সাম্প্রতিক

পাণ্ডুলিপি থেকে । কৌস্তুভ শ্রী

স্বাস্থ্যকর ক্রন্দন

পৌষী পূর্ণিমাতে বাইরে আলো
আমার ঘরে অন্ধকার আগুনে রান্না হচ্ছে।
তার গন্ধে জড়ো হয়েছে চোখের পাতারা
উশখুশ করছে নাক
শকুনের মতো অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে কপোলেরা
সব শেষে সুস্বাদু প্রলাপ জাবর কাটবে আমার ঠোঁট।

স্বাস্থ্যকর ক্রন্দন রাঁধছি।

যদি সে খোঁজে

কালির কলম, লাল খাতা, গন্ধ কে নেবে?
তোমরা গন্ধ নিতে জানোনা
সেসব পাঠিয়ে দিয়ো আমার কাছে
আমি নিয়ে যাবো।

মানুষটা কে রেখে দিও।
সে তোমাদের অক্ষমতায় অভ্যস্ত হয়ে যাবে।
তোমরা তার গন্ধ নিতে জানোনা।

আমাকে পাঠিয়ে দাও কালির কলম, খাতা
আমি চললাম।
আমাকে টুকরো করে ছড়িয়ে গেলাম রোদের ঘাসে
গাছের ফাঁকে, পুকুরের কোণায়
যদি সে খোঁজে, তাকে বলে দিও।
নয়তো
সে তোমাদের অক্ষমতায় অভ্যস্ত হয়ে যাবে
তাকে রেখে দিও।

আমি বসে থাকবো
ছোট ডোবায়, পচা কাঠের অসংলগ্নতায়
বিপন্ন বালিশে ঘুমাবো, তাকে বলে দিও,
সে যেন তোমাদের গন্ধহীনতায় বেঁচে থাকে।

আমি চমকে যাবো আলোতে, রাত নামলে চমকাবো
তাকে তোমাদের অভ্যস্ততায় রেখে দিও।
আমি চললাম।
আমাকে তার গন্ধ পাঠিয়ে দিও।

আমার জন্য অপেক্ষা কোরো না।
আমাকে আমি ছিঁড়ে ফেলেছি
ফেলেছি পুরাতন ব্রিজে
শহরের বাইরে
আর ট্রাকের সারির সবথেকে পেছনে

সে যদি আমাকে খোঁজে, বলে দিও।
নয়তো
সে তোমাদের দৃষ্টিহীনতায় অভ্যস্ত হয়ে যাক ।
তাকে পাঠিয়ো না আমার কাছে।
যদি সে খোঁজে, তাকে মরতে দিও।

ভরদুপুরে

সমস্ত ব্যথা নিয়ে থমকে থাকি ভরদুপুরে
অথচ সুখের প্রজাপতি কিংবা ফড়িঙ ওড়ে
অথচ সমস্ত ব্যথা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি।

আমার পায়ের নিচে নতুন সবুজ ঘাস
অথচ সমস্ত ব্যথা নিয়ে আমি বসে থাকি
অথচ শীতের ভাপে নরম হচ্ছে রোদ
আকাশ আজকে ভয়ানক কী নীল!
অথচ সমস্ত ব্যথা নিয়ে আমি।

আর তখনি
দূরে কোন শিশু তারস্বর কেঁদেওঠে
আর তখনি
নিজের মুখাবয়বে সেই কান্না বসাই
সেই কান্নায় নিজের মুখাবয়ব বসাই
সমস্ত কিছু নিয়ে আমি ধীরেধীরে সুখের শিশুর দিকে যেতে থাকি

আর এদিকে বিষণ্ন প্রজাপতি কিংবা ফড়িঙ ওড়ে!

16473786_610956955766874_4044357219990249403_n copyকোথাকার বাতাস আসে

আগের রাতে আজকের সকাল হারিয়েছি
কোথাকার বাতাস আসে!
গতকাল খুলে রাখা সম্পর্কগুলো পরা হলো না!
কোথাকার বাতাস আসে!
আরেকটু জোরে ছুটতে পারলে হতো!
বলা থেকে না বলার দূরত্ব মাপা গেল না!
শুধুমাত্র বুকে নিলেই দৈর্ঘ্য প্রস্থে কমে মানুষ
শুধুমাত্র মৃতদেহ মিশলেই পবিত্র হয় মাটি
কোথাকার বাতাস আসে!

ছবি ১

যখন প্রতিটা গাছ বন হয়ে ওঠে
আমি গাছেদের নিচতলায় বসে থাকি তখন
অন্তরঙ্গ ফিসফাসের মতো অপূর্ব সব শব্দ হয়।

আমার ঘুম আসে না।
আমি গাছেদের নিচতলায় জেগে থাকি শেষরাতে।
সবথেকে প্রশস্ত ডালগুলো বাড়িয়ে থাকে শূন্যে
মায়ার মতো ব্যথা হয় আমার
যখন প্রতিটা গাছ বন হয়ে ওঠে।

প্রতিটা গাছ যখন পানির কিনার ধরে
পানিতে উলটো ঝুলে থেকে কাঁপে
আমি গাছেদের উপরতলায় বসে থাকি তখন।
অপূর্ব সব শব্দে আমার ঘুম আসে না।

একটা অন্ধকারের আলোতে চোখ অবিশ্বাসে ভরে যায়
আমি তখন ঘাসের কিনার ছুঁয়ে উলটো চেয়ে থাকি।

একটা অন্ধকারের আলোতে বাকিসব ঝলসে যায়
শুধু মায়ার প্রশস্ত ডালগুলো বাড়িয়ে থাকে শূন্যে
ব্যথা হয় আমার, যখন শেষরাতে আমার ঘুম আসে না।

অন্তরঙ্গ ফিসফাস হয়, আমি জেগে থাকি
আমার ঘরে! ভোররাতে!

মিথ্যার মতো সুন্দর

এইরাত হাত ধরে তোর মুঠোতে দিলাম।
সিঁড়িঘরের পাহারায় রেখেছি একা অন্ধকার
চাঁদের গুঁড়া ঝরে পড়লে তোর আমার ছাদে,
কালো মেঝেতে সুখীর মতো পা ছড়িয়ে বসি।
ঘোলা আলোতে তোর অবয়ব অবিশ্বাস্য লাগে।
তোর চুলে এলিয়ে পড়ে হাসির মতো লুটোপুটি খায়
এই রাত, তোর মুঠোতে দিলাম।

দীর্ঘশ্বাসের মতো লক্ষ্মীপেঁচা ডেকে উঠলে,
দিনজুড়ে জমা হওয়া কান্না বাতাসে ফিরিয়ে দিচ্ছে কবরগুলো।
প্রবারণা ফানুসে ছেয়ে গেছে তারার আকাশ।
এইরাত, সবকিছু, সুন্দরতম মিথ্যা,
এইরাত, তোর মুঠোতে দিলাম।

আমাদের শরীর বেয়ে হাসির শব্দ নামে
তোর চুলে এলিয়ে পড়েছে শীতের আলো
মিথ্যার মতো সুন্দর রাত, তোর মুঠোতে দিলাম!
মিথ্যার মতো সুন্দর রাত, কী অবিশ্বাস্য লাগে!

প্রকট গাছে ঝুলে থাকা ঘুড়ি,
হয়তো কোন গোত্তা খাওয়া বিকেলে মাটির স্বপ্ন দেখেও
ধরা পড়ে গেল দেবদারু জালে
আবছা অন্ধকারে কী অবিশ্বাস্য লাগে!

কালো মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসে থাকি
আমাদের ছোটগল্প চাঁদের গুঁড়ার সাথেমিশে চিকচিক করে
ঘোলা আলোতে তোর মুখ আমার বিশ্বাস হয়না
তোকে আমার কীসুন্দর মিথ্যা লাগে!

চর

জোছনায় জেগে আছে সদ্যোজাত চর,
কারো চোখে আত্মগোপনে ব্যর্থ জলেরটুকরার মতো,
চিকচিক করে তার বালু শরীর।

তার নদী তাকে চায়নি।
যেকোন গভীর ক্ষতর মতো তার মৃত্যু নেই।
সমস্ত ভ্রান্তি নিয়ে সে ঝলমল করে,তোমরা তার রঙ দেখোনা।
আমি জানি, আমার মতোই, তার রঙ নীলচে করুণ!

ডায়েরী

আমি চলে যাচ্ছি
আর গোলাপি বাগানবিলাসের পেছনে সূর্য নামছে।

আমি চলে যাচ্ছি
আর ধূসর গিরগিটি পরে নিচ্ছে কমলা খোলস।

আমি চলে যাচ্ছি
আর আকাশের বুক তারার বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে আজকের মৃত্যু হলো।

আমি চলে যাচ্ছি
আর ঝড়ো হাওয়ায় দুলছে শহুরে দালানের মরিচবাতি।

আমি চলে যাচ্ছি
সমস্তের সাক্ষ্য আমি কোথায় রেখে যাবো?

ছবি ২

পাতার ছাপ গায়ে মেখে আকাশ দাঁড়িয়ে আছে, আর
শহরের পাড় দিয়ে হরিণের মতো গোশাবকেরা হেঁটে যায়;

বাতাসে উড়তে শুরু করেছে ঝিলের পানি
আর ঝমঝম করে আজান নামলো;

হাসির মতো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে বিকেলের আলো
আর গল্পের ভারে একটু একটু করে নুয়ে পড়ছে পৃথিবী।

২০০৪

পুকুরে পানির উপরে মরচে হলুদ চাঁদ ঝুলছে
এপাশে একটা লাল বাংলোতে বিদ্যুৎ গেছে। আর সারা শহরেও।
পাড়ে বসে ওপাশের চলন্ত হ্যারিকেন গুণছে একটা তেরো বছরের মেয়ে
বুকে তার একটা ডাকনামের কাপড়ের পুতুল।

সে কি জানে, এরপর যতদিন জোৎস্না হবে,
এক মানবী তার কাছে ফিরতেই থাকবে, ফিরতেই থাকবে!

Comments

comments

কৌস্তুভ শ্রী

কৌস্তুভ শ্রী

কবি ও গদ্য লেখক, সাস্টে অধ্যয়নরত। জন্ম: ১ জানুয়ারি ১৯৯১, রাজশাহী। গ্রন্থ: মহাপ্রয়াণ সড়ক।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

Tags: , , ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি