে সে-ই সেরা রেফারী, সেরা ক্রীড়াবিদ আরও কত্তো কী। এখন অবশ্য স্যার শিক্ষক হিসেবেই সেরা। মাঝে মধ্যে আমাদের ক্লাবেও এসে পরামর্শটর্শ দেন। মিশুক মানুষ মাইডিয়ার টাইপের, পোলাপান বন্ধু বন্ধু ভাবে স্যারকে। একবার গরমের সময় আম-লঙ্কা খেতে গিয়ে উহু স্যার রীতিমতো অসুস্থ হয়ে গেছিলেন। একদম-ই ঝাল খান না তিনি। খেলা শুরুর বাঁশী বাজলো। আমরা পরেছি লাল জার্সি তাতে সাদা ডোরা কাটা, সাদা প্যান্ট সঙ্গে লাল মোজা কালো বুট যেন একেবারে সুভাষ বোসের লাল ফৌজ। আর পশ্চিমপাড়ারা পরেছে নীল জার্সিতে সাদা ডোরা কাটা, সাদা প্যান্ট সঙ্গে নীল মোজা কালো বুট। দারুন লাগছে ওদেরকেও। মাঠের চারপাশে দুই দলের সমর্থক হই হই করছে। পশ্চিমপাড়ারা বেশ ভালো খেলছে। ওরা এরই মধ্যে বেশ কবার আমাদের গোলপোস্টের ধারেকাছেই বল এনেছে কিন্তু চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছে গÐার আশিস। সে কি জোর তার পায়, ওহ বাপরে বাপ। আমি সব সময় ভয়ে আছি।

এখন বাবা যদি জানেন আমি ভাঙ্গা পা নিয়ে আবার এই ফুটবল খেলছি, তবে আমায় বারোটা বাজাবে এমন কী বাড়ি থেকে বেরও করে দিতে পারে। যাহোক, আমাদের খেলা বেশ জমে উঠেছে এরই মধ্যে একটা মোক্ষম সুযোগ হাতছাড়া করেছি— দর্শকরা অবশ্য তেমন কিছুই বলেনি কারণ, বলটা ছিল লং পাসের যার জন্য ডিরেক্ট শটে গোলটা হবার ছিল আমিও তাই করেছি। আমাদের দলের হবি ভাই রাইট সাইডের স্টাইকার হাততালি দিয়ে বলল— রুমি দারুন দারুন, পরের বার হবে। আমিও হাসলাম। হাফ টাইম হয়ে গেল। হাফ টাইমে আমাদের সভাপতি রবিন ভাই বলল— রুমি চিন্তা করো না। চেষ্টা করো ফাইনালে ওঠা চাই। তারপর ক্যাপ্টেনকে কি যেন বলল কানে কানে। ক্যাপ্টেন জাভেদ ভাই সবার সিনিয়র হাসতে লাগলেন। আমি বুঝতেই পারলাম না আমরা গোলশূন্য হয়ে আছি ৪৫ মিনিট শেষ আর বাকি আছে ৪৫ মিনিট এখন হাসির কী? সবার চোখে মুখে উত্তেজনা কেবল কোনো টেনশন নেই জাভেদ ভাইয়ের। কেমন যেন লাগল জাভেদ ভাইকে আমার কাছে। অন্যদিন হলে জাভেদ ভাই উল্টো সবাইকে ধমকাতো। আজ তার ধমকা ধমকি’র কোনো ব্যাপার দেখছি না। এরই মধ্যে সবাই নামলাম মাঠে কিন্তু জাভেদ ভাই যেন হঠাৎ উধাও হয়ে গেল। দেখলাম মাথা ভাঙ্গা ক্লাবের ওই দুজনের একজনের সাথে জাভেদ ভাই কিছু একটা বলে দৌঁড় দিলো। খেলা শুরু হলো মনের মধ্যে খটকা আমার রয়েই গেল।

আমাদের গোল পোস্ট থেকে বল একেবারে ছোঁ মেরে আশিস বের করে দিলো আউট লাইনের বাইরে ফলে থ্রো পেল পশ্চিমপাড়ারা। ওদের জাম্বু দুঙ্গা মোচড়াইতে মোচড়াইতে এসে থ্রো করল। আবারও আশিস লং হেড দিলো আমি বল ধরে এগুতে লাগলাম কিন্তু সামনেই ঘটে গেল অভূতপূর্ব ঘটনা। জাভেদ ভাই পড়ে গেল- ওরে মা রে বাবা রে বলে! আমি গোল পোস্টে বল কিক করার আগেই বাঁশী পড়ে গেল শঙ্কর স্যারের। কী আর করা জাভেদ ভাই কাতরাইতেছে। আসলে মুখোমুখি ছিলেন জাভেদ ভাই আমার। তিনি বলের দিকে দৌঁড়াইতেছিলেন, কীভাবে পড়লো তাহলে? শঙ্কর স্যার জাভেদ ভাইকে মিষ্টি হেসে লাল কার্ড দিয়ে দিলেন। কারণ কী তা জানতে চাওয়াও হলো না। তিনি খোড়াতে খোড়াতে মাঠ ত্যাগ করলেন। আমাদের দলে এখন ১০জন খেলয়াড়। ভয়ানক পরিস্থিতি। ভারপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন হলো আমাদের গÐার আশিস। পশ্চিমপাড়ার দর্শকরা উল্লাসে ফেটে পড়ছে আমাদের একজন লাল কার্ড পাওয়ায়, কিন্তু গোল তো একটাও হয়নি। 

রবিন ভাইকে বললাম— ভাই যেভাবে হোক জয় আমাদের চাই-ই। কিন্তু পশ্চিমপাড়ারা কেবল মেরেই যাচ্ছে আর আক্রমন করছে অগোছালোভাবে, বুঝে উঠতে পারছি না। আশিস মাঝে মাঝে উপরে এসে খেলে অনেকটা চাপমুক্ত করছে বটে তবে চিন্তাটা মাথা থেকে সরাতে পারছি না। জাভেদ ভাই একা একা কীভাবে গিয়ে পড়লো পশ্চিমপাড়ার রাজের গায়ে বিষয়টা মাথায় ঢুকছিল না। কিন্তু এসব ভাবার সময় এখন নেই। যেভাবে হোক জয় আমাদের চাই। গতবার হেরেছি একেবারে মাঠে আবোল তাবোল খেলে, এবারও ভুল খেলে হারতে হবে! হয় জিতবো নয় হারব। আমি ববি ভাইকে বললাম- ফার্স্ট ফার্স্ট টানেন সামনে পাস দেন—পাস দেন আমি আবার টান দিলোাম আর হঠাৎ দেখলাম আশিস আমার পেছনে চিৎকার করে বলল-আমায় দে। পরমুহূর্তেই গোল উৎসবে মাতলো আমাদের দর্শকেরা। একমাত্র জয়সূচক গোল এলো আমাদের গÐারের পা থেকে। শঙ্কর স্যারও বাজিয়ে দিলেন শেষ বাঁশী। কিন্তু মাঠের এই গোল দু-জন লোকের মুখে হাসি ফোটানোর বদলে যেন হুল ফোটালো। তাদের মুখ দুটো একেবারে বোচা হয়ে আছে- ক্লাব সভাপতি রবিন ভাই আর জাভেদ ক্যাপ্টেনের। আমি বিলুর সাথে বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করব ভাবছিলাম। কারণ, রবিন ভাই আর জাভেদ ক্যাপ্টেন খুশি হওয়ার চেয়ে অখুশিটাই বেশি। আমি আর এগুতে পারলাম না বাড়ির পথেই রওনা দিলোাম। পথে যেতে যেতে কেবল বিলুকে বললাম— বিলু রহস্যটা কী রে? এত কষ্ট করে জিতলাম কিন্তু রবিন ভাই খুশি না জাভেদ ভাই খুশি না। আমার কাছে ঘোলাটে ঠেকছে। যাহোক রাতে খেয়ে একবার ক্লাবের দিকে যাবো তুমি তৈরি থেকো।

এদিকে বাড়িতে ঢুকেই বড়াপুর সাথে দেখা কোথায় ছিলি, আমি সেই কতক্ষণ ধরে বসে আছি। চল বাজারের দিকে যাবো। কী আর করা চললাম বড়াপুর সাথে। মোড়ে গিয়ে ভ্যানে উঠতে যেতেই দেখা মাথা ভাঙ্গার দুই দেঁতেলের সাথে। কী রে রুমি তোর তো পা ভাঙ্গার পরেও খেলাটা এখনও বহাল। যা খেল দেখ কী হয়, বলে চলে গেল। বড়াপু একটু অন্য মনস্ক ছিল কি’না কে জানে শুনতে পায়নি কথাগুলো। আমার একটু ভয় লাগল কথা শুনে। আমাদের ক্লাব তো ফাইনালে উঠেছে আর মাথাভাঙ্গাও পয়েন্টে এগিয়ে থেকে আগেই ফাইনালে উঠেছে কী হবে কে জানে। ওদের খেলয়াড়গুলো একটু বয়স্ক বয়স্ক ষÐা টাইপের।

রাতের খাবার খেয়ে সবাই ঘুমোতে গেলেও আমি জেগে থাকলাম। 

মাকে বললাম—আমার পড়া আছে তাই মাও আর কিছু বলল না। তখন সাড়ে ৯ টা বাজে আমি ছোট্ট টর্চ লাইট নিয়ে বেরিয়ে গেলাম বিলুদের বাড়ির সামনে। রাস্তার পাশেই বিলুর পড়ার ঘর বিলু আলো জ্বালিয়ে বসে বসে আমার অপেক্ষাই করছিল। আস্তে করে কু কু শব্দ করতেই বিলু হাজির হলো। আমরা দুজনে রওনা দিলোাম ক্লাবের দিকে বিলুর সাইকেলে। আমার কাছে ক্লাবের চাবি নেই কিন্তু একটা ছোট্ট ছুরির ফলা আছে যেকোনো চাবীর মধ্যে দিয়ে ঢুকে যায় আর মোচড়ে খুলে যায়। এই ফলাটাই আমার একমাত্র অস্ত্র। আমরা ক্লাবের পেছনের রাস্তা দিয়ে ঢুকলাম ক্লাবের ঠিক দেয়ালের সাথেই শেষ রাস্তাটা। ভেতরে বাল্ভ জ্বলছে এখনও তারমানে কেউ আছে ওখানে। হুমম, বিলু সাইকেলটা সরিয়ে রাখল। এরপর আমরা দুজনেই গড়িয়ে গড়িয়ে চলে এলাম দেয়ালের পাশের জানালার কাছে। জানলায় চোখ দিতেই দেখি রবিন ভাই আর মাথা ভাঙ্গা দলের ক্যাপ্টেন চন্দ্রদাস একসাথে হাসছে। রীতিমতো ঘাবড়ে গেলাম সে কি, ওরাতো আমাদের বিরুদ্ধে ওদের সাথে সভাপতির এতো কী? আমরা তেমন কোনো আলোচনা শুনলাম না ওদের কিন্তু কি সব যেন পরামর্শ করল ওরা। আর কেউ নেই ক্লাবে এত রাতে কী করছে ওরা? বেরিয়ে গেল দুজনেই। আমরা দাঁড়িয়ে রইলাম বেশ কিছুক্ষণ। রবিন ভাইয়ের হোন্ডায় করেই চলে গেল দু’জনে ওরা। আমি আমার পকেটে রাখা ছুরির ফলা দিয়ে চাবি খুললাম আর যেখানে ওরা বসে ছিল সেই টেবিলে গিয়ে তাকাতেই চমকে গেলাম। একি এযে অনেকগুলো শিশুর ছবি এরাই তো বিগত দুই সপ্তাহে হারাচ্ছে।

স্কুলে যাবার পথে না হলে বিকালে মাঠে খেলতে গিয়ে না হলে হঠাৎ হাওয়া বাড়ি ফেরার পথে। ছবিগুলোর পাশে একটা সাদা খাম। কী আছে খামে তা দেখতে মন চাইলো। খামটা খুলতে বেরিয়ে এলো অজানা কি এক রহস্যময় চিঠি। চিঠিতে লেখা—’পুতুলগুলো নিয়ে এসো, লাল পাহাড়ের গোড়ায়— ফাইনালের এক ঘন্টা আগে। মনে রেখো পুতুলগুলো 

ওই দিনই নিয়ে যাবে।’

চিঠিটা পড়ে আমি আর বিলু দুজনে সমানে ঘামছি। কি লেখা এসব? দু’জনের মাথায়-ই এলো না এইভাবে খামের মধ্যে পুতুল দিয়ে কী বোঝানো হয়েছে। আর কেন, কে লিখে পাঠিয়েছে- কাকে লেখা? পাশের ওই ছবিগুলোই বা কেন ছিল? তবে কী ক্লাবের আরও কোনো ব্যবসা আছে? খামে তো কারো নাম লেখা নেই তাহলে কে কাকে পাঠালো? এইসব ভাবনার মধ্যেই মনে হলো এইগুলো লিখে নেয়া ভালো। 

বিলুকে বললাম বিলু একটু লিখে নিবি এই চিঠিটা? বিলু পটাপট লিখতে শুরু করল আর আমার ভাবনাগুলো এলোমেলো হয়ে গেল। কীভাবে এই ছবিগুলো এখানে এলো? নিশ্চয়ই কোনো ঝামেলা আছে। বিলু কাগজে লেখা তুলছিল ঠিকই কিন্তু ততক্ষনে ক্লাবে আসার রাস্তায় হোন্ডার শব্দ শুনতে পাওয়া গেল। বিলুকে বললাম, বিলু কাগজটা নে বের হ, দৌড় দে! ভয়ে কাঠ হয়ে গেলাম যকোনো রকমে রক্ষা হলো ঠিক-ই কিন্তু রবিন ভাই আর চন্দ্রদাস দৌঁড়ে গিয়ে চাবী দিয়ে খুলল ক্লাবঘর আমরা দুইজনে জানলায় চোখ রেখেছি কী বলে তা শুনতে। কিন্তু তারা যা বলল তাতে কানকে বিশ্বাস করা দায় হলো। বুঝলাম এই চিঠিই একটা গোপন কোড কিন্তু কী তা আমাদের জানা নেই।

আর ওরা কোনো দুষ্টু লোকের দল না হলে গোপনে ওদের কী এমন কাজ। কাল সকালে এসেও তো পারত নিতে। কী এমন জরুরি ওই খামের চিঠি আর ছবি। ছবির কথা মনে পড়তেই দেরি না করে আমরা পালাই পাছে যদি ওরা বুঝে যায় আমরা ঢুকেছি। তখন চন্দ্রদাস-ই বলল ওরা তো খামটা আটকানো অবস্থায় পাঠাইছিল তুমি খুলেছিলে? রবিন ঘাড় নেড়ে না বলে। চন্দ্র তখন বলে ওঠে— আমাদের এখানে কেউ এসেছিল আর এই খাম-ছবি সব তারা দেখেছে। আমি বিলুর কানে কানে বললাম —বিলু পালা। এরপরের কথা খুবই মজার বিলু ঠিকই পালাল আর আমি সাইকেলে বসতে গিয়ে ছিঁড়ে ফেললাম ছোট মামার এনে দেওয়া আমার একমাত্র জিন্স। তাও আবার পশ্চাদদেশের কাছেই ছিঁড়লো। সব সময় বিপদে পড়লে আমার বাঁধা একটা আসবেই। দুষ্টু লোকদের জন্যে আমার প্যান্টটা গেল মাকে কী বলবো— এমনি পড়ে গেছিলাম তাই ছিঁড়ছে, মনে হয় না মা’র প্রশ্ন থেকে রক্ষা পাবো। আর মামা এত ভালো একটা প্যান্ট দিলো আমি ছিঁড়লাম ছিঃ ছিঃ পুরো মনটাই এবড়ো থেবড়ো হয়ে গেল। 

বাড়ি ফিরে বাবার বকুনি খেতেই হলো। কোথায় ছিলাম কী করি টো টো ছাড়া কাজ নেই নানান ধরনের পঁচা পঁচা কথা বাবা বলল। আমি শুধু মনে মনে বললাম, দেখো না এবার কী করি তখন বলতে হবে সবার সামনে রুমি আমার ছেলে। নিজেকে হেব্বি বীর বীর লাগছে ভেতরে ভেতরে। কিন্তু আমি তখনও জানতাম না এই চিঠির শেষ কোথায়! দু-দিন পর খেলা। সমানে সবাই প্রাকটিস করছে। আমার কেবল যাওয়া হলো না আবার চিঠিটারও সুরাহা হচ্ছে না। বিলু এসেছিল আমাদের বাড়িতে ওকে বললাম— এই চিঠিটাই সব আমার যা মনে হচ্ছে। দেখি কী করা যায় চেষ্টা তো করছি। পরদিন ফাইনাল প্রাকটিস সবাই প্রাকটিসে মগ্ন। শঙ্কর স্যারও এসেছেন প্রাকটিস দেখতে। যা তা ব্যাপার নয় থানা গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট। জিততে আমাদের হবেই। প্রাকটিসে নামলাম তখন-ই একটা খটকা লাগল মাথার মধ্যে আরে এই অঙ্কটা তো রাশিয়ান একটা গোয়েন্দা বইয়ের মতো। তবে তো পেরে গেছি। মনে আনন্দ নিয়ে প্রাকটিস শেষে ফিরে এলাম বাড়ি। বসে গেলাম মেলানোর কাজে। কিন্তু কিছুতেই মেলাতে পারলাম না। যা হয় তার কোনো মানে নেই। পরে একটা কথা মনে হলো আরে এই ‘পুতুল’ কি বিশেষ কিছু?

’পুতুলগুলো’ কি? আরে এর মানে কি চিন্তায় মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল তখন। হয়তোবা ভুল কিছু হবে কারো হাতে পড়ে যেতে পারে ভেবে এই বুদ্ধি এটেছে দুষ্টু লোকেরা। এটা এমন ধন্দের সৃষ্টি করেছে যে বোঝা কষ্ট। একটা রাশিয়ান গোয়েন্দার বই পড়তে শুরু করলাম- হঠাৎ দেখলাম সাধারনত অন্যায়কারীরা সব সহজ উপমা ব্যবহার করে গোপন করে ভয়ানক কিছু। কথাটা আমার মনে ধরলো। তখনই মনে হলো—

চিঠিটার ‘পুতুল’ শব্দদটি  একটা কোড। যা দিয়ে অন্য দামি কিছু বোঝানো হচ্ছে। গোয়েন্দারা মাত্রই এমন ভাষা ব্যবহার করে সাধারন মানুষে যা বোঝার কথা না— তারমানে কি এমন, এটা কোনো পুরোনো দিনের পুতুল? যার দাম অনেক। ভাবনার জালে আটকে গেলাম যেন।

‘পুতুলগুলো’ নিয়ে এসো, লাল পাহাড়ের গোড়ায়— ফাইনালের এক ঘন্টা আগে। মনে রেখো পুতুলগুলো 

ওই দিনই নিয়ে যাবে।

আচ্ছা, পুতুলগুলোর মানে কি তবে ওই ছবির শিশুরা? হয়তো, পুতুল বলে আসল কিছুকে গোপন করা হচ্ছে- কি সেই গোপন বিষয়? কাকে বলে এর আসল ধাঁধার উত্তর মিলবে। কাউকে বলেও যদি উল্টো সব গোলমেলে হয়ে যায়। চিঠির উত্তর মিলে গেছে মনে হলো আমার, হতেই হবে ওই ছবির সাথে জড়িত এ চিঠি। তবে তো শিশুরাই হলো— পুতুলগুলো।

ইউরেকা! মনে হয় এটাই ঠিক। নিজের বিশ্বাবা জোর বেড়ে গেলো— কারন, গোপন কথা এটাই। তারমানে হলো, শিশুদের হারানো গোপনীয়! এত কষ্ট করে কথাগুলো মেলানোর পর আর বসে থাকতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল এটা তবে— গোপনীয়, লাল পাহাড়ের রহস্য। চিঠি থেকে  কী বের হলো এ! কীভাবে সব পারব জানিনা। এদিকে রবিন ভাইরাও বুঝেছে, যে কেউ ওই সাদা খাম খুলেছিল কিন্তু কী লেখা তা কারো বাপের সাধ্য নেই উদ্ধার করা। তাই তারা মনের আনন্দেই ছিল বেশ। ওরা বোঝেওনি যে, এটা আমরা উদ্ধার করে ফেলেছি।

আমি বিষয়টা নিয়ে আশিসের সাথে কথা বলে চলে গেলাম শঙ্কর স্যারের কাছে। সব গিয়ে বললাম খেলার মাঠ থেকে ক্লাবঘর পর্যন্ত। স্যার অবাক হয়ে গেলেন শুনে। তারপর স্যারকে নিয়ে আমরা করলাম ফাইনাল খেলার আগের পরিকল্পনা। আমি, আশিস, বিলু তিনজনে তিনটা সাইকেলে রওনা দিলাম শহরের পাশের লাল পাহাড়ের গোড়ার দিকে। 

সেখানে গিয়ে সতেরোটা বাচ্চা দেখে আমি ওহ করে উঠলাম। সাথে সাথে বুদ্ধিহীনতার জন্যে ধরা পড়লাম দুষ্টু লোক আমাদের সভাপতি রবিন আর মাথাভাঙ্গা ক্লাবের টেকো ক্যাপ্টেন চন্দ্রদাসের হাতে। ওরা দলে মোট পাঁচজন। আমরা তিনজনে ঠিক ধরা খেলাম এখন ভয় হলো ওরা না পালিয়ে যায়। পাহাড়ের ঠিক গোড়ায় রয়েছে একটা ট্রাক। ওই ট্রাকেই হয়তো বাচ্চাদের নেবে। কিন্তু কিসের অপেক্ষা করছে যেন। রবিনের লোকেরা আমাদের তিনজনকেই বাঁধলো তারপর ফেলে রাখল চিৎ করে পাহাড়ে। রবিন হাসতে হাসতে বলল— এই কে গেছিল সেদিন ক্লাবে তোরা কয় জন ছিলি রে আর কে কে ছিল? বিলু ভয়ে বলেই দিচ্ছিল আমি বললাম না আমরা কেউ যাইনি। তবে এখানে এলি কী করে? আসলে আমরা একটু ঘুরতে বের হয়েছিলাম। আর পাশেই তো টাটকা লেবু পাওয়া যায় তাই। রবিন আর চন্দ্র আমাদের বুদ্ধির প্যাঁচটা ধরতেই পারলো না— যা বললাম তাই সে বিশ্বাস করল। বলল— তা কি আর করা ধরা পড়ে গেলে আমাদের জালে। তোমাদের কিডনি বেঁচে বেশ টাকা আসবে। এখন আর খেলা হবে না সোনামনিরা, তোমাদেরকে অপারেশনের আগে ছাড়বো না।

বিলু আর আমাদের গন্ডার আশিস বিড়ালের মতোন মাফ চাইতে লাগল আমাদের ছেড়ে দাও আমরা জানতাম না। কিন্তু চন্দ্রদাস হেসেই শেষ কচি শিশু সব! 

এর একটু পরেই মাইকে ঘোষণা এলো রবিন তুমি তোমার দলবলসহ আমাদের কাছে বন্দি হাত তুলে দাঁড়াও নড়বে না কেউ। যে নড়বে গুলি করা হবে। পুলিশ চারদিক থেকে তোমাদের ঘিরে ফেলেছে। এরপরও রবিন ভাই চালাকি করতে গেল পাঁচ সাত বছরের একটা বাচ্চার মাথায় নিজের হাতের রিভলবার ধরে পালাতে চাইছিল। ঠিক সেই মূহুর্তে মজাটা দেখালো আমাদের গন্ডার আশিস। ওই শরীর নিয়ে একেবারে উড়ে গিয়ে রবিন ভাইয়ের হাতে লাথি মারলো রিভলবারটা পড়ে গেল হাত থেকে আর রবিন ভাই আহ্ আহ্ করতে লাগল। তারপর আর কেউ নড়লো না। যে যার জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল পুলিশ এসে ওদের সবাইকে বাঁধলো, শিশুরা মুক্ত হলো লাল পাহাড় থেকে এরপর শঙ্কর স্যারের সাথেই ফিরলাম খেলার মাঠে। ফাইনাল খেলায় আমরা জিতলামও। একেবারে শেষ বিকালে আমি ভয়ে ভয়ে বাড়িতে ঢুকলাম। বাবা নিশ্চয়ই খেলার বিষয় জেনে গেছে— আজ বোধহয় রক্ষা নেই। কী হবে কে জানে?

সন্ধ্যেয় বাবা এসে হাজির সঙ্গে বাবার বন্ধু আমাদের থানার ওসি মিজান আঙ্কেল। দেখে একেবারে আমি চুপ মেরে গেলাম। পা দু’টো এরই মধ্যে কাঁপতে শুরু করেছে আমার- বাবা সব জানলে রেগে গিয়ে হয়তো সব বন্ধ করে দেবেন।

কিন্তু কি কান্ড ঘটলো— আমাকে অবাক করে দিয়ে বাবাই সব বলে দিলো বাড়ির সবার সামনে। বড়াপু বলল, কি রে- তুই পড়ালেখার ফাঁকে গোয়েন্দা হয়ে গেলি না’কি? ঘটনাটা সবাই জেনে যাবে তা তো ভাবিনি আগে তাই লজ্জা পেয়ে গেলাম বড়াপর কথায়। বাবা বেশ খুশি মনে হলো। আর মা সেই সময় একেবারে গরম তেলে ভাজা চপ নিয়ে হাজির সবাই বেশ মজা কওে খেল। পরদিন খবরের কাগজে বড় বড় করে ছাপা হলো— লাল পাহাড়ের রহস্য সাথে আমাদের তিনজনের ছবি। আর পাড়ায় আমাদের বেশ কদরও বেড়ে গেল এই ঘটনার পর।

Comments

comments

এহসান হায়দার

এহসান হায়দার

এহসান প্রকৌশলী রূপে পড়াশোনা করলেও, পেশায় সাংবাদিক। জন্ম-৩০ মার্চ। জন্মস্থান খুলনা, বসবাস করছেন ঢাকায়। এহসান বর্তমানে ‘রূপকথা’ নামে একটি শিশু-কিশোর পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। নিজেকে পরিচয় দেন ছোটকাগজ কর্মী হিসেবে। কারণ, কবিতা প্রবন্ধ এই ছোটকাগজেই ছাপতে ভালো লাগে। একান্ত ইচ্ছে শিশুদের জন্যে একটি নতুন ধরনের জগত তৈরি ‌‍করা। ছেলেবেলায় শিশুসাহিত্যর প্রতি যে আগ্রহ জন্মেছিল তা থেকে দূরে যাওয়া যায়না- আর তাই শিশুদের নিয়ে লিখতে ভালো লাগে। ইমেল : shubornoarjo@gmail.com

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি