এক গুচ্ছ কবিতা । মনিরুস সাব্বিন

খেরোখাতা

ভালোই ছিলো জীবন— কাঁচামিঠা রোদ।

প্রতিটি ইলেক্ট্রিক পিলার
মর্মবেদনায় শহীদ মিনার—
তাদের বলি — ধন্যবাদ।
প্রতিটি ধূলিকনাকে এক এক করে
বলে দিতে চাই — ভালোবাসা।
আঁজলায় প্রতিটি মুখ তুলে বলি — কৃতজ্ঞতা।
সকল প্রকৃতিস্থ ও পাগলের চোখে খেলে যায় অরুণ আভা,
উদাসী চিবুকের কাছে ‘যেহেতু জীবন’।
ব্রহ্মান্ডের জ্বলজ্বলে উত্তর থমকে আছে
আসন্ন মানে। তবু তো,
প্রেমের মুখোমুখি হয় উদাত্ত যৌবন।
দৃশ্যের মায়াবী গর্ভ থেকে জন্ম নেয়
অদৃশ্য বিদ্যুৎ,চাবুকের মতো চিরে দিয়ে যায় চেতনাশরীর।
ভালোই ছিলো জীবন—
শুভ্রনীলাকাশের নীচে
এই নশ্বর বোঝাপড়া।
ভালোই ছিলো জীবন—
এক হাত দেখে নেয়া।
(বিদায়!)

“তুমি একটা অল্পশিক্ষিত ছেলে, তারপরও তোমাকে শাহবাগ প্রতিনিধি করা হইছে তোমার পীড়াপীড়িতে।” দম নিলেন আনিস আহমেদ। “ঠিকঠাক ইভেন্টগুলা কাভার করতে পারো না পর্যন্ত।” দৈনিক জাগরণ পত্রিকার সহযোগী সম্পাদক তিনি। পত্রিকার সাহিত্য পাতার প্রধানও তিনি। ভিন্ন একটা কারণে মেজাজ বিগড়ে আছে তার। পুরো ঝাল সামনে বসা লোকটার উপর ঝাড়ছেন। লোকটা কিছু বলার জন্য মুখ খুলতে যাচ্ছিলেন। আনিস আহমেদ তাকে হাত তুলে থামিয়ে দিলেন। আরো রেগে গিয়ে বললেন “তুমি নাকি লেখালেখি করো? এই তার নমুনা?” টেবিলে রাখা কাগজের তাড়ায় আঙুলের মৃদু টোকা দিতেই ওগুলি নিচে মেঝেতে ছড়িয়ে পড়লো। শাহবাগ প্রতিনিধি চেয়ার ছেড়ে মেঝে থেকে ওগুলি কুড়িয়ে নিলেন। আনিস আহমেদ কিছুটা শান্ত কন্ঠে বলতে লাগলেন “শোনো নিজাম, ছড়াগুলা আমার পছন্দ হয় নাই। মাত্রা ঠিক আছে তো ছন্দ ঠিক নাই, ছন্দ ঠিক আছে তো …দেখি” নিজাম কাগজগুলি আনিস আহমেদ’র হাতে দিলেন। তিনি একটা কাগজ থেকে পড়তে শুরু করলেন, “মেয়েটি আমার পাড়াতো বোন/ মেয়েটি আমার কেউ নয়/ ছেলেটি ওর কাকাতো ভাই/ ওকে নিয়েই যত ভয়…না, এগুলা আমাদের পত্রিকার স্ট্যান্ডার্ডের সাথে যায় না।” নিজাম এর দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক কন্ঠে বললেন, “তুমি এখন যাও।” নিজাম দরজা লক্ষ্য করে এগিয়ে গেলেন। দরজার হাতলে টান দিতেই আনিস সাহেব ডাক দিলেন। নিজাম ঘাড় ফেরাতেই বললেন, “মন দিয়ে কাজ করতে হবে।”

বিকেলে অফিস থেকে বেরিয়েছেন নিজাম। অবসন্ন লাগলেও মেসে ফিরতে ইচ্ছে করে না তার। ঢাকার ফুটপাথে হাঁটতে থাকেন। মনে বিক্ষিপ্ত ভাবনার আনাগোনা। হাঁটতেই থাকেন গন্তব্যবিহীন ছড়াগুলি বাতিল হওয়ায় হতাশ হয়েছেন তিনি। কিছু সময়ের জন্য ক্রোধ নিজামের মনের অধিকার নিয়ে নেয়। নিজের শিক্ষাগত জোগ্যতা নিয়ে প্রায়শই কথা শুনতে হয় যা তার ভালো লাগে না। কলেজে ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন তিনি। বিদ্যমান বন্দোবস্ত তার ভালো লাগে না। একসময় গ্লানি-রাগ চাপা পড়ে যায় প্রবল দু:খবোধের নিচে। সেই দু:খ নিজামকে স্মৃতি তলিয়ে দেখতে বাধ্য করে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বাবার হঠাৎ মৃত্যুতে তারা একপ্রকার রাস্তায় চলে আসে। সেই অবস্থায় পরিবারের বড় সন্তান হয়ে তার পক্ষে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ সম্ভব ছিলো কি?

নিজামের ঘড়িতে রাত এগারোটা সাতাশ। গলির অন্ধকারের ভিতর দিয়ে কিছুদূর গেলেই তার মেস। কিন্তু দিক বদলে ধীরে ধীরে উল্টো দিকের রাস্তায় চলে আসেন তিনি। ইটের টুকরা খুঁজে নিয়ে সংকীর্ণ ফুটপাথঘেঁষা দেয়াল বরাবর এগিয়ে যান। এগারোটা ত্রিশ এ শহরের জন্য এমন কোনো রাত নয়। তবু আজ সুনশান চারিদিক। প্রহরী পুলিশের বাঁশির আওয়াজ নেই। কুকুরের ঘেউ ঘেউ নেই। এখন আকাশে তারার আলোটুকুও নেই। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় লিখতে শুরু করলেন নিজাম—

তোমরা খুব সফল আছো
দিয়েছো ঢেড় ছাইপাশ
আমি অনেক ফেইল হয়েছি
ছিঁড়তে চেয়ে নাগপাশ
একমাত্র ল্যাম্পপোস্ট এই দৃশ্যের সাক্ষী হয়ে রইলো। ফুটপাথ থেকে নেমে বিপরীত দিকের গলির অন্ধকারের ভিতর হারিয়ে গেলেন নিজাম।
(চিকা/একজন মামুলি মানুষ)

জেগে আছি অন্ধকারে।

ইদানীং আমার অবসর কাটে গত শতকের স্বীকৃত ক্লাসিক দেখে। মাঝে মাঝে গভীর রাতে ব্লু রে দুঃস্বপ্ন দেখি। সবুজ পাহাড়ে হাটছি,মুখ তুলতেই আকাশে ঘনীভূত নিউক্লিয়ার মেঘ। শুরুতে মানবসৃষ্ট মনে হলেও—দ্রুতই পষ্ট হোলো—এটা কোনো আগ্রাসী এলিয়েন ফোর্স সমস্ত আকাশে বিস্তারিত হচ্ছে। টের পাচ্ছি,মাটিতে চূড়ান্ত ধ্বংসলীলা শুরু হবে এখনি।আতঙ্কে কলিজা হিম হয়ে আসছে।

পরপর দু’রাত ঘুম ভেঙে গেলো
এই ক্লিশে দৃশ্যমালায় ঠেকে।
(দু:স্বপ্ন)

বিলম্বে এসেছে বসন্ত
বাহিত বাতাসে শীত লেগে আছে
শীত শীত হাওয়ায় পুকুরের পানি
তিরতির করে কাঁপতেছে।
পার্শ্ববর্তী নিয়নসাইনবোর্ডের বাহারি রঙ লেগে
তৈরি হয়েছে জলের জামদানী
চৈত্রের আজ কত?
(শহরে বসন্ত রাত)

Comments

comments

মনিরুস সাব্বিন

মনিরুস সাব্বিন

বাংলাদেশ এর ময়মনসিংহ বিভাগের শেরপুর জেলায় বাড়ি। ক্রিকেট রোমান্টিক। সাহিত্য, চলচ্চিত্র ও সংগীত ভালোবাসেন। ইমেল : goldfish7162@gmail.com । ফোন :01865282518

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি