প্রাক-বসন্তের হাওয়া । আফরোজা সোমা

নিজেকে নিজেই ফাঁকি দিয়ে বেরিয়ে যাই বাসা থেকে। এমন সময়, এই মাতাল হাওয়ার লগ্নে, ঘরে থাকা যায় না।

বিকেলের পর-পর— সন্ধ্যার আগে-আগে— আলোর গায়ে তখনো রয়েছে সোনালি আভা, এমন সময় যখন কিচেনের খোলা জানালা গলে ঘরে ঢোকে হাওয়া। তার স্পর্শ পাওয়া মাত্র আমি এলোমেলো হয়ে যাই। আমার বুকের ভেতর কেমন-কেমন করতে থাকে; পেটের ভেতর, নাভির গোড়ায় কেমন-কেমন লাগতে থাকে; গা-হাত-পা কেমন যেন করে; কেমন আনচান-আনচান লাগে; অস্থির-অস্থির লাগে; কই যাই, কই যাই; কী করি, কী করি লাগে।

আনচান মন নিয়ে দৌড়ে বাথরুমে ঢুকি। মুহুর্তেই একটা আধা-গোসল সেরে, ঝটপট তৈরি হয়ে বাইরে বেরিয়ে আসি। এই হাওয়া আমাকে ঘরে থাকতে দেয় না; আমাকে টেনে আনে বাইরে। কিন্তু এই হাওয়া আমাকে দেয় না কোনো গন্তব্যের দিশা । উদ্দেশ্যহীন বেরিয়ে কোথায় যাবো আমি এই প্রাক-সন্ধ্যায়!

মনে মনে ভাবি, আচ্ছা, ধানমন্ডি লেকে যাই। ওখানে অনেক মানুষ। কিন্তু ভাবতে-ভাবতেই আমি দেখি একজনকে ফোন করে বসে আছি। উনার সাথেও দেখা নেই বহুদিন। আর একটু কাজও আছে তার অফিসে। তিনি বললেন, চলে আসো। চা খেয়ে যাও।

আমার বাসার কাছেই তার অফিস। সামান্য রাস্তাটুকুই রিকশায় বসে থাকতে-থাকতে এই হাওয়া আমায় পাগল করে তোলে। ছোট্টো পাখির ঠোঁটে করে ফুলের রেণু যেমন শত মাইল দূরে, অন্য কোথাও অন্য আরেক নতুন দেশে উপনীত হয়, তেমনি এই হাওয়া আমাকে তার ঠোঁটে তুলে নিয়ে ফুলের রেণুর মতই অন্য কোথাও অন্য এক দূরের দেশে বয়ে নিয়ে যায়।

একবার মনে হয়, রূপকথার সেই ডানাওয়ালা ঘোড়া আমায় উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে প্রেমের দেশে। একবার মনে হয়, সে এক দারুণ রাক্ষস, ছদ্মবেশী দানব; বাতাসের ছদ্মবেশে আমার ঘরের জানালার পাশে বসে থেকে জাদুমন্ত্রে ভুলিয়ে সে আমাকে করেছে ঘরের বাহির। আর ঘর থেকে যেই-না আমি বাইরে বেরিয়েছি, অম্নি রূপকথার চরিত্রের মতই সে আমাকে করেছে হরণ।

কেমন না-জাগরণ, না-অচেতনের এক ঘোরের মধ্যে আমি রিকশায় বসে থাকি। লম্বা করে ধীরে-ধীরে দম নিই। আর দমে দমে সেই হাওয়া অথবা সুবাস মেশানো সেই চেতনা-নাশক বিষে আমার বুক ভরে যায়। বুকের ভেতর একটা ঝরা পাতা বাতাসে উড়তে থাকে। উড়তে থাকে। উড়তেই থাকে। কোথায় যাবে পাতাটি তার ঠিকানা জানে না। ঠিকানা সমেত তাকে হরণ করেছে হাওয়া।

প্রাক-বসন্তের বাতাসে কী অদ্ভুত মদিরতা; কী আকুল করা সুবাস; কেমন রিনরিনে একটা আবছা সুর; কী এক দূর্বার আকর্ষণ। এমন সময়েই হয়তো মনে আসে,

“বর্ণে গন্ধে ছন্দে গীতিতে হৃদয়ে দিয়েছো দোলা
তুমি যে ফাগুন রঙের আগুন,
তুমি যে রসেরও ধারা।”

এই রকম বাতাসে, মনে আচানক আনচান শুরু হলে, গত বেশ কয়েক বছর ধরেই আমার মাথার মধ্যে শচীন কর্তার গান ঘোরাফেরা করে। বিশেষ করে, “ঝিলমিল ঝিলমিল ঝিলের জলে ঢেউ খেলিয়া যায় রে, ঝির ঝির ঝির হাওয়ায় রে” গানটা মাথার মধ্যে আসবেই।

শচীন দেব বর্মণ যখন বলেন, “মন কাঁদে হায় হায় রে’’ তখন মনে হয়, আহা! মনের কথাই তিনি বলছেন। কিন্তু পরক্ষণেই উনি যখন বলেন, “আজ তুমি কোথায় রে, তুমি কোথায়”, তখন আমি খেই হারিয়ে ফেলি। তিনি যে এক বিশেষ কারো কথা নির্দেশ করেন, বিশেষ তুমি’র কথা বলেন, সেই “তুমি” বিষয়ক আমার কোনো আনচান নেই। হায়! তবু কেন এই “হায়! হায়!”

শচীন কর্তা থামেন না। আমাকে ঘুড়ি করে অস্থিরতার আকাশে উড়িয়ে দিয়ে লাটাইখানি বেঁধে রাখেন তাঁর গানে। তাঁর গানের সুরসকল কোথায় কোন অচিন আকাশে আমাকে উড়িয়ে-ঘুড়িয়ে শেষে ভোকাট্টা করে পাঠিয়ে দেয় অসীমে। সেই অনন্ত দিগন্তে ভাসতে-ভাসতে আমি শুনতে পাই উনি গাইছেন, “বিরহ বড় ভালো লাগে”। কিন্তু আমি তো খুঁজে পাই না আমার বিরহের উৎসমুখ!

হায়! কোথা থেকে এলো এই হঠাৎ হাওয়া! কী বিরহ ছড়ালো প্রাণে! কেন এখন তিলেকদণ্ড বিরতি ছাড়াই মনে মনে বাজে, “বিচ্ছেদ হবে এতো মধুর জানিতাম না আগে”।

আমি আমার ’বিচ্ছেদ’ খুঁজে পাইনা, বিরহ খুঁজে পাই না, আবার আমার মাঝে আমাকেও খুঁজে পাই না এই হাওয়ায়। এ-কি তবে নিজেরই সঙ্গে নিজের বিচ্ছেদ? নিজেকে হারিয়ে খুঁজতেই কি তবে আমি বেরিয়েছি এই হাওয়ায়! এই গন্তব্য-অনির্ধারিত-পথে?

ক্ষণে বিরহ, ক্ষণে প্রেম। এই অকারণ দোলাচলে যখন আমি পথহারা হরিণ-শাবক, তখন অন্তর্যামীর মতন আমার ভেতরে উদিত হন রবীন্দ্রনাথ। আমাকে তিনি করেন পরিত্রান এবং মূক আমার বেদনা নিজের কণ্ঠে তুলে নিয়ে তিনি মোহন সুরে বলেন, “বহে কী-বা মৃদু বায়”।  আর সেই মৃদু বায়ু পেয়ে প্রাণ যে কেমন-কেমন করতে থাকে সেটিকেও তিনি সুন্দর করে গুছিয়ে বলেন, “কী জানি কিসের লাগি প্রাণ করে হায় হায়”!

প্রাণের মধ্যে একটা অদ্ভুত “হায়! হায়!”, একটা অচেনা “বিরহ”, একটা অদ্ভুত সুখতরঙ্গ নিয়ে আমি রিকশায় বসে থাকি সন্ধ্যায়। হাতিরপুলে মোড়ে এসে রিকশাটা জ্যামে আটকায়। আমি মোতালেব প্লাজার দিকে মুখ করে বসে থাকি। ময়ূরের পুচ্ছের মতন নীলরঙা একটা বোরকা পরে আমার রিকশার পাশ ঘেষে হেঁটে-হেঁটে চলে যায় মাঝ বয়সী এক নারী। তার হাঁটার ছন্দের দিকে তাকিয়ে আমার মনে হয়, একেই বুঝি বলে গজগামিনী।

জ্যামের মধ্যে রিকশায় আমাকে ঠাঁয় বসিয়ে রেখে, আমার পাশ দিয়ে নগর ছুটে যায়। আমার পাশ দিয়ে, সামনে দিয়ে, ভিন্নমুখী রিকশার স্রোত চলে যায়। কোনো রিকশায় দেখি, হাসি মুখে ফোনে কথা বলতে-বলতে যাচ্ছে এক সুন্দর যুবক। কোনো রিকশায় পান চিবাতে-চিবাতে আরামসে সিগারেটে টান দিচ্ছেন এক প্রৌঢ়। কোনো রিকশায় এক তরুণ আর এক তরুনী হুড তুলে এক জোড়া ভেজা কপোত-কপোতীর মতই পরস্পর ঘন হয়ে বসা। কোনো রিকশায় চকিতে দেখি, ছেলেটি খুব নিবিড় করে ধরে আছে মেয়েটির হাত, আর মেয়েটি কেমন যেন লজ্জায়, ভালো লাগায়, হয়ে আছে আধফোটা জবার মতন।

হাওয়ার চক্করে পরে আমার চোখে আজ সব সুন্দর-সুন্দর দেখায়। নিত্য দেখা মলিন মুখের ভিখিরির ম্লান মুখখানিও আজ দেখায় খানিকটা উজ্জ্বল।

এতো উজ্জ্বলতা, এতো রং, এতো সুর, এতো সুখ-সুখ হাওয়া গায়ে মেখে এই জ্যামে বসে হঠাতই আমার মনে পরে খালেদ হোসেইনি’র লেখা  অ্যা থাউজেন্ড স্প্লেন্ডিড সান্স-এর একটা বাক্য। যেখানে গল্পের এক চরিত্রের মনে সুখের বিচ্ছুরণের প্রকৃত অবস্থা বোঝাতে তিনি লিখেছেন, “অ্যা রেইনবো হেড মেল্টেড ইনটু হার আইজ”। হ্যাঁ, হোসেইনি’র গল্পের সেই চরিত্রটির মতই চোখের মধ্যে মাখামাখি হয়ে থাকা একটা রংধনু নিয়েই যেনো আমিও রিকশায় বসে থাকি। জ্যামের মধ্যে বসে পড়তে থাকি মানুষের মুখ; নিজের চোখের রংধনু দিয়ে রাঙিয়ে তুলতে থাকি অপরের মুখশ্রী।

আমার কোনো তাড়া না থাকলে এম্নিতেই জ্যাম খুব উপভোগ করি। যদি বাস বা সিএনজি-তে না-থাকি অর্থাৎ যদি আমি রিকশায় থাকি, তাহলে রিকশায় এক ঘন্টা বসে থাকলেও জ্যামে আমার ক্লান্তি নেই। কারণ আশ-পাশে বিরামহীনভাবে এতো ঘটনা ঘটতে থাকে যে মনে হয়, জ্যামে বসে থাকা মানে নদীতে সাঁতার কাটার মতন ঘটনা, বসে থেকেই পাওয়া হয়ে যায় লম্বা এক পরিভ্রমনের অনুভূতি।

রিকশায় রোদে বসে থাকতে-থাকতে কোন্ কিশোরের কানের লতি ঘামে ভিজে ওঠলো, রোদ লাগতে লাগতে কোনো কিশোরীর গাল একেবারে লাল ডালিয়ার পাপড়ীর মতই হয়ে উঠলো টুকটুকে, কোন্ তরুনীর কানের দুলে রোদ লেগে আচমকা করে উঠলো ঝিকমিক, বিরক্ত হয়ে কে বারবার ঘড়ি দেখতে লাগলো, কে বারবার ফোন করে বলতে লাগলো, আরে ভাই, আইতেসি তো. . . কঠিণ জ্যাম… এইসব ঘটনাবলী দেখতে-দেখতেই আমার সময় কেটে যায়, জ্যাম কেটে যায়।

কিন্তু আজ এই সন্ধ্যায় মন আমার কিছুতেই বসছে না। বসলেও অস্থির প্রজাপতির মত থেকে-থেকেই উড়াউড়ি করছে। কিন্তু উড়ে সে কোথায় যেতে চায়, সেই ঠিকানা জানে না। তাই শচীন-এর ভাষায় নিজেকে শুনাই, “হায়! কী যে করি এ মন নিয়া!” কিন্তু মনকে আমি যত যাই বলি-না কেন, যত গানই শোনাই-না কেন তবু হায়! “বহে কী-বা মৃদু বায়”। আর সেই হাওয়ায় “কী জানি কিসের লাগি প্রাণ করে হায় হায়!”

কুহকী হাওয়া অচেনা এক সুতীব্র সুবাস ছড়িয়ে পল-পলে খুন করে দিচ্ছে আমায়; আমাকে করে তুলছে মাতাল থেকে মাতালতর; আমার নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস ঘন হয়ে পড়ছে, দ্রতলয়ে পড়ছে; আমার পায়ের পাতা কেমন নিশপিশ-নিশপিশ করছে; বুকের ভেতর কেমন ক্ষণে যাচ্ছে কুকড়ে-মুকড়ে, ক্ষণে আবার কেমন যেন ঝিকিমিকি করে জ্বলে উঠছে হাজার রঙের বাতি! এই কেমন-কেমন করা ভাব ভেতরে গোপন রেখে আমি সেই অফিসে ঢুকি। চেনাজনদের সাথে কিছু কেজো কথা হয়; কিছু খেজুরে আলাপ হয়; আলাপের ফাঁকে-ফাঁকে কফি পান করা হয়।

কিন্তু কী মুস্কিল! আমি যে জানালাটার পাশে বসেছি, সেটি একটুখানি খোলা! আর এই জানালা দিয়ে থেকে-থেকেই সেই খুনী বাতাস যমের মতন এসে চেপে বসছে আমার বুকে! আর থেকে থেকেই আমার মনে হচ্ছে, ধুর! কেজো আলাপ, খেজুরে কথা আরেক দিন হবে! এখন বরং ধানমন্ডি লেকে যাই। রবীন্দ্র সরোবরের সিঁড়িতে গিয়ে ঝিম মেরে বসে থাকি কিছুক্ষণ। সেখানে আঁধারের গায়ে কাছে দূরে জ্বলতে থাকবে সড়কবাতি। আমার থেকে একটু দূরেই ধানমন্ডি আট নম্বর ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে থাকবে একগুচ্ছ তরুণ; তাদের মাথার উপর ছড়িয়ে থাকবে সড়কবাতির নিয়ন আলো; থাকবে রিকশার টুংটাং; গাড়ির হর্ন; মানুষের কোলাহল; আর পুরোটা রবীন্দ্র সরোবর ভরে থাকবে ফুলের মতন থোকায় থোকায় ফুটে থাকা গুচ্ছ গুচ্ছ মানুষের কথার উচ্ছাস, হাসির কলরোল; গানের শব্দ; গিটারের সুর, বাঁশির মূর্ছনা।

এই খুনী হাওয়াটাকে ফাঁকি দিতে হলে ধানমন্ডি লেক ছাড়া আমি আর বিকল্প খুঁজে পাই না। কিন্তু কী মনে করে আবার ভাবি, আচ্ছা, না-হয় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে-ই যাই! ভাবতে ভাবতেই আমি আরেকজনকে ফোন দিই। উনি সেদিকটাতেই আছেন। ভাবলাম, ঠিকাছে, যাই তবে।

কিন্তু আমি তো আসলে উনার কাছেও যাচ্ছি না; গল্প করতেও যাচ্ছি না; যাচ্ছি ওই শত্রু হাওয়াটার চোখ ফাঁকি দিতে;  অথবা সেই হাওয়ার মধ্যে একাকার হয়ে যাবার বাসনাতেই হয়তোবা আমি খুঁজছি উপায়।

হাতিরপুল বাজারের সামনে থেকে হাঁটতে হাঁটতে আজিজ মার্কেট; আজিজের সামনে থেকে রিকশা নিয়ে চারুকলা; সেখান থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। কিন্তু সেখানে গিয়ে কুশল বিনিময়ের পর্ব শেষ হবার পর গল্পে আমার মন বসে না; চা খেতেও ইচ্ছে করে না। ফলে, চা খাই না। বরং বসে থেকে গল্পের আনমনা শ্রোতা হয়ে মনে মনে ভাবি, ধুর! ধানমন্ডি লেকে গেলেই ভালো হতো। কেন যে এখানে এলাম!

আবার চকিতে মনে হয়, রিকশা নিয়ে পুরান ঢাকায় গেলে ভালো হতো। বিশেষ করে শাঁখারী বাজারে যাওয়া যেতো। শাঁখারী বাজারে গিয়ে, ওখানে যে মন্দিরে মানুষের সমাগম একটু বেশি এরকম কোনো একটা মন্দিরে ঢুকে এক কোণায় চুপচাপ বসে থাকা যেতো। ধূপের গন্ধে, আগরের গন্ধে, পূজারীর নিবেদনে, প্রতীমার পায়ের কাছে ষাষ্ঠাঙ্গে নত হয়ে করা সকাতর প্রার্থনায় আমিও থাকতাম অলক্ষ্যে এক জোড়া টলোমলো চোখ।

তাহলে হয়তো আমার পিছু ধাওয়া করা খুনী বাতাসটা ধূপের গন্ধে, আগরের গন্ধের ভীড়ে হঠাত আর খুঁজে পেতো না আমার গায়ের গন্ধ। আমার গন্ধ চিনতে না পেরে হয়তো আমাকে তাড়িয়ে বেড়ানো হাওয়া যেতো এক পথে। আর আমি গায়ে ধূপ ও আগরের ঘ্রাণ মেখে, মানুষের প্রার্থনার আকুতি সঙ্গে নিয়ে আরেক পথ ধরে ফিরতাম বাড়ি।

কিন্তু সন্ধ্যা যেহেতু পার হয়ে গেছে, যেহেতু রাত নয়টা সাড়ে নয়টা বাজতে চলেছে, সেহেতু শাঁখারী বাজারে যাওয়া হয় না। বরং এইসব ভাবতে-ভাবতেই ওই আড্ডা ছেড়ে আমি উঠে যাই। তবু আমার পিছু ছাড়ে না প্রাক-বসন্তের বাতাস,  আমাকে বে-দিশা করে টো টো করে ঘোরায়, অথবা হাওয়ার হাতে নিজেকে এতোই শপে দিই আমি যে, হাওয়া আমার স্থিরতা ধরে দেয় টান।  

অবশ্য এই প্রথমবার নয়। আগেও, আরো অগুন্তি দিন গেছে আমার হাওয়ার টানে। হয়তো তখন আমি ১৪ কি ১৬ কি ১৮। তখন, সেই কৈশোরে বা প্রাক-তারুন্যের দিনগুলোয় এমন অচিন হাওয়া আমায় ডাকতে এলে আমি মাঠে মাঠে হেঁটেছি; ঘাসের মধ্যে শুয়ে থেকেছি একা; ঘাসের গন্ধ, মাটির গন্ধ, সদ্য-ফোটা আমের মুকুলের গন্ধ, শুকনো পাতার গন্ধ একে একে দখল করে নিয়েছে আমায়; আর হাওয়া-ভ্রমণ শেষে যখন আমি ফিরেছি ঘরে, তখন আমি আর আমি নেই; অথবা তখন আমি হাজার বছরের ভ্রমণ শেষে নিজভূমে ফিরে আসা এক নতুন মানুষ।

কিন্তু এখন তো আমি ১৪ বা ১৬ বা ১৮ নই। এখন আমি ৩০ পাড় হওয়া। এখন আমি মধ্য বয়স। তবু কেন হাওয়া এসে আমাকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে গেঁথে নেয় তার বর্শায়! কেন তবু অস্থিরতা! কেন তবু, “কী জানি কীসের লাগি প্রাণ করে হায় হায়!”

স্থির হবার জন্য আমি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যাই। কিন্তু ওখানেও মন টেকে না। তাই, গল্পের মুখগুলোকে বিদায় জানিয়ে আমি উঠে যাই, উঠে ধীর পায়ে হাঁটি। হাঁটতে গিয়ে পরিচিত কয়েকজনের সাথে পথে দেখা হয়; কুশল বিনিময় হয়; টুকটাক গল্পও হয়। কিন্তু আমি অনুভব করি, তাদের সাথে করা গল্পগুলোয় আমার সেই হাওয়াটা নেই; অথবা আমি দেখি, আমার ভেতর ঢুকে বসে থাকা হাওয়াটা আমাকে ভেতর থেকে খুঁটি ধরে ক্রমাগত নাড়ায় আর বলে, আহা! চলো তো, অন্য কোথাও।

কী করি! হাওয়ার টানে আমি পরিচিতজনদের বিদায় জানাই! বিদায় জানিয়ে এক কদমের পথ তিন কদমে হাঁটি; তিন কদমে হাঁটতে হাঁটতে হাওয়াটাকে গায়ে মাখি। গায়ে মাখতে মাখতে শাহবাগ অব্দি এসে ফুলের দোকানগুলোতে যাই। ফুল কিনবো-কিনবো ভাবছি বেশ কয়েক দিন। ঘরের ফুল শুকিয়ে ভাস্কর্য হয়ে গেছে। তবু ওই ফুলেই চলছে, কিনবো-কিনবো করেও ফুল কেনা হয়নি। কারণ বাসা থেকে বেরিয়ে শাহবাগের দিকে যাওয়া হয় না অনেক দিন; আর কাঁটাবনের দিকে গেলেও কাজ সেরে চলি আসি; ফুল কেনার কথা মনে থাকে না। ফলে, ভাষ্কর্য হয়ে যাওয়া শুকনো ফুলই আমাকে রোজ গৃহে জানায় অভ্যর্থনা।

তো, আজকে এই হাওয়ায় পাওয়া দিনেই আমি ফুলের দোকানে ঢুকি। তবে, “ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে” কোনো “মৃদু বায়” “বহে” কি-না সেদিকে আমি নজর করি না। বরং ফুলওয়ালাদের সাথে আমি দরাদরি করি। দশ টাকার গোলাপ ছয় টাকায়, ছয় টাকার রজনীগন্ধা চার টাকায় দাম ফুরিয়ে একগুচ্ছ ফুল কিনি ফ্রেশ ফ্লাওয়ার নামের দোকান থেকে।

ফুল কেনার ফাঁকে, গোলাপের বালতি থেকে একটা একটা করে একগুচ্ছ গোলাপ বাছার ফাঁকে বিক্রেতার সাথে এটা-ওটা নিয়ে কথা হয়। সদ্য যুবক হওয়া অথবা টিনএজ এর শেষ সীমায় দাঁড়িয়ে থাকা ফুল বিক্রেতার নাম শাকিল বা সাকিব, এই দু’টোর কোনো একটা নাম সে বলেছিল কিন্তু গুলিয়ে ফেলেছি।

আলাপটা ফুল বিক্রেতা শাকিল বা সাকিবের সাথেই শুরু হয় প্রথম। তারপর কথা ছড়ায় দোকানের অন্য লোকদের সঙ্গেও। কী জানি! এই হাওয়ায় পাওয়া দিনে আজ বুঝি আমাকে পেয়েছে কথাতেও। ফুল বাছাবাছি শেষ হলে শাকিল বা সাকিব বলে, ফুলগুলা তোড়া বানাইয়া দেই?

আমি বলি, না না, তোড়া বানানোর দরকার নাই।
সে বলে, কী বলেন, এইভাবেই নিবেন ফুলগুলা!

কথাটা বলে সে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। তার মুখের দিকে তাকিয়ে আমি বুঝতে পারি যে, শাকিল বা সাকিব আসলে বলতে চাইছে, ফুলগুলা যারে দিবেন, তারে এম্নেই দিবেন? একটু সাজাইয়াও দিবেন না?

ওর মুখের ভাব লক্ষ্য করেই আমি বলি, আরে আমি তো কাউকে দেয়ার জন্য ফুল কিনতেছি না। এইগুলা আমার নিজের জন্যই।

তখন সে বলে, তাইলে ফুলের ডাটাগুলো ছোটো করে দেই?

আমি আবার বলি, না না, তুমি কেটো না। বাসায় নিয়ে সাজানোর সময় আমি দরকার মতন কাটবো।

শাকিল বা সাকিব ফুলগুলো বেঁধে দেয়। একগুচ্ছ ফুল হাতে হেঁটে হেঁটে আমি রাস্ত পাড় হয়ে জাদুঘরের সামনে আসি। পরিচিত একজনের সাথে সেখানে দেখা হয়; কুশল বিনিময় হয়। কিন্তু অন্যদিনের মত আজকে আর চা খেতে ইচ্ছে হয় না। আমি আবার ধীরলয়ে হাঁটি; রিকশা নিই না। কারণ এতক্ষণ এই হাঁটাহাঁটি আর ফুলের দোকানের লোকেদের সঙ্গে কথোপকথনে বাতাসের ঘোরটা একটু কেটেছে বলেই টের পাই। কিন্তু এখন রিকশায় উঠলে দেশী রজনীগন্ধা আর লাল গোলাপের গন্ধে ওই খুনী হাওয়াটা আবারো আমার খোঁজ পেয়ে যেতে পারে। তাই, সেই ভয়ে রিকশা নিতে আমি একটু ইতস্তত করি এবং হাঁটতে থাকি। হাঁটি ফুটপাথ ধরে, আস্তে ধীরে। কাছিমের মতন হাঁটতে হাঁটতে এগুই, আর থেকে-থেকে আকাশের দিকে তাকাই, চোখ যায় দুই-চারটা তারায়।

এভাবে হাঁটতে হাঁটতেই আজিজ মার্কেট পাড় হই। পাড় হয়ে রিকশা নিই। রিকশা চলতে থাকলে আমি আকাশের তারার দিকে মুখ করে থাকি; আমার নাকে এসে লাগতে থাকে গোলাপ ও রজনী গন্ধার ঘ্রাণ। আর রিকশায় যেতে যেতে, তারাদের দেখতে দেখতে, ফুলের গন্ধ নিঃশ্বাসে টেনে নিতে নিতে এক মনে নিজেকে বলি: সামলে থাকো; বাতাস এসে অতর্কিতে হামলে পড়তে পারে। আর আরেক মনে আমি নিজেকে শোনাই,

“মোর ভাবনারে কী হাওয়ায় মাতালো
দোলে মন দোলে অকারণ হরষে।”

Comments

comments

আফরোজা সোমা

আফরোজা সোমা

জন্ম ২রা অক্টোবর, ১৯৮৪, কিশোরগঞ্জ। পেশায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। পাশাপাশি ফ্রিল্যান্স ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট হিসেবে কাজ করেন বিবিসি বাংলা রেডিও-তে। প্রকাশিত কবিতার বই: অন্ধঘড়ি (২০১০,কথা প্রকাশ), হারমোনিকা (২০১৪, সংবেদ), ডাহুক (২০১৫, ভাষা প্রকাশ)।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি