শব্দ এক খোঁজ । মন্দাক্রান্তা সেন

শব্দ।
শব্দের পর শব্দ।
শব্দের পর শব্দের পর শব্দ।

থামো।
ফের গোড়া থেকে শুরু করো।

শব্দ।

না। আরও গোড়া থেকে।

ধ্বনি।
ধ্বনির ভেতরে ধ্বনি।
ধ্বনির ভেতরে ধ্বনির ভেতরে ধ্বনি।

কী পেলে?

এই পাওয়ার চেষ্টা করে চলেছি আজ অনেক বছর। এই মনে হয় ধরে ফেলেছি ফেলেছি, কিন্তু সে ধরা দেয় না। আসলে যা বলতে চলেছি, সে কথা আমি আগেই বলেছি, তবু আরেকবার বলা ছাড়া উপায় নেই। আমার মনে হয় ইথার তরঙ্গে শব্দগুলি ভাসছে। তাদের যে পায় সে পায়। একাধিক শব্দ জুড়ে জুড়ে বাক্য তৈরি হয়। বাক্য সাজিয়ে সাজিয়ে কাব্য। কাজেই, একটি কবিতা গড়েই ওঠে ইথার তরঙ্গের শব্দ থেকে। একে একবার কেউ পেড়ে আনলে অন্য কেউ তার আর নাগাল পায় না। অনুকরণ চলতে পারে, তাতে প্রকৃত ও আদি শব্দে বাক্যনির্মাণের স্বতঃস্ফূর্ততা থাকে না। এমনকি এই ইথার-শব্দ অনুবাদের ক্ষেত্রেও সত্যি। অনুবাদক মূল কাব্যের সঠিক অনুবাদটি, তাঁর অনুদিত শব্দচয় ওই ইথার থেকে সংগ্রহ করেন। আমার ক্ষেত্রে অন্তত এই অভিজ্ঞতা সত্যি।

কথায় বলে শব্দব্রহ্ম । তার অমিত শক্তি। সে প্রার্থনা করাতে পারে, সে অভিশাপ দিতে পারে। আমি, স্বভাবতই, একজন কবি হিসেবে সেই শব্দব্রহ্মের উপাসক। উপনিষদ আমাকে দীক্ষিত করেছে। তেমনই দীক্ষিত করেছে নাম-না-জানা তরুণ কবির চমৎকার ফেসবুক পোস্ট। আমাকে শব্দ যে-কোনওরকম ভাবে ছোঁয়। তার গাঁথা শব্দমালা আত্মাকে সুরভিত করে তোলে।

আমার শব্দেও বাজুক ওই কারণে-অকারণে বেহালার সুর। কেউ তাকে কিনল কি কিনল না, আমি সন্ধে ঘনানো রাত্তিরে ঘরে ফিরে আবার হাতড়ে হাতড়ে শব্দ খুঁজব।

কবিতায় শব্দের প্রয়োগ কিছু মুনশিয়ানার দাবি রাখে। যুগপৎ ছন্দে, ছন্দমিলে ও গদ্য কবিতায়। আপাতভাবে ছন্দে ও ছন্দমিলেই যে, সে কথা বলাই বাহুল্য। শ্রুতিতে বা হিসাব কষে যাঁরা কবিতা রচনা করেন, তাঁদের ছন্দ অটুট রাখার জন্য ঠিক শব্দে শেষ হওয়া বাক্যে অথবা পঙক্তিতে অর্থের সাথে আপোস করে না। বিষয় ও নির্মাণ এখানে ঠিকঠাক পরাস্পরকে কমপ্লিমেন্ট করে। এটা ঘটাতে কিছু চর্চার প্রয়োজন। প্রথম প্রথম আঁকশি নিয়ে বসে থাকতে হয়, ইথারে সঠিক শব্দটি ভেসে এলেই খপ্! গদ্যকবিতার নির্মাণের ক্ষেত্রেও এটা সত্যি। একটি শব্দের পর আরেকটি শব্দ বসাতে সঠিক কাব্যমনস্কতা ব্যবহার করতে হয়। মনে হয় ছন্দ-মিলের কবিতা থেকে এটা আরও কঠিন। ছন্দ ও অন্ত্যমিলের কাঠামোটা অনুযায়ী শব্দ বসানো যায়, কিন্তু গদ্য কবিতার কাঠামো অন্যরকম। তার খোঁজও আরও বেশি মনোযোগিতা দাবি করে। এখানে একটি শব্দের পর এমন আরেকটি শব্দ বসাতে হয়, যার কোনও বিকল্প নেই। সেদিক থেকে আপাতভাবে ছন্দমিলের নির্মাণকে শব্দব্যবহারে কিছু কঠিন মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে গদ্যকবিতা বা মুক্তকবিতাকে অনেক সাবধানে সযত্নে গড়ে তুলতে হয়।

কবিতায় শব্দব্যবহার নিয়ে কিছু কথা বলা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে যদি একটি কথা উল্লেখ না করি। ছন্দ ও অন্ত্যমিলের কবিরা কেউ কেউ কথার খেলায় মেতে ওঠেন। এ শব্দ তাঁদের পাওয়া নয়, বানানো। কৃত্রিমতাটা ধরা পড়ে যায়। কবিতা তখন শুধু কথার জাগলারি হয়ে ওঠে, মর্ম তার উপেক্ষিত হয়। এটা খুব দুর্ভাগ্যজনক প্রবণতা। এতে কিছু কবি সংক্রামিত। শুধুমাত্র এই কথার পর কথা সাজানোর বদ নেশা থেকে মুক্তি অতি অবশ্য কাম্য।

শব্দের মধ্যেই শুধু বেঁধে রাখছি সত্তাকে আমার,
বেঁধে রাখছি প্রাণপণে, আপাতত শব্দমাত্র সার।
জানি না এখনও আরও কতদূর পথ চলা বাকি,
ততদিন শব্দগুলি শুধুমাত্র অক্ষরের ফাঁকি।

এই অক্ষরের ফাঁকি নিয়ে ভুলে থাকার জন্য কবিতা নয়। এই অক্ষরকে শব্দে পরিণত করতে হবে ছুঁয়েছেনে। তবেই কবিতা হয়ে ওঠে উত্তীর্ণ। শব্দ সেখানে অক্ষরসমষ্টিমাত্র নয়, কবিতার রক্তকণিকা।

ইংরিজি গানের ব্যান্ড বি জি-দের একটা বিখ্যাত গান আছে। পরে আর একটি ব্যান্ড বয়জোনও এই গানটা রেকর্ড করে। তার কথাগুলো দারুণ। ‘ইট’স ওনলি ওয়ার্ডস, অ্যান্ড ওয়ার্ডস আর আই হ্যাভ টু টেক ইওর হার্ট অ্যাওয়ে’… সত্যিই। হে পাঠক, আমার শব্দ মেলেছি তোমার সামনে, তোমার হৃদয় যদি কাড়তে পারি, তবেই আমার শব্দসকল ধন্য, আমি ধন্য।

শেষ করব একটি ব্যক্তিগত কথন দিয়ে। এটাও বোধ হয় কারও জানতে বাকি নেই। তবু প্রাসঙ্গিক বলে বলতে ইচ্ছে হলো। আমার তখন সাড়ে তিন বছর বয়েস। বাড়িতে ধুমধাম করে রবীন্দ্রজয়ন্তী পালিত হতো। আত্মীয় স্বজন প্রতিবেশীদের জন্য অবারিত দ্বার। সেই রবীন্দ্রজয়ন্তীতে আমার থেকে ছ’বছরের বড় দাদা একটা রবিঠাকুরের মুখ এঁকেছিল। দেখে ভারি হিংসে হলো। মা বুঝলেন ব্যাপারটা। আমাকে একটা প্রস্তাব দিলেন, দাদা ছবি এঁকেছে, আমি একটা পদ্য লিখলে কেমন হয়! খুব রাজি। মা একটা লাইন বলবেন, পরেরটা মিলিয়ে মিলিয়ে আমি। মা বললেন– ‘আজকে তোমার জন্মদিনে গাইছি তোমার গান।’ আমি সঙ্গে সঙ্গে মায়ের কানে কানে বললাম — ‘যারা যারা গাইছে নাকো, শুনছে পেতে কান।।’ ছন্দে মিলে ভুল নেই। মা আনন্দে বিগলিত, আমায় খুব আদর করলেন। আর সেই রবীন্দ্রজয়ন্তীর শুভ লগ্নে আমার কবিতার জীবন শুরু হয়ে গেল।

শব্দ নিয়ে বেসাতি সাজিয়েছি। যার যা ভালো লাগে, নিয়ে যায়। প্রকাশক কিছু পয়সা। কিন্তু প্রকৃত শব্দকে কেনা যায় না। কে কিনবে বৃষ্টিপতনের শব্দ, নদীর ছলাৎছল, বাঁশবনের মর্মর। কে কিনবে নিঝুম দুপুরে ফেরিঅলার ডাক, অকারণে ঝাঁকায় বাঁশের বেহালা নিয়ে বাজাতে বাজাতে বেহালা-অলার দূরে ভাসে যাওয়া সুর। কে কিনবে ওই বেহালা, দুপুর গড়িয়ে যাওয়া এই বিকেলটি ছাড়া!

আমার শব্দেও বাজুক ওই কারণে-অকারণে বেহালার সুর। কেউ তাকে কিনল কি কিনল না, আমি সন্ধে ঘনানো রাত্তিরে ঘরে ফিরে আবার হাতড়ে হাতড়ে শব্দ খুঁজব।

ও আমার ইথার তরঙ্গে ভাসা শব্দেরা…

Comments

comments

মন্দাক্রান্তা সেন

মন্দাক্রান্তা সেন

জন্ম: ১৫ই সেপ্টেম্বর ১৯৭২ সালে কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৭ পর্যন্ত তিনি চিকিৎসা শাস্ত্র নিয়ে গবেষণা শুরু করেন কিন্তু স্নাতক হবার আগেই সাহিত্যের প্রতি আরও মনযোগী হতে চূড়ান্ত পরীক্ষার আগেই তিনি তার গবেষণায় ইতি টানেন। কবিতার বই ছাড়াও তিনি তার মাতৃ ভাষায় প্রচুর ছোট গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, শ্রুতি নাটক প্রকাশ করেছেন। তিনি সর্বকনিষ্ঠ কবি যিনি ১৯৯৯ সালে ‘আনন্দ পুরস্কার‘ পান মাত্র ২৭ বছর বয়সে। ২০০৪ সালে তিনি ‘ভারতীয় সাহিত্য আকাদেমি ‘ থেকে ‘ সুবর্ণজয়ন্তী ইয়ং রাইটার্স পুরস্কার ‘ লাভ করেন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ১৯৯৯ ইংরেজিতে ‘হৃদয় অবাধ্য মেয়ে’ বের হয়। তারপর থেকে প্রায় প্রিতি বছরই বই বের হচ্ছে।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট

লেখকের সোশাল লিংকস:
Facebook

Tags: ,

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :

সাম্প্রতিক পোষ্ট

লেখকসূচি