অন্তরালের অনুসন্ধান :: পর্ব ১ । কালের লিখন

কালের লিখন

পৃথিবীর সব মানুষ মুসলিম? উত্তর হচ্ছে না। পৃথিবীর সব মানুষ হিন্দু? এর জবাবও না। পৃথিবীর সব মানুষ কি খ্রিস্টান? উত্তর হচ্ছে না। তাহলে পৃথিবীর সব মানুষ কি বৌদ্ধ? এটারও নিশ্চিত জবাব না। এক জরিপে দেখা যায় পৃথিবীতে ছোটবড় মিলিয়ে প্রায় সাড়ে তিনহাজার ধর্মীয় মতবাদ আছে, আমাদের এই ছোট বাংলাদেশেও প্রায় শ’খানেক সাম্প্রদায়িক মতবাদ খুঁজে পাওয়া যায়। যদিও আমরা এদের ধর্ম বলছি, মূলত শাব্দিক ও তাৎপর্যমূলক পর্যালোচনায় দেখা যাবে, এগুলো হচ্ছে সাম্প্রদায়িক মতবাদ। একেকটা সম্প্রদায়ের একেকটা মতবাদ। মুসলিম একটা সাম্প্রদায়িক মতবাদ, হিন্দু একটা সাম্প্রদায়িক মতবাদ। একইভাবে খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, জৈন, শিখ বা অন্যান্যরাও একেকটা সাম্প্রদায়িক মতবাদের ধারক ও বাহক।

ধর্ম ও মতবাদ এক নয়। ধর্ম হচ্ছে বস্তুর বৈশিষ্ট্য যেমন- জলের ধর্ম বয়ে চলা, আগুনের ধর্ম দাহ্য করা। অন্যদিকে মতবাদ হচ্ছে দীর্ঘদিনের প্রথা, সে প্রথা মনুষ্যসৃষ্ট, প্রকৃতি সৃষ্ট বা সামাজিকভাবে সৃষ্ট। পৃথিবীর সকল মানুষ যদি একই সাম্প্রদায়ভুক্ত হতো তাহলে কথা ছিলো না। যেহেতু অসংখ্য সাম্প্রদায়িক মতবাদ সৃষ্টি হয়েছে, একজন বিবেকবান মানুষ হিসেবে প্রথার কাঁথা গায়ে না দিয়ে নিজের বিবেচনাবোধ কাজে লাগানো অতি জরুরী।

মহাবিশ্বে এখনও পর্যন্ত জীবন ধারণের উপযোগী একমাত্র গ্রহ আমাদের এই পৃথিবী। যদিও বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে এই মহাবিশ্বে জীবন ধারণের উপযোগী আরও অনেক গ্রহ আছে এবং এর ব্যাপক অনুসন্ধান এখনো অব্যাহত।

মানবপ্রজাতি বেঁচে থাকা আর টিকে থাকার দুর্বার আকর্ষণে প্রতিনিয়ত ছুটে চলেছে উন্নতির শিখরে। পৃথিবীর অসংখ্য প্রাণীকূলের মাঝে মানুষ নিজের প্রজ্ঞা, বুদ্ধিমত্তা, আর ইন্দ্রিয় (প্রযুক্তি) গুণে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠজীব হয়েছে। মানুষ আধিপত্য করছে সমস্ত সৃষ্টিজগতের উপর। এত চমৎকার বায়ুমণ্ডলের এই পৃথিবীর প্রতি মানুষের অপরিসীম ভালোবাসা! মানুষ প্রাণ ভরে উপভোগ করে সৃষ্টির সৌন্দর্য আর অপার মহিমা। মানুষ ফুলের ঘ্রাণ নেয়, পাখির ডাক শোনে, মানুষ রাতজেগে আকাশের তারা গোনে। মানুষ সৃষ্টির সৌন্দর্য দেখে আর ভাবে এত অনুপম সৃষ্টির সৃষ্টিকর্তা কে? মানুষ মাত্রই চিন্তা করে আমার সৃষ্টিকর্তা কে? এমন কোনো মানুষ নেই যার মনে এই প্রশ্ন উদয় হয়নি। সৃষ্টিকর্তার সন্ধানে মানুষের যাত্রা এখনো অব্যাহত, সৃষ্টিকর্তার সন্ধানে তৈরি হয়েছে অসংখ্য সম্প্রদায়, ভিন্নভিন্ন গোষ্ঠী আর জাতি, জন্ম নিয়েছে অসংখ্য সাম্প্রদায়িক মতবাদ, এসব মতবাদকে আমরা ধর্ম বলে থাকি। যেমন- ইসলাম ধর্ম, হিন্দু ধর্ম, খ্রিস্টান ধর্ম।

এইযে এত ঈশ্বর, এত মতবাদ, এত ধর্ম, এত বিশ্বাস, মুসলিম বলছে হিন্দু কাফের, হিন্দু বলছে মুসলিম যবন। এক সম্প্রদায়ের লোক অন্য সম্প্রদায়ের লোককে দেখতে পারছে না, প্রত্যেকেই মনে করছে তার সম্প্রদায় ঠিক, হিন্দু ভাবছে আমার ভগবান সত্য, আমার বেদ অকাট্য, আমার পূজা আরাধ্য! মুসলিম ভাবছে আমার আল্লাহ সর্বশক্তিমান, আমার কোরআন শ্রেষ্ঠগ্রন্থ, আমার নামাজ-রোজা উত্তম উপাসনা।

প্রত্যেক সাম্প্রদায়িক মাতবাদীদের একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন, প্রত্যকে ধর্মীয়মত তাদের মতো করে সৃষ্টিকর্তার সন্ধান দিয়েছে। মুসলিমদের মতে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ, হিন্দুদের মতে স্রষ্টা ভগবান, খ্রিষ্টানদের স্রষ্টা গড, বিজ্ঞানীদের মতে সৃষ্টিকর্তা শক্তি, আত্মতাত্ত্বিকদের মতে সৃষ্টিকর্তা হচ্ছেন সাঁই, দার্শনিকদের মতে সৃষ্টিকর্তা প্রকৃতি।

কিছু বহুল প্রচলিত সাম্প্রদায়িক মতবাদ বা ধর্ম হলো- ১. ইসলাম ধর্ম, ২. খ্রিস্ট ধর্ম, ৩. ইহুদি ধর্ম, ৪. দ্রুজ ধর্ম, ৫. সামারিতান ধর্ম, ৬. মান্দাই ধর্ম, ৭. হিন্দু ধর্ম, ৮. বৌদ্ধ ধর্ম, ৯. জৈন ধর্ম, ১০. শিখ ধর্ম, ১১. শাক্ত ধর্ম, ১২. জরথুস্ত্র ধর্ম, ১৩. বাহাই ধর্ম, ১৪. ইয়াজিদি ধর্ম, ১৫. মাজদাক ধর্ম, ১৬. আল ই হক, ১৭. শিন্তো ধর্ম, ১৮. তাওবাদ ধর্ম, ১৯. জেন ধর্ম, ২০. হোয়া হাও, ২১. ক্যাও দাই।

প্রত্যেকেই সাম্প্রদায়িক মতবাদ নিজনিজ হাড়িতে চমৎকার ব্যঞ্জন রেঁধে রেখেছে, প্রত্যেকেই তার তার মতো নিজের সৃষ্টিকর্তার স্বপক্ষে দালিলিক প্রমাণ আর যুক্তি উপস্থাপন করছে, তাহলে এই অসংখ্য সৃষ্টিকর্তার ভিড়ে আমি আমার প্রকৃত সৃষ্টিকর্তাকে কিভাবে কোথায় খুঁজে পাবো? খুব ছোট মানবজীবন, দেখতে দেখতেই ফুরিয়ে যায়, একটা কচ্ছপ কয়েকশতাব্দী বাঁচে, সেখানে মানুষের গড় আয়ু এক শতাব্দীরও নিচে, অসংখ্য প্রশ্ন মনের মাঝে নিয়ে, উত্তর না জেনে, আত্মবিশ্বাসহীনতায় কেটে যায় ক্ষণিকের এই মানবজনম। মরার আগে আমরা জানতেও পারি না আমাদের এই পৃথিবীতে আগমনের উদ্দেশ্য, আমাদের মানবকর্ম কী, আমাদের প্রকৃত ধর্ম কী? অসংখ্য প্রশ্নের বেড়াজালে অনুসন্ধানী মনে, জ্ঞান দিয়ে বিচার করে একটা সিদ্ধান্তে আসা উচিৎ। একবিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞানের এই উৎকর্ষের যুগে সময় এসেছে প্রকৃত সৃষ্টিকর্তার সন্ধান করার, জেনে বুঝে সৃষ্টিকর্তার ভজন পরম আনন্দের।

এইযে এত ঈশ্বর, এত মতবাদ, এত ধর্ম, এত বিশ্বাস, মুসলিম বলছে হিন্দু কাফের, হিন্দু বলছে মুসলিম যবন। এক সম্প্রদায়ের লোক অন্য সম্প্রদায়ের লোককে দেখতে পারছে না, প্রত্যেকেই মনে করছে তার সম্প্রদায় ঠিক, হিন্দু ভাবছে আমার ভগবান সত্য, আমার বেদ অকাট্য, আমার পূজা আরাধ্য! মুসলিম ভাবছে আমার আল্লাহ সর্বশক্তিমান, আমার কোরআন শ্রেষ্ঠগ্রন্থ, আমার নামাজ-রোজা উত্তম উপাসনা।

আপনি যেমন আপনার সম্প্রদায়কে নিজের বিশ্বাসের জোরে শ্রেষ্ঠ ভাবতে পারেন, পৃথিবীর অন্য আর একজন মানুষ একই বিশ্বাসের জোরে তার মতবাদ বা সম্প্রদায়কে শ্রেষ্ঠ ভাবার অধিকার রাখে। আপনার যেমন বিশ্বাস করার অধিকার আছে, অন্যজনেরও অবিশ্বাস করার অধিকার আছে। কিছুতেই কোনদিন পৃথিবীর সকল মানুষ এক মতবাদের ছায়াতলে আসবে না। তারমানে মতবাদে মতবাদে এই বিভেদ চলতেই থাকবে। এর থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?

(চলবে…)
(কারও ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাত বা কটাক্ষ করা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়, ধর্ম, জাতপাত যার-যার; আত্মানুসন্ধান সবার)

Comments

comments

কালের লিখন

কালের লিখন

কবি, গীতিকার, পুঁথিকার, শিশু সাহিত্যিক, গল্পকার, গবেষক, সম্পাদক, সংকলক, শিল্প-সাহিত্য সমালোচক, আত্মতাত্ত্বিক দার্শনিক, লোকসাহিত্য ও লালন গবেষক। বহুমাত্রিক লেখক কালের লিখনের প্রকাশিত ও প্রকাশিতব্য গ্রন্থ সংখ্যা ৫০ এর অধিক।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি