আলোর বিশ্বায়ন ইতিহাস এবং শব্দ সহবাস । পিয়ালী বসু

ইদানীং মাঝে মাঝেই ক্লান্তি আসে। খুচরো শহুরে নেশা কেটে যাবার পর বুঝতে পারি, আমরা প্রত্যেকেই আসলে মনখারাপের একটা পরিত্যক্ত স্টেশনে দাঁড়িয়ে ইউটোপিয়া’র শেষ ট্রেনটির প্রতীক্ষা করছি। যে যার নিজের মতন করে ‘ভাল আছি’ বললেও, আদতে আমরা প্রত্যেকেই নিটোল সন্ধেগুলি পার করি একাকীত্বের সাথে।

তবুও পুড়ে যাওয়া নাগরিক মন
প্রেমের ভ্রান্ত খোলসে… অধীনত’ শব্দটিকে নাগরিক মান্যতা দেয়

এই মুখ ফিরিয়ে নেওয়া, এই নির্জন সহবাস আপাত দৃষ্টিতে কঠিন বলে মনে হলেও, ভুল অঙ্কের একাধিক স্বপ্নসিঁড়ি ভেঙ্গে ফেলার পর, এ সহবাস তেমন কঠিন লাগে না, বরং সামাজিকতার লোভ ছেড়ে থাকা এ জীবন আলগোছে পরম তৃপ্তি উদ্রেক করে।
নির্জনতার অন্তরীণে … নিভৃত উঠোন জুড়ে … ভিড়ের মাঝেও ‘একা’ হবার প্রয়াস, ফিরিয়ে নিয়ে যায় ছেড়ে আসা শৈশবে। একা থাকার এই অভ্যাস, এই একলা যাপন সুখ, গহীন ফল্গুর মতো আজও আমার অন্তরালে বয়ে চলেছে।

তবুও নক্ষত্রের ব্যঞ্জনা
বুকের আবেগ অলিন্দে প্রতিদিন… ছাতিমের গন্ধ মেখে স্নান করে

ইতিবাচক যে কোন কষ্টই আসলে নেতিবাচক কষ্টগুলির দিকে আরও এক পা এগিয়ে যাওয়ার মোহমাত্র …

তাই,
আপাত ইতিবাচক দৃশ্যমানতা ছুঁয়ে যায়… বিলম্বিত মিথ্যা প্রতিশ্রুতি

আসলে, কনশাসনেস অব কন্টিনিউটি জুড়ে অবিরত খেলা করতে থাকে শৈশবের সেই একক পাখিটির সিম্ফনি, যে তার প্রিয়তম মানুষটিকে হারানোর শোক আমৃত্যু পালন করে গিয়েছিলো। মননের যৌক্তিক প্রবাহ জুড়ে, সেই একাকীত্বই বেটোফেনের সুর হয়ে আজীবন ব্যাকড্রপের কাজ করে চলে ।

মেঘাচ্ছন্ন ব্যস্ত স্মৃতির শহরে হঠাৎ চেনা মুখ কথা বলে ওঠে
‘‘কেমন আছিস ?’’

চিরপ্রিয় মানুষটির প্রয়াণের পর, আকাশের গায়ে…বাতাসের কোলে যেটুকু মনখারাপ অবশিষ্ট থাকে, সে সবগুলিকেই সঙ্গী করে সময়ের মানচিত্র বদল হয়। বহুপ্রতীক্ষিত হাওয়া বিকেল নতুন ভাবে মনে করায়… বন্ধু হারানোর বিলম্বিত সুর মূর্ছনা।
জীবন এগিয়ে চলে, চলনে… বলনে…রূপকে। সময়ের তাল মেপে, সময় বিশেষে গুঁড়ো গুঁড়ো আকাশ হয়ে ঝরে বিষাদ।প্রতিটি স্বপ্নের শেষে নতুন যাপন শুরুর প্রারম্ভে, মনে পড়ে তাদের কথা, যাদের ছাড়া জীবনের মার্গদর্শনটি অসম্পূর্ণ থাকে।মননের চিন্তা এবং চেতনের নিবিড় গল্পের মধ্যেও বারম্বার ফিরে আসে তারা, … ভ্যালু অ্যান্ড হিস্ট্রি ব্যতিরেকে তারাই আদতে চেনায়… মনখারাপের সেইসব দীর্ঘ রাতগুলি।

স্মৃতির জলপ্রপাত জুড়ে এখন … নিভৃত মনখারাপিয়া মনোটনি

আসলে, এইসব টুকরো টুকরো ছবির নেপথ্যে তারাই থাকে, যারা নিয়নের পিছনে থেকেও অবিরত শিখিয়ে গেছে… আজীবনের সমস্ত সোহাগ, আর যাবতীয় নিভৃত কুহক।
জীবনের ঐ পর্যায়টা, ঐ স্প্যানটা… আসলে একটা বিস্তার, … অস্তিত্বের মধ্যেও অনস্তিত্বের বিস্তার… জীবনের ভাবনা সম্বন্ধীয় যাবতীয় উপলব্ধীর ব্যপ্তি… ঐ সময়টাকে ঘিরেই

জীবন জোড়া এই ট্র্যাজিক লিগ্যাসি তে
প্রাত্যহিকতার ধুলো― সংলাপে মাখামাখি হয় বিশ্বায়নের সুতোর টান
হৃদয় আর শরীরের অবিরত টানাপোড়েনে ছিন্নমূল হয় অস্তিত্ব
জীবন্ত থাকার জন্যই, বারবার বদলায় গঠনের রুটম্যাপ

প্রত্যাশার পুনর্বাসনের জন্য human race নয়, দায়ী থাকে ইতিহাসের নতজানু ভুল… তাই যন্ত্রণার উত্তরণ এবং অবতোরণে ইনফর্মাল এলিমিনেশনই বিম্বিত হয়,… আপাত চোখে দেখা, আদতে ক্লিশে জীবনও
রিপুর ভাঙাগড়ায়, লেখে নতুন রিয়ালিস্টিক উপাখ্যান…

“The world is changed because you are made of ivory and gold. The curves of your lips rewrite history.”
― Oscar Wilde, The Picture of Dorian Gray

 

Comments

comments

পিয়ালী বসু

পিয়ালী বসু

জন্ম দক্ষিণ কলকাতার। বাবা প্রয়াত প্রসূন বসু বামপন্থী রাজনৈতিক আন্দোলন ও সাহিত্য জগতের ব্যক্তিত্ব। পড়াশোনা প্রথমে পাঠ ভবন ও পরে বাংলা সাহিত্য নিয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। প্রথম প্রকাশিত বই 'ফেলুদা কুইজ' প্রকাশিত হয় ১৯৯৭ সালে। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ছটি। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে 'কথা কাব্যের চক্রবাক' নামে চারজন কবির একটি আন্তরজাল কাব্য সংকলন। পেশায় ডিজাইনার, কর্মসূত্রে ১৬ বছর আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে স্থিত। piyadublin@gmail.com

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি