খানসাহেবের খণ্ডজীবন :: পর্ব ১১ । সিরাজুদ দাহার খান

খানসাহেবের সাপুরেজীবন  ::  কিস্তি-৩

দর্শকদের সাথে সাপের লড়াই

ইতোমধ্যে সাপের খেল নাটকটি বেশ কয়েকবার প্রদর্শিত হয়েছে ইউনিভার্সিটি এবং তার বাইরে। লেখক শিবিরের প্রতিটি কর্মসূচিতেই এটা অভিনীত হয়; প্রশংসিত হয়; দর্শকদের প্রতিক্রিয়া-অভিমত জানতে চাওয়া হয়। নাটকটিতে অভিনয় কেমন হলো, তার চাইতে বেশি করে মতামত ব্যক্ত করা হয়-এ নাটকটিতে কী বলতে চাওয়া হয়েছে সে ব্যাপারে। আয়োজকদের পক্ষ থেকেও দর্শকদের কাছে এ নাটকের মূল মেসেজ ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়। এটা আর নিছক নাটক থাকে না; এটা হয়ে দাঁড়ায় সমসাময়িক ও চিরকালীন রাজনৈতিক-সামাজিক শোষণ-শাসন-প্রক্রিয়া বিশ্লেষণের হাতিয়ার হিসেবে।

যাহোক, এর মধ্যে লেখক শিবির থেকে সিদ্ধান্ত হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের ১৫০ নম্বর ভবনের সামনের চত্বরে নাটকটি প্রদর্শন ও বিশ্লেষণ করার। ততদিনে জ্যান্ত শাপ হাতে অভিনয় করার ব্যাপারে হায়দার শুধু সাহসীই হয়ে ওঠেনি রীতিমতো পারদর্শী, অসক্ত ও রোমাঞ্ছিত হয়ে উঠেছে। সাপ নিয়ে তার ভাবনা  ও দিনরাতযাপন। শয়নে-স্বপনে তার সাপের সাথে বসবাস। তার মনে হতে থাকে যে, সে এখন পৃথিবীর যেকোনো সাপ অনায়াসে বশীভূত করে ফেলতে পারবে। কোন সাপ কোথায় পাওয়া যায়, কোন সাপের বিষ কেমন, কীভাবে ধরতে ও বশ করতে হয়— সে এখন এসব আক্কাস মিয়ার কাছ থেকে জানতে শুরু করেছে। সাপ এখন তার কাছে ডাল-ভাত। এমন কি, শেরে বাংলা হলের সাতবার পানিমেশানো পাতলা ডালের চাইতেও ডালভাত! এক চুমুকেই তা খেয়ে সাবাড় করতে পারে। ইতোমধ্যে সাপুড়ের সাথে তার ভীষণ সখ্য। কেউ কেউ তো গুঞ্জন তুললো এবং কানাঘুষা করতে লাগলে— ‘হায়দার কি এবার সাপুড়েজীবনই বেছে নিতে যাচ্ছে! তাহলে সংগঠন চলবে কেমনে?’

যাহোক দিনক্ষণ সব ঠিকঠাক। মহড়া-প্রচারণা-স্থান-কাল-পাত্র-পাত্রী সব প্রস্তুত। বাংলা বিভগের সামনেই সবুজ চত্ত্বর বেছে নেয়া হলো নাটক প্রদর্শনের জন্য। হায়দার এ বিভাগেরই কিছুটা বহেমিয়ান ছাত্র হিসেবে একসাইটেড! এবার তাহলে তার বন্ধুবান্ধবেরা বুঝবে— হায়দার কী চিজ! রাজনৈতিক চেতনাপ্রসারের পাশপাশি তার আরও একটা বিশেষ মনোযোগ ছিল— বিশেষ করে সহপাঠিনীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। সম্ভবত, সচেতনভাবেই নাটক প্রদর্শনের জন্য ক্লাসটাইম বেছে নেয়া হয়েছিল, রাজনৈতিক চেতনা ও হায়দারের প্রতি শিক্ষার্থীদের টান যাচাই করার জন্য।

প্রদর্শনচত্বরের পেছন দিকে একটু পর্দা দেয়া হলো তাৎক্ষণিক মেকআপ, প্রপস বা কোনো ঝঞ্ঝাট ম্যানেজ করার জন্য। ক্লাসের সময় হয়ে গেছে। একসময় একদিকে ক্লাসের ঘণ্টা বেজে উঠলো, সেই সাথে প্রিয় ক্যাম্পাসের অন্যদিকে ঢোলডগর-হারমোনিয়াম বেজে উঠলো মতিহারের সবুজ চত্ত্বরে। লেখক শিবিরের সংগীত দল নেচেগেয়ে মাতোয়ারা করে ফেললো গোটা ক্যাম্পাস, বিশেষ করে কলাভবন চত্ত্বর। দুয়েকজন প্রখরচেতনাসম্পন্ন শিক্ষক ও রাজনৈতিক দীক্ষাদাতা-ও এ শিবিরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত ও সক্রিয় ছিলেন। হায়দারদের অন্যতম ভরসা ছিলেন তাঁরা এবং তাঁদের দিকনির্দেশনা ও সচেতন সমর্থন।

সারা ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে সংগীত প্রচারণাদল প্রদর্শন চত্বরে সমবেত হলো। কোনা ঘোষণা ছাড়াই শুরু হয়ে গেল গণসংগীতের মূর্ছনা ও বিপ্লবীচেতনাসম্পন্ন গানের উদ্দীপনাময় রুদ্ররূপ! আর কীসের ক্লাস, কীসের কী! হুরমুড় করে ক্লাস ভেঙে বেরিয়ে এলো শিক্ষারথীদের অর্ধেকেরও বেশি। হাজার হোক তাদের মজার ক্লাসমেট হায়দারের নাটক। বাকিরা সাহস করে বের হয়ে না আসতে পারলেও তাদের মন পড়ে রইলো বাইরের নাটকচত্ত্বরে। একটা পর একটা সংগীতের মাঝেমাঝে গানের বিশ্লেষণ ও মূল আকর্ষণ ‘সাপের খেল’-এর ঘোষণা চলতে থাকলো। এভাবে প্রায় আধাঘণ্টা চলে গেল কিন্তু সাপুড়ের কোনো খবর নাই; নামগন্ধও নাই। হায়দারেরও কোনো পাত্তা নাই! আজকেও ভয়ে পালারো নাকি ও।

আয়েজকরাও একটু চিন্তিত হয়ে পড়লো; কিন্তু বিষয়টিকে কোনো পাত্তা না দেযার ভাব দেখিয়ে গণসংগীতের মাদলে মাতিয়ে তুললো দর্শকদের। এভাবে ৫মিনিট গেছে কি যায়নি হঠাৎ অদূরে কানে এলো সাপুড়ের ডুগডুগির বাজনা আর সাপুড়ের চিরচেনা গান— ‘কী সাপে দংশাইলো লখাইরে, এএএ বিধির কী হইইলোওওওওও!’ শব্দ কোনদিক থেকে আসছে বুঝে ওঠার আগেই অতি অকস্মাৎ পেছন থেকে দর্শকসারি ভেদ করে গলায় সাপের মালা জড়িয়ে হায়দার তার দলবল ও শিষ্যরূপী আসল সাপুড়েকে নিয়ে সঙ্গীতদলের মধ্যে মিশে গেল। এবং কোনটা আসল সাপুড়ে আর কোনটা নকল অর্থাৎ সাপুড়েরূপী হায়দার কেউই বুঝে ওঠার আগেই যথরীতি তারা দলের সাথে নেচে নেচে অদ্ভূত ভঙ্গিতে গান গাইতে লাগলো। এসবের মধ্যেই আড়চোখে দর্শকের ভীড় এবং তাদের মনচঞ্চলতা ও ভীতিময় মুখগুলোও হায়দার পড়ে নিলো চকিতে সহজাতভাবে। গান চলছে তালে তালে; দর্শক-ও তালে তালে তাল রেখে করতালিতে মুখর করে তুলেছে প্রাঙ্গণ। চলছে তুমুল বিপ্লবী সঙ্গীত একের পর এক। দর্শক ততক্ষণে নাটকের কথা ভুলেই গেছে।

হঠাৎ বলা নেই-কওয়া নেই অতি আকস্মিকভাবে হায়দার গগণবিদারি চিৎকার করে ওঠে—           ‘আ-আ-আস্তে!’

মুহূর্তে যেন কোনো এক অদৃশ্য যাদুকরের যাদুর প্রভাবে গোটা ক্যাম্পাস স্তব্ধ হয়ে গেল। পাখির কলরবও থেমে গেল। ১ সেকেন্ড.. ২ সেকেন্ড! মনে হচ্ছে যেন অসীমসময়। সমবেত নিঃশ্বাসের ছন্দ ছাড়া আর কিছুই ধ্বনিত হয় না তখন। সাপুড়ে হায়দার লাল চোখ নিয়ে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। নিশ্চল নিশ্চুপ। নিঃশ্বাসেরও উথ্থান-পতন নাই তার! এভাবে কেটে যায় আরও দীর্ঘ ২টি সেকেন্ড। ৩য় সেকেন্ডে সাপুড়েরূপী হায়দার কণ্ঠস্বরের বেজ থেকে বিড়বিড় করে মন্ত্রপাঠের মতো সংলাপ আওড়ানো শুরু করলো— ‘আস্তে আস্তে শুরু কর, ধীরে ধীরে দেখাবি’ —বলতে বলতে ধীরে ধীরে গলার গামছা ঝাঁকি দিয়ে যেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রেণে নিয়ে আসে সে। যেন নিজের সাথে নিজেই কথা বলছে এমনভাবে বলতে থাকে— ‘আশা কইরা আইসে মানুউউষ! মাইনষেরে তুই খুশি কইরা দিস! মনে রাখিস! মাইনষেরে খুশি করতে না পারলে সাপের বংশের কলংক হয়া যাবি তুই। হে..এ…এ…রে রে…রাহ্’(গলা ক্র্যাক করে যায় সাপুড়ের ইচ্ছাকৃতভাবে; থমথমে ভীতিকর পরিবেশ তৈরি হয়)। সাপুড়ে হায়দার সাপের বাক্সের ওপরে হঠাৎ স্বশব্দে বাম হাত দিয়ে থাপ্পর মারে। আচমকা অওয়াজে দর্শকবৃন্দ চমকে ওঠে এবং যেন কিছুটা ধাতস্থ হয়।

কিন্তু দর্শকের মধ্যে কোনো সাড়াশব্দ নেই; নড়াচড়া নেই। হায়দার আবার ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। দাঁড়াতে দাঁড়াতে চারদিকে আবার চোখ বুলিয়ে নেয়। সবাইকে পড়তে চেষ্টা করে এবং পরক্ষণেই  সংলাপ আওড়ে চলে নিজের গতিতে :

‘জনাব! বহুদিন আপনেগো এইখানে আহি না। আগে খুব ঘনঘন আইতাম। আইজকাল একটু কমকম আহি। দিনকাল খুব খারাপ যাইতাছে। পুব পশ্চিম উত্তর দক্ষিণ কিছু দিশা পাওন যায় না। এই দেকপেন পুব দিক থিকা ঘনকাইল্লা ম্যাঘে আকাশ ছাইয়া গেছে। আবার ইকটু পরেই দেকপেন পশ্চিম দিক থিকা খটখটা রোইদ! কহন কী ঘইটা যায়, কিছুই কওনের ক্ষেমতা নাই। তাই আইজকাল একটু কমকম আহি।’

বলেই সে দর্শকদের মধ্যে একটা চক্কর দেয় এবং বলে চলে : ‘তয় আইজ যহন আইছি এককালে খালি হাতে আহি নাইক ক্যা। আপনেগো জান শান্তি কইরা যামু। যত্ত খুশি শাপ দেকপেন। চোক্ষু বুঁইজা মন ভইরা শাপ দেকপেন। হে..এ…এ…রে রে…রাহ্!’ বলেই সে ৩২ পাটি দাঁত বের করে একটা কিম্ভূতকিমাকার যাদুকরি হাঁসির মুক্ত ছড়িয়ে দেয়। তা দেখে দর্শকদের মধ্যে হাসির রোল পড়ে যায়; তাদের মধ্যে স্বস্তি ও স্বাভাবিক ছন্দ ফিরে আসে। তারা এতক্ষণে নড়েচড়ে বসে; বড় বড় নিঃশ্বাস নেয়। এবং পরস্পরের মধ্যে গুঞ্জন শুরু করে। সামনে কী ঘটতে যাচ্ছে সে-ব্যাপারে কৌতূহলি হয়ে ওঠে।

হায়দার এতক্ষণে নিশ্চিত হয়ে গেছে যে, সে দর্শকদের কব্জা করে ফেলেছে। সে ইচ্ছেমতো তাদেরকে নাচাতে পারবে। তাই হঠাৎ আবার বলতে শুরু করে : ‘আইজ আপনেগো একখান সাপ দ্যাহামু। জীবনেও দ্যাহেন নাই। আপনে তো দূরের কথা, আপনের বাপদাদা চইদ্দগুষ্টি দেহে নাইক্কা। আপনেগো ভাইগ্যে আছে তাই আপনেরা আইজ দেখপেন। কী দ্যাখতে চান?’ ‘হ হ দেখতে চাই’-সমস্বরে বলে ওঠে দর্শকবৃন্দ। ‘ডরা খাইবেন না তো?’ ‘না না ডরাইতাম না। ডরামু কেন? আপনে আছেন না!’ — সমস্বরে বলে ওঠে কয়েকজন দর্শক।

হায়দার আবার গলা চড়িয়ে শুরু করে : ‘আমার উস্তাদ নাম তার পিন্দাল সাপুড়ে।      কামরূপ-কামুক্ষ্যায় আসামের জঙ্গলে থাকত, নাম শুনছেন; শুনেন নাই? হ হ আপনি শুনছেন। আপনি?’ — কেউ হ্যাঁ বলার আগেই সে বলে ‘হ আপনিও শুনছেন।”

সাপুড়ের প্রভাবে অনেকেই ‘শুনছি শুনছি’ বলে মন্ত্রমুগ্ধের মতো সায় দিতে থাকে।

‘তিনি এই সাপ আমারে দিয়া গেছেন। কইছেন— সাবধান! যেখানে সেখানে যারে তারে এই সাপ দ্যাহাবি না। বুজমান লোক পাইলে দ্যাহাবি। আপনেরা বুজমান গোন্যমাইন্র লোক জন্যেই দ্যাহাইতেছি।’

এবার সে মন্ত্র পাঠ করতে থাকে বিড়বিড় করে। দর্শকরা তার কিছুই বুঝে উঠতে পারেনা।

মন্ত্র পড়তে পড়তে একসময় হায়দার নিজের হাঁটুতে থাপ্পর দিয়ে হঠাৎ বাক্সের ডালা ঝপ করে খুলে ফেলে। লিকলিকে ফনা তুলে কয়েকটা ছোট ছোট ছোট সাপ প্রত্যেকের দিকে নজর বুলিয়ে নেয়। তারপর তারা স্থির হয়ে তাকিয়ে রইলো আসল সাপুড়ে আক্কাস মিয়ার দিকে; তারপর হায়দারের দিকে। তারপর দর্শকদের দিকে। তাদের তো নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার পালা। সাপুড়েরূপী হায়দার জিজ্ঞেস করে : ‘ওই তরা কি কিচু খাইবি? সাপগুলো না-সূচক মাথা নাড়লো। এরপর দর্শকদের দিকে দেখিয়ে জানতে চাইলো: ‘তরা কি ওনাগো ভালো পাইস?’ ওরা আবার মাথা নাড়লো : ‘হ ভালো পাই?’ ‘ওনাগো খ্যালা দ্যাখাবি?’ ওরা আবার মাথা নাড়লো : ‘হ দ্যাহামু।’ এরপর সে আদেশ করলো : ‘ওই তরা অহন বাক্সের ভিতরে হান্দা।’ — বলে বাক্সে একটা আস্তে করে টোকা দিল। সাপগুলো মাথা নত করে বাক্সের ভিতরে ঢুকে গেল।

‘স্যারেরা, বোইনেরা, ভাইয়েরা! এইগুলান কুনো সাপ না, এই গুলান কাচ্চাবাচ্চা। যেইডা দ্যাহনের লাইগ্যা আপনেগো পরান এতক্ষণ আঁকুপাকু করতাছে অহন সেইডা দ্যাহামু। তয় একখান কতা কই— সাপডা যহন বাইর করমু, আপনেরা কেই নড়াচড়া করবেন না; ছটফটানি করবেন না। হেই আবার মাইনষের তড়বড়ানি এক্কেলে সহ্য করতে পারে না।’

এরপর সে আবার মন্ত্র পড়তে থাকে আর চারদিক ঘুরতে থাকে। একসময় হঠাৎ চিৎকার দিয়ে বলে ওঠে :

‘সাবধান! সক্কলে সাবধান! আমি অহন সাপডা বাইর করুম। এই যেই সেই সাপ না। এই সাপ কহনো কেউ দ্যাহেন নাই। এমুন তার ত্যাজ যে, গাছছের শিকড়ে কামুড় দিলে গাছছের পাতা ঝইরা যায়, পাথ্থরে কামুড় দিলে পাথ্থর ফাইটা যায়, আর মা্নষের শরীলে কামুড় দিলে? মাইনষের শরীল মোমের মতো গইল্লা মাটিতে মিইশ্যা যায়!’

সাপুড়ে হায়দার কথা শেষ করে ধপ করে মাটিতে বসে পড়ে। দর্শকবৃন্দ জড়োসড়ো হয়ে যায়। পাথরের মতো একে অন্যের গা ঘেঁষে বসে থাকে। নারী-পুরুষ কেনো ভেদাভেদ দেখা যায়না।

সাপুড়ে আচমকা বড় বাক্সের ডালা খুলে ফেলে। একটা মাথামোটা বড় সাপ গলা ও লকলকে জিব বের করে চোখ বড় বড় করে দর্শকদের দিকে তাকিয়ে থাকে। দর্শকদের গা ছমছম করে ওঠে! শরীর শিরশির করে। রক্ত হিম হয়ে যায় সবার। হায়দার সাপের ফনার সামনে হাত অর্ধমুষ্টিবদ্ধ করে এদিকে-ওদিকে দোলাতে থাকে; সাপও তার ফনা সাপুরের হাতের মুঠির তালে তালে দুপাশে দোলাতে থাকে। দর্শকেরাও তালে তালে দুলতে থাকে। সাপের চোখ দর্শকদের দিক থেকে সরে এসে সাপুড়ের হাতের দিকে যাদুমন্ত্রের মতো তাক করে থাকে। সাপ তাকে ছেবল দিতে নেয; সে হাত পিছিয়ে নেয।

সাপুড়ে ধীরে ধীরে হাতের দূরত্ব বাড়াতে থাকে। সাপও তার গলার দূরত্ব বাড়াতে থাকে। একপর্যায়ে সে তার পুরো শরীর বাক্স থেকে বের করে মাটিতে শুইয়ে দেয়; কিন্তু তার ফনা উদ্ধত থাকে। সাপুড়ে হায়দার তার হাত ক্রমান্বয়ে ওপরের দিকে তুলতে থাকে; সাপও তার গলা আরও উঁচুতে তুলে ধরে। এবং কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সাপুড়ের হাত স্থির হয়ে যায়; যন্ত্রচালিতের মতো সাপের ফনাও স্থির হয়ে থমকে যায়। রুদ্ধশ্বাসে দর্শকবৃন্দও অপেক্ষা করতে থাকে পরবর্তী মুহূর্তের কৌতূহলে; নির্বাক; নিস্তব্ধ! ২/৩ সেকেন্ড নিস্তব্ধ থাকে হায়দার-ও। সে কী করতে যাচ্ছে, কেউ-ই আন্দাজ করতে পারে না।

বিড়বিড় করে আবার মন্ত্রপাঠ শুরু করে হায়দার-ও; দর্শক চঞ্চল হয়ে ওঠে। সাপ কিন্তু অচঞ্চল; অপলক! মন্ত্র পড়তে পড়তে আচমকা হায়দার সাপুড়ের কণ্ঠ মুষ্টিবদ্ধ করে। সাপ অবলীলায় প্রথমে তার গলা পরে হাত পেঁচিয়ে ধরে। হায়দার সংলাপ আওড়ায় :

‘কী সাপে দংশাইল লখাইরেএএএ! এ এ এ বিধির কী হইলো!’ বলতে বলতে দর্শকদের মধ্যে গিয়ে হাজির হয়; তারা তার পথ আলগা করে দেয়। সে এবার আসল কথায় চলে আসে— অন্য কথায় চলে যায় : ‘ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার মন্ত্রি-এমএপি জজ-ব্যারিষ্টার এমুনকি প্রফেসর-প্রেসিডেন্টও ঘুষ খাইতে পারে, সাপপে কহনো ঘুষ খাইবোনা; বেঈমানি করব না। তয় খ্যালা দ্যাহানোর লাইগ্যা খুশি হই যে যা দিবেন তা লইতে পারে। কীরে লইবি?’ সাপ মাথা নাড়ে-‘হ লমু্’। এই সুযোগে হায়দার সাপুড়ে নারী দর্শকদের দিকে ঘুরে দাঁড়ায় এবং তাদেরকে আবিষ্ট করতে চেষ্টা করে :

‘ফেলান পয়সা ফেলান। ১ টাকা ২ টাকা ৫টাকা ১০ টাকা ১০০ টাকা। যে যা পারেন ফেলান। ১ টাকা ২ টাকা ৫টাকা ১০ টাকা ১০০ টাকা। যার পয়সা আছে তার কাছে দাবি আছে; পয়সা নাই দাবি নাই।’ ঝনঝন শব্দে ধাতব মুদ্রা ও খসখসে নোট পড়তে থাকে বাক্সের সামনে সাপুড়ের গায়ে সাপের মাথায়।

‘যার পয়সা আছে দাবি আছে, যার পয়সা নাই দাবি নাই। পয়সা থাকা সত্বেও যে পয়সা দিব না তার সোয়ামিরে ধইরা খা; পয়সা থাকা সত্বেও যে পয়সা দিব না তার লাভাররে ধইরা খা; পয়সা থাকা সত্বেও যে পয়সা দিব না তার বউরে ধইরা খা! এএএ রেরেরেরে!’ ধাতব মুদ্রা ও নোট পতনের শব্দ ৫গুণ বেড়ে গেল; বিশেষ করে মেয়দের মধ্যে থেকে এবং প্রেমিক-প্রেমিকাদের হাত থেকে।

সবাই যখন টাকার দেয়া নিযে ব্যস্ত ও আহল্লাদিত এসময় অভূতপূর্ব এক ঘটনা ঘটে যায়। কখন যে সেই মস্ত বড় সাপ সাপুড়ে হায়দারের হাত গলে সবুজ চত্তরে নেমে গেছে তা কেউই খেয়াল করেনি। এমন কি হায়দারও ২/৩ সেকেন্ড তা অনুভব করেনি। হঠাৎ হাতটা হালকা মনে হওয়ায় সে আবার মন্ত্র পাঠ করতে উদ্যত হতেই নিজের হাতে চোখ যায় এবং তার চোখ তখন চড়কগাছ! সে লক্ষ করে তার হাতে কোনো সাপ নেই; তার চোখ চলে যায আসল সাপুদড় আক্কাস মিয়া দিকে। চকিতে সামনে তাকিয়ে দেখে সাপটা সবুজ চত্ত্বরে এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করছে এবং সম্ভবত দর্শকসারি ভেদ করে বাইরে যাওয়ার পথ খুঁজছে।

ইতোমধ্যে দর্শককুলও ঘটনার আকস্মিকতায় হতবিহবল ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেছে। সাপ তখন দর্শকসারিতে ঢুকে পড়েছে; পরিস্থিতি হায়দারের নিয়ন্ত্রেণের বাইরে। ততক্ষণে দর্শকের চেতনা বাস্তব জগতে এসে গেছে যে সাপ হায়দারের নিয়ন্ত্রণহীন। কীসের নাটক, কীসের সাপের খেল! ছেলেমেয়ে শিক্ষক বিপ্লবি নির্বিশেষে পালানোর পথ খুঁজছে। একেবারে জগাখিচুড়ি অবস্থা; হুটোপুটি হুড়োহুড়ি! কে কার গায়ের ওপর গড়িয়ে পড়ছে তার ঠিক-ঠিকানা নেই। নাড়পিুরূষ বেদ নেই; কারো মদ্রে অন্য কোনো চেতনা্ও নেই। কেউ প্যান্ট কেউ পাজামা কেউ শাড়ি সামলাতে ব্যস্ত। কারও কারও পাজামা-প্যান্ট-শাড়ি হ৭াটুর ওপড়ে উঠে গেছে তাদের অজান্তেই। কখন কার বস্ত্রভেদ করে মারত্মক বিষধর সর্পরাজ কার কোন প্রত্যঙ্গে দংশন করে! ত্রাহি অবস্থা!

২/১ সেকেন্ড হায়দার-ও দিশা হারিয়ে ফেলে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় সে! এতবড় সংকট তার অভিনয়জীবনের অতি ক্ষুদ্র পরিসরে কখনো ঘটেনি। কিন্তু বিহ্বলতা ও দ্বিধা কাটিয়ে উঠতে মুহূর্ত সময়ও নষ্ট করে না সে। হঠাৎ সে গগণবিদারি চিৎকার করে ওঠে :

‘আ..আ..আস্তে! একদম চুপ! কেউ নড়াচড়া কইরেন না। এক পা-ও না। যে যেখানে আছেন চুপচাপ পাথ্থরের মতো ঠাসি খাইয়া থাকেন। আমার উস্তাদের দুহাই লাগে! এই যেই সেই সাপ না! কারো কোনো বেয়াদপি সহ্য করবনা। একচুল নড়ছেন কি মরছেন!’ তার দৃঢ় ও ভীতি প্রদর্শনকারী বক্তব্যে মোহিত ও যাদুগ্রস্ত হয়ে নারীপুরুষ নির্বিশেষে সব দর্শক মুহূর্তে যে যার জায়গায় ফ্রিজ হয়ে যায়। এবং পর মুহূর্তের হুকুমেই ধপ করে যে যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেখানে বসে যায়।

এদিকে বাইরে দম্ভ ও সাহস প্রদর্শন করলেও ভিতরে ভিতরে হায়দার প্রচণ্ড ঘামতে থাকে। কপালে-ও চিকন ঘাম দেখা দেয়। মাথার চুল বিন্যস্ত করার ভাব করে গামছা দিয়ে কপালের ঘাম মুছে ফেলে সে। এরপর সাপ নিজে ধরার জন্য অত্যন্ত স্বভাবিকভাবে এক পা এগিয়ে গিয়ে; যেন কিছুই ঘটেনি। কিন্তু পরক্ষণেই ‘নিজে বাঁচলে বাপের নাম’ এই নীতিতে ভয়ে পিছিয়ে আসে। কিন্তু কাউকে বুঝতে দেয়না যে, ভয়ে তার আত্মারাম খাঁচাছাড়া! হঠাৎ তার মাথায় বিদ্যুৎগতিতে বুদ্ধি খেলে যায়। সে তাৎক্ষণিকভাবে গর্জে ওঠে তার শিষ্যরূপী আসল সাপুড়ে আক্কাস আলির দিকে :

‘ওই বেটা ব্যাক্কল! উস্তাদের মতো খাড়াইয়া খাড়াইয়া দ্যাহস কী? দ্যাহস না সাপ ছুইট্টা গেছে। পাবলিকের জামাকাপড়ের মধ্যে হান্দাইতেছে। যা! শিগগির ওরে ধইরা বাক্সে ভর। তরে কী রঙ্গ দ্যাহোনের জইন্যে লইয়া আইছি? না কি তুই-ও ওইসব স্যার আর আপাগো ল্যাহান ডরা খাইসস? বেহুদ্দা কোনহানকার!’

আক্কাস মিয়া ঝট করে অভিনয় চত্ত্বরে ঢুকে পড়ে। এবং সাপের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে বিড়বিড় করে মন্ত্র পাঠক রতে শুরু করে। অর্ধ-মুষ্টিবদ্ধ ডান হাত সাপের ফনার সামনে নিয়ে এপাশে-ওপাশে দোলাতে থাকে। সাপ তাকে ছোবল দেয়ার চেষ্টা করে সে হাত পিছিয়ে নেয়। এভাবে অল্পক্ষণ খেলানোর পর সে বাম হাত দিয়ে সাপটাকে আলতো করে কব্জা করে ফেলে। সে সাপটাকে হায়দারের হাতে দিতে নেয়; হায়দার তাকে ধমকে ওঠে : ‘ব্যাক্কল কোনহানকার! ওইডারে বাক্সে হান্দা। দ্যাহস না, পাবলিকে ভয়ে জামাকাপড় নষ্ট কইরা দিছে!’

সবার অলক্ষে চোখ টিপে নিচু স্বরে বলে : ‘আমার-ও লুঙ্গি ভিজ্যা গেছে!’ —বলেই সে দর্শকদের দিকে তাকিয়ে ৩২ পাটি দাঁত কেলিয়ে খিকখিক করে বিদঘুটেভাবে হেসে ওঠে। দর্শকবৃন্দও খিক খিক করে হেসে ওঠে তার দিকে তাকিয়ে —এ হাসি আনন্দের নাকি হায়দারের প্রতি বিদ্রুপ তা সে বুঝে উঠতে পারে না।

ততক্ষণে আক্কাস মিয়া সেই তথাকথিত ভয়ংকর দাঁতভাঙা সাপটিকে বাক্সে ভরে ফেলেছে। সবাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচে; দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়ে ঘনঘন। সবার বুকের উথ্থান —পতন স্পষ্ট দেখা যায়। আর এ যাত্রায় রক্ষা পেয়ে হায়দারের প্রাণে পানি আসে। সে মনে মনে আক্কাস মিয়াকে শত কোটি প্রণাম করে! নিজের প্রেজেন্স অব মাইন্ডের-ও প্রশংসা করে নিজে নিজেই মনে মনে। চোখ গরম করে আক্কাসকে হুকুম ঝাড়ে :

‘ওই আক্কাস্যা! এক গ্লাস পানি দে!’

Comments

comments

সিরাজুদ দাহার খান

সিরাজুদ দাহার খান

সমাজোন্নয়ন ও জনশিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়নের কৌশল প্রণয়ন ও উপদেশনার কাজে ব্যাপৃত। প্রশিক্ষণ ও অধিপরামর্শ তৎপরতা চালনে সহায়ক একাধিক বোধিনী পুস্তক ও নির্দেশনগ্রন্থের প্রণেতা। ‘মাইন্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাপ্রোচ’ শীর্ষক বিশেষ একটি প্রশিক্ষণ সঞ্চালনকৌশলের উদ্গাতা। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয় নিয়ে বিদ্যায়তনিক অধ্যয়ন সেরেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। গোড়ার দিককার গণথিয়েটার ম্যুভমেন্টের তৎপরতা ছাড়াও জড়িত ছিলেন বাংলাদেশ লেখক শিবিরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে। পেশাজৈবনিক লেখালেখির পাশাপাশি নেশাজৈবনিক লেখার প্রতি নিবিষ্ট হচ্ছেন ক্রমশ।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

Tags: , , ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি