সাম্প্রতিক

আমার বিষাদগুচ্ছ । মৃন্ময় চক্রবর্তী

যেখানেই পা রাখতে যাই, দেখি
মুছে গেছে সমস্ত আলপনা।
এটা কোনো কল্পনা নয়
কিংবা, ভেবে নেওয়া কোনো জল্পনা।
আকাশের নীচে এসে দাঁড়ালেই,
দেখি কে যেন নিভিয়ে দিয়েছে চাঁদ
আমি বহুদিন জানি এমন প্রবাদ।

আকাশে তারার ভিড়
বাগানে হাসনুহানা
হাওয়াও বইছে ধীর
তবুও কবিতা নেই।
লিখতে পারিনি কিছু
ছন্দ হয়েছে হত
শব্দের পিছু পিছু
পেরিয়েছি প্রান্তর।
শুনছি ঝরছে ঘাসে
রক্ত অনুষ্টুপ
পয়ারে বুলেট ভাসে
দেশজুড়ে নীল ক্ষত।
কবিতা ধরেনি হাত
শব্দ করেছে চুপ
সারারাত ঝরে শুনি
টুপটুপ টুপটুপ !

একটি চোখ, মনে হল যেন 
পাঁজর ফাটিয়ে
সমুদ্র তুলে আনবে;
একটা হাত, ছুঁয়ে দিতেই
মনে হল, সমস্ত তন্ত্রী ছিঁড়ে
প্রচন্ড বেজে উঠবে
হারানো ভায়োলিন।

ভাঙতে ভাঙতে কোথায় নিয়ে যাবে হে,
চূর্ণ করতে করতে কোথায় উড়িয়ে দেবে বলো?
পড়ে থাকা বাদামি পালক, পাখিটার খোঁজ দেবে না আর,
কোথায় ভাসিয়ে দেবে তাকে নীলবিন্দু জল।
এভাবেই থেমে যাবে কথা আর নদীর জোয়ার
বার বার থেমে যাবে, বার বার দখিনা প্রবাহ।
ভাঙতে ভাঙতে কোথায় নিয়ে যাবে দীর্ঘশ্বাস,
কতদূর নিয়ে যাবে বলো?

কথা সামান্যই ছিল…
যাপিত আমার থেকে বলা
ফুল নয় গন্ধ নয়
কাঁটাপূর্ণ এই পথ চলা।

সামান্য একটুখানি কথা…
অযত্নে বেড়ে ওঠা কুঁড়ি
ভুল হয়ে খসে পড়া ফুল
স্বপ্ন যত চূর্ণ জলনুড়ি।

থেমেছি এখানে তবু এসে
পায়ে পায়ে ফের ভালবেসে
স্বাতীতারা অশ্রুময় তিল
জ্বেলে দিল আবার সুনীল ।

সপ্তর্ষিমণ্ডল থেকে কিছু দূরে
থেমেছে নৌকো।
আমি আসছি
একটু অপেক্ষা করো রাত
হাওয়ায় বিবর্ণ বিশ্বাসের গন্ধ
খসে পড়া স্বপ্নের ঝিরঝির
কাঁঠালপাতার গায়ে বিলিকাটা
কবেকার আলো

সব পেরিয়ে আসছি…
সপ্তর্ষিমণ্ডল থেকে কিছু দূরে
থেমে থাকো রাত
আমি আসছি একটু অপেক্ষা করো!

ফুটে উঠতে ইচ্ছে হল
ডুবে যেতেই  ইচ্ছে হল
তোমার চোখের কাজল মেখে
লাল শালুকের সায়র দেখে।

মাটির তলায় লুকিয়ে ফেলেছি গান
যদি চাও তবে কান পেতে খুঁজে নাও
পাথর ফাটিয়ে বেরিয়ে আসবে প্রাণ
যদি চাও, তবে মেঘ আনো জল দাও।

বাতাস আজ অশ্রুভারাক্রান্ত!
পাঁজরে নিম্নচাপ
গভীর গভীর।
সতর্ক বন্দর,
অন্দরজুড়ে ঝড়োহাওয়া…

১০

হে বিষাদ বুক ভরে দাও
অন্ধকার—
কাঁটার প্রশাখা
তীক্ষ্ণ আলিঙ্গন।
আমি যে আলোর কথা ভাবি
ভাবি সৌরভ
তোমার আড়ালে
সে ঢাকা থাক।
বিষাদ
এসো
ভালবাসা দাও
প্রহার করো
এসো।

১১

ছিঁড়ো না
রেখে দাও
বুকে।
যদি সব
মিথ্যে হয়ে যায়
পাঁজরেই
থাকুক গোপনে।

১২

ডালে ভরা ছিল কাঁটা
মাটিতে ছড়ানো ফুল
তোমার দুহাতে রাত
নির্ভুল নির্ভুল।

১৩

একটা পাখির গন্ধ ঘুমিয়ে আছে
ওকে জাগিয়ে দাও
আকাশ বড় কাঁদছে
টুপ টুপ জল!

১৪

আশমানে অত কি দেখ হে,
সাধন মুর্মু বলেছিল
আমিতো মাথার উপরে শুধু
ভাত দেখি হে ভাত
ভাতের সাদা সাদা দানা
যেন খিলখিলাইছে,
আর অই চাঁদটো
একটা পুরুষ্ট ডিম।
তবে বুঝলে
অই আশমানি থালাটা মাঝেসাঝে
বড় আঁন্ধার লাগে
ভুখে পোড়া আঁন্ধার।

তারপর থেকে মাথার উপরে চাইলেই
আমিও দেখি
অজস্র চালের দানা
ছড়িয়ে রয়েছে।
আমার আর আশমানদারি করা হয় না
কিছুতেই হয় না

১৫

জলের ভেতর ঘাই মারছে আলো
কিসের এত ফুর্তি হে তোমার
যাও ফোটো এখন
মাছেরা ঘুমুচ্ছে
সারাদিন খেটেছে ওরা
ওদের একটু ঘুমুতে দাও!

১৬

এখানে কে ছড়িয়ে গেল কাঁটা,
বাছতে বাছতে চোখ ব্যাথা হয়ে যাচ্ছে।
কে আছ লন্ঠন বাড়িয়ে ধরো!
বুকভর্তি ফুটো থেকে
বেরিয়ে আসছে
ক্রমাগত
জরুরি অবিশ্বাস,
ছিদ্রান্বেষণ
অনিবার্য হয়ে উঠেছে,
কে আছ?

১৭

একটা অন্ধকার, জলার পাশে বসে কাঁদছে
টুপ টুপ করে বাতাস খসে পড়ছে উঠোনে
আমি বাড়ি যাব
আমায় বাড়ি নিয়ে চলো
এখানে মাটির তলায় কারা শিষ দিচ্ছে
এখানে গুমোট
ফেলে আসা পথ আমাকে খুঁজছে
আমি বাড়ি যাব!

১৮

একদিন টুপ করে
পাখিটা
খসে পড়ে যাবে,
তাকে ঠুকরে
খেয়ে নেবে
মাছ।
এই আকাশ
এই হাওয়া
কেউ
কিচ্ছুটি
জানবে না।

১৯

এই মেঘলা সন্ধ্যায়
সজনে ফুলকে আমি
ভেবেছিলাম আকাশের তারা,
তোমার উপস্থিতি এখন
ঝরা ফুলের স্বয়ম্বর।

২০

অন্ধকার কঠিন হয়ে আসছে
তুমি বলেছিলে
তোমার কাছে একটাও
দেশলাই নেই
জমে যেতে যেতে
তবু
খোয়াব দেখছ
আমিও দেখছি যদিও!

২১

এখনই নিশ্চিত হয়োনা
এখনো জলের ভেতর
কিছুটা তরঙ্গ আছে
এখনো বাতাসে
লুকানো আছে ঝড়।
এখনই নিশ্চিত হয়োনা
সামনে বালিয়াড়ি ভেবে
কিছু পরে ভেসে উঠতে পারে
দিগন্ত।
শ্মশানে জিয়োনো আছে
কিছুটা জীবন,
এখনই নিশ্চিত হয়োনা
মৃত্যুর হাত
অতটা দীর্ঘ নয়।

২২

পায়ে পায়ে কেন ঘুরছ বিষাদ
চলে যাও যেখানে দুচোখ,
আর কিছু নেই তোমাকে দেবার।
মুঠোভর্তি বিষাদ
তবু পায়ে পায়ে ঘোরে
ছায়ার মত ঘোরে
পায়ে পায়ে।

২৩

এখন আর কোথাও যাইনা
তোমার পাশেই বসে থাকি
ছায়া, হে বিষাদ
বলো বলে যাও
তোমার কাহিনী।

২৪

পাখির ডানায় কতটা উড়ান আছে,
কতটা প্রবাহ আছে একটা নদীর
কতটা সত্য আছে একটি কথার ভেতর?

২৫

নিজের কথা বলতে গিয়ে ভাবি
সব কথা তো বলাই হয়ে গেছে
খিদের কথা বলামাত্রই কারা
উঠছে বলে এ তাদেরও দাবী
আমার ব্যথা মান অপমান সেও
প্রেমও কি আজ একলা পড়ে আছে?
দেখছি হাজার চূর্ণ ভাঙা বুক
বলছে, কোথায় পেলাম তাদের চাবি!

Comments

comments

মৃন্ময় চক্রবর্তী

মৃন্ময় চক্রবর্তী

জন্ম — ১৯৭৬, কলকাতার ঢাকুরিয়ায়। কবিতার পাশাপাশি গদ্যে, অনুবাদেও তাঁর বিচরণ। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : বেঁচে থাকার স্বপ্নগুলি ( ২০০৪), এই মৃগয়া এই মানচিত্র ( ২০০৮)। পাঁচালি কাব্য: ভুখা মানুষের পাঁচালি ( ২০০৯)। সম্পাদিত গ্রন্থ পুস্তিকা : রাত্রির কঠোর বৃন্ত থেকে, মানিক শতবর্ষপূর্তি শমীবৃক্ষ, নির্মোহ রবীন্দ্রনাথ ( শমীবৃক্ষ)। সম্পাদিত পত্রিকা: মাটির প্রদীপ। ইমেল : mrinmoyc201@gmail.com

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি