“তোমায় নতুন করে পাব বলে” । আফরোজা সোমা

দুগ্গা! দুগ্গা! সিএনজির স্টার্ট জানি বন্ধ হয়ে না যায়, মা! মনে মনে এই কথা জপেছি। এতো রোম্যান্টিকতা এই সকালে বেশি হয়ে যাবে, মা! ভেজাবসনে চিকন ক’টি দুলিয়ে দুলিয়ে বাতাসের সাথে ফিসফিস একবার শুরু হয়ে গেলে আর বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া হবে না, মা! এরচে’ এই ভালো সিএনজির ভেতর। স্টার্টটা তুমি বন্ধ করো না, মা।

এইসব ভাবনা ঠাহর করে নিজেকে দেখে নিজেই অবাক মেনেছি! আজিব! এতো বৃষ্টি হচ্ছে। একটানা বৃষর্ণ। বৃষ্টিতে কাদা মেখে ঘরে ফিরছি। কাকভেজা হয়ে চশমার কাচে বড় বড় ফোটা জমে জগতকে দেখছি তুমুল মাতালের মতন ঘোলা। তবু, আমার বিরক্তি হচ্ছে না! হচ্ছে না! শাওনের বৃষ্টিতে আমি নিজেকে আবিস্কার করি।

ঢাকাবাসের জীবন শুরু হওয়ার পর থেকে তো বৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা আমার উপে গেছে! শুধু কি উপে যাওয়া! প্রেমের জায়গায় জন্ম নিয়েছে বিরক্তি, রাগ এবং ঘেন্না পর্যন্ত। এমনকি বৃষ্টি যারা ভালোবাসেন, যেমন রবীণ্দ্রনাথ যেমন আমার ছোটো বোন, তাদের প্রতি জন্মেছে রাজ্যের ক্ষোভ। মনে হতো, যত সব আদিখ্যেতা!

আর আজ কিনা বৃষ্টিবিরোধী আমিই জ্যামরুদ্ধ রাজপথে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়া নিয়েও গভীর মনে শুনছি সিএনজির ছাদে বৃষ্টির ঝিম ধরানো বাজনা! কী জানি! জীবনে কলিকাল এলো কিনা!

একদিকে নগরের বিরুদ্ধ স্রোত। আরদিকে বৃষ্টি-ফোঁটার তালে তালে নাচতে থাকা স্মরণের সবুজ শহর। দুই জগত একসঙ্গে একইসময়ে বয় সিএনজির ভেতর। যুক্তি না মেনে জাদুর মতন গায়েবী কায়দায় মফস্বল শহরের নদী, পুকুর, মাঠ, বৃষ্টিসমেত একটা সবুজ সময় ঝপাৎ করে আকঁরে ধরে পাগল প্রণয়ীর মতন।

সিএনজি চালককে মনে হচ্ছে বেশ খোশালাপী। কী জানি, হয়তো বৃষ্টির এই সকালে আমিই অধিক আন্তরিকতা মাখানো হাসি দিয়ে কথা শুরু করায় তারও অর্গল খুলে গেছে।

যেতে যেতে সে বলে: ইশ! আপা! কি যে বৃষ্টি শুরু হইলো! থামেও না। কমেও না। আর আজকে তো কালকের থেকে বেশি! সেই রাত থেইক্যা একই রকম বৃষ্টি।

বৃষ্টিতে পথচারীদের অনেকের প্যান্টের পা গুঁটিয়ে হাঁটু অব্দি তোলা। ছাতার ডাঁটি বেয়ে টপটপ করে পানি পড়তে-পড়তে ভিজে গেছে অফিসগামীর ইস্ত্রিভাঙা নীল শার্টের হাতা। মেরুনরঙা রেইনকোটে নিজেকে মুড়িয়ে এক তরুণি মেয়ে সবুজাভ রঙের রেইনকোটে ঢাকা আরোহীর গায়ে নিজেকে পেছন থেকে লেপ্টে রেখেছে সবুজ লতায় ফোটা পদ্মের মতন।

জ্যামে বসে থাকি। মানুষের মুখ দেখি। বিরক্ত মুখ। উদাসীন মুখ। প্রসন্ন মুখ। বিষন্ন মুখ। ক্লান্ত মুখ। নির্বিকার মুখ। আগ্রহী মুখ। অস্থির মুখ। সুস্থির মুখ। ঘুম থেকে ওঠা ফোলা ফোলা মুখ।

অভিব্যাক্তিতে রাঙা হয়ে যায় আমার সকাল। এসবের ফাঁকে চকিতে ঘড়িতে চেয়ে এক মন ভাবে: মাবুদ! ক্লাশের সময় যে বয়ে যায়।

আর আরেক মন ভাবে: যায় যদি কী আর করা। ডানা তো নাই। বসেই যদি থাকতে হয় টেনশন করে কী লাভ! এরচেয়ে মানুষের মুখ ভরা কত কথা লেখা তাই পড়া আনন্দময়।

খাপছাড়াভাবে চালক ডাকেন। আপা, আপনার দেশের বাড়ি কই? মুড ঠিক না থাকলে উত্তর সাদালাপী হতো না। কিন্তু বৃষ্টিস্নাত প্রসন্ন সকালে মৃদু হেসে বলি, কিশোরগঞ্জ। আপনার কই? পাবনা।

ব্যাস। ওইটুকুই। তারপরে যে যার মতন। জ্যামে সে বসে থাকে। হাতলে কনুই রেখে গালে সে ঠেকিয়ে রাখে কখনো ডান হাত কখনো বাম হাত।

রাস্তায় কোথাও গোঁড়ালি পানি। কোথাও গর্তের কারণে পানি হাঁটু ছুঁই-ছুঁই; রিকশার চাকা বরাবর অর্ধেক ডুবে আছে। এই গলি ওই গলি করে চালক মেইন রোডে উঠে আসে। আমি সিএনজির একদিকে পর্দা নামিয়ে আরেক দিকের পর্দা গুটিয়ে রাখি।

এমন দিনে প্লাস্টিক ঘেরা অন্ধকারে বসে থাকার কী মানে! গুঁটিয়ে রাখা পর্দার পাশ দিয়ে বৃষ্টির ছাঁট আসে। জামা ভিজে যায়। প্যান্টের ভেতর দিয়ে শীতল লাগতে থাকে। আমি সিএনজির ভেতরে ছাতা মেলে দিয়ে বৃষ্টির ছাঁট আটকাই।

ফর্সা রঙের স্বাস্থ্যভালো চালক বলে, বৃষ্টি আসে নাকি?

—হুমম।

—তাইলে পর্দা নামাইয়া দেন।

—না। অন্ধকার হইয়া যাইবো। এরচে’ ছাতা ভালো। আলো আসবে। বৃষ্টি আসবে না।

বৃষ্টির দিনগুলো কৈশোরে ছিল স্বাধীনতা আর ফুর্তির দিন। স্কুলে না যাবার কত যে বাহানা হতে পারে, বৃষ্টি না এলে তা জানাও হতো না বুঝি। বৃষ্টিতে ভেজার জন্য কত যে বাহানা তৈরি করা যেতে পারে ঝুম বৃষ্টি ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে না হলে জানাও হতো না তা।

এমনো হতো, সারাদিনমান বৃষ্টিতে ভিজে এইপাড়া ওইপাড়া, পুকুর-নদী-রাস্তা সবখানে দল বেঁধে ঘুরে দুপুরের খাবারের সময় হয়-হয় সময়ে যখন ঘরে ফিরেছি তখন ঠোঁট নীল; চোখ লাল; মাথা ভার; হাতের আঙুলের চামড়া ভিজে শুকিয়ে কুঁচকে আছে; ঠান্ডায় দাঁতে-দাঁত বাড়ি খাচ্ছে।

এই অবস্থায় আমার মা আড় চোখে আমাকে দেখে। আমার মায়ের আড় চোখের দিকে আমিও আড় চোখে চেয়ে মেপে নেয়ার চেষ্টা করি তার রাগ কতটা জমেছে? সে কি এখনি পিটানি দেবে? না-কি রাতে সব নিরালা হলে পরে ধরবে আসামীর মতন?

এইসব মানসিক খেলার মধ্যেই আমার ত্রানকর্তা দাদু বলবে: ও ছেরি! তুই তো ঠান্ডায় কাপতাছস! আয়! আয়! ঘরও আয়!কাপড় বদলা। আর আমার মাকে বলবে: ও বউ! ধুর! ধুর! এম্নে চাইয়ো না। ছেরিরে আগে ঘরও আইতে দেও।

এইভাবে কত যে সকাল দুপুরে গরিয়েছে! কত যে দপুর হয়েছে বিকেল। এমনকি কত যে বিকেল দল বেঁধে আমরা নিয়ে গেছি সন্ধ্যের দিকে তার কোনো লেখা-জোঁকা নেই। আর বৃষ্টির মধ্যে মূল সড়কে আমরা জমাতাম অকারণ হুল্লোড়। দৌঁড়াতাম। নাচতাম; কতই না রকম ছিল সেই নাচের অঙ্গভঙ্গি!

কচুপাতার গা কেন বৃষ্টিতে ভিজে না এই জন্য কচু পাতার গায়ে আঙুল দিয়ে ডলে ডলে সেটার গা-টা কেমন চামড়া ওঠা-ওঠা করে দিতাম। দিয়ে দেখতাম তার গায়েও বৃষ্টি ধরে। আমাদের মুখে হাসি ফুটতো। বিজয়ীর। কিন্তু জানতাম বাড়ি ফিরলে আম্মি পিটাবে। পিটানোর পরোয়া কে আর করে! তাও আবার সাক্ষাৎ দুগ্গা হয়ে ঘরে যদি থাকে দয়াময়ী দাদী! তাই, বৃষ্টি মানে মাতাল হয়ে নিজেকেই ঘোলা দেখা বৃষ্টির ভেতর।

সেইসব দিন সহসাই আজ ফিরে আসে সিএনজির ভেতর। এই বর্ষা আমার জন্য পরিবর্তনের বার্তা এনেছে বটে! ঢাকাবাসের জীবন শুরুর পর যুগের অধিক পেরিয়ে গেছে; বৃষ্টিকে আমি বিরক্তি বৈ ভালোবাসিনি। কিন্তু একি বদল দেখি আজ! পামরের মনেও দেখি গান বেজে ওঠে!

এইসব ভাবতে ভাবতে ক্লাশের সময় পেরিয়ে যায়! তাও ভালো লাগে। যাক। আমার চোখের সামনে ভেসে উঠে মাস্টার ইউডার মুখ। ঢুলুঢুলু মায়াবী চোখে মাস্টার ইউডা সিনেমার পর্দা ভেদ করে সরাসরি আমার চোখের দিকে চেয়ে বলেন: লেট গো অফ এভরিথিং ইউ ফিয়ার টু লুস।

নিজেকে ছাড়া কী আর আছে হারাবার। ইউডার কথা মতন, তাই হয়তো তাকেই দিয়েছিলাম নিজেকে খুঁজে না পাবার শর্ত ছাড়াই হারিয়ে ফেলার ছাড়পত্র।

জামা-জুতো-মাথা-ছাতা ভিজিয়ে কাদামাখা পায়ে রুক্ষ তিরিক্ষি মেজাজে বৃষ্টির চৌদ্দ পুরুষ উদ্ধার করতে করতে বজরায় ভাসতে ভাসতে পদ্মায় বৃষ্টি দেখতে বেরিয়ে পরা খামখেয়ালী রবীন্দনাথকে কতইনা অগুন্তি দিন করেছি শাপ-শাপান্ত! কিন্তু কই! কোথায় গেলো যুগেরো অধিক সময় ধরে আমার ভেতরে বেড়ে ওঠা ঘৃনার আগুন! বুকের ভেতর তো দেখি মায়াবী হয়ে ঝরছে শ্রাবণের ঘোরলাগা বর্ষণ!

সিএনজির ভেতরে বসে আছি বর্ষণসিক্ত। টিস্যু দিয়ে কিছুক্ষণ পর পর মুছি নিজের আসন। জোর বাতাস এলে পর্দা গলে বৃষ্টি ঢুকে ভিজিয়ে দিয়ে যায়। বৃষ্টির দিকে চেয়ে চালক বলে: দেখছেন আপা! এতো বৃষ্টি! থামেও না। কমেও না।

কথা বলার সময় একটা ছন্দ-ছন্দ ভাব করে উনি বলেন। আর হাতটাও নাড়েন ওইভাবে, তাল মিলিয়ে।

এরপর আবার সে নীরব। কিছুক্ষণ পর নীরবতা ভেঙে সেই আবার বিরক্ত গলায় বলে: আপা! বলেন তো, এই বৃষ্টিতে কাজ করন যায়! সকাল থেইকা গাড়িটা পানি খাইতে-খাইতে কোন সময় যে স্টার্টটা বন্ধ হইয়া যাইবো! আল্লাহই জানে! বন্ধ হইলে আর ঝামেলার শেষ নাই। ধুর! আসমানটা ফুটা হইয়া গেলো নাকি!

আমি সশব্দে হেসে উঠি। চালকের ভেতরে নগরবন্দী পুরনো আমি যেনো বলছে কথা। তাকে বলি: থাক। বিরক্ত হইয়া আর কী করবেন! বৃষ্টি তো থামবো না।

উনি বলে: তা কথা ঠিক। বলে ম্লান হাসে।

চারিপাশে তাকিয়ে দেখি, নগরের পথগুলো বৃষ্টিতে মাতাল মানুষের মতন নিজের দায়িত্ব ভুলে নদী হয়ে যায়। জায়গায় জায়গায় পানি। কোনো কোনো গাড়ি পথে জমা পানির উপর দিয়ে প্রবল বেগে ঝড় তুলে দুই দিকের পানি ঝরণাধারার মতন উছলে দিয়ে বিদ্যুত বেগে চলে যায়। তার চলায় কার গা ভিজলো, কার তেতো সকাল হয়ে উঠলো আরো তেতো এতো কিছু দেখার অবসর তার নেই।

আমার আছে। সিএনজির ভেতরে বসে আমি মানুষের অভিব্যক্তি দেখি। দেখতে দেখতে মনে হতে থাকে, হতে পারে “বেতন পঁচিশ টাকা/ সদাগরি আপিসের কণিষ্ঠ কেরাণী”। কিন্তু বাসনায় “আকবর বাদশার সঙ্গে/ হরিপদ কেরানির কোনো ভেদ নেই।”

কুড়িল ওভার পাসে ওঠে চালক সজোরে বলেন: হায়! হায়! সব তো অন্ধকার হইয়া গেছে! আপা দেখছেন! দেখেন চাইয়া!

ওভারপাসের ওপর থেকে দূরে যতদূর চোখ যায় বৃষ্টির মায়াবী সুতোয় আবছা হয়ে থাকা ঢাকার আবছায়া দৃশ্যের দিকে ইশারা করে উনি পুনরায় বিস্ময়ে বলেন: হায়! হায়! আপা! সব তো অন্ধকার হইয়া গেলো!

আমি হাসি। হাসির শব্দ বৃষ্টির শব্দকে ছাপিয়ে যায়। যেমন যুগেরো অধিক কালের বিরক্তিকে ছাপিয়ে গেছে এই সকাল।                                                                                                                                                                                                                                                                  

Comments

comments

আফরোজা সোমা

আফরোজা সোমা

জন্ম ২রা অক্টোবর, ১৯৮৪, কিশোরগঞ্জ। পেশায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। পাশাপাশি ফ্রিল্যান্স ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট হিসেবে কাজ করেন বিবিসি বাংলা রেডিও-তে। প্রকাশিত কবিতার বই: অন্ধঘড়ি (২০১০,কথা প্রকাশ), হারমোনিকা (২০১৪, সংবেদ), ডাহুক (২০১৫, ভাষা প্রকাশ)।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি