গল্পঃ শামসুর রাহমানের মৃত্যু অথবা ব্যর্থ প্রেমগুলো । হাসান আহমদ

শামসুর রাহমানে

তখন আমি একটা দারুণ চ্যালেঞ্জিং প্রেমে সফল হতে-হতে প্রায় সফলই হয়ে যাচ্ছিলাম।

তো সে সময় কবি শামসুর রাহমান যে মারা যাবেন সেটা কেই-বা জানত? রিকশায় বসে এক হাতে মোবাইল ফোন কানে চেপে ধরে প্রেম-সম্ভব সেই হবু প্রেমিকার সাথে কথা বলছিলাম আর আরেক হাতে টসটসা দুইটা জাম্বুরা ভরতি পলিথিনের ব্যাগ ধরে জনৈক ‘স্যোশিও ইকোনমিস্ট’ পদাধিকারী নিকটাত্মীয় বড় ভাইয়ের বাসায় যাচ্চ্ছিলাম। তা ফোনে কথা বলতে বলতে ফিসফিস করে [ গৃহ গোয়েন্দাদের হাতে ধৃত হবার আশঙ্কায় আমার সাথে দরজা বন্ধ করে তিনি ফিসফিস করে কথা বলতেন। এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে দরজা বন্ধ থাকা অবস্থায় কাঁথা মুড়ি দিয়েও তাঁকে ফিসফিস করে কথা বলতে হতো।] উনি বললেন যে, ‘কুতায় যাইতেছেন আপ্নে?’ বললাম যে, ‘দেশের বাড়ির বড় একজন ভাই কয়েক মাস হলো এসেছেন নতুন পোস্টিং পাইয়া। ভাবিরে লইয়া সরকারি কোয়ার্টারে উঠছেন। দেখতে যাইতেছি।’ উনি বললেন যে, ‘খালি হাতে যাইতেছেন? ভাবির লাইগ্যা কিছু লইয়া যাইতাছেন না?’ ‘হ্যাঁ হ্যাঁ’, বললাম আমি, ‘ভাবির জন্য জাম্বুরা কিনছি, এক্কেবারে টসটসা।’ ‘তা ভাবির জন্য টসটসা জাম্বুরা কেন? ঘটনা কি?’ আমি কিছুটা থতমত খেলাম। আসলে ভাবির জন্য আমি জাম্বুরা কিনি নাই। কিনেছি ভাবির সেইরকম ও সেইটাইপের মাথা আউলা করা কফি রঙের সিল্কি চুলের অধিকারিণী সুন্দরী বইনটির জন্য। মানে, আমার স্যোশিও ইকোনমিস্ট পদাধিকারী নিকটাত্মীয় বড় ভাইয়ের শ্যালিকার জন্য! তাই মিথ্যে করে বললাম, ‘ভাবি প্র্যাগন্যান্ট আছেন কীনা! এসময় এসব খাবার খুবই কার্যকরী।’ বোঝা গেল যে, এমনতরো কথায় যারপরনাই তিনি খুবই খুশি হলেন। বললেন, ‘উলি বাবা লে, উনি কত কি বোঝেন! কত কী জানেন! তা এতকিছু শেখা হলো কীভাবে?’

আসলে ব্যাপার হচ্ছে গিয়ে আপনার, দুই দিন আগে ইকোনমিস্ট বড়ভাই তার শ্যালিকারে সাথে নিয়ে বাজার থেকে ফেরার পথে আমার সঙ্গে ফরচুনেটলি দেখা হয়ে গেলে এই বলে আফসোস করলেন যে, ‘কি বালের শহরে আসলাম দেখো, বাজারের কোথাও জাম্বুরা পাওয়া যাচ্ছেনা। আমার একমাত্র শালী দুলাভাইয়ের কাছে জাম্বুরা খাওয়ার আবদার করল, অথচ আমি খাওয়াইতে পার্লাম না, এইডা কোন কথা হইল কও?’ ভাই তাঁর মনের দুঃখ শেষ করার সাথে সাথে ভাইয়ের শ্যালিকা আহ্লাদি মেয়েবাবুদের মত দুই হাত দুই ঠ্যাঙ দোলাতে দোলাতে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল, ‘আমি জাম্বুলা খাব। আমি জাম্বুলা খাব। আমাকে জাম্বুলা এনে দাও জিজু’।

বলাই বাহুল্য, জাম্বুরা খাওয়ার জন্য ভাইয়ের শ্যালিকার এভাবে ফুপিয়ে কান্না করা আমি একদম সইতে পারি নি। তাই বিশ্ব সংসার তন্ন তন্ন করে একশো আটটি…. স্যরি, দুইটি জাম্বুরা নিয়ে দুইদিন পরেই ভাইয়ের বাসায় হাজির হই।

স্বভাবতই দৃশ্যটা আমার ভাল লাগেনি। সিঁড়ি বারান্দা ডানপাশে রেখে দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকতেই বামপাশের বসার ঘরে অতিথিদেরকে আড্ডা দিতে দেখলাম। সেখানে ইকোনমিস্ট ভাইও আছেন। ভেতরের দিকে এগুতেই দেখলাম ভাবি এগিয়ে আসছেন। তিনি খুবই ব্যস্ত। অন্তঃপুর থেকে মেয়েদের কলকাকলি ভেসে আসছে। আমার হাত ধরে টানতে টানতে বললেন, ‘আরে তাড়াতাড়ি আসো ল্যাওরার দ্যাওড়া, ফটুসেশন তো শেষ হইয়া গেল।’ বলে আমাকে নিয়ে ভাবি দ্রুত ভেতরের কক্ষে প্রবেশ করলেন। সেখানে তার সুন্দরী বোন, মাথা আউলা করা কফি রঙের চুলের অধিকারিণী জনৈক সুদর্শন ও সুপুরুষ যুবকের বাহুবল্লভা হয়ে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে । আরো কয়েকজন অচেনা সুন্দরী তাদেরকে ঘিরে হাস্য ও কৌতুকের সঙ্গে মুহুর্মুহু ক্যামেরায় ক্লিক করে চলেছে।

সেই সন্ধ্যায় ভাইয়ের শ্যালিকার হাতে শুকনো মরিচ পোড়া দিয়ে রসালো জাম্বুরা খাওয়ার অভিজ্ঞতা বিবাহ পূর্ব জাম্বুরা খাওয়ার ঘটনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে মজাদার এবং চরম ঝাল ঝাল এবং চরম এক্সাইটিং ছিল। এক কথায়, সে অভিজ্ঞতা ছিল তুলনাহীন।

তো, ভাইয়ের শ্যালিকাকে আবারো এরকম টসটসা জাম্বুরা খাওয়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে সেদিনের মতো বের হয়ে আসি। গেট দিয়ে বের হওয়ার সময় পেছন থেকে সিঁড়ি বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভাইয়ের শ্যালিকা মহোদয়া ডেকে বললেন, ‘জাম্বুরা আনলে সাথে কয়টা নাগা মরিচও নিয়া আইসেন কিন্তু।’

আমিও চিৎকার করে বললাম, ‘হ্যাঁ, কাইলই আইতাছি বিয়াইন সাব।’

‘মিস করবেন না। কাল আপনার জন্য সারপ্রাইজ আছে। তাড়াতাড়ি আইসেন।’

মোবাইল ও আমার সম্ভাব্য প্রেমিকার কথা সেদিনের মতো ভুলেই গেলাম। ঘরে এসে পকেট থেকে মোবাইল বের করে দেখি যে আমার নকিয়া এগারশো দশের চার্জ নিঃশেষিত হয়ে মৃত হয়ে আছে। আমি বলতেই পারবো না। চার্জে লাগাতেই স্যোশিও ইকোনমিস্ট ভাইয়ার মোবাইল থেকে তাঁর সপ্রতিভ শ্যালিকা ফোন করে বললেন যে, ‘কবি সাহেব [ আমি যে তখন দুয়েক লাইন কবিতা লিখে থাকি এটা জাম্বুরা খেতে খেতে তিনি আমার বাক-প্রতিভায় প্রথমত আন্দাজ করে পরে নিশ্চিত হয়ে নিয়েছিলেন।] আপ্নাদের বড় কবি শামসুর রাহমান আজ ইন্তেকাল করেছেন। আপনি চলে যাওয়ার পর খবরে দেখলাম।’ কবির মৃত্যু সংবাদে আমি মর্মাহত ও শোকসন্তপ্ত হয়ে দুঃখ প্রকাশ করে বললাম যে, ‘অনেক বড় মাপের কবি ছিলেন তিনি। শুধুমাত্র প্রেমের কবিতাগুলোর জন্যই তিনি নোবেল পুরস্কার পেতে পারতেন।’ আমি সুন্দরীর অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে কবি সম্পর্কে অতিরঞ্জিত তথ্য দিয়ে তার ওপর প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করি।

‘তাইলেতো ওনার প্রেমের কবিতা শুনতে হয়, ভাইয়া! বলেন দেখি একটা, শুনি।’

কবির মৃত্যু সংবাদে কিছুটা ব্যথিত হলেও সুন্দরীকে প্রেমের কবিতা শোনানোর এমন সুযোগ হাত ছাড়া করবার মত বেরসিক লোক মোটেও আমি নই। দেয়ালের সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করে আবৃত্তি করতে লাগলাম…

“তুমি হে সুন্দরীতমা নীলিমার দিকে তাকিয়ে বলতেই পারো 
‘এই আকাশ আমার’ 
কিন্তু নীল আকাশ কোনো উত্তর দেবেনা। 
সন্ধ্যেবেলা ক্যামেলিয়া হাতে নিয়ে বলতেই পারো, 
‘ফুল তুই আমার’ 
তবু ফুল থাকবে নীরব নিজের সৌরভে আচ্ছন্ন হয়ে। 
জ্যোত্স্না লুটিয়ে পড়লে তোমার ঘরে, 
তোমার বলার অধিকার আছে, ‘এ জ্যোত্স্না আমার’ 
কিন্তু চাঁদিনী থাকবে নিরুত্তর। 
মানুষ আমি, আমার চোখে চোখ রেখে 
যদি বলো, ‘তুমি একান্ত আমার’, কী করে থাকবো নির্বাক ?

তারায় তারায় রটিয়ে দেবো, ‘আমি তোমার, তুমি আমার’।”

‘অহহো! বহুত বহুত! আচ্ছা আচ্ছা্‌!’ হাসতে হাসতে একেবারে গলে গলে ঢলে পড়ল সে। মনে হচ্ছিল তখনো তার মুখের সেই ঝাল ঝাল ভাবটা যেন রয়ে গেছে, এমন ভাবে মোবাইলে শব্দ করে ফু দিতে দিতে লাজুকলতার মতো বলল, ‘নাগা মরিচ বেশি কইরা আনবেন কিন্তু ভাইয়া!’

আমি মনে মনে বললাম, ‘নাগা মরিচের সুগন্ধ ও ঝালের বন্যায় তোমাকে ভাসিয়ে দেব সুন্দরী।’

মোবাইল চার্জে লাগিয়ে শামসুর রাহমানের মৃত্যু সংবাদ শোনার জন্য আমি টেলিভিশনের সামনে গিয়ে বসি। কবির শ্যামলীর বাসায় শোক সন্তপ্ত মানুষের ঢল। কেউ টেলিভিশনে সাক্ষাত্কার দিচ্ছিল। কেউ বলছিল কবির জীবন ও কর্ম সম্পর্কে। কেউ কবির সঙ্গে তাদের ব্যাক্তিগত স্মৃতিগুলো চারন করছিল। টেলিভিশন দেখতে দেখতে জাম্বুরা খাওয়ার প্রভাবে কিনা কে জানে, রাতের খাবার না খেয়েই রিমোটটি বুকে চেপে একসময় সোফাতে ঘুমিয়ে পড়লাম। রাতে স্বপ্ন দেখলাম, আমার প্রেম-সম্ভব হবু প্রেমিকাটি বৈদ্যুতিক সংযোগ সম্পন্ন একটা প্রমাণ সাইজের ড্রিল মেশিন আমার কানের ফুটোর মধ্যে চেপে ধরে চিৎকার করে বলতেছেন, ‘সারাদিন ধইর‍্যা কল দিতাছি শুনস নাই ক্যান হারামির বাচ্চা? তোর কোন ঢ্যামনারে জাম্বুরা খাওয়াইতে গেছিলি, ক’? আমি বললাম যে, ‘হ্যালো, হ্যালো, হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি এখন শুনতে পাচ্ছি। ড্রিল মেশিন্টা এবার খুলে ফেলো প্লিজ।’ ‘খুলবোনা!’ সে ড্রিল মেশিনটা আরো জোরে চেপে ধরল। ‘অনেক কষ্ট কইরা ড্রিল মেশিনে ফ্লেক্সিলোড ঢুকাইছি।’ চিৎকার করে বলল, ‘তোমারে বলতে হবে। জবাব দাও।’ ততক্ষনে ড্রিল মেশিনটা আমার অন্য কান দিয়ে বেরিয়ে গেছে। সেই অবস্থাতেই আমি বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, ‘আমি কারো জন্য জাম্বুরা নিয়ে যাইনি, বিশ্বাস করো। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। ড্রিল মেশিনটা খোলো।’ সে এক টানে কান থেকে ড্রিল মেশিনটি খুলে পেছন থেকে লাত্থি মেরে আমাকে নিচে ফেলে দিল। আমি আতঙ্কে চিৎকার করে উঠলাম। এবার সে আগের চেয়ে আরো ভয়ংকর রুপ ধারন করে ড্রিলটি আমার পশ্চাদ্দেশে তাক করে চিৎকার করে বলল, ‘এইটা তোর এইদিক দিয়া ঢুকায়া দেব হারামজাদা।’ বলেই সে ড্রিলটা আমার পশ্চাদ্দেশে জোরে চেপে ধরল। আমি জীবন বাঁচানোর জন্য সর্বশক্তি দিয়ে উঠে পালাতে চেষ্টা করি। কিন্তু পারিনা। প্রানপণ চিৎকার করতে চেষ্টা করি। কিন্তু পারিনা। পশ্চাদ্দেশ থেকে ড্রিল মেশিনটি আলগা করতে চাই। কিন্তু পারিনা। ড্রিল মেশিনের দানবীয় রকমের উচ্চঃশব্দের আড়ালে হারিয়ে যায় আমার চিৎকারহীনতা, আমার শক্তিহীনতা ও অক্ষমতা।

সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রেম-সম্ভব হবু প্রেমিকার একটা মিস্ডকল দেখতে পাই। রাতে ঘুমিয়ে যাওয়ার পর কল এসেছে। অন্যান্য দিনে হলে হয়তো বিছানা থেকে উঠবার আগের আলস্য ভরা সকালের মধুর মুহূর্তটা তার সঙ্গে কথা বলে কাটিয়ে দিতে পারতাম। কিন্তু গতকালের ঝাল ঝাল এক্সাইটিঙ্গে ভরা জাম্বুরা খাওয়ার প্রতিক্রিয়া আমার আপাত নিরীহ তলপেটে একটা তীব্র ঘূর্ণন তুলে আমাকে নির্দয় ভাবে ছুঁড়ে ফেলল টয়লেট কমোডের ওপর। কমোডের ওপর দীর্ঘ সময়ের বোঝাপড়াটা ভালই চলল। ক্লান্ত, শ্রান্ত ও ঘর্মাক্ত হয়ে যখন বিছানায় আসি, তখনই মোবাইলটা বেজে উঠল।

অনিচ্ছা স্বত্বেও ফোন রিসিভ করি।
কোনোরকম ভুমিকা ছাড়াই সে বলল, ‘মোবাইল বন্ধ ছিল কেন আপনার?’

আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম। ‘মোবাইল বন্ধ ছিল? আমার? কখন?’
‘জ্বী, গতকাল, ভাবির কাছে যাওয়ার পর থেকে।’
‘কোন ভাবি? কার কথা বলছেন?’ আমি বলি।
‘ওইযে জাম্বুরা ভাবি। পোয়াতি ভাবি। দেশের বাড়ীর ভাবি। এক রাইতেই সব ভুইলা গেলেন?
‘কী আজাবাজে বকছেন! দেখুন, জাম্বুরা নামে আমার কোন ভাবিটাবি নাই।’ আমি দৃঢ়তার সাথে বলি, ‘একদম বাজে বকবেন না।’
‘গতকাল আপনি বলেন নি যে জাম্বুরা নিয়ে ভাবিকে দেখতে যাচ্ছেন?’ সে চুড়ান্ত রকমের অবাক হয়ে বলল।
‘তা হতে যাবে কেন? ভাবি থাকলেইতো আমি জাম্বুরা নিয়ে দেখতে যেতাম, তাইনা? উলটো আমি প্রশ্ন ছুঁড়ে দেই।
এবার হতাশা ভরা কন্ঠে সে বলল, ‘আপনি সত্যি বলছেন? মানে, কালকের ব্যাপারটা আমি ভুল শুনেছি?’ 
‘আশ্চর্য! আমি মিথ্যে বলতে যাব কেন?’ আমি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই বলি।
কিছুক্ষন সে চুপ করে থেকে বলল, ‘তাহলে তুই একটা শুয়ারের বাচ্চা। কুত্তার ছাও।’

লাইনটা কেটে গেল। সেইসাথে সম্ভাব্য প্রেমের সমাধি রচিত হল। তার পেছনে তিন মাসের বিনিয়োগ কৃত অক্লান্ত শ্রম, তাকে জয় করতে কৌশলে প্রয়োগ করা বিবিধ ছলনা ও পরিকল্পনাসমূহ মুহূর্তে পন্ডশ্রমে পরিণত হল। একেবারে তীরে এসে ডুবে গেল তরীটা।

আমি ভুলে যেতে চাইলাম ব্যাপারটা। বিকেলে তলপেটের অবস্থার উন্নতি হলে সবচেয়ে ভাল পোশাকগুলো পড়লাম। মুখে ক্রীম ও চুলে জেল মাখলাম। বডি স্প্রে মাখতে মাখতে ভাবছিলাম, ঈশ্বর সতত দয়াবান। তিনি যা করেন মঙ্গলের জন্যই করেন। আমরা তাঁর ইচ্ছা অনিচ্ছার বাইরে যেতে পারিনা। নিশ্চয়ই এসবের মধ্যেও জ্ঞানীদের জন্য রয়েছে তাঁর প্রজ্ঞার নিদর্শন।

পর্যাপ্ত পরিমানে নাগা মরিচ এবং জাম্বুরা নিয়ে আমি স্যোশিও ইকোনমিস্ট ভাইয়ার বাংলোতে হাজির হই। গেটের ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখলাম বাংলোর ভেতরে গতকালের শান্ত সমাহিত ও নিরব ভাবগাম্ভীর্যময় পরিবেশটা আজ নেই। ঘরের ভেতর থেকে লোকজনের কথাবার্তা ও হাসি ঠাট্রার শব্দ ভেসে আসছে। উঠোনের একপাশে গ্যারাজের বাইরে অতিথিদের তিনটি গাড়ি দাঁড়ানো।বারান্দার এক কোণে দাঁড়িয়ে চল্লিশ পঁয়তাল্লিশের পাঞ্জাবি পাজামা পরা একজন ভদ্রলোক সিগারেট টানছে আর শাড়ি পরিহিতা দীর্ঘদেহী ও রূপবতী এক মহিলার সঙ্গে কথা বলছে। লোকটার কথা শুনে মহিলাটি হাসতে হাসতে বারবার নুয়ে পড়ছিল আর তার হাতের কোমল পানীয়ের গ্লাস থেকে পানীয় ছিটকে ছিটকে পড়ছিল।

স্বভাবতই দৃশ্যটা আমার ভাল লাগেনি। সিঁড়ি বারান্দা ডানপাশে রেখে দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকতেই বামপাশের বসার ঘরে অতিথিদেরকে আড্ডা দিতে দেখলাম। সেখানে ইকোনমিস্ট ভাইও আছেন। ভেতরের দিকে এগুতেই দেখলাম ভাবি এগিয়ে আসছেন। তিনি খুবই ব্যস্ত। অন্তঃপুর থেকে মেয়েদের কলকাকলি ভেসে আসছে। আমার হাত ধরে টানতে টানতে বললেন, ‘আরে তাড়াতাড়ি আসো ল্যাওরার দ্যাওড়া, ফটুসেশন তো শেষ হইয়া গেল।’ বলে আমাকে নিয়ে ভাবি দ্রুত ভেতরের কক্ষে প্রবেশ করলেন। সেখানে তার সুন্দরী বোন, মাথা আউলা করা কফি রঙের চুলের অধিকারিণী জনৈক সুদর্শন ও সুপুরুষ যুবকের বাহুবল্লভা হয়ে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে । আরো কয়েকজন অচেনা সুন্দরী তাদেরকে ঘিরে হাস্য ও কৌতুকের সঙ্গে মুহুর্মুহু ক্যামেরায় ক্লিক করে চলেছে। আমাকে দেখে সে আরো নিবিড় ভাবে সুদর্শন যুবকের বাহুলগ্না হয়ে, বাম হাতটি উঁচু করে সদ্য গ্রন্থিত স্বর্ণের আংটিযুক্ত মধ্যমা ও আংটিবিহীন তর্জনী আঙ্গুল দিয়ে ভি চিহ্ন বানিয়ে আমাকে দেখিয়ে বলল, ‘কাল বলেছিলাম না সারপ্রাইজ আছে!’ আমি মাথা নাড়াতে নাড়াতে সুদর্শনের দিকে হাত বাড়িয়ে দিই। তিনি সজোরে আমার হাত চেপে ধরলে আমি ফিসফিস করে বলি যে, ‘আই আম সো সারপ্রাইসড। আই এম সো সারপ্রাইসড।’ ভাবি আমাকে তার বোনের বাম পাশে ঠেলে চেপে ধরে আমার বাম পাশে তিনি দাঁড়িয়ে সুন্দরীদেরকে চিৎকার করে বললেন, ‘মারো ক্লিক!’ আমি গভীর মনোবেদনার সঙ্গে আস্তে করে হাতের জাম্বুরার ব্যাগটি উঁচু করে ক্যামেরার সামনে তুলে ধরলাম। মুহূর্তে ফ্লাস লাইট জ্বলে উঠল। ক্লিক। ক্লিক। ক্লিক।

Comments

comments

হাসান আহমদ

হাসান আহমদ

হাসান মূলত কবি। তার কবিতা বাংলাদেশের বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে। কিছুটা বোহেমিয়ান। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে একাডেমিক পড়াশোনায় আপাতত ইতি টানেন, চলে যান জাহাজের নাবিক হতে। কিছুদিন সমুদ্রে কাটিয়ে মাটিতে ফিরে আসেন। মাটি তাকে আর ছাড়ে না, কবিতা তাকে টানে। বর্তমানে চাকরিসূত্রে সিলেটে বাস করছেন। জন্ম চাঁদপুর জেলার কচুয়া উপজেলার আশারকোটা গ্রামে, ১৯৮৬ সালে।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: , , ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি