সাম্প্রতিক

পাণ্ডুলিপি থেকে । রুমা মোদক

রূপে চমক আনে বিজলী মার্কা সাবান

দোকানে ঝুলানো বিজ্ঞাপনটিতে দাঁত কেলিয়ে হাসছে উঠতি নায়িকা নিশি। মাত্রই সিনেমা করতে এসে হৈ চৈ ফেলে দিয়েছে মেয়েটি, যতোটা না অভিনয় দিয়ে তার চেয়ে বের্শি এক ক্রিকেট তারকাকে ঘিরে স্ক্যান্ডেলিং এর জন্ম দিয়ে। পত্রিকা খুললেই তাদের প্রেম-যৌনতা নিয়ে রগরগে নিউজ। দোকানে ঝুলানো নিশির উগ্র হা খোলা জামার বগল কাটা হাতে সবুজ রং এর বিজলী মার্কা অসহায় ম্লান সাবানটির দিকে তাকিয়ে আব্দুল খালেকের কথা ভাবতে না ভাবতেই আব্দুল খালেক এসে “সুইটি স্টোরের’’ সামনে দাঁড়ায়। উপজেলা সদরের বাজারের মেইন পয়েন্টে একচালা টং দোকানটি মনোহারি দোকান হিসাবে এলাকায় সুপরিচিত। কেননা হরেক রকম জিনিস মেলে এখানে। মূলত প্রতি সপ্তাহে বিক্রয়কর্মীরা নানা কিসিমের পণ্য গছিয়ে দিয়ে যায়, ঝুলিয়ে দিয়ে যায় নিত্য নতুন বাহারী বিজ্ঞাপন। এক্ষেত্রে ঈমান আলী যে নীতি মেনে চলে, তা হলো সে সেই পন্যই রাখে যে পণ্য বিক্রয়কর্মীরা বাকিতে দিয়ে যেতে রাজি হয়। বিক্রি হলে টাকা এই শর্তে অনেক বিক্রয়কর্মী রাজি হয়, অনেকে হয় না। এই নতুন সাবানটিও এক বিক্রয়কর্মী গছিয়ে দিয়ে গেছে একই নীতিতে। আর কেউ না হোক প্রায় প্রতি সপ্তাহে সাবানের খোঁজে আসা আব্দুল খালেক যে একবার ঢুঁ মারবেই তাতে কোনো সন্দেহই ছিলনা ঈমান আলীর। দীর্ঘ পাঁচ থেকে সাত বছর তো হবেই। ঈমান আলী দেখছে আব্দুল খালেক সুইটি স্টোরে আসে, এ সাবান সে সাবান, নতুন আসা সাবান, পুরানো সাবানের মোড়ক সব উল্টে পাল্টে দেখে, গন্ধ শুকে তারপর অপেক্ষাকৃত নতুন সাবানটি কিনে নিয়ে চলে যায়। আশেপাশের দোকানদারদের ধারনা এটা তার বাতিক। দোকানে দোকানে ঘুরে সাবান খোঁজা। তারা বিরক্ত হয়। কিন্তু ঈমান আলী হয় না। তার একটা অনুক্ত কারণ অবশ্য আছে, ঈমান আলী যদিও তা কাউকে বলেনা এমনকি আব্দুল খালেককেও না, তা হলো এই যে ঈমান আলীও খালেকের মতোই নিঃসন্তান। খুব আগ্রহ নিয়ে সামনে দাঁড়ানো আব্দুল খালেককে নতুন আসা সাবানটি দেখায় ঈমান আলীএকডা বালা গতরের হাবান নু আইছে খালেক বাই ! আব্দুল খালেকের দৃষ্টি বিস্ফোরিত হয়। বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে ঈমান আলী বাতিকগ্রস্ততার ছায়া খুঁজে পায় না। ঈমান আলীর বোধ হয়, আব্দুল খালেক কিছু খুজছে। দৃষ্টিতে তার বাতিকগ্রস্ততা নয়, অনুসন্ধিৎসা। কী খুঁজে আব্দুল খালেক, ঈমান আলী বুঝতে পারে না।

.

চারা গাছে নতুন পাতা

খুব ভোরে গরুর দুধ দুইয়ে, গরু দুটোকে পাশের বিছরায় ডিকরা দিয়ে, দু’লিটার দুধ এসিসটেন্ট ম্যানেজারের বাংলোয় পৌঁছিয়ে, বাকী দুধ টুকু ঘাগড়ায় ভরে সোয়ামী বীরেন উড়াংকে খাইয়ে দাইয়ে উপজেলা সদরের বাজারে পাঠিয়ে, নিজে দুটো মুখে দিয়ে কাজে যায় রূপালী উড়াং। সেই কবে উড়িষ্যা থেকে এসেছিলো পূর্বপুরুষেরা, তখন থেকেই একই জীবন, পরম্পরাক্রমে। বাইরের পৃথিবী যতোই বদলাক বীরেন উড়াং রূপালী উড়াংরা তার খবর রাখেনা। দুধ দুয়ানো থেকে এসিসটেন্ট ম্যানেজারের বাংলো ঘুরে আসা সময়টুকুর মাঝে ননদ সুমিত্রা কাঠ কয়লার আগুনে চারটে ভাত আর আশেপাশের জংগল থেকে কুড়িয়ে আনা শাকপাতা রান্না করে রাখে। সারাদিনের খোরাক। ঘরে বছর ছুঁতে যাওয়া যমজ বাচ্চা। বাচ্চা হবার পর বদলি কাজে ননদ সুমিত্রাকে পাঠালেও মাসখানেক হলো কাজে জয়েন দিয়েছে রূপালী। দৈনিক ১৭ কেজি পাতায় সপ্তাহে ৮৫ টাকা মজুরী। পঞ্চায়েতের ঠিক করা রেইট। যদিও প্রথমটায় লেবাররা আপত্তি করেছিলো, এতো কম টাকায় পোষাবে কী করে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পঞ্চায়েত এর কথাই মেনে নিতে হয়েছে। কেন না এই নতুন পঞ্চায়েত যে তারাই ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছে। তাদের কথা মানা ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু অদক্ষ হাতে সুমিত্রা দিনে ১৭ কেজি পাতাও তুলতে পরতো না। ফলে দৈনিক পঁচাশি টাকা থেকে কমে যেতো মজুরী। সপ্তাহান্তে তলবের দিনে সবাই যখন ফূর্তিতে অরুণের তৈরি হাড়িয়া খেতো, বীরেন-রূপালী তখন বিষণœ মুখে বসে থাকতো ঘরের দাওয়ায়। অবশেষে বছর না ঘুরতেই কাজে জয়েন দেয় রূপালী। পাতা তুলায় ওর মতো দক্ষ আশেপাশে আর কেউ নেই। বাচ্চা গুলো থাকে সুমিত্রার জিম্মায়। গরুর দুধে জল মিশিয়ে বোতলে ভরে নিয়ম করে বাচ্চা দুটোকে  খাওয়ায় সুমিত্রা। দুধের বোতলগুলো ভরতে ভরতে প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দেয়ার প্রয়োজন বোধ করে রূপালী। বোতলগুলি ঘরের কোণায় বাঁশের পাল্লায় ঠেস দিয়ে বাইরে রাখা প্লাস্টিকের জগটা নিয়ে দৌড়ায় টিলার উপরে সারি সারি চা গাছের আড়ালে। এখানেই প্রাকৃতিক কাজ সারতে হয় তাদের। রিং এর পায়খানা বানানোর জন্য কোম্পানী ঋণ দেয় বটে, তবে তার টাকা কেটে রাখে মজুরী থেকে। এমনিতেই মজুরীর টাকায় এন জি ওর কিস্তি দিয়ে আর রেশন তুলে বাকি কিছুই থাকে না। খাওয়া জুটুক না জুটুক, এন জি ওর হার্মাদ ব্যাটাগুলো কিস্তি না দিলে ঠিক গরুগুলো নিয়ে চলে যাবে। ভাগ্যিস সামনের জমিতে যে ধান হয় তা দিয়ে মাস ছয়েকের খোরাকী হয়ে যায়, নইলে না  খেয়ে মরতে হতো।

.

ডাঙায় তোলা মাছ

নতুন টিলা বাবু বাগানে ঢুকতেই প্রথম ধাক্কা খেয়েছিলো প্রচন্ড দুর্গন্ধে। এ কী অবস্থা, যে দিকে হাঁটা যায়, সেদিকেই মানুষ আর পশুর প্রাকৃতিক বর্জ্যরে দুর্গন্ধ। তাঁর জন্য বরাদ্দ বাসাটি অবশ্য বেশ পরিষ্কার পরিচচ্ছন্ন। সামনে খোলা মাটির রাস্তা পিছনে বেশ খানিকটা খালি জায়গা। ঘর পরিষ্কার করতে করতে সুখেন গল্প করছিল— আগের টিলা বাবু ইখানে ছবজি ছাস করতো রে দাদা। তুইও করতে পারবি। খুব ভাল ছবজি হয় ইখানে। শীতের কালে ছিম, টমাটো, ফুলকপি ছব হয়, আবার গরমকালে তরমুজ ও হয় বটে। নতুন আসা টিলাবাবুর অবস্থা তখন সেই পোস্টমাস্টারের মতো, ডাঙায় তোলা মাছের দশা। চা বাগানের চাকরিটা তার মোটেই  পছন্দ ছিল না। পিতৃহীন সংসারে বড় ভাই এর পানের টং এর ইনকামে আটজনের সংসার প্রায় অচল। পড়াশোনাও খুব বেশী নয়, পাসকোর্সে ডিগ্রীর ঘর পার হওয়া, চাকরির বাজারে যা একেবারেই সুলভ। বাড়ির কাছে চা বাগানে চাকরিটা জুটে গেলে পরিবার থেকে বলতে গেলে জোর করে পাঠিয়েছে তাকে। বন্ধু বান্ধবরা নানা রকম ভয়ডর দেখিয়েছে। প্রয়েজন আর অনিচ্ছার দোটানায় অবশেষে খুব বেশিদিন থাকা নয় এমন একটা মনোভাব নিয়ে ঘরগুলো ঘুরে ঘুরে দেখে সে। মাটির মেঝে আর মাটির দেয়াল, বেশ সুন্দর করে নিকানো। পূর্ববর্তী টিলাবাবুর ভরা গার্হস্থ্যর সুনিপুন ছাপ সর্বত্র। সুখেন বলতে থাকে— বুঝলি রে দাদা বাবু আগের দাদাবাবু নিজের ছেইলাটাকে এই চারকিতে ঢুকানোর কত ছেষ্টা করিল, কিন্তু নাই পারিল। নতুন আসা টিলাবাবুর মৃদু কৌতুহল হয় কেনো পারলো না জানতে। কিন্তু এই বিরান ভূমিতে এসেই মনটা তেতো হয়ে আছে, কোথায় নতুন গড়ে উঠতে থাকা শহরের চাঞ্চল্য আর কোথায় এই সাপ খোপ্রে বসতি জঙ্গল! কিভাবে দিন কাটবে এই দুশ্চিন্তায় বিষণ্ণতা আকড়ে ধরে তাকে, স্বতপ্রণোদিত হয়ে প্রশ্ন করার ইচ্ছে জাগে না তার। কিন্তু সুখেন নিজেই বলতে থাকে— ছাইলাটা কেমনে জানি নিছা ভাং ধরিল, রাছতার মোড়ে জুয়ার  আছর বছাইতো, কী কেলেঙ্কারি কান্ড রে দাদাবাবু।

.

জান দেবো তো জমি দেবোনা

প্রাকৃতিক কাজ সারতে সারতে রূপালী শুনতে পায় দূর থেকে লেবাররা আসচে দলে দলে, তাদের মুখে শ্লোগান। হাতে তীর-ধনুক, বল্লম, কারো মাথায় ঝাঁকি, রূপালী বাঁ হাতট্ ামাটিতে ঘষে পরিষ্কার করে ধুয়ে নেয় তাড়াতাড়ি। তার মনে পড়ে আজ বাড়ির সামনে ধানী জমিতে সমাবেশ হবার কথা। পঞ্চায়েত প্রধান সুধীর বাকতি কাল সন্ধ্যায় বলে গিয়েছিলো। দ্রুত পায়ে বাড়ি ফিরে সে, ননদকে ডাকে— হে ছুমিত্রা ছাও গুলারে খাইতে দে দিকিন। হামি এক দৌড়ে দুধটাতো পৌঁছাই দিয়ে আছি। তুর মনেক লাই আজ ছমাবেচ হবে!! দুধের বোতলগুলো নিয়ে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে যায় রূপালী। দুধটা পৌঁছে দিয়েই সমাবেশে যাবে সে। সুধীর বাকতি বলেছে ঐ ধানী জমিগুলো নাকি সরকারী খাস জমি। সরকার নিয়ে নেবে। আর ধান চাষ করতে দেবে না। যদিও রূপালীদের জমির পরিমান সুধীর বাকতির জমি থেকে অনেক কম, তবু যা আছে বছরের অর্ধেক খোরাকী তো হয়, জমিগুলো সরকার নিয়ে গেলে বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে না খেয়ে মরতে হবে। দুধারে চা গাচের সারির মাঝে মাটির পথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পুরোনো স্মৃতি মনে পড়ে রূপালীর। “ছমাবেছ” শব্দটা শুনেই তার শরীরে শিহরন লেগেছে কাল। সিলেট শহরে থাকতে একটা সমাবেশে গিয়েছিলো সে। তাদের স্কুলের একটা মেয়ে ধর্ষণ হয়েছিল। স্কুলের ম্যাডামরা মিছিল করে নিয়ে গিয়েছিল, কলেজ থেকে কত নেতারা এসে যোগ দিয়েছিল। সিলেট শহরকে দুভাগ করে চলে গেছে সুরমা নদী, তার উপরে কীন ব্রীজ। এর নীচে দাঁিড়য়ে শ্লোগান দিচ্ছিল তারা। সিলেটের মেয়র- কী যেন নাম ছিল— ও হ্যাঁ মনে পড়েছে কামরান ভাই, সবাই এ্ই নামেই ডেকেছিলো তাকে। কী জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিয়েছিলো সেদিন। স্কুল থেকে আসা সবগুলো মেয়েকে মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করেছিলো। কেক আর ঠান্ডা খাইয়েছিলো। নিজেকে কী ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছিলো সেদিন। সেই জীবনে কতো স্বপ্ন ছিলো রূপালীর, সব কোথায় হারিয়ে গেল। সেই জীবন আর এই জীবনে কত আকাশ— পাতাল ফারাক।

.

হায় বুদ্ধিহীন মানব হৃদয়

সুখেন এসে সকাল বেলায় উঠান ঝাড়– দেয়, বাসার পিছনে অনুচ্চ বাগানটিতে কোদাল কুপিয়ে  মাটি তৈরি করে সবজির চারা লাগানোর জন্য। ততোক্ষনে টিলাবাবু উঠে হাত মুখ ধুয়ে টয়লেট গোসল সেরে নেয়। সুখেন কুড়িয়ে আনা লাকড়ি পুড়িয়ে ভাত ফুটায়, সঙ্গে ডিম ভাজি আর পাশের সবজি ক্ষেত থেকে তুলে আনা তিতা করলা কাকরোল ভাজি। নতুন টিলাবাবু আন্দাজ করে এই সামান্য কাজে মহাবিরক্ত সুখেন সারাক্ষণ খিটখিট করে। আগের টিলাবাবুর ঘর ভরতি মানুষ ছিল, বৈচিত্র্যময় কাজও ছিল। অবশেষে সুখেন একদিন বলেই ফেলে- তোর এসব টুকিটাকি কাম করিতে হামি আর নাই আসিবেক রে দাদাবাবু। টিলাবাবু চমকে উঠে। বলে কী? তবে কি ফিরে কুয়ো থেকে জল তুলে, লাকড়ির আগুনে হাত পুড়ে রান্না করে খেতে হবে নাকি, যে কাজ জীবনে করে নি? সর্বনাশ এরকম হলে চাকরিটাই ছেড়ে দিতে হবে। কিন্তু মুখ ফুটে সে আশঙ্কা প্রকাশের আগেই সুখেন বলে— কাল থিকে হামার মাইয়া সক্কাল সক্কাল আসিয়া এই কাজটুকুন করিয়া দিবে। টিলাবাবু হাঁফ ছাড়ে। পরদিন মেয়েটি আসে, কালো কুচকুচে, নাক বোচা, ঠোঁটগুলো উল্টানো তার দিকে তেমন ফিরে দেখেনা সে। এ তার ধাত নয়। সঙ্গী বন্ধুদের মতো পারতপক্ষে হ্যাংলার মতো মেয়েদের দিকে সে তাকায় না। তা সে শহরের যতোই ডাকসাইটে সুন্দরী হোক। আর এগুলো তো বাগানের কুলি-কামিন। কিন্তু মেয়েটি যখন চোখের সামনে এসে পড়ে না তাকিয়ে উপায় থাকে না। এমনিতেই বাগানের চা শ্রমিক মেয়েদের বয়স বুঝা মুশকিল। কেশোরোত্তীর্ণ যুবতী বয়সটা পার হলেই তাদের বয়সটা যেনো থেমে যায়। রোদেপুড়া উদয়াস্ত শ্রম তাদের বয়সটা যেনো বেঁধে ফেলে। মেয়ে আর মেয়ের মাকে দেখতে প্রায় সমবয়সী লাগে। মেয়েটিকে দেখলে বুঝা যায় অবশ্য কেবলই যৌবনপ্রাপ্ত হয়েছে— টিলা বাবু তুই যদি দুধ কিনিয়া আনিচ তো তোকে আমি দুধ চা বানাইয়া খাওয়াতে পারি— মেয়েটির কথা যেন যাদুমাখা। টিলাবাবু অগ্রাহ্য করতে পারে না। সত্যি সেদিন টিলায় টিলায় ঘুরে অনেক ক্লান্ত থাকা সত্ত্বেও এক প্যাকেট দুধ কেনার তাড়া তাকে টেনে নিয়ে যায় বাজার পর্যন্ত। পরদিন সকালে মেয়েটির বানানো চা খেয়ে শরীরটা যেনো একলাফে চাঙা হয়ে উঠে। অপূর্ব চা বানায় মেয়েটি। সেদিনই সে মেয়েটিকে সামান্য মনোযোগী দৃষ্টিতে দেখে, বারবার সামনে এসে পড়া একটা প্রাণীর মতোই, বাধ্য চোখে। কিন্তু সেই নির্বিকার চোখে মেয়েটি একটু ব্যতিক্রম হয়ে উঠে। তার কপালের টিপ, কানের দুল আর নাকের নাকফুল নিয়ে। রংটা কালো হলেও চেহারাখানা বেশ মিষ্টি বোধ হয় টিলাবাবুর। চা খেতে খেতে মেয়েটির গড়বড় করে বলে যাওয়া কথাগুলো কেমন কৌতুহল উছকে নিয়ে আবার নিবৃত্ত করার মতো অদ্ভূত আকর্ষনীয় হয়ে উঠে। সিলেট শহরে কারো বাসায় গৃহপরিচারিকার কাজ করতো মেয়েটি। ব্র্যাক স্কুলে ক্লাস টেন অব্দি পড়েছে। ওখানেই শহরে বাবুদের মতো চা খেতে শিখেছে। আসছে বছরই এস. এস.সি  পরীক্ষা দিতো সে। কিন্তু বাবুর ছেলোটা  যেদিন রাতের অন্ধকারে ওকে ঝাপটে ধরে কামড়ে আচঁড়ে রক্তাক্ত করে দিয়েছিলো তারপর দিনই সে কেঁেদ কেটে বাড়ি ফিরে এসেছে, যদিও বাবা- মাকে আসল কারণটা জানায়নি, আজ টিলাবাবুকেই বললো সত্যিটা। মেয়েটার চোখে জল টলমল করে। বিশ্বাসের সুরে বলে সে— আর ই বছরটা থাকতি পারলি মেট্রিক পাশ দিতাম রে বাবু, মেয়েটির বলার  ঢং এ নিশ্চিত হয় টিলাবাবু এ বড় গোপন কষ্টের জায়গা তার। যার মর্যাদা বুঝার কেউ চারপাশে নেই।

.

আমার মাটি আমার মা। জান থাকিতে দিবো না

ঘরে ঢুকে নিভে যাওয়া আগুনে ফুঁ দিয়ে পানির মগটা বসিয়ে দেয় রূপালী। নিজেই গাছ থেকে কাঁচা পাতা তুলে এনে গুড়ো করে রোদে শুকিয়ে পাতা বানায় সে। সেই পাতা আর এক চিমটি লবণের এক মগ চা সকাল সকাল না খেলে শরীরটা ম্যাজম্যাজ করে। ও দিকে যতোই বেলা বাড়ছে, উত্তাল হচ্ছে মাঠ, সুমিত্রা উত্তেজিত— অ বউ কখন যাবি রে, সবাই তো চলিয়া আসিছে। দ্রুত চুমুকে চা টা শেষ করে বাইরে বেরুতে যাবার পথেই দেখা হয়ে যায় এন জি ও কর্মকর্তাদের সাথে। দু পক্ষই সমান বিরক্ত হয় এই মুহুর্তের সাক্ষাৎে। এন জি ও কর্মকর্তারা ক্ষোভ ঝাড়ে— বাব কী কষ্ট করে আসতে হলো আজ, রাস্তাঘাট সব বন্ধ। ঘটনা কী রে রূপালী। সমান ক্ষোভেই রূপালী উত্তর দেয়— আর আছার টাইম নাই পাইলি! আজ ওখানে ছমাবেছ হচ্ছে। কিসের সমাবেশ- এন জি ও কর্মকর্তা কৌতুহলী হয় একটু। সেই কৌতুহলে আরো ক্ষেপে উঠে রূপালী— এখন এত্তো কিছু কওয়ার টাইম তো নাই, টাকা লিয়া বিদায় হ দিকিন। ঐ যে জমিন দেখছিস, ওটার ফসলে দুবেলা খাবার তো জুটে, মজুরীর টাকা তো ছব তুরাই নিয়ে নিস, সেই কবে গাই কিনে ঋণ নিছিলাম, কিস্তি তোদের ফুরায় না। এখন ছুনি সরকার ওখানে ইকোনমি জুন বানাবে। হাছপাতাল করবে, ফ্যাক্টরী করবে… রূপালী বিড়বিড় করে রাগে। এন জি ও কর্মকর্তা না সরকার— রাগটা ঠিক কার উপর বুঝা যায় না। রাগের আগুনে ঘি ঢালে তারা— ভালোই তো তোদের ভালো চাকরি হবে, ভালো চিকিৎসা হবে। মুখের বিড়বিড়ানি এবার মুখ ঝামটায় রূপ নেয়— উ হামার ঢের জানা আছে। চাকরি দিবার নাম করে জমিগুলান নিবে, তারপর মোদের আর নাই চিনিবে। ছব বাবুদের আমার হাড়ে হাড়ে চিনা আছে। ছে ফ্যাক্টরির বাবু বল আর কোম্পানির বল। রূপালীর বলার ভংগিতে কর্মকর্তা দুজন চুপ মেরে যায়। ওরা ক্ষেপে গেলে মুশকিল। গোয়ারের মতো এক কথা একশোবার বলবে। বছর খানেক ধরে ঋণের কিস্তি নিতে এসে বেশ চেনা হয়েছে এদের। তাড়াতাড়ি প্রসঙ্গ পাল্টায় একজন কর্মকর্তা— আচ্ছা শোন আজ থেকে নতুন বাবু আসবে টাকা নিতে। সে আসছে আমাদের পিছনেই, বোধহয় কোথাও আটকেছে। এক্ষুণি এসে পড়বে। যা তুই সমাবেশ সেরে আয় আমরা একটু অপেক্ষা করি। নতুন বাবুকে তোদের চিনিয়ে দিয়ে যাবে।

.

জীবনে এমন কতো বিচ্ছেদ আসে

সেদিন বাগানের টিলায় টিলায় ঘুরে কাজে মন লাগে না টিলাবাবুর। মেয়েটার মায়াভরা মুখ আর জল টলমলে চোখ সারাবেলা তাকে মোহগ্রস্ত করে রাখে। চুম্বকের মতো অনিবার্য আকর্ষন তার গড়বড় করে বলে যাওয়া কথাগুলোর। নিজের সাথে নিজেই দ্বন্দ্বে জড়ায় সে। শহরের পড়ালেখা করা জীবনটা খুব পছন্দের মেয়েটার, খুব আক্ষেপের তার অসমাপ্ত শিক্ষাজীবন। আচ্ছা সে কী পারে মেয়েটাকে তেমন একটা জীবন ফিরিয়ে দিতে— মর্যাদা দিয়ে? ভাবনার অন্তরালে গোপন ইচ্ছাটা সনাক্ত করে ভয় লাগে তার। দূর এটা কী করে সম্ভব ? কিন্তু সব অসম্ভব বাস্তবতা জেনেও প্রবৃত্তির কাছে আত্মসমর্পন করে টিলাবাবু। দুপুরের সূর্য ঠিকঠাক মাঝ আকাশে যাবার আগে আগেই সেদিন বাসায় ফিরে টিলাবাবু। চারপাশ সুনসান, নাম জানা— না জানা অসংখ্য পাখিদের সম্মিলিত কলরব, গনগন আগুনের পাশে রান্নারত মেয়েটিকে এই ধেয়ে আসা দুপুরের রং এ অপূর্ব অপার্থিব লাগে টিলাবাবুর চুলার ধার থেকে মেয়েটিকে টেনে বুকে তুলে আনে সে। মেয়েটি পূর্ব অভিজ্ঞতার তিক্ততায় প্রথম হাত—পা ছুঁড়ে কিন্তু টিলাবাবুর স্পর্শে কেমন মমতা আর নির্ভরতার ছাঁয়া খুঁজে পায় মেয়েটি, যখন টিলাবাবু বলে— তোকে আমি মেট্রিক  পরীক্ষা দেবার ব্যবস্থা করে দেবো রে। নিশ্চিত এটাই মেয়েটির দুর্বলতম জায়গা, যেখানে হাত রাখে টিলাবাবু। মেয়েটি গলে যায়। না ধীরে ধীরে সলতে ছুঁয়ে  জ্বলতে থাকা মোমের মতো নয়। চুলার পাশে ভুল করে রাখা মোমবাতির মতো দ্রুত। টিলাবাবুর বিছানায় তার অনভিজ্ঞ শরীরের চাপে অদ্ভূত ভালোলাগায় মিশে যেতে থাকে মেয়েটি। মেট্রিক পাশের স্বপ্ন, অন্য একটা জীবনের স্বপ্ন তার ব্যাথাতুর শরীরের চারপাশে ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু টিলাবাবুর কেমন গা ঘিনঘিন করে মোহগ্রস্ততার ঘোরের আগুন নিভে যাবার পর। মেয়েটির শরীরে, নাকের নীচে, ঠোঁটের উপরে শরীরের কোনায় কোনায় জমে থাকা ঘামের দুর্গন্ধ তাকে বিপর্যস্ত করে রাখে অনেকক্ষণ।

দিনকয়েক পরে মেয়েটি নিজেই মুখ খুলে— হামারে একটা ছাবান কিনিয়া দে না টিলাবাবু। চুলার কাছে ছারাদিন বছে বছে ভীষণ গান্ধা লাগে রে। টিলাবাবুর হুশ হয়। সত্যি তো এটাতো তার মাথাতেই আগে আসার কথা ছিল। সেদিন সাবান দিয়ে গোসল করে মেয়েটি যখন কাছে আসে, নিজেকে গার্হস্থ্য পুরুষ লাগে টিলাবাবুর, পাশে শোয়া মেয়েটিকে বোধহয় নবপরিণীতা আহ্লাদি বউ। প্রথমবার পাপবোধ নয়, দাম্পত্য সুখের স্বাদ তার মিলনকে মধুর করে তোলে। সেদিন প্রথম পরপর দুইবার পুরুষ হয় টিলাবাবু।

.

রূপের গোপন রহস্য, বিজলী মার্কা সাবান

আব্দুল খালেক গভীর রাতে যখন সাবানের মোড়কটা উল্টে পাল্টে দেখে, গন্ধ শুঁকে। তখন ফজিলা বিরক্ত হয়ে পাশ ফিরে শোয়। বিয়ের চার বছরের মাথায় যখন বুঝা গেলো তাদের বাচ্চাকাচ্চা হচ্ছে না, তখন থেকেই শুরু হয়েছে উৎপাত। দুদিন পরপর নিত্য নতুন সাবান নিয়ে হাজির হয় আর রাতে বিছানায় যাবার আগে গোসল করতে বাধ্য করে। কেন করায়, কী বৃত্তান্ত জিজ্ঞেস করলে কোনো উত্তর নেই। শীত-গ্রীষ্ম একই অবস্থা। মাঘ মাসের শীতে গরম পানিতে বালতি ভরে রাখতে হয়। আব্দুল খালেক সাবানের মোড়কটা খুলতে খুলতে বিড়বিড় করে— এইডা এক মুশকিল, হাবানের উফকারিতা গতর অ না মাখলে টিক বুঝা যায় না। ফজিলা এই ভূমিকার উদ্দেশ্যে বুঝতে পারে। এত্তো রাইত্তে আইজকা গোসল করতে খইবাইন না— ফজিলা মুখ ঝামটা দেয়। বউ এর পাশে বসে মাথায় হাত বুলায় অসহায় আব্দুল খালেক— বুঝঅ না কিতার লাগি, ঘর অ কি অশান্তি ক ও, আরেখডা বিয়ার লাগি আম্মার ফ্যানফ্যানানি শুনতে তোমার বালা লাগে না আমার? আব্দুল খালেকের মিষ্টি কথায় মোটেই পটে না ফজিলা, ক্ষেপে উঠে— তুমারে খোন ফীরে খইছে নিত্য নয়া হাবান দি গোসল করলে বাইচ্ছা ফয়দা অইবো? খোন ফিরে খইছে, আইজখা খওন লাগবো। বাইচ্ছা-খাইচ্ছা অয় না, ইখান ত আল্লার ইচ্ছা। ডাখÍর খবিরাজ ত কম দেখাইরাম নায়। হাবান দি গোসল করনের ইখিতা বাতিখ তুমার, কত্তোদিন জিগাই, হাছা মাত মাত না খেনে? বাচ্চা না হওয়ার অক্ষমতায় আড়ষ্ট হয়ে থাকা নিরীহ ফজিলার হঠাৎ অগ্নিমূর্তির কাছে আত্মসমর্পন করে আব্দুল খালেক। আজ আর কথা বাড়িয়ে লাভ নেই, মশারির ভিতরে ঢুকে চুপ করে শুয়ে পড়ে সে। আব্দুল খালেক জানে যতো রাগ করুক নারীমন তো, ঠিক আজ না হয় কাল নতুন সাবান দিয়ে গোসল সেরে স্বামীর সাথে শুতে আসবে, বলা তো যায় না আল্লা ইচ্ছায়…

.

পৃথিবীতে কে কাহার?

টিলাবাবু বারবার ঘড়ির দিকে তাকায়। আটটা বেজে গেছে।  একটু পরেই বের হতে হবে তাকে। সুখেনের মেয়েটা এখনো আসেনি। ভোর ছ টায় আসে যে মেয়ে, আজ তার হলো কী, অস্থির লাগে তার। অস্থিরতার অবসান ঘটিয়ে বেলা নয় টার দিকে, মেয়েটি বাসার পিছন দিয়ে ঢুকে। আন¤্র লজ্জায় লাল হয়ে টিলাবাবুর সামনে দাঁড়ায়। ঘটনা কী?  মেয়েটি জানায় সে পোয়াতী হয়েছে— হিছাব কইরে দেখছি পাঁচ হপ্তার গর্ভ রে টিলা বাবু। যেইদিন তুই ছাবান কিনিয়া আনলি ছেইদিন। ঘটনার আকস্মিকতায় ভ্যাবাচ্যাকা খেতেও ভুলে যায় টিলা বাবু। কী বলতে হয়, কী বলবে বুঝে উঠতে পারে না। মেয়েটি বলতেই থাকে— বাপ ভিষণ খেইপেছে রে বাবু, তুর ইখান আর কাম করিতে নাই দিবেক। এবার বিছানায় বসে মেয়েটি নির্বিকার আবদার জানায়, যেনো তার স্বতসিদ্ধ অধিকার— তুর বাড়িত হামাকে কুনদিন লয়ে যাবি ক ॥ গলায় তার আশঙ্কা ঝরে- বেছি দেরি করিলে মা খালাছ করিয়া দিবে কিন্তু ক। তুর ছাও হামি খালাছ করিতে পারিব না রে বাবু। মেয়েটির নিরপরাধ-নিষ্পাপ আবেদনের সামনে ঘামতে থাকে টিলাবাবু। সম্পূর্ণ অচেনা এক সংকটে দিশেহারা লাগে তার। ঠিক তখন বাইরে সুখেন এর গলা শুনা যায়— দাদাবাবু বাড়ি আছিস নাকি রে, দাদাবাবু…। বাপের গলা শুনে দৌড়ে আবার যাবার পথ ধরে মেয়েটি বাড়ির পিছন দিয়েই। ঘরে ঢুকেই প্রচন্ড রাগে ফেটে পড়ে সুখেন যা বলে তার মর্মার্থ এই যে— গরীব বলে তার কী ইজ্জত সম্মান নেই, ঘটনার কথা পঞ্চায়েতকে জানানো হয়েছে। তারা আজ সন্ধ্যায় নাটমন্ডপে সালিশ ডেকেছে। সে যেন উপস্থিত থাকে। সর্দারও লোক পাঠাবে খবর জানিয়ে। ক্ষোভে ঘোঁৎ ঘোঁৎ করতে করতে সুখেন চলে যাবার পর হুঁঁশ হয় টিলাবাবুর । আধ ঘন্টা খানেক সময় নেয় সে সিদ্ধান্ত নিতে। এসব চাকরি-বাকরি, চলতি মাসের বেতন, শরীরী প্রেম— প্রেমের ফসল সব পিছনে ফেলে সাথে করে নিয়ে আসা একমাত্র ব্যাগটি আবার সাথে নিয়ে গঞ্জের গাড়িতে উঠে বসে সে চিরতরে।

.

লইড়তে হইলে লইড়বো, মইরতে হইলে মইরবো

শ্লোগানের উত্তাপ বাড়তে থাকে। শহর থেকে, রাজধানী থেকে সাংবাদিক, মিডিয়াকর্মী, সমাজকর্মী, এন. জি.ও কর্মী উৎসুক জনতায় জনারন্যে পরিণত হয় পুরো বাগান। মাইল মাইল দূর থেকে শোনা যায় শ্রমিকদের সম্মিলিত শ্লোগান— “লইড়তে হইলে লইড়বো, মইরতে হইলে মইরবো।” গলা ফাটিয়ে শ্লোগানে তাল মিলায় রূপালী। মগের মুল্লুক নাকি দেশটা? কয়েক পুরুষ ধরে জমিতে চাষ করছে তারা। আজ সরকার বললেই সেটা সরকারী হয়ে যাবে ? হঠাৎ পিছন থেকে ঘাড়ে হাত রাখে কেউ, রূপালী ফিরে তাকায়। এন জি ও কর্মকর্তা ডাকেন— একটু উঠে আয়, নতুন বাবুর সাথে পরিচয় করিয়ে দেই। ওর কাছেই কিস্তির টাকা দিবি এখন। সমাবেশ ছেড়ে উপরে টিলায় উঠে আসে রূপালী। নতুন বাবুকে দেখে চমকে উঠে সে— টিলা বাবু তুই!! আব্দুল খালেক ও বিস্মিত— তুই এখানে রূপালী? এন জি ও কর্মকর্তারা অবাক— আপনারা দুজন পরিচিত নাকি? আব্দুল খালেক শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি দেয়। এখন তাদের সাথে অতিরিক্ত কথা বলার সময় নেই। অনেক, অনেক খবর নিতে হবে তার। রূপালীকে টেনে আড়ালে আনে আব্দুল খালেক— তোর এখানে বিয়ে হয়েছে রূপালী? বাচ্চা কয়টা তোর। এসব পারিবারিক ব্যক্তিগত আলাপে খুব আগ্রহ নেই রূপালীর। কোমরে গুঁজা টাকাটা আব্দুল খালেকের হাতে তুলে দিয়ে আঙুল তুলে বাড়িটা দেখায় সে— ঐ যে হামার বাড়ি, ছাওয়ালরা আছে দেখে যা। রূপালী নেমে যায় বৃহত্তর প্রয়োজনের আয়োজনে, কোথায় সেই নতুন যৌবনের অবাস্তব স্বপ্ন? ভীষণ বাস্তবের মুখোমুখি অতীতটা খুব মূল্যহীন ওর কাছে। আব্দুল খালেক টের পায়।

তবু আব্দুল খালেক মনে ক্ষীন আশা নিয়ে নেমে যায় রূপালীর বাড়ির দিকে। উঠোনেই খেলছে যমজ বাচ্চা দুটো। বোকার মতো ক্ষীন আশায় এদিক সেদিক তাকায় আব্দুল খালেক, কিসের আশায়— আশার গভীরে যেতে যেতে ক্ষত—বিক্ষত হতে থাকে সে অপরাধে— অপরাধবোধে। হঠাৎ ঘরের দাওয়ায় রাখা সাবানের কৌটোটি চোখে পড়ে আব্দুল খালেকের, কোনো সংকোচের ধার না ধেরে কৌটোটি হাতে নেয় সে, নাকের কাছে নিয়ে গন্ধ শুঁকে, সেই অপূর্ব দিনটির গন্ধ খুঁজে পায় আব্দুল খালেক। রূপালী বলেছিলো ওর বাচ্চা নষ্ট করতে চায় না সে। রূপালীকে ডাকতে ইচ্ছে হয় তার কিন্তু রূপালীর গলা তখন শ্লোগানে উচ্চারিত— “লইড়তে হইলে লইড়বো, মইরতে হইলে মইরবো।” এখন গলা ফাটিয়ে ডাকলেও রূপালী শুনবে না।

Comments

comments

রুমা মোদক

রুমা মোদক

জন্ম: হবিগঞ্জ। জেলা শহর থেকে প্রকাশিত সংকলনগুলোতে লেখালেখির মাধ্যমেই হাতেখড়ি। শুরুটা আরো অনেকের মতোই কবিতা দিয়ে। ২০০০ সালে প্রকাশিত হয় কাব্যগ্রন্থ ‘নির্বিশঙ্ক অভিলাষ’। এরপর ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়েন মঞ্চনাটকে। রচনা করেন কমলাবতীর পালা, বিভাজন, জ্যোতি সংহিতা ইত্যাদি মঞ্চসফল নাটক। অভিনয়ও করেন। মঞ্চে নাটক রচনার পাশাপাশি নিরব অন্তঃসলিলা স্রোতের মতো বহমান থেকেছে গল্প লেখার ধারাটি। জীবন ও জগতকে দেখা ও দেখানোর বহুস্তরা এবং বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতার উৎসারণ ঘটেছে ২০১৫ সালের বইমেলায় প্রকাশিত ছোটগল্প সংকলন ‘ব্যবচ্ছেদের গল্পগুলি’তে। ‘প্রসঙ্গটি বিব্রতকর’ প্রন্থভুক্ত গল্পগুলোতে সে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি হয়ে উঠেছে আরও নির্মোহ, একবগগা, খরখরে কিন্তু অতলস্পর্শী ও মমতাস্নিগ্ধ। গল্প লেখার স্বীকৃতিস্বরূপ ইতোমধ্যে পেয়েছেন বৈশাখী টেলিভিশনের পক্ষ থেকে সেরা গল্পকারের পুরস্কার, ফেয়ার এন্ড লাভলী সেরা ভালোবাসার গল্প পুরস্কার। ২০১৪ সাথে মঞ্চনাটকে অবদানের জন্য পেয়েছেন ‘তনুশ্রী পদক’। বর্তমানে সক্রিয় রয়েছেন বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের পত্র-পত্রিকা, লিটলম্যাগ এবং বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে প্রকাশিত অন্তর্জাল সাহিত্য পোর্টালে লেখালেখিতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এম. এ সম্পন্ন করে শিক্ষকতা পেশায় জড়িত রয়েছেন। ব্যক্তিগত জীবনে স্বামী অনিরুদ্ধ কুমার ধর ও যমজ সন্তান অদ্বিতীয়া অভীন্সা পদ্য ও অদ্বৈত অভিপ্রায় কাব্যকে নিয়ে হবিগঞ্জে বসবাস করছেন।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি