ঘ্রাণ । আফরোজা সোমা

এই মাঝরাতে রাফসানার এমন লাগতে শুরু করবে এটা কি রাফসানাও জানতো! এমন আচম্বিতে! এভাবে এসে-ও আঁকরে ধরতে পারে আকুলতা! অথচ গত সাড়ে তিন বছরে তো রাফসানা প্রায় মানিয়েই নিয়েছে নিজেকে। অপেক্ষাকে এখন আর তার অপেক্ষা মনে হয় না। থেকে-থেকে হঠাত করেই বুকের ভেতর খালি হয়ে যায় না। হঠাত করেই বুক ধর-ফড় করতে-করতে শরীর কাঁপতে শুরু করে না বা কাঁদতে-কাঁদতে হঠাতই জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ে না সোফায় বা বিছানায় বা মেঝেতে। শ্বশুড়বাড়ির লোকজন, মায়ের বাড়ির লোকজন রাফসানাকে সামলাতে প্রথম দেড়টা বছর কী কষ্টই না করেছেন।

তাদের সকলের চেষ্টা কাজে লেগেছে। রাফসানা শারীরিকভাবে সুস্থ্যই থেকেছে। তার গর্ভের শিশু পৃথিবীতে এসেছে। সেই শিশুর এখন তিন বছর বয়স। দেখতে সে অবিকল হয়েছে বাবার মতন। বাবার দেয়া নামেই তার নাম হয়েছে ‘মেঘমঞ্জুরী’। মেঘমঞ্জুরী ‘বাবা বাবা’ বলে ডাকে। দেয়ালে বাঁধানো বাবার বড় ছবির দিকে তাকিয়ে হাসে। আঙুল তুলে দেখিয়ে বলে, ‘বাবা’! মেঘমঞ্জুরির সাথে হাসে রাফসানা। সেও বলে, ‘বাবা! বাবা আসবে! আর মাত্র ক’দিন। বাবা আসবে’।

আসবে। আসবে। আরাফাত আসবে। এই আশায় কতইনা প্রহর গুণেছে রাফসানা! কিন্তু একে একে সাড়ে তিন বছর গেলো। আরাফাত আজো আসেনি। তার এই না আসার সাথেও তো মানিয়েই নিয়েছিল রাফসানা। কিন্তু আজ এই মাঝরাতে হঠাত কী হলো আবার!

স্বপ্নের মধ্যে রাফসানা খুব তীব্রভাবে আরাফাতের গায়ের গন্ধ পেলো। গায়ের গন্ধ মানে, প্রতিদিন সকালে উঠে শেভ করে আরাফাত মুখে মাখতো অ্যাডিডাস-এর আফটার শেভিং লোশান। আরাফাত যখন শেভ করতো বাথরুমের দরজা সাধারণত ভেতর থেকে আটকাতো না। দরজা সামান্য ফাঁকা হয়ে থাকতো। ফলে, শেভিং শেষে আফটার শেভ লোশান মাখার সময় সিটকিনি না-আটকানো দরজার ফাঁক গলে অ্যাডিডাসের মৃদু্ সুগন্ধে ঘর ভরে যেতো।

বিবাহিত জীবনের টানা প্রায় দুই বছর ধরে এই গন্ধটা পেতে পেতে কখন যে অ্যাডিডাসের এই আফটার শেভিং লোশানের গন্ধটাই আরাফাতের গন্ধ হয়ে রাফসানার মগজে ঠাঁই করে নিয়েছে তা সে নিজেও জানতো না। একদিন আড়ং-এ বাজার করতে গিয়ে হঠাত একটা চেনা গন্ধ পেয়ে ‘এখানে আরাফাত কোথ্থেকে এলো’ ভাবতে ভাবতে রাফসানা চকিতে ঘাড় ঘুড়িয়ে পেছনে তাকায়। কিন্তু পেছনে তাকিয়ে দেখে, আরাফাত নয়। প্রায় আরাফাতের বয়সই আরেকটা লোক; ক্লিন-শেভড; গায়ে একটা ফুল হাতা সাদা শার্ট; হাতে একটা ট্রলি নিয়ে বাজার করছেন ভদ্রলোক। কিন্তু লোকটা রাফসানার একেবারে পেছনে থাকায় গন্ধটা খুব তীব্রভাবে পেয়েছিল।

এরপর থেকেই রাফসানা খেয়াল করেছে, কোথাও অ্যাডিডাসের এই গন্ধটা পেলেই তার মনে হয়, আশাপাশে কোথাও আরাফাত আছে। যদিও সে জানে যে, আরাফাত এখানে নেই। যদিও সে জানে যে, আরাফাত হাসপাতালে এবং যার গা থেকে গন্ধটা আসছে তিনি অন্য কেউ। কিন্তু তবু এই গন্ধটা পাওয়ামাত্রই  আরাফাতের কথাই রাফসানার মনে আসে। আসবেই। এইক্ষেত্রে কোনোভাবেই সে নিজের চিন্তাকে নিয়ন্ত্রন করতে পারে না। ফলে, বাজারে বা রাস্তায় বা কোনো অনুষ্ঠানে হঠাত কখনো এই গন্ধটা পেয়ে গেলে রাফসানা তখন হয়তো আরাফাতকে ফোন দেয়। ঘটনাটা বলে। দুই এক মিনিট গল্প করে। মাঝে মাঝে কিছু খুনসুটিও করে দু’জন।  

একবার শিল্পকলায় নাটক দেখতে গিয়ে তো রাফসানার খুব সমস্যা হলো। একটা লোকের গা থেকে আসছে আরাফাতের গন্ধ। লোকটা বসেছেও রাফসানার ঠিক বামপাশের সিটেই। কিন্তু এই গন্ধ পাওয়ার পর থেকে সে কিছুতেই আর স্থির হয়ে বসে থাকতে পারছে না। এই গন্ধে তার কেমন একটা ইলিউশান হচ্ছে। মনে হচ্ছে, আরাফাতই বুঝি পাশে বসে আছে। কিন্তু সে জানে যে, এখানে আরাফাত নেই। তবু, মাথার মধ্যে ঘুরছে, যেনো আরাফাত আছে। পাশেই। তাই, এই গন্ধটাকে পাশ কাটানোর জন্য নাকের মধ্যে ভালো করে ওড়নাটা প্যাঁচিয়ে দিয়েছে রাফসানা। তবুও অস্বস্তিটা যায়নি।

নাটকের বিরতিতে সে আরাফাতকে ফোন দেয়। ঘটনাটা বলে। সবকথা শুনে আরাফাত জিজ্ঞেস করে, পাশের লোকটা কি মোটামুটি হ্যান্ডসাম? রাফসানা বলে, হ্যাঁ। কেন? তখন আরাফাত বলে, তাহলে বিরতি শেষে আবার যখন নাটক শুরু হবে, তখন তুমি ওই পাশের লোকটার হাত ধরে ফেলো। কারণ নাটক শুরু হলে যখন সব বাতি নিভিয়ে দেবে তখন তো আর কারো মুখ দেখা যাবে না। ফলে, তুমি ভাববে আমিই বসে আছি পাশে। বলেই একটা খুব দুষ্টু হাসি শুরু করেছিল আরাফাত।

সেদিন যে রাফসানার কী রাগ হয়েছিল। বলার মতন নয়। এরকম একটা কথা বলা যায়! আরেকটা লোকের হাত কি আরাফাতের হাত! সে কি কেবল যে কোনো একটা মানুষের হাত ধরে বসে থাকতে চেয়েছে নাকি! আরাফাতের গায়ের গন্ধ আর আরেকটা লোকের গায়ের গন্ধ কি এক হলো! আর গন্ধ এক হলেই কি সেই লোকটা আরাফাত হয়ে গেলো নাকি! এই নিয়ে রাতে বাসায় ফিরেও রাফসানার অভিমান যায়নি। তখন অভিমান কাটাতে আরাফাত এমনি-এমনিই মুখে একটু আফটার শেভিং লোশন মেখে এসে রাফসানাকে জড়িয়ে ধরেছিল। গভীর করে চুমু দিয়ে অভিমান ভাঙিয়ে বলেছিল, তোমার স্মৃতির মধ্যে আমি আর ওই গন্ধটা একাকার হয়ে গেছে। তাই, এই গন্ধের থেকে আমাকে বা আমার থেকে এই গন্ধটাকে আলাদা করতে তোমার অসুবিধা হয়।  

এই ঘটনার পর থেকে রাফসানা এই গন্ধটার ব্যাপারে খুবই সাবধান। আরাফাত সঙ্গে না থাকা অবস্থায় কোথাও এই গন্ধটা পেলে সে চেষ্টা করে এটাকে এড়িয়ে যেতে। কারণ এই গন্ধটা পাওয়া মানেই খুব তীব্রভাবে আরাফাতের কথা মনে ঘুর-ঘুর করে; অনিচ্ছাতেই। সকালে প্রায় প্রতিদিনই বের হয়ে যাবার সময় আরাফাত চুমু খেয়ে যেতো। সেসময় সদ্য মাখা অ্যাডিডাসের গন্ধ লেগে থাকতো রাফসানার গালে। এই গন্ধটাই অনেক্ষন সঙ্গ দিতো রাফসানাকে। ফলে, রাস্তাঘাটে অচেনা লোকের গায়ে এই গন্ধটা পেতে তার একদমই ভালো লাগে না। বরং সমস্যা হয়।   

যেদিন ভোরে একটা সাদা মাইক্রোবাস এসে বাসা থেকে আরাফাতকে তুলে নিয়ে গেলো সেদিন সেই মাইক্রোবাসের মুখোশে ঢাকা লোকদের একজন বলেছিল, চিন্তার কিছু নেই। সন্ধ্যার মধ্যেই ফিরে আসবে। কিন্তু আরাফাতকে কেন নিয়ে যাচ্ছে, কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, যারা নিয়ে যাচ্ছে তারা কারা — এসব কোনো প্রশ্নের উত্তর তারা দেয়নি। শুধু বলেছিল, আমরা আইনের লোক। সন্ধ্যার মধ্যেই উনি ফিরে আসবেন।   

আরাফাত ডাক্তার। নিউরো স্পেশালিস্ট। কাজ করে একটা বেসকারি হাসপাতালে। রাজনীতির সাথে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তাহলে ওকে কেন আইনের লোকেরা নিয়ে গেলো! এই নিয়ে সবাই ধন্ধে। রাফসানার শ্বশুড়, ভাসুর, দেবর, ননাস সবাই। সবাই যে যার মতন চেষ্টা করেছে খবর নিতে। কিন্তু রাফসানার মনে হয়েছিল, আরাফাত তো আর রাজনীতি-টিতি করে না। হয়তো কোথাও কিছু একটা ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। ফলে, চিন্তার কিছু নেই। যেহেতু ওরা বলেছে সন্ধ্যার মধ্যে ফিরে আসবে, তাহলে তো আসবেই।

আরাফাত সন্ধ্যার মধ্যে ফিরে আসবে ভেবে রাফসানা সেদিন দুপুরে আরাফাতের পছন্দের পাবদা মাছের ঝোল রেঁধেছিল। কিন্তু সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হয়েছে। ভোর হয়েছে। আরেক সন্ধ্যা এসেছে। গেছে। এরকম করে পেরিয়ে গেছে কয়েকশ’ সন্ধ্যা। আরাফাত আসেনি।   

কত বড় বড় লোক দিয়ে খবর নেয়া হলো! এমনকি রাফসানার এক নন্দাই যার ভাই কি-না সরকারের উচ্চপদে কাজ করেন তিনিও ভেতর থেকে খবর জানার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ভেতর থেকেও খবর মিললো, আরাফাতকে আইনের কেউ তুলে নেয়নি। আইনের লোকের হাতে সে নেই।

তাহলে আরাফাত কোথায়! থানা-পুলিশ-ডিবিতে কত ধর্না দিয়ে যাচ্ছেন রাফসানার শ্বশুড় ডাক্তার ফজলে এলাহী। কিন্তু আরাফাতের দেখা নেই। উকিল, পুলিশ বারবার জিজ্ঞেস করে তাদের কোনো পারিবারিক শত্রুতা আছে কি-না। জমিজমা নিয়ে কোনো গণ্ডগোল আছে কি-না। কিন্তু তাদের তো কোনো বিশেষ শত্রুও কেউ নেই। জমিজমা নিয়েও কোনো বিরোধ হয়নি কখনো কারো সাথে। নিকট অতীতে কারো সাথে কোনো ঝামেলাও হয়নি কোনো। অনেক ভাবতে ভাবতে রাফসানার মনে আসে শুধু যে, রাফসানার বিয়ের আগে-আগে তাকে বিয়ে করানোর জন্য তাদের বাড়ীতে প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন স্থানীয় এমপি। এমপির ছেলে নাকি রাফসানাকে একটা অনুষ্ঠানে দেখে খুব পছন্দ করেছিলেন। কিন্তু রাফসানার পরিবার থেকে খুব বিনয়ের সঙ্গে যখন জানানো হয়েছিল যে, মেয়ের বিয়ে ইতোমধ্যেই ঠিক হয়ে গেছে; সামনের মাসেই আকত্ তখন বিয়ে ভেঙে দিতে এমপি সাহেব সামান্য আভাস দিয়ে ছিলেন বটে। কিন্তু বিয়ের কথা-বার্তা পারিবারিকভাবে ঠিকঠাক হবার পর মেয়ে-ছেলে পরস্পরকে পছন্দ করে গত দুই মাস ধরে মেলা-মেশা করছে জেনে এমপি সাহেব আর কোনো আপত্তি তোলেননি। ওই প্রস্তাবের ওখানেই ইতি। ওটা নিয়ে আর কোনো কথা-বার্তা বা ঝামেলা কিছু হয়নি। এছাড়া এলাকার আর কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির সাথেও তাদের বিশেষ যোগাযোগ নেই। তাহলে, আরাফাতকে কারা তুলে নিয়ে গেলো? কারা গুম করলো? কেন নিলো? কেউ এই উত্তর দিতে পারে না। আইনের লোকেরা শুধু বলছেন, তারা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। কিন্তু নেই। আরাফাত নেই। কয়েকশ’ দিন গেছে। আরাফাত ফেরেনি।

আরাফাতের সেই না থাকার প্রাথমিক দিনগুলো রাফসানা এখন মনেও করতে চায় না। সে কী বিভৎস একেকটা দিন। আরাফাতকে দেখতে না পেয়ে ছয় মাসের গর্ভবতী রাফসানার তখন মাঝে মাঝেই মনে হতো ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়তে বা ফ্যানে ঝুলে যেতে। আরাফাত যখন শেভ করে বেরিয়ে যেতো প্রতিটা সকালে ঘড়ির কাঁটায় সেই সময়টা বাজলেই মনে হতো, এই বুঝি এক্ষুনি আরাফাত বাথরুম থেকে বেরোবে। ওর সুবাসে ভরে যাবে ঘর। হয়তো আরাফাতকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরবে রাফসানা। অথবা হয়তো রাফসানাকে জড়িয়ে ধরে নাকের মধ্যে আলতো করে নাক ঘষে দেবে আরাফাত।

কিন্তু আরাফাত আসেনি। কয়েশ’ দিন গেছে। যে শিশু ছয় মাসের গর্ভে ছিল। তার জন্ম হয়েছে। কিন্তু আরাফাত আসেনি। আরাফাতের না আসার প্রায় বছর খানেক হবে তখন। তখন একদিন নিজেকে আর সামলাতে না পেরে রাতের বেলায় অ্যাডিডাসের আফটার শেভিং লোশানের বোতলের মুখটা খুলে নাকের সামনে ধরে রাখে রাফসানা! সেই রাতে হয়তো ওই গন্ধটাই ওকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল। নইলে হয়তো কয়েকমাসের মেয়ে মেঘমঞ্জুরীকে রেখেই সে ঝুলে যেতো ফ্যানে।

তারপর ধীরে ধীরে নিজেকে সামলে নিতে শিখেছে সে। মেঘমঞ্জুরীর নামটাও আরাফাতের দেয়া। আরাফাত বলেছিল মেয়ে হলে নাম রাখবে মেঘমঞ্জুরী। মেঘমঞ্জুরি দেখতেও হয়েছে একেবারেই আরাফাতের মতন। তার দিকে তাকিয়েই দিনগুলো যাচ্ছিলো রাফসানার। কিন্তু আজ হঠাত কী হলো তার!

এই মাঝরাতে কেন স্বপ্নের মধ্যে এতো তীব্রভাবে পেলো আরাফাতের ঘ্রাণ! মনে হলো, বাথরুমের দরজা খানিকটা ফাঁকা রেখে শেভ করছে আরাফাত। দরজার ফাঁকা দিয়ে সুগন্ধ বেরিয়ে এসে ভরে গেছে ঘর।  তারপর বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসে টাওয়েলটা হ্যাঙ্গারে রেখেই রাফসানার গলা জড়িয়ে ধরে নাকে নাক ঘষে দিয়েছে আরাফাত। আরাফাতের গাল থেকে আসা সেই গন্ধ লম্বা দম দিয়ে টেনে নিচ্ছে রাফসানা। এমনো হয়! স্বপ্নের মধ্যে কি কেউ কখনো গন্ধ-ও পায় নাকি!

এই গন্ধে রাফসানার ঘুম ভেঙে গেলো। ঘুম ভেঙে সে-কী বুক বিদীর্ণ করা কান্না! বোবা কান্না! সশব্দে কাঁদলে মেয়ের ঘুম ভেঙে যাবে। পাশের রুমে থাকা অসুস্থ্য শ্বাশুড়ির পাতলা ঘুম ভেঙে যাবে। তখন তিনিও হয়তো কাঁদতে শুরু করবেন। তাই, নিঃশব্দে গুঙিয়ে-গুঙিয়ে কাঁদে রাফসানা। ভাবে, কোথায় আছে আরাফাত! কেমন আছে! কেন তাকে নিয়ে গেলো কেউ! কেন! কেন কেউ তাকে খুঁজে পায় না!

রাফসানার দম বন্ধ হয়ে আসছে। আরাফাতের ফিরে না আসার সেই প্রথম দিনগুলোর মতনই তার বুক ধড়-ফড় করছে। বুক ধড়-ফড় করার শব্দ রাফসানা শুনতে পাচ্ছে নিজের কানেই। নিজেকে আর সামলাতে পারছে না। মনে হচ্ছে, চিৎকার করে আকাশ কাঁপিয়ে যদি কাঁদতে পারতো। যদি ডাকতে পারতো আরাফাতের নাম ধরে! কিন্তু সে চিৎকার করে না। মেয়ে জেগে গেলে তাকে সামলানো মুস্কিল; শুাশুড়ী জেগে গিয়ে সে-ও কান্না জুড়ে দিলে তাকে সামলানো মুস্কিল।

বিছানায় উপুড় হয়ে পড়ে কাঁদতে-কাঁদতে সে অস্ফুটে বারবার বলতে থাকে আরাফাতের নাম। আরাফাত! আরাফাত! জপতে-জপতে একটা সময়ে তার যেনো জ্ঞান লুপ্ত হয়। কান্নায় ফুলে যাওয়া লাল টকটকে দুই চোখ নিয়ে বেহুশের মতন সে ঢুকে বাথরুমে। ঘোরগ্রস্থের মতন আফটার শেভিং লোশনের বোতলটা হাতে নিয়ে ঘরের মধ্যে এসে সে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়ায়। তারপর বোতলের মুখটা খুলে ধরে রাখে নাকের সামনে। এমন সময় চকিতে রাফসানার মনে হয়, সাড়ে তিন বছর ধরে অবব্যাহৃত পড়ে থাকা এই আধ-বোতল লোশান ঢেলে দেবে নাকি সে তার গলার ভেতর! যেই ভাবা সেই কাজ করতে গিয়েও আর হয় না। বোতল থেকে একটু লোশান ডান হাতের আঙুলে নিয়ে রাফসান তার গালে, নাকে, গলায় মেখে দেয়। আর তার চোখ দিয়ে ঝুরঝুর করে ঝরতে থাকে অশ্রু।    

Comments

comments

আফরোজা সোমা

আফরোজা সোমা

জন্ম ২রা অক্টোবর, ১৯৮৪, কিশোরগঞ্জ। পেশায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। পাশাপাশি ফ্রিল্যান্স ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট হিসেবে কাজ করেন বিবিসি বাংলা রেডিও-তে। প্রকাশিত কবিতার বই: অন্ধঘড়ি (২০১০,কথা প্রকাশ), হারমোনিকা (২০১৪, সংবেদ), ডাহুক (২০১৫, ভাষা প্রকাশ)।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি