সাম্প্রতিক

এক গুচ্ছ কবিতা । অনন্ত সুজন

রংধনু

অন্ধের নজর থেকেই জন্মেছিল রংধনু
লতাগৃহে তার স্বাক্ষর বহন করে—
যে কোন কণ্ঠহার

ধারাক্রমে তুমিও বিকশিত, আড়ম্বর
সন্ধিসুত্র উহ্য রেখে পাতানো খেলার ফাঁদে
ঋতু ধারণের দিন থেকে এখনো বিলিয়ে যাচ্ছ
বহুবর্ণিল শিস । তবুও মেয়াদোত্তীর্ণ প্রলোভন
আহত শিরদাঁড়া নিয়ে জাগিয়ে রাখে — অস্তিত্বঝড়

অধিগ্রহণের হাওয়া আসে দূর দ্বীপ থেকে
অজস্র আলোকবর্ষ লুপ্ত যায় সন্ধ্যাগণিতে
রংধনু তাই দিঙমূঢ় — বাসনাবেকার।

রুপান্তর

এ বছর পাখিদের দলে যোগ দেবো
ভুবনচিলের কাছে প্রস্তাব করেছি উড্ডয়ন খ্যাতি
আরেকবার নিপতিত হবার আগেই মেঘপাহাড়ের
শীর্ষে রেখে আসবো অগ্নিবায়ু — এতকাল যে
উঠতি যুবতীর শরীরের ভেতর লুকিয়ে ছিল।

ঐ যে ধীমান যুবক,গ্রহরাশি যাকে সন্ধান করে
শীতভর্তি শরীরে কুয়াশা-কঙ্কর ভেঙ্গে পা
বাড়িয়েছিল হিমালয়ের খুঁজে। যেখানে এক
বিচরণশীল বর্ষীয়ান কচ্ছপ যে-কি না ঝর্ণাকে
সামনে বসিয়ে ছন্দ শেখায়। যার পায়ের
নিচেই কেবল স্থির হয়ে বসে থাকে অসামান্য
আয়ুর হ্রদ। তার স্নানের কৌশল হতে পারে
যে কোন অভিজ্ঞ নর্তকের। হয়তো অদূরের
বাড়িতে তার মঞ্চায়ন হবে কোন একদিন

লুণ্ঠিত হবে দলত্যাগী হরিণ শাবকের মতো
অরণ্যযাদুতে বিছিয়ে দিয়ে রক্ত আর লবন।

প্যারিসে একরাত্রি

রাতকে সৌরপ্রলেপে আবৃত করে, বহুবর্ণিল 
আলোর জৌলুসে ইচ্ছানুসারে সাজানো প্রাত্যহিক
রেওয়াজ এখানে! পৃথিবী যখন আঁধার-আরামে 
ঘুমের তলদেশে নিখোঁজ — তখন অনিবর্চনীয় 
জেগে ওঠে জ্যোৎস্না অধ্যুষিত প্যারিসের প্রশস্ত—
প্রান্তর। উৎক্ষেপিত ঝাড়বাতির অসম প্রজ্বলনে
নক্ষত্র সব অধিকৃত, ঝরঝর! লোকালয় ছেড়ে
জনঢল নেমে এসেছে রঙধনু বিছানো রাস্তায়! 
সর্বদিক ব্যাপী বিস্ময়ের উদ্বোধন, ঘোরের গ্রন্থি
ছিঁড়ে ঊর্ধ্বাকাশে উড্ডীন অত্যুজ্জ্বল ঘুড়ি ও বেলুনে!
সবার উৎসবের পোশাক সমান রঙ্গিন, শোধিত—
শোভাকর! প্রত্যেকের চোখে নিদ্রা বিসর্জনের 
দুর্লভ-ধাতুফুল — পরাবর্তের আয়ুষ্মান উল্লাসে
তরঙ্গায়িত! এই প্রথম উপমিতির সুতীব্র সংকটে
আমি দ্বিখণ্ডিত, ঝলসানো! সঙ্গপরিষদের যে কোন
যুবতীমাত্রই বঙ্গ ষড়ঋতুর বৈচিত্র্যে সুষমাসুগন্ধমথিত!
তাদের গানের পরিভাষা ও নাচের নন্দনে আসক্তির
প্লাবন! চুম্বনের শব্দগুলো শারঙ্গ-শামিল, আলিঙ্গনের
শুদ্ধতা থেকে উড়ে যাচ্ছে পাখি, প্রজাপতি! আহা, 
প্রবাহিত বাতাসে শীতের অহিফেন! আবহ তাড়নায়
পাথর সে’ও পুষ্পিত-পল্লবিত! আলো ঝলমলে হল্লা
উপচানো এ আনন্দভূমে বরফের পানপাত্র হাতে 
অসম্ভবের মতো আচম্বিত দেখেছি ঈশ্বর — সমগ্র 
আয়োজনে গর্বিত মদিরা পরিবেশক!

জলধি

মেঘস্বর ভেসে আসে — যে দিক ও দ্বীপের কোন নাম নেই
হাওয়ার দঙ্গল জগত ঘুরে খরচ করছে নিজেদেরই ঢেউ!
ভ্রমণরেখা আলোকবর্ষের ভার নিয়ে ডানার নিচে ডুবে গেছে
নাবিক তখনো জানে না, পৃথিবীর তিনভাগ জল পেছনে ফেলে
নোনাগন্ধের স্বীকৃতি বয়ে ফিরছে উপকূলে! আর যারা অবিশিষ্ট,
কৌতূহল অসামান্য, তাদের সম্মুখে রক্তবালি আর চোরাকূপ!
গোপনে সবাই কোন না কোনভাবে প্রেমের কথা বলছে —
যাত্রাপথে আলোবাদ্য, সন্ধ্যার জংশন, উল্কি আঁকা পেশীর প্রাচুর্য
থেকে অবিরাম উড়িয়ে দিচ্ছে অফুরান লাল নিশানা, আয়ুর
কোলাহল! যদি একবার দখলে আসে অনির্ণেয় ভূখণ্ড তোমার —
প্রার্থনার এমন প্রপাত নিয়ে পরাভূত যারা, ওদের কাউকেই
আমি গ্রহণ করি না। সমস্ত সম্ভাবনার সামনে তাই ঠেলে দেই
আগুনপাহাড়, অত্যুগ্র সেই ঈর্ষাতীর!

তাতে যদি মহাবিস্তারের ভেতর ইসরাফিলের শিঙ্গার আওয়াজ
ধ্বংসধর্মে স্তব্ধ করে দেয়, তবুও বিভাজনে যাবো! যেহেতু
কল্পদুর্গের অধরা আয়াত ঐ অনন্তে ধাবিত, যে পথে
এসরাজের শব্দ শোনা যায়। ষড়ঋতুর অপেক্ষমাণ কলিজা
রক্তিম করে অবশেষে আমাকেও বসিয়ে রাখে নির্জন গুহায়!
হবে হয়তো অজস্র-সহস্র দিনরাত্রি এভাবেই মুহূর্তের ময়দানে
চিত্রিত — উদ্বেলিত আর্তনাদ চিত্তের পরিপার্শ্বে বাদামী উষ্ণতার
বারুদ ঢেলে ঈশ্বরের বাগান অবধি ভস্ম করে দিচ্ছে! নীল শিখার
নন্দন হতে স্ফুরিত এক একটা বর্ণের অর্থায়ন বাক্যের জাদুতে
আবর্তিত। এতে গুঞ্জরন গাঢ় হয়, প্রতিটি সম্বন্ধ সূচকে।
প্রভাবক ততোই অহর্নিশ আনন্দদানা — এ সংবাদ ছড়িয়ে দিতে
চাই বিশ্বভূগোলে। গ্রহ তোমার একদিন এই পৃথিবীরই চূড়ান্ত
অংশ ছিল! গোপন এই তথ্যের তেজ এতদিন ধারণ করেছিল
হিজল গাছের নিচে উদ্বাস্তু, উদাস সেই সন্ধ্যার পাগল! যার
স্বোপার্জিত সিনার উত্তাপে জন্ম নিয়েছিলো স্বর্গের প্রথম ফুল —
নিরঞ্জন জ্জ্যোৎস্নার আবেগ! নিজেকে রক্তাক্ত করতে করতে
নক্ষতবাতিকে গানের ছলে এনেছে এতো দূর। অবাক চঞ্চলতাগুলো
পড়ে আছে হাঁসের ডিমের মতো কুড়িয়ে পাওয়া স্বর্ণসময়ে।  

তাই বুঝি সবাক বিস্তৃত জল্পনার প্রহেলিকা — প্রতিটি লক্ষ্যবস্তু
মর্মের জাগরণ একত্র করে বানিয়েছে মুকুট। বগলের ক্ষুদ্র বনে
লঘু অন্ধকারে আহ্নিক আর বার্ষিক গতির চূড়ান্ত বিলোড়ন
একত্ববাদের সর্বশেষ মদিরাটুকু নিঃশেষ করে হ্রদ পর্যন্ত
শুকিয়ে দিয়েছে। কাজেই সকল সূত্র ও রহস্যবীথিকার নিরব
অধিপতি আমি। ধূলিকণা থেকে নক্ষত্রমণ্ডলী আমারই নির্দেশক্রমে
সুসজ্জিত, প্রেরণা পরিবাহী। হয় নেমে এসো, নয়তো
দেখা দাও — ঝরে গিয়ে লজ্জিত, বিবর্ণ বটপাতাটিও
শহীদের মর্যাদা পেতে পারে। সদ্য গোর দেওয়া লোকটি
সর্বাঙ্গে যার শুধুই পাপের সঞ্চয় — কবরের গাঢ় অন্ধকার
হতে নির্মিত সুড়ঙ্গ নরকের উল্লাস প্রলম্বিত করেছে। যেখানে
অবয়বহীন ফেরেশতারা দণ্ডের বহুরূপী হাতিয়ার হাতে এগিয়ে
আসছে। নিরুপায় সেও মুহূর্তেই পাড়ি দিতে পারে অসম্ভবের পুলসিরাত।

মরুবালিতে ঝিনুকের বিচরণ — এমন অর্থহীন উত্থানের মতো
পাহাড় কাঁপিয়ে কে যেন বলছিল — জাগো, প্রার্থনায় নমিত হও।
প্রলয়ের গান সমাপ্ত হবার আগেই শেষ চুম্বন করো প্রেমিকাকে।
ওদের কী করে ধারণা দেই, আড়াল থেকে তুমি মৃদু হেসেছিলে
মাত্র! দশদিগন্তে পুষ্পমাস — গন্ধস্রোতে অন্ধ করে ফুলেরা সব
কই হারালো? শর্তহীন আর্তির বিস্ময়-বিতান থেকে সৌরদেব
নিজস্ব রশ্মির বিনিময়ে যেভাবে পৃথিবী রক্ষা করছে, সে-তো
আমারই চেতনার অনুক্ত বিদ্যুৎ! রৌদ্রস্নান করবে বলে পরাবর্তের
চুক্তি অটুট এখনো। তাই শুধু নয়, গোধূলিগঞ্জ ত্যাগ করে
পরিকীর্ণ রাতের অসীম নিরবতায় ফেরি করে নক্ষত্রের নরম।
প্রতিবিম্ব আমারই —
উন্মুল ধীমান
সিংহ দরজা
মাতাল ঋষভ
পথ সব ঢালু, নেমে গেছে একই দিকে — কেন্দ্রকাবার চারপাশে
ঘুরে ঘুরে বাঞ্ছা করে দিলের আওয়াজ। বিমন্দ্রিত মাতমে সমুদ্রের
নোনা জল উঠে এসেছে রাস্তায়। দূরে, গম্বুজের পেছনে বনমোরগটির
ঝুটির উপরিভাগে ডালিম ফুলের উদ্দীপ্ত লাল ব্যথার সংজ্ঞায়
আচ্ছাদিত। ঠিক তখন নভোছকের তলানিতে জমা হয় দাহ্য-দিনার।
গোপনে কেউ কি তবে চালিয়েছে ছুরি নিজেরই ধমনীতে?
বোধ হয় ঋতুও ভুল করে, কিংবা ভুল ঋতুরই প্রাণ-রক্ষিতা
তা না হলে কেনো তবে চোদ্দটি বছর ধরে প্রত্যহ কান্না-কুরআন
পঠিত হচ্ছে স্মৃতি-সরণীর বাঁকে! সামান্য কিছু সারমর্ম নিয়ে
প্রকাণ্ড ঝড়ের দাপট তুচ্ছ ভেবে, সংকটের বলয় ভেঙ্গে ভেঙ্গে
একতারা হাতে এগিয়ে যায় জগত-বাউল। তার পেছনে ছুটতে
থাকে আরেক প্রেমান্ধ উন্মাদ। পথ আজও পায়নি পথের নাগাল —
শিলাবৃষ্টি বারংবার বিরহ-বরফ ঢেলে দিয়েছে জানান।
এতো ভার কোথায় রাখি, রক্তশূন্য হয়ে যাই যদি! ঘুমের
সুযোগে যদি কোন জল্লাদ এসে চুরি করে নিয়ে যায় স্নায়ুর সম্পদ —
সজাগ তাড়না সেহেতু দ্বিধায় বঙ্কিম। সম্ভাবনার সামনে তখনো
অযুত-নিযুত অন্ধকার, ভাসমান হিম কুয়াশা।
অথচ এসরাজের মিহি সুর স্পষ্ট শোনা যায়।

অদেখার চৌদ্দ বছর কীভাবে অতিক্রান্ত হলো, ফসকে গেলো
শিকারির ফাঁদ থেকে — বলতে পারবে শুধু নিরীহ বনসাইগুলো।
সঞ্চিত ব্যাধিঘোর থেকে উঠে গিয়ে প্রথম সাক্ষাতের বেদিমূলে অর্ঘ্যচুম্বন
রেখে ফিরে আসি। বোধ ও বিস্ময়ে বিবেচনা করি — হুরের সমস্ত
হামদ দূরেই ঠেলেছিলাম। যেন রক্তের ভেতর পানশালা, মদের সন্ত্রাস।
প্রস্তাবিত সেই রাতে অস্থির চাঁদ প্রশ্ন করেছিলো — আকাশ আর মাটির
মাঝে তুমিতুল্য কেউ কী আছে, যাকে নূরের তিলকে সাজানো যায়?
জ্যোৎস্নার কসম খেয়ে বলেছি — নেই, নেই, নেই।
আজও তার ধ্বনিতে অমাবস্যা আসে, প্রেম পরিণতি পায় যৌনজলে।
সম্মুখে দাঁড়াও আরেকবার, গির্জার আয়তন ঘিরে
মন্দিরের ঘণ্টায়
মিনারের ছাদে
প্রকাশ্যে বাজাও এসরাজ, নইলে রেহেলে খোলা কোরানের
অক্ষরগুলো বাষ্প হয়ে উড়ে যাবে আল্লার আরশে।

Comments

comments

অনন্ত সুজন

অনন্ত সুজন

জন্ম--২৭/১১/১৯৭৭ ইং কবিতাবই--পিপাসা পুস্তক, জেল সিরিজ, লাল টেলিগ্রাম, জ্যোৎস্নার হাড় । সম্পাদিত পত্রিকা--সুবিল । সম্পাদনা--শূন্যের সাম্পান [প্রথম দশকের নির্বাচিত কবি ও কবিতা], অনতিদীর্ঘিকা [প্রথম দশকের দীর্ঘ কবিতা । প্রকাশিতব্য গল্পগ্রন্থ--লীলা রিরংসা । মুঠোফোন--০১৭১২০৯৭৭৬৬

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি