ফাইন মর্নিং মাতালতা । মিসবাহ উদ্দিন

প্রার্থনা

আমি কি দেখতেছি তারে? এই তুরীয় অন্ধকারে?
আমি কি বলতেছি কিছু? কিংবা সে আমারে
বলতেছে নাকি গায়েবি ইথারে?

খোদা—
দুনিয়ার এই বিষণ্ণতম সন্ধ্যায়,
আমারে তফাতে রেখে
জেহের ও সুরার নহর
দুই দিকে বয়ে বয়ে যায়।।

দস্তুরমতো মুশকিলে আছি,
পুরানা ক্ষতর উপর ভনভন করে মাছি।
পানা দাও খোদা,
এমন আজাবে, হায়, ফানা হয়ে আছি।।

তবু কি দেখতেছি তারে?
বলতেছি নাকি কিছু?
হাঁটতেছি নিজেই আমি
আরেক আমার পিছু?

ফাইন মর্নিং মাতালতা

আমি কি তারে চাইতেছিলাম?
শর্ষের সোনালি-হলুদ বিকেলের ভেতর
তারে কি ডাকতেছিলাম?
নাকি সে আমারে বলতেছিলো কিছু?
একলা একডানা শালিখের চোখে যে-ভাষা
গুমরায় গুমরায় খালি তেমনই কোনো অবোধ্য দুর্গম
ইশারায় সে-ও কি ডাকতেছিলো কাছে?
উড়ালের শক্তির অভাবে?
অছিলায় অছিলায় খালি পড়ে যায় রোদ
আন্ধার ঘনায়ে আসে স্মৃতিদের স্মৃতি হয়ে যাওয়া হলুদ বেগানা বুক
পুত্রসম জড়ায়ে ধরেছিলা নাকি? নাকি নিজেই নিজেরে খুব ফিল দিতে গিয়া
পানিতে কাটছিলা সাঁতার? আমি এক আজিব পুস্কুনী?
কেবলই জিজ্ঞাসা জাগে, জিজ্ঞাসার গভীরে এক গাভীন পিপাসা
তোমারে কি চাইতেছিলাম, হে শ্যাওলাপড়া নগরীর শেষ ডাকবাক্স?
আমারে কি কোথাও পৌঁছানোর কথা ছিলো তোমার!
নাকি তোমারে আমার?
ভাষার ভিতরে তুমি আরেক আধো আধো বোল হয়ে ফুটে ফুটে রও
ফুল কি সঙ্গীতে পিপাসা কি মেটানোর কথা ছিলো না, হে নদী?
বয়ে যাও, বয়ে বয়ে যাও, হে ফোরাত রমণী
তোমার ঢেউয়ের ভাঁজে আমি শেষমেশ শুয়ে শুয়ে রবো
কোনো এক ফাইন মর্নিং মাতালতার ছলে…।

যাই

ফিরিয়া আসিবার রাতে
পথ কি কিছুটা দীর্ঘই থাকে?
ফুরায় না ফুরায় না তোমার ফিরাযাত্রার পথ
অথচ এদিকে পৌষের শেষ, গ্রস্ত নর ও নারীর
দেহগুলো বাজাইতেছে সাইরেন, আর তুমি দেখতে পাইতেছো
পথের দু’ধারে সাজানো কারারক্ষী শিশু আর মেহগনি আর আম্র বৃক্ষেরা
পলাইয়া যাইতেছে হাইওয়ে পুলিশের ন্যায়
আর চাঁদটাও যেন বা কিশোরীর প্রথম পরশের সুখ
আর এমন একটা রজনীতে তুমি যে ফিরিয়া আসিতেছো তাও কি জেনে গেছে
সাপ আর মণির গল্পসমেত দূরে দূরে সরে যাওয়া মুখচোরা গেরামের বাড়িঘর?
আদম ফিরেছিলেন এই রূপে, ফিরেছিলেন মনু আর তোমার পূর্ববর্তী তিনপুরুষ
এইভাবেই ফিরেছিলেন কি? যে-পুরাণ জেনেছো তুমি উতলা স্রোতস্বিনীর ঢেউয়ের ভাঁজে ভাঁজে,
সে-পুরাণ সহী? একটা ঝুলন্ত বাদুড় তোমারে শুধায় কেন সে-কথা?
চাঁদ আর মরণের রাতে, শালুক আর দুধরাজের রাতে এইসব জাজ্বল্যমান মাংস আর মদিরার
ঘন ঘন মোম হয়ে যাওয়া দেখতে দেখতে তুমি যে ফিরিতেছো এই গাঁথা
লিখিবার কালি তোমারই বুকের লহু, এই গাঁথা গাহিবার স্বর তোমারই আপন কণ্ঠ?

তবুতো ফিরিতেই হবে, ফিরিতেই আছে ধরণীর চলে যাওয়া দেহ আর দেহোত্তর কামনারা
পিতা কি কন্যার ন্যায় তুমি তারে বরণের লাগি পৌঁছাবে না আপন মন্দিরে?
পথে পথে গ্রস্ত নর ও নারীরা তাদের ওম ও শীতলতা সমেত পলাইতেছে কোথায়
তোমারই বয়ে নিয়ে চলা স্মৃতি ও বিস্মৃতির মতোন এ-সওয়াল আজ তুলে রাখো, পথিক
শিশু ও মেহগনির আড়ালে যে চন্দ্র তার কাম ঢালিতেছে তোমারই মস্তকের উপর
ওষ্ঠ ও অধরে তার স্বাদ নাও, তারে ভালোবাসো, তারেই জড়ায়ে ধরো
পৃথিবীর ভ্রাম্যমাণ খোয়াব আর বেদুইন মেঘেদের গৃহ নেই কোনো
ফিরিবার কালে এই সহজ সত্য তুমি ভুলে যাবে কেন?

শব্দ ১

ধরুন,
তিনি লিখলেন
রাত
আর
আপনি বুঝে ফেললেন
একটা কাঁচা সড়ক ধরে হাঁটতে হাঁটতে গ্রামের পর গ্রাম পেরিয়ে
একটা পানকৌড়ির বিল
আর কিছু শিমুল গাছ
আর তাদের লাল লাল ছায়া
আর কিছু উদাস রোদের মতোন যে মানুষ
যাকে হয়তো আপনি চিনেন কিংবা চিনেন না
তার একাকিত্ব, দিশাহীনতা, ইনসমনিয়া, হতাশা আর নির্ভেজাল ডিপ্রেশন
অর্থাৎ আপনি যদি বুঝে ফেলেন রাত শব্দটি ঠিক কখন কারো
না-ফেলা দীর্ঘনিশ্বাসে মিশে থাকে
তবে আমরা বুঝে নিবো, নির্দ্বিধায়,
লাইফ অলসো হ্যাপেন্ড টু ইউ।
বস্তুতঃ
জীবন যাদের জীবনে ঘটে না
তারা শব্দ আর তার উচ্চারণকারীর সম্পর্ক
কখনোই আবিষ্কার করতে পারে না।
আর, হে পাঠিকা,
উচ্চারণের ভিতর তো
শ্রবণ আর আবিষ্কারের আবেদন প্রচ্ছন্নে থেকেই যায়।

শব্দ ২

তুমি তার শব্দের দিকে যাও
তুমি তার উচ্চারণের দিকে
কেননা
প্রার্থনা ও প্রেমে শব্দের ব্যবহার আছে
তাপে ও প্রতাপে
ভাবে ও প্রকাশে
মূলত, অবগুণ্ঠিত আবেগের দশায় তুমি এক লাউয়ের খোল
শব্দ ও সুরে তুমি একতারা হওয়ার দিকেই যাও।

 

শব্দ ৩

ঊর্ধ্বকমার ভেতর ঢুকে গেছ তুমি, যেন বা প্রাচীন নগরী এক, পরিখায় সুরক্ষিত, আক্রান্ত হতে পারো ভেবে নিয়েছ ডেকে গোপন বৈঠকে সিপাহশালার; তোমার উষ্ণতম প্রশ্বাসগুলো নগরীর দেয়ালে দেয়ালে এ-খবর বিলি করে যায়।
আদিতে শব্দ ছিলো। উচ্চারণ রীতি কি ছিলো? বিভিন্ন বিদ্যালাভের পথে আমরা ভুলে গেছি কবেই একে অপরের ডাকনাম।
পুনরায় তোমাকে লিখবো ভেবে ভেবে বর্ণমালা পুনর্পাঠে যাই। ভাবতে থাকি, গুহাযুগই ভালো ছিলো।

নিশীথিনী বলে গেছে আমার ভুলে-যাওয়া টোটেমের নাম।

তখন

তখন আমার শনির দশা
তখন আমি অনেক দূর
তুমি তখন শীতের বিকেল
চাঁদর গায়ে অচিনপুর।

তখন আমি পাগল পাগল
তখন আমি যাচ্ছেতাই
তোমার তখন তুফান তুমুল
জ্বলছো ভীষণ মীরাবাঈ।

ইভ ১

শাশ্বত কান্না বলে কিছু নেই
তবে অবিরাম ক্ষরণ আছে
নিশিদিন দহন আছে…

তামসিক রাত্রির গন্ধ মগজে ধাক্কা দিলে-
কী যেনো হাঁটতে থাকে
ঘুরতে থাকে খুঁড়তে থাকে
কাঁদতে থাকে হাঁকতে থাকে…

আদতে আদ্যন্ত একা
কখনো অখণ্ড
কখনো বা খণ্ড খণ্ড…

ইভ ২

এ দেহ কার্পাস ঘুড়ি,
লোনাঘুম, ঘুমপোড়া ছাই—

এ প্রসাদ ওঙ্কারসম—
হাওয়ার মিঠাই…

Comments

comments

মিসবাহ উদ্দিন

মিসবাহ উদ্দিন

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। বর্তমানে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে আলাপ করেন।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: , , , , , , ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি