বিল এভ্যান্স সাক্ষাৎকার । শফিউল জয়

শফিউল জয়

বিল এভ্যান্স সাক্ষাৎকার : আমার অভিজ্ঞতার সাপেক্ষে সংগীতই সর্বোৎকৃষ্ট

সাক্ষাৎকার গ্রহণকাল : ১৯৬৫, জ্যাজ ম্যাগাজিন
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মাসিক জ্যাজ ম্যাগাজিনের সম্পাদক জ্যাঁ লুইtumblr_o03dr5Jpec1qjyr3io1_1280

প্রশ্ন : তোমাকে নিয়ে লেখা বিচক্ষণ কোন ম্যাগাজিন-আর্টিকেল পড়ার সৌভাগ্য হইছে কখনো?
বিল : হ্যাঁ। বলতে গেলে কয়েকটা লেখা বেশ ভালো লাগসে। সেগুলো পড়ে নিজের বাজানোতেও কিছু পরিবর্তন আনসি। আমার মতে সবাই ঠিক, পার্থক্যটা শুধু দৃষ্টিভঙ্গির। আমাকে নিয়ে মোটামুটি যা-ই লেখা হইসে, সেগুলোর প্রায় সবই সপ্রতিভ এবং বিচক্ষণতার সাথেই লেখা হইসে। প্রেসে ছাপানো দুইশো লেখার ভেতরে দুই একটা বাদে সবগুলোই সহায়ক হিসেবে কাজ করসে। এক্ষেত্রে আমাকে ভাগ্যবানই বলতে হয়।        

প্রশ্ন : সমালোচকরা  প্রায়ই বলে তোমার মিউজিক ইম্প্রেশনিস্টিক। কী মনে হয়?
বিল : ইম্প্রেশনিস্টদের প্রতি ভালোলাগা তো আছেই। ডেব্যুসি আমার প্রিয় কম্পোজারদের মধ্যে একজন। পেইন্টিং নিয়ে অত্যুৎসাহ না থাকলেও ইম্প্রেশনিস্টদের প্রতি আলাদা একটা সমীহা আছে। মাঝে মাঝে ভাবি আমি আসলে দুইশো বছর পেছনে আঠারো শতাব্দীতে বাস করতেসি, এমন কী উনবিংশ শতাব্দীতেও না। এইভাবে দেখলে বলা মুশকিল আমি ইম্প্রেশনিস্ট কী না। নিজেকে বদলানোর ইচ্ছা পোষণ করি সবসময়ই। আবার এটাও ভাবি, যা করতেসি এখন- সেটাকে অতিক্রম করা সম্ভব হবে না যদি আরও ভালো কিছু করতে ব্যর্থ হই। এখনো ভালো কিছু পাই নাই, তবে যা আছে তা নিয়ে সন্তুষ্ট।

প্রশ্ন : এই আত্মজিজ্ঞাসাটা কি সচেতন না কী স্বতঃস্ফূর্ত, স্বাধীন?
বিল : নিজের স্বাধীনতায় আস্থা রাখি সবসময়। এবং এই স্বাধীন যাত্রাতেই হয়তো উত্তর খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করি। আমি  অনেক মানুষের কাছে থেকে অনেককিছু শিখসি, তারপরেও কেউ কেউ বলে আমার দ্বারা বহুজন প্রভাবিত। অন্যদের মতো নিজেকে প্রতিভাবান লাগে নাই কখনো। প্রতিভাবান কেউ হয়তো তার প্রতিভার গুণে ষোল সতেরো বয়সে যা বাজায়, সেভাবে বাজাইতে পারি নাই নিজের ওই বয়সটায়। নতুন কিছু খুঁজে পাইতে অনেক প্র্যাক্টিস করে নানাকিছুর ভেতর দিয়ে আসতে হইসে। এর ফলে পরবর্তীতে নিজে কী করতেসি সেটা নিয়ে অনেক সচেতন ছিলাম। অনুকরণ করি নাই কখনো, বরং অনেকের সংশ্লেষেই নিজেকে খুঁজে পাইসি। সম্পূর্ণ এই প্রক্রিয়াটা থেকে যা বের হয়ে আসছে, সেটাই আমার।

প্রশ্ন : নিজের সাফল্যে বিস্মিত বোধ করো?
বিল : হ্যাঁ। বিশ্বাসের জায়গাটা সবসময় এখানেই ছিল। আর কষ্ট করেই এই পথটা পাড়ি দিতে হইসে। আবার চারপাশে অনেক প্রতিভাবান মানুষ দেখি, যারা সাফল্য পায় নি।

প্রশ্ন :  মিউজিক নিয়ে যাত্রার শুরুতে কোন পিয়ানো প্লেয়ারদের বাজানোর গুণগ্রাহী ছিলা?
বিল : প্রথমত ন্যাট কিং কোল। অসাধারণ। আর্ল হাইন্স, বাড পাওয়েল। বাডের ফর্মের সেন্সের কারণে ও সবসময়ই আমাকে প্রভাবিত করসে। এছাড়া ডেইভ ব্রুবেক, শিরিং, অস্কার পিটারসন, আল হেইগ, ল্যু লেভি।

প্রশ্ন : এই তালিকায় ডেভিড ব্রুবেক?
বিল : সবার কাছে থেকেই শেখার আছে। ন্যাট কিং কোলের রিদম আর স্পার্সিটি, ব্রুবেকের নির্দিষ্ট ঘরানার ভয়েসিং। জর্জ শিরিঙেরও অন্য রকমের একটা ভয়েসিং আছে ভালো লাগার। অস্কার পিটারসনের শক্তিশালী সুইং, আর্ল হাইন্সের কাঠামো। বাড পাওয়েলের মধ্যে এর সবকিছুই আছে, কিন্তু তার কাছে থেকেই সব নিতে চাই না। এমন কখনো হয় নাই যে বাডের কোন রেকর্ডিং শুনে সরাসরি অনুকরণ করে বাজায়া গেসি। বরং  ওই রেকর্ডটা শুনে তার নির্যাসটা আত্মস্থ করার পর কিছুটা অদল বদল করে নিজের মতো করে বাজানোর চেষ্টা করসি। আর শুধু পিয়ানিস্টই না; স্যাক্সোফোন, ট্রাম্পেট সবক্ষেত্রেই একই ব্যাপার। জ্যাজ ‘কোন ইন্সট্রুমেন্টে বাজতেসে’- এর থেকে সবসময়ই ‘জ্যাজ নিয়ে ভাবা’ মনোভাবটা নিয়ে আগ্রহী ছিলাম ।   

প্রশ্ন : ষোল বছর বয়সে তোমার ভাইয়ের সাথে প্রথম ব্যান্ড গঠন করেন?
বিল : কলেজে থাকতে। এর আগেও ড্যান্স ব্যান্ডে বয়স্ক মিউজিশিয়ানদের সাথেও বাজানো হইসে; মানে একটা প্রস্তুতি আগে থেকেই ছিল। ভাইয়ের সাথে যে ব্যান্ড করসিলাম সেটা শুধুমাত্র স্টুডেন্টদেরকে নিয়ে ছিল। ছয় বছর বয়সে পিয়ানোতে হাতেখড়ি হয়। সাধারণত লেখা ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিক বাজাইতাম। তারা যদি আমাকে স্টার স্প্যাঙ্গল্ড ব্যানার বাজাইতে বলতো, তাহলে এমনি এমনি বাজানো সম্ভব ছিল না। বারোতে এসে ব্যান্ডে বাজানোর শুরু। লিখিত সবকিছুই বাজাইতাম, তারপর একদিন সেটার বাইরে পা দিলাম। একেবারে আনকোরা কিন্তু সুমধুর কিছু একটা বাজানোর পর জ্যাজটা আমাকে পায়া বসলো। এটাই জ্যাজের দিকে টেনে নিয়ে আসে আমাকে।   

প্রশ্ন : আর থেলোনিওস মঙ্ক?
বিল : অতোটা না। ভালো লাগে। মঙ্কের কাজ অনেকেই আত্মস্থ করসে। ওকে অনুকরণ করা মানে ওর হৃদয়গ্রাহী ব্যক্তিত্বকে অপমান করার শামিল। ভুলও। মঙ্ক বা যে কাউকে অনুকরণ করার মানে স্বীয় ব্যক্তিত্বকে বিসর্জন দেয়া।

প্রশ্ন : রিদমের ক্ষেত্রে তোমার নিরীক্ষা নিয়ে মন্তব্য শোনা যাক।
বিল : কী বলবো! এটা তো অনুভবের ব্যাপার। সাড়ে বারো বছর বয়স থেকে সিরিয়াস্লি শুরু করসি এইসব। সবাই স্কুল থেকে বের হওয়ার পর জ্যাজে ঢুকে আর শত হাজার থেকে হাতেগোনা কয়েকজন মানুষ বের হয়ে আসে শেষপর্যন্ত। তাই জিনিশটা এমন না যে তুমি সিদ্ধান্ত নিয়ে একেবারে নাওয়াখাওয়া ছেড়ে শুরু করে দিলা আর হয়ে গেলো। আমার মতে জ্যাজ হচ্ছে আমাদের ফোক মিউজিক। এর সম্প্রসারণ হবে আরও, মাত্রাগত নানা দিকে ঝুঁকবে। ট্রেডিশন ছাড়া কোন কিছুর অস্তিত্ব ভালো লাগে না। ঐতিহ্য থেকেই সবকিছু বেড়ে ওঠে। তবে রিদমের ক্ষেত্রে আলাদা করে কোন পরীক্ষা নিরীক্ষা করি না।    

প্রশ্ন : ছাত্রাবস্থায় যাদের সাথে বাজাইতা, তাদের মধ্যে কেউ পরবর্তীতে পেশাদার জ্যাজপ্লেয়ার হইসে?
বিল : নাহ। আল্লায় দিলে অ্যামেরিকা অনেক বড় জায়গা। প্রত্যেকটা কলেজেই দুই একটা করে ব্যান্ড আছে। সবাই কমবেশি কিছু না কিছু বাজায়। এই ন্যুইয়র্কেই অনেক মেধাবী মিউজিশিয়ান আছে যারা তাঁদের প্রাপ্য পায় নাই। হয়তো অন্য কোথাও গিয়ে বড় কিছু ঘটায়া ফেলতে পারতো, কিন্তু এইখানে তাদের দিকে কেউ ফিরেও তাকায় না। আমাকে অনেক স্ট্রাগলের ভেতর দিয়ে আসতে হইসে। ন্যু-ইয়র্কে আসার পরবর্তী তিন বছর ধৈর্য ধরে থাকছি। খুব সহজেই সাফল্য পায়া গেলে সেটা খুব সহজেই চলে যায়। সময় নিয়ে নিজের মেধার উপর আস্থা রেখে কিছু করলে সেটা টিকবে।

প্রশ্ন : কলেজে থাকাকালীনই তো মান্ডেল লওয়ের সাথে বাজাইসো?
বিল : হ্যাঁ। লুজিয়ানাতে ছিলাম তখন। মান্ডেল একবার আমাদের শহরে আসলে কলেজের কেউ একজন তাকে বলছিল আমার বাজানো শুনতে। তখন আমি জুনিয়র। পরে একটা টেলিগ্রাম পাই- ‘তুমি কি আমার সাথে এই গ্রীষ্মে কাজ করতে আগ্রহী’? নিঃসন্দেহে আগ্রহী ছিলাম এবং রেড মিশেল আর ওর সাথে কাজ করসিলাম তখন। কলেজ ছেড়ে দেয়ার পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু মান্ডেল পড়াশোনা শেষ করতে বললো । মান্ডেলের মাধ্যমেই টনি স্কটের সাথে পরিচয়। আর টনি স্কটই হার্বি ফিল্ডসের সাথে কাজ জোগাড় করে দিসিলো। ওর সাথে দশমাস কাজ করি। এরপর তিন বছর আর্মিতে থাকার পর নিউ জার্সিতে নিজের বাড়িতে ফিরি। দেড় বছর। এরপর ন্যুয়র্ক আসার পর আরও তিন বছর। এরপরই একটা কিছু হইলো। বলতে গেলে গত দুই বছর ধরে একটু স্বস্তিতে আছি। যা চাইসি, তাই পাইতেসি। যদিও খুব বেশি কিছু চাই না।     

প্রশ্ন : হার্বি ফিল্ডস তো আত্মহত্যা করলো।
বিল : হ্যাঁ, দুই বছর হয়ে গেলো। তাকে রক্যানরোলের একজন অগ্রদূত বলা যায় নানাদিক থেকে। এক ধরণের অস্থিরতা ছিল ওর ভেতরে। রক্যানরোল আসলো, মিলিওন ডলারও আসলো সাথে সাথে- কিন্তু হার্বির কিছুই ছিল না। বউও বাচ্চাকাচ্চাসহ আলাদা হয়ে গেল। প্রচুর মদ্যপান করতো। অসহনীয় অবস্থার ভেতর দিয়ে যাইতে হইসে ওকে। ভালোই হইসে ও আত্মহত্যা করসে। ওকে এত যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে যাইতে দেখার থেকে মৃত্যুটাই তুলনামূলক ভালো হইসে।

প্রশ্ন : তুমি তো এডি কস্তার সাথেও বাজাইসো।
বিল : আমরা খুব ভালো বন্ধু ছিলাম। একসাথে রেকর্ড করা হলেও একত্রে বাজানোটা হয় নাই ওইভাবে। আমরা দুইজনেই খেলাধুলা পছন্দ করতাম। ও মারা যাওয়ার এক ঘণ্টা আগেও ওর সাথে ছিলাম।

প্রশ্ন : মাইলস ডেভিসের সাথে পরিচয়সূত্রটা কী? সে তো তোমাকে হায়ার করসিলো।
বিল : আমাকে ফোন করসিলো। একবার আগে দ্যাখা হইসিলো ‘দ্যা কম্পোজারস’-এ, কে পরিচয় করায়া দিসিলো মনে নাই। ছয়মাস পরে ও আমাকে ফোন দিয়ে বললো উইকেন্ডে একসাথে কাজ করতে রাজী কী না। আমাকে ভাল্লাগসিলো সম্ভবত, তা না হইলে হায়ার করবে কেন।

832793c4ee6a24b256d7fc9526db6066প্রশ্ন : মাইলসের গ্রুপের সাথে অনেক রিহার্স করা হইতো?
বিল : নাহ। কখনোই না। আমি তো আমার দলের সাথেও রিহার্স করি না তেমন। নিজেদের ভেতরে বোঝাপড়াটা ভালো আমাদের। তুমি যদি একটা টিউন জানো, সেটা বাজাইতে কোন অসুবিধা হওয়ার কথা না। প্রত্যেক মিউজিশিয়ানেরই সেই সক্ষমতা আছে। মাইলস বা আমার দল- কারো সাথেই বেশি রিহার্স করা হয় না।   

প্রশ্ন : মাইলস ডেভিসের সাথে ছন্দপতন ঘটলো কেনো?
বিল :  নিজেকে ঠিক খুঁজে পাচ্ছিলাম না। জানি না ঠিক কেন, কিন্তু একটা সময় এসে মনে হইলো আমার চলে যাওয়া উচিত। মাইলসকে বললাম, ও-ও রাজি হইলো। আমরা এখনো ভালো বন্ধু।

প্রশ্ন : মাইলস কি তোমাকে একটা নির্দিষ্ট স্পিরিটে বাজাইতে বলতো?
বিল : সেটা বলা শুরু করছিল, আমি বেশিদূর আগাইতে দেই নাই। কারণ লায় দিলে ও বেশ রাফ হয়ে যায়। তুমি যদি ওকে বাঁধা দাও, তাহলে সে আরও পছন্দ করা শুরু করবে তোমাকে।

প্রশ্ন : স্কট লাফারোরর সাথে অভিজ্ঞতা নিয়ে তোমার কি অভিমত?
বিল : বিস্ময়কর। এটা শুধু মিউজিক্যাল জার্নিই ছিল না, আমার দ্যাখা সবচেয়ে প্রাণবন্ত মানুষগুলার মধ্যে ও একজন। ওর দ্বারা দারুণভাবে অনুপ্রাণিত। জানি না ও মারা না গেলে কতদূর আর সে কিছু দিতে পারতো। মনে হয় না খুব বেশিকিছু দেয়ার ছিল আর।

প্রশ্ন : স্কটের পরিবর্তে ট্রিওতে আর কাউকে ভাবতে পারতা?
বিল : আমি বিশ্বাস করি স্কটের জায়গাটা প্রতিস্থাপনযোগ্য না। অনেককেই হয়তো পাইসি নানাদিক থেকে পারদর্শী, তবে ওর মতো আরেকজনকে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। চাক ইজরায়েল মাত্রাগত দিক থেকে স্কটের থেকে অনেক কিছু দেয়ার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু আরেকজন স্কট, চাক কিংবা গ্যারি পিপক পাওয়া সম্ভব না।  

প্রশ্ন : গ্যারি পিককের সাথে শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠলো না কেন?
বিল : গ্যারি একটা ব্যক্তিগত সংকটের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল। আর আমিও নিজের চিন্তাভাবনা স্টাইল অন্য কারো উপরে চাপায়া দেয়ার পক্ষপাতী ছিলাম না। গ্যারির জন্যে আমার শ্রদ্ধাবোধের জায়গা থেকেই কিছু চাপায়া দেয়ার ইচ্ছাটা ছিল না, বরং ও নিজেকে খুঁজে পাক- এটাই কাম্য ছিল। একত্রে বাজাইতে বাজাইতে পারস্পরিক আস্থাবোধের জায়গাটা পরিষ্কার হচ্ছিল। তারপরেও আমার মনে হচ্ছিল আমি আরও কিছু করতে চাই, আবার ওকে চাপও দিতে চাই না। তাই আলাদা হয়ে গেলাম।

প্রশ্ন : আর পল মোশনের সাথে?
বিল : ওই-ই চলে গেছে। গ্রুপের সাথে ওর ছোটোখাটো মতানৈক্য ছিল, আর বউয়ের সাথেও ঝামেলা চলতেছিল ওর। মতানৈক্য, এর থেকে বেশি কিছু বলবো না। পলকে আমার ভালো লাগতো। ও অনেকদিন আমাদের সাথে ছিল।

প্রশ্ন : ক্ল্যাসিকাল মিউজিক শোনা হয়?
বিল : হ্যাঁ। আমি মনের আনন্দে বাজাই হাল্কা-পাতলা।

প্রশ্ন : তোমার প্রিয় কম্পোজার কারা?
বিল : সব গ্রেইট মাস্টাররা- বাখ, ব্রামস, ডেব্যুসি, বিতোভেন, বার্টক, স্ট্র্যাভিন্সকি। মাঝে মাঝে ভাবি আজকাল ক্ল্যাসিকাল মিউজিকে কি হচ্ছে সেটা ঠিক বুঝে উঠতে পারি না। চেষ্টা করি বোঝার, বাট কোথাও আটকে যাই।      

প্রশ্ন : গুন্টার শ্যুলার এবং জর্জ রাসেলের সাথে তোমার রেকর্ড বের হইসে। কেমন ছিল অভিজ্ঞতা?
বিল : দু’জনের প্রতিই গুণমুগ্ধতার জায়গা আছে, যদিও শ্যুলার বা জর্জ রাসেলের অনেক চিন্তাভাবনার সাথে সহমত নই। তারপরেও, আমার মতে জর্জ রাসেল গুটিকয়েক ভালো জ্যাজ কম্পোজারদের মধ্যে একজন। শ্যুলারের জ্ঞান সমীহাজাগানিয়া, চমৎকার মিউজিশিয়ান। তারপরেও আমি অন্য কারো অপেক্ষায় আছি। জানি না কার অপেক্ষায়, কিন্তু এই অপেক্ষাটা পোষণ করি।  

প্রশ্ন : তুমি‘অড এগেইন্সট টুমর‍্যো’ মুভি সাউন্ডট্র্যাকে কাজ করসো। এ নিয়ে জানতে চাই।
বিল : অভিজ্ঞতা কিছুটা হতাশাজনক। মুভিতে সিডাকশনের একটা দৃশ্য ছিল রবার্ট রায়ান আর গ্লোরিয়া গ্রাহামের মধ্যে। দৃশ্যটার সাথে সঙ্গতি রেখে এই জায়গাটায় আমি ইম্প্রোভাইজ করসিলাম। মুভিটা দেখার সময় লক্ষ্য করলাম ওই দৃশ্যের মিউজিকটা এডিট করা হইছে চার সেকেন্ড এদিক সেদিক করে। ফলে, আমার কাজটার আর কোন মানে দাঁড়ায় নাই শেষ পর্যন্ত।

প্রশ্ন : ‘স্বাতন্ত্র্য’ শব্দটা তোমার মিউজিকে কীভাবে উপস্থাপিত হয়?
বিল : আমার জন্যে ‘স্বাতন্ত্র্য’ হচ্ছে যেখানে যথেষ্ট স্পেইস নাই, সেইখানে স্পেইসটা তৈরি করা। ধরা যাক তুমি একটা মিউজিক পার্ট নিলা যেখানে তোমার মনে হচ্ছে কিছু একটা অনুপস্থিত। তবে যথেষ্ট সময় নিয়ে জিনিশটাকে অনুধাবন করলে এক ধরণের ‘স্বাধীনতা’ পাবেন কিছু যোগ করার। ইচ্ছা করলেই কিন্তু তুমি অংশটা বাদ দিয়ে পিয়ানো নিয়ে বসে কিছু বাজিয়ে বলতে পারেন ‘এটাই স্বাধীনতা’। আমি এভাবে ভাবি না। সবচেয়ে মূল্যবান স্বাধীনতা হচ্ছে আঁটসাঁট, দৃঢ় কিছুর প্রতিপক্ষে সক্ষমতাসম্পন্ন কিছু সৃষ্টি করা।       

প্রশ্ন : অর্নেট কোলম্যান শোনা হয়?
বিল : প্যারিসে যাওয়ার আগে ন্যু-ইয়র্কের বিলবোর্ডে আমরা দুই সপ্তাহ ছিলাম। কেউ কেউ হয়তো এই ধরণের কাজ পছন্দ করে যেটা অস্বীকার করা সম্ভব না, কিন্তু আমার অ্যাপ্রচটা মোটেও এমন না। আমি অর্নেট কোলম্যান না, এবং তার মতো হওয়ার চেষ্টা করার কোন ইচ্ছাও নাই। নিজের জীবন নিজের মতো করেই বাঁচতে চাই এবং তফাৎটা বজায় রেখেই তা সম্ভব। এইটুকুই বলতে পারি।

2813be7a1a2036889b70be4099bf2e59প্রশ্ন : তোমাদের এই পারস্পরিক অংশগ্রহণে সে ভায়োলিন বাজাইসিলো।
বিল : হ্যাঁ। ভায়োলিন। কিন্তু তুমি এটাকে ভায়োলেশনও বলতে পারো।

প্রশ্ন : অনেকেই বলে গত দশ বছরের মধ্যে তুমি শ্রেষ্ঠ পিয়ানিস্ট। কেমন লাগে শুনতে?
বিল : জানি না। ভেতরে ভেতরে আমি একইরকম আছি। একইভাবে একই স্ট্যান্ডার্ডে বাজায়া যাচ্ছি, এবং আগেও এই স্ট্যান্ডার্ডেই বাজাইতাম- কেউ মানুক আর না মানুক, তবু এটা বলতে কুণ্ঠাবোধ করবো না। ফলে, আমার কাছে এসবের কোন পার্থক্য নাই। তবে অনেক মানুষ এই স্বীকৃতি দিলে আরও বেশি কিছু পয়সা আসবে হাতে- এই যা। কিন্তু আসলে কথা হলো- মানুষজন যা বলে তার কোন দাম নাই। আমি জানি কে আমি- সাধারণ এবং মৌলিক একজন। অনেক ভাগ্যবান আমি।

প্রশ্ন : মানুষের সঙ্গ ভালো লাগে?
বিল: হ্যাঁ। কিন্তু আমার মনে হয় তাদের সাথে কম্যুনিকেট করতে ঝামেলায় পড়ি আমি।

প্রশ্ন : কম্যুনিকেট করাটা জরুরী?
বিল : আমার জীবন উৎসর্গ করসি এর জন্যে।

প্রশ্ন : কিন্তু মাঝেমধ্যে ক্লাবে কন্সার্টে ব্যর্থ হও তা করতে গিয়ে।
বিল : অবশ্যই। অন্যান্য পেশার মতো এখানেও সফলতা-ব্যর্থতা আছে।

প্রশ্ন : এটা বিচলিত করে?
বিল : অবশ্যই। নিজেকে দায়ী মনেহয়।

প্রশ্ন : মিউজিকের থেকে শ্রেষ্ঠতর কোন আর্টফর্ম আছে বলে বিশ্বাস করেন?
বিল :  নাহ। লং শটে দেখলে আর কিছু নাই।

প্রশ্ন : মানুষ হিসেবে তুমি সহনশীল?
বিল : সম্ভবত। কিন্তু ভেতর থেকে উত্তরটা হয়তো না-ই হবে। অন্যভাবে বললে, আমি কাউকে কষ্ট দিতে চাই না, তবে নিজেকে ধরে রাখতে কঠোর হতে হয়। অর্নেট কোলম্যান নিয়ে যা বললাম একটু আগে, দেখলাই তো কী জবাব দিলাম। কিন্তু ভেতর থেকে তার মিউজিক সম্পর্কিত চিন্তাভাবনার ঘোরবিরোধী আমি।  

প্রশ্ন : চাক ইজরায়েল নিজের ভালো-লাগা খারাপ লাগা প্রকাশ করার ক্ষেত্রে অনেক সোজাসাপ্টা।
বিল : চাককে চিনি না তেমন। ওকে বুঝতে পারাটা কঠিন। তবে তাকে অবশ্যই ভালো লাগে। মিউজিক্যালি আমরা নিজেদেরকে খুব ভালো বুঝি।

প্রশ্ন : তোমার প্রথম ব্যক্তিগত রেকর্ড বের হয় বিল গ্র্যুর রিভারসাইরড থেকে। তোমার সাথে তার সখ্যতা ছিল কেমন?
বিল : অতোটা না। বিল গ্র্যুর রিভারসাইডের প্রশাসনিক দিকটা দেখত আর অরিন কিপনিউজ আর্টিস্টিক জায়গাটা। ফলে অতোটা মেলামেশা হয়ে ওঠে নাই, যতটুকু না হলেই না। অনেক রাফ ছিল বিল। ওর মৃত্যুতে কষ্ট পাইছি, কিন্তু জীবিত অবস্থায় ওকে নিয়ে বলার মতো আমার কোন কিছু ছিল না।

প্রশ্ন : তোমার কি মনে হয় বিল গ্র্যুরের মৃত্যুই রিভাইরসাইডের দেউলিয়া হয়ে যাওয়া তরান্বিত করসিলো?
বিল : না, বরং উল্টাটাই বলা যায়। সে প্রচুর দেনার দিকে নিয়ে গেসিলো রিভারসাইডকে, এবং এর থেকে বের হওয়ার উপায় ছিল না। তাদের অল্প পুঁজি নিয়ে, ব্যাঙ্ক থেকে ধারদেনা করে সেটাকে বাড়ানোর চেষ্টা করছিল। কিন্তু বাড়াবাড়ি হয়ে গেসিলো। ফলস্বরূপ এই দেউলিয়া।

প্রশ্ন : তোমার নিজের ‘কনভার্সেশন উইথ মাইসেলফ’ অ্যালবামটা ভালো লাগে?
বিল : আংশিক। চারটা কাট আমার অনুমতি ছাড়াই প্রকাশিত হইছে। ‘হেই দেয়ার’, ‘ব্লু মঙ্ক’ এবং আরও দুইটা। আমার সিদ্ধান্ত ছিল এগুলা অ্যালবামে রাখবো না। কিন্তু ‘স্পার্টাকাস’, ‘রাউন্ড অ্যাবাউট মিডনাইট’, ‘স্টেলা বাই স্টারলাইট’ অ্যান্ড ‘হাউ অ্যাবাউট ইউ’ আমার প্রিয়। অ্যালবামটা গ্র্যামিসহ নানা পুরষ্কার পাইসে। আই থিঙ্ক, অ্যালবাম কনসেপ্টটা ভালো ছিল।    

প্রশ্ন : নিজের বর্তমান দল নিয়ে সন্তুষ্ট?
বিল : অনেক সন্তুষ্ট। চাক ইজরায়েল চমৎকার বাজায়। ল্যারি বাঙ্কার মাত্রাসম্পন্ন মিউজিশিয়ান এবং অসাধারণ ড্রামার। দুইজনেই সংবেদনশীল, উপলব্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব এবং সে জন্যেই নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা সম্ভব হয়ে উঠতেসে। সেই পোটেনশিয়ালটা আছে।

প্রশ্ন : সাক্ষাৎকারের সময় কোন প্রশ্নের মুখোমুখি হইসো সবচেয়ে বেশি?
বিল : ’নিজে যা বাজাও সেটাকে কী বলো তুমি’- এবং এটার কোন উত্তর আমার কাছে নাই।

প্রশ্ন : মিউজিক ছাড়া আর কিছুতে আগ্রহ আছে?
বিল : স্পোর্টস ভালো লাগে। একসময় খেলাধুলা করতাম প্রচুর।

প্রশ্ন : কী খেলতা?
বিল : বেইজবল, ফুটবল। বয়স হয়ে গেলে আর খেলাধুলা করা যায় না। কিন্তু গলফ, বোলিং আমার ভাল্লাগে।

প্রশ্ন : রাজনীতি নিয়ে উৎসাহী?
বিল : একেবারেই না।

e936ce2a20aa774018f205c23b1b8302প্রশ্ন : তার মানে কংগ্রেসম্যান বা সিনেটর হওয়ার কোন খায়েস নাই?
বিল : না। মজার কথা হচ্ছে, কলেজে থাকতে ওই ধরণের অফিসের জন্যে আমাকে নির্বাচিত করা হইতো। মাঝে মাঝে তা গ্রহণও  করতাম কারণ গর্বের ব্যাপার ছিল একটা, সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নটাও ছিল। ওই পদের জন্যে কোন আগ্রহ ছিল না। দুনিয়া যদি আমার মতো মানুষের উপর নির্ভরশীল হইতো, তাহলে আমরা এখনো গুহায় থাকতাম।

প্রশ্ন : সবচেয়ে অপ্রীতিকর ঘটনা কোনটা ছিল জীবনে?
বিল: বলা মুশকিল। আর্মির সময়টা আমার জন্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল। এখনো ভুলতে পারি না। একটা দুঃস্বপ্ন প্রায়ই দেখি যে- আমার কাগজপত্র হারায়া গেছে এবং আরও তিন বছর আমার আর্মিতে থাকতে হবে।

প্রশ্ন : তুমি সর্বশক্তিমান কিছুতে বিশ্বাস করো?
বিল : আমার অভিজ্ঞতার ভেতরে একমাত্র সংগীতই সর্বোৎকৃষ্ট।

প্রশ্ন : ভবিষ্যতে ক্যারিয়ার নিয়ে কি ভাবনা?
বিল : পরশুদিনের বেশি আমি কখনোই ভাবি না। অত দূরও না। কিন্তু যদি বলতেই হয়, তাহলে কম্পোজ করার ইচ্ছা আছে। কিন্তু এটা শুধুমাত্র স্বপ্নই। আসলে আগামীকালের পরে কী হবে সেটা নিয়েও ভাবি না।

প্রশ্ন : বয়স হয়ে যাওয়ার ভয় কাজ করে?
বিল : না। একমাত্র মৃত্যুকেই আমি ভয় করি। আঠারো উনিশ বছর বয়সে মরতে প্রস্তুত ছিলাম, কিন্তু আজকে প্রস্তুত না। অনেক সময় হারায়া ফেলসি এরমধ্যে।

Comments

comments

শফিউল জয়

শফিউল জয়

শিক্ষার্থী, নৃতত্ত্ব।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: , , , , ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি