আলো নিভছে । কল্যাণী রমা

আকাশের সব বৃষ্টি হাহাকার হয়ে ঝরে গেছে। পুরোপুরি আলো ফোটে নি এখনো। কোথাও। গত কয়দিন ধরে যত আঁকিবুঁকি কাটা হয়েছিলো, সব মুছে পরিষ্কার স্লেট হয়ে গেছে আজকের সকাল। পাখীগুলো ডাকবে কিনা ভাববার কোন সুযোগ না পেয়ে অভ্যাসবশতেই ডাকতে শুরু করেছে। আমি সকলের আগে ঝরা পাতা দেখব বলে বাড়ীর সব ক’টা দরজা খোলা রেখেই দৌড়ে বের হ’য়ে পড়েছি। এত্ত ভয় করছে।

কেবলই মনে হচ্ছে সময় বুঝি আমার শেষ হতে চলেছে। আমি সত্যিই হয়ত সেই হেমন্তে কোনদিন আর পৌঁছতে পারব না। আসলে আজ বসে আমি যে এক সামনের হেমন্তের কথা ভাবছি। সেই হেমন্ত যা কোনদিন কোথাও আসে না। তবু এক হাঁটু কমলা পাতার উপর দাঁড়িয়ে মচ্ মচ্ শব্দ তুলে মনে করছি পৃথিবীটা এখন বুঝি পুরোপুরিই আমার হাতের মুঠোয়। যদি চাই এই এখনি এই বাদামি পাতার ভিতর মাটির উপর আমি তার পাশে হয়ত সত্যি সত্যিই শুয়ে পড়তে পারব। এবং হাত দিয়ে যদি মুখ ছুঁয়ে দেখি তবে চেষ্টা করেও তার মুখে শতাব্দীর পায়ের ছাপ আমি একটাও কোথাও খুঁজে পাব না। হয়ত বিশ্বাসও করে ফেলব যে আমাদের চামড়ায় মাটির উপর লাঙ্গলের মত সময়ও শেষ পর্যন্ত কোন বলিরেখাই কাটতে পারে না।

মানুষের চোখের আলো এতটাই শক্তিশালী হয় যে পাহাড়ের ওপারে সব ডাইনোসর হেঁটে চলে যাওয়ার পর ঘাসের রঙও উপত্যকায় সবুজ ম্যালাকাইট হয়। তবু ভোরবেলা গ্রামের বাড়ীর আঙিনা গোবর দিয়ে লেপা না হ’লে যেমন ফেটে ফেটে ধুলো হয়ে যায়, মানুষের সব চামড়াও সেভাবেই খসে পড়ে গেল। এবং মানুষ ভুলে গেল সেই সব পথের গল্প…

তাকে আমি চব্বিশ বছর দেখি নি। জানি না কেন ভেবেছিলাম মানুষের চোখ আর ঠোঁট বুঝি পাথরে খোদাই করা থাকে। এবং মানুষের চোখের আলো এতটাই শক্তিশালী হয় যে পাহাড়ের ওপারে সব ডাইনোসর হেঁটে চলে যাওয়ার পর ঘাসের রঙও উপত্যকায় সবুজ ম্যালাকাইট হয়। তবু ভোরবেলা গ্রামের বাড়ীর আঙিনা গোবর দিয়ে লেপা না হ’লে যেমন ফেটে ফেটে ধুলো হয়ে যায়, মানুষের সব চামড়াও সেভাবেই খসে পড়ে গেল। এবং মানুষ ভুলে গেল সেই সব পথের গল্প। যেখানে সে আমার সাথে হেঁটেছিল। হলদে মধুফুল পায়ের কাছে ছড়িয়ে পড়েছিলো সেদিন। আমি দশ আঙ্গুলে মধুফুলের টুপি পড়ে সেই ভোরবেলায় কত যে হেসেছিলাম। আর মধুফুল শুষে মধু খেতে গিয়ে ভুল করে তাকে জীবনের প্রথম চুমু খেয়েছিলাম। এক ফোঁটা ছটফটে শিশির পায়ের কাছে ঝরে পড়ে গিয়ে বলেছিলো ইচ্ছে করলেই পৃথিবীটাকে যে কোন সময় রাজপ্রাসাদ করে ফেলা যায়। এবং ইচ্ছে করলেই সারা জীবন হাতের ভিতর হাত আঁকড়ে ধরে হেঁটেও যাওয়া যায়।

সেই সব ইচ্ছেগুলো এখন আমার পায়ের কাছে কমলা, বাদামি, লাল পাতা হয়ে ঝরে পড়ে আছে। আর আমি বোকার মত কয়েকটি লাল রঙের সুগার ম্যাপল, হলদে রঙের রিভার বার্চ, সোনালি রঙের এ্যাস্পেনের পাতা কোনমতে দুই আঙ্গুল দিয়ে ছুঁতে পেরেই ফ্যালফ্যাল চোখ করে ভাবছি এইবার আমিও বুঝি এই কমলা পৃথিবীর উপর তার পাশেই শুয়ে থাকব। অথচ এদিকে আমার সব তাড়াহুড়োর অনেক আগেই তার মুখের সব বলিরেখা আমার পায়ের নীচে, ওই পাতার স্তূপে ঝুরঝুর করে আমার জন্মের আগে ঝরে গেছে।

মধুফুল শুধু স্বপ্নের হেমন্তেই ফোটে।

Comments

comments

কল্যাণী রমা

কল্যাণী রমা

ছেলেবেলা কেটেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। ভারতের খড়গপুর আই আই টি থেকে ইলেকট্রনিক্স এ্যান্ড ইলেকট্রিক্যাল কমুনিকেশন ইঞ্জিনীয়ারিং-এ বি টেক করেছেন । এখন আমেরিকার উইস্কনসিনে থাকেন। অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপমেন্ট সিনিয়র ইঞ্জিনীয়ার হিসাবে কাজ করছেন ম্যাডিসনে। ২০১৫ সালে ‘যুক্ত’ থেকে প্রকাশিত হয়েছে কল্যাণী রমার প্রথম বই ‘আমার ঘরোয়া গল্প’। ২০১৬ সালে ‘চৈতন্য’ থেকে প্রকাশিত হয়েছে আরো দু’টো অনুবাদের বই। ইয়াসুনারি কাওয়াবাতার ‘হাতের পাতায় গল্পগুলো’ আর সিলভিয়া প্লাথ, অ্যান সেক্সটন, মেরি অলিভারের কবিতা নিয়ে ‘রাত, বৃষ্টি, বুনোহাঁস’। ২০১৭ সালে ‘যুক্ত’ থেকে প্রকাশিত হয়েছে কাব্যগ্রন্থ 'জলরঙ' । জন্ম ঢাকায়। ইমেল: kalyanirnath@gmail.com

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি