ঢাকাই ইফতারের ঘরানা-বাহিরানা । অনার্য তাপস

রমজানের সাথে ইফতার ও সেহরির সম্পর্ক ওতোপ্রোতভাবে জড়িত সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে এটা বোধ হয় বলার অপেক্ষা রাখে যে ঢাকার সেহরি এবং ইফতার কতোটা বর্ণিল হতো। এটা ঠিক যে, ঢাকার খাবারে অনেক পূর্ব থেকে মুঘল ছোঁয়া লেগেছে। আর এ কারণে কোনটা আসলে ঢাকা অঞ্চলের স্থানীয় বা আদি খাবার সেটা নির্ণয় করা দূরুহ। কারণ ঢাকায় মুঘলদের আগমনের পূর্বকালের এখানকার অধিবাসীদের খাদ্যাভ্যাসের দালিলিক প্রমাণ আমাদের হাতে নেই। তবে এটা বলা যায় যে, ঢাকায় দীর্ঘ মুঘল শাসনের কারণে কালক্রমে মোগলাই খাবারই ঢাকার খাবার হিসেবে চিহ্নিত হয়ে গেছে সাধারণভাবে।

চলুন দেখে নেওয়া যাক পুরনো দিনে, মানে রমজান ‘রমাদান’ হয়ে ওঠার আগে এবং নামিদামি রেস্তোরাসহ গলির মুখের হোটেলগুলো ইফতার আর সেহরির ‘স্পাইসি কম্বো’ অফার শুরু করার আগে ঢাকায় রমজান মাসের খাবার কেমন ছিলো।

‘রমজানে প্রত্যেক ঘরেই শ্রেষ্ঠ খাবার রান্না হতো।’ অর্থাৎ রমজানে ইফতার বা সেহরির জন্য বাড়িতেই প্রত্যেকে সাধ্যের মধ্যে থাকা শ্রেষ্ঠ খাবারটাই রান্না করতো। সেহরিতে সবাই গরম খাবার খেতো। পহেলা রোজায় প্রত্যেক বাড়িতে কোফতা ভাজা, কোর্মা না হলে কালিয়া রান্না করা ছিলো প্রায় বাধ্যতামূলক। কারণ এগুলো রুটি এবং ভাত উভয়ের সাথেই সুস্বাদু। ঢাকাবাসী সেহরির জন্য সাধারণভাবে কোর্মা এবং ‘শীরবিরিঞ্জ’ বা দুধের পায়েস বেশি পছন্দ করতো। তবে আহসান মঞ্জিলে শীরবিরিঞ্জে দুধের সাথে চালের পরিবর্তে সাবুদানা ব্যবহার করা হতো। পুরুষদের মধ্যে রুটি এবং নারীদের মধ্যে সাধারণভাবে ভাত খাবার প্রচলন ছিলো। তবে এখনকার মতো সেহেরির চাইতে পুরোনো দিনেও ঢাকায় ইফতারই ছিলো বর্ণিল।

ধনী কিংবা গরিব সব পরিবারেই ইফতারের আয়োজন করা হতো সাধ্যমতো বর্ণিল। ইফতারের জন্যও বাড়িতে তৈরি খাবার ছিল প্রধান। বাজার থেকে ছোলা কিনে পরিষ্কার করে রাখা হতো ইফতারে ব্যবহার করার জন্য। সাতাশ সাবান নতুন হাঁড়িতে মুগ ডাল ভেজানো হতো, যাতে পহেলা রমজান এর অঙ্কুর বের হয়ে যায় এবং ইফতারে সেটা ব্যবহার করা যায়। নোনতা ও মিষ্টি সামুচা, কাঁচা এবং ভাজা ডাল, ফল-ফলারি, পেয়াজি, ফুলুরি, নার্গিসি কাবাব, কাছ কাবাব, মুরগির শিককাবাব, হান্ডি কাবাব ইত্যাদি অধিকাংশ বাড়িতেই তৈরি করা হতো। কাবাব খাবার জন্য বিভিন্ন ধরনের রুটি এবং পরাটা ভাজা হতো। এগুলোর পাশাপাশি বাজার থেকে আসতো শিককাবাব, ভূনাচিড়া, দোভাজা, টেপি ফুলুরি, মাসকলাই এর বড়া, ডাল-বুট ইত্যাদি। এসবের সাথে অবশ্যই থাকতো সাদা অথবা পনির যুক্ত বাকরখানি। পুদীনা পাতা, খিরা, ধনে পাতা, বিভিন্ন ধরনের মৌসুমী ফল থাকতো ইফতারে। হাবিবুর রহমান জানাচ্ছেন, যে মৌসুমেই রমজান হোক না কেন পুদীনা পাতা, খিরা আর ধনে পাতা পাওয়া যাবেই। আর পাওয়া যেতো আখ। গোলাপ বা কেওড়া ফুলের পাপড়ি দিয়ে সুবাসিত করা হতো এগুলো।

নানা ধরনের পানিয় এবং শরবত তৈরি হতো রমজানে। এগুলোর মধ্যে জনপ্রিয় ছিল ফালুদা এবং তোকমার শরবত। কেউ কেউ বেলের শরবত পান করতো। ‘বেশি গরম মেজাজের লোকেরা’ লেবুর শরবত অথবা তেঁতুল ও গুড় দিয়ে তৈরি করা শরবত পান করতো ইফতারের সময়। চা খাবার প্রচলন ছিল তখনো। তবে এখনকার মতো নয়। শুধুমাত্র মুঘল এবং কাশ্মীরীদের বাড়িতেই চা পান করার রেওয়াজ ছিল, সাধারণ্যে নয়। চা খেলে পিপাসা কম লাগে এই ধারণায় মুঘল এবং কাশ্মীরীরা সেহরিতে চা পান করতো।

আর একটি বিষয় বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সেটি হচ্ছে, খাদ্যদ্রব্য সুবাসিত করা। এজন্য ব্যবহার করা হতো গোলাপ এবং কেওড়া ফুল। বিশেষ বিশেষ খাদ্যদ্রব্য কেওড়া এবং গোলাপের পাপড়ি দিয়ে ঢেকে রাখা হতো যেন তাতে সুগন্ধ তৈরি হয়। যেমন, মাখনা। মাখনার দানা বের করে নিয়ে তা কেওড়া বা গোলাপের পাপড়িতে ঢেকে রাখা হতো। পরে সেই দানা খাওয়া হতো বা তা দিয়ে সুগন্ধী পায়েস রান্না করা হতো। আখের খ-কেও সুবাসিত করা হতো একই প্রক্রিয়ায়। এমনকি হুক্কায় খাবার জন্য যে তামাক ব্যবহার করা হতো সেটিও সুবাসিত করা হতো গোলাপ বা কেওড়া পাতা দিয়ে। রমজানের শুরুতে ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই সাধ্যমতো গোলাপ বা কেওড়া কিনতো খাদ্যদ্রব্য সুগন্ধ যুক্ত করার জন্য।

এতো গেল অন্দরের কথা। বাইরের? আজ থেকে এক-দেড়শো বছর আগেও আজকালের মতো ইফতারের জন্য  চক বাজার ছিল গুরুত্বপূর্ণ। চকে ইফতারির দোকান বসতো। শ্রেণীভেদে সবাই এখানে আসতো ইফতার কেনার জন্য। হাকিম হাবিবুর রহমান জানাচ্ছেন যে, বাড়িতে তৈরি খাবার তো ছিলই। তারপরেও প্রত্যেক ব্যক্তি চক থেকে কিছু না কিছু কিনতো। বিভিন্ন ধরনের পিঠা এবং রমজানের বিশেষ বিশেষ জিনিস এই চকেই পাওয়া যেত। যেমন, গোলাপী উখড়া শুধুমাত্র রমজানে চকেই পাওয়া যেত। হাবিবুর রহমানের বর্ণনা মতে আজ থেকে আনুমানিক দেড়শো বছরেরও আগে চকে আলাউদ্দিন হালুয়াই খাবারের দোকান খুলেছিলেন লখনৌ থেকে এসে। নিকম পারা, সামুচা এবং লখনৌ শিরমাল শুধু তার দোকানেই পাওয়া যেতো। তবে ধারণা করা অসঙ্গত হবে না যে, এগুলোর পাশাপাশি তার দোকানে লখনৌয়ের আরো খাবার পাওয়া যেতো।

এতক্ষণ পর্যন্ত যা আলোচনায় আসলো তার প্রায় সবই বিশেষ ধরনের মোগলাই খাবার। বিশেষ ধরনের বলা হলো এই কারণে যে, আমরা ঢাকার খাবারের ঠিক যে সময়কার বর্ণনা পাচ্ছি সে সময় খাবারে বেশ খানিকটা পরিবর্তন এসেছে। অর্থাৎ বাঙালীর হাতে পারে মোগলাই খাবারও মোটামুটি তার শুদ্ধতা হারিয়ে কখনো উৎকৃষ্ট হয়েছে, কখনোবা অপকৃষ্ট। তবে নিঃসন্দেহে মুঘল কিংবা কাশ্মিরী পবিবারগুলো পারিবারিকভাবে তাদের খাবারের আভিজাত্য ধরে রাখার চেষ্টা করেছে। এখনো সেটা দেখা যায় আমাদের পুরান ঢাকায়। এখনো যেসমস্ত ইরানী কিংবা ইরাকি পরিবার সেখানে বসবাস করে তাদের খাদ্যাভ্যাস গড়পরতা বাঙ্গালীর চেয়ে আলাদা। এখনো এই পরিবারগুলো ডালের অঙ্কুর ভালোবাসে নাস্তায় কিংবা ইফতারে। মাংসের পদ রান্নায় এখনো তারা বাঙ্গালীর চেয়ে স্বতন্ত্র।

কিন্তু ইফতারির একটি বিষয়ে এখন আর তখনের মধ্যে তেমন পার্থক্য ছিল বলে মনে হয় না। সেটি হচ্ছে মুড়ি। হাকিম হাবিবুর রহমান জানাচ্ছেন, রোজায় প্রত্যেক ঘরে মুড়ি অত্যাবশ্যকীয় ছিলো। পেঁয়াজ, মরিচ, তেল সহযোগে মুড়ি মাখানো হতো। শুধু যে সাধারণ্যে মুড়ির প্রচলন ছিলো তা নয়। হাকিম সাহেব বলছেন, ভাজা মুড়ি ও ভাজা পনির ভালো ভালো ঘরে ইফতারির অন্তর্ভূক্ত থাকতো। ইফতারের সময় খাবারের বিভিন্ন আইটেমের সাথে মুড়িরও বিভিন্ন ‘আইটেম’ আসতো দস্তরখানে। মুড়ি বাঙ্গালীর জনপ্রিয় খাবারগুলোর মধ্যে অন্যতম। তবে বাংলাই এর উৎস না এটি ‘উড়ে এসে জুড়ে বসেছে’ সেটি নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

সন্দেহ নেই যে এই একুশ শতকে এসেও এই খাবারগুলো প্রতি রমজানের ইফতারি বা সেহরিতে আমাদের রসনার স্বাদ নিবারন করছে। এই দীর্ঘ সময়ে অবশ্যই খাবারগুলোর পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। উপকরণের অদলবদল ঘটেছে। ফলে স্বদেরও হেরফের হয়েছে। তারপরেও এগুলো আছে বলেই রমজানের ইফতারিতে অনন্য স্বাদের মাতামাতি এখনো আছে।

ইফতারের বাহিরানা সূচীত হয়েছে গত এক দেড়শো বছরে। এখনো বাড়িতে ইফতার তৈরি হয় বটে। কিন্তু অন্দরের সেই বৈচিত্র্য ছাপিয়ে সদরের বৈচিত্র্য দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সবখানে। চকবাজার এখনো আছে। পাশাপাশি নতুন ঢাকার বিভিন্ন পাঁচ তারকা হোটেল থেকে গলির মোড়ের দোকান — সবাই ‘ঈদ স্পেশাল’ নিয়ে ব্যস্ত। মানুষও ছুটছে সেখানেই। মিলছে নানান পদ, ভিন্ন স্বাদ। কিন্তু পাশাপাশি হারিয়ে গেছে খাবারের আভিজাত্য আর শুদ্ধতা। খাবারের সংস্কৃতিতে একধরনের সামাজিক অনুশাসন থাকে, যেখান থেকে সূচীত হয় খাবারের আভিজাত্য আর শুদ্ধতা — সেই অনুশাসন হারিয়ে গেছে প্রবল বাহিরানার দাপটে। এটি ভালো কী মন্দ, সেবিচারের দায়ভার আমাদের নয়।

সূত্র: ১. হাকিম হাবিবুর রহমান, ঢাকা পঞ্চাশ বছর আগে, অনুবাদ, ড. মোহাম্মদ রেজাউল করিম, প্যাপিরাস। ২০০৫।

Comments

comments

অনার্য তাপস

অনার্য তাপস

জন্ম ১৯৮০, দিনাজপুর। বড় হয়েছেন রংপুর জেলার একটি গ্রামে। লোকসংস্কৃতি বিষয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। সাথে এমফিল। লোকসংস্কৃতি বিষয়ে লেখালেখি করেন। সংগীত, নাটকসহ লোকসংস্কৃতির বিভিন্ন বিষয়ে তার আগ্রহ রয়েছে। বর্তমানে ঢাকায় একটি আইটি ফার্মে ননমিউজিক্যাল কনটেন্ট নিয়ে কাজ করছেন। anarjo.tapos@gmail.com

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি