ভাষাপোকা । রাজিব মাহমুদ

সারা রাত একটানা ঝরার পর ভোরের আগে আগে বৃষ্টিটা ধরে আসে। এটা বর্ষার বৃষ্টি না; তবে বর্ষার পূর্বসূচক হতে পারে। সৌম্যদের বাড়ির দক্ষিণের খালি প্লটটার চারপাশে ইটের বাউন্ডারি দেয়া। ওখানে সারা রাত ঘাসের গোড়ায় বৃষ্টির পানি জমতে জমতে এখন আগা ছাড়িয়েও ইঞ্চি খানেক উপরে উঠে গেছে পানির স্তর। ঘাসগুলো ভোরের এই ময়লা-চাদর আকাশের আলোয় অদৃশ্য হয়ে আছে। বেশ টলটলে একখন্ড একটা পুকুর হয়ে আছে পুরো জায়গাটা। রাতের সেই প্রথম প্রহর থেকেই ভেসে আসছে গ্যাঁ-গোঁ গ্যাঁ-গোঁ ব্যাঙের ডাক। রাত বাড়ার সাথে সাথে চারপাশের অন্য সব শব্দ কমতে থাকে; সেই শূন্যতা দখল করে ব্যাঙদের এই কোরাস। এক অদ্ভুত কর্তৃত্বের সুর এই শব্দে-ছেয়ে ফেলে রাতের ঘুম-ক্লান্ত শরীর। এর সাথে যোগ হয়েছে হাল্কা বৃষ্টির ফিনফিনে শব্দ। সব মিলিয়ে এক ঘনঘোর ঐকতান-প্রকৃতির নিজস্ব এক এ্যাকোস্টিক কনসার্ট যেন বা। একটা ঘুটঘুটে বিলম্বিত ভোর অন্ধকারের দীর্ঘ ঘুম থেকে যেন খুব অনিচ্ছায় জেগে উঠছে। এই অনিচ্ছাটা মেঘদেরও আছে। শুধু আছে কী, একেবারে ষোল আনাই আছে। আর আকাশেরই বা নেই কে বলল? কাঁথার নীচের ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা মায়াময় ঘুমটা ছেড়ে ওঠার আলস্যটা তো বোঝাই যাচ্ছে। তবে কেষ্টা হয়ে যায় বেচারা ভোর, সব দোষ যেন তারই-কেননা সে যে সবার চোখের সামনে!

সৌম্য ওর ঘরের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। তার চোখে কেমন একটা ঘোলাটে ধ্যানমগ্নতা। মাঝে মাঝেই রাতে সৌম্য’র ঘুম আসে না । একটা দৈনিকের ক্রাইম রিপোর্টার সে। বাবা মারা যাওয়ার পর মা’কে নিয়ে নিজেদের বাড়িতেই থাকে। সংবাদ সংগ্রহে ছুটতে হয় বিভিন্ন জায়গায়। তখন খাওয়া-ঘুম কিছুরই ঠিক থাকে না। স্পেশাল এ্যাসাইনমেন্ট হলে তো কথাই নেই। তবে যেখানেই যখন রাতে থাকতে হয় সেখানেই জানালার কাছাকাছি বসে থাকাটা অভ্যাস হয়ে গেছে। কখনো কখনো গান শোনে বসে থাকার সময়। জিম মরিসন অথবা এডি র‍্যাবিট কিংবা বাংলা ব্যান্ড। ভোরের দিকে টের পায় যে ওর রাত-জাগা ইন্দ্রিয়গুলো ভয়ঙ্কর তীক্ষ্ম হয়ে উঠেছে; বোবা জীবের ভাষাও যেন পড়তে শিখে গেছে ওরা। সাথে একটা ঝিমঝিমে ক্লান্তিও থাকে সাথে। পুরো ব্যাপারটাকে করোটির ভেতরের আঁধারে জিইয়ে রাখে সকাল হওয়ার আগে আগে বিছানায় গলে পড়ার স্বাদু মুহূর্তটাকে উপূর্যপুরি পাওয়ার জন্য। আজও যেমনি আছে।  

ঘটনাটা ঘটে গেলো এই ক্লান্তি আর ঘুমের ক্রান্তিতে। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ক্লান্তিকর তর্কটা যাতে উঠতেই না পারে সেজন্যই হয়ত এই ক্ষণটুকুর সতর্ক নির্বাচন। শুরুটা এরকম: সৌম্য’র মনে হয় ওর মগজের ভেতর থেকে কেউ কথা বলছে। তবে এই কথা বলার শব্দটা বড় অদ্ভুত। চেনা ভাষাগুলোতে স্বর-ব্যঞ্জন ধ্বনির ঘনবদ্ধ যে বুনোট থাকে সেরকম কিছু নয়; এটা অনেকটা হাল্কা শিস আর গভীর ওঙ্কারের মিশ্রণে তৈরি হওয়া একটা ব্যাপার মনে হচ্ছে। শব্দের উৎস খুঁজতে ও চারপাশে তাকালে চোখে পড়ে না কিছুই। বরং শোনা যায় চাপা হাসির মত একটা শব্দ। চকিতে চারপাশে তাকিয়ে “কে?” বলে উঠতে চাইলেও সৌম্য’র গলা দিয়ে কোন আওয়াজ বের হয়না। 

আবার শোনা যায় সেই শিস আর ওঙ্কারের মিশ্রণ। যেন কেউ একজন বলে ওঠে, “আমি”। ও পরিষ্কার শোনে শব্দটা কিন্তু চেনা কোন মাধ্যমে নয়। একটা অস্পষ্ট ভয়ের শিহরণ চামড়া গলে শরীরের ভেতরে ঢুকে যায়। হাত-পা শক্ত হয়ে আসে, শ্বাসনালীর কাছে বাতাস যেন হঠাৎ-ই আটকে গেছে, দুলে ওঠে মাথার ভেতরটা। গলার কাঁপুনি সামলাতে সামলাতে একটা দৃঢ় ভাব ফোটানোর চেষ্টা করে সৌম্য জিজ্ঞেস করে, “আমি কে?”

“আমি ভাষা”
“ভা…ষা!!!”
“হ্যাঁ, ভাষা। অবাক হচ্ছো নাকি?”
সৌম্য কী বলবে বুঝে উঠতে পারে না। ওদিকে ভাষা বলে যায়-
“অবাক হচ্ছো নাকি ভয় পাচ্ছো?”
কয়েক সেকেন্ডের বিরতি দিয়ে ভাষা আবার বলে-

“অবশ্য তোমরা মানুষেরা তো এক ঈশ্বর ছাড়া বিমূর্ত কিছুতে বিশ্বাসই করোনা। মানে বিমূর্ত হলেও তার একটা মূর্ত শরীর চাই তোমাদের। তুমি চাইলে ভাষা’র পরে একটা ‘পোকা’ লাগিয়ে ডাকতে পার আমাকে।”

সৌম্য অনড় বসে থাকে। ও পরিষ্কার সবকিছু শুনতে ও বুঝতে পারছে কিন্তু কীভাবে পারছে সেটাই বুঝতে পারছে না।
“কি, পছন্দ হল না নামটা?” ভাষাপোকা জিজ্ঞেস করে।
সৌম্য ফিসফিস বা বিড়বিড় করে কী বলল বোঝা গেলনা।
‘হ্যাঁ’ বললে নাকি ‘না’?
“উম্‌ম্‌ হ্যাঁ…না হয়েছে।”

“এর মানে কি ‘হ্যাঁ’ আর ‘না’ দু’টোই নাকি? যদি তাই হয়, তাহলে বলব ‘ওয়াও’। তুমি যে কোন একটা সম্ভাবনা নিয়ে গোঁড়া নও। দু’টোকেই চলতে দিচ্ছ পাশাপাশি। সবাই তোমার মত হলে তোমাদের মানুষদের  সভ্যতা অন্য স্তরে চলে যেত। তোমাকে পছন্দ হয়েছে আমার। মনে হচ্ছে তোমাকে নির্বাচন করাটা বুদ্ধিমানের কাজ হয়েছে ”

“কীসের নির্বাচন?”
“মানুষদেরকে সাবধান করার সময় এসেছে। তারা বড্ড বাড়াবাড়ি শুরু করেছে। তোমাকে নির্বাচন করা হয়েছে সব মানুষের কাছে এই সাবধান বাণী পৌঁছে দেবার মাধ্যম হিসেবে।”
“কীসের বাড়াবাড়ি? কী বলছো এসব?”
“বলব আস্তে আস্তে। কেবল তো পরিচয় হলো।”
“আচ্ছা তাই নাকি? কিন্তু তুমি কোথা থেকে কথা বলছো?” সৌম্য জিজ্ঞেস করে।
“তোমার মগজের বাম পাশ থাকে। ‘অঙ্ক’ আর ‘যুক্তি’ আমার প্রতিবেশী।”
“আচ্ছা!!” এবার যেন সৌম্য একটু মজাই পেয়ে যায়।
“হ্যাঁ তাই।”
“কিন্তু তুমি আমার সাথে কী ভাষায় যোগাযোগ করছো?”
“কী ভাষা মানে? আমি নিজেই তো ভাষা”
“না মানে বাংলা যেমন একটা ভাষা…ইংরেজি একটা ভাষা…”
“ওগুলো তো আমার একেকটা কায়িক রূপ। আমি নিজে বিমূর্ত ”
“বিমূর্ত কিছুর আবার কায়িক রূপ থাকে নাকি?”

“থাকে না বলছো? তাহলে যাকে মানি’ বা বাংলায় ‘অর্থ’ বলছো সেটা তো একটা বিমূর্ত ব্যাপার, একটা কনসেপ্ট। আর এই কনসেপ্টের-ই বিভিন্ন দৃশ্যমান রূপ হল ‘টাকা’, ‘ডলার’, ‘ফ্রাঙ্ক’ ইত্যাদি”

“কিন্তু তুমি তো আমার সাথে কথা বলছো। তার মানে তুমি আছো…”
“হ্যাঁ আছি কিন্তু তুমি থাকা বলতে যা বোঝ সে অর্থে নেই। অর্থাৎ থাকা মানেই দৃশ্যমানতা নয়”
“তুমি কি সত্যিই অদৃশ্য নাকি লুকিয়ে আছো কোথাও?”
“এখানেই তোমাদের মানুষদের সমস্যা। তোমরা দৃশ্যমান বস্তু ছাড়া কিছু বোঝ না। অথচ নিজেরা বড় বড় সব অদৃশ্য ব্যাপার সৃষ্টি করে বসে আছো।”
“কীরকম?”
“ধরো তোমাদের চিত্রকলা। এটা তো দৃশ্যমান কিছু না।
“মানে কী? চিত্রকলা মানে চিত্রের কলা অর্থাৎ দেখার একটা ভঙ্গি বা কৌশল। না-ই যদি দেখা গেলো তো দেখার ভঙ্গির প্রশ্ন আসছে কোত্থেকে?
“ আদতে ব্যাপারটা সেরকম নয় একেবারেই।”
“তাহলে কীরকম?”
“দেখা তো যায় শুধু ঐ ক্যানভাস আর রং যেগুলো দিয়ে কিছু বিমূর্ত ‘ভাব’ বা ‘আবেগ’কে বন্দী করার চেষ্টা করা হয়েছে। ভাব আর আবেগ তো অদৃশ্য। ওগুলো তুমি দেখবে কী করে?”
সৌম্য হতবুদ্ধি হয়ে যায়। ব্যাপারটা এভাবে সে কখনো ভেবে দেখেনি।
“তুমি নিজেই ভেবে দেখো। ব্যাপারটা এরকম-ই নয় কি?”
সৌম্য তবুও চুপ। ও এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না যে ও কারও সাথে কথা বলছে। বরং মনে হচ্ছে ওর নিজেরই একটা সত্ত্বা আরেকটা সত্ত্বার সাথে বলছে।
ওদিকে ভাষাপোকা বলে যায়-
“যেমন ধরো তোমাদের ভাষাবিজ্ঞানীরা তো মনে করেন যে ভাষা শুধুই ‘ফর্ম’ বা ‘খোলস’। এর ভেতরে কোন সাব্‌সটেন্স বা পদার্থ নেই। কী হাস্যকর কথা! সাব্‌সটেন্স ছাড়া ফর্ম থাকে না-কি?
এখানে খানিকক্ষণের বিরতি। তারপর আবার-

“তোমরা মানুষেরা আমাকে যে কতভাবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করলা এই পর্যন্ত …আমি নাকি লিখিত অক্ষর, আমি নাকি শ্রুত ধ্বনি…আমি নাকি মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম…অর্থাৎ সেই পুরনো ব্যাপার…আমি ফর্ম…আমার ভেতরটা ফাঁপা…কোন সাব্‌সটেন্স নেই। আরে বাবা তাই যদি হত, তাহলে আমি তোমার সাথে কথা বলছি কীভাবে? তুমি তো আমাকে দেখতে পাচ্ছো না। আমি শুধু ফর্ম হলে তো তোমার আমাকে দেখতে পাওয়ার কথা ছিল”

তোমার সত্য রিপোর্টটার জন্য অভিনন্দন। যেভাবে তুমি মেয়েটার জীবনের সত্যটা বের করে এনে ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছো! তবে তোমার জীবনের সত্যটাও অনেক ট্র্যাজিক। তুমি তোমার জীবনে আসা কোন মেয়েকেই ভালোবাসতে পারো নি। শেষ পর্যন্ত ভালোবাসলে যৌতুকের বলি হওয়া মৃত একটা মেয়েকে। কালঘাম ছুটিয়ে ওকে নিয়ে রিপোর্টটা করলে। তোমরা মানুষেরা সত্যিই অদ্ভুত। জীবিত মানুষকে ভালোবাসতে পারলে না অথচ মৃত একটা মানুষকে কী অবলীলায় ভালোবেসে ফেললে। তোমাদের সীমাবদ্ধতাটাও আমি বুঝি। সব তো তোমাদের হাতে নেই। মাঝে মাঝে তোমরা ক্রীড়নক মাত্র।  তবে তোমরা মানুষেরা এখনো পুরোপুরি শয়তান হতে পারোনি। এই শয়তান তো এই ভালো। কে যেন বলেছিল আমাকে একবার যে মানুষ হল শুভ আর অশুভ’র চমৎকার ভারসাম্য। আসলেই তাই। যাই হোক তোমার মাধ্যমে আমি ভাষাদের প্রতিনিধি হিসেবে সব মানুষদের একটা অনুরোধ করে যাই: তোমরা মিথ্যার পথ থেকে যতটুকু পারো সরে আসো। সবটুকু তোমাদের হাতে নেই জানি। যতটুকু আছে ততটুকুতে নিজের কাছে সৎ থাকতে চেষ্টা করো।

এ পর্যায়ে সৌম্য হঠাৎ-ই প্রচণ্ড রেগে যায় সৌম্য, বলে-

“তোমাকে দেখতে পাচ্ছি না কারণ তুমি আমার মনের কল্পনা। ভাষাপোকা টোকা বলে কিছু নেই। সারা রাত জেগে থাকার কারণে আমি এসব উল্টাপাল্টা ভাবছি। জেগে উঠেই দেখব সব স্বাভাবিক।”

শব্দ করে হাসে ভাষাপোকা, তবে তাতে বিরক্তিটা ঢাকা পড়ে না-

“এখন মনে হচ্ছে তোমাকে নির্বাচন করা ভুল হয়েছে। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম তুমি অন্য মানুষদের থেকে আলাদা। যেমন বলেছিলাম যে তুমি দু’টো সম্ভাবনাকেই দেখে ওঠো। কিন্তু এখন দেখছি আমার ধারণা ভুল। তুমিও অন্য মানুষদের মতই। তোমাদের ব্যাখ্যার মধ্যে যা ধরা দেয় না তোমরা সেটাকে ভুল প্রমাণের জন্য উঠে পড়ে লেগে যাও। ওটাকে মিথ্যা প্রমাণ করে নিজেদের বুদ্ধির জয় ঘোষণা তোমাদের করতেই হবে। যাই হোক। ভালো থেকো। হয়ত আবারো কথা হবে কিংবা হবে না। বিদায়!

              

সৌম্য ঘুম থেকে ওঠে অনেক বেলা করে। বাইরে একেবারে ডাঁ ডাঁ রোদ। রাতে ভাষাপোকার সাথে কথোপকথনের ব্যাপারটা মনে পড়ায় নিজে নিজে হেসে নেয় কিছুক্ষণ। নিজেই বলে যে এই ক্রমাগত রাত জাগা ওর মগজে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে; ওর ভালো ঘুম দরকার না হলে এরকম আরও কত অদ্ভুতুড়ে ব্যাপার মাথায় চেপে বসবে কে জানে! আজ শনিবার। অফিস ছুটি।

সপ্তাহের এই দিনটায় বিকেল বেলায় ও দীপার সাথে নিয়ম করে দেখা করে। শনিবার দীপার অফিসও ছুটি। ওদের পরিচয় হয়েছিল একটা বিয়ের অনুষ্ঠানে, এক বন্ধুর মধ্যস্থতায়।

দীপা ডিভোর্সি, ওর পাঁচ বছরের ছেলে সাজিদকে নিয়ে নিজের ফ্ল্যাটেই থাকে। প্রথম দীপার বাড়িতে যাবার পর দীপা বলেছিল,

“আমি আসলে অনেক দূর উড়তে গিয়ে সুতা কাটা ঘুড়ি হয়ে গোত্তা খেয়ে পড়ে গেছি। বাট স্টিল আই এ্যাম এ হেল্পলেস ড্রিমার, য়্যু নো, সৌম্য। আমি বোধহয় আর শোধরাব না।” দীপা বলে যায় কীভাবে কাটা ছকেই চলছিল তার জীবন: ঝঞ্ঝাটহীন বিশ্ববিদ্যালয় জীবন-প্রথম চেষ্টায় বেশ ভালো একটা বেসরকারি চাকরি-আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠিত সম্ভ্রান্ত পরিবারের পাত্রের সাথে বিয়ে-বছর ঘুরতেই ফুটফুটে ছেলে সন্তান। পরের তিনটি বছরও বেশ কেটে গেল। এরপরই আকাশে সুতোর টান: “দ্যাট বাস্টার্ড স্লেপ্ট উইথ হিজ বেস্ট ফ্রেন্ডস’ ওয়াইফ।”

এদিকে সৌম্য’র আট বছর ধরে চলা সম্পর্কটার শেষ যতিটাও পড়ে গিয়েছিলো। ওর কলেজ জীবনের প্রেমিকা ধীরা বাবা-মা’র ঠিক করা কানাডায় থাকা পাত্রকে বিয়ে করে ভারহীন ভবিষ্যৎ গড়তে চেপে বসেছিল স্বপ্নপাখি উড়োজাহাজে। চলে যাবার আগের দিন পর্যন্তও সৌম্য বিশ্বাস করতে পারেনি যে ধীরা সত্যিই চলে যাচ্ছে। যাবার আগে একটা নির্জন কফি শপে দেখা করে ধীরা বলেছিল, “সম্ভব হলে ক্ষমা করে দিও।”   

সৌম্য ধীরাকে ক্ষমা করেছিল কিনা ও নিজেই নিশ্চিত নয়। ধীরা চলে যাবার শুরুর দিকের হলুদ বিকেলগুলোকে বিষণ্নতায় পোড়া মনে হলেও আস্তে আস্তে ধীরার সাথে ওর স্মৃতি ফ্যাকাসে হয়ে আসে। তবে প্রায়-ই রাত-বিরেতে ঘুম ভেঙে ভেতরটা খুব তেতো হয়ে যেত। নিজেকে মনে হত একটা মরা মাছ: চোখ দু’টো যার অনুভূতিশূন্য ভাবে দিনরাত খোলা। সৌম্য অফিসে যায়, একেকটা নতুন এ্যাসাইনমেন্টের জন্য ঢাকায় বা ঢাকার বাইরে ছোটে, রাত জেগে রিপোর্ট লেখে, কফি খায়,  সন্ধ্যায় একা একা হেঁটে বহুদূর চলে যায়। একটা অনিচ্ছুক লক্ষ্যহীন হাসের পিঠে চড়ে যেন শুধুই লক্ষ্যহীন আকাশ-ভ্রমণ।  

এরকমই একটা সময়ে সৌম্য’র সাথে দেখা হয়ে যায় রোমানা বলে একটা মেয়ের। অভাবী ঘরের মেয়ে। দিনের বেলা একটা বুটিক শপে কাজ করে আর রাতে কল গার্ল। এক রাতে রোমানার পুডিং-কোমল শরীরে পাখা খসা পতঙ্গের মত গোত্তা দিতে দিতে হঠাৎ-ই ওকে ভীষণভাবে আঁকড়ে ধরে সৌম্য ফিশফিশিয়ে বলে উঠেছিল, “আই এ্যাম হেল্পলেসলি লোনলি। ছেড়ে যেও না আমাকে।” রোমানা সে রাতে এ নিয়ে কথা বাড়ায় নি। পরে ফোনে জানিয়ে দিয়েছিল যে সৌম্য’র সাথে ওর আর দেখা করা সম্ভব না। ফিরে এলো আবার সেই রূপকথার রাজহাঁস। সেই আত্ম-মন্থনের সান্ধ্য ভ্রমণ। 

এরপর দীপা চ্যাপ্টার। দু’জনেই তাদের ভেতরে একটা একটা ভেঙে পড়া জীবনের মূর্তি বহন করে নিয়ে যাচ্ছিল। মনের ছোট ছোট টানে তৈরি নকশা একসময় শরীরের কাছে সমর্পিত হয়। এক রাতে দীপাকেও ঐ এক-ই কথা বলে সৌম্য যা রোমানাকে বলেছিল। তবে এবার সে তৈরি ছিল ধাক্কা খাওয়ার জন্য। তবে দীপা তাকে ধাক্কা দেয় নি। ওরা একে অন্যের মাঝে একটা স্ট্রাকচার খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করে-সমাজ, ভবিষ্যৎ, অতীত, বর্তমান এসবের একীভূত একটা হাওয়ার গাছের ওপর বৃন্তের মত ফুটে থাকে ওরা দু’জন। তবে প্রায়ই তীব্র শারীরিক আনন্দের সময়গুলোতে আচমকাই আনমনা হয়ে পড়ত দু’ জন। মাঝে মাঝে একসাথেই। তবে এটা সৌম্যের চেয়ে দীপার-ই বেশী হত। একটা পুরো দুস্তর বিবাহিত জীবন কাটিয়ে আসার অভিজ্ঞতার কারণেই হয়তবা এমন হয় তার যে জীবনের অভিজ্ঞতা সৌম্যের নেই।

আজকে সৌম্য দীপা’র ফ্ল্যাটে যাওয়ার পর দীপা দরজাটা ভিজিয়ে দিয়ে বলে-
“একটা কথা বলা দরকার তোমাকে… কীভাবে শুরু করব বুঝতে পারছি না। তবে ব্যাপারটা ইম্পরট্যান্ট…
“বলো কী ব্যাপার। এতো হেযিটেট করছো কেন?”
“না মানে আব্বুর শরীরটা ভালো যাচ্ছে না।”
“কী হয়েছে উনার?”
“আসলে আব্বু আমাকে নিয়ে অনেক চিন্তা করে। মা সেদিন বলছিল আব্বু প্রতি রাতে ঘুমাতে যাবার আগে আমার কথা তোলে। আব্বুর ধারণা আমার জীবনটা নষ্ট হয়ে গ্যাছে…”

দীপা কথাটা শেষ হওয়ার আগেই বিদ্যুৎ চলে যায়। ওর শেষ বাক্যটা যেন অন্ধকারে ঝুলতে থাকে। সৌম্য কী বলবে বুঝে ওঠার আগেই পাশের ঘর থেকে সাজিদ এসে মাকে জড়িয়ে ধরে বলে, “আম্মু আম্মু…কারেন্ট চলে গেসে…ভূত আসবে।”

ওদের রুমের পাশের বারান্দা দিয়ে দেখা যাচ্ছে যে আকাশ কালো হয়ে এসেছে। বৃষ্টি নামবে যে কোন সময়। সৌম্য উঠে পড়ে। 

বাসায় ফিরতে ফিরতে বৃষ্টি’র আঠায় ওর শরীর আর শার্ট এক হয়ে গেছে। রাতে শোয়ার আগে ওর মনে হতে থাকে যে ওর জ্বর আসছে। বাইরের বৃষ্টির শব্দ কমে এসেছে। কালকের মত দক্ষিণের খালি প্লটটার অস্থায়ী পুকুরটায় ব্যাঙের গ্যাঁ-গোঁ গ্যাঁ-গোঁ হাল্কা তালে শুরু হয়েছে। তবে বৃষ্টি আর চারপাশের নানা শব্দের কারণে তেমন উচ্চকিত হতে পারছে না। আস্তে আস্তে শব্দ বাড়তে থাকে। হাওয়ায় হাওয়ায় সেই শব্দ সৌম্য’র মগজে কুন্ডুলী পাকিয়ে ঢুকে পড়তে থাকে।   

বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করছে সৌম্য। মনের ভেতরে একটা অস্বস্তি দলা পাকিয়ে গলার কাছে উঠে আসতে চাইছে।  চোখ বন্ধ করতেই সকালে শোনা সেই শিস আর ওঙ্কারের মিশ্রণ ভেসে আসে। এবার সৌম্য আর প্রথমবারের মত ভয় পায় না।

“না খেয়েই শুয়ে পড়লে যে?” ভাষাপোকা শুধায়।
“ক্ষুধা নাই। তুমি আবার এসেছো?”
“হ্যাঁ, কারণ কথাগুলো বলাটা জরুরী।”
“চলে যাও। তুমি আমার কল্পনা। তোমার কোন অস্তিত্ব নাই”
“যাবো। কথাগুলো বলে একেবারেই চলে যাবো।”
“আমি কোন কথা শোনার অবস্থায় নেই। শুনতে চাইও না”
“শুনতে তোমাকে হবে । কারণ তোমরা এভাবে দিনের পর দিন আমাদের ক্ষতি করে যেতে পার না। এটা বন্ধ হতেই হবে।”
“কীসের ক্ষতি? আমরা ক্ষতি করেছি তোমাদের?”
“হ্যাঁ, তোমরা। অর্থাৎ মানুষেরা”
“মানে কী? কীভাবে?”
“মিথ্যা কথা বলে”
“কী বলতে চাও পরিষ্কারভাবে বল।”
“তুমি আজকে দীপাদের বাড়ি থেকে পালিয়ে এলে কেন?”
“পালিয়ে মানে? বৃষ্টি আসছিল তাই… ”
“ওসব ভাঁওতা আমাকে দিও না। তুমি ওর তোলা প্রসঙ্গটা ফেইস করতে ভয় পাচ্ছিলে। কেন পাচ্ছিলে?”
সৌম্য আচমকাই চুপ মেরে গেলো।

“আমি-ই বলে দিচ্ছি। কারণ প্রসঙ্গটা বিয়ের দিকে যাচ্ছিলো তাই। তুমি তো ওকে বিয়ে করতে চাও না। এক বাচ্চার মা একটা ডিভোর্সি মেয়েকে বিয়ে করার মত বোকা তুমি নও। অথচ তুমি-ই গায়ে পড়ে ওকে তোমার জীবনে থেকে যেতে বলেছিলে। তুমি মিথ্যা বলেছো। দীপা তোমার কাছে একটা আশ্রয়ের মত। একটু সামলে উঠেই তুমি ওকে ফেলে চলে যাবে।”

সৌম্য এবারও চুপ। ভাষাপোকা বলে যায়-

“তবে এটাও ঠিক যে দীপাও তোমাকে ভালোবাসে না। ও এখনো ওর আগের স্বামীকে যাকে ও কথায় কথায় বাস্টার্ড বলে তাকে ভুলতে পারে নি। তুমি ওর কাছে নিঃসঙ্গতা দূরে ঠেলে রাখার একটা খেলনা ছাড়া আর কিছুই না।

“কী বলছো উল্টা পাল্টা! আমি কি বাচ্চা যে ও আমাকে খেলনা বানাবে আর আমি ওকে খেলতে দিব?” এবার জিজ্ঞেস না করে পারে না সৌম্য।

“তোমরা দু’জনেই দু’জনের খেলনা কেননা তোমাদের দু’জনেরই দু’জনকে প্রয়োজন। তোমার একটা সেইফ কম্প্যানি প্রয়োজন- এই নিঃসঙ্গ জীবনে হাঁপিয়ে উঠেছো তুমি। আর দীপার প্রয়োজন সামাজিক স্থিতাবস্থায় ফিরে যাওয়ার একটা সাঁকো আর ওর ছেলের জন্য একটা সাইনবোর্ড- সিম্পল। আর সম্পর্কটা টিকিয়ে রাখতে তোমরা দু’জনেই দু’জনকে মিথ্যা বলে যাচ্ছ।”

বাইরে রাতটা গাঢ় হতে থাকে।

“আর হ্যাঁ দীপা আরও মিথ্যে বলেছে। ওর বাবা’র শরীর এমন কিছু খারাপ না। এটা তোমার ওপর বিয়ের চাপ দেয়ার একটা কৌশল। এখানেই শেষ না, আরও আছে। দীপা মনে মনে তোমার মায়ের মৃত্যু চাইছে কারণ ও ভাবে ওর ছেলে সহ ওকে ছেলের বউ হিসেবে তোমার মা কখনোই মেনে নেবে না। অথচ দেখ রোমানা নামের যে মেয়েটাকে তুমি তোমার জীবনে ধরে রাখার কথা বলেছিলে, সেটা যদিও আরেকটা মিথ্যা কথা, তবে সে তোমাকে নিয়ে আজও ভাবে। তোমাকে ফিরিয়ে দিয়ে সে ভীষণ ভেঙে পড়েছিলো। আরও শুনবে?”

“বাকি আছে নাকি এখনো কিছু?”

“বটেই আছে। তোমার প্রথম প্রেমিকা যে ধীরা সে-ও তোমাকে ভেবে অনেক ডিপ্রেশনে আছে। স্বামীটা ভালো পেয়েছে তবে তোমাকে সে ভুলতে পারছে না। মেয়েটা অনেক ভালোবাসতো তোমাকে।  শুধু একটা ভালো জীবনের লোভে ও তোমাকে ছেড়ে গিয়েছিল। এটা তো তুমি জানতেই। অথচ ধীরা চলে যাবার পর তুমি নিজের সাথে এত নাটক করলে যে যেন তুমি ওকে ছাড়া বাঁচবেই না। আসলে তুমি এতদিনের পুরনো এই সম্পর্কে ক্লান্ত হয়ে উঠেছিলে। ও চলে যাবার পর তোমার নিজেকে ভারমুক্ত মনে হয়েছিল।

“তোমার কথা কি শেষ হয়েছে?”
“শেষ করছি রোমানাকে দিয়ে। মেয়েটা কিন্তু তোমাকে সত্যি সত্যি ভালোবেসেছিলো কিন্তু তোমাকে ওর অনিশ্চিত জীবনের সাথে জড়াতে চায়নি। কিন্তু তুমি ওকে তোমার জীবনে থেকে যেতে বললেও ও যদি সত্যিই থেকে যেত তাহলে তুমি কিছুদিন পরেই চলে যেতে ওকে ছেড়ে।”
ভাষাপোকা যেন দম দেয়ার জন্য কয়েক সেকেন্ড থামে। এরপর একগাদা বিরক্তি নিয়ে প্রশ্ন করে-
“এবার তুমি-ই বল তোমাদের এই হাজার হাজার মিথ্যার ভার আমি আর আমার শব্দ-সৈন্যরা কেন বয়ে বেড়াব?”
“শব্দ-সৈন্য? তারা কারা?”
“এরা আমার সৈন্যবাহিনী। আমি হলাম মা-পোকা। সমগ্র ভাষা সত্ত্বাকে ধারণ করি আমি। আর আমার সৈন্যরা ছোট ছোট বোধগুলো ধারণ করে। এদের একেক জনের নাম “ভালোবাসা”, “আনন্দ”, “দুঃখ”…
“বাহ্‌! ভালো গপ্পো ফেঁদেছো । তা কী করে তোমার এই সৈন্যের বহর?”
“সব কিছুই করে। ইন ফ্যাক্ট তোমাদের মানবিক সম্পর্কগুলোকে ওরাই টিকিয়ে রাখে। যেমন তোমরা মানুষেরা যখন এক অন্যকে ভালোবাসার কথা বলো তখন আমি আমার ‘ভালোবাসা’ নামের যে শব্দ-সৈন্য আছে তাকে পাঠাই। মগজ থেকে তোমাদের মুখের বাতাসে।”
“একই সঙ্গে তো অনেকেই বলতে পারে ভালোবাসার কথা। তখন? এক সৈন্যকে কতজনের কাছে পাঠাও?”
“ওরা একই সময়ে থাকতে পারে অনেক জায়গায়। সেটা কোন সমস্যা না। আগেই বলেছি যে ভাষা শুধুই একটা ফর্ম না যার অস্তিত্ব শুধু একটা শরীরে আটকে থাকবে। তুমি আবারো কৌশলে প্রসঙ্গ ঘোরানোর চেষ্টা করছো… আমার প্রশ্নের উত্তর দাও…তোমরা কেন এত মিথ্যে বলো?
“জানি না।”

“জানো না মানে? তোমরা একেকটা মিথ্যা বলো আর আমরা অসহায় হয়ে পড়ি। শুধু তাই না মুখে “ভালোবাসি না” বলে মনে মনে ভালোবাসা টাইপের জটিল অনুভূতির জন্য কোন শব্দ-সৈন্য তৈরি নেই আমার। তোমরা জটিল জটিল সব অনুভূতি তৈরি করো আর আমাদের সেগুলোর জন্য নতুন নতুন শব্দ-সৈন্য তৈরির চিন্তা করতে হয়। একবার ভেবে দেখেছো যে আমাদেরও রিসোর্সের লিমিটেশান থাকতে পারে”

আবার দম নিতে থামে ভাষাপোকা, এরপর বলে যায়-

“তোমরা দিন দিন আমাদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছ। তোমাদের এই মিথ্যের কারণে আমার শব্দ-সৈন্যরা বিদ্রোহ করেছে। ওদের অভিজ্ঞতা থেকে ওরা দেখেছে যে তোমরা মানুষেরা সভ্যতার  এই পর্যায়ে এসে কেউই আর সত্য বলোনা। তোমাদের আইনজীবী, ব্যবসায়ী, মন্ত্রী, প্রেমিক, শিল্পী, চোর, সাধু প্রত্যেকটা মানুষ এখন প্রতি মুহূর্তে মিথ্যে বলে যাছে অনর্গল। আইনজীবীরা অপরাধীকে বাঁচানোর জন্য আদালতে মিথ্যা বলে, ব্যবসায়ীরা ক্ষতিকর কেমিক্যাল ব্যবহার করা রঙিন তরলকে খাঁটি ফলের জুস বলে চালায় আর বলে যে সেটা নাকি খুবই স্বাস্থ্যকর, মন্ত্রীরা সংসদে বসে বলে দেশ উন্নয়নের জোয়ারে ভেসে যাচ্ছে অথচ দেশে অপরাধ, গুম, খুন প্রতিদিন বেড়েই চলেছে…”

ভাষাপোকা একটু দম নিয়ে বলে যায়-

“আমার শব্দ সৈন্যরা বলেছে যে এভাবে তারা মিথ্যা ‘ভাব’ কে আর বহন করে যেতে পারবে না। মিথ্যার কালো শরীরকে ধারণ করতে করতে ওদের শরীর-আত্মাও কালো হয়ে যাচ্ছে। ওরা এই ভয়ঙ্কর অভিশপ্ত জীবন থেকে মুক্তি চায়। আগামীকাল মগজের হেড কোয়ার্টারে এক জরুরী মত বিনিময় সভা ডাকা হয়েছে আমাকে প্রধান অতিথি করে। জানি না কী বলব ওদের। আমি তো চোখে অন্ধকার দেখছি…ভাষার সামনে তো কোন ভবিষ্যৎ -ই দেখছি না। এভাবে চলতে পারে না। তোমরা নিজেদের শোধরাও। কী হলো? ”

সৌম্য গভীর ঘুমে অচেতন। ওর নাক ডাকার শব্দ বিকট থেকে বিকটতর হচ্ছে।

               

সৌম্য’র পরের সপ্তাহটা খুব ব্যস্ততায় কাটলও। একটা ক্রাইম রিপোর্টিং এর কাজে ঢাকার বাইরে থাকতে হল তিনদিন। শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাদের চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছেলের বৌকে যৌতুকের জন্য দিনের পর দিন একটা ঘরে বন্দী করে রেখেছিলো। মেয়েটাকে তারা খাবার দিতোনা ও ভয় দেখাতো যে যৌতুক না আনলে ওর পেটের বাচ্চাটাকে মেরে ফেলবে। মেয়েটা শেষ পর্যন্তও যৌতুক আনতে রাজি না হলে তার উপর চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন। এক পর্যায়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে তড়িঘড়ি করে হাসপাতালে নেয়ার পথে সে মারা যায়। বস্তাবন্দী লাশ নদীতে ফেলে দিয়ে স্বামী, ভাসুর, আর শাশুড়ি পালিয়ে যায়। পুরো দুই সপ্তাহ অমানুষিক পরিশ্রম করে এসব তথ্য সংগ্রহ করল সৌম্য। ও চায় অন্তত: মেয়েটার পরিবার যাতে ন্যায়বিচার পায়। ঢাকায় ফিরে আসার পরেও রিপোর্ট তৈরি করতে কালঘাম ছুটে গেল। বসের ডেডলাইন মানে আক্ষরিক অর্থেই ডেডলাইন। উনার ভাষায়: “হোয়েদার ইউ আর ডেড অর এলাইভ, এ ডেডলাইন ইজ ডেডলাইন এন্ড ইউ মাস্ট মিট ইট।” আর সেই ডেডলাইন মিট করতে গিয়ে কাজের চাপে ঘুম-খাওয়া সব মাথায় উঠেছে সৌম্য’র। এ কয়দিন দীপার সাথেও ঠিক মত কথা হয় নি ফোনে। তবে শত ব্যস্ততার মধ্যেও সেদিন রাতের ভাষাপোকার সাথে কথোপকথনের টুকরো টুকরো অংশ ওর মগজে ধাক্কা দিচ্ছিল।

ও কি সত্যিই দীপাকে ভালোবাসে না? ও ধন্দে পড়ে যায়। ও দীপার সঙ্গ চায়, ওর সাথে কথা বলার জন্য ও সারাদিন অপেক্ষা করে। ওদের শারীরিক সম্পর্কের সময়ও একে অন্যকে ভরিয়ে রাখে। মনে হয় কোথাও একটুকু ভান নেই। তবে এটাও ঠিক ও সাজিদের দায়িত্ব নিতে ভয় পায়। এছাড়াও যে মেয়ে পুরো পাঁচ বছর আরেকটি পুরুষের সাথে প্রতি রাতে শুয়েছে, তার সন্তান ধারণ করেছে তাকে বিয়ে করে বউ করার কথা সৌম্য ঠিক ভেবে উঠতে পারে না।

সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার হল ভাষাপোকা দীপা’র ভাবনা নিয়ে যা বলেছে। সৌম্য এটা নিয়ে এঁফোড়-ওঁফোড় ভেবেছে। দীপা কি সত্যি-ই এমন ভাবতে পারে? যত যাই হোক দীপা সৌম্য’র মা’র মৃত্যু চাইতে পারে না। আর তাছাড়া সৌম্য কখনো দীপাকে এরকম ইঙ্গিত দেয়নি যে সৌম্য তার মা-বাবা কষ্ট পাবে দেখে দীপাকে বিয়ে করতে পারবে না। তবে এটাও আবার ঠিক যে নিজের ছেলের দিকে তাকিয়ে দীপা মা হিসেবে সব করতে পারে। হয়ত কোন নিষ্ঠুর সিদ্ধান্ত নিতেও পেছপা হবে না। আরেকটা ব্যাপার হল ভাষাপোকা সৌম্য’র অবচেতনের যে ভয় অর্থাৎ দায়িত্ব কাঁধে পড়ে যাবার ভয়, সামাজিকভাবে ছোট হয়ে যাবার ভয়, মা’কে কষ্ট দেবার ভয়-এই সবকটা ভয়কে যেন সুঁই দিয়ে উকুনের মত তুলে এনেছে। আর সেখানেই খটকাটা জিতে যাচ্ছে। তাহলে  হয়ত ও দীপা সম্পর্কে যা বলেছে তা ঠিক হলেও হতে পারে। এত নিখুঁতভাবে একজনের সম্পর্কে বলতে পারলে অন্যজনের সম্পর্কেই বা বলতে পারবে না কেন?

কিন্তু ভাষাপোকা কি সত্যিই আছে? নাকি আসলে পুরোটাই নিজের অবচেতনের সাথেই একটা দীর্ঘ কথোপকথন? কিন্তু এত স্পষ্ট সব। এত পরিষ্কার শুনলো সে কথাগুলো। উত্তরও দিলো… তাহলে? তবে ওর মনে পড়ে যে ভাষাপোকা একবার বলেছিলো যে সে সৌম্য’র ই একটা অংশ। মনের ভেতরের সব যুক্তি-তর্কে সৌম্য ক্লান্ত হয়ে যায়। এর থেকে পরিত্রাণ দরকার তার। বিশেষ করে দীপা সম্পর্কে বলা কথাগুলো নিয়ে ভাষাপোকার সাথে ওর আরেকবার বোঝাপড়া করতেই হবে।

আজ রিপোর্টটা জমা দিয়ে সন্ধ্যের আগেই বেরিয়ে পড়ল সৌম্য। দীপা’র ওখানে যেতে পারত কিন্তু গেলনা। আজ ওর নিজের জন্য কিছু সময় প্রয়োজন। বাড়ি ফিরে সোজা নিজের রুমে চলে গেল। সটান বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করে পড়ে রইল চুপচাপ। ভাষাপোকার সাথে যোগাযোগের কোন সুনির্দিষ্ট উপায় ওর জানা নেই। এর আগের দু’দিন যোগাযোগটা হয়ে গিয়েছিল বা বলা যায় ভাষাপোকা-ই করেছিলো। কিন্তু ওর দিক থেকে যোগাযোগ করতে হলে কী করণীয় তা জানা নেই সৌম্যের। তবে শোয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই ওর চোখ বন্ধ হয়ে আসে। আর তখনই ও টের পায় যে এ ক’দিনের টানা ব্যস্ততার পর ওর শরীর কী ভীষণভাবে বিশ্রাম চাচ্ছে! তবে এই ক্লান্তির ভেতরে ঘুমিয়ে যেতে যেতেও ও প্রছন্ন ভাবে খুঁজতে থাকে ভাষাপোকাকে। ওর মনের প্রশ্নগুলো যেন করোটির ভেতরে কিলবিল করতে থাকে। ওর ভেতর থেকে কে যেন খুঁজতে থাকে ভাষাপোকাকে। কিন্তু এবার আর গত দু’দিনের মত কোন শিস শোনা যায় না। কেমন একটা অদ্ভুত বিষণ্ণ নীরবতা পুরো মগজ জুড়ে।

এরকম একটা মুহূর্তে ওর মনে হল ওর মাথার ভেতরে মগজের ওপর দিয়ে একটা গভীর তরঙ্গ বয়ে যাচ্ছে। ধানক্ষেতের সবুজ ধানের ওপর বাতাস বয়ে গেলে যেমন ধানের গাছগুলো নম্র আবেশে পেছনে বা পাশে এলিয়ে পড়ে, ওর মগজের শিরা উপশিরাগুলোর ওপর খেলে গেল সেরকম একটা আবেশ। ও ডেকে উঠল, “ভাষাপোকা”। কেউ জবাব দিল না। তবে বাতাসের মত সেই তরঙ্গ যেন আরো জোরালো হল; একটা ফিশফিশানির মত শোনা গেল। কেউ যেন নিঃশ্বাস নিচ্ছে। যেন কেউ কিছু বলতেও চাইছে। এরকম কিছুক্ষণ চলার পর সৌম্য যেন একটা ভাব বা বক্তব্যকে বুঝে উঠল। কিন্তু কোন ধ্বনি বা শব্দে নয়। বরং এক গা ছমছম করা নীরব যোগাযোগের তরঙ্গে। সেই তরঙ্গ থেকে ভাবটুকু ছেঁকে নিলে এরকম দাঁড়ায়: “ভাষাপোকাকে ধ্বংস করা হয়েছে।”

সৌম্য’র মনে হলো একটা তীব্র হাহাকার ওর অনেক ভেতরের একটা গভীর সুড়ঙ্গে গড়িয়ে পড়লো। চারিদিকে যেন এক ধরণের ভুতুড়ে শূন্যতার মত নীরবতা ছড়িয়ে পড়ছে-কানে তালা ঝুলিয়ে দেয়া এক গম্ভীর স্তব্ধতা। সেই তরঙ্গ-নির্ভর ভাবকে ও আবার শুনতে পায়, “ভাষাপোকা নিহত হয়েছে। তার সমস্ত সৈন্য-সামন্ত সহ সে নিহত হয়েছে। টিকে থাকার চেষ্টায় অনেক যুদ্ধ করেও সে পরাজিত হয়েছে মূকতাপোকার কাছে। এই পোকা যুদ্ধ করেছে নিমিনদের অস্ত্র হয়ে। বাকিটা তুমি ভাষাপোকার চিঠি থেকে জানতে পারবে। এই চিঠি পাওয়া গিয়েছিল তার গোপন বাংকারে। যেখানে স্বেচ্ছাবন্দী থেকে সে যুদ্ধ চালিয়ে গিয়েছিল মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। সম্ভবত চিঠিটা তোমাকেই লেখা। চিঠিটা তোমার মগজের তরঙ্গে প্রবেশ করানো হচ্ছে। ঠিক যেভাবে তুমি আমার ‘ভাব’ বুঝতে পারছ সেভাবেই চিঠিটাও বুঝতে পারবে:

প্রিয় সৌম্য,

তোমার কাছ থেকে শেষ বিদায়টা নেয়া হল না। আমি গত সপ্তাহের প্রায় পুরোটা জুড়েই তোমার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছি কিন্তু তোমার মাথায় অনেক ধরণের চাপ থাকায় তোমার মনোযোগ পাইনি। জানি না এই চিঠি তোমার কাছে পৌঁছুবে কিনা আর পৌঁছুলেও কীভাবে পৌঁছুবে। যাই হোক আমি এখন আমার গোপন বাঙ্কারে আছি আর আমার সৈন্যরা জীবন হাতে নিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। এটাকে গোপন বাঙ্কার বলা ঠিক হচ্ছে কিনা জানি না কারণ  ওরা মানে নিমিনরা  এটার কথা জেনে ফেলেছে। আমি বাইরে গোলাগুলির আওয়াজ পাচ্ছি আর এটাও বুঝতে পারছি যে আমার সৈন্যরা হেরে যাচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা বাঙ্কারে ঢুকে আমাকেও মেরে ফেলবে। যাই হোক সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। আমি ধ্বংস হওয়ার আগে মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে কিছু কথা তোমাকে বলে যেতে চাই। আশা করি তুমি ও তোমরা মানুষেরা তা বিবেচনা করে দেখবে। অবশ্য নিমিনরা যদি সব দখল করে নেয় তখন হয়ত তোমরা এসব কিছু করার সুযোগ-ই পাবে না। যাই হোক আমি শেষ মুহূর্তেও আশাবাদী থাকতে চাই আর যা বলতে চাই সেটা নিম্নরুপঃ

তোমরা মানুষেরা হয়ত জান না যে নিমিন বলে এক ধরণের প্রাণী আছে যারা দেখতে হুবহু তোমাদের মত। ওরা থাকে তোমাদের ছায়াপথ গ্যালাক্সির ভেতরেই কিন্তু তোমাদের সৌরজগত থেকে প্রায় ২০০০ সৌরজগত দূরের একটা বেশ প্রাচীন গ্রহে। ওদের সভ্যতা অনেক পুরনো যার শীর্ষে গিয়ে ওরা অমরত্ব লাভ করেছে। তবে সেই সাথে ওরা পরিণত হয়েছে এক মূক জাতিতে। ওদের পুরো গ্রহটাই একটা দেশ যেটা তোমাদের পৃথিবীর চেয়ে প্রায় পাঁচ গুন বড়। তবে ওদের গ্রহে কারও কোন ভাষা নেই। বলা যায় কথ্য ভাষা নেই। কেননা একজন নিমিনের অন্য নিমিনের সাথে মৌখিক যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে গেছে অনেক আগেই। প্রতিটা নিমিনের একটা জাতীয় আই ডি আছে যে আউ ডি’র বিপরীতে তার সমস্ত তথ্য রাষ্ট্রীয় মেমোরি ব্যাঙ্কে জমা থাকে। রাষ্ট্র যখন কোন ব্যাপারে কোন নিমিন নাগরিকের সাথে যোগাযোগ করতে চায় তখন তার আই ডি তে সাংকেতিক মেসেজ পাঠানো হয়।

নিমিনরা কোন কাজ করে না কারণ তাদের খাদ্য উৎপাদন করতে হয় না। রাষ্ট্র থেকে তাদের জন্য সরবরাহ করা হয় একধরণের ক্ষুধা-নির্বাহকারী ডিজিটাল ট্যাবলেট। এই ট্যাবলেট উৎপাদিত হয় স্বয়ংক্রিয় মেশিনের মাধ্যমে কোন নিমিনের সংশ্লিষ্টতা ছাড়াই। প্রতিটা নিমিন থাকে একটা দশ ফুট বাই দশ ফুট হাওয়া-কাঁচ ঘরে যা ওদের গ্রহের হাওয়ায় ভাসতে থাকে। যেহেতু ওদের কাজ করতে হয় না তাই সময় কাটানোর জন্য ওদের প্রত্যেকের হাওয়া-কাঁচ ঘরে রয়েছে যাবতীয় ডিজিটাল বিনোদনের ব্যবস্থা। ওরা ঐ ঘর থেকে কখনো বের হয় না। যেহেতু ওরা অমরত্ব লাভ করেছে তাই ওদের নতুন জীবন সৃষ্টির কোন প্রয়োজন নেই। প্রতিটা নিমিন অনন্ত জীবন নিয়ে তার জন্য বরাদ্দকৃত হাওয়া-কাঁচ ঘরে অনন্তকাল ধরে বাস করতে থাকে।

ওদের জীবনে শুধু নতুন প্রাণের সৃষ্টি-ই বন্ধ হয়নি; বন্ধ হয়ে গেছে সবরকম নতুন সৃষ্টি। বিজ্ঞান, সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস বা জ্ঞানের অন্য যে কোন শাখায় আর নতুন কোন সৃষ্টি বা উদ্ভাবন নেই কারণ ওরা মনে করে এসবের আর প্রয়োজন নেই। আর নতুন সৃষ্টি হবেই বা কীভাবে? প্রতিটা নতুন আবিষ্কারকে ধারণ ও তা ছড়িয়ে দেয়ার জন্য তো ভাষা চাই। ওদের তো আর ভাষাই নেই। ওরা একটা মূক জাতি।  আর তাই কোন নিমিন বিজ্ঞানী আর নতুন কিছু আবিষ্কারের প্রণোদনা পায় না বা কোন নিমিন কবি লেখে না নতুন কোন কবিতা। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার হল নতুন কোন কিছু করার চেষ্টা কোন নিমিনের মধ্যে পরিলক্ষিত হলে রাষ্ট্র তাকে ভয়ঙ্কর শাস্তি দেয়। এই শাস্তির উদ্দেশ্য হল তাকে ভবিষ্যতে এ ধরণের কোন উদ্যোগ থেকে পুরোপুরি বিরত রাখা। নিমিনরা গভীরভাবে বিশ্বাস করে যে ওরা পৌঁছে গেছে চূড়ান্ত সৃষ্টির শীর্ষে যেখানে শুধুই অনন্ত জীবনোপভোগ ছাড়া আর সব কিছুই বাতুলতা মাত্র।

এই নিমিনদের রাষ্ট্রীয়ভাবে নিয়োগ দেয়া কিছু আন্তঃ গ্যালাক্টিক চর আছে যাদের কাজ হল এই গ্যালাক্টির ভেতরে অন্য সভ্যতার খোঁজ করা। এরা এই সভ্যতার খোঁজেই সারা গ্যালাক্সি চষে বেড়ায় আর খুঁজে পেলে সেই সভ্যতাকে নিজেদের অধীনে নিয়ে এসে নিজেদের মত পরিবর্তন করে নেয়। অর্থাৎ নিমিনদের বর্তমান সভ্যতার সাথে যোগ হয় আরেকটি মূক সভ্যতা। এভাবে ওরা বেশ কিছু বেশ উন্নত সভ্যতাকে নিজেদের কব্জায় নিয়ে এসেছে। এবার ওরা খোঁজ পেয়েছে তোমাদের পৃথিবীর সভ্যতার আর সেটা অচিরেই দখল করে নেয়ার পথে তারা। যেহেতু তোমাদের সভ্যতার সমস্ত অর্জন (বিজ্ঞান, সাহিত্য ইত্যাদি) ধরা আছে ভাষায় তাই তারা প্রথমেই আক্রমণ করেছে আমাকে। আমি শেষ হয়ে গেলেই তোমরা পুরোপুরি চলে যাবে ওদের কব্জায়। তোমাদের সভ্যতার সমস্ত অর্জন যা তোমরা বিভিন্ন ভাষায় রেকর্ড করে রেখেছ তা এক মুহূর্তে মুছে যাবে।

নিমিনদের এই দুরভিসন্ধির কথা আমি টের পেয়েছি এ সপ্তাহেই। ওরা তোমাদের অক্সিজেনের ভেতর মিশিয়ে দিয়েছে ভাষা-ধ্বংসকারী এক বায়বীয় বিষ। এই বিষ অন্য আর কোন ক্ষতি করবেনা। যা করবে তা হল এরা নিঃশ্বাসের সাথে তোমাদের মগজে ঢুকে মগজের ভাষা-এলাকাকে আক্রমণ করে তাকে অকেজো করে দিবে। এদেরকে প্রতিহত করার চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম নীরব ভাবে। আমার সমস্ত ভাষা- সৈন্য নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। অনেকটা সফলও হয়েছিলাম। কিন্তু তোমাকে সেদিন বলেছিলাম না যে তোমরা মানুষেরা ভাষার মধ্যে মিথ্যের বিষ ঢুকিয়ে দিয়েছ। তোমাদের মধ্যে কেউ আর এখন সত্য বলে না। তোমরা প্রতিটা পেশার মানুষ কারণে-অকারণে অনর্গল মিথ্যা বলে যাও। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর মিথ্যাবাদী হল তোমাদের রাজনীতিবিদেরা যাদের হাতে অসংখ্য শ্রমজীবী মানুষের ভাগ্যের সুতো ধরা থাকে। এইসব রাজনৈতিক ব্যবহার করে অনেক শুদ্ধ-পবিত্র শব্দ যেমন “উন্নয়ন”, “সমৃদ্ধি” “আশা”, “মানবিকতা” অথচ তারা এগুলো ভেতর থেকে বিশ্বাস করেই না বরং নিজেরা একত্র হলে এগুলো নিয়ে ব্যাপক হাসাহাসিও করে।

তোমাদের এই মিথ্যার চূড়ান্ত ও নির্মম শিকার হলো ভাষা। ভাষার শিরা-উপশিরায় এখন এই মিথ্যার গরল। ভাষার ভেতরে এই গরলের ক্রমাগত নিঃসরণে ভাষার শরীর-কাঠামো দুর্বল হতে হতে এখন তোমাদের আলুর চিপসের মতই ভঙ্গুর একটা অবস্থায় এসে ঠেকেছে। এই দুর্বল সৈন্য নিয়েও আমি এতদিন যুদ্ধ চালিয়ে গেছি। কিন্তু এখন ওরা ঐ মূকদের বিরুদ্ধে আর পেরে উঠছে না। ভেতর-ফাঁপা দানবগুলোর ধ্বংসাত্মক শক্তি ভয়াবহ। আমার অনেক শব্দ-সৈন্য লড়তে লড়তে লুটিয়ে পড়ছে। ওদের শরীরে আর বিন্দুমাত্র শক্তিও অবশিষ্ট নেই।

আমার বাঙ্কারের বাইরে প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দ হচ্ছে। মনে হচ্ছে মূকেরা আমার বিশেষ প্রতিরক্ষা ব্যূহ ভেঙে ফেলেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ধরে ফেলবে আমাকে। আর সাথে সাথে শেষ হয়ে যাবে তোমাদের সভ্যতা। তোমরা হয়ে পড়বে মূকেদের দাস। আমি চেষ্টা করেছিলাম প্রাণপণ তোমাদের সভ্যতাকে এ যাত্রায় টিকিয়ে দেয়ার। কিন্তু পারলাম না। তোমাদের মিথ্যার বিষ এতই তীব্র যে ওতে ভাষার শরীরের শেষ ধুকপুকটাও স্তব্ধ হয়ে যায়।      

এটুকু জানানোর জন্যই এই চিঠি। আমার আর কিছু বলার নাই। তোমাদের মিথ্যাতেই ধ্বংস হলে তোমরা।
বিঃদ্রঃ তোমাকে এই চিঠি যদি কেউ দেয় সে হবে মূকদেরই একজন। কারণ তখন আমি আর থাকব না।
বিদায়
ভাষাপোকা।

আজকের রাতটা পুরোপুরি অন্ধকার। কোথাও আলোর এতটুকু ফুটকিও নেই। বেশ কিছুক্ষণ হলো বিদ্যুৎ চলে গেছে। চারিদিকে কারফু-লাগা শহরের নীরবতা। কোথাও কোনরকম কোন শব্দ নেই-না বৃষ্টির, না ব্যাঙ ডাকার। সৌম্য জানালার শিক-এ মুখ ঠেকিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। মনের ভেতরটা ভীষণ ফাঁকা লাগছে-একটা অদ্ভুত বিষণ্ন অন্ধকার দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে যেন বুকের সামনের দিকে ছলকে উঠছে। খুব একা আর অসহায় লাগে সৌম্য’র। কোন কিছু বা কারো কথা মনে করতেও যেন ভুলে গেছে ও। আজকের অন্ধকার ঘুচে গিয়ে যে কালকে একটা নতুন দিন এটা ও আর বিশ্বাস করতে পারে না। মনে হয় সবকিছু অর্থহীন। আলো-অন্ধকার, দিন-রাত সবকিছু অর্থহীন লাগে ওর কাছে। মনে হয় কোন কিছুর-ই কোন মানে নেই।

ঠিক এই সময়ে ও খুব পরিচিত একটা শিসের শব্দ শুনতে পায়, আর তারপরেই একটা ‘বিপ’ শোনা যায়। একটা গলা খাঁকারি শোনা যায়: “ঘুমাওনি এখনো? কালকে তো রিপোর্টের ফিডব্যাক পাবে অফিসে গেলেই। খুব সম্ভবত রিপোর্টটা ছাপা হবে। সম্পাদক পছন্দ করেছে সরেজমিনে করা তোমার রিপোর্টটা”

“ভাষাপোকা? তুমি?”
“হ্যাঁ, মরে গেছি। চিঠিতে তাই লিখেছিলাম।”
“তাহলে?”
“ওটা ঠিকই আছে তবে এটা লিখিনি যে শুধু শরীরটা মরেছে আমার…”
“মানে?”
“মানে তোমাদের ভাষাবিদরা যাকে স্বীকার-ই করেনা তার জোরেই বেঁচে আছি এখনো”
“সেটা কী?”
“আত্মা। তোমাদের কেউ কেউ যেটাকে বলে সাব্সটেন্স”
“এখন তোমার আত্মা কথা বলছে?”
“হ্যাঁ। তোমরা মানুষেরা তো এখনো বিশ্বাস কর যে ভাষা হল শুধুই ফর্ম বা খোলস। এর ভেতরে আর কিছু নেই। কত বোকা বোকা তোমাদের ভাষাজ্ঞান।
সৌম্য কিছুক্ষণ কথা বলতে পারে না। এক ভীষণ আনন্দের উজ্জ্বল ছুরিতে ওর ভেতরটা এফোঁড় ওফোঁড় হতে থাকে। কয়েক মুহূর্তের স্তব্ধতার পর ও বলে,
“আমি আসলে আমাদের মিথ্যাচারের জন্য খুব-ই লজ্জিত…আমি…”

“হুম্‌ম্‌…শুনে খুশী হলাম যে তুমি লজ্জিত। তবে তোমার সত্য রিপোর্টটার জন্য অভিনন্দন। যেভাবে তুমি মেয়েটার জীবনের সত্যটা বের করে এনে ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছো! তবে তোমার জীবনের সত্যটাও অনেক ট্র্যাজিক। তুমি তোমার জীবনে আসা কোন মেয়েকেই ভালোবাসতে পারো নি। শেষ পর্যন্ত ভালোবাসলে যৌতুকের বলি হওয়া মৃত একটা মেয়েকে। কালঘাম ছুটিয়ে ওকে নিয়ে রিপোর্টটা করলে। তোমরা মানুষেরা সত্যিই অদ্ভুত। জীবিত মানুষকে ভালোবাসতে পারলে না অথচ মৃত একটা মানুষকে কী অবলীলায় ভালোবেসে ফেললে। তোমাদের সীমাবদ্ধতাটাও আমি বুঝি। সব তো তোমাদের হাতে নেই। মাঝে মাঝে তোমরা ক্রীড়নক মাত্র।  তবে তোমরা মানুষেরা এখনো পুরোপুরি শয়তান হতে পারোনি। এই শয়তান তো এই ভালো। কে যেন বলেছিল আমাকে একবার যে মানুষ হল শুভ আর অশুভ’র চমৎকার ভারসাম্য। আসলেই তাই। যাই হোক তোমার মাধ্যমে আমি ভাষাদের প্রতিনিধি হিসেবে সব মানুষদের একটা অনুরোধ করে যাই: তোমরা মিথ্যার পথ থেকে যতটুকু পারো সরে আসো। সবটুকু তোমাদের হাতে নেই জানি। যতটুকু আছে ততটুকুতে নিজের কাছে সৎ থাকতে চেষ্টা করো।  তোমরা যত সত্য বলবে তত শক্তিশালী হবে ভাষা। ভবিষ্যতে ভাষার উপর এরকম আক্রমণ হলে শক্ত হাতে ঠেকাতে পারব তাহলে। তুমি তো সাংবাদিক। এটা নিয়ে একটা রিপোর্ট লেখ। চাই কি আমাকে নিয়ে একটা ফিকশনও লিখে ফেলতে পার। মেসেজটা গেলেই হল। তবে সত্যভাষণটা দীপাকে দিয়েই শুরু কর। ভালবাসলে বলে দাও আর না বাসলে তাও বলে দাও। ওর দিক থেকেও শুনে নাও ও কি চায়। ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলো পারস্পরিক সম ঝোতার মাধ্যমে। আর কোনদিন তোমার সাথে হয়ত কথা হবে না। সেটার আর প্রয়োজনও নেই। তবে আমার অনুরোধটা রাখার চেষ্টা কোরো!” সৌম্যকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই সৌম্য’র মগজের  ভেতরে হঠাৎ-ই শিস-ওঙ্কারের মিশ্রণটা থেমে গেল। 

বাইরে আকাশ ফর্শা হয়ে আসছে। জীবনের জেগে ওঠার নানা শব্দ পাওয়া যায়। আজ বৃষ্টি নেই। নেই ব্যাঙের ডাকও। একটা চাপা ফর্শা আলোয় সবকিছু কেমন নতুন দেখাচ্ছে। 

কয়েকজন মর্নিং ওয়াকার উচ্চস্বরে কথা বলছে, ওদের পাড়ার নতুন নেড়ি কুকুরটা ঘেউ শব্দ করে দুই পাশে মাথা ঝাঁকিয়ে দুই কানে পটপট শব্দ তোলে। আর এ সময়ই সৌম্য’র ফোনটা রিনরিনিয়ে ডেকে ওঠে। ফোনটা দীপার। সৌম্য ফোনটা ধরে, “হ্যালো।”

Comments

comments

রাজিব মাহমুদ

রাজিব মাহমুদ

পুরো নাম মোহাম্মদ মাহমুদুল হক। পেশায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক। গল্প লেখার পাশাপাশি অনুবাদও করেন। অনূদিত গল্প সংকলন “The Book of Dhaka” তে একটি গল্প ও অনূদিত গবেষণা গ্রন্থ “Of the Nation Born” প্রকাশিত হয়েছে যথাক্রমে কোমা প্রেস, ম্যানচেস্টার ও যুবান পাবলিকেশন্স, দিল্লী থেকে।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি