নিশুতি রাত, মৃত শিশুরা ও একদল পেঁচা । রাসেল রাজু

বারান্দায় যে সামান্য জায়গাটুকু আছে সেটুকু ঘিরে একটি দেয়াল। অন্ধকার তাতেই ঝেঁকে বসেছে এই একচিলতে বারান্দায়। একদা বিকেলে আদিবার একবছরের ছেলে অনিন্দ্য হামাগুড়ি দিয়ে খেলতে খেলতে এই বারান্দায় এসে চিৎকার করে কেঁদে উঠেছিল। মায়ের মনও ঠিক তেমনি আঁতকে উঠেছিল অজানা শঙ্কায়। পারলে ছেলের কাছে উড়াল দেয় তখনই। অকুস্থলে গিয়ে দেখল এই জায়গাটি মশাদের অভয়ারণ্য যেন। আর দ্বিতীয়বার না ভেবেই  মালিককে বলে একজন মিস্ত্রি আনিয়ে দেয়াল ভেঙ্গে ওখানে গ্রিল লাগানোর ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। এই বারান্দা ভর্তি এখন গন্ধরাজ, গেন্দা আর সূর্যমুখী ফুলের টব। চারাগুলো অবশ্য এখনো একদম ছোট। মশা নেই আর। বোধকরি চলে গেছে অন্যকোন বদ্ধ জায়গায়। আদিবার স্বামী বাছেদ লন্ডন প্রবাসী। আদিবাকে নেয়ার জন্য আপিল করেছে অনেকদিন হয়। আদিবা আর ওর শাশুড়ি আইইএলটিএস লাইফস্কিল টেস্টের জন্য ভর্তি হয়েছে একটি কোচিং-এ। সেখানে যায় সপ্তাহে চারদিন। নয়াসড়কে তিন রুমের একটি ফ্ল্যাট নিয়েছে ওরা।

পাশের বিল্ডিংয়ের একটি ছেলে সুযোগ পেলেই ওদের ব্যালকনি থেকে এদিকে ধ্যানরত হয়ে থাকে। আদিবা তখন গোসল সেরে ভেজা কাপড় শুকোতে দিতে ছাদে আসে। অবশ্য ভেজা চুল আর সিক্ত দেহে আদিবাকে বেশ লাস্যময় লাগে তখন। একবিংশতি সে। এই বয়সে একমাত্র ছেলের মা। বিয়ের মাত্র দু’বছর হলো। এর মধ্যে দুইমাস সে স্বামীসঙ্গ বা সুখ যা-ই বলা যায় তা পেয়েছে। বিয়ের পরেও তাই শরীরের বাঁধন আলগা হয়নি ওর। এখন দেশে থাকা শাশুড়ি আর একমাত্র ছেলেকে নিয়ে সিলেট থাকে। শ্বশুর মোখলেসুর রাহমান গত হয়েছে বছর চারেক হয়। তার আর ছেলেপুলে নেই। বাছেদই তার সবেধন নীলমণি ছিল।

একদিন সন্ধ্যায় বহুকষ্টেও একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাচ্ছিল না আদিবার শাশুড়ি। আদিবাকে ডাকল। সে তখন পালংকে শুয়ে ছেলেকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছে। আসতেই বললেন, How do you get to your school? অউ প্রশ্নর উত্তর কিতা বেটি? মাস্টরে কইয়া দিছইন অগুর উত্তর জানতে অইবো আইয়েল্টস দিতে অইলে। কিন্তু আমি কুন্তা পাররাম না।

এইচএসসি পাশের পরপরই বিয়ে হয় আদিবার। পড়াশোনাতেও যতি তখনই। খুব যে ইংরেজি পারে তা নয়। তবুও যথাসাধ্য উত্তর দেয়ার জন্য সে চেষ্টা করল। বলল, I go to school by bus.

অয় বেটি, অউত্ত অইছে। কিন্তু কিতার লাগি যে আমারে ইতা দেওয়ার কতা কইলো বাছেদে। আমি বুড়া মানুষ, নিজর জামাইর ফুতাত থাকিয়া আল্লার নাম লইয়া লইয়া মরতাম। না হে ইতা মানতে রাজিই নায়। আমারে লইয়া যাইতেই অইবো লন্ডন। হিনো গিয়া কিতা আমি ইংলিশ মাত্তে পারমু? তৃপ্তির সঙ্গে খেদোক্তি করে ফেলে সব মা-ই সন্তুষ্টির ভিন্ন প্রকাশ ঘটায়।

আদিবা জবাব দিতে পারেনি এই প্রশ্নের। তার কাছে লন্ডন যেতে পারা মানে একটা বিরাট কিছু করে ফেলার অহংবোধ। সে বুঝতেই পারেনা অনিন্দ্যের দাদু কেন এমনটা করে। স্বামীকেও এটা নিয়ে বেশ ক’বার খোঁচা দিয়েছে সে। বাছেদ লোকটা অবশ্য খুব মাতৃভক্ত। সে রেগে গিয়েছিল এটা শুনে। আদিবাও তখন কথা ঘুরিয়ে নিয়েছিল। স্বামীকে ভয় পায় সে।

দেয়াল গুড়িয়ে দিতেই নতুন সমস্যার শুরু হবে। জানত আদিবা। এমনিতেই নানা কারণে তার ছাদে যাওয়া বন্ধই বলা চলে। বাসার মালিকের ছেলেটি সারাদিন বাসায় হোমথিয়েটারে ফুল ভলিউমে গান শুনে, মুভি দেখে, সুযোগে মাতব্বরি করে। তবে সন্ধ্যায় বাইক চালিয়ে জিমে যায়। ফেরে মধ্যরাতে। এই সময়টাতেই যা একটু নিষ্কৃতি। সবাই যেন এই সময়ের প্রতীক্ষাতেই থাকে। আর যেটা সে করে সেটা বেশ অসহ্য ঠেকে আদিবার। অনিন্দ্যের জন্য এটা সেটা নিয়ে যখনতখন ছুটে আসে ওদের ফ্ল্যাটে। পাঁচতলা এপার্টমেণ্টের নীচতলাতে থাকে মালিক। আর বাদবাকি ভাড়া। চারতলার সি ব্লকে থাকে আদিবারা। এমনকি পাঁচতলা পেরিয়ে আদিবা ছাদে গেলেই কোত্থেকে যে ছোকড়া এসে হাজির হয়! এই রহস্য ভেদে ব্যর্থ আদিবা। হয়তো ছেলেটা সারাক্ষণ পাখির চোখ করে রাখে ছাদটাকে। যেই আদিবা সেখানে পা ফেলে অমনি সে হাজির। ছেলেদের দেখতে ওর যে খারাপ লাগে তা নয়। কিন্তু তারচেয়ে বেশি ভয় লাগে। লোকনিন্দার ভয়, ইজ্জত-আভ্রুর ভয়। আর যে ভয় সেটা সব পুরুষকেই সে করে। এদের চোখে যেন একটা আগুন জ্বলে ওকে দেখলেই। সে আগুন জীবনে অনেকবার দেখেছে আদিবা। তবে সবচেয়ে বেশি সময় দেখেছে স্বামী বাছেদের চোখেই। যেদিন অচেনা-অজানা একটি ঘরে প্রথম এসেছিল ঠিক সেদিনই। বাছেদের চোখের আগুন দেখে শিউরে উঠেছিল। এরপরে কীভাবে কীভাবে যেন নিজেকে মানিয়ে নেয়। বিয়ের পরদিন ও খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটে। তা দেখে পরস্পর গা-টেপাটেপি করে হাসে বয়োজ্যেষ্ঠ রমণীরা। আদিবা এই হাসির অর্থ এখন জানে। সব মরদ যে একজন চাষা আর সব রমণীই যে একখণ্ড জমি- এ সত্য সে মেনে নিয়েছে। শুরুতে অনভ্যস্ত ছিল। প্রথম কর্ষণে তাই সমস্ত শরীর ব্যথায় কুঁজো হয়ে গিয়েছিল। এরপর শত চাষেও আর তার কিছুই হয়না। মানিয়ে নিতে তার কোন সমস্যা নেই। ভরণপোষণ করে, সময়মত খাজনা দেয় যে চাষা – জমিতে লাঙ্গলচষার অধিকার যে একচেটিয়াভাবে তারই। এই বাস্তবতা সে মেনে নিয়েছে। ফসল হিসেবে অনিন্দ্যও তাকে আর সব খেদ ভুলিয়ে দিয়েছে হয়ত। মেয়েরা এমনই। সমাজ তাদের পরনির্ভররূপে গড়ে তোলছে। তারা সেই স্রোতেই গা ভাসিয়ে দিতে জানে। সে স্রোত তাদের প্রতিষ্ঠিত হবার তাগিদ দিক। স্রোতের আনুকূল্য কাজে লাগিয়ে তারা সেটাই করবে।

বারান্দার দেয়াল ভেঙ্গে ফেলার পর প্রথম গোসল সেরে বারান্দায় বেরোয় আদিবা। ছাদে যায় না আজ সে। দেখতে পায়, পাশের বিল্ডিং হতে ধ্যানমগ্নতার ভাণ করে তার দিকেই চেয়ে আছে ওই যুবক। এতদিন পেরিয়ে ছেলেটিকে দেখার পর সেও যেন চোখের পলক ফেলতে পারছে না এমন অবস্থা। কিছুটা সময় সেও সম্মোহিতের মত চেয়ে রয়। সম্বিৎ ফিরে পেতেই লজ্জায় তার মাথা যেন কেটে পড়তে লাগল। কিন্তু বুকের মধ্যে কেমন ঢিপঢিপ করতে থাকল। যেন আজ সে নেশায় চূর হয়ে আছে। কোনওমতেই ছেলেটির দিকে তাকানো থেকে নিজেকে সংহত করতে পারেনা সে। যেই আবার ওই বারান্দাতে তাকায়, সেখানে তখন আর কোন ফ্ল্যাট নেই! কোন যুবকও নেই! নিমেষেই উধাও হয়ে গেছে সব। আদিবার কাছে কোনও অত্যাশ্চর্য ঘটনা হতে পারেনা এটি। সে কেবল তৃপ্ত মনে ধরে নেয় এমনটা হয়েছে ওর সতীত্বের বলে। মনে মনে তাওবা-আস্তাগফার পড়ে। চার-রাকায়াত নফল নামাজ মানত করে। তাৎক্ষণিক তা আদায় করবার জন্য অধীর হয়ে উঠে। ঘটনাটাও এখানেই চাপা পড়ে থাকে। আর কেউ জানেনা।

বিকেলে অনিন্দ্য বারান্দায় যায় ওর দাদুর সাথে। ফুলের টবে তখন অন্য সব ফুলের চারার সাথে গন্ধরাজের চারাও বেড়ে উঠছে। আরও কিছু ফুলের চারা নার্সারি থেকে কিনে এনেছে বউ-শাশুড়ি মিলে। সামনেই ফাগুনমাস। বসন্তের আগমনবার্তা হয়ে মনোরম এক আবেশ ছড়িয়েছে বারান্দাজুড়ে। পাতাগুলো যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। মেয়ে মাত্রই ফুল, সুঘ্রাণ আর সৌন্দর্যের একনিষ্ঠ পূজারী। বারান্দা পরের বছরই ফুলে ফুলে ভরে উঠবে। আদিবা এটা ভাবতে ভাবতে নিজের মধ্যেই মশগুল হয়ে যায়। ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় নিজের দিকে আনমনে তাকিয়ে থাকে। গুণগুণ করে গান গায়। মনে তখন তার রঙ ধরে। অস্পষ্টভাবে ভেসে ওঠে বাছেদের চেহারা, লোমশ-চওড়া বুক আর গোঁফ। সমস্ত শরীর ছটফট করে তখন তার। অদম্য পিপাসায় হাসফাস করে সে। হাতের কাছে যা পায় তাই বুকে চেপে ধরে। নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসে। তখন তার ফুল ভাল লাগে। প্রজাপতি ভাল লাগে। ভাল লাগে শান্ত-নীরব বারান্দা। আর এই ভালোলাগা থেকেই বারান্দায় একচিলতে ফুলের বাগান। অনিন্দ্যও অনেকটা সময় এখানেই কাটায়। আর বাসার কলিংবেল বাজলেই ইদানিং অনিন্দ্যই পড়ি পড়ি করে এক অদ্ভুতুড়ে ভঙ্গিতে দৌড়াবার মত করে হামাগুড়ি দিয়ে ছুটে যায়। নাগালের বাইরে থাকা নব ঘুরিয়ে দরোজা খুলে দিতে চেষ্টা করে। আদিবা আর ওর শাশুড়ি বেশ আনন্দ পায় এতে। কিছুকাল অতিবাহিত করে আয়নাতে মুখ দেখে। এরপর গোসল সেরে জোহরের নামাজে বসে। বারদুয়েক কলিংবেল বাজে। অনিন্দ্য পড়িমরি ছুটে আসে। ওর দাদু কিছুটা অসুস্থ্যবোধ করায় আসতে পারেনা। বারান্দাতেই থেকে যায়।

অভ্যাগত লোকটি ড্রয়িংরুমে এসে অনিন্দ্যের সাথে হাসিগানখেলায় মত্ত। আদিবা তখন সালাম ফিরিয়েছে কেবল। অচেনা কণ্ঠস্বর শোনে ড্রয়িংরুমে এসে দেখল সেই লোকটি এসেছে তাদের ঘরে।

আফনে! দরজা খুলছইন কে, আম্মায়?

জিওয়, আমি। অনিন্দ্যরে নেওয়াত আইছি। হে-ই দরজা খুলিয়া দিছে।

কিন্তু তার ত এখনও হাদানির বয়স অইছে না। আর হে কিলা দরজা খুলিয়া দিতো? নাগাল পাইবো কিলান, কইন দেখি!

হুরুতাইনতে অনেকতা করতে পারইন। আফনে জানইন না হয়তো। আমরা এবার একটু নিয়ম বদলাইছি। বাচ্চাইনতর বয়স একবছর অইগেলেই হাদানির সময় অইযায়।

অনিন্দ্যর দাদু বসার ঘরে এসে একটু জিরিয়ে নেয় ততক্ষণে। অল্পেই হাঁপিয়ে উঠে তার শরীর। সব শোনে বলে, যে সময় আইছেরে বাবা, একটু সময় আগানিয়ে ভালা অইছে। হুরুতারে না হাদাইলে পুরা নষ্ট অইযাইবা।

লোকটা হাসিমুখে বলল, তাইলে আমরা কাইল আইয়া তারে হাদানির লাগি লইয়া যাইমু।

আদিবা বলল, আর কিতা কিতা লাগব লগে?

লোকটা বলল, আমি ঠিক জানিনা। মাইকও এনাউন্স করা অইবোনে। আর আমরার এখন থাকি বেশি সময় লাগব। টেখাও বেশি লাগব।

আদিবা আর তার শাশুড়ি হাসিমুখেই মেনে নেয় বাস্তবতাটুকু। দুজনেরই পরিকল্পনা ছিল গ্রামের মুরব্বি আর আত্মীয়স্বজনদের দাওয়াত করবে। ছোটখাটো একটা অনুষ্ঠানের মত করে অনিন্দ্যকে পোষ মানাতে পাঠিয়ে দেবে। বেশি টাকা দিয়ে যদি অনিন্দ্য ভাল শিখতে পারে তবে গেলই নাহয় কিছু বেশি টাকা। আদিবার শাশুড়িই মুখ খুলে, আইচ্ছারে বাবা, আমরারে দুইদিন সময় দিতে পারবায় নি? চাইছলাম ছোটখাটো একটা অনুষ্ঠান করিয়া নাতিগুতারে হাদানিত দিতাম। এলাকার আর দশজনও খুশি অইলা। আর দোয়াও করলা। আল্লায় আমার নাতিরে হায়াত দিতা।

আইচ্ছা চাচী, ঠিক আছে। আফনারা দুইদিন সময় নিয়াউ হক্কলতা করইন। আমি তাইলে দুইদিন পরে আইমু অনিন্দ্যরে নেওয়াত। আর সতর্ক থাকইন যেন আফনারা। ই সময় শয়তানে লগ ধরে খুব। কুমন্ত্রণা দেয়।

ইতোমধ্যে কাজের মেয়ে তাদের জন্য চা-নাশতা নিয়ে আসে। চা-টুকু পান করে সুপারি মুখে পুরেই লোকটা বিদায় হয়।

বিকেলেই সবাইকে জানিয়ে দেয়া হয় অনিন্দ্যর পোষ মানানো পর্ব শুরু হবে দুদিন পর। সকলের দাওয়াত। বাছেদও ইমোতে কল দিয়ে এ ব্যাপারে নিজের উচ্ছ্বাসের কথা জানায়। আর সন্ধ্যা থেকেই এলাকার প্রশিক্ষণ ইশকুল প্রাঙ্গণ থেকে মাইকের আওয়াজ ভেসে আসতে শুরু করে। একসাথে এইবার আটান্ন বাচ্চার পোষ মানানো শুরু হবে। মহল্লায় উৎসব – উৎসব ভাব। সবাই বেজায় খুশি। প্রত্যেক বছর তারা এই দিনটির প্রতীক্ষায় থাকে। মেলাটেলা বসবে। সেসবের আয়োজনও অল্পবিস্তর শুরু হয়ে যায়।

এদিকে রাতের অন্ধকারে একটি পেঁচা একটি ইঁদুর দেখতে পেয়ে খুশিতে মিউ মিউ করে ডেকে ওঠে। ঝাঁপিয়ে পড়ে ওটাকে ধরে আনে। সেই মিউ মিউ আওয়াজ মহল্লায় ছড়িয়ে পড়ে। সকলেই এবার বাতি জ্বালিয়ে গ্যাসের চুলোয় বেড়ি রাখে। স্বামীরা স্ত্রী-সহবাসে লিপ্ত হয় এর দিন পাঁচেক পরে। বংশপরম্পরাগত শিক্ষাকে জারি রাখতে হলে শিশু দরকার খুব। দরকার ওদের পোষ মানানো। সেটাকেই জারি রাখতে ক্রমেই স্ত্রীরা স্বামীসঙ্গ সুখে মেতে ওঠে। বাছেদও দেশে আসে ইতোমধ্যে। হিমাগার থেকে মরদেহ কবরে প্রেরিত হয়। আদিবাও আবার সুখস্পর্শ লাভে প্রীত হয়। স্বামীর চোখের আগুন তার চোখে আগুন জ্বালে এবার। মহল্লার সকলেই জানে এর ঠিক দশমাস দশদিন পর বাচ্চা আসবে আরও আটান্নটি। এদেরও আরও বছরখানেক পরে পোষ মানানোর ইশকুলে পাঠাতে হবে। সেই অপেক্ষাতে সকলেই অধীর আগ্রহে দিন অতিবাহিত করতে থাকে। দিনও এগিয়ে চলছে যেন। আর বেশি দূর নয় সেইদিন। সেই আশায় বসে থাকে ওরা।

আদিবা বারান্দায় যাওয়ার সময় পায় না আর। বসে থেকে ভাবতে থাকে। তাদের বাসায় পেঁচা ডেকেছে আজ রাতে। সে জানে লক্ষণ ভাল নয়। পেঁচা ডাকলেই মৃত্যু। আজ বাসার কেউ মারা যাবে নিশ্চয়। এইতো সিলেট আসার বছর পাঁচেক আগের এক রাত। তখন সে বাবার ঘরে। উঠোনে পেঁচা ডাক দিল মিউ মিউ সুরে। তার মা সাথে সাথে শুনতে পেরে ভাতের ডেক ধরবার বেড়িটা চুলোতে দিয়ে দিল। এতে বিপদ কেটে যায়। কেটেও গিয়েছিল বিপদ। আদিবার স্পষ্ট মনে পড়ে। রাতে ঘুমোতে যাবার পূর্বে মা-মেয়ে কালেমা পড়ে নেয় পাছে ঘুমের মধ্যে মৃত্যু চেপে ধরে। ঘুম আসতে চায় না। আদিবা ছটফট করতে থাকে। এভাবে অনেকক্ষণ চলে যায়। বেড়ি চুলোতে থাকে। আদিবার ঘুম আসে। পেঁচা ডেকে উঠে আবারও। কী একটা দুঃস্বপ্ন দেখে সে জেগে ওঠে শেষ রাতে। পাশের চা বাগান হতে তখন তিনটা ঘণ্টাধ্বনি ভেসে আসে। কিছুক্ষণ পরে পাশের রুশনিদের বাড়ি থেকে হাউমাউ কান্নার আওয়াজ ভেসে আসে। ছ্যাঁত করে উঠে আদিবার বুক। কিন্তু তার মা ঘুমের মধ্যেই বিড়বিড় করে, অয় অয়। রুশনির বাপ মরছইন। আদিবা ভয়ে ভয়ে অপেক্ষায় থাকে রাত পোহাবার। সে জানে রুশনির বাবা মারা গেছেন। কিভাবে জানে সেটা সে জানেনা। শুধু এইটুকু সে জানে যে সে জানে। তার গায়ে কাটা বিঁধে রাতের নীরবতায়। কাটা বিঁধে কিছু একটা শব্দ করে ছুটে গেলে। রাতজাগা পাখিদের ডাকে, পোকাদের ডাকে তার গায়ে সুড়সুড় করে ওঠে। সে ভয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে। মা আবারও বলে ওঠে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ। কিন্তু জেগে উঠে না। ভয়ে গলা শুকিয়ে আসে আদিবার। চিৎকার করতে চায়। পারে না। ওর বুকে কে যেন পাথরচাপা দিয়ে রেখেছে। নড়তে চায়। তাও পারে না। বহুকষ্টে একটু নিঃশ্বাস শুধু নিতে পারে। রাত পোহাতে চায় না কিছুতেই। সহসা তার মনে পড়ে চার ক্বুল পড়ে শরীরে ফুঁ দিলে ভূতপ্রেত সব দূরে সরে যায়। বহুকষ্টে সে মনে মনে চার ক্বুল পড়ে শরীরে ফুঁ দেয়। তার বিছানা কেঁপে কেঁপে ওঠে। জানালায় কেউ যেন লাঠি দিয়ে আঘাত করে। তারপরে উঠোনের আমগাছের একটি ডাল মট মট করে সহসাই ভেঙ্গে পড়ে। আর তখনই তার বুক হতে পাথরটা নেমে যায়। সে নিঃশ্বাস নিতে পারে। বুঝতে পারে এইমাত্র হুমায় ধরেছিল তাকে। ভাগ্যিস সে চার ক্বুল পড়ে শরীরে ফুঁ দিয়েছিল। এদের যাওয়ার সময় এইটাই নিয়ম যে ডালপালা কিছু একটা ভেঙ্গে তবেই যায়। দূরের মসজিদ থেকে ফজরের আজান ভেসে আসে। স্বস্তিদায়ক সে আজানের ধ্বনি তাকে আপ্লুত করে। গভীর মমতায় সে আজান শুনতে থাকে।

আদিবার কিছু একটা মনে পড়ে। তার মা’র মুখে শুনেছে। চাঁদে একটি বটগাছ আছে। সেটাতে অসংখ্য পাতায় প্রত্যেক জীবিত মানুষের নাম লিপিবদ্ধ। এর নিচে একজন ফেরেশতা বসে থাকেন। যখনই বটগাছ থেকে কোন পাতা ঝরে পড়ে তা আজরাইল ফেরেশতার হাতে দেয়া হয়। পাতায় লিখা নাম দেখে দেখে আজরাইল তাদের জান কবচ করতে ছুটে যান সাথে সাথে। এদিনই এবং নির্ধারিত সেই মুহূর্তেই তাদের মৃত্যু ঘটে। এটাই মানুষের ভাগ্য। এটাই নিয়ম। আর যাদের জন্ম হয়, জন্মের সাথে সাথে বটগাছে নতুন কুঁড়ি গজায়। আদিবা ওসব ভাবে। ভাবতে ভাবতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ে। সকালে বেশ দেরী করে ঘুম ভাঙ্গতেই আদিবার চাচাতো বোন নিপা রুশনির বাবার মৃত্যুর খবর দেয়। মসজিদের মাইকে এনাউন্স ভেসে আসে একটু পরে। ‘একটি শুক সম্বাদ, একটি শুক সম্বাদ। বড়দামাই নিবাসী জনাব মুহাম্মদ মুবশ্বির আলি সায়েব। আজ রাত দুই গটিকার সময় উনার নিজ বাসবুবনে ইন্তেকাল ফরমাইয়াছেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাই হি রাজিউন। মরহুমের নামাজে জানাজা, পরবর্তীতে জানানু হইবে…’ এরকম তিনবার বলার পরে নীরবতা গ্রাস করে আদিবার চারপাশ। একটু শিউরে ওঠে যেন সে। তার হৃৎপিন্ডে যেন কেউ ঢোল বাজাতে থাকে। আদিবার মনে পড়ে আরেক কথা। সে নিপাকে বলেছিল, রুশনির মায় চুলাত বেড়ি রাখছইন না। এর লাগি তাইর বাফ মরছইন।

নিপা এতে সায় জানিয়েছিল। আশপাশের সবাইই সায় জানিয়েছিল। রুশনির মাও এটা নিয়ে হাহাকার করতে করতে বিলাপ করে। রুশনিও। কিন্তু রাতে হুমায় ধরার কথা সে বলতে পারে না। বলতে ভয় লাগে ওর। পাছে হুমা ক্ষেপে যায়।

আদিবার ধ্যান ভাঙ্গতেই দৌড়ে গিয়ে গ্যাসের চূলা ধরায়। আগুনের মধ্যে বেড়ি রাখে। আগুনের তাপে বেড়িটি লাল হয়ে আসে। একটা প্রফুল্ল ভাব চলে আসে তার মধ্যে। স্বস্তিতে যেন সতেজতা ফিরে পায় সে। শাশুড়িকে গিয়ে সে-কথা জানায়।

আম্মা, ফেসায় ডাকছিল। আমি ওভেনও বেড়ি রাখছি। আল্লায় বিফদ-আফদ তনে বাছাইতা।

নফল নামাজ পড়িয়া দুয়া করো বেটি আল্লার কাছে। আল্লা বাছানেওয়ালা। শাশুড়ি বলেন।

আদিবা তখনই অজু করে চাররাকায়াত নফল নামাজ সেরে দোয়া করতে থাকে। অনিন্দ্য তার কাঁধে চড়ে বসে। সে কিছুই বলে না। দীর্ঘদিনের জন্য ছেলে চোখের আড়াল হবে। ফেরেশতা ছাওয়াল। এসবের কিছুই বোঝে না সে। মায়ের বুকে ছুটে গিয়ে একহাতে একটি স্তন চেপে ধরে আর অন্যটি মুখে পুরে স্তন্যপান করতে থাকে। আদিবা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। তার মুখে কথা আসে না। সে স্বামীর কথা ভাবে। তার হায়াত চেয়ে প্রার্থনা করে। নিজের জন্য, সন্তানের জন্য, মা-বাবার জন্য, শাশুড়ির জন্য প্রার্থনা করে।

পরদিন খুব ভোরে মালিকের বাসা থেকে কান্নার আওয়াজ ভেসে আসে। সেখানে ছুটে যায় আদিবা আর তার শাশুড়ি। গিয়ে দেখে রক্তাক্ত দেহে মেঝেতে পড়ে আছে মালিকের ওই ছেলে। মাথাটা থেঁতলে গেছে কীভাবে যেন। লোকজনকে আদিবা আর তার শাশুড়ি বেড়ি চুলোয় দেয়ার রীতির কথা জানায়। কিন্তু কেউই পেঁচার ডাক শুনেছে বলে জানায় না। আদিবা এসব হুমার কাজ বলেই ধরে নেয়। তার বুকে চেপে বসেছিল। এর সম্ভবত মাথায়। তাই মাথাটা এভাবে থেঁতলানো। তবু এটা সে কাউকে বলে না। হুমায় ধরার কথা কাউকে বলতে নেই। এতে হুমা ক্ষেপে যায় খুব। আর হুমা কারোর উপর ক্ষেপলে আর রক্ষা নেই। তাই পারতপক্ষে কেউ হুমার নাম নেয় না। কেবল একবার, শিমু নামের এক মেয়ে আদিবাদের সাথে পড়তো, সে-ই প্রকাশ্যে হুমার নাম নিয়েছিল। এর তিনদিন পর ওর আর কোন খোঁজ পায়নি কেউ। এখনো সে নিখোঁজ। না, সে মরে পঁচে গেছে। আদিবা কল্পনায় পঁচন ধরা শিমুর লাশ দেখে। মনে মনে চার ক্বুল পড়ে শরীরে ফুঁ দিয়ে নেয়। তাছাড়া মরার চল্লিশতম দিন পর্যন্ত তাবিজটাবিজ সব নষ্ট হয়ে যায় মরা বাড়ি গেলে। এটাও ওর ভাবনায় থাকে। বাসায় ফিরে মৌলভীর কাছ থেকে ফের তাবিজ আনাতে হবে। মনে মনে এই পরিকল্পনা সে করে। সহসা শুনে জয়তুন বিবি বলে, টাউনও ফেসা নাই। বেড়ি চুলাত দিতা কের লাগি?

হাসিবা ঠোট মেলায় বৃদ্ধার সাথে। কথাটি কানে যায় মালিকের বউয়ের। সে কাঁদে না আর। বলে, আমি ফেচার ডাক শুনছিলাম। বেড়ি আইল্যাত দিতে যাইতাম দেখি ঢেরি লাগাইল ফেসায় আইয়া বেড়িরে ঘুইর‍্যা বই থাকছইন। আমি নেওয়াত লাগছি, দেখি উড়াল দি গেছেগি ফাইক্কা হকলটি। কিন্তু বেড়ি নাই!

মালিকের ছেলের মৃত্যু যে অমোঘ সেটা মেনে নেয় সবাই। উড়তে উড়তে একটি মাছি এসে বসে মরদেহের গায়ে। এক বৃদ্ধা বলে উঠে, মুর্দার গাত মাছি বইতে দিওনারে। ফাখা দি বাতাস করো। একটা মাছি বইলে মুর্দার উফরে পাহাড় চাপাইয়া দেওয়ার কষ্ট পায় মুর্দায়।

ঘরে ফিরে আদিবার মন খারাপ করে। স্বামীর আদর-সোহাগের জন্য তার মনের কোথাও যেন একটা হাহাকার জেগে উঠেছে। ইমোতে গিয়ে বাসেদকে রিং করবে ভাবে। কিন্তু সময়ের ব্যবধান তার সে ইচ্ছেয় পানি ঢেলে দেয়। অনিন্দ্য হঠাৎ কেঁদে ওঠে। চমকে ওঠে আদিবা। ছেলেটা কাঁদে কেন? এবার হেসে ফেলে আদিবা। মনে পড়ে ওর শাশুড়ির সাথে একদিনের আলাপের কথা।

আম্মা, অনিন্দ্যয় মাঝে মাঝে ইলা হাসে কেনে ঘুমর মাঝে? আবার মাঝে মাঝে দেখি কান্দেও।

ইতা জরার মায় কান্দাইন আর হাসাইন, বেটি।

ইয়াল্লা! আমি ভুলি গেছি তানর কথা।

তার মনে পড়ে ঘুমের সময় বাচ্চাদের হাসিকান্না করায় জরার মা। অনিন্দ্য তাই কান্না করে। হাসে। আদিবা এবার আরেকটু যেন নিজেকে নিজের কাছাকাছি দাঁড় করায়। সব মরদই তার দিকে কেমন লোভাতুর তাকিয়ে থাকে। হাসি পায় তার। ড্রেসিং টেবিলে বসতে যাবে তখনই মনে পড়ে আর মাত্র একদিন পরেই ছেলেটা চলে যাবে পোষ মানানোর ইশকুলে! তার নিজের পোষ মানানোর দিনগুলোর কোন স্মৃতি মনে পড়ে না। বস্তুত কারোরই মনে পড়ে না। এটাই নিয়ম। সে জানে এই সমাজে জন্ম নিলে এই সমাজের নিয়মকানুন, লোকাচার-লোকরীতি, সংস্কারাদি আত্মস্থ করে নেওয়াই নিয়ম। অনিন্দ্য ত এই সমাজেরই একজন। প্রথম দায়ভার হিসেবে দাদী আর মা মিলে অনিন্দ্যকে যৎসামান্য যা পারে শিখিয়েছে। কিন্তু এছাড়া আরও অনেককিছুই ত রয়ে গেছে। সেসব এখন ওই ইশকুলে শিখানো হবে। আদিবা খুশীই হয় বেশ। এই প্রথম ওদের পরিবার থেকে কেউ পোষ মানানো ইশকুলে যাচ্ছে। খুব দ্রুত সব নিয়ম আত্মস্থ করে নিতে পারলে মিলবে সিটি কর্পোরেশন প্রদত্ত স্বর্ণপদক। আদিবা সেই স্বর্ণপদকের জন্য এই ক’দিন ভিখারিদের গেট থেকে খালি হাতে ফেরত যেতে দেয়নি। সবার কাছেই সে ছেলে প্রসঙ্গে নানা কথা বলে এটা সেটা দিয়ে তাদের কাছে দোয়া চেয়ে নেয়।

ওদিকে বিকেলের দিকে একটা ব্যাপার ঘটে গেল হুট করে। আদিবা ছেলের পোশাকাদি সব গুছিয়ে রাখার জন্য জড়ো করছে। এমন সময় ওর শাশুড়ি কোত্থেকে ছুটে এলেন।

রশির ব্যবস্থা করছ নি বেটি?

আদিবা প্রথমটায় বোঝতে পারেনি। বলল, জ্বী?

রশির ব্যবস্থা কিতা করছ বেটি? অনিন্দ্যর নু রশি লাগবো।

রশি লাগেনি আম্মা?

হুরুতাইনতর ভিতরে বড়ো বড়ো শয়তান থাকইন। এরা হাত্তির লাখান শক্তিশালী। রশিদি হুরুতারে বান্ধা ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না।

ইতা আফনে জানলা কিলা?

আইজ নু মাকিত কইল বেটি।

কিন্তু ব্যাপারটি যখন ঘটে তখন কারোরই সেদিকে খেয়াল ছিল না। না আদিবার, না তার শাশুড়ির। দোকান হতে কাজের মেয়েকে দিয়ে রশি আনিয়েই কী একটা কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে বউ-শাশুড়ি দুজনেই। অনিন্দ্য ছুটে আসে। রশিটা নিজের হাতে ফাঁস আকারে লাগিয়ে নেয়। সহসা মাকে ডেকে ওঠে, আম্মু। ওউ দেখো। আমি রশিদি হাত বান্ধিলিছি। আমারে হাদাও অখন। আমারে আর ইশকুলো দেওয়ার কাজ নাই। বলতে বলতে সে স্বাভাবিক মানুষের মত হেঁটে এগোতে থাকে।

তুমি ইলা মাতো কিলা, গো বাজান? আর তুমি হাঁটা শিখিলায় কিলা?

আমি পারি মাত্তে আম্মু। এমনে মাত্তাম না, হাঁটতামও না। কিন্তু এখন আমারে ইশকুলও পাঠাইরায় দেখিয়া বুঝলাম আমার মাত্তে অইবো এখন। আমি ইশকুলও যাইতাম না। আমি তুমারে ছাড়া থাকতে পারতাম নায়।

শাশুড়ি ঈশারায় থামতে বলে। আদিবা জবাব দিতে গিয়েও তাই থেমে যায়। সে থামতেই ওকে কানে কানে বলে দেয়, শয়তান অনিন্দ্যর কাঁন্ধও সওয়ার অইছে বেটি।

আদিবা চার ক্বুল পড়ে বুকে ফুঁ দিয়ে নেয়। অনিন্দ্যের গায়েও ফুঁ দিতে যাবে এমন সময় অনিন্দ্য সরে যায়।

দেখছনি বেটি কিলা সরিয়া গেছে? ইতা শয়তানে ধরার লক্ষণ। হুরুতাইন আইজকাইল ওউ শয়তানর ফাল্লাত পড়িয়া নষ্ট অইযিরা। তুমি আমারে থুড়া পড়া তেল দেও।

ইতাদি কিতা করতা, আম্মা?

মাইর দিলেই পড়া তেলর গুণে মারমারাইয়া ইশকুলও যাইবো হে।

কিন্তু দুখ পাইবো নু, আম্মা!

ইতা হে বুঝত উ নায়। সব শয়তানর উফ্রেদি যাইবো বেটি। আর বেতও ত হুজুরর পড়া। তেলও। ইতায় দুখ লাগে না।

আমি ভুলি গেছলাম, আম্মা।

ইতা মনে রাখতে অইবো, বেটি। যাও অনিন্দ্যরে ধরিয়া আনো।

আদিবা অনিন্দ্যকে আনতে যায়। কিন্তু কোন ঘরেই ওকে পায় না। খুব অবাক হয়। কই গেল আমার ফুয়া? মনে মনে ভাবতে থাকে। তারপর বারান্দায় গিয়ে ওকে পেয়ে যায়। ওখানে বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে সে। কিন্তু আদিবা শয়তানের কারসাজি সম্বন্ধে ইতোমধ্যেই ওয়াকিবহাল। সে এসব মায়াকান্নাকে ধর্তব্যের মধ্যে নেয় না। ছেলেকে একদম টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যায় শাশুড়ির শুবার ঘরে।

আম্মা আনছি।

ইতোমধ্যে বৃদ্ধা ঘুমিয়ে পড়েছিল। আদিবার কথায় জেগে উঠে।

ধরিয়া রাখিও বেটি। হাত তনে ছুটিয়া যাতে ভাগতে না পারে। আমি বেত আনি।

বলেই তিনি বেত নিয়ে এগিয়ে এসেই পটাপট দু’তিন ঘা বসিয়ে দিলেন। কিন্তু অনিন্দ্য অবাক চেয়ে রইলো তার পানে। সে যেন কিছুই বুঝতেছে না। এর কিছুক্ষণ পরেই মাথা ঘুরে পড়ে গেল মাটিতে। শাশুড়ি বললেন, বলা বিদায় অইছে বেটি। এখন ফুয়ারে ঘরো নেওগি, যাও।

আদিবা খুশি মনে ছেলেকে পাঁজকোলা করে ঘরে নিয়ে যায়। শুইয়ে দিয়ে মাথায় হাত বুলাতে থাকে।

অনিন্দ্য’র জ্ঞান ফেরে কখন কেউ জানেনা। আদিবা ওর পাশেই ঘুমিয়ে পড়েছে। হঠাৎ অনিন্দ্য উঠে বসে যেন তাকে কেউ ডাকছে। সহসা ভেসে আসে একজনের ফিসফিসানি।

হুনো, বাচ্চা, তুমি চাইও ইশকুলও যাইবায়। ইশকুলও গেলেই তুমি আর আগের লাখান থাকতায় না।

এই কথা শুনে অনিন্দ্য শুয়ে পড়ে আবার। ঘরের ভিতরে তাকিয়ে দেখে একটি পাখি চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। কিন্তু ও নড়তে পারে না। ওর বুকে যেন কিছু একটা চেপে বসা। মিউ মিউ করে ডেকে ওঠে পাখিটি। আদিবার ঘুম ভাঙ্গে এক পলকের জন্য। যেন সে মিউ মিউ ডাক শুনতে পায়। একটু নড়ে ওঠে। ফের ঘুমিয়ে পড়ে। ঘরের ভিতরে ততক্ষণে অনেকগুলো পেঁচা এসে হাজির হয়। বিদ্যুৎ চলে যায়। পেঁচাদের দীর্ঘনিঃশ্বাস ভেসে আসে। অনিন্দ্য চোখ বন্ধ করতে পারে না। বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে একটি পেঁচার চোখের দিকে। সেই চোখ হতে জলধারা এসে ওর চোখ ভিজিয়ে দেয়। একসময় পেঁচাগুলো উড়ে চলে যায়। অনিন্দ্য তখন হয়তো ঘুমিয়ে পড়ে। তবু চোখ খোলা থেকে যায় তার।

পরদিন ফজরে পাড়ার প্রতিটি বাসা থেকে আর্তনাদ ভেসে আসে একসাথে। আদিবার ঘুম ভাঙ্গে। দেখে আদিবের হাত-পা শক্ত হয়ে গেছে। চোখদুটো খোলা। কিছুই বুঝতে পারে না সে। অনিন্দ্যর দাদু তড়িঘড়ি ছুটে আসেন আদিবার ঘরে। ঘরের দরোজা খোলাই ছিল। বাতি জ্বালিয়েই দেখেন আদিবা শূন্যচোখে কোথায় যেন ডুবে আছে।

কিতা অইছে বেটি? মাইনষে কান্দইন কেনে অখন?

আদিবা শুধু বলে, অনিন্দ্য!

শাশুড়ি অনিন্দ্য’র কপালে হাত দেন। সেখানে তখন মৃত্যুশীতলতা এসে ভর করেছে। অনিন্দ্য’র চোখ বন্ধ করতে যাবেন কিন্তু চোখ আর বন্ধ করতে পারেন না। আদিবা পাথরের ন্যায় স্তব্ধ হয়ে বাচ্চার পাশে শুয়ে থাকে। মেজেতে বিশালাকায় এক ব্যাগ রাখা। ওটাতে অনিন্দ্যর প্রয়োজনীয় সমস্ত পোশাকাদি। আজ বিকেলেই অনিন্দ্য পোষ মানানো ইশকুলে যেত। মেহমানরা আসার কথা সকালেই। সহসা মাইকে ভেসে আসে একটি শব্দ। তারপর একটি কণ্ঠস্বরে শোকার্ত ঘোষণা, ‘একটি দুঃসংবাদ। এলাকার আটান্ন বাচ্চাদের সকলেই আজ মৃত। পোষ মানানো ইশকুল এবারকার মত স্থগিত। সকলেই মৃতদের আত্মার শান্তির জন্য প্রার্থনা করুন।’

* * *

সন্ধ্যায় মালিকের বউ বেড়াতে আসে আদিবার ঘরে। অনিন্দ্য নেই তখন ঘরে। ওর লাশ তখনো বসার ঘরের মেঝেতে সাদা কাপড়ে প্যাঁচ দিয়ে রাখা। হিমাগারে রাখা হবে লাশ। বাছেদ দেশে ফিরলে তবেই দাফন। আদিবার বাবা-মা, ভাই আর নিপা মরদেহের পাশে বসে কোরআন তিলাওয়াত করে চলে। বাকি সাতান্ন বাচ্চাকে ইতোমধ্যে কবর দেয়া হয়েছে। মালিকের স্ত্রী মরদেহ হতে কাফন সরিয়ে একবার তাকায়। গায়ে কোন পোশাক নেই। বুকের মধ্যে খুব কালো একটা রেখা দেখতে পায় মহিলা। ভয়ে বিহ্বল হয়ে পড়ে। তার চেহারা ফ্যাকাসে হয়ে যায়। বলে, মুর্দার বুকর উফরেদি অনেক চাপ গেছিল। মহল্লার সব বাচ্চাইনতর অউ একই অবস্থা দেখিয়া আইলাম।

কেউ কোন কথা বলে না। সবাই যেন রাতের কথা ভেবে ভেবে সব জেনে গেছে। সহসা নীরবতা ভেঙ্গে নিপা বলে, আম্মায় স্বপ্নে দেখছইন পেঁচায় অনিন্দ্যরে চাইরদিক তনে বেরিয়া বই থাকছইন। আর মিউ মিউ করি ডাকরা। কথা শেষ করে ডুকরে কেঁদে ওঠে। ইশ! কিতার লাগি যে মড়ার লাখান ঘুমাইলাম! আদিবার শাশুড়ি এই কথা বলে কাঁদতে থাকে।

রাতের বেলা অন্ধকার ঝেঁকে বসে এই পাড়ায়। কেউ মরে গেলে গ্রামে আগুন জ্বলে না চুলোয়। শোকপালনের এটাই নিয়ম। শহরেও এবার তাই হয়। তবু কেউ কারো বাড়িতে খাবার পাঠায় না। হৃদিতা নামক মহল্লার সবচেয়ে সুন্দর মেয়েটিও এবার কালো হয়ে যায়। কালোরাও কালো। সবাই মিশে যায় রাত্রির গায়ে। কেউ কাউকে দেখতে পায় না এমন অন্ধকার রাত। শুধু অনিন্দ্যর মরদেহ সিওমেকের হিমাগারে হিমায়িত হতে হতে ফুলতে থাকে। অবশ্য এসব কেউ জানেনা। আদিবা উতলা হয়ে কোরআন নিয়ে বসে এবার। বাতি না জ্বালিয়েই সে হরফ দেখে দেখে পড়ে যায়-

ফাবি আইয়্যি আলা ইরাব্বিকুমা তুকাযযিবান।

অতএব, তোমার রবের কোন কোন নিয়ামতকে তুমি অস্বীকার করবে? সে কিছুই অস্বীকার বা স্বীকার করে না। পূর্ববৎ তিলাওয়াত করে যায়।

যাওয়াতা আফনান। ফাবি আইয়্যি আলা ইরাব্বিকুমা তুকাযযিবান।

সে অনর্গল কোরআন পড়ে যেতে থাকে। কিছুই যেন সে অস্বীকার করে না। সব মেনে নেয় এবার।

এদিকে রাতের অন্ধকারে একটি পেঁচা একটি ইঁদুর দেখতে পেয়ে খুশিতে মিউ মিউ করে ডেকে ওঠে। ঝাঁপিয়ে পড়ে ওটাকে ধরে আনে। সেই মিউ মিউ আওয়াজ মহল্লায় ছড়িয়ে পড়ে। সকলেই এবার বাতি জ্বালিয়ে গ্যাসের চুলোয় বেড়ি রাখে। স্বামীরা স্ত্রী-সহবাসে লিপ্ত হয় এর দিন পাঁচেক পরে। বংশপরম্পরাগত শিক্ষাকে জারি রাখতে হলে শিশু দরকার খুব। দরকার ওদের পোষ মানানো। সেটাকেই জারি রাখতে ক্রমেই স্ত্রীরা স্বামীসঙ্গ সুখে মেতে ওঠে। বাছেদও দেশে আসে ইতোমধ্যে। হিমাগার থেকে মরদেহ কবরে প্রেরিত হয়। আদিবাও আবার সুখস্পর্শ লাভে প্রীত হয়। স্বামীর চোখের আগুন তার চোখে আগুন জ্বালে এবার। মহল্লার সকলেই জানে এর ঠিক দশমাস দশদিন পর বাচ্চা আসবে আরও আটান্নটি। এদেরও আরও বছরখানেক পরে পোষ মানানোর ইশকুলে পাঠাতে হবে। সেই অপেক্ষাতে সকলেই অধীর আগ্রহে দিন অতিবাহিত করতে থাকে। দিনও এগিয়ে চলছে যেন। আর বেশি দূর নয় সেইদিন। সেই আশায় বসে থাকে ওরা। খায়, ঘুমায়, জীবিকার্জন করে। প্রস্রাব করে, পায়খানা করে। স্নান করে। অফিসে যায়। রমণ করে। ঝগড়াফ্যাঁসাদে লিপ্ত হয়। যুবক-যুবতীরা প্রেম করার কথা ভেবে আকুল হয়। গৃহিণীরা পেঁচার ডাক শুনলেই বেড়ি দেয় গ্যাসের চুলোয়। যে পেঁচার ডাক শুনেনা অথবা শুনেও চুলোয় বেড়ি দেয় না তার ঘরে মৃত্যু হানা দেয়। হুমা কারো বুকে, কারো পীঠে, কারোবা মাথায় কিংবা ঘাড়ে চেপে ধরে। কেউ কেউ চার ক্বুল পড়ে বুকে ফুঁ দে। যারা দেয় না তারা মারা পড়তে থাকে। এভাবেই দিন কাটে তাদের পরের বছরের প্রত্যাশায়।

 

Comments

comments

রাসেল রাজু

রাসেল রাজু

শাবপ্রবি থেকে সদ্যই পোস্টগ্র‍্যাজুয়েশন শেষ করলেন ইংরেজি বিভাগ থেকে। লেখালেখি ব্যাপারটা প্যাশন থেকে। গল্প আর কবিতা লেখারই চেষ্টা করেন। অনুবাদ করেন মাঝে মধ্যে। সাহিত্য বিষয়ক পড়তে বেশি পছন্দ। জন্ম ১৯৯৩ সালের ৭ ডিসেম্বরে।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: , ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি